কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

বাংলাদেশের অপ্রচলিত ফলের গুরুত্ব ও উন্নয়ন

বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু ফল চাষের জন্য খুবই উপযোগী। এ দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রতিটি বাড়ির আঙিনায়, খেতের আইলে, নদ-নদী, খাল-বিলের পাড়ে পতিত জমিতে সর্বত্রই রয়েছে নানা রকম ফল গাছ। তাছাড়া পরিকল্পিতভাবে এখন মানুষ গড়ে তুলছে নানা রকম ফলের বাগান। এখন আর কেবল শখের বশে নয়, বাণিজ্যিক ভিত্তিতে দেশের নানা স্থানে আবাদ করা হচ্ছে নানা রকম ফলদ বৃক্ষ। এদেশে এ পর্যন্ত প্রায় ১৩০ রকম ফলের সন্ধান পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে আম, কাঁঠাল, লিচু, নারিকেল, পেয়ারা, কুল, লেবু, কলা, আনারস ও পেঁপে আমাদের দেশের প্রধান ও প্রচলিত ফল। এগুলো আমরা সবাই চিনি। দেশের প্রায় সর্বত্রই এসব ফল জন্মে। তাই এসব ফলকে আমরা প্রচলিত ফল বলি। আবার প্রায় ৭০ ধরনের ফল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে থাকে যা অপ্রচলিত ফল নামে  পরিচিত।  অপ্রচলিত মানে এসব ফলের অস্তিত্ব আছে, খুঁজলে পাওয়া যায় কিন্তু যখন তখন দেখা যায় না, দেশের সব এলাকাতে জন্মে না, কোনো কোনো এলাকাতে স্বল্প পরিসরে জন্মে। তবে এদের অনেকে বনে জঙ্গলে অনাদরে ও অবহেলায় বেড়ে ওঠে। এরা অবহেলিত হলেও গুরুত্বহীন নয়। এদের কোনো কোনোটায় ভিটামিন, খনিজ, পুষ্টিমান, ও ঔষধি গুণ অনেক বেশি। রোগব্যাধি আরোগ্যের ক্ষেত্রে এদের জুড়ি নেই। রোগের আরোগ্যের দিক থেকে বলা যায় যে ‘ঋতু ভিত্তিক দেশীয় ফলে, সকল রোগের আরোগ্য মেলে’। এ দেশের অপ্রচলিত ফলের মধ্যে প্রায়শই দেখা যায় যেমনÑ সফেদা, কামরাঙা, লটকন, বিলাতি আমড়া, বাতাবিলেবু, কদবেল, বেল, জলপাই, তাল, কালোজাম, করমচা, কাজুবাদাম, গোলাপজাম, আদা জামির, আঁশফল, দেশি গাব, বিলাতিগাব, আতা, শরিফা, কাউফল, খেজুর, জামরুল, আমলকী, টকলেবু, চালতা, ডুমুর, বৈচি, তেঁতুল, দেশি আমড়া, বকুল, বেতফল, ফলসা, জামরুল, বিলিম্বি, অরবরই, লুকলুকি, তৈকুর, ডেউয়া, সাতকরা, পানি ফল, কাগজিলেবু, মহুয়া, চাপালিশ, ইত্যাদি ফল। নানা কারণে এবং আমাদের অসচেতনতায় কিছু কিছু ফল এদেশ থেকে দিন দিন বিলুপ্তির পথে ধাবিত হচ্ছে। যেমন- বৈচি, লুকলুকি, আদাজামির, কাউফল, চালতা, টাকিটুকি, পানকি চুনকি, তিনকরা, সাতকরা, আঁশফল ইত্যাদি। উপকূলীয় অঞ্চলের একটি গবেষণা পত্রের ফল অনুযায়ী পটুয়াখালী জেলার সাতটি উপজেলায় ৪৫ ধরনের অপ্রচলিত ফলের সন্ধান পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে গড়ে প্রতিটি উপজেলাতে ৩৬ ধরনের অপ্রচলিত ফল পাওয়া গেছে।
 

ফল একটি  অর্থকরী ফসল। অপ্রচলিত ফল আমাদের অনেক কাজে লাগে। যেমন- জ্বালানি কাঠ, নদীভাঙন রোধ, ঘরের আসবাবপত্র, বিল্ডিংয়ের পাইলিং করতে, মাছ ধরার জালের রঙ তৈরিতে, নৌকা তৈরিতে, উন্নত জাত উন্নয়নে রুটস্টক হিসেবে, ফলদ বৃক্ষের ব্যবহার আছে। পুষ্টি নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন, পরিবেশের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে অপ্রচলিত ফলের অনেক অবদান আছে।
 

ফল ভেষজ বা ঔষধিগুণে সমৃদ্ধ। নিয়মিত ফল খেলে  রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং সুস্থ সবল জীবন যাপন করা যায়। বাংলাদেশের শতকরা প্রায় ৮৮ ভাগ মানুষ ভিটামিন এ, ৯০ ভাগ মানুষ ভিটামিন সি এবং ৯৯ ভাগ মানুষ ক্যালসিয়ামের অভাবে ভোগে। আমাদের এ পুষ্টি ঘাটতি পূরণে ফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ফল আমাদের শরীরে ভিটামিন, আঁশ ও খনিজ উপাদান সরবরাহ করে। ফল কম খাবারের জন্য বাংলাদেশে ভিটামিন, আঁশ ও খনিজ উপাদান অভাবজনিত অপুষ্টি যেমন- রাতকানা, অন্ধত্ব, রক্তস্বল্পতা, গলগ-, স্কার্ভি ও বেরিবেরি এর হার পৃথিবীর অন্যান্য স্থানের চেয়ে বেশি। এসব পুষ্টি উপাদান রোগ প্রতিরোধ ছাড়াও খাদ্য দ্রব্য হজম, পরিপাক, বিপাক, খাবারে রুচি বৃদ্ধি, বদহজম কোষ্টকাঠিন্য দূর করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। ফলে প্রায় সব ধরনের পুষ্টি বিদ্যমান। ফলকে রোগ প্রতিরোধক খাদ্য বলা হয়। শরীরের রোগ প্রতিরোধের জন্য আমরা ফলকে খাদ্য হিসেবে গুরুত্ব দেই না। পুষ্টিবিদরা একজন প্রাপ্ত বয়ষ্ক লোকের দৈনিক ১১৫ গ্রাম ফল খাওয়ার সুপারিশ করেছেন। কিন্তু বর্তমানে আমরা গড়ে ৭৭ গ্রাম ফল গ্রহণ করে থাকি। যা আমাদের শরীরের চাহিদার তুলনায় অনেক কম।
 

ভিটামিন সি এর প্রধান উৎস ফল। অপ্রচলিত দেশীয় ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে। ভিটামিন সি শরীরকে মজবুত, ত্বককে মসৃণ, সর্দি কাশি থেকে রক্ষা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। পুষ্টিবিদরা একজন বয়স্ক লোকের দৈনিক ৩০ মি.গ্রাম ও শিশুদের ২০ মি. গ্রাম ভিটামিন সি গ্রহণ করার সুপারিশ করেছেন। অপ্রচলিত ফল রান্না না করে কাঁচা বা পাকা অবস্থায় খেলে পুরো ভিটামিন সি আমাদের শরীরে কাজে লাগে। শরীরের চাহিদা মতো প্রতিদিন ফল গ্রহণ করলে চোখ, দাঁত, মাড়ি, হাড়, রক্ত, ত্বকসহ শরীরের প্রতিটি অঙ্গে পুষ্টি জোগাতে সাহায্য করে এবং সুস্থ সবল দেহ নিয় দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। প্রায় সব অপ্রচলিত ফলে কম বেশি খনিজ উপাদান বিদ্যমান। যেমন- কাউ ফলে ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, আয়রন, সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ও ফসফরাস, খেজুরে ক্যালসিয়াম, আয়রন, কপার, ম্যাগনেসিয়াম ও সালফার, আমড়াতে ক্যালসিয়াম ও আয়রন, তালে ক্যালসিয়াম, আয়রন, পটাসিয়াম পাওয়া যায়। অপ্রচলিত ফলে প্রচুর পরিমাণে জলীয় অংশ থাকে। এ জলীয় অংশ পানির সমতা রক্ষা, খাদ্য দ্রব্য হজম, পরিপাক ও দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সচল রাখতে সাহায্য করে। জাম্বুরাতে ৯০ গ্রামেরও বেশি জলীয় অংশ থাকে। জামরুল, জলপাই ও কামরাঙাতে ৮০ গ্রাম থেকে ৯০ গ্রাম জলীয় অংশ থাকে। এছাড়া বেল ও পাকা তালে ৭০ ভাগের কাছাকাছি জলীয় অংশ থাকে। ফলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আঁশ থাকে। কালোজাম, বেল ও আতা ফলের প্রতি ১০০ গ্রাম এর মধ্যে ২ গ্রামের বেশি আঁশ থাকে। আমড়া ও জামরুলে ১ গ্রাম থেকে ২ গ্রাম এবং অন্যান্য ফলে ১ গ্রামের কম আঁশ থাকে। আমাদের মোট খাদ্যের শতকরা ১ ভাগ আঁশ থাকা উচিত। ফলে ক্যালোরির পরিমাণ কম থাকে। প্রতি ১০০ গ্রাম অপ্রচলিত ফলের মধ্যে পাকা তাল, কামরাঙা, বেল ও আতা ফলে ৫০ থেকে ১০০ ক্যালরি শক্তি থাকে। অন্যান্য অনেক ফলে ৫০ ক্যালরির কম খাদ্য শক্তি থাকে। ফলে ক্যালরি কম থাকায় স্থূলাকায়ত্ব, ডায়াবেটিস ও মেদ বহুল লোকরা অনায়াসে ফল খেতে পারে। অপ্রচলিত দেশীয় হলুদ রঙের ফলে প্রচুর পরিমাণে ক্যারোটিন (প্রাক ভিটামিন এ) থাকে। প্রাপ্ত বয়স্ক একজন লোকের দৈনিক ৭৫০ মাইক্রো গ্রাম ও শিশুদের ২৫০ থেকে ৩০০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন-এ এর প্রয়োজন। ফলে অল্প পরিমাণে ক্যালসিয়াম থাকে, যার পরিমাণ প্রতি ১০০ গ্রামে ১০ থেকে ৫০ গ্রাম। এছাড়া ফলে ভিটামিন বি২ থাকে।
 

