কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়নে বিএডিসির ভূমিকা

খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিতকরণে বিভিন্ন কৃষি উপকরণ তথা মানসম্মত রাসায়নিক সার সংগ্রহ ও বিতরণ, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, উন্নত মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন ও বিপণন, কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ইত্যাদি কৃষকের মাঝে অবাধ সরবরাহ থাকা বাঞ্ছনীয়। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের লক্ষ্যে বিএডিসির বীজ ও  উদ্যান উইং এবং ক্ষুদ্রসেচ উইংয়ের পাশাপাশি সার ব্যবস্থাপনা উইং বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের বহুমুখী নিরলস কার্যক্রম গ্রহণে জাতীয় ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি ও অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। দীর্ঘ সময়ে বিএডিসি  উন্নত বীজ, পরিমিত সেচ ও গুণগতমান সম্পন্ন সার ব্যবহারের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে।


মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ কার্যক্রম  
ফসল উৎপাদনে বীজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। অন্যান্য কৃষি উপকরণের কার্যকারিতা গুণগত মানসম্পন্ন বীজের ওপর নির্ভরশীল। তাছাড়া কোন ফসলের সম্ভাব্য ফলন বীজের মানের সাথে সরাসরি জড়িত। বীজ উৎপাদন ও মানসম্পন্ন বীজ কৃষকের হাতে তুলে দিতে বিএডিসি ৩৪টি ভিত্তিবীজ বর্ধন ও উৎপাদন খামারের মাধ্যমে বীজ উৎপাদন করছে। এর মধ্যে দানাজাতীয় বীজ উৎপাদন খামার ২৪টি, পাটবীজ খামার দু’টি, ডাল ও তেলবীজ খামার চারটি ও আলুবীজ খামার দু’টি। ১ লাখ ৯ হাজার ৫৩১ একর কমান্ড এরিয়ায় ৭৫টি কন্ট্রাক্ট গ্রোয়ার্স জোন ও ৩৭ হাজার ৬১১ জন চুক্তিবদ্ধ কৃষক যুক্ত আছেন। ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭০০ টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ৫২টি আধুনিক বীজ প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ কেন্দ্র, তিনটি অটো সিড প্রসেসিং প্লান্ট ও ডিহিউমিডিফায়েড গুদাম এবং ঢাকায় একটি কেন্দ্রীয় বীজ পরীক্ষাগার রয়েছে। দেশব্যাপী ট্রানজিট বীজ গুদামসহ ১০০টি বীজ বিক্রয় কেন্দ্র, ৮ হাজার ৫৬ জন বীজ ডিলার নিয়ে একটি সুসংগঠিত মার্কেটিং চ্যানেল রয়েছে। বীজের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে অভ্যন্তরীণ মাননিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১৪টি এগ্রো সার্ভিস সেন্টার ও নয়টি উদ্যান উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে। বীজ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিএডিসি কর্তৃক বাস্তবায়িত প্রকল্প, বীজ কার্যক্রম ও চুক্তিবদ্ধ চাষিদের মাধ্যমে বিগত ৯ বছরে বিভিন্ন ফসলের সর্বমোট ১২.৯০ লাখ টন বীজ উৎপাদন ও কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে।


বোরো ধান বীজ সরবরাহ বৃদ্ধিকরণ
দেশের খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের জন্য দানাজাতীয় ফসলের মধ্যে বোরো ধান বীজ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। বিএডিসি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সর্বমোট ৬৬,৪৯৫ টন বোরো ধান বীজ কৃর্ষকপর্যায়ে সরবরাহ করেছে।


আমন ধান বীজ সরবরাহ
দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য দানাজাতীয় ফসলের মধ্যে আমন ধান বীজ  অন্যতম। বিএডিসি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সর্বমোট ১৭৭৯০ টন আমন ধানবীজ কৃষকপর্যায়ে সরবরাহ করেছে।


SL-8H জাতের সুপার হাইব্রিড বোরো বীজ সরবরাহ বৃদ্ধিকরণ
বিএডিসি কর্তৃক ২০১৬-১৭ অর্থবছরে
SL-8H জাতের সুপার হাইব্রিড ৬৫৪ টন বীজ উৎপাদন ও কৃষকপর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে। কৃষকপর্যায়ে বিএডিসির SL-8H জাতের সুপার হাইব্রিড বোরো বীজ সরবরাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। SL-8H জাতের হাইব্রিড ধানের হেক্টরপ্রতি ফলন ১০-১২ টন। এ জাতের ধান চাষে দেশে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
 

গম বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ
দেশে গমের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সর্বমোট ১৮,১১১ টন গমবীজ উৎপাদন ও কৃষকপর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে।  

 
ভুট্টা বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ
বিএডিসি দেশে ভুট্টার উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সর্বমোট ১৬ টন ভুট্টা বীজ উৎপাদন ও কৃষকপর্যায়ে সরবরাহ করেছে।


ডাল ও তেলবীজ উৎপাদন ও সরবরাহ
দেশের জনগণের আমিষের চাহিদা পূরণকল্পে বিএডিসি কর্তৃক ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ডালজাতীয় ৮৩৪ টন ও তেল জাতীয় ২,৩১৫ টন বীজ উৎপাদন ও কৃষকপর্যায়ে বিতরণ করা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে দেশে ডাল ও তেল ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচর উপজেলায় বিএডিসি কর্তৃক ২০১৪-১৫ অর্থবছরে একটি ডাল ও তেলবীজ বর্ধন খামার স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। উক্ত খামারের বীজ ব্যবহারের মাধ্যমে নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার চর এলাকায় একরপ্রতি ডাল ও তেল ফসলের ফলন বৃদ্ধি পাবে।


আলু বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ
বিএডিসি কর্তৃক ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩২,৬২৭ টন আলুবীজ উৎপাদন ও কৃষকপর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে। এতে দেশব্যাপী আলু উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

পাট বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ
বিএডিসি কর্তৃক ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭৭৫ টন পাটবীজ উৎপাদন ও কৃষকপর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে। এতে দেশব্যাপী পাটবীজের আমদানি নির্ভরতা কমেছে।

 

সবজি ও মসলা বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ
দেশের জনগণের পুষ্টি চাহিদা পূরণকল্পে বিএডিসি কর্তৃক ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭৭ টন সবজি বীজ ও ১১০ টন মসলা বীজ উৎপাদন ও কৃষকপর্যায়ে বিতরণ করা হয়েছে।

 

উদ্যান সংক্রান্ত কার্যক্রম
বিএডিসি বিগত ২০১০-১১ হতে ২০১৬-১৭  সময়ে সমন্বিত মানসম্পন্ন উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্প, এগ্রো সার্ভিস সেন্টার কার্যক্রমের মাধ্যমে ২৫.১৩৩ লাখ টন সবজি; ০.৩৭ লাখ টন মসলা; ৪.৪৮ লাখ টন ফল; ৩৯৮.৩২ লাখ সবজি চারা; ২০১৪.২৫৫ লাখ চারা/কলম ও ২৮.৬৮৫ লাখ নারিকেল চারা উৎপাদন ও বিতরণ করেছে। ফলে সময়ের সাথে সাথে সবজি, ফল, মসলা জাতীয় ফসলের উৎপাদন বেড়েছে। কৃষকপর্যায়ে মানসম্পন্ন উদ্যান ফসলের চারা বিতরণের ফলে দেশব্যাপী উদ্যান ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে দেশের জনগণের পুষ্টি চাহিদা পূরণ ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে।

 

সেচ কার্যক্রম
বিএডিসি সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ করে দেশের খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ  অবদান রাখছে। খাদ্য উৎপাদনে দেশে দুই ধরনের সেচ কার্যক্রম প্রচলিত আছে। বৃহৎ সেচ ও ক্ষুদ্রসেচ। বোরো মৌসুমে ক্ষুদ্রসেচের মাধ্যমে দেশের সেচকৃত জমির ৯৫% ভাগ এবং বৃহৎ সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে মাত্র ৫%  জমিতে সেচ প্রদান করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশে সেচযোগ্য জমির প্রায় ৭২% সেচের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। ফসলে সেচ প্রদানের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বিএডিসি বেশ কিছু কৌশল গ্রহণ করেছে।

 

সেচকাজে ভূপরিস্থ পানিসম্পদের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি করা
বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার ভূপরিস্থ পানি সেচকাজে ব্যবহারে অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। শুষ্ক মৌসুমে নদ-নদী, খাল-বিল বা অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাশয়ে পর্যাপ্ত পানি থাকে না। তবে ব্যবহারযোগ্য পানির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করে কম খরচে গুণগত মানসম্পন্ন পানি ব্যবহার এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানোই এর উদ্দেশ্য। বিগত ৬ বছরে ভূপরিস্থ পানির ব্যবহার ১৮% থেকে বৃদ্ধি করে ২২% এ উন্নীত করা সম্ভব হয়েছে। ভূপরিস্থ পানি ব্যবহারে নিম্নবর্ণিত কার্যক্রম অব্যাহত আছে।


সেচের পানির উৎস বৃদ্ধিকল্পে ভূপরিস্থ পানি (বৃষ্টি ও বন্যার পানি) সংরক্ষণ ও ব্যবহারের জন্য খাল-নালা, পাহাড়ি ছড়া ইত্যাদি পুনঃখনন/সংস্কার;
 

ছোট নদীতে রাবার ড্যাম স্থাপনের মাধ্যমে সেচ সুবিধা প্রদান;
জলাবদ্ধ এলাকায় খাল-নালা পুনঃখনন ও বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে কৃষি জমি পুনরুদ্ধার করে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি এবং সেচের নির্ভরযোগ্য উৎস তৈরি করা;

বৃষ্টি বা বন্যার পানি সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন প্রকার Water control structure (যেমন: ক্রস ড্যাম, সাবমারসিবল ওয়্যার, বক্স কালভার্ট, ক্যাটল ক্রসিং ইত্যাদি) নির্মাণ;

 

বিএডিসির প্রধান প্রধান সেচ কার্যক্রম
সঠিকভাবে সেচের পানির ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পানির অপচয় হ্রাসের পাশাপাশি ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে দেশের ভূগর্ভস্থ ও ভূপরিস্থ পানির সুপরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি, বহুমুখীকরণ ও ফলন বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ উদ্দেশ্যে বিগত ২০০৯-১০ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত বিএডিসির মাধ্যমে সেচকৃত এলাকা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিম্নোক্ত কার্যক্রম  বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

 

কৃষক প্রশিক্ষণ
বিএডিসির সেচ উইং কর্তৃক বাস্তবায়িত প্রকল্প ও কর্মসূচির মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ ও ভূপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহার এবং সেচ দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়ে সর্বমোট ৯৮,০৫৮ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পানির অপচয় হ্রাস ও কৃষকপর্যায়ে সেচ দক্ষতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হচ্ছে।

পানির স্তর পরিমাপ
বিএডিসি কর্তৃক বাস্তবায়িত ক্ষুদ্রসেচ উন্নয়নে জরিপ ও পরিবীক্ষণ প্রকল্পের মাধ্যমে সর্বমোট ২০১টি অটোওয়াটার লেভেল রেকর্ডার স্থাপন করা হয়েছে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসব অটোওয়াটার টেবিল রেকর্ডারের মাধ্যমে টাইম সিরিজ ডাটা সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে এবং ডিজিটাল ডাটা ব্যাংক প্রস্তুত করার মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির তথ্য/উপাত্ত পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে। এ তথ্য ব্যবহার করে ইতোমধ্যে
Groundwater Zoning Map তৈরি করা হয়েছে এবং সময়ে সময়ে তা আপডেট করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশের কোথায় কোন ধরনের সেচযন্ত্র ব্যবহার করা যাবে তা সহজেই নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে।  ক্ষুদ্রসেচ উন্নয়নের লক্ষ্যে সেচযন্ত্র, সেচ এলাকা, সেচের পানি ইত্যাদির নিয়মিত জরিপ, অনুসন্ধান অটোওয়াটার লেভেল রেকর্ডার ও পর্যবেক্ষণ নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ স্থিতিশীল পানির স্তর পরিমাপ করা এবং Space Technology (ST), Remote Sensing (RS), Geophysical Survey এর মাধ্যমে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, তথ্য সংগ্রহ করে, আধুনিক প্রযুক্তি যেমন: Geographic Information System (GIS) Modeling এর মাধ্যমে বিশ্লেষণ, পরিবীক্ষণপূর্বক সুপারিশ প্রণয়ন, প্রচার এবং ডাটাবেজ উন্নয়ন ও সরকারকে তা অবহিত করা হচ্ছে।


সার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম
ফসল উৎপাদনে সার তথা গাছে পুষ্টি সরবরাহ করাও গুরুত্বপূর্ণ। বিএডিসি প্রতিষ্ঠালগ্নে প্রাথমিকভাবে ১৯৬২-৬৩ অর্থবছরে প্রায় ৫০,০০০ টন সার সংগ্রহ ও ডিলারপর্যায়ে বিতরণের মাধ্যমে সার ব্যবস্থাপনা বিভাগের সফল কার্যক্রম শুরু করে এবং পর্যায়ক্রমে সার বিতরণ কার্যক্রম কৃষকপর্যায়ে জনপ্রিয়তা লাভ করে। এরই ধারাবাহিকতায় বিএডিসি গত ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে সর্বোচ্চ প্রায় ১৬ লাখ ৯০ হাজার টন সার আমদানি ও প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার টন সার বিতরণ করে থাকে। তথাপি তৎকালীন বিএনপি সরকার দেশের জনগণের কল্যাণ তথা কৃষকের স্বার্থ বিবেচনা না করে সরকারি সিদ্ধান্তক্রমে ১৯৯২ সাল  থেকে বিএডিসির মাধ্যমে সার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়। অতঃপর বেসরকারিভাবে সার আমদানি কার্যক্রমে অব্যবস্থাপনা ও কৃষকপর্যায়ে বিতরণে বিশৃঙ্খলার কারণে সুদীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর পর ২০০৬-০৭ অর্থবছর সরকার পুনরায় বিএডিসিকে বেসরকারি পর্যায়ের পাশাপাশি নন-নাইট্রোজেনাস সার আমদানি ও বিতরণের দায়িত্ব অর্পন করে।


বর্তমান সরকার কৃষকদের কাছে গুণগত মানসম্পন্ন টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিসিআইসির সার ডিলারদের পাশাপাশি বিএডিসির বীজ ডিলারগণকে বিএডিসির সার ডিলার হিসেবে নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় বিএডিসির নিজস্ব সার ডিলার নেটওয়ার্ক ব্যাপকতা লাভ করে। অর্থাৎ বিএডিসির মাধ্যমে নিবন্ধিত সব ডিলারকে সার উত্তোলনের সুযোগ প্রদান করায় বিএডিসির সার কৃষকদের কাছে আরও সহজপ্রাপ্য হয়। এর ফলে কৃষকদের মধ্যে বিএডিসির আমদানিকৃত সারের চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ২০০৯ সালে বর্তমান কৃষকবান্ধব সরকার গঠনের পর সারের দাম দফায় দফায় হ্রাস করা হয়।


সারের মূল্য হ্রাস ও মানসম্মত সার নিশ্চিত হওয়ায় নন-নাইট্রোজেনাস সারের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কৃষি উৎপাদন খরচ হ্রাস পেয়েছে। ফলে ক্রমবর্ধমান হারে দেশের জাতীয় উৎপাদনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বিএডিসি কর্তৃক টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সারের আমদানি ও বিতরণ হচ্ছে।


