কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

পরিবর্তিত জলবায়ুতে মসুর ডাল উৎপাদন প্রযুক্তি

মানুষের সুষম খাদ্য চাহিদা পূরণে ডাল একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল। ডালে পর্যাপ্ত পরিমাণে হজমযোগ্য আমিষ থাকে অথচ মাংস অপেক্ষা দাম কম। তাই ডালকে গরিবের মাংস বলা হয়। শুধু মানুষের খাদ্যই নয় পশুর খাদ্য ও মাটির খাদ্য হিসেবে পরিবেশবান্ধব কৃষি ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে ডাল এদেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। FAO এর রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতিদিন জনপ্রতি ৪৫ গ্রাম করে ডাল খাওয়ার কথা থাকলেও আমরা খাচ্ছি মাত্র ১২-১৩ গ্রাম করে। বর্তমানে ৭.০৭ লাখ হেক্টর জমিতে প্রায় ৭.৬৯ লাখ মেট্রিক টন ডাল উৎপাদন হচ্ছে। ডালের ঘাটতি দূর করতে জমির পারিমাণ ও ফলন উভয়ই বাড়াতে হবে। মসুর বাংলাদেশের ডাল ফসলের মধ্যে অন্যতম প্রধান ডাল ফসল। প্রতিদিন খাবার টেবিলে মসুর ডালের উপস্থিতিই প্রমাণ করে এর জনপ্রিয়তা এবং চাহিদা। কিন্তু বর্তমানে মসুর উৎপাদন নিম্নমুখী। এর কারণ আমন ধান কেটে জমি তৈরি করতে মসুর বপনের উপযুক্ত সময় (Optimum sowing time) চলে যায়, যার কারণে মসুর দেরিতে বপন করতে হয়। এতে মসুরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এছাড়া ফুল ধারণের সময়েই (Flowering stage) ব্যাপকভাবে স্টেম ফাইলিয়াম ব্লাইট রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং ফলন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। তাছাড়া ইদানীং চাষকৃত জমিতে ব্যাপকভাবে মসুরের গোড়া পচা (Foot rot) রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। তাই চাষ করে মসুর আবাদের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত ৩টি কারণে কাঙ্খিত ফলন পাওয়া যাচ্ছে না-
 

ক. উপযুক্ত সময়ের পরে বপন (Late planting) করার জন্য শারীরবৃত্তীয় কারণে ফলন কম হচ্ছে।
খ. গোড়া পচা
(Foot rot) রোগের কারণে ব্যাপকভাবে গাছের সংখ্যা (Plant population) কমে যাচ্ছে।
গ. স্টেম ফাইলিয়াম ব্লাইট
(Stemphylium Blight) দ্বারা ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হচ্ছে।
 

এসব সমস্যাগুলো থেকে মসুরকে রক্ষা করে কাঙ্খিত ফলন অর্জনে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা কয়েক বছর ধরে গবেষণা করে পরিবর্তিত জলবায়ুতেও মসুর উৎপাদনের লাগসই ও টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। আর তা হল বিনা চাষে রিলে পদ্ধতিতে (সাথী ফসল হিসেবে) মসুর চাষ। প্রচলিত চাষের মাধ্যমে মসুরের আবাদ ও রিলে পদ্ধতিতে বিনা চাষে মসুরের আবাদের একটি গবেষণালব্ধ তুলনামূলক ফলাফল নিম্নে উল্লেখ করা হলো-


টেবিল-১ : প্রচলিত ও রিলে ফসল হিসেবে মসুরের ফলন ও ফলনে সাহায্যকারী বৈশিষ্ট্যের তুলনামূলক ছক, আটঘড়িয়া, পাবনা, ২০১৬-১৭

ট্রিটমেন্ট

গাছের উচ্চতা  (সে.মি.)

প্রতি গাছে ফলের সংখ্যা

প্রতি ফলে বীজের সংখ্যা

এক হাজার বীজের ওজন(গ্রাম)

হেক্টর প্রতি ফলন (কেজি)

হেক্টরপ্রতি খড়ের ফলন  (কেজি)

বিনা চাষে রিলে পদ্ধতিতে মসুর আবাদ ৪৫.৫৫ ৫৪.২৫ ২.০০ ১৮.৫৬ ১৬১৩ ১৩৮৮
প্রচলিত চাষের মাধ্যমে মসুর আবাদ ৩৯.৫০ ৪৪.৭৫ ১.৮৫ ১৮.১১ ১৩৬২ ১২৬৮

উৎস : বার্ষিক গবেষণা প্রতিবেদন, সরেজমিন গবেষণা বিভাগ, বারি, গাজীপুর, ২০১৬-১৭

 

টেবিল-২ : মসুর উৎপাদনে প্রচলিত চাষ পদ্ধতি ও বিনা চাষে রিলে পদ্ধতির খরচ ও লাভের তুলনামূলক হিসাব, আটঘড়িয়া, পাবনা, ২০১৬-১৭

ট্রিটমেন্ট

প্রতি হেক্টরে বীজ থেকে প্রাপ্ত অর্থ (টাকা)

প্রতি হেক্টরে খড় থেকে প্রাপ্ত অর্থ (টাকা) প্রতি হেক্টররে মোট প্রাপ্ত অর্থ (টাকা) প্রতি হেক্টরে মোট খরচ (টাকা)

প্রতি হেক্টরে লাভ (টাকা)

বিনা চাষে রিলে পদ্ধতিতে মসুরআবাদ ১,২০,৯৭৫.০০ ১৩,৮৮০.০০ ১,৩৪,৮৫৫.০০ ২৮,০২০.০০ ১,০৬,৮৩৫.০০
প্রচলিত চাষের মাধ্যমে মসুর আবাদ ১,০২,১৫০.০০ ১২,৬৮০.০০ ১,১৪,৮৩০.০০ ৩২,৫২০.০০ ৮২,৩১০.০০


