কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

ফলসমৃদ্ধ দেশ গড়তে করণীয়

বাংলাদেশ একটি আর্দ্র ও উষ্ণমণ্ডলীয় দেশ হওয়ায় এখানে শতাধিক প্রজাতির ফল জন্মে। আম, কাঁঠাল, কলা, পেঁপে, আনারস, লিচু, পেয়ারা, কুল, লেবু, নারিকেল, তরমুজ প্রধান ফল। এছাড়া সফেদা, খেজুর, তাল, কমলা, জাম্বুরা, লটকন, চালতা, আমলকী, বিলাতি গাব, লুকলুকি, আমড়া, বেল অপ্রধান ফলও জন্মে। অর্থনৈতিক দিক, কর্মসংস্থান ও পুষ্টি বিবেচনায় এসব ফল চাষের গুরুত্ব অপরিসীম। ফল চাষ ও পুষ্টি সম্পর্কে দিন দিন জনসচেতনতা বাড়ছে। এখনও মোট উৎপাদিত ফলের প্রায় ৫৩ শতাংশ ফল বাণিজ্যিক বাগান থেকে উৎপাদিত হয়, বাকি ৪৭ শতাংশ ফলের জোগান আসে বসতবাড়ি ও তৎসংলগ্ন জমি থেকে। কাজেই ফলসমৃদ্ধ দেশ গড়তে দুই জায়গাতেই ফল চাষে জোর দিতে হবে। পাশাপাশি মানসম্মত ফলের উৎপাদনের জন্য বাণিজ্যিক বাগানের পরিমাণ বাড়াতে হবে। বিগত ৫ বছরে আমের বাণিজ্যিক বাগান ও উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। নিরাপদ ফল উৎপাদনে এখনও বসতবাড়িতে ফল চাষ পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কিন্তু বছরের সব মাসে সেসব বাগান থেকে ফল পাওয়া যায় না। বছরব্যাপী ফলপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে বসতবাড়ির পারিবারিক ফলবাগানে পরিকল্পিতভাবে ফলগাছ রোপণের কর্মসূচি নেয়া দরকার।
 

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে নতুন ঘর বাড়ি তৈরির প্রয়োজনে এ পারিবারিক ফল বাগানের সংখ্যা যেমন কমে যাচ্ছে, তেমনি গ্রামীণ বনভূমি উজাড় হওয়ার ফলে স্বল্প প্রচলিত ফলের অনেক প্রজাতিও বিলুপ্ত হচ্ছে। তাই এসব প্রজাতির সংরক্ষণ ও দেশীয় ফল গ্রহণের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়নে বসতবাড়ির বাগান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমান সরকার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের সাথে সাথে পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কৃষিকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করে কৃষির উপকরণ খাতে ভর্তুকি প্রদান, কৃষি ঋণ বিতরণ ও নানামুখী উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে দেশের মোট উৎপাদন বাড়াতে সচেষ্ট রয়েছে। দেশের মানুষের মধ্যে পুষ্টি সচেতনতা বৃদ্ধি ও  সুষম খাবার গ্রহণের মাধ্যমে কর্মক্ষম জাতি তৈরি করার জন্য ফল সমৃদ্ধ দেশ গড়তে সরকারের লক্ষ্য অর্জনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কাজ করে যাচ্ছে।
 

ফল উৎপাদনের বর্তমান অবস্থা
বাংলাদেশের মোট ফল উৎপাদনের শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ ফল বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ (মে-আগস্ট)  এ চার মাসে উৎপাদিত হয় এবং এদের  মধ্যে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারাই  প্রধান। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসে উৎপাদিত হয় মোট ফলের ১৯% যার মধ্যে কুল, বেল, কলা, সফেদা অন্যতম। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে উৎপাদিত হয় ২১% যার মধ্যে আমড়া, কামরাঙা, কদবেল, চালতা অন্যতম। তবে কলা, পেঁপে, আনারস, কিছু কিছু জাতের পেয়ারা (বারি পেয়ারা-২, থাই পেয়ারা), নারিকেল সারা বছর উৎপন্ন হয়। নতুন ফলের মধ্যে মাল্টা, ড্রাগন ফ্রুট, স্ট্রবেরি ও বিভিন্ন জাতের কুল অন্যতম। সারা বছরে ফল প্রাপ্তি নিশ্চিত বা প্রধান মৌসুম ছাড়া অন্যান্য মৌসুমেও উৎপাদন বাড়ানো দরকার।

 

বর্তমানে বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে বেশি চাষ হচ্ছে আম। তথ্য অনুযায়ী ১,৬৭,৭৬০ হেক্টর জমিতে প্রায় ২০,২৩,৯০২ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়েছে। প্রদর্শনী আকারে বাণিজ্যিক ফল বাগান স্থাপন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করার কারণে কৃষক উৎসাহিত হয়ে নতুন নতুন বাগান সৃষ্টি করছে, ফলে আম শুধু উত্তরাঞ্চল নয় পাহাড়ি এলাকা থেকে শুরু করে লবণাক্ত অঞ্চল সাতক্ষীরা, অনাবাদি সিলেটসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে আমের প্রাপ্তিকে দীর্ঘতর করার জন্য বাণিজ্যিক বাগান করার সময় আগাম, মধ্যম ও নাবি জাতের বিষয়গুলো বিবেচনা করা হচ্ছে। যেমন আমের ক্ষেত্রে গৌড়মতি, বারি আম-৪ এর মতো নাবি জাতগুলো আগস্ট-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আম প্রাপ্তির সময়কে দীর্ঘায়িত করেছে। আগাম জাতের মধ্যে নীলউদ্দিন, গোলাপবাস, গোলাপখাস, রাজবৈশাখী, বৈশাখী, গোবিন্দ ভোগ আম চাষিদের আগাম ভালো বাজারমূল্য দিচ্ছে। হাঁড়িভাঙ্গা, ব্যানানা ম্যাংগো, সূর্যপুরী, তোতাপুরী উন্নত জাত বাগান সৃষ্টিতে উৎসাহিত করছে। পরিকল্পনা করে আমের সঠিক জাত নির্বাচন করে আমবাগান করলে বছরে ৭ মাস ধরে আম পাওয়া সম্ভব। আ¤্রপালি, হাঁড়িভাঙ্গা, গৌড়মতি, বারি আম-৪, বারি আম-১০ ফল বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে, স্বল্প পরিসরে আম রপ্তানি হচ্ছে। আমের ব্যাগিং, ফেরোমেন ফাঁদ ব্যবহার, হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট, উত্তম কৃষি ব্যবস্থাপনা বা সু-কৃষি (এঅচ) প্রযুক্তি দেশে আমের উৎপাদন আরও বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে এবং এ কার্যক্রমের আওতায় আম রপ্তানি কার্যক্রম জোরদার করা, আমভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা, বিভিন্ন দেশের উপযোগী কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ড প্রণয়নসহ সব বাগানে উত্তম কৃষি ব্যবস্থাপনার প্রয়োগ করা ডিএই’র পরিকল্পনায় রয়েছে।
 

জাতীয় ফল কাঁঠালের উৎপাদন এলাকা বৃদ্ধি না পেলেও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এর মোট উৎপাদন ১৬,৯৪,৯০২ মেট্রিক টন। ‘ভিটামিন-এ’ সমৃদ্ধ এ ফলটির ছোট আকারের ফলসমৃদ্ধ গাছের সম্প্রসারণ, আগাম, নাবি  ও বারোমাসি জাতের কাঁঠালের কলম উৎপাদন প্রযুক্তি এবং রোগবালাই পোকামাকড় দমনে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। লিচু এখন দিনাজপুর ছাড়িয়ে পাবনা,  নাটোর, মেহেরপুর এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২৭,২৩৫ হেক্টর জমিতে ১,৮০,৮৬২ মেট্রিক টন লিচু উৎপাদিত হয়েছে। লিচুর উন্নত জাতের মধ্যে বেদানা, বোম্বাই, চায়না-২, চায়না-৩, বারি লিচু-৩, বারি লিচু-৪  বাণিজ্যিক বাগানগুলোতে ব্যাপক চাষ হচ্ছে।
 

বরিশাল ছাড়াও নাটোর, নওগাঁসহ সারা দেশে ৩১৪৪০ হেক্টর জমিতে ৪১৩৪৪৩ মেট্রিক টন পেয়ারা উৎপাদিত হয়েছে। পেয়ারার বর্ষাকালীন জাত ও বারোমাসি জাতের সম্প্রসারণ সারা বছর পেয়ারা প্রাপ্তি নিশ্চিত করেছে। বারি মাল্টা-১, বাউ কুল, আপেল কুল, স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফ্রুট ফল বাংলাদেশে ফল চাষে নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। প্রকল্পের মাধ্যমে বৃহত্তর সিলেট, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও পঞ্চগড়সহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় সর্বত্রই মাল্টার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। অক্টোবর-নভেম্বর মাসে মাল্টার ফল সংগ্রহ করা যায়। যে সময়ে বাংলাদেশে ফলের স্বল্পতা থাকে সে সময়ে ফল প্রাপ্তির নিশ্চয়তার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
 

