কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং অভিবাসন রোধে সুগারক্রপ (কার্তিক ১৪২৪)

কৃষি প্রধান দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। এক কথায় আমরা বলি সোনার বাংলা। সত্য সত্যই এ বাংলা সোনা ফলানো বাংলা। ফসলের সমারোহে পীতে-হরিতে, সবুজে-শ্যামলে এ দেশ ভরপুর। অন্ন সমস্যা যে দেশে প্রকট, সে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়বে অচিরেই। আজকের দিনে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আমাদের যা আশু এবং অবশ্যম্ভাবী করণীয় তা হলো কৃষি বিপ্লবের মাধ্যমে দেশের খাদ্যশস্যের পর্যাপ্ত ফলনকে সুনিশ্চিত করা। কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি। এ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ শতাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। জিডিপির প্রায় ১৫.৩৩ শতাংশ (বিবিএস, ২০১৫)  অর্জিত হয় কৃষি খাত থেকে। কৃষি খাতে চলমান প্রবৃদ্ধির হার ৩.৩৫ (বিবিএস ২০১৬)। দেশের প্রায় ১৬ কোটি মানুষের খাদ্যের জোগান আসে কৃষি খাত থেকে। এ ছাড়াও প্রতি বছর প্রায় দুই মিলিয়ন নতুন মুখের জন্য ৩ লাখ টন অতিরিক্ত খাদ্যের জোগান দিতে হয় এ খাতকে।


কৃষি নির্ভর অর্থনীতিতে খাদ্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যেখানে জনগণ তাদের আয়ের বেশির ভাগ খাদ্যের জন্য ব্যয় করে থাকে। রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো সব সময়ে সবার জন্য নিরবচ্ছিন্ন খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু ক্রমাগত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খাদ্য উৎপাদন ও চাহিদার সমন্বয়হীনতার অভাবে ক্রমে প্রকট হয়ে উঠছে খাদ্য সংকট। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে আবাদযোগ্য জমি কমার কারণে গত ১০ বছরে জমির পরিমাণ ও উৎপাদন ২০ থেকে ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। কৃষি খাতকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ১৫.১৮ মিলিয়ন (বিবিএস, কৃষি শুমারি ২০০৮) কৃষি পরিবারের (যাদের মধ্যে ৮৪.৩৮ শতাংশ পরিবারে জমির পরিমাণ সর্বোচ্চ ১ হেক্টর) জীবিকা অর্জনে কখনও কখনও অসম পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। কর্মসংস্থানের জন্য বিপুলসংখ্যক গরিব ও ভূমিহীন পরিবারের কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে পরিস্থিতির জটিলতা আরও বেড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার মানোন্নয়নে কৃষি খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। কৃষি কাজে জমির ওপর ক্রমবর্ধিত জনসংখ্যার চাপ, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের সংখ্যাধিক্য, মাটির স্বাস্থ্যের ক্রমাবনতি, সেচ পানির অপ্রতুলতা ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, দানাদার ফসল উৎপাদনে অধিক গুরুত্ব প্রদান, মানসম্মত বীজের অপ্রতুলতা, কৃষকের চলতি মূলধনের অভাব, কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ধীরগতি, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং অন্যান্য সমস্যা কৃষি খাতে সাফল্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ ছাড়াও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ যেমন- কৃষি জমির শিল্প দূষণ, কৃষি জমি অকৃষিতে রূপান্তর, পাহাড়ধস ইত্যাদি কারণে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়ন চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ছে এবং অভিবাসন হার বৃদ্ধি পাচ্ছে।


জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। জার্মানভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচ বলেছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ২০০৭ সালে বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। প্রায় প্রতি বছরই বাংলাদেশের জনসাধারণ বিশেষ করে চরাঞ্চল, নদী, পাহাড়, বরেন্দ্র, হাওর ও সমুদ্র উপকূলবর্তী জনগোষ্ঠী বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন-বন্যা, খরা, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, পাহাড়ধস ইত্যাদি কারণে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের শিকার হয়। বর্তমানে জনসংখ্যার ৪০% দরিদ্র। এর মধ্যে ২০% অতিদরিদ্র। চরাঞ্চলে ৮৮% দরিদ্র এবং ৪৪% অতিদরিদ্র এবং ৫% জনগোষ্ঠীর অরক্ষিত বসতি রয়েছে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার সাথে সাথে অভিবাসন হারও বৃদ্ধি পাচ্ছে।


