কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

দানাদার ফসলের ইঁদুরের ক্ষতি ও দমন ব্যবস্থাপনা

ধান বাংলাদেশের প্রধান ও মুখ্য দানা শস্য, ধানের পর গম, ভুট্টা, মুখ্য দানাদার ফসল। চিনা, কাউন, বার্লি গৌণ দানাদার ফসল হিসেবে পরিচিত। যেসব প্রাণীর মেরুদণ্ড আছে তাদের মেরুদণ্ডী প্রাণী বলা হয়। আর যেসব মেরুদণ্ডী প্রাণী আমাদের ফসলের ক্ষতি করে থাকে তাদের ক্ষতিকর বা অনিষ্টকারী মেরুদণ্ডী প্রাণী বলা হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল অংশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অথচ মাঠ থেকে শুরু করে গোলাঘর পর্যন্ত উৎপাদিত কৃষি পণ্যের বিরাট অংশ শুধুমাত্র ক্ষতিকর মেরুদণ্ডী প্রাণীর কারণে নষ্ট হয়। এদের উপস্থিতি পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য একান্ত আবশ্যক। মেরুদণ্ডী প্রাণীর অন্তর্গত পশুপাখির অধিকাংশই আমাদের উপকারে আসে। মানুষের উপকারে একবারেই আসে না এমন পশুপাখির সংখ্যা নিতান্তই কম। বাংলাদেশে দানাদার ফসলে ক্ষতিকর মেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যে ইঁদুর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে থাকে।


ইঁদুর স্তন্যপায়ী, সর্বভুক ও নিশাচর প্রাণী। কৃষি প্রধান বাংলাদেশে ফসলের জন্য ক্ষতিকর স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে ইঁদুর মানুষের প্রধান শক্র। ইঁদুর মানুষের উপকারে আসে এমন ঘটনা বিরল। মানুষের আশপাশে থেকেই এরা মাঠে গুদামে বাসাবাড়িতে অফিস আদালতে প্রতিনিয়ত ক্ষতি করে চলেছে। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই যেখানে ইঁদুরের সমস্যা নেই। এদের উপদ্রবে পৃথিবীর বহুদেশে চরম দুর্যোগ নেমে এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (১৯৬৭) হিসাব মতে, ইঁদুর প্রতি বছর বিশ্বের ৩ কোটি ৩৩ লাখ টন খাবার নষ্ট করে। বিশ্বে প্রতি বছর ইঁদুর যে পরিমাণ খাবার নষ্ট করে, সে খাবার খেয়ে অনায়াসেই ২৫-৩০টি দরিদ্র দেশের মানুষ এক বছর বাঁচতে পারে। বাংলাদেশে প্রতি বছর ইঁদুরের কারণে গড়ে ৫০০ কোটি টাকারও বেশি ফসলের ক্ষতি হয়ে থাকে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ইঁদুর প্রায় ৭২৪ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি করেছে। বাংলাদেশে প্রায় ৫০-৫৪ লাখ লোকের এক বছরের খাবার ইঁদুরের কারণে নষ্ট হয়। ইঁদুর বছরে আমন ধানের শতকরা ৫-৭ ভাগ, গমের শতকরা ৪-১২ ভাগ, গোলআলুর শতকরা ৫-৭ ভাগ, আনারসের শতকরা ৬-৯ ভাগ নষ্ট করে। ইঁদুর শুধুমাত্র গম ফসলে বছরে প্রায় ৭৭,০০০ মেট্রিক টন ক্ষতি করে যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। ইঁদুর প্লেগসহ প্রায় ৪০ প্রকার রোগ ছড়ায়। শস্যহানি, রোগ-জীবাণু ছড়ানো ছাড়াও ইঁদুর বই পুস্তক, কাপড়-চোপড়, আসবাবপত্র, রাস্তাঘাট, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নষ্ট করে থাকে। টেলিফোনের তার ও বৈদ্যুতিক তার কেটে যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল ও ভয়াবহ অগ্নিকা- ঘটায়।

 