ফল চাষ সম্প্রসারণে ডিএই’র উদ্যোগগুলো
০১. উন্নত মানের চারা কলম উৎপাদন ও বিতরণ
হর্টিকালচার সেন্টারের মাধ্যমে ফলের চারা কলম উৎপাদন ও মাতৃবাগান সৃজন করে দেশি, বিদেশি, প্রচলিত অপ্রচলিত ফলের জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ এবং ফল চাষিদের কাছে উন্নত মানের চারা কলম বিতরণ করে ফল চাষ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে উদ্ভাবিত ফলের উন্নত ও আধুনিক জাতগুলো, স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত বিশেষ জাতগুলো, বিদেশি নতুন ফল ও নতুন জাতগুলোর চারা কলম উৎপাদন করে ফল চাষিদের কাছে বিতরণ করা হচ্ছে ও নতুন নতুন ফল বাগান স্থাপনে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে।

 

হর্টিকালচার সেন্টারগুলোতে দেশ বিদেশে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে উদ্ভাবিত নব প্রযুক্তি ও ফলের জাত যেগুলো এদেশের উপযোগী সেসব প্রযুক্তি, ফল অথবা জাতসহ দেশের ভেতরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিশেষ গুণসম্পন্ন অনন্য বৈশিষ্ট্যের ফল গাছের বীজ-চারা-কলম অথবা অঙ্গবিশেষ সংগ্রহ করে সেগুলোর মাতৃবাগান অথবা জার্মপ্লাজম সেন্টার সৃজন করে সেখান থেকে বীজ-চারা-কলম তৈরি করে চাহিদা মাফিক কৃষক, নার্সারি ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানকে সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে এর পাশাপাশি দেশীয় বিলুপ্ত প্রায় ফলের অনেক প্রজাতির জার্মপ্লাজম এসব সেন্টারে রয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশের আবহাওয়ায় চাষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন বিদেশি ফল যেমন রাম্বুটান, জাবাটিকাবা, সৌদি খেজুর, আলুবোখারা, আঁশফল ও অ্যাভোকাডো নতুন নতুন ফলের মার্তৃবাগান সৃজন করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে চারা কলম উৎপাদন করে সারা দেশে এসব ফল সম্প্রসারণের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
০২. ফল মেলা, ফলদবৃক্ষ মেলা ও বৃক্ষরোপণ পক্ষ
প্রতি বছর দেশের মানুষকে ফলের উৎপাদন ও নিয়মিত ফল খাওয়ায় উৎসাহিত করার জন্য জাতীয় পর্যায়ে ফল মেলার এবং প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় ফলদবৃক্ষ মেলা আয়োজন করা হয়। এতে সারা দেশ থেকে প্রদর্শনযোগ্য নানা রকমের ফল ও ফলের জাতগুলো সংগ্রহ করে মেলায় প্রদর্শন করা হয় এবং উৎপাদন প্রযুক্তি সম্পর্কে কৃষক, উদ্যান নার্সারি মালিক, উদ্যোক্তা, ছাদে ও বসতবাড়ির আঙিনায় বাগান করতে আগ্রহী জনসাধারণকে অবগত ও উৎসাহিত করা হয়। একই সাথে দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ পক্ষ উদযাপন করা হয়ে থাকে এবং ফলদ ও ঔষধি বৃক্ষরোপণের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে তা বাস্তবায়ন করা হয়। ফলদ ও ঔষধি বৃক্ষরোপণে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতি বছর সম্প্রসারণ কর্মী, কৃষক, নার্সারির মালিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বাড়ির ছাদে বাগান সৃজনকারীদের জাতীয় পর্যায় থেকে  পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয়। এতে ফল চাষে কৃষকের মাঝে উৎসাহ বাড়ে।
০৩. বাণিজ্যিক ফল বাগান প্রতিষ্ঠা
সমন্বিত মানসম্পন্ন উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্প, ইনট্রিগ্রেটেড হর্টিকালচার অ্যান্ড নিউট্রিশন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট, কমলা উন্নয়ন প্রকল্প, বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প, সাইট্রাস ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট, এসসিডিপি প্রজেক্টের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় অনেক ফলের বাণিজ্যিক বাগান স্থাপন করা হয়েছে, যা দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে সারা দেশে ব্যাপক ফল বাগান সৃষ্টি হচ্ছে।
