কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

অভিবাসন রোধ ও গ্রামীণ উন্নয়নে ধানভিত্তিক খামার ব্যবস্থাপনা (কার্তিক ১৪২৪)

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশে শতকরা ৭৫ ভাগ লোক গ্রামে বাস করে। বাংলাদেশের গ্রাম এলাকায় ৫৯.৮৪ ভাগ এবং শহর এলাকায় ১০.৮১ ভাগ লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে জড়িত (বিবিএস-২০১৬)। মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৯.১% এবং কৃষি খাতের মাধ্যমে ৪৮.১% মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। এক সময়ের খোরপোষের কৃষি এখন বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তরিত। এদেশের শিক্ষিত তরুণরা কৃষির চেয়ে অভিবাসনের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। কিন্তু অভিবাসনের ঝুঁকির চেয়ে সমবিনিয়োগে ধানভিত্তিক কৃষিচর্চা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাক্সিক্ষত অবদান রাখতে পারে।


জরিপে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ২৫ বছরে শহরমুখী গ্রামীণ অভিবাসনের হার ক্রমেই বাড়ছে। গ্রাম এবং ছোট্ট মফস্বল শহরগুলো থেকে বড় শহরে লোকজনের অভিবাসনের কারণগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক কারণটাই মুখ্য। অনেকের মতে, শহর এবং গ্রাম এলাকায় আয়ের বৈষম্যই শহরমুখী জনস্রোত বৃদ্ধির একমাত্র কারণ নয়। দারিদ্র্য, বছরজুড়ে কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নানা বিপর্যয়, বন্যা, খরা, নদীভাঙন প্রভৃতির শিকার হয়ে গ্রামের অসহায় বিপর্যস্ত মানুষগুলো অনেকটা নিরুপায় হয়ে শহরমুখী হচ্ছে।


গ্রামে কাজ করার জন্য কৃষি শ্রমিক পাওয়াটা কঠিন ব্যাপার হয়ে গেছে। দুই চোখে নানা রঙিন স্বপ্ন নিয়ে গ্রাম থেকে শহরে পা রাখা নারী-পুরুষগুলো যখন প্রত্যাশা অনুযায়ী নিজেকে দাঁড় করাতে পারেন না তখন শহরে কোনোভাবে মাথা গুঁজে থাকতে আপ্রাণ চেষ্টা শুরু করেন। যেখানে অনেক সময় সুস্থভাবে বসবাসের ন্যূনতম সুযোগ সুবিধা থাকে না। অথচ গ্রামে তাদের ছিল চমৎকার সুন্দর ছিমছাম বসতবাড়ি ও ভরণপোষণের উপযুক্ত কৃষি জমি, বাড়ির পাশের আঙিনায় সবজি, আনাজপাতির চাষ। তাই শহরমুখী গ্রামীণ জনস্রোতকে নিরুৎসাহিত করতে হলে গ্রামেই তাদের কর্মসংস্থানের নানা আকর্ষণীয় সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। বছরজুড়ে যেন কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়, কৃষিভিত্তিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে।


অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অভিবাসন নিরুৎসাহিত করে গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ধানভিত্তিক কৃষির কোনো বিকল্প নেই। বহির্বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদেরও ধান চাষে আধুনিক জাত এবং প্রযুক্তির বিস্তার ও ব্যবহার বাড়াতে পারলে দেশেই বিদেশের তুলনায় বেশি আয় করা সম্ভব। বীজ সরবরাহ, সার-সেচে ভর্তুকিসহ বহুমুখী সরকারি প্রণোদনার কারণে এখন ধান চাষ আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় লাভজনক। দেশের বাজারে এখন একমন ধান বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকায়। বর্তমানে এক কেজি মোটা চালের দাম ৪০-৫০ টাকা। সরু চাল বিক্রি হচ্ছে প্রকারভেদে কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ১০০ টাকায়। ফলে ধান উৎপাদন এখন আর কোনোভাবেই অলাভজনক নয়। আগে যেখানে হেক্টরপ্রতি ধানের গড় উৎপাদন ছিল ২ থেকে ২.৫ টন এখন নতুন নতুন জাত ও প্রযুক্তির কারণে তা ৩.৫ থেকে ৭.০ টনে দাঁড়িয়েছে।


দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে উদ্ভাবন করা হয়েছে উচ্চফলনশীল ধানের একাধিক জাত ও লাভজনক শস্যক্রম। যেমন- স্বল্প জীবনকালের খরা সহনশীল ব্রি ধান৫৬/খরা পরিহারকারী ব্রি ধান৫৭ এবং জিংক সমৃদ্ধ ব্রি ধান৬২ চাষ করে বৃষ্টি নির্ভর বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে বিনা সেচে ছোলা এবং মশুর চাষ করা যায় এমন একটি অধিক লাভজনক শস্যবিন্যাস তৈরি করেছেন ব্রির বিজ্ঞানীরা। এ শস্য বিন্যাস অবলম্বন করে একটি জমির উৎপাদনশীলতা ১৮-৩২ শতাংশ বৃদ্ধি করা সম্ভব (আরএফএস বিভাগ, ব্রি)। ফলে রাজশাহী অঞ্চলের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা তাদের পরিবার-পরিজন ও সন্তানদের বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে প্রবাসে অনিশ্চিত জীবনে ঠেলে না দিয়ে তার অর্ধেক বা চার ভাগের একভাগ ব্যয়ে নিজের সামান্য জমিকে যথাযথ ব্যবহার করে ধানভিত্তিক কৃষি খামার ব্যবস্থা সৃষ্টির মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে পারে।


উত্তরের জেলাগুলোতে যেখানে বৃষ্টিনির্ভর স্বর্ণা জাতের প্রচলন ছিল সেখানে ব্রি উদ্ভাবিত আধুনিক আমন জাতগুলো যেমন- ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭০, ব্রি ধান৭১, ব্রি ধান৭২ জাতগুলো প্রবর্তন করার মাধ্যমে ফলনে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এ জাতগুলোর ফলন জাতভেদে ৪.৫ থেকে ৬.০ টন/ হেক্টর এবং বাজারে চাহিদাও বেশি। তাই পুরনো জাতের পরিবর্তে ব্রি উদ্ভাবিত এসব জাত ও আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তির ব্যবহার ওই অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখছে। এছাড়া অঞ্চলভেদে খরাসহনশীল ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭১, জলমগ্নতা সহনশীল ব্রি ধান৫১ ও ব্রি ধান৫২, লবণাক্ততা সহনশীল ব্রি ধান৪১, ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৫৪ এবং ব্রি ধান৭৩, বন্যাত্তোর বিআর২২, বিআর২৩, ব্রি ধান৪১ এবং জোয়ারের পানি যেখানে জমে যায় সেসব এলাকায় ব্রি ধান৪৪, ব্রি ধান৭৬, ব্রি ধান৭৭ চাষ করে কাক্সিক্ষত উৎপাদন পাওয়া সম্ভব।


উত্তরাঞ্চলের বিশেষ সময়ের খাদ্যাভাব বা মঙ্গা নিরসনে ব্রি ধান৩৩/ব্রি ধান৬২-আগাম আলু-মুগ-ব্রি ধান৪৮ অধিক লাভজনক ধানভিত্তিক চাষাবাদ প্রযুক্তি, যেটি অনুসরণ করে ওই এলাকার কৃষকরা মঙ্গা চিরতরে দূর করতে সক্ষম হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের মানুষের শহরমুখী বা দেশান্তরী হওয়ার যে প্রবণতা পূর্বে ছিল তা হ্রাসে দারুণ কাজে লেগেছে এ চার ফসলি শস্যক্রম। বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে ধান চাষের সুযোগ ও সম্ভাবনার বিষয়টি চোখে পড়ে কিছু পরিসংখ্যানের দিকে দৃষ্টি দিলে। গত দুই দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা  গেছে, ধানের ফলন ও উৎপাদন ক্রমাগত বাড়ছে যা যথাক্রমে বার্ষিক ০.০৭ টন/হেক্টর ও ০.৯ মিলিয়ন টন/বছর।


আবার বোরো মৌসুমে মেগা জাত (সর্বাধিক জনপ্রিয়) হিসেবে খ্যাত ব্রির জনপ্রিয় জাত ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান২৯ এর চেয়েও অনেক ভালো জাত বর্তমানে রয়েছে, যার মধ্যে ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৫৮ ব্রি ধান৬০, ব্রি ধান৬৩, ব্রি ধান৭৪ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ৫ উল্লেখযোগ্য। লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকার জন্য ব্রি ধান৪৭ এর আধুনিক সংস্করণ ব্রি ধান৬৭। আউশে পারিজা, জামাইবাবু ও বিআর২৬ এর পরিবর্তে যথাক্রমে ব্রি ধান৪৮, ব্রি ধান৬৫ এবং নেরিকা মিউটেন্ট প্রবর্তন করে অধিক ফলন পাওয়া সম্ভব।


অধিকন্তু বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এমন কিছু ধান জাত উদ্ভাবন করেছে যেগুলো সুগন্ধি, প্রিমিয়াম কোয়ালিটি, উন্নত পুষ্টি ও ঔষধি গুণসম্পন্ন। এসব ধান জাতের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে বিনিয়োগ করেও লাভজনক খামার ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। যেমন- ব্রি উদ্ভাবিত বিআর৫, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬৩ ও ব্রি ধান৭০, ব্রি ধান৭৫, ব্রি  ধান৮০ প্রিমিয়াম কোয়ালিটি সম্পন্ন জাত। বিআর১৬, ব্রি ধান৪৬ ও ব্রি ধান৬৯ লো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (লো-জিআই) গুণসম্পন্ন জাত, এসব জাতের চালের ভাত ডায়াবেটিক রোগীরা নিরাপদে খেতে পারেন। ব্রি উদ্ভাবিত জিংক সমৃদ্ধ চারটি ধানের জাত ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৬৪, ব্রি ধান৭২ এবং ব্রি ধান৭৪। এসব বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জাতগুলোর ভোক্তা চাহিদা যেমন বেশি, বাজারমূল্যও অধিক। তাই ধানভিত্তিক খামার বিন্যাসে এ জাতগুলো উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ অভিবাসনের অন্যতম বিকল্প হতে পারে। এ খাতে বর্ধিত হারে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগকৃত পুঁজি লাভসহ তুলে আনা সম্ভব।