অর্থাৎ বর্তমান সরকারের উন্নয়নের অন্যতম নিদর্শন সুলভ মূল্যে কৃষক পর্যায়ে সার বিতরণ। যে কারণে দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে।
পাশাপাশি সার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য প্রাথমিকপর্যায়ে ৪৬২টি গুদাম নির্মিত হয়। পূর্ববর্তী সরকারের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বিএডিসির সার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম বন্ধ হয় এবং বিএডিসিতে জনবল হ্রাসকরণের ফলে নির্মিত বিশাল অবকাঠামো ও গুদামগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনায় অনেকটা বিপর্যয় নেমে আসে। তখন গুদাম কিংবা স্থাপনা সংস্কার কিংবা মেরামত কাজ একদম বন্ধ ছিল। ফলে সময়ের পরিক্রমায় অনেক গুদাম ও স্থাপনা জরাজীর্ণ/ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বর্তমান সরকারের বলিষ্ঠ পদক্ষেপে জরাজীর্ণ/ব্যবহার অনুপযোগী গুদাম/স্থাপনা পুনরায় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বর্তমান কৃষকবান্ধব সরকারের আধুনিক উন্নত চিন্তার কারণে অব্যাহতভাবে সার আমদানি বৃদ্ধি ও ডিলার নেটওয়ার্ক বাড়ানোর পদক্ষেপের পাশাপাশি বিএডিসি সার সংরক্ষণের জন্য গুদামের প্রয়োজনীয় ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রমও অব্যাহত রেখেছে। সরকারের খাদ্য বিভাগ, বিসিআইসি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিএডিসির যেসব গুদাম ব্যবহৃত হচ্ছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে পুনরায় বিএডিসির অধীনে ফেরত নেয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে যেখানে বিএডিসির গুদামের ধারণক্ষমতা ছিল মাত্র ৯৮,০০০ মে. টন সেখানে বর্তমানে বিএডিসির ১২০টি গুদামের মোট ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়ে ১,৭৫,৯৬৬ মে. টনে উন্নীত হয়েছে।


জৈবসার
বিএডিসির বীজ উৎপাদন খামারগুলোতে জৈবসার (ভার্মি কম্পোস্ট) উৎপাদন শুরু হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ঝিনাইদহের দত্তনগর, খুলনার বোয়ালিয়া, মেহেরপুরের চিৎলা পাটবীজ খামার, নীলফামারী জেলার ডোমার বীজ আলু উৎপাদন খামার, নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচর ডাল ও তেলবীজ খামার, গাজীপুরের কাশিমপুর উদ্যান উন্নয়ন কেন্দ্রে জৈবসার (ভার্মি কম্পোস্ট) উৎপাদন শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বিএডিসির অন্যান্য খামারেও  জৈবসার (ভার্মি কম্পোস্ট) উৎপাদন করা হবে। বাণিজ্যিকভাবে বিএডিসি জৈবসার (ভার্মি কম্পোস্ট) বাজারজাত করবে।


দেশের জনগণের দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার টেকসই রূপ দিতে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। খাদ্য উৎপাদনের জন্য মানসম্পন্ন বীজ, সার এবং সেচের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকপর্যায়ে মানসম্পন্ন বীজ সরবরাহ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ সংক্রান্ত কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তির আওতায় তিউনিশিয়া, মরক্কো, বেলারুশ, রাশিয়া ও কানাডা হতে নন ইউরিয়া সার আমদানি এবং সেচ এলাকা সম্প্রসারণের মাধ্যমে পতিত জমি আবাদি জমিতে রূপান্তরিত করার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। মানসম্মত কৃষি উপকরণ তথা বীজ, সার ও সেচ সুলভ মূল্যে সহজলভ্য হওয়ায় ফসল উৎপাদন ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। কৃষি বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের মেরুদণ্ড। বর্তমানে কৃষি উৎপাদন নিশ্চিত হওয়ায় গ্রামীণ উন্নয়ন হচ্ছে। গ্রামীণ জনগণের আয় বেড়েছে, শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে, শিশু মৃত্যুর হার কমেছে, তথ্য প্রযুক্তিতে গ্রামীণ জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

মো. নাসিরুজ্জামান*
*চেয়ারম্যান  (অতিরিক্ত সচিব), বিএডিসি, সেচ ভবন, মতিঝিল, ঢাকা


Share with :

Facebook Facebook