কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

টেকসই কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার মূল পরিচালিকা শক্তি

তিন ধরনের সাংগঠনিক সম্পর্ক : টেকসই কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার মূল পরিচালিকা শক্তি

একটি টেকসই কৃষক সংগঠনের মূল চালিকাশক্তি তার মজবুত সদস্যভিত্তি। এটি গড়ে উঠে তখনই যখন সদস্যরা সংগঠনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও কার্যাবলিতে সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং নিজেকে সংগঠনের গর্বিত অংশীদার মনে করে। সংগঠনের সঙ্গে সদস্যদের এ অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক যখন দৃঢ় হয় তখন সংগঠনের বিভিন্ন সেবা প্রাপ্তি ও যোগাযোগ রক্ষার প্রয়োজনে অন্যান্য কৃষক সংগঠন, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাসমূহের সঙ্গেও সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়। একটি টেকসই কৃষক সংগঠন তিন ধরনের পারস্পরিক সম্পর্কে বিজড়িত হয়ে টেকসই হতে পারে বন্ধন, সেতুবন্ধন ও সংযোগ। এ তিন ধরনের সম্পর্ক নিম্নোক্ত সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করা হলো-
বন্ধন : তৃণমূল পর্যায়ের কৃষক সংগঠনে সদস্যদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক হলো বন্ধন। তবে এ বন্ধন কতটা দৃঢ় হবে তা নির্ভর করে সংগঠনটি গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার ওপর। সংগঠনের সব সদস্যর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে তাদের মাঝে বন্ধন দৃঢ় করতে যে বিষয়গুলো নিয়ামক হিসেবে কাজ করে তা নিম্নরূপ-
ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, বর্গা ও ভূমিহীন কৃষকদের সমবেতকরণ : বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষক সংগঠন গড়ে ওঠে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার কোনো না কোনো প্রকল্পের উদ্যোগে ও পৃষ্ঠপোষকতায়। যেভাবেই গড়ে উঠুক না কেন সমবেতকরণের এ ধাপে খেয়াল রাখতে হবে সংগঠনগুলো যেন শুধু প্রকল্পের সেবা প্রদানের হাতিয়ার হিসেবে গঠিত না হয়। এটাও খেয়াল রাখা প্রয়োজন সংগঠনগুলো যাতে একই শ্রেণীর কৃষকদের নিয়ে গঠিত হয়। এখানে একটা কথা স্মরণ করা যেতে পারে যে, সচ্ছল পরিবারের ২৬ থেকে ৩০ শতাংশ বা আরও বেশি কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত (সূত্র : আব্দুল বায়েস ও মাহবুব হেসেন, ২০০৮)। ফলে তারা এমনিতেই প্রভূত প্রভাব রাখেন। যদি তাদের ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গা কৃষকদের সংগঠনে আনা হয় তবে তারা সংগঠনকে নিজের স্বার্থে ব্যবহারে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। সেজন্য সমশ্রেণীর কৃষক নিয়ে দল গঠনই শ্রেয়। শুধু প্রকল্পের প্রয়োজনে গড়ে ওঠা কৃষক সংগঠনগুলোর সদস্যদের মধ্যে বন্ধন শিথিল হয় নানা কারণে; তন্মধ্যে দলে নানা শ্রেণীর কৃষকদের মিশ্রণ, নানামুখী স্বার্থের টানাপড়েন, প্রকল্প সুবিধার অসম বণ্টন (বড় কৃষককে বেশি সুবিধা অথবা পক্ষপাত) ও সংগঠনের মাধ্যমে প্রকল্প চাহিদামাফিক সেবা বিতরণ ইত্যাদি অন্যতম বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়। এ কারণে প্রকল্প শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংগঠনের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় ও বিলুপ্ত হয়। আবার যখন সমশ্রেণীর কৃষকরা  তাদের জটিল সমস্যাগুলো অংশগ্রহণমূলকভাবে চিহ্নিত করে ও তা সমাধানে একই উদ্দেশ্যে একসঙ্গে সংগঠিত হয় তখন সেটিতে সদস্যরা আস্থা অর্জন করে এবং উদ্দেশ্য পূরণে একসঙ্গে কাজ করে।