ইঁদুরের সাধারণ বৈশিষ্ট্য ও প্রজাতি
স্তন্যপায়ী শ্রেণীর মধ্যে রোডেনশিয়া বর্গের অন্তর্ভুক্ত ইঁদুর জাতীয় প্রাণী হলো একটি বিশেষ ধরনের প্রাণী এবং তাদের বিশেষত্ব এই যে, স্তন্যপায়ী শ্রেণীর ৫৪১৯টি প্রজাতির মধ্যে ২২৭৭টি প্রজাতিই এ বর্গের অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে মাত্র ২০-২৫টি প্রজাতি আপদ বালাই বা অনিষ্টকারী হিসেবে চিহ্নিত। অনিষ্টকারী মেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যে ইঁদুর জাতীয় প্রাণী হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ক্ষতিকারক প্রাণী যা ফসল বপন থেকে শুরু করে ফসল কাঁটা ও সংগ্রহ পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে ক্ষতি করে থাকে। এরা সাধারণত গর্তে বাস করে, তবে কোনো কোনো প্রজাতির ইঁদুর ঘরে বা গাছে বাসা তৈরি করে বাস করে। ইঁদুর যে কোনো পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে খুব দ্রুত বংশবিস্তার করতে সক্ষম। এ জাতীয় প্রাণীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এদের দাঁতের গঠন ও বিন্যাস। ইঁদুর জাতীয় প্রাণী Rodent শব্দটি এসেছে তাদের কর্তন দাঁত (Rodere = কাটা, dent= দাঁত) থেকে। যা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও ধারাল বাটালির মতো। এ দাঁত জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বাড়তে থাকে, তাই ইঁদুর দাঁত বৃদ্ধির সমতা রাখার জন্য বা দাঁত ক্ষয় করার জন্য অনবরত কাটাকুটি করে বা গর্ত খোঁড়াখুঁড়ি করতে থাকে। ইঁদুরের ওপরের ও নিচের মাঢ়িতে এক জোড়া ছেদন দ- ও ৩ জোড়া পেষণ দন্ত আছে। ইঁদুর জাতীয় প্রাণীর গবেষকরা ইঁদুর জাতীয় প্রাণীকে বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত করেছে, যেমন-সজারু, কাঁঠবিড়ালি, নেংটি ইঁদুর (mice)।


সাধারণত ইঁদুরের জীবনকাল এক থেকে তিন বছর, একটি স্ত্রী ইঁদুরের বয়স তিন মাস পূর্ণ হলে বাচ্চা দেয়ার ক্ষমতা অর্জন করে। স্ত্রী ইঁদুরের সাধারণত ৮-১০ জোড়া স্তন থাকে। গর্ভধারণ কাল ১৯-২৩ দিন। বাচ্চা প্রসবের পরে মাত্র দুই দিনের মধ্যে আবার গর্ভধারণ করতে পারে। এরা সারা বছরই বাচ্চা জন্ম দিতে পারে, তবে বছরে ৫-৭ বার এবং প্রতিবারে ৬-১০টি বাচ্চা জন্ম দিয়ে থাকে। মা ইঁদুর এদের যতœ বা লালন পালন করে থাকে। পুরুষ ইঁদুরের বাচ্চা লালন পালনে কোনো আগ্রহ নেই, অধিকন্তু খাদ্য সংকটের সময় এরা এদের বাচ্চাকে খেয়ে ফেলে। এদের ১৪-১৮ দিনে চোখ ফোটে। ৪ সপ্তাহ পর্যন্ত দুধ পান করে এবং তিন সপ্তাহ পর থেকে শক্ত খাবার খাওয়া শুরু করে। পাঁচ সপ্তাহ পর থেকে এরা মা এর সঙ্গ থেকে আলাদা হয়ে যায়।


মাঠের কালো ইঁদুর (Bandicota bengalensis)
মাঠের কালো ইঁদুর মাঠ ফসলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে থাকে। এরা মাঝারি আকৃতির, ওজন প্রায় ১৫০-৩৫০ গ্রাম, পশম কালো ধূসর রঙের। মাথাও শরীরের মোট দৈর্ঘ্যরে তুলনায় লেজ কিছুটা খাটো। এরা সাঁতারে পটু। এরা গর্ত তৈরি করে বসবাস করে। বাংলাদেশের বনাঞ্চল ব্যতীত সর্বত্রই এদের বিস্তৃতি। সব রকমের কৃষিজাত ফসলেই এদের পাওয়া যায়। এছাড়া শহর এলাকা, ঘরবাড়ি এবং গুদামেও এদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এরা গর্ত তৈরির ব্যাপারে সক্রিয় যার ফলে বীজতলা ও ফসলের চারা অবস্থায় খুবই ক্ষতি হয়ে থাকে। ইঁদুর মাঠ ও গুদামে উভয় স্থানই গর্ত করে, ফসল কেটে, খেয়ে, গর্তে নিয়ে, গুদামে খেয়ে, পায়খানা, প্র¯্রাব, পশম, মাটি ও শস্যের সাথে মিশিয়ে ব্যাপক ক্ষতি করে থাকে। এ ছাড়া রাস্তাঘাট, পানি সেচের নালা, বাঁধ এবং ঘরবাড়ির যথেষ্ট ক্ষতি করে থাকে। সবচেয়ে আশংকাজনক ব্যাপার হলো যে এ প্রজাতির একটি ইঁদুর এক রাত্রে ২০০-৩০০টি ধান বা গমের কুশি কাটতে পারে।


