কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়নে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজীবনের লালিত স্বপ্ন ছিল কৃষিনির্ভর এ দেশকে ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্র্যমুক্ত সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলা। স্বাধীনতার অব্যহিত পরেই তিনি কৃষি ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে Presidential Order No. ৩২ অর্ডিন্যান্স জারি করেন যার ফলে কৃষি গবেষণা এবং কৃষি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের ধারা সূচিত হয় এবং কৃষি গবেষণার উন্নয়ন ও সমনি¦ত কার্যক্রমের পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি হয়। কৃষি খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনয়ন এবং দেশ খাদ্যে স¦য়ংসম্পূর্ণতার লক্ষ্যে তিনি সবুজ বিপ্লবের ডাক দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ নং-৬২ এর মাধ্যমে ‘ডাইরেক্টরেট অব এগ্রিকালচার (রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন)’ এর বিলুপ্তি ঘোষণা করে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।


বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট দেশের সর্ববৃহৎ বহুবিদ ফসল গবেষণা প্রতিষ্ঠান। দেশের সার্বিক কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন, কৃষকের আয় বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন প্রকার দানা জাতীয় ফসল, কন্দাল ফসল, ডাল, তেল, মসলা ফসল, সবজি, ফল, ফুল, সামুদ্রিক শৈবালসহ ২০৮টি ফসলের ওপর গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এ প্রতিষ্ঠান এসব ফসলের খরা, লবণাক্ততা প্রতিরোধী, স্বল্প দৈর্ঘ্যরে বায়োফর্টিফাইড উচ্চফলনশীল উন্নত জাত এবং উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি উদ্ভাবন, ফসল ব্যবস্থাপনা, সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা, পোকামাকড় ও রোগবালাই প্রতিরোধী জাত ও ব্যবস্থাপনা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, ফসলের সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা, এলাকাভিত্তিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন, হাইড্রোপনিক পদ্ধতি, সামুদ্রিক শৈবাল চাষ, সমন্বিত খামার পদ্ধতি উন্নয়ন, পাহাড়ি অঞ্চলে ফসল উৎপাদন এবং আর্থসামাজিক বিশ্লেষণ ইত্যাদি বিষয়ের ওপর লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে তা সম্প্রসারণকর্মী, কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ট এনজিও কর্মী কৃষকের নিকট হস্তান্তরের জন্য নানা ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করে থাকে।
প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ৫০৯টি জাত ও ৪৮২টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে। এসব জাত ও প্রযুক্তি বাংলাদেশের কৃষি তথা গ্রামীণ উন্নয়ন ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে ভূমিকা রেখে চলেছে।


যখন সব মানুষের সক্রিয় দৈনন্দিন সুস্বাস্থ্য জীবন যাপনের জন্য সব সময় পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টিসমৃদ্ধ সুষম নিরাপদ খাদ্য পাওয়ার অধিকার থাকবে তখন তাকে খাদ্য নিরাপত্তা বলে। প্রাকৃতিকভাবেই উর্বর জমির এ দেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে আর্থসামাজিক এবং খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাসহ জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা সম্ভ^ব। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের কৃষিনীতি ও বিভিন্ন পদক্ষেপ যেমন- ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি সারে উল্লেখযোগ্য ভর্তুকি, জ্বালানি তেলে ভর্তুকি, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, কৃষিতে প্রণোদনা প্রদান, সার বিতরণ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, উন্নতমানের বীজ সরবরাহ, প্রতিকূলতা সহিষ্ণু জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের ফলে দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।


দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রতি বছর ফসলি জমি ০.৭৩% হারে কমে যাচ্ছে (এসআরডিআই ২০১৩)। ফলে চাষের জমি সম্প্রসারণের সুযোগ কম। তাই দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে গ্রামীণ উন্নয়নের লাভজনক, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থার একান্ত প্রয়োজন।


বিভিন্ন ফসলের আধুনিক চাষাবাদের জন্য ফসল, মাটি এবং বালাই ব্যবস্থাপনার ওপর ২১৩টি উন্নত প্রযুক্তির উদ্ভাবন। বায়োটেকনোলজির ওপর ১৮টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের জন্য ৩৫টি কৃষি যন্ত্র সংক্রান্ত প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন। সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনার ওপর ৩৬টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন। চার ফসলভিত্তিক ১২টি লাভজনক শস্য বিন্যাসের উদ্ভাবন। শস্য সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তির ওপর ২৮টি প্রযুক্তির উদ্ভাবন। খামার পদ্ধতি গবেষণার আওতায় ১৩০টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন। প্রতি বছর  ১০ হাজারের অধিক বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও কৃষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান


নিয়মিত ত্রৈমাসিকভিত্তিক একটি আধুনিক জার্নাল, বারি সংবাদ, বারি প্রযুক্তি বইসহ অসংখ্যা বুকলেট, লিফলেট ও বই প্রকাশ। বিভিন্ন ফসলের ১০ হাজারের অধিক জার্মপ্লাজম বারি জার্মপ্লাজম কেন্দ্রে সংরক্ষণ।


প্রতি বছর ১০০০ টন বিভিন্ন ফসলের উন্নত বীজ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হয় এবং পরে ঐসব প্রতিষ্ঠান বীজ বর্ধিত করে সারা দেশের কৃষকদের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়।
বিশে^র মধ্যে বাংলাদেশ সবজি উৎপাদনে ৩য় স্থান এবং ফল উৎপাদনে ৮ম স্থান অর্জন করেছে।
সেক্স ফেরোমন এবং আইপিএম প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রবর্তনে কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে রাসায়নিক বালাইনাশকের ব্যবহার প্রায় ৫০ হাজার টন থেকে ৩৫০০ টনে নেমে এসেছে।
কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উন্নয়নে অবদানের জন্য স্বাধীনতা পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার, কেআইবি পুরস্কারসহ অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছে। বিজ্ঞান ও কৃষি উন্নয়নে অবদানের জন্য এ প্রতিষ্ঠানের অনেক বিজ্ঞানী স্বাধীনতা পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কারসহ বিভিন্ন দেশি ও বিদেশি সংস্থা কর্তৃক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত  প্রযুক্তিগুলো নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছে।
বিগত চার দশকে গম, ভুট্টা, আলু, ডাল, তেলবীজ, শাকসবজি, ফলমূল, ফুল, মসলা ইত্যাদি ফসলের বারি উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তিগুলো কৃষকদের মাঝে প্রবর্তনের ফলে উৎপাদনশীলতা বহুগুণে বেড়েছে। বারি উদ্ভাবিত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তি হচ্ছে-

 

গম
বিএআরআই এ পর্যন্ত গমের ৩২টি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তির প্রয়োগ, লবণাক্ততা ও তাপ সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনের ফলে বর্তমানে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১৪ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। বারি গম-২৫ থেকে বারি গম-৩২ পর্যন্ত  দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় এবং বরেন্দ্র অঞ্চলসহ সারা দেশে এ জাতগুলোর আবাদ বৃদ্ধি করার ব্যাপক সম্ভাবনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
 

ভুট্টা
একটি অতি উচ্চফলনশীল ফসল। দেশে পোলট্রি শিল্পের বিকাশের সাথে সাথে ভুট্টার চাহিদা ক্রমান¦য়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৩১ লাখ টন ভুট্টা উৎপন্ন হয়। বিএআরআই এ পর্যন্ত ১৫টি হাইব্রিড জাতসহ মোট ২৪টি ভুট্টা জাত উদ্ভাবন করেছে। খরা অঞ্চলের জন্য ভুট্টার ২টি হাইব্রিড জাত- বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১২ ও বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৩ ও বেবিকর্নের ১টি জাত উদ্ভাবিত হয়েছে।

 

কন্দাল ফসল
কন্দাল ফসলের মধ্যে আলু, মিষ্টি আলু এবং কচু খাদ্য ও সবজির ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৫.৬৫ লক্ষ হেক্টর জমিতে কন্দাল ফসলের চাষ করা হয় যার বার্ষিক উৎপাদন ৯৫ লাখ টন। বিএআরআই এ পর্যন্ত মোট ১০৮টি উচ্চফলনশীল কন্দাল ফসলের জাত উদ্ভাবন করেছে যার মধ্যে আলুর ৮৭টি জাত, মিষ্টিআলুর ১৩টি ও কচুর ৭টি উদ্ভাবিত হয়েছে। এর মধ্যে ৫টি জাত (বারি আলু ৩৫, বারি আলু ৩৬, বারি আলু ৩৭, বারি আলু ৪০ ও বারি আলু ৪১) বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সংকরায়নের মাধ্যমে ক্লোনাল হাইব্রিড জাত হিসেবে অবমুক্ত করা হয়। নতুন উদ্ভাবিত জাতগুলোর গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৩০-৩৫ টন, যা বর্তমানে প্রচলিত জাতগুলোর চেয়ে ২০-৩০% বেশি। এসব জাতের মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রক্রিয়াজাতকরণের উপযোগী।

 

ডাল জাতীয় ফসল
ডাল জাতীয় ফসল বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আমিষের প্রধান উৎস ডাল। জমির স¦ল্পতা, ডাল ফসলের কম উৎপাদনশীলতা, উন্নত জাতের অপ্রতুল ব্যবহার এবং উৎপাদন কলাকৌশল যথাযথভাবে প্রয়োগ না করাই ডালের উৎপাদন বৃদ্ধির প্রধান অন্তরায়। বিএআরআই ৬টি ডাল ফসলের ৩৯টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করছে যার মধ্যে নতুন জাত (বারি মসুর-৭, বারি মসুর-৮,  বারি খেসারি-৩, বারি ছোলা-৯ ও বারি ফিল্ড পি-১) উদ্ভাবিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মসুর, মুগ ও ছোলার জাত চাষ করে ২৫-৩০% ডালের ফলন বাড়ানো সম্ভব।

 

তেল জাতীয় ফসল
তেল জাতীয় ফসল বাংলাদেশের কৃষি পণ্য উৎপাদনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে যে পরিমাণ তেল বীজ উৎপাদিত হয় তা প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। বিএআরআই এ পর্যন্ত ৮টি তেলবীজ ফসলের ৪২টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। বারি সরিষা-১৬, বারি তিল-৪ দুটি উচ্চফলনশীল জাত, দেশের লবণাক্ত ও খরাপ্রবণ এলাকাতেও ভালো ফলন দিতে সক্ষম। উচ্চফলনশীল ও স্বল্পমেয়াদি সরিষার জাত বারি সরিষা-১৪ ও বারি সরিষা-১৫ এবং বারি সরিষা-১৭ রোপা আমন-বোরো ধান শস্যবিন্যাসে অন্তর্ভুক্ত করে সরিষার উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব। কৃষকের জমিতে জনপ্রিয় এ জাত তিনটির সন্তোষজনক ফলন লক্ষ করা যাচ্ছে ।

 

সবজি, ফল ও ফুল
সবজি খাদ্যপ্রাণ ও খনিজ সমৃদ্ধ খাদ্য, যা মানুষের স¦াস্থ্য রক্ষায় অপরিহার্য। একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের দৈনিক সবজির চাহিদা ২২০ গ্রাম অথচ সরবরাহ মাত্র ৬০ গ্রাম। সবজির ঘাটতি পূরণের জন্য বিএআরআই এ পর্যন্ত ২৯টি সবজি ফসলের মোট ১০৪টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে বেগুনের দুটি হাইব্রিড ও গ্রীষ্মকালীন টমেটোর দু’টি হাইব্রিড জাতও রয়েছে। গ্রীষ্মকালীন টমেটোর আবাদ করে সারা বছর টমেটোর প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং অমৌসুমে টমেটোর আমদানি নির্ভরতা কমানো সম্ভব হয়েছে। বারি সরিষা ১৬, বারি হাইব্রিড টমেটো ৭, বারি হাইব্রিড টমেটো ৮ ফল সবজির মতো খাদ্য প্রাণ ও খনিজ সমৃদ্ধ খাদ্য, যা মানুষের স¦াস্থ্য রক্ষায় অপরিহার্য। মাথাপিছু দৈনিক ৮৫ গ্রাম ফলের চাহিদার বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন থেকে আসে মাত্র ৩৫ গ্রাম। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এ যাবৎ ২৭টি ফল ফসলের ৭৯টি উন্নত জাতসহ ফল উৎপাদনের বেশ কিছু কলাকৌশল উদ্ভাবন করেছে।


