কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

টেকসই ও গতিশীল কৃষক সংগঠন গড়তে মাঠ সম্প্রসারণ কর্মীদের ভূমিকা

বাংলাদেশের কৃষি এবং মাঠ ফসলের (ধান, মাছ, গবাদিপশু পাখি বা সবুজ বন) অতন্দ্র প্রহরী হচ্ছেন একজন আদর্শ মাঠ সম্প্রসারণ কর্মী। মাঠ পর্যায়ের যে কোনো সমস্যায় যে কোনো শ্রেণীর কৃষকের সর্বপ্রথম যোগাযোগ বিন্দু হচ্ছেন তিনি কখনো উপদেষ্টা হয়ে, কখনো বা বন্ধু হয়ে। সম্প্রসারণ সংস্থাগুলো (কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ বা বন) ঐতিহাসিকভাবে এ মাঠকর্মীদের মাধ্যমে গবেষণালব্ধ বিভিন্ন প্রযুক্তি, ফলাফল বা জ্ঞান কৃষককূলে জনে জনে বা দলে হস্তান্তর ও বিস্তার করে আসছে। যদিও প্রথাগত এ একমুখী সম্প্রসারণ বা যোগাযোগ ব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত বা পরিকল্পনা প্রণয়নে কৃষকদের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। তবে সম্প্রতি সম্প্রসারণ সংস্থাসমূহের নীতিমালায় কৃষিতে বিদ্যমান স্থানীয় সমস্যার সমাধানে এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও জ্ঞানের বিস্তার তথা সার্বিক গ্রামীণ উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নের বিভিন্ন স্তরে কৃষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। অর্থবহ এসব নীতিমালায় কৃষি উন্নয়ন পরিকল্পনায় কৃষকদের অংশগ্রহণের পূর্বশর্ত হিসেবে তাদের ছোট ছোট দলে সংগঠিত হতে এবং ছোট দল বড় দলে জোটভুক্ত হওয়ার প্রতি দিক নির্দেশনা আছে। অতি সম্প্রতি প্রণীত খসড়া জাতীয় কৃষি সম্প্রসারণ নীতি-২০১৫ এর উদ্দেশ্য (মিশন স্টেটমেন্ট) হিসেবে বলা আছে- ‘টেকসