কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

বহুস্তরী মিশ্র ফল বাগান

বহুতল বিশিষ্ট শস্য বিন্যাসকে বহুস্তর শস্য বিন্যাস অথবা বহুধাপ বিশিষ্ট শস্য বিন্যাসও বলা হয়ে থাকে। এটি এক ধরনের আন্তঃফসল চাষ পদ্ধতি (Multi Storied Fruit Garden)। একই জমিতে একই সময়ে বিভিন্ন উচ্চতার বিভিন্ন ফল চাষ করাকেই বলে বহুস্তর বিশিষ্ট শস্য বিন্যাস।  ফল বাগানের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি ব্যবহার হয়ে থাকে, যেখানে অতি ঘন চাষ পদ্ধতির ব্যবহার করে সূর্যের আলোর সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়। বিভিন্ন উচ্চতার, বয়সের এবং গাছের শিকড়ের গঠনসহ অন্য সব বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে এ চাষ পদ্ধতির সমন্বয় ঘটানো হয়। ভূমির উল্লম্ব (ভার্টিকাল) ব্যবহার সর্বোত্তমভাবে নিশ্চিত করাই হলো এ ধরনের চাষ পদ্ধতির অন্যতম উদ্দেশ্য। এ পদ্ধতিতে সবচেয়ে লম্বা আকার (Canopy) গাছের  বৈশিষ্ট্য হলো অতি সূর্যালোক ও বাষ্পীয় ভবনের চাহিদা এবং সবচেয়ে খাটো আকার গাছের চাহিদা হলো ছায়া এবং অতি আর্দ্রতার। সাধাণত লম্বা গাছ প্রখর সূর্যালোক পছন্দ করে বিধায় উপরের স্তরে থাকে এবং খাটো আকারের গাছ ছায়া পছন্দ করে সেগুলো নিচের স্তরে থাকবে।
 

সুবিধা : বহুস্তর বিশিষ্ট ফল বাগানে বিভিন্ন  বিন্যাসের মাধ্যমে যেসব সুবিধা পাওয়া যায় তা নিম্ন
এ ধরনের চাষ পদ্ধতির ব্যবহারের মাধ্যমে একক জমিতে অধিক আয় পাওয়া যায়। একই জমি থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ফসল আহরণ করা যায়।  
চাষে ফলন ঝুঁকি কমায় এবং সারা বছর নিয়মিতভাবে ফলের সরবরাহ পাওয়া যায়।
কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করে।
বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমন- অতি বৃষ্টি, ভূমিক্ষয় বা ভূমিধসের প্রভাব কমাতে সাহায্য করে।
ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয়।
মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি করে।
একই জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফল চাষ করার ফলে একক জমিতে ফলন বাড়ে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় থাকে।

 

বহুস্তর বিশিষ্ট চাষ পদ্ধতির কিছু উদাহরণ
নারিকেল-পেয়ারা-আনারস#নারিকেল-পেঁপে-আনারস # নারিকেল-জলপাই-আনারস # নারিকেল-কাঁঠাল-কফি-পেঁপে-আনারস # নারিকেল-কলা-কচু # নারিকেল-আম-পেঁপে-ঢেঁড়স-মুলা-লালশাক/ডাঁটাশাক # নারিকেল-গোল মরিচ-আম-মাল্টা-পেঁপে-ঢেঁড়স-মুলা-লালশাক/ডাঁটাশাক #নারিকেল/সুপারি-চুই-মাল্টা/লেবু-আদা/হলুদ

 

বহুস্তর বিশিষ্ট ফল বাগানের নিচে ছায়া সহনশীল ফসলের নাম
আনারস; মরিচ; হলুদ; আদা; মিষ্টিআলু; কুল; মসলা চাষ; বকফুল; জগডুমুর;  ডেওয়া;  লেবু; আতা ফল;     শরিফা; গাব-বিলাতি গাব; জামরুল; বেল; কদবেল; কামরাঙা; সফেদা; জাম্বুরা; লুকলুকি; কাউ ফল ; বেদেনা; তেঁতুল ইত্যাদি    

 

বহুস্তর বিশিষ্ট মিশ্র ফল বাগানের বিবেচ্য বিষয়গুলো
১. বহুবর্ষজীবী ফল গাছ নির্বাচন : বহুবর্ষজীবী ফল গাছ নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনায় আনা প্রয়োজন : ক. সূর্যালোক পছন্দ করে; খ. স্থানীয় আবহাওয়া উপযোগী; গ. দ্রুতবর্ধনশীল; ঘ. বহুবিধ ব্যবহার; ঙ. হালকা ছায়া প্রদান; বহুবর্ষজীবী ফল গাছ, যেমন- নারিকেল, আম, কাঁঠাল, মাল্টা, জাবাটিকাবা, লিচু, পারসিমন ইত্যাদি
২. বর্ষজীবী ফল নির্বাচন : নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো বিবেচনায় এনে এক বর্ষজীবী ফল গাছ নির্বাচন করা প্রয়োজন
ক. দ্রুতবর্ধনশীল; খ. আংশিক ছায়া পছন্দকারী; গ. খাটো জাত; ঘ. অধিক ফলন; ঙ. সহজে ফল আহরণ করা যায়; বর্ষজীবী ফল গাছ : যেমন- আনারস, কলা, পেঁপে।
৩. মৌসুমি ফসল নির্বাচন : মৌসুমি ফসল নির্বাচনে বিবেচ্য বিষয়গুলো
ক. ভালো জাত;
খ. কভার ক্রপ হিসেবে কাজ করবে;  
গ. অঞ্চলভেদে মৌসুম অনুযায়ী উপযোগী ফসল নির্বাচন;
ঙ. দ্রুতবর্ধনশীল ও অধিক ফলন নিশ্চিত করবে; যেমন- চেরি টমেটো বিভিন্ন প্রকার শাকসবজি ও মসলা।
৪. অতিরিক্ত ফল গাছ অপসারণ : রোপণকৃত বাগানে গাছের বৃদ্ধির প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। বাগানে গাছ বেশি ঘন থাকলে গাছের বাড়-বাড়ন্ত কমে যাবে। রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বেশি হয় এবং ফলন কমে যায়। তাই বাগানের সারিতে অতিরিক্ত গাছ অপসারণ করা প্রয়োজন। তবে খেয়াল রাখতে হবে অপসারণের সময় অন্য গাছ যেন আঘাতপ্রাপ্ত না হয়।
৫. আন্তঃপরিচর্যা : সময়মতো  ডাল ছাঁটাই, আগাছা পরিষ্কার, সার ও বালাইনাশক প্রয়োগ এবং সেচ ও পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা থাকা বাঞ্ছনীয়।

 

বহুস্তর বিশিষ্ট মিশ্র ফল বাগানের অন্তরায় : খরা;  অর্থের অভাব;  কারিগরি জ্ঞানের অভাব;  সময়মতো উপকরণ না পাওয়া; রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ; সেচের অভাব; শ্রমিক স্বল্পতা।
মানবদেহের পুষ্টির চাহিদা পূরণে ফলের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের মাথাপিছু দৈনিক ফলের চাহিদা ২০০ গ্রাম এবং এ চাহিদা পূরণে বহুস্তরী ফল বাগান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কাক্সিক্ষত পুষ্টির উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। অল্প জমি থেকে অধিক ফলন প্রাপ্তির জন্য বহুস্তরী ফল বাগানের বিকল্প নেই। বাংলাদেশের অধিকাংশ গ্রামীণ লোকজন তাদের ফল উৎপাদন এবং কাজ করার জন্য বসতবাড়ির আশপাশের জায়গাগুলোকে বেছে নেয়। বাংলাদেশের জনসংখ্যার খাদ্য পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য এ দেশের বসতবাড়িতে বহুস্তরী মিশ্র ফল বাগান গড়ে তুলতে পারলে পুষ্টি উন্নয়নের পাশাপাশি অধিক আয়ের পথ তৈরি হবে এবং সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হবে।

 

ড. মো. মেহেদী মাসুদ*
*প্রকল্প পরিচালক, বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প, ডিএই, খামারবাড়ি, ঢাকা


Share with :

Facebook Facebook