আমাদের দেশে ফুলের গবেষণা একটি নতুন অধ্যায়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এ ক্ষেত্রটির সম্ভাবনাগুলো চিহ্নিত করে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিএআরআই বিভিন্ন ফুলের ১৯টি জাত উদ্ভাবন করেছে যার মধ্যে গত সাড়ে ৪ বছরে ফুলের ১৩টি উন্নত জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। এসব জাতের মধ্যে চন্দ্রমল্লিকার ২টি, অ্যালপেনিয়ার ১টি, গাঁদার ১টি, লিলির ১টি, ডালিয়া ও জারবেরার ২টি ও গ্লাডিওলাসের ৩টি জাত উল্লেখযোগ্য।


হাইড্রোপোনিক পদ্ধতি
বাংলাদেশে বাড়তি জনসংখ্যার চাপ মোকাবিলার জন্য শুধু আবাদি জমির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। এক্ষেত্রে চাষ অযোগ্য পতিত জমি, বিল্ডিংয়ের ছাদ বা ঘরের বারান্দায় হাইড্রোপোনিক পদ্ধতিতে ফসল চাষের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বড় স্টিলের বা প্লাস্টিকের ট্রেতে পানির মধ্যে গাছের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য উপাদান সরবরাহ করে ফসল উৎপাদন করা হয়। এরই মধ্যে টমেটো, ক্যাপসিকাম, লেটুস, ফুলকপি, শসা, করলা, শিম, খিরা, স্ট্রবেরি, গাঁদা এবং গোলাপ ইত্যাদি ফসল সাফল্যজনকভাবে এ পদ্ধতিতে চাষ করা সম্ভব হচ্ছে।


মসলা ফসল
মসলা জাতীয় ফসল বাংলাদেশে খুবই জনপ্রিয়। বিএআরআই তে মসলা গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের পর পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, আদা, হলুদ, আলুবোখারা ইত্যাদিসহ ১৭ ফসলের ৩৩টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে । যার মধ্যে বারি পেঁয়াজ-২, ৩, ৫  এবং বারি মরিচ-৩ সারা বছর চাষ উপযোগী জাত।

 

কৃষি যান্ত্রিকীকরণ
বাংলাদেশে বর্তমানে কৃষি শ্রমিকের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। সময় ও শ্রম সাশ্রয় কৃষি কাজ লাভজনক করার জন্য গবেষণার মাধ্যমে ৩৫টি কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করা হয়েছে। বর্তমান সরকার কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। এর মধ্যে হাইস্পিড রোটারি টিলার, স্ট্রিú টিলেজ, পাওয়ার টিলার চালিত ইনক্লাইন্ড প্লেট সিডার, পিটিওএস, বেড প্লান্টার, গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্র, শক্তি চালিত ভুট্টা মাড়াই যন্ত্র, শক্তি চালিত শস্য মাড়াই যন্ত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা কৃষকপর্যায়ে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। কৃষিকাজে এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন সময়ের সাশ্রয় হবে অপরদিকে কৃষি উৎপাদন ব্যয়ও হ্রাস পাবে এবং ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।

 

ফসল উৎপাদন ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি
ফসল উৎপাদন ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রযুক্তি বর্তমান সরকারের সময়ে বিএআরআই ফসল, পানি, সার ও মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনা, রোগ ও পোকামাকড় দমন, জীব প্রযুক্তি, হাইড্রোপোনিক, আইপিএমসহ ফসল, মৃত্তিকা, পানি, রোগ ও পোকা মাকড় দমন ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনা বিষয়ক ২১৩টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এসব প্রযুক্তি প্রতিকূল পরিবেশে বিশেষ করে, লবণাক্ত, খরা, জলাবদ্ধতা, পাহাড়ি এলাকা ও চরাঞ্চলে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধিতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখবে।


