কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

গ্রামীণ উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অভিবাসন সমস্যা নিরসন

খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনসহ দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থান, বেকারত্ব হ্রাস ও প্রতিটি নাগরিকের জীবনমানের উন্নয়ন দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যতম হাতিয়ার। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক প্রণীত রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়ন করতে কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন ও গ্রামীণ উন্নয়নের পাশাপাশি দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য প্রতিটি মানুষকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে হবে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়, খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এরই মধ্যে যথেষ্ট উন্নতি করলেও  প্রায় ০৪ কোটি মানুষ এখনও খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে আছে। পাশাপাশি গরিব ও বিত্তবানদের মধ্যে পুষ্টি বৈষম্য বেড়েই চলেছে। দারিদ্র্য নিরসনে গত দুই দশকের বেশি সময়ে নেয়া বিভিন্ন কর্মসূচির ফলে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতিতে লক্ষণীয় অগ্রগতি আছে বাংলাদেশের। শিশু ও মাতৃপুষ্টি নিশ্চিত করতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও আন্তর্জাতিক মানদ-ে বয়স অনুযায়ী শিশুর উচ্চতা ও ওজনে এখনও পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য আরও বড় একটি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে অপরিকল্পিত নগরায়ন। এর ফলে বেশ কিছু কৃষি জমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, বর্তমানে কর্মসংস্থানের অভাবে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বিরাট একটি অংশ অবৈধভাবে বিদেশে পাড়ি জমানোর পাশাপাশি দেশের গ্রাম ও মফস্বল এলাকা ছেড়ে শহরমুখী হয়ে পড়ছে। অথচ গ্রামীণ উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে এ ধরনের অবৈধ অভিবাসন রোধ করাসহ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর শহরমুখী প্রবণতাকেও রোধ করা সম্ভব। সে লক্ষ্যে বর্তমান সরকার কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে দেশব্যাপী বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনার বাস্তবায়ন করছে।


গ্রামীণ উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার অত্যন্ত সফল। দারিদ্র্য বিমোচন সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০১৫ সালেই Millennium Development Goals (MDG) এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে। যেখানে বিগত ১৯৯১ সালে দরিদ্রতার হার ছিল ৫৭ শতাংশ, সেখানে ২০১৬ সালে তা কমে ২৪.৮ শতাংশ। এ ছাড়া, মাথাপিছু খাদ্য গ্রহণের হারও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগত ২০০৯ সালে জনপ্রতি খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ ছিল ২,৬৩৩ কিলোক্যালোরি এবং বিগত ২০১৬ সালে তা ২,৯২৫ কিলোক্যালোরিতে দাঁড়ায়। গ্রামীণ পর্যায়ে উৎপাদিত কৃষি পণ্যের সঠিক বিক্রয়মূল্য নিশ্চিতকরণ ও কর্মসৃজনের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বাজার অবকাঠামো নির্মাণ করছে। উল্লেখ্য, অপ্রচলিত ফসলগুলো চাষাবাদ বৃদ্ধিকরণ এবং কৃষিভিত্তিক ব্যবসা সম্প্রসারণে বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে ৭.৫ বিলিয়ন টাকা দেশব্যাপী বিতরণ করেছে, যা গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে এবং এসব উদ্যোগ আমাদের নবীন কৃষকদের কৃষির প্রতি আরও আগ্রহী করে তুলছে। কৃষি মন্ত্রণালয় সার, বীজ, কৃষি যন্ত্রপাতি সহজলভ্য করতে নিয়মিত ভুর্তকি ও প্রণোদনা কর্মসূচি পরিচালনার পাশাপাশি নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের চাহিদা মোতাবেক পুনর্বাসন সেবা প্রদান করে যাচ্ছে।


যেহেতু কৃষি প্রধান বংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৭ শতাংশ এখনও কৃষির ওপর নির্ভরশীল এবং এই শ্রমশক্তির সিংহভাগই প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চলে বিস্তৃত, দেশের অভিবাসন সমস্যা নিরসনে গ্রামীণ শ্রমশক্তির আর্থসামাজিক উন্নয়ন অত্যাবশ্যক।  


উল্লেখ্য, বিগত ১৯৭১-৭২ অর্থবছরে বাংলাদেশের   খাদ্যশস্যের (ধান, গম ও ভুট্টা) উৎপাদন ছিল প্রায় ১১১ লাখ টন, আর বর্তমানে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে খাদ্য উৎপাদন প্রায় ৩৯২ লাখ  টন। বিগত ১৯৭১-৭২ সালের তুলনায় বর্তমানে বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় তিন গুণেরও বেশি ও গম প্রায় ১৩ গুণ। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বে ধান উৎপাদনে চতুর্থ, সবজি উৎপাদন বৃদ্ধির হার বিবেচনায় তৃতীয় ও ফল উৎপাদন বৃদ্ধির হার বিবেচনায় সপ্তম অবস্থানে রয়েছে। আগে যেখানে হেক্টর প্রতি ২ টন চাল উৎপাদিত হতো, বর্তমানে উৎপাদিত হচ্ছে ৪ টনের কাছাকাছি। স্বাধীনতার পর দেশে মাত্র ৭ কোটি জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগান ছিল না, আর বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ০.৭৩ শতাংশ হারে জমি কমে যাওয়া, গড়ে ১.৩৭ শতাংশ হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও দেশ এখন খাদ্যে উদ্বৃত্ততা অর্জন করেছে। এক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয়াধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভূমিকা অগ্রগণ্য। কেননা সংস্থাটি তার প্রশিক্ষিত সম্প্রসারণ কর্মীদের মাধ্যমে ২০০টিরও বেশি ফসলের উৎপাদন, দলভিত্তিক সম্প্রসারণ সেবা প্রদান, সেচ ব্যবস্থাপনা, বীজ ব্যবস্থাপনা, ফসল সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ, ক্ষেত্র বিশেষে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনসহ সামগ্রিক প্রযুক্তিগুলো কৃষকদের মধ্যে সম্প্রসারণ, সব দুর্যোগে কৃষকদের পাশে থেকে সহায়তা প্রদান, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, মানসম্পন্ন কৃষি উপকরণ কৃষকের কাছে সহজলভ্যকরণ ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি, কৃষক কর্তৃক গৃহীত প্রযুক্তিগুলো টেকসই করার মাধ্যমে তাদের আয় বৃদ্ধি, জীবনমান উন্নয়ন, উন্নত কৃষি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদিত কৃষি পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়তা প্রদান, নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের গ্রামীণ আর্থসামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশ সরকার কৃষি উৎপাদনে রাষ্ট্রীয় ব্যয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, উপকরণ ব্যবস্থাপনা ও সারের মূল্য নির্ধারণসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকার কৃষি বাজেট, কৃষিঋণ, ভর্তুকি ও বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে জনগণের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তবে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে দেশের বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ, খাদ্যশস্য সংরক্ষণ ও গুদামজাতকরণের বিষয়ে আরও কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।


বাংলাদেশে জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, তাতে পল্লী বসতিগুলো এখনকার মতো বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে উঠলে মারাত্মক কৃষিজমির সংকট দেখা দেবে। কিন্তু Compact Township এর মতো করে যদি ঘনবসতিপূর্ণ বসতি সৃষ্টি করা যায়, তাহলে কৃষি জমির ওপর আগ্রাসন শুধু কমবেই না, বরং নতুন করে আরও কিছু কৃষি জমি মুক্ত হবে। ফলে পল্লী এলাকাতেই লোকজন নগর সুবিধা পেয়ে যাবে। সুতরাং পল্লী-নগর স্থানান্তর কমবে এবং এর ফলে আঞ্চলিক বৈষম্যও কমে যাবে। এছাড়া, সারা দেশের খাসজমির বণ্টনে আরও কার্যকরী নীতিমালা প্রয়োজন। নদীভাঙনের ফলে নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ার বিপরীতে যারা বাস্তুহারা হচ্ছে, তাদের চরের জমি বণ্টনের ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। ব্যক্তিমালিকানায় জমির ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের মাধ্যমে জমির সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাছাড়া নবায়নের ক্ষেত্রে আইনি বিষয় ও সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে।


সমবায়ের মাধ্যমে কৃষিকাজ, মৎস্য চাষ, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন করে গ্রামের অধিবাসীদের আয় বাড়ানো যেতে পারে। গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে আধুনিক গ্রামে রূপান্তর করতে হলে প্রথমে শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। সে লক্ষ্যে বর্তমান সরকার গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য ছোট ছোট ডেইরি ও পোলট্রি খামার এবং আধুনিক চাষ পদ্ধতিসহ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা গড়ে তুলতে বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছে। এছাড়া আমাদের সনাতন পদ্ধতিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ পালন ব্যবস্থাপনায় আনা হচ্ছে নানা ধরনের আধুনিক পরিবর্তন। বাংলাদেশের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিজ্ঞানীরা উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন এবং তা দ্রুত কৃষকদের মাঝে সম্প্রসারণ করছে। গ্রামীণ পর্যায়ে মৎস্য ও প্রণিসম্পদের উন্নয়নের লক্ষ্যে এর দুর্বল গ্রামীণ অবকাঠামো পুননির্মাণসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরূপ প্রভাব  মোকাবিলায় খামার ও কৃষিভিত্তিক আয় বৃদ্ধিতে সুনির্দিষ্ট বাধাগুলো অপসারণে মাঠ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো কাজ করে যাচ্ছে। দরিদ্র কৃষকদের ভর্তুকি প্রদানসহ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয়বর্ধনমূলক কর্মসংস্থান, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সমবায়ভিত্তিক ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প স্থাপনের জন্য স্বল্প সুদে সহজ শর্তে মূলধন জোগান দেয়া হচ্ছে। দেশের পুষ্টি, স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তাসহ দারিদ্র্য বিমোচন ও অন্যান্য সামাজিক উন্নয়নে সরকারের এ ধরনের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।


বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এবং এলাকাভিত্তিক ফসল উৎপাদনের উপযোগিতাকে বিবেচনায় নিয়ে Cropping Zone সৃষ্টি করে এলাকাভিত্তিক উপযোগী ফসলগুলো নিবিড়ভাবে চাষাবাদ ও এর অধিক উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব। যার ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় উৎপাদিত ফসলের ওপর ভিত্তি করে বিশেষায়িত বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপন গড়ে উঠবে, যা নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর শহরমুখী প্রবণতা হ্রাস করবে। উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার এ ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন এবং এরই মধ্যে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে।


বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের যুগোপযোগী নীতিমালা অনুযায়ী বর্তমানে গৃহীত ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিল্পনাগুলো সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমেই দেশের গ্রামীণ উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অবৈধ অভিবাসন সমস্যা নিরসনসহ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর শহরমুখী প্রবণতা রোধ করা সম্ভব।

 

কৃষিবিদ মো. গোলাম মারুফ*
*  মহাপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫

 


Share with :

Facebook Facebook