মাঠের বড় কালো ইঁদুর (Lesser bandicoot rat, Bandicota indica)
এদের দেখতে মাঠের কালো ইঁদুরের মতো। কিন্তু তাদের চেয়ে আকারে বেশ বড়, মুখাকৃতি সরু, ৩৫০-১০০০ গ্রাম ওজনের হয়ে থাকে। পেছনের পা বেশ বড় এবং কালো হয় বলে সহজেই চেনা যায়। মাথা ও দেহের দৈর্ঘ্য ১৫-৩০ সেন্টিমিটার। এ ইঁদুরের রঙ কালচে ধূসর বা তামাটে বর্ণের। মাথা ও শরীরের মোট দৈর্ঘ্যের তুলনায় লেজ কিছুটা খাটো। লেজ বেশ মোটা, লেজের রিংগুলো স্পষ্ট, পেছনের পা বড়, চওড়া ও পায়ের পাতার নিচের দিকে কালো। এরা সাঁতারে পটু, গর্তে বাস করে, গর্ত ৮-১০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এরা সাধারণত মাঠে ধান ফসলের বেশি ক্ষতি করে।


গেঁছো ইঁদুর/ঘরের ইঁদুর (House/ roof rat,) Rattus rattus
গেঁছো ইঁদুর সাধারণত মাঝারি ধরনের, লম্বাটে, লালচে বাদামি বর্ণের হয়ে থাকে। শরীরের নিচের দিকটা সাদাটে বা হালকা বর্ণের। এ জাতের ইঁদুর গুদাম জাত শস্য, ঘরে রাখা খাদ্যশস্য, ফলমূল, তরিতরকারি ইত্যাদির ক্ষতি সাধন করে থাকে। এরা মাটিতে গর্ত না করে ঘরের মাচায় বা গুপ্ত স্থানে গাছে বাসা তৈরি করে বংশ বৃদ্ধি করে। এদের সাধারণত মাঠে কম দেখা যায়, তবে বাড়ির আশপাশে, উঁচু এলাকায় ও নারিকেল জাতীয় গাছে বেশি দেখা যায়।


ঘরের নেংটি ইঁদুর (House mouse, Mus musculus)   
ছোট আকারের এ ইঁদুরকে কোনো কোনো এলাকায় ঘরের বাতি ইঁদুর, কোথাও শইল্লা ইঁদুর বলে থাকে। এ ইঁদুরের শরীর ও মাথার দৈর্ঘ্যরে তুলনায় লেজের দৈর্ঘ্য কিছুটা বড় হয়। গায়ের পশম ছাই বা হালকা তামাটে বর্ণের, পেটের পশম খানিকটা হালকা ধূসর বর্ণের। এরা ঘরে বাস করে, ঘরে সংরক্ষিত খাদ্যশস্য, ঘরের জিনিস পত্র, কাপড় চোপড়, লেপ তোষক, বই পুস্তক, অফিস আদালত, বাসাবাড়ি, ল্যাবরেটরির জিনিসপত্র, যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক তার ইত্যাদি কেটে ব্যাপকভাবে ক্ষতি সাধন করে।