উদাহরণ : একটি নির্দিষ্ট গ্রামের ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন-বর্গা কৃষকরা একজন মাঠ সম্প্রসারণ কর্মীর সহায়তায় কৃষিতে তাদের বিভিন্ন সমস্যা ও সমাধানসমূহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অংশগ্রহণমূলকভাবে চিহ্নিত করল। চিহ্নিত সমস্যার যেগুলো এককভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়, সেগুলো কিভাবে সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করা যায় তা নিয়ে অংশগ্রহণকারী কৃষকরা একসঙ্গে আলোচনা করল এবং একটি নতুন কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার সম্ভাব্য এজেন্ডা হিসেবে চিহ্নিত সমস্যাগুলোর সমাধানে অংশগ্রহণকারী কৃষকদের মতামত গ্রহণ করল। একটি কার্যকর কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে এ অনুশীলনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এ অনুশীলনের মাধ্যমেই প্রান্তিক-বর্গা-ভূমিহীন কৃষকদের মাঝে জিজ্ঞাসার সৃষ্টি হবে কেন সংগঠিত হওয়া প্রয়োজন? ধরা যাক অংশগ্রহণমূলক অনুশীলনে এ ধরনের যে সমস্যাগুলো চিহ্নিত হলোÑ উপকরণের সমস্যা (ভেজাল, উচ্চমূল্য), বাজারজাতকরণের সমস্যা (ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না), অবকাঠামো (সেচ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, স্লুইস গেট, নিষ্কাশন নালা, গ্রামীণ রাস্তা ইত্যাদি) সমস্যা, ঋণের সমস্যা, উৎপাদনের সমস্যা (লাগসই প্রযুক্তি নেই)। আলোচনা করে তারা বুঝতে পারল এ সমস্যাগুলো একা একা সমাধান সম্ভব নয়, সম্মিলিত উদ্যোগে তখন তারা একটি সংগঠন গড়ে তুলতে সহমত পোষণ করল।
স্পষ্ট ও অংশীদারমূলক লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও পারস্পরিক সুবিধা : ওপরের উদাহরণের আলোকে দেখা যাচ্ছে, চাষাবাদে ব্যক্তি কৃষকদের একেকজনের একেক রকম সমস্যা থাকলেও সমশ্রেণীর কৃষকদের কিছু সমস্যা আছে, যা সবাইর জন্য সাধারণ, সে সমস্যা এককভাবে সমাধান করা যায় না, যার জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ। এভাবে সমশ্রেণীর কৃষকদের সাধারণ সমস্যাগুলো মোকাবিলায় সবার অংশীদারিত্বে একটি সাধারণ স্পষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। এভাবে সব সদস্যের সাধারণ স্বার্থে গড়া সংগঠনে সবাইর মতামতের প্রতিফলন ঘটে, সবাই সংগঠনকে নিজের মনে করে এবং তাদের মধ্যে বন্ধন অটুট থাকে।
উদাহরণ : ধরা যাক পূর্বের সংগঠনটি অংশগ্রহণমূলকভাবে সমস্যা চিহ্নিত করার পর সংগঠিত হওয়ার জন্য সংকল্পবদ্ধ হলো। এ সমস্যাগুলো থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যই হচ্ছে ‘ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, বর্গা ও ভূমিহীন কৃষকদের আর্থসামাজিক জীবনমান উন্নয়ন’। এ লক্ষ্য পূরণে সাংগঠনিকভাবে যেসব স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কাজ করতে হবে তা নি¤œরূপÑ
সদস্যদের পূর্ণ আর্থসামাজিক বৃত্তান্ত প্রস্তুত করা এবং তদনুযায়ী তাদের চাহিদা নিরূপণ;
চিহ্নিত সমস্যাসমূহ সমাধানে একত্রে কাজ করা, সদস্যদের চাহিদামাফিক সেবা প্রদানে দলীয়ভাবে উপকরণ ও বাজারজাতকরণ সেবা (দলীয়ভাবে একসঙ্গে উপকরণ কেনা ও উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করা) প্রদানে উদ্বুদ্ধ করা যাতে করে সদস্যরা সংগঠনমুখী হতে পারে এবং তাদের মধ্যে সংগঠনের প্রতি দৃঢ়বন্ধন গড়ে উঠে;