রোগবালাই প্রতিরোধী জাত
বালাইনাশকের ব্যবহার হ্রাস করে পরিবেশবান্ধব আইপিএম পদ্ধতি উদ্ভাবনের গবেষণার ওপর যথেষ্ঠ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এক্ষেত্রে সবজি ও ফলের বেশ কয়েকটি ফসলের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা
(IPM) প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে- যা মাঠপর্যায়ে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। জিএমও ফসলের ওপর গবেষণা, রোগবালাই প্রতিরোধী এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে পারে এমন জাত উদ্ভাবনে Biotechnology গবেষণার প্রতি অধিকতর মনোযোগ দেয়া হয়েছে। বিএআরআই কর্নেল ইউনির্ভাসিটির সহযোগিতায় এরই মধ্যে বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধী Bt Brinjal এর চারটি ট্রান্সজেনিক জাত (বারি বিটি বেগুন-১, ২, ৩ এবং ৪) উদ্ভাবন করেছে। বেগুনের এসব জাত কৃষক পর্যায়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। তাছাড়া Bt Brinjal এর আরও তিনটি জাতসহ আলুর নাবি ধসা রোগ প্রতিরোধী ৎন মবহব সমৃদ্ধ ট্রান্সজেনিক আলুর জাত উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বারি কর্তৃক উদ্ভাবিত নাবি ধসা রোগ প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবনের ফলে আলু চাষে কৃষকদের মধ্যে আরও উৎসাহ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং উৎপাদন খরচ কমে গেছে। ফলে দেশে রেকর্ড পরিমাণ আলু প্রতি বছর উৎপাদিত হচ্ছে এবং বিদেশে রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। দেশে আলু থেকে স্টার্চ ও জাংকফুড তৈরিসহ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠছে। এ জাতগুলো হচ্ছে- বারি আলু-৪৬, বারি আলু-৫৩ এবং বারি আলু-৬৮। রোগ ও পোকামাকড় সহনশীল জাতগুলো হচ্ছে-বারি মৌরি-১, বারি মৌরি-২, বারি শিম-৮, বারি কামরাঙা শিম-১, বারি ঝিঙা-২, বারি গম-৩০ (মরিচা, ছত্রাক), বারি গম-২৯ (ইউজি ৯৯ প্রতিরোধী), বারি মটর-১, বারি মরিচ-৩, বারি গম-২৭ (ইউজি-৯৯ প্রতিরোধী), বারি হাইব্রিড বেগুন-৪ (উইল্ট প্রতিরোধী), বারি বেগুন-১০ (উইল্ট, পড বোরার), বারি সয়াবিন-৬ (মোজাইক ভাইরাস প্রতিরোধী) বারি রসুন-৩, বারি রসুন-৪ ভাইরাস রোগ সহনশীল।


 জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলা
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবিলায় জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত ফসল উৎপাদন সমস্যা যথা- লবণাক্ততা, উষ্ণতা, খরা, ভূ-গর্ভস্থ পানির সমস্যা ও বন্যা প্রভৃতি বিষয়ভিত্তিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। বিএআরআই ফসলের প্রতিকূল পরিবেশ প্রতিরোধী বেশ কয়েকটি জাত উদ্ভাবন করেছে যার মধ্যে তাপ সহিষ্ণুজাতগুলো হচ্ছেÑ বারি গম-২৬ বারি গম-২৮, বারি গম-২৯, বারি গম-৩০, বারি গম-৩১, বারি গম-৩২, বারি বার্লি-১, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১২, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৩, বারি চীনাবাদাম-৮, বারি চীনাবাদাম-১০, বারি আলু-৭৩, বারি হাইব্রিড টমেটো-৮, বারি বেগুন-১০। খরাপ্রবণ এলাকার জন্য উপযোগী এবং ভালো ফলন দিতে সক্ষম জাতও উদদ্ভাবন করা হয়েছে। লবণাক্ত এলাকার চাষের উপযোগী স্বল্পমেয়াদি উচ্চফলনশীল জাত বারি কর্তৃক উদ্ভাবিত হয়েছে এবং দক্ষিণ অঞ্চলে লবণাক্ত এলাকায় কৃষক পর্যায়ে ভালো ফলন দিচ্ছে এবং জনপ্রিয়ও হচ্ছে। প্রতিকূল পরিবেশ প্রতিরোধী এ জাতগুলো হলো- বারি গম-২৫, বারি বার্লি-৭, বারি সরিষা-১৬, বারি তিল-৪, বারি আলু-৭২, বারি মুগ-৬, বারি ছোলা-৯। এসব জাত জলবায়ুূ পরিবর্তন সংক্রান্ত সমস্যা মোকাবেলায় কার্যকর ভূমিকা রাখছে।