ইঁদুরের ক্ষতির ধরন বা লক্ষণ
ধান ক্ষেতে ইঁদুরের ক্ষতির ধরন : ইঁদুর ধান গাছের কা- সব সময়ই তেছরাভাবে কাটে যার ফলে কাণ্ড নুয়ে পড়ে। কিন্তু ধান বা গমে যখন শীষ বের হয় তখন ইঁঁদুর কখনও কখনও ওই শীষকে বাঁকিয়ে নিয়ে শুধু শীষ কেটে দেয়। কোনো কোনো সময় ইঁদুর শুধুমাত্র তার দাঁতকে ধারালো এবং স্বাভাবিক রাখার জন্য অথবা বাসা তৈরি করার জন্য ধান কেটে টুকরো টুকরো করে থাকে। গভীর পানির ভাসা আমন ধানে থোর আসার আগে থেকেই ইঁদুরের আক্রমণ পরিলক্ষিত হয়। সাধারণত বড় কালো ইঁদুর  ভাসা আমন ধানে ক্ষতি করে থাকে। ফসল কাটার সময় ধান ক্ষেতে অনুরূপ লক্ষণ দেখা যায়। ফলে ফলন অনেক কমে যায়। রোপা আমন ধানেও বেশি ক্ষতি করে থাকে।


গম ও বার্লি ক্ষেতে ইঁদুরের ক্ষতির ধরন : গম উৎপাদনে প্রধান অন্তরায় হচ্ছে ইঁদুর। বীজ গজানো থেকে শুরু করে গম কাটা পর্যন্ত মাঠে ইঁদুরের উপদ্রব দেখা যায়। ক্ষেতে বহু সংখ্যক গর্ত, নালা ও প্রচুর পরিমাণে মাটি উঠিয়ে গমক্ষেতে ব্যাপক ক্ষতি করে। তবে ইঁদুর শীষ বের হওয়া অবস্থায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে থাকে। শীষ বের হওয়ার শুরু থেকে কুশি কেটে গাছের নরম অংশের রস খায় ও পরে গাছ কেটে ও গম খেয়ে ফসলের ক্ষতি করে। ইঁদুর গাছ কেটে গমসহ শীষ গর্তে নিয়েও প্রচুর ক্ষতি করে থাকে। একটি ইঁদুর এক রাতে ১০০-২০০টি পর্যন্ত গমের কুশি কাটতে সক্ষম। ফলে গমের ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায়। গমের ও বার্লিতে শীষ বের হওয়ায় সময় থেকে গম পরিপক্ব অবস্থা পর্যন্ত ক্ষতির মাত্রা বৃদ্ধি পায়।
সংগ্রহোত্তর ক্ষতি : প্রচুর পরিমাণ খাদ্যশস্য গুদামে সংরক্ষণ করা হয় যেখানে ইঁদুরের ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। এছাড়াও বিভিন্ন রিপোর্টে দেখা গেছে, ইঁদুর দ্বারা সংগ্রহোত্তর ক্ষতির পরিমাণ ২.৫-৩০ শতাংশ। ছোট কালো ইঁদুর, গেছো ইঁদুরএবং নেংটি ইঁদুর প্রধানত গুদামে, গবেষণাগারে, অফিসে, বাসাবাড়িতে ক্ষতি করে থাকে। একটি ইঁদুর প্রতি পরিবারে গুদামে বছরে ৪০-৫০ কেজি দানাশস্য ক্ষতি করে থাকে এবং এ ক্ষতির পরিমাণ ৭৫,০০০-১,০০,০০০ মেট্রিক টন।


ইঁদুরের উপস্থিতির চিহ্ন
ইঁদুরের পায়খানা (Dropping)
ইঁদুরের বিষ্ঠা ফসলের ক্ষেতে, বাড়িতে, দালান কোঠার বা গুদামে গর্তের পার্শে¦, দেয়াল বা মাচার ওপর দেখতে পাওয়া যায়। ইঁদুরের প্রজাতির ভেদে বিষ্ঠার আকার ও আকৃতি ভিন্ন হয়ে থাকে।


ইঁদুরের চলাচলের রাস্তা (Runway)
অন্যান্য প্রাণীর মতো ইঁদুরেরও সচরাচর একই পথ দিয়ে চলাফেরা করে। তারা এ পথ সব সময়ই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখে। ফসলের জমিতে ফসলের ঘনত্বের ওপর নির্ভর করে তাদের সুড়ঙ্গ পথ ৫-৬ সেন্টিমিটার ব্যাসার্ধের হয়ে থাকে।


ইঁদুরের পায়ের চিহ্ন (Foot print)
কাদা মাটিতে, নরম বা বালি মাটিতে ইঁদুরের পায়ের ছাপ বোঝা যায়। তাছাড়া কালি মিশ্রিত ঢাইলের ওপর ও পায়ের ছাপ বুঝা যায়। পায়ের ছাপ বা চিহ্ন ইঁদুরের উপস্থিতি বুঝা যায়।