ফলাফল থেকে দেখা যাচ্ছে, মসুরের ফলনে সাহায্যকারী বৈশিষ্ট্য ও ফলন প্রচলিত চাষের চেয়ে বিনা চাষে রিলে পদ্ধতিতে বেশি এবং রিলে পদ্ধতিতে ফলন প্রায় শতকরা ১৮ ভাগ বেশি। বিনিয়োগ ও লাভের হিসাবেও দেখা যাচ্ছে কম খরচ করে বেশি লাভ পাওয়া যাচ্ছে রিলে পদ্ধতিতে প্রচলিত চাষ পদ্ধতির চেয়ে এবং তা প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ। তাই উল্লিখিত গবেষণার ফল থেকে দৃঢ়ভাবে বলা যায় প্রচলিত চাষ পদ্ধতির চেয়ে বিনা চাষে রিলে পদ্ধতিতে মসুর উৎপাদন একটি লাভজনক প্রযুক্তি যা বর্তমানে পরিবর্তিত জলবায়ুতে মাঠ পর্যায়ে সফলভাবে বাস্তবায়নের অপার সম্ভাবনা রয়েছে।


বিনা চাষে রিলে ফসল হিসেবে মসুর উৎপাদনের কলাকৌশল
এ পদ্ধতিতে আমন ধান কাটার ১০-১৫ দিন আগে (অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ) জমি থেকে পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথেই কাদার মধ্যে মসুর বীজ ছিটিয়ে বপন করতে হয়। যদি জমিতে রসের অভাব থাকে তাহলে বীজ বপনের ১ দিন আগে একটি হালকা সেচ দিয়ে নিতে হবে। সাধারণত মাঝারি উঁচু জমির ক্ষেত্রে আমন ধানের শেষ সেচের পরই মসুরের বীজ বপন করা যেতে পারে। রিলে পদ্ধতিতে একটু বেশি বীজের প্রয়োজন হয় এবং তা হেক্টরপ্রতি ৪৫-৫০ কেজি। বপনের আগে বীজ মোটামুটি  ৬-৮ ঘণ্টা ভিজিয়ে (প্রাইমিং) রাখলে ভালো হয়। যদিও এ পদ্ধতিতে গোড়া পচা রোগের প্রাদুর্ভাব কম তারপরও বপনের আগে বীজ কেজি প্রতি ৩ গ্রাম হারে প্রোভ্যাক্স অথবা কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক দ্বারা শোধন করে বপন করলে এ রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।


সার ব্যবস্থাপনা পরিমাণ : ইউরিয়া ৪৫ কেজি/হেক্টর; টিএসপি ৯০ কেজি/হেক্টর; এমপি  ৪৫ কেজি/হেক্টর। সমুদয় সার বীজ বপনের আগের দিন অথবা একই দিনে বীজ বপনের আগে প্রয়োগ করা যাবে।


আন্তঃপরিচর্যা এ পদ্ধতিতে মসুরের জমিতে সাধারণত আগাছা দমন ও সেচের তেমন প্রয়োজন হয় না। তবে মাটিতে যদি রসের অভাব হয় এবং রসের অভাবে যদি গাছের বৃদ্ধি কম হয় সেক্ষেত্রে চারা গজানোর ২৫-৩০ দিন পর একবার হালকা সেচ দিতে হয়। জমিতে পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা থাকতে হবে। কারণ মসুর জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। আগাছার প্রকোপ বেশি হলে বীজ গজানোর ৩০-৩৫ দিন পর একবার আগাছা পরিষ্কার করতে হয়।


রোগ দমন মসুরের প্রধান রোগ হলো স্টেমফাইলিয়াম ব্লাইট যা Stemphylium প্রজাতির ছত্রাক দ্বারা সৃষ্টি হয়। আক্রান্ত গাছের পাতায় ছত্রাকের সাদা জালিকা (মাইসেলিয়াম) দেখা যায়। দূর থেকে আক্রান্ত ফসল আগুনে ঝলসানো মনে হয়। আক্রমণের শেষ পর্যায়ে গাছ লালচে বাদামি রঙ ধারণ করে। বীজ, বিকল্প পোষক, বায়ু প্রভৃতির মাধ্যমে এ রোগ বিস্তার লাভ করে। রিলে পদ্ধতি যেহেতু সঠিক সময়ে মসুর বপন করা হয় সেহেতু সাধারণত দানা গঠন পর্যায়ে এ রোগের আক্রমণ দেখা যায়। এ রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে ফুল আসা শুরু করলেই (Flowering stage) রোভরাল-৫০ ডব্লিউপি নামক ছত্রাকনাশক ১০ দিন অন্তর অন্তর ২-৩ বার স্প্রে করলে এ রোগ থেকে সম্পূর্ণভাবে ফসলকে রক্ষা করা যায় এবং ফলনের ওপর কোনো প্রভাব পড়ে না।


ফলন এ পদ্ধতিতে মসুরের ফলন হেক্টরপ্রতি ১৫০০-২০০০ কেজি।


বাজারদর : বীজ- প্রতি কেজি ৭৫ টাকা, খড়- প্রতি কেজি ১০ টাকা।

 

ড. মো. জাহেরুল ইসলাম* ড. মো. রবিউল আলম**

*সরেজমিন গবেষণা বিভাগ, কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, পাবনা # ০১৭১৫-৫২৪১২৬

 


Share with :

Facebook Facebook