০৪. নতুন ফলের জাত সম্প্রসারণ
অমৌসুমে ফল প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য নতুন  ফল ও বিভিন্ন ফলের নতুন জাত সম্প্রসারণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। এখন দেশীয় বাউকুল, আপেলকুল, বিভিন্ন জাতের আনারস, রঙিন জামরুল ছাড়াও বিদেশি ও উচ্চ মূল্যের ফলের মধ্যে ড্রাগন ফ্রুট ও স্ট্রবেরি দেশের বিভিন্ন বাগানে উৎপাদন হচ্ছে। এরই মধ্যে অ্যাভোকাডো, ম্যাঙ্গোস্টিন, কিউই, লংগান, রাম্বুটান, জাবাটিকাবা, সৌদি খেজুর, আলুবোখারা, আঁশ ফল ও পিচফল প্রবর্তন করা হয়েছে। ড্রাগন ফ্রুট চাষে বাণিজ্যিক সফলতা এসেছে।
০৫. খাটো জাতের নারিকেল সম্প্রসারণ
বাংলাদেশের প্রচলিত নারিকেল জাতগুলো লম্বা হওয়ায় তা প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহনশীল নয়, উপরন্তু এ গাছ অধিক ফলনশীল নয় এবং এর থেকে ফল সংগ্রহ করা কষ্টকর। ভারত থেকে ডিজে সম্পূর্ণা নামের ১০ হাজার হাইব্রিড নারিকেল চারা ও ভিয়েতনাম থেকে সিয়াম গ্রিন ও সিয়াম ব্লু নামের ২ লাখ ১০ হাজার  খাটো জাতের নারিকেল চারা আমদানি করা হয়েছে যা উপকূলীয় এলাকাসহ অন্যান্য অঞ্চলে রোপণ করা  হয়েছে।
০৬. পাহাড়ে ফল বাগান
আমাদের পাহাড়ি এলাকায় চাষ পদ্ধতি ছিল জুম নির্ভর। বর্তমানে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার পাহাড়গুলোতে ফল চাষ একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য রেখে চলেছে তেমনি ফলভিত্তিক অর্থনীতি পাহাড়ি জনগণের জীবন যাত্রায়ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। ডিএই পাহাড়ে বাগান সৃজনের জন্য ভর্তুকি মূল্যে চারা কলম বিতরণ করে আম, লিচু, কলা, পেঁপে, আনারস ও মাল্টার বাগান সৃজনে চাষিদের উৎসাহিত করছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আম্রপালি ও রাঙ্গুয়াই জাতের আম, লিচু, মাল্টা ও খাটো জাতের নারিকেল চাষের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটছে।
০৭. বসতবাড়িতে ফল গাছ রোপণ
দেশে ১ কোটি ৯৪ লাখ বসতবাড়ির আওতাধীন প্রায় ৪.৫ লাখ হেক্টর জমি রয়েছে। আমাদের দেশে উৎপাদিত মোট ফলের একটা বড় অংশ বসতবাড়ি থেকে আসে এবং পারিবারিক পুষ্টি ও বাড়তি আয় এ বাগান থেকেই অর্জন করা সম্ভব। সারা বছর যাতে বসতবাড়ির আঙিনায় লাগানো ফলগাছ থেকে নিরাপদ ফল পাওয়া যায় ও পারিবারিক পুষ্টি উন্নয়ন করা যায় সেজন্য ব্যাপকভাবে কৃষক-কিষাণীদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও চারা কলম দেয়া হচ্ছে। প্রকল্পের মাধ্যমে সারা দেশের ৬১টি জেলার ২,৮১,০০টি বসতবাড়িতে এরই মধ্যে ৫ লক্ষাধিক ফলের চারা কলম রোপণ করা হয়েছে।
০৮. ছাদে ফলবাগান
শহর এলাকায় বাড়ির ছাদে বর্তমানে অনেকে আগ্রহী হয়ে ড্রাম বা টবে গাছ লাগিয়ে ফল বাগান করছেন। এতে নিজ হাতে করা ফল খাওয়া, পরিবেশ ঠাণ্ডা রাখা ও বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ডিএই’র প্রতিটি মেট্রোপলিটন কৃষি অফিস মূলত ছাদে বাগান সৃজন কার্যক্রম ও সে সম্পর্কে কারিগরি পরামর্শ দিয়ে আসছে। এছাড়াও ঋঅঙ  ডিএই এর সহায়তায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে এরূপ ছাদ বাগান ও অক্সিজেন ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ঢাকা শহরে ডিএই’র মাধ্যমে এ পর্যন্ত মোট ৬৫০০টি ছাদ বাগান করা হয়েছে।
০৯. রাস্তার ধারে তাল-খেজুর গাছ রোপণ