 

দাগ (Smear)
ইঁদুর সব সময় একই রাস্তা দিয়ে চলাচল করে। বার বার একই রাস্তা ব্যবহার করার ফলে, চলাচলে রাস্তার পার্শ্বে, বিম এ এক ধরনের দাগ দেখা যায় একে Smear বা দাগ বলে। দাগ দেখেও ইঁদুরের উপস্থিতি বুঝা যায়।


ইঁদুরের গর্ত (Burrow)
ইঁদুরের গর্ত সাধারণত খাদ্য গুদামের কাছে দেয়ালের বাহিরে স্থাপনার নিচে এবং বাঁধের পাড়ে ফসলের ক্ষেতে দেখা যায়। সদ্য নতুন মাটি বা উঠানো গর্ত দেখে সহজেই সতেজ গর্ত শনাক্ত করা যায় এবং ইঁদুরের উপস্থিতি সহজেই বুঝা যায়।


ক্ষত এবং কাটাকুটির চিহ্ন (Damage)
মাঠে কাটা গাছ, কাটা ফল, শাকসবজি, গুদামে বা মাচাতে কাটা বস্তা ইত্যাদি দেখে ইঁদুরের উপস্থিতি বুঝা যায়। গম বা ধানের কা- তারা তেরছা করে কাটে।


শব্দ (Sound) ও ঘ্রাণ
ঘরে বাড়িতে সাধারণত রাতের বেলায় মাচা বা সিলিংয়ের ওপর ইঁদুরের দৌড়ানো বা চলাফেরার শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। ইঁদুরের কিচির মিচির শব্দ বা ইঁদুরের প্র¯্রাব পায়খানার গন্ধ শুকেও ইঁদুরের উপস্থিতি বুঝা যায়।


সমন্বিত ইঁদুর দমন ব্যবস্থাপনা
শত শত বছর ধরে ফসলের মাঠে ইঁদুর দমন করা হচ্ছে তবুও ইঁদুরের সমস্যা প্রকট। কারণ যত্রতত্রভাবে ইঁদুর দমনের কৌশল অবলম্বন করা। বুদ্ধিমানের কাজ ইঁদুরের প্রাদুর্ভাবের সময় ইঁদুর দমন করা। অতএব, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনুধাবন করা প্রয়োজন যে, ইঁদুর দমন একটি পরিবেশগত কৌশল যে ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা কিন্তু কোনো প্রজাতিকে ধ্বংস করা নয়। ইঁদুর দমনের সবচেয়ে ভালো উপায় হলো, ইঁদুরের মৌলিক চাহিদা যেমন খাদ্য ও বাসস্থান সম্পর্কে জানা এবং এসব উপাদানগুলো সীমিত করা যা ইঁদুরের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।


ইঁদুর দমন পদ্ধতিগুলো আমরা সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করতে পারি। ক. পরিবেশসম্মতভাবে ইঁদুর দমন বা অরাসায়নিক পদ্ধতি খ. বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে ইঁদুর দমন বা রাসায়নিক পদ্ধতিতে ইঁদুুর দমন।


ক. পরিবেশ সম্মতভাবে দমন : কোনো রকম বিষ ব্যবহার না করে অর্থাৎ পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে ইঁদুর দমনই হলো পরিবেশসম্মতভাবে ইঁদুর দমন বা অরাসায়নিক পদ্ধতি। বিভিন্নভাবে এটা করা যায়। যেমন-


পরিদর্শন ও সজাগ দৃষ্টির মাধ্যমে আশ্রয়স্থল কমানো/বাসস্থান ব্যবস্থাপনা :
প্রতিবন্ধকতা
গর্ত খোঁড়া, পানি ও ধোঁয়া দিয়ে
জৈব নিয়ন্ত্রণ বা পরভোজী প্রাণীর মাধ্যমে
নিবিড়ভাবে ফাঁদ পাতার মাধ্যমে
নিবিড়ভাবে বিভিন্ন রকমের জীবন্ত ও মরণ ফাঁদ ব্যবহার করে ইঁদুর দমন করা যায়। কোনো কোনো ফাঁদে ইঁদুর ধরা পড়ার সময়ই যাতাকলে আটকিয়ে মারা যায়। এগুলোকে মরণফাঁদ বলে। কোনো কোনো ফাঁদে (বাঁশের ফাঁদ, বাক্সের ফাঁদ, খাঁচার ফাঁদ ইঁদুর জীবন্ত ধরা হয় এগুলোকে জীবন্ত ফাঁদ বলে। ফাঁদে ইঁদুরকে আকৃষ্ট করার জন্য বিভিন্ন ধরনের খাদ্য টোপ হিসাবে ব্যবহার করা হয়। সাধারণত যেখানে ইঁদুর দেখা যায় এবং যেখান দিয়ে ইঁদুর চলাফেরা করে যেমন ঘরের কিনারা, দেয়ালের পার্শ্ব, চালের ওপর বা গর্তের কাছাকাছি সেখানে ফাঁদ স্থাপন করা উচিত। মরণফাঁদ ইঁদুর চলাচলের রাস্তায় আড়াআড়িভাবে দেয়ালের বিপরীতে পাতা উচিত কেননা তাতে দুই দিক হতে ইঁদুর ফাঁদে পড়ার সম্ভবনা থাকে। বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ ঘরবাড়ির জন্য উপযোগী কিন্তু মাঠেও এ ধরনের ফাঁদ পাতা যায়।


বপন পদ্ধতি পরিবর্তনের মাধ্যমে
বপন পদ্ধতির উপর ইঁদুরের আক্রমণ কমবেশি হয়ে থকে। যেমন- গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, সারিতে বপন (৬-৮%) ছিটিয়ে বপনের চেয়ে (৮-১০%) ইঁদুরের আক্রমণ কিছুটা কম হয় আবার বেড পদ্ধতিতে গম আবাদ করলে ইঁদুরের আক্রমণ কম হয়।


ইঁদুরের লেজ সংগ্রহের মাধ্যমে
এ ব্যবস্থা এরই মধ্যে কয়েকবার বাংলাদেশে নেয়া হয়েছে এবং আশানুরূপ ফলও পাওয়া গেছে। প্রতিটি ইঁদুরের লেজের জন্য পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে লেজ সংগ্রহ অভিযান চালিয়ে ইঁদুরের সংখ্যা কমিয়ে রাখা সম্ভব।


খ. রাসায়নিক দমন বা ইঁদুরনাশক দিয়ে দমন
রাসায়নিক পদ্ধতিতে ইঁদুর দমন পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই বহু যুগ ধরে রাসায়নিক পদ্ধতিতে ইঁদুর দমন চলে আসছে। বিষ ক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে রাসায়নিক পদ্ধতিকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে, ক. তীব্র বা তাৎক্ষণিক বিষ (Acute poison) খ. বহুমাত্রা বা দীর্ঘমেয়াদি বিষ (Chronic poison)। বাংলাদেশে দুই ধরনের ইঁদুরনাশক পাওয়া যায়।


ক. তীব্র বা তাৎক্ষণিক বিষ (Acute poison)
যেসব বিষ খেলে ইঁদুরের দেহে তাৎক্ষণিক বিষক্রিয়া দেখা দেয় এবং মৃত্যু ঘটায় তাদের তীব্র বিষ বলা হয়। যেমন- জিংক ফসফাইড। একমাত্র ‘জিংক ফসফাইড’ সরকার অনুমোদিত একমাত্রা বা তাৎক্ষণিক বা তীব্র বিষ। বিষটোপ তৈরিও খুব সহজ। তাই অতি সহজে কৃষক ভাইরা জিংক ফসফাইড দিয়ে বিষটোপ তৈরি করে এবং তা দিয়ে ইঁদুর দমন করে। এ বিষ থেকে তৈরি বিষটোপ খেয়ে ইঁদুর সাথে সাথেই মারা যায়। ইঁদুর মরা অবস্থায় বিষটোপ পাত্রের আশপাশেই পড়ে থাকতে দেখা যায় বলে অনেকেই এ বিষটোপ খুব পছন্দ করে। কিন্তু এ বিষটোপের প্রধান অসুবিধা হলো বিষটোপ লাজুকতা। অর্থাৎ মরা ইঁদুর পড়ে থাকতে দেখে অন্য ইঁদুর আর বিষটোপ খেতে চায় না। একেই বিষটোপ লাজুকতা বলে। বিষটোপ ব্যবহারের আগে ২-৩ দিন বিষহীন টোপ ব্যবহার করে ইঁদুরকে টোপ খেতে অভ্যস্ত করে নিলে ইঁদুরের মৃত্যুর হার অনেক বেড়ে যায়। তবে কোনো ক্রমেই পর পর দুই তিন রাত বিষটোপ ব্যবহারের পর ওই স্থানে এক মাস আর এ বিষ ব্যবহার করাই ভালো।