বাংলাদেশে অপ্রচলিত ফলের বংশগতি বিভিন্নতা ও ফল জীববৈচিত্র্য বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলের জীববৈচিত্র্য যত বেশি থাকবে বংশগতির বিভিন্নতাও তত বেশি হবে। যেমন- আমাদের দেশের আমলকী, জলপাই ও তেঁতুলের স্বাদ এখনও টক। বর্তমানে গবেষকরা অপ্রচলিত ফলের উন্নয়ন ঘটিয়ে মিষ্টি আমলকী, চালতা, কামরাঙা, জলপাই, ও তেঁতুলের উন্নত জাত তৈরিতে সক্ষম হয়েছেন। অপ্রচলিত ফলের উন্নয়ন কে প্রাধান্য দিয়ে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের পরিচালনায় ২০১১ সালে হেকেপ (উচ্চ শিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্প) এর আর্থিক সহযোগিতায় প্লান্ট বায়োটেক ল্যাব এবং ফলদ বৃক্ষের জার্মপ্লাজম সেন্টার গড়ে উঠেছে। জার্মপ্লাজম সেন্টারের আয়তন ৪ একরের বেশি। পবিপ্রবি জার্মপ্লাজম সেন্টারটি দক্ষিণ অঞ্চলের একমাত্র বৃহৎ ফলদ বৃক্ষের সংরক্ষণ, গবেষণা ও উন্নয়নের প্রতিষ্ঠান। এ সেন্টারটিতে রয়েছে ৬০ প্রজাতির ৬৪৬টির বেশি দেশি-বিদেশি ফলের মাতৃগাছ। এতে স্থান পেয়েছে প্রচলিত ফলদ বৃক্ষ, অপ্রচলিত ফলদ বৃক্ষ, বিলুপ্ত প্রায় অপ্রচলিত ফলদ বৃক্ষ এবং ফলদ ঔষধি গাছ। দেশীয় অপ্রচলিত ফলের গবেষণার ওপর এ পর্যন্ত ৮ জন ছাত্রছাত্রী এমএস ডিগ্রি অর্জন করেছেন। দেশীয় অপ্রচলিত ফলের ওপর পিএইচডি গবেষক মি. চিত্তরঞ্জন সরকার এর ৩টি গবেষণা প্রবন্ধ বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত এ সেন্টার থেকে তরুণ মেধাবী ও বুদ্ধিদীপ্ত গবেষকদের নিরলস গবেষণার চেষ্টায় মোট ৮টি অপ্রচলিত ফলের জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। যেমন- পিএসটিইউ বিলাতিগাব-১ (বীজবিহীন), পিএসটিইউ বিলাতিগাব-২ (বীজবিহীন), পিএসটিইউ ডেউয়া-১ (মিষ্টি), পিএসটিইউ ডেউয়া-২(মিষ্টি), পিএসটিইউ বাতাবিলেবু-১ (মিষ্টি), পিএসটিইউ কামরাঙা-১ (মিষ্টি), পিএসটিইউ কামরাঙা-২ (মিষ্টি) ও পিএসটিইউ তেঁতুল-১ (মিষ্টি)। ভবিষ্যতে পবিপ্রবি এর জার্মপ্লাাজম সেন্টার দেশে ফল গবেষণায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কৃষকের সংরক্ষিত ফলের বৈচিত্র্যপূর্ণ অপ্রচলিত ফলের জাতগুলো (ল্যান্ড রেস) জার্মপ্লাজম সেন্টারে সংরক্ষণ করে মূল্যায়ন, বৈশিষ্ট্যায়ন ও উন্নয়ন ঘটিয়ে কাক্সিক্ষত গুণাগুণ সম্পন্ন নতুন জাত হিসেবে অবমুক্ত করা এবং সেসব জাতকে স্বীকৃতি ও সুরক্ষা করা প্রয়োজন। আশা করা যাচ্ছে, অপ্রচলিত ফলের মধ্যে থেকে কিছুকিছু নতুন জাত নির্বাচিত করা যাবে যে গুলো প্রচলিত চাষের আওতায় আসবে এমনকি বাণিজ্যিকভাবে চাষের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

 

প্রফেসর ড. মাহবুব রব্বানী*
*উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

 


Share with :

Facebook Facebook