পরিবেশ ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে তালগাছ রোপণ করা খুবই লাভজনক। এটি গুচ্ছমূলী বৃক্ষ এবং  বেশ শক্ত। এজন্য মাটি আটকে রেখে ভাঙন ও জমির ক্ষয় রোধ করে। এছাড়াও ঝড় বৃষ্টি থেকে ঘরবাড়ি রক্ষা করে। এ গাছটি প্রায় ১৪০-১৫০ বছর পর্যন্ত বাঁচে। ফলবতী হতে ১০-১৫ বছর সময় লাগে। একটি তালগাছ থেকে বছরে প্রায় ৪০০-৫০০টি ফল পাওয়া যায়। এদিক বিবেচনায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাস্তার ধারে তালগাছ রোপণ কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে।
১০. রপ্তানি  ও বাজার সম্ভাবনা
আন্তর্জাতিক বাজারে সুস্বাদু হিমসাগর আমকে ছড়িয়ে দিতে ডিএই নেদারল্যান্ডসভিত্তিক সংস্থা সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়ার সহায়তায় ২০১৫ সালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে আম রপ্তানির উদ্যোগ গ্রহণ করে। সে কার্যক্রমে মেহেরপুর জেলায় ১৫টি আম বাগান নির্বাচন করা হয়। রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান সেসব বাগান থেকে প্রথমবার ১২০ মেট্রিক টন আম সংগ্রহ করে। চলতি বছর ২০০ মেট্রিক টন আমের অর্ডার আছে। নির্ধারিত বাগানগুলোতে আমের ব্যাগিং করা হয়েছে। কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের মাধ্যমে চাষি বাছাই করে উত্তম কৃষি ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি ব্যবহার করে আম রপ্তানি হচ্ছে।
১১. ফলসমৃদ্ধ দেশ গড়তে করণীয়
ফল উৎপাদন বাড়াতে ডিএই কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপগুলোর পাশাপাশি ফল রপ্তানির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এবং বাংলাদেশকে ফলসমৃদ্ধ দেশ গড়তে যেসব উদ্যোগগুলোর আশু বাস্তবায়ন দরকার-
প্রতিটি জেলায় হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন করে এর মাধ্যমে  সে এলাকার উপযোগী ও স্থানীয় ফলের মাতৃবাগান সৃজন ও চাষিদের মাঝে সুলভ মূল্যে ফলের চারা কলম সরবরাহের ব্যবস্থাকরণ;
বেসরকারি নার্সারিগুলো ফলের মানসম্মত চারা কলম উৎপাদন নিশ্চিতকরণ;
ফলের ক্রপ জোনিং করা; কারণ বিশেষ এলাকার মাটি ও আবহাওয়ার জন্য সে এলাকার ফলের উৎপাদন ও গুণগত মানের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায়। ফ্রুট জোনিং করা হলে বাণিজ্যিক বাগান ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত হবে;
ফল রপ্তানির জন্য উত্তম কৃষি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ;
ফলের সংগ্রহোত্তর অপচয় কমানোর জন্য বাস্তবমুখী পদক্ষেপ ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ;
ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে আরও উৎসাহিতকরণ;
ফল সংরক্ষণের জন্য এলাকাভিত্তিক হিমাগার স্থাপনসহ পরিবহনের জন্য কুলিং ভ্যান ও প্যাকেজিং ব্যবস্থা উন্নতকরণ।

 

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ক্ষুধা মুক্তি, খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা চালুকরণ এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আমাদের ভবিষ্যৎ করণীয়। কাজেই ফলের আবাদ সম্প্রসারণ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ কৌশল সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিসহ ফল চাষের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পুষ্টি ঘাটতি পূরণ তথা খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমানে ফলের উৎপাদন এলাকা ও একরপ্রতি উৎপাদন উভয় ক্ষেত্রেই অগ্রগতি হয়েছে। অগ্রগতির ধারাটি অব্যাহত রাখতে পারলে আগামীতে ফল উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ফলসমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে এবং সবার জন্য যথাযথ পুষ্টি নিশ্চিত হবে।

 

কৃষিবিদ মো. গোলাম মারুফ*
*মহাপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা


Share with :

Facebook Facebook