খ. দীর্ঘমেয়াদি বিষ (Chronic poison)
যেসব বিষ খেলে ইঁদুর তাৎক্ষণিকভাবে বিষক্রিয়ায় মারা না গেলেও ধীরে ধীরে অসুস্থ বা দুর্বল হয়ে ২-১৪ দিনের মধ্যে মারা যায় তাদের দীর্ঘমেয়াদি বিষ বলা হয়। দীর্ঘমেয়াদি বিষকে দুইভাগে ভাগ করা হয়েছে। ক. একমাত্রা বিষ, খ. বহুমাত্রা বিষ। একমাত্রা একবার খেলেই ইঁদুর মারা যাবে, যেমন- ক্লের‌্যাট, স্টর্ম। বহুমাত্রা বিষ খেয়ে ইঁদুর মরার জন্য একাধিকবার খেতে হবে যেমন- ল্যানির‌্যাট, ব্রোমাপয়েন্ট, রেকুমিন। উল্লিখিত সবগুলো বিষই বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। ইঁদুর এ ধরনের বিষ খেয়ে আস্তে আস্তে অসুস্থ হয়ে গর্তের ভেতর মারা যায়, সেজন্য মৃত ইঁদুর সচরাচর চোখে পড়ে না। এ ধরনের বিষ খেলে সহসা কোনো আক্রান্ত লক্ষণ ধরা পড়ে না বিধায় পরিবারের অন্যান্য ইঁদুররাও এ ধরনের বিষটোপ খেতে কোনো কুণ্ঠা/দ্বিধাগ্রস্ত হয় না। ফলে একসাথে অনেক ইঁদুর মারা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ ধরনের বিষটোপে বিষটোপ লাজুকতা দেখা যায় না। পরীক্ষামূলকভাবে মাঠে এ জাতীয় বিষ দ্বারা শতকরা ৯০ ভাগ ইঁদুর দমন করা সম্ভব। এদেশে ল্যানিরটি বা ক্লেরাট, ব্রোমাপয়েন্ট নামে বিভিন্ন কীটনশকের দোকানে পাওয়া যায়।


সতর্কতা
জিংক ফসফাইড বিষটোপ তৈরির সময় কাপড় দিয়ে নাক ঢেকে দিতে হবে। বিষটোপ তৈরির পরও ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুতে হবে। ছোট শিশু ও বাড়ির গৃহপালিত পশুপাখি যেন এ বিষটোপের সংস্পর্শে না আসে তা লক্ষ্য রাখতে হবে। মৃত ইঁদুরগুলো একত্রিত করে গর্তে পুঁতে  ফেলতে হবে। বিষটোপ প্রস্তুত ও প্রয়োগে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে এবং কোনো রকম অসুস্থতা অনুভব করলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। গ্যাস বড়ি ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।


ইঁদুর মানুষের ব্যক্তিগত ও জাতীয় সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। কিন্তু বেশির ভাগ ইঁদুর গর্তে বাস করে বলে সম্পূর্ণভাবে দমন বা নির্মূল করা সম্ভব হয় না। তাই এদের সংখ্যা কমিয়ে মূল্যবান ফসল রক্ষা করে খাদ্যাভাব দূর করার চেষ্টা করতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট একক পদ্ধতি ইঁদুর  দমনের জন্য  যথেষ্ট নয়। ইঁদুর  দমনের সফলতা নির্ভর করে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং বিভিন্ন সময়োপযোগী পদ্ধতি ব্যবহারের ওপর। অতএব সম্মিলিত এবং সময়োপযোগী দমন পদ্ধতি প্রয়োগ করলেই জমিতে ইঁদুরের উপদ্রব কমানো সম্ভব।

 

ড. মো. শাহ আলম*

*প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত), অনিষ্টকারী মেরুদণ্ডী প্রাণী বিভাগ, বিএআরআই, গাজীপুর

 


Share with :

Facebook Facebook