ব্রি বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত দেশের কৃষকদের ব্যবহার উপযোগী ৩২টি কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন করেছে এবং শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় সরকার ঘোষিত ৬০ শতাংশ ভর্তুকিতে কৃষি যন্ত্রপাতি কৃষক পর্যায়ে বিতরণ করছে। চারা রোপণ, আগাছা নিধন থেকে ধান কাটা ও মাড়াই সব কিছুতেই লেগেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। অভিবাসনের চিন্তা পরিহার করে সরকার ঘোষিত ৬০ শতাংশ ভর্তুকিতে কেনা একটি রাইস টান্সপ্লান্টার বা কম্বাইন হার্ভেস্টার স্ব-কর্মসংস্থানের অন্যতম উপায় হতে পারে। এছাড়া যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে বর্তমানে কৃষকরা লাভবান হতে পারেন সেগুলোর মধ্যে আছে পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, চারা রোপণ যন্ত্র বা ট্রান্সপ্লান্টার, রোটারি টিলার, ধান-গম কাটার যন্ত্র, ধান-গম মাড়াই যন্ত্র, কম্বাইন হারভেস্টার ও আগাছা দমন যন্ত্র বা উইডার ইত্যাদি। কৃষকরা এসব যন্ত্র নিজেরা ব্যবহারের পাশাপাশি ভাড়া দিয়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতেও অন্যদের এসব সেবা প্রদান করে লাভবান হতে পারেন।


উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হলো ভালো বীজ। কথায় বলে ভালো বীজে, ভালো ফলন। ভালো বীজের অভাবে আমাদের কৃষকরা প্রায়শই প্রতারিত হন। এ পর্যন্ত মাত্র ৪৬ ভাগ চাষি মান সম্পন্ন বীজ ব্যবহার করতে পারেন। বাকি ৫৪ ভাগ কৃষক নিজেদের অপেক্ষাকৃত কম মান সম্পন্ন বীজের ওপর নির্ভরশীল। মৌসুমভিত্তিক চিত্র হচ্ছে আমনে শতকরা ২০-২৩ ভাগ, আউশে শতকরা ১৬ ভাগ, এবং বোরোতে ৮০ শতাংশ কৃষক  মান সম্পন্ন বীজ ব্যবহার করে থাকেন। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ব্রি প্রতি বছর ১৫০ টনের অধিক ব্রিডার (প্রজনন) বীজ উৎপাদন এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে। ব্রি থেকে ব্রিডার বীজ, ভিত্তি বীজ ও টিএলএস সংগ্রহপূর্বক সামান্য পুঁজি বীজ ব্যবসায় বিনিয়োগ করে বীজ উৎপাদন ও সরবরাহের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যায় যা অভিবাসনের একটি বিকল্প হতে পারে।


এছাড়াও ধানভিত্তিক বিভিন্ন খাবার প্রস্তুত ও প্রক্রিয়াজাতকরণ (যেমন- চিড়া, মুড়ি, খই, রাইস কেক, চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি পিঠা-পুলি), কম ছাটা বা ঢেঁকি ছাঁটা চাল (অধিক পুষ্টিগুণ সম্পন্ন), বিভিন্ন মৎস্য ও পশু খাদ্য প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে সামান্য পুঁজি বীজ ব্যবসায় বিনিয়োগ করেই আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যায়। অভিবাসন ব্যয়ের সিকিভাগও যদি কৃষক পর্যায়ে উন্নত মান সম্পন্ন বীজ সরবরাহ, সার, সেচ সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, কৃষি যন্ত্রপাতি এবং উন্নত পুষ্টি ও ঔষধি গুণ সম্পন্ন ধান উৎপাদন, ধানের চাল থেকে খাবার প্রস্তুত ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা যায় তাহলে কৃষকের যেমন ঝুঁকিমুক্ত ও টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, তেমনি দেশের জাতীয় উন্নয়নেও তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

 

ড. মো. শাহজাহান কবীর* ড. মো. আনছার আলী** মো. আবদুল মোমিন***
*মহাপরিচালক **পরিচালক (প্রশাসন)  *** ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, ব্রি, গাজীপুর
E-mail-smmomin80@gmail.com


Share with :

Facebook Facebook