সুগারক্রপ চাষাবাদের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং অভিবাসন রোধ
খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং অভিবাসন রোধে সুগারক্রপের গুরুত্ব এদেশে অপরিসীম। ইক্ষুর ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এ দেশের চিনি ও গুড় শিল্প, যা উত্তরাঞ্চলের একমাত্র ভারী শিল্প। তাই উত্তরাঞ্চলের তথা উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে ইক্ষুর অবদান সবচেয়ে বেশি। চিনিকল এলাকায় প্রায় ৬ লাখ চাষি পরিবার সরাসরি ইক্ষু চাষের ওপর নির্ভরশীল। তা ছাড়া চিনিকল বহির্ভূত গুড় উৎপাদন এলাকায় এবং চিবিয়ে খাওয়া ইক্ষু উৎপাদনের জন্য সারা দেশে প্রায় ২০ লাখ চাষি পরিবার ইক্ষু ফসলের ওপর নির্ভরশীল। চিনিকলগুলো প্রতি বছর ইক্ষু চাষিদের মধ্যে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করে, ২৫০-৩০০ কোটি টাকার ইক্ষু ক্রয় করে এবং নিজ নিজ এলাকার সড়ক, জনপথ, কালভার্ট ইত্যাদি নির্মাণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি গ্রামীণ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিদ্যুতায়ন, হাট-বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রভৃতি গড়ে ওঠায় চিনিকলগুলোই গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকা-ের মূল ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত হয়। প্রায় ২৫ হাজার পরিবারের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হচ্ছে চিনি শিল্পে। এ ছাড়া ৬০ মিলিয়ন কৃষি পরিবার, ব্যবসায়ী, শ্রমিক চিবিয়ে খাওয়া ইক্ষু এবং গুড় উৎপাদনের সাথে জড়িত। তা ছাড়া ইক্ষু রোপণ, আন্তঃপরিচর্যা, কর্তন, মাড়াই, পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজে কর্মসংস্থান হচ্ছে বিপুল সংখ্যক মানুষের।


মিষ্টিজাতীয় দ্রব্য মানবদেহের জন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যোপাদান। বিশেষ করে মেধাশক্তি বিকাশে এর বিকল্প নেই। আমাদের দেশে সাধারণত  চিনি ও গুড় মিষ্টিজাতীয় খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার নির্ধারিত মান অনুযায়ী জনপ্রতি বার্ষিক ১৩ কেজি চিনি/গুড় খাওয়া প্রয়োজন। সেই হিসাবে দেশে ২০২১ সালে প্রাক্কলিত ১৭.২০ কোটি জনসংখ্যার জন্য দরকার হবে ২৩ লাখ  টন চিনি ও গুড়। বর্তমানে প্রতি বছর ১.৮০ লাখ হেক্টর জমিতে ইক্ষু আবাদের মাধ্যমে দেশে ১৫টি চিনিকলে ২.১০ লাখ টন চিনি উৎপাদন ক্ষমতার বিপরীতে প্রায় ১.০০-১.৫০ লাখ  টন চিনি এবং ৬.০০ লাখ  টন গুড় উৎপাদিত হচ্ছে। এতে করে চিনি/গুড়ের মোট দেশজ উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭.৫০ লাখ টন। ফলে চিনি/গুড়ের ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪.৮৬ লাখ টন। এ চাহিদা পূরণ করতে সরকারকে প্রতি বছর ১৪-১৬ লাখ টন চিনি বিদেশ থেকে  আমদানি করতে হয়। বর্তমানে ইক্ষু চাষাযোগ্য জমির পাশাপাশি পতিত জমির সদ্ব্যবহার, উপকূলীয় এলাকার ২০ লাখ হেক্টর জমির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, চরাঞ্চলের ২ লাখ হেক্টর এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অব্যবহৃত জমির একটা অংশ গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যে চাষের আওতায় নিয়ে এসে ঘাটতি পূরণের এ কাজটি সফলভাবে করার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ইক্ষুর পাশাপাশি ট্রপিক্যাল সুগারবিট, খেজুর, তাল, গোলপাতা, স্টেভিয়া প্রভৃতি অপ্রচলিত মিষ্টি উৎপাদনকারী ফসল থেকেও চিনি, গুড়, সিরাপ, জুস উৎপাদনের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।


এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে বছরে প্রায় ৮২ হাজার হেক্টর আবাদি জমি হারিয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া কৃষককে আর্থসামাজিক অবস্থা ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কারণে দেশে খাদ্যশস্যের চাহিদা পূরণের জন্য শুধু ইক্ষুর একক আবাদ যুক্তিযুক্ত নয়। আবাদযোগ্য জমির সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য ও সার্বিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রচলিত ফসল বিন্যাসের সাথে ইক্ষু ও সাথী ফসলের আবাদ সমন্বয় করা প্রয়োজন। চাষযোগ্য পতিত ৩.২৩ লাখ হেক্টর জমিসহ পাহাড়ি এলাকা, সমুদ্র উপকূলবর্তী ২০ লাখ হেক্টর, বরেন্দ্র এলাকার প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর এবং চর এলাকার প্রায় ২ লাখ হেক্টর জমির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সুগারক্রপ চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে হাইওয়ে রয়েছে প্রায় ২.৫ হাজার মাইল, গ্রাম্য কাঁচারাস্তা রয়েছে প্রায় ৯০ হাজার মাইল, ইট বিছানো রাস্তা প্রায় ১.৫ হাজার মাইল, নিয়মিত বাঁধ ও বেড়িবাঁধ রয়েছে প্রায় ১০ হাজার মাইল, মিটার গেজ রেলপথ আছে প্রায় ১.২ হাজার মাইল ও ব্রড গেজ রেলপথ রয়েছে ৬ শত মাইল। অর্থাৎ মোট রাস্তার পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার মাইল। দুই ধার হিসাবে ২ লাখ ১২ হাজার মাইল। ২০ ফুট পরপর একটি করে তাল বা খেজুর গাছ এসব পতিত জমির এক-চতুর্থাংশে লাগানো হলেও প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ গাছ লাগানো সম্ভব। তাছাড়াও জমির আইল, পুকুর/খালের পাড়, দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রায় কয়েক কোটি খেজুর, তাল ও গোলপাতা গাছ লাগানো সম্ভব। প্রতি বছর যদি এক কোটি গাছ থেকে গুড় উৎপাদন করা হয় (গড়ে ১০ কেজি হিসাবে) তবে ১ লাখ টন গুড় উৎপাদন করা সম্ভব যার বাজার মূল্য প্রতি কেজি ৮০ টাকা হিসাবে ৮ কোটি টাকা, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং অভিবাসন রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


বসতবাড়ির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতের লক্ষ্যে প্রত্যেক বাড়ির আনাচে-কানাচে চিবিয়ে খাওয়া ইক্ষু ও স্টেভিয়া চাষ, পরিবারপ্রতি একটি করে তাল ও একটি করে খেজুর গাছ লাগানোর মাধ্যমে প্রায় কয়েক কোটি গাছ লাগানো সম্ভব, যা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি কৃষকদের আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের চিনি ও গুড়ের চাহিদা পূরণ করবে এবং অভিবাসন রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ১৮,৪৯,০০০ একর বসতবাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে ১,৭৮,০০০ একর শহর এলাকায় এবং ১৬,৭১,০০০ একর গ্রাম এলাকায় (Statistical Pocket Book, Bangladesh, 2006) । বন্যা, ঘূর্ণিঝড় প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর তাৎক্ষণিকভাবে পানি ও পুষ্টির চাহিদা পূরণে ইক্ষুর রস ব্যবহার করার লক্ষ্যে বাড়ির আঙিনায় চিবিয়ে খাওয়া আখের কয়েকটি ঝাড় লাগিয়ে উৎপাদিত আখ বছরব্যাপী ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।