সংগঠনে সুশাসন ও শক্ত দলীয়ভিত বজায় রাখতে সব কাজ কর্মে স্বচ্ছতা বজায় রাখা;
বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা;
কৃষিতে স্থানীয়ভাবে চিহ্নিত সমস্যাসমূহের সমাধানে  স্থানীয় সরকার ও সরকারি কৃষি সম্প্রসারণ সংস্থাসমূহের নাগরিক সনদে উল্লিখিত কৃষকদের প্রাপ্য সেবাসমূহ চিহ্নিত করা এবং এ বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি সেবা প্রদানকারী সংস্থাসমূহের সঙ্গে সংযোগে দেনদরবার করা;
সদস্যদের তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা যাতে সরকারি বিনিয়োগ কর্মসূচিতে স্থানীয়, আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে কৃষক সংগঠনের শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা যায়।
স্বায়ত্তশাসন : সদস্যদের সবার অংশীদারিত্বে নির্ধারিত সাধারণ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণ করা যে কোনো কৃষক সংগঠনের উন্নয়নের জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। প্রকল্পভুক্ত বা প্রকল্প সাহায্যপুষ্ট সংগঠনগুলোতে সদস্যরা সম্প্রসারণ সংস্থার প্রতি অতিনির্ভরশীল, কি করতে হবে না হবে তা পূর্ব নির্ধারিত। কোনো পরিবর্তন করা না করা তাও বাইরের নির্দেশে করা হয়। ফলে তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সাধনে সদস্যদের খুব একটা সক্রিয় হতে দেখা যায় না। হতে পারে প্রকল্পের উদ্দেশ্য আদর্শের সঙ্গে তাদের আকাক্সক্ষার কোনো মিলই নেই। কারণ কৃষকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া উদ্দেশ্য আদর্শ নিয়ে প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। যদি এমন হতো প্রকল্পটি শুরুই হয়েছে এলাকার কৃষকদের সঙ্গে অংশীদারিভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে। তবে কৃষকরা তাদের মতামত দিতে পারত, তাদের আকাক্সক্ষা অনুযায়ী প্রকল্পটি তৈরি হতো। অথবা সমস্যা চিহ্নিত করার ফলে নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে তার সমাধান করতে পারত। সব ক্ষেত্রেই প্রকল্প বা সম্প্রসারণ সংস্থা শুধু সহায়কের ভূমিকা পালন করবে, কোনোক্রমেই প্রকল্পের কোনো মাঠ সম্প্রসারণ কর্মী সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ করবে না, হয়তো কিছু তথ্য, প্রযুক্তি, জ্ঞান দিয়ে সহায়তা করবে। তাদের কাজ হলো কৃষকদের আত্মশক্তি জাগ্রত করা, নির্দেশ করা নয়। এতে কৃষকদের মাঝে আত্মনির্ভরশীলতা বাড়বে। সংগঠন তার নিজস্ব উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অনুযায়ী চলবে। সব সিদ্ধান্ত সংগঠনের সদস্যরাই নেবেন ও বাস্তবায়ন করবেন। এভাবে সংগঠনগুলোতে স্বায়ত্তশাসনের চর্চা গড়ে ওঠে, সদস্যদের মাঝে বন্ধন গড়ে ওঠে, যা সংগঠনের সাধারণ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণে সহায়ক। স্বায়ত্তশাসন মানে নির্ভয়ে নিশ্চিন্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। স্বায়ত্তশাসনের ফলে সদস্যরা নিম্নের কাজগুলো করতে অনুপ্রাণিত হয় এবং তাতে সংগঠনে তাদের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়:
আমরাই আমাদের গঠনতন্ত্র তৈরি করব;
আমরা নিয়মিত সঞ্চয় করব, ভবিষ্যতে সঞ্চয় তহবিল থেকে আমরা সদস্যদের চাহিদামাফিক সেবা প্রদানে সামাজিক বিনিয়োগ করতে পারব;
সংগঠনের হিসাব নিয়মিত রাখব এবং সব সদস্যর মাঝে হিসাবের স্বচ্ছতা বজায় রাখব;
নিয়মিত সভা করব এবং যে কোনো সিদ্ধান্ত সবাই মিলে গ্রহণ করব।


সাধারণ মূল্যবোধ : মূল্যবোধ দেখা যায় না ছোঁয়াও যায় না- অনুভব করতে হয়। কিন্তু এর প্রভাবেই আমাদের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি গঠিত হয়। মূল্যবোধ আমাদের লক্ষ্য নির্ধারণ ও অর্জনে প্রভাব ফেলে। আমরা যখন অন্যের কল্যাণ চাইব তখন নিজের স্বার্থের কথা কম চিন্তা করব বা করব না বিপরীতটাও অনুরূপভাবে সত্য। আমরা প্রথমটাই চাইব। আমাদের উদ্দেশ্যের সঙ্গে মূল্যবোধ জড়িত। যদি দেখি কোনো পরিকল্পনা প্রণয়ন বা বাস্তবায়ন শেষে সবাই আনন্দিত অথবা ব্যর্থ বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা সব স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভাগাভাগি করে নিচ্ছে অথবা সীমিত সম্পদ যখন সবাইর মধ্যে সমভাবে বণ্টন করা যাচ্ছে না তখন যদি নিজের অংশটা অন্যকে দিতে সবাই মুখিয়ে থাকে কিংবা আর্থিক কোনো লাভ হবে না জেনেও সব সংগঠনের জন্য ব্যক্তিস্বার্থকে ত্যাগ করতে পারছেন তখন বুঝা যাবে সংগঠনে যৌথতার মূল্যবোধ জাগরূক আছে। আমরা জীবনে যেসব বিষয় নিয়ে প্রাণপণ লড়াই করি সে সব বিষয়ের পরিষ্কার ধারণা দেয় মূল্যবোধ। মূল্যবোধই বলে দেয় কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ, কোনটা চাই, কোনটা চাই না।
একজন মানুষের মধ্যে যেহেতু ভালো-মন্দ, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, সমাজকেন্দ্রিকতা একসঙ্গে বিরাজমান- তাই আমাদের অগ্রাধিকার ঠিক করতে হয়। সংগঠন যেহেতু সহযোগিতা ও যৌথতার ওপর গড়ে উঠে সেজন্য সংগঠনে কমিউনিটি সমাজ, ত্যাগ তিতিক্ষা এ ধরনের মূল্যবোধকে লালন করতে হয়। এজন্য উদ্দেশ্য, আদর্শ ঠিক করতে হয়, পরিকল্পনা করতে হয় সমাজকেন্দ্রিক মূল্যবোধের আলোকে। এটিই হলো মূল্যবোধের চর্চা। এছাড়াও কিছু নিয়ম পালন করতে হয়। নিয়ম মূল্যবোধ আলাদা বিষয়। মূল্যবোধ বিমূর্ত ধারণা, নিয়ম হচ্ছে মূল্যবোধ প্রকাশের উপায়। যেমন- আমরা বিশেষ বিশেষ দিনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করিÑ এটি নিয়ম। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয় আমাদের দেশপ্রেমের মূল্যবোধ। মৃত ব্যক্তির জন্য পালিত অনুষ্ঠানে আমরা সাদা-কালো পোশাক পরিÑ এটা নিয়ম কিন্তু এর মধ্য দিয়ে মৃতদের জন্য আমাদের শ্রদ্ধা প্রকাশিত হয়।  
সংগঠনের একটা সাধারণ মূল্যবোধ সদস্যদের মাঝে বন্ধন দৃঢ় করতে একটি শক্তিশালী নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। সংগঠনে সদস্যদের বন্ধন দৃঢ় করতে একটি স্বকীয় দলীয় মূল্যবোধ সৃজনেও নেতাদের কাজ করতে হয়। একটি অতি সাধারণ মূল্যবোধ হতে পারে ‘সংগঠনের সব কাজে সদা সত্য কথা বলব- কোনো কিছু গোপন করব না’ অথবা এমন হতে পারে ‘সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’। আবার সদস্যদের মাঝে মূল্যবোধ সৃষ্টিতে শপথও নেয়া যেতে পারে ‘আমরা একতাবদ্ধ থাকবো, মিত্র সংগঠনগুলোর সাথে মিলেমিশে গড়ে তুলবো বৃহত্তর ঐক্য। আমার জন্য নয়, এখন থেকে আমাদের জন্য কাজ করব। সম্পদ সৃষ্টি করব মানুষের জন্য। সম্পদ সংরক্ষণ করব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।’ উদাহরণ হিসেবে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে একটি মহিলা গণ সংগঠন ‘সেবা’র (ঝঊডঅ) মূল্যবোধের কথা বলা যেতে পারে, যারা তাদের সব সভার আগে ও পরে শপথ নেয় এভাবে ‘আমরা সত্য, অহিংসা, সর্বধর্ম ও খাদি (স্থানীয় কর্মসংস্থান) প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাবো’।