বায়োফর্টিফাইড জাত
পুষ্টিমান খাদ্য এককভাবে ক্ষুধা ও পুষ্টিহীনতা দূর করতে পারে না। শক্তি, প্রোটিন এবং গৌণ পুষ্টি উপাদানগুলো খাদ্য-নিরাপত্তায় বিশেষভাবে প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে বর্তমানে দৈনন্দিন খাদ্য অভ্যাসে বহুমুখীকরণের জন্য অপ্রচলিত ফসলের প্রচলন, ব্রিডিং প্রক্রিয়ায় বায়োফর্টিফাইড জাত (আয়রন, জিংক এবং ভিটামিন-এ) উদ্ভাবন এবং খাদ্য নিরাপদ রাখার জন্য উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশের গরিব মানুষের পুষ্টিহীনতা অনেকাংশে লাঘব করা সম্ভব হবে। বারি কর্তৃক উদ্ভাবিত ক্যারোটিন সমৃদ্ধ বারি মিষ্টিআলু-১০, বারি মিষ্টিআলু-১১, বারি মিষ্টিআলু-১২, জিংক, আয়রন ও সেলিনিয়াম সমৃদ্ধ বারি মসুর-৫, বারি মসুর-৬, বারি মসুর-৭, বারি মসুর-৮, জিংক সমৃদ্ধ বারি গম-৩৩।


ফসল বিন্যাস এর ওপর গবেষণা কার্যক্রম চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের স্বল্পমেয়াদি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন হওয়ায় এটা সম্ভব হচ্ছে।


সামুদ্রিক শৈবাল (Seaweed) গবেষণা  
সামুদ্রিক শৈবাল গবেষণাও উন্নয়ন জোরদারকরণের মাধ্যমে দেশের ব্লু ইকোনমিতে অবদান রাখার লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য বিএআরআই, সরেজমিন গবেষণা বিভাগ এর মাধ্যমে সামুদ্রিক শৈবালের উপর গবেষণা ও উন্নয়ন কাজ কক্সবাজারে শুরু করেছে। মানব খাদ্য হিসেবে ব্যবহার ছাড়াও ডেইরি, ঔষধ, টেক্সটাইল, জমিতে সার, প্রাণিখাদ্য, লবণ ও কাগজ শিল্পে সামুদ্রিক শৈবাল অ্যাগার কিংবা জেল জাতীয় দ্রব্য ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।


টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীগণ চার দশক ধরে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে ফসলের নতুন নতুন উচ্চফলনশীল জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে চলেছে। শুধু প্রযুক্তির উদ্ভাবন হলেই হবে না এগুলো দ্রুত কৃষকদের কাছে হস্তান্তর করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে কৃষি গবেষণার সহিত সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, এনজিও অন্যান্য দেশি-বিদেশি আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যে সম্পর্ক জোরদারকরণ করতে হবে। কৃষিকে বাণিজ্যিকীকরণ, রূপকল্প ২০২১ এবং রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়ন, টেকসই উন্নয়ন  লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, দক্ষিণাঞ্চল উন্নয়ন কর্মসূচি ইত্যাদিতে সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য কৃষি গবেষণাকে আরও শক্তিশালী ও জোরদারকরণ এবং বিজ্ঞানীদের প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষি গবেষণা উদ্ভাবিত জাত ও লাগসই প্রযুক্তিগুলো সরকারি, বেসরকারি এনজিও ও অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে হস্তান্তর করা গেলে দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন, কৃষকের কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়ন করা সম্ভব।

 

ড. মো. আককাছ আলী*

* প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা


Share with :

Facebook Facebook