গ্রামীণ উন্নয়নে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার উপযোগী আখ, তাল, খেজুর ও গোলপাতার স্বাস্থ্যসম্মত দানাদার/পাটালি গুড়, সিরাপ, জুস, তালমিশ্রি ইত্যাদি উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং বাজারজাতকরণের লক্ষ্যে সমবায় সমিতি প্রবর্তনের মাধ্যমে চাষিদের অবস্থার উন্নতি সাধন করে আমরা সুফল পেতে পারি। বাংলাদেশে বহু পতিত জমি, খাল-বিল, ডোবা, পাহাড়, চরাঞ্চল, বরেন্দ্র, সমুদ্র উপকূলীয় অধিকাংশ এলাকা এখনো অনাবাদি। এগুলো চাষোপযোগী করলে আমরা অধিক পরিমাণে খাদ্য ফলাতে পারি। তাছাড়া বন্যাক্রান্ত অধিকাংশ এলাকার ফসল বিনষ্ট হওয়ায় চাষিরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু ইক্ষু একমাত্র ফসল, যা বন্যাকালীনও জমিতে দাঁড়িয়ে থাকে এবং নষ্ট হয় না। বজ্রপাতসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পুষ্টি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে তাল ও খেজুর গাছ রোপণ এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আমন ধান রোপণের পর আশ্বিন-কার্তিক মাসে মানুষের হাতে তেমন কোনো কাজ না থাকায় অলস বসে থাকে এবং অভিবাসনের হার বৃদ্ধি পায়। ওই সময় হচ্ছে ইক্ষুর রোপণ ও কাটার সময়। ইক্ষু রোপণের জন্য বীজ খ- তৈরি, শোধন, নালা তৈরি, জমি তৈরি, রোপণ, আন্তঃপরিচর্যা এবং কর্তনকৃত আখ থেকে গুড় মাড়াই, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ফলে প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর  আর্থসামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি অভিবাসন রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং অভিবাসন রোধ নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে-


খাল কেটে পানি সরবরাহ, পানি নিষ্কাশন, পোকামাকড় ধ্বংস, প্লাবন ও লোনাপানির হাত থেকে ফসল রক্ষা করতে পারলে খাদ্য ঘাটতি বহুল পরিমাণে হ্রাস করা সম্ভব।
কৃষক সংগঠন/উৎপাদক দল গড়ে তোলা এবং তাদের টিকিয়ে রাখার জন্য যথাযথ সহায়তা প্রদান।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ।
কৃষিঋণ কার্যক্রম সহজীকরণ এবং প্রকৃত কৃষক যেন ঋণ পায় সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভর্তুকি প্রদানের ব্যবস্থা করা।
উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা।
কৃষকগণ যেন ফসল  উৎপাদন লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে তার নিশ্চয়তা বিধান করা।
সময়মতো কমমূল্যে কৃষি উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
গবেষণা-সম্প্রসারণ-কৃষক-বাজার সংযোগ শক্তিশালী করা।
গুদামজাতকরণ সুবিধা বৃদ্ধি করা।
কৃষি পণ্যের বাণিজ্যিক চাষাবাদে উৎসাহ প্রদান।
শস্য বীমা চালুকরণ।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বমূলক অংশগ্রহণের মাধ্যমে এগ্রো ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা।
উৎপাদনমুখী বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি।
উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে পরীক্ষণ, প্রদর্শনীর ব্যবস্থা ইত্যাদি।

 

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অতীতের উন্নত জাতিগুলো কৃষি কার্যেও উন্নত ছিল। প্রাচীন মিসরবাসী পালাক্রমে ভিন্ন ভিন্ন শস্যের চাষ জানত। উষ্ণ মরুভূমি, হাজার বছরের পতিত জমি যেসব জায়গায় ফসল ফলানোর কথা কল্পনাও করা যেত না এক সময়, সেখানে আজ অতি প্রয়োজনীয় সব ফসল ফলছে। পরিবার পরিকল্পনা, অধিক খাদ্য ফলাও, একটি বাড়ি একটি খামার ইত্যাদি অভিযান সাফল্যমণ্ডিত করে তুলতে পারলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি গ্রামীণ উন্নয়ন এবং অভিবাসন রোধ সম্ভব। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণে আবাদযোগ্য জমির সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য ও সার্বিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রচলিত ফসল বিন্যাসের সাথে বিভিন্ন উচ্চফলনশীল ফসলের আবাদ সমন্বয় করা তাই সময়ের দাবি।

 

কৃষিবিদ ড. মো. আমজাদ হোসেন* কৃষিবিদ ড. মো. নূর আলম মিয়া**
*মহাপরিচালক **বিভাগীয় প্রধান, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগ, বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঈশ্বরদী, পাবনা

 


Share with :

Facebook Facebook