 

প্রতিশ্রুত সদস্য : সংগঠনের অংশগ্রহণমূলক উদ্দেশ্য ও সাধারণ মূল্যবোধ ছাড়াও সদস্যদের নিয়মিত আর্থিক অনুদান বা বিনিয়োগ ও বন্ধন দৃঢ় করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। সদস্যরা যখন প্রতিশ্রুতিমতো সাপ্তাহিক বা মাসিক ভিত্তিতে সঞ্চয় করে এবং সঞ্চিত অর্থ থেকে সামাজিক কোনো ব্যবসায় বিনিয়োগ করে সব সমসুবিধা লাভ করে তখন তা সদস্যদের প্রতিশ্রুতবদ্ধ করে। প্রতিশ্রুত বা অঙ্গীকারাবদ্ধ সদস্যরা একদিকে যেমন সঞ্চয়ে আগ্রহ বোধ করে অন্যদিকে নিজেদের এ সম্পদ সৃজনের দেখভাল করতেও উদ্যমী হয়। তদুপরি সংগঠনে তার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আর্থিক সম্পদের ব্যবহারে নেতৃত্বকে দায়বদ্ধ করে তুলে।
 

সেতুবন্ধন : একটি কৃষক সংগঠনে সদস্যদের মধ্যকার দৃঢ় বন্ধন রচিত হওয়ার পরের কাজটি হলো অন্যান্য কৃষক সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন বা সেতুবন্ধন গড়ে তোলা। একজন কৃষক যেমন অপর একজন কৃষকের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় করে; পরস্পরের ভালো চাষাবাদ পদ্ধতি, কারিগরি জ্ঞান, ভালো বীজ, গুণগতমানের চারা, কলম, সার ইত্যাদি নিয়ে মতবিনিময় করে তেমনি একটি কৃষক সংগঠন অন্য আরেকটি কৃষক সংগঠনের সঙ্গে সেতুবন্ধন সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। এ সেতুবন্ধন সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে দুটি সংগঠন বা সমশ্রেণীর অনেক কৃষক সংগঠন পরস্পরের সঙ্গে অনেক অভিজ্ঞতার বিনিময় করতে পারে। তারা কিভাবে গড়ে উঠেছে, গড়ে ওঠার সময় কী কী প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছিল, কিভাবে সেসব প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠেছে, সদস্যদের জন্য কী কী অভিনব সেবা দেয়া হয়, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, সংগঠনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার চর্চা কিভাবে করা হয়, সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে সংগঠনের সম্পর্ক কেমন, কৃষি পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত সংগঠন সদস্যদের জন্য কি করে, সর্বোপরি সামাজিক মূলধন সৃজনে সংগঠন কিভাবে ভূমিকা রাখছে, কি কৌশল ব্যবহার করছে ইত্যাদি বিষয়ে ভাব-মতামত আদান-প্রদান হতে পারে। যেহেতু বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষক সংগঠনই ক্ষুদ্র, ২০-২৫ জনের ছোট ছোট দল; কাজেই পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পাশাপাশি ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, বর্গা, ভূমিহীন কৃষকদের অধিকার আদায়েও কৃষক সংগঠনগুলো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো না থেকে পরস্পরের সমন্বয়ে একটি অভিন্ন ও জোটভুক্ত মঞ্চ গড়ে তুলতে পারলে এ শ্রেণীর কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় একটি বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করতে পারে। এবং এ সেতুবন্ধনের সম্পর্ক গড়া বাংলাদেশের কৃষক সংগঠনের জন্য অতিশয় জরুরি।  
সেতুবন্ধনের সম্পর্ক রচনা করার কাজগুলো বিভিন্ন ধাপে হতে পারে। তবে পাশাপাশি সমশ্রেণীর কৃষক সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের কাজটিই আগে করা উচিত। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় একই ইউনিয়নে একই প্রকল্পের গড়া একটি গ্রামের কৃষক সংগঠন তার পাশের গ্রামগুলোর কৃষক সংগঠনগুলোকে চিনে না, জানে না বা জানার আগ্রহও বোধ করে না। এটা হয়, আমাদের কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থার ত্রুটির জন্য, মাঠ সম্প্রসারণ কর্মীরা কখনো ছোট ছোট কৃষক দলগুলোকে জোটভুক্ত হওয়ার সুবিধাগুলো কী তা বুঝিয়ে উদ্দীপ্ত করে না বা সেটা করার দক্ষতাও নেই। সেতুবন্ধন পর্যায়ে জোটভুক্ত হওয়ার ধাপগুলো নিম্নরূপ হতে পারে:

 

গ্রাম থেকে : গ্রামের ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, বর্গা, ভূমিহীন পরিবারগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করে তাদের ছোট ছোট দল করে একটা গ্রাম সমিতি গড়ে তোলা যায়। গ্রামের উন্নয়নে তারাই সিদ্ধান্ত দেবে এবং স্থানীয় সরকার প্রতিনিধির সঙ্গে বা ইউনিয়ন পর্যায়ে তাদের জোটের সঙ্গে গ্রাম উন্নয়ন পরিকল্পনা দাখিল করবে।
উদাহরণ : বরগুনা সদর উপজেলার সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট ফউন্ডেশন (এসডিএফ) সহায়তায় গড়ে ওঠা পরীর খাল গ্রাম সমিতি।
ইউনিয়ন থেকে : ইউনিয়নের সব গ্রামে সমশ্রেণীর যেসব কৃষক সংগঠন আছে সেগুলো ইউনিয়ন পর্যায়ে জোটভুক্ত হতে পারে। তারা পরস্পরের সঙ্গে অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান যেমন করতে পারে, তেমনি সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নিজেদের প্রতিনিধি প্রেরণের জন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে জোরালো সংলাপ চালাতে পারে, ইউনিয়ন কৃষি কমিটিতে অংশগ্রহণ, গ্রাম সমিতিগুলোর মাধ্যমে ওয়ার্ড সভা করা, সব ওয়ার্ডের কৃষি উন্নয়নে বিনিয়োগ পরিকল্পনায় একত্র করে ইউনিয়ন কৃষি কমিটির মাধ্যমে উপজেলা পরিষদে প্রেরণ করা ও তা বাস্তবায়নের জন্য তাগিদ দিতে পারে।

 

উদাহরণ : কুড়িগ্রামে যাত্রাপুর ইউনিয়নে আরডিআরএসের যাত্রাপুর ইউনিয়ন ফেডারেশন।
উপজেলা পর্যায়ে : ইউনিয়নের জোটগুলো উপজেলা পর্যায়ে তাদের জোট গঠন করতে পারে। এ জোটটি ইউনিয়ন পর্যায়ের জোটগুলোর সঙ্গে সমন্বয় সাধন, তাদের পরিকল্পনাগুলো উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা চেয়ারম্যান, নির্বাহী কর্মকর্তা, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, মৎস্য কর্মকর্তা, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে (পিআইও) অবহিত করতে পারে এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জোরালো দেন-দরবার চালাতে পারে। উপজেলা পর্যায়ের জোট- ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ের জোটের চাহিদা সাপেক্ষে কৃষি উপকরণ কোম্পানি, উপজেলার পাইকারি উপকরণ বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে উপকরণ বেশি পরিমাণে ক্রয় করার মাধ্যমে গুণগত মান ও স্বল্পমূল্য নিশ্চিত করতে পারে।
জেলা পর্যায় : জেলা পর্যায়ে উপজেলা পর্যায়ের সেতুবন্ধনে আবদ্ধ কৃষক সংগঠনগুলো জোটভুক্ত হবে এবং জেলা পর্যায়ে এ জোটের ভূমিকা উপজেলা জোটের মতোই তবে আরো বড় পরিসরে।
বিভাগীয় বা আঞ্চলিক পর্যায় : গ্রাম থেকে ইউনিয়ন, ইউনিয়ন থেকে উপজেলা, উপজেলা থেকে জেলা পর্যন্ত জোটগুলোর বৃহত্তর জোট বিভাগীয় পর্যায়েও হতে পারে আবার আঞ্চলিক পর্যায়েও করা যেতে পারে। কৃষকদের অধিকার রক্ষায় বিভাগীয় পর্যায়ে দেন-দরবারে এ ধরনের সেতুবন্ধন রচিত হতে পারে।
উদাহরণ : সারা বাংলা কৃষক জোট (উত্তর বঙ্গ), সারা বাংলা কৃষক জোট (দক্ষিণ বঙ্গ) ও কেন্দ্রীয় কৃষক মৈত্রী।
জাতীয় জোট : দেশের সর্ববৃহৎ পরিসরে সব পর্যায়ের প্রতিনিধিত্বে কৃষকদের কেন্দ্রীয় জোট হতে পারে, যা কৃষির সঙ্গে সম্পর্কিত সব জাতীয় ইস্যু নিয়ে সরকার, উন্নয়ন সহযোগী ও বেসরকারি খাতের সাথে দেন-দরবার করতে পারে।

 

উদাহরণ : সারা বাংলা কৃষক জোটের আত্মপ্রকাশ, যদিও একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে তবুও বাংলাদেশের প্রায় ৫৪টি কৃষক সংগঠনের সেতুবন্ধনে এটি রচিত।
সংযোগ: সংগঠনে সদস্যদের মাঝে উত্তম সেবা নিশ্চিত করে বন্ধন দৃঢ় রাখতে নেতাগণকে বিভিন্ন সরকারি সেবা সংস্থা বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয়, আবার সেতুবন্ধন সম্পর্কেও জোটভুক্ত সংগঠনগুলো কৃষকদের অধিকার রক্ষায় বা স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ স্থাপন করতে হয়। এ যোগাযোগ স্থাপনের কাজটিই হলো সংযোগ। তবে সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সংযোগের ক্ষেত্রে কৃষক নেতাগণকে যথেষ্ট বিচক্ষণ হতে হবে। বিশেষ করে কৃষি, সম্পদ, সরকারি নীতিমালা, কোন দপ্তরের কী কাজ ইত্যাদি বিষয়ে সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের জীবন জীবিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস  হচ্ছে চাষাবাদ। গ্রামীণ পটভূমিতে জীবন জীবিকায় পাঁচ ধরনের সম্পদকে চিহ্নিত করা যায়। যেমনÑ
প্রাকৃতিক সম্পদ : জল-জমি-জলা, বন, উদ্ভিদ জিন তথা ফসলের রকম।
ভৌত  সম্পদ : রাস্তাঘাট, আকাশ, পানি সরবরাহ সেচনালা, কৃষি যন্ত্রপাতি, ইত্যাদি।
মানবসম্পদ :    মানুষের  দক্ষতা, জ্ঞান, স্বাস্থ্য ইত্যাদি।
আর্থিক সম্পদ : সঞ্চয়, ঋণ, পণ্য ভা-ার, প্রেরিত অর্থ ইত্যাদি।
সামাজিক সম্পদ : গ্রামীণ প্রতিষ্ঠান, কৃষক সংগঠন, নেটওয়ার্ক  বা বহুমুখী যোগাযোগ।
এসব সম্পদ ব্যবস্থাপনা (এবং জীবন-জীবিকার গড়ন বা আদল বা ধরন ঠিক করে) তথা রাষ্ট্রের সার্বিক শাসন পদ্ধতি পরিচালন বা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও নীতিমালা, আইন ইত্যাদি বর্তমান। এসব প্রতিষ্ঠান মৌজা থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত বিদ্যমান। এমনকি  অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও এখানে জড়িত থাকে। এগুলো সরকারি হতে পারে আবার বেসরকারিও হতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠান এবং নীতিমালাই কার্যকরভাবে নির্ধারণ করে সম্পদে প্রবেশাধিকার, সম্পদের মধ্যকার বিনিময় এবং জীবন-জীবিকার কৌশল অবলম্বনে/ নির্বাচনে যেমনÑ জমিসংক্রান্ত  বিষয়ের জন্য  ভূমি  অফিস, ভূমি আইন।
কাজেই সরকারি-বেসরকারি এসব প্রতিষ্ঠান ও নীতিমালা না জানলে কৃষকদের অধিকার কী, কিভাবে সরকারি প্রশাসনযন্ত্র কাজ করে তা জানা যাবে না। সেজন্য জানতে হবে কোন প্রতিষ্ঠান কি কাজ করে, কী তাদের ভূমিকা, কি তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য, কিভাবে তারা তাদের  দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে, কার্যকর করে। সেগুলো কী নীতিমালা বা আইনে বলা আছে? প্রতিষ্ঠানগুলো কী তাদের মানবিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে  সচেতন? বিভিন্ন দলের মধ্যে সম্পর্ক কী রকম? এসব কিছু জানতে হলে এদের সঙ্গে সংযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তাহলেই বুঝা যাবে কোন প্রতিষ্ঠান কী সেবাটা দেয়, তার চালিকাশক্তি কী? এগুলো জেনে সেবা গ্রহণ করতে হবে সদস্যদের জন্য। তখনই কৃষক সংগঠনের সদস্যরা বলতে পারবেন নীতিমালার কোথায় কী সংযোজন করা দরকার কোনটা বাতিল করা দরকার।
এ সংযোগ সৃষ্টি করতে না পারলে সহজলভ্য সেবাদানের উৎসগুলো সম্পর্কে জানা যাবে না, সেবাও গ্রহণ করা হবেনা। আবার নীতিমালা না জানলেও সেবা গ্রহণের সুযোগ আছে কিনা তা জানা যাবে না। উভয় ক্ষেত্রেই যদি নীতিমালায় কোনো পরিবর্তন আনা দরকার তার জন্য অ্যাডভোকেসিও করা যাবে না।
প্রায়শই দেখা যায়, কৃষকরা জানে না যে, কোথায় গেলে কি সেবা পাওয়া যাবে! যদিও সরকারি সেবা বিষয়ক তথ্যগুলো প্রতিটি সেবাদানকারী সংস্থার যার যার নাগরিক সনদে বিবৃত আছে কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে সঠিক সংযোগ গড়ে না ওঠায় প্রান্তিক কৃষকরা এসব সেবা প্রাপ্তিতে বঞ্চিত হয়।
সরকারি সম্প্রসারণ সংস্থাসমূহের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তোলার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে কৃষির উন্নয়নে বা বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় কৃষক সংগঠনের অংশগ্রহণ। যেহেতু কৃষক সংগঠন স্থানীয় কৃষি, এর প্রতিকূলতা ও ঝুঁকিসমূহ এবং ঝুঁকি প্রশমনে করণীয় সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল, কাজেই কৃষি বিষয়ক যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সংগঠিত কৃষকের প্রতিনিধিত্ব জরুরি।  এজন্য ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে কৃষি সম্পর্কিত যেসব কমিটি আছে (কৃষি কমিটি, জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি, কৃষি খাসজমি বন্দোবস্ত কমিটি, কৃষি পুনর্বাসন কমিটি, মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি) সেগুলোতে সংগঠিত কৃষকদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর সঙ্গে সব পর্যায়ে সংযোগ রক্ষা করা প্রয়োজন।  
সরকারি সংস্থাসমূহের মতো বেসরকারি খাতের সঙ্গেও একটা লাভ-লাভ (উইন-উইন) সম্পর্ক স্থাপনে কৃষক সংগঠনগুলোকে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে। যখন একটি সংগঠনে সদস্যদের মাঝে দৃঢ় বন্ধন গড়ে ওঠে, তারা একত্রে সিদ্ধান্ত নেয় এখন থেকে আমরা আর ‘জনে জনে উপকরণ কিনব না, জনে জনে উৎপাদিত ফসল বেচবো না’ তখনই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে লাভজনক সংযোগের প্রয়োজন হয়। একসঙ্গে যখন বড় ধরনের চাহিদা তৈরি হয় অর্থাৎ একটি কৃষক সংগঠন যখন বেসরকারি উপকরণ কোম্পানির কাছে একেকটি বাজার হিসেবে গণ্য হয়, কোম্পানিগুলো তখন তার প্রয়োজনেই একটা আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়। এতে উপকরণের গুণগতমান যেমন নিশ্চিত করা যায় তেমনি ন্যায্যমূল্যও পাওয়া যায়।

মাহমুদ হোসেন*  ড. ইমানুন নবী খান**
* ন্যাশনাল টিম লিডার, আইএপিপি-টিএ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ** প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, আইএপিপি-টিএ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা

 

 


Share with :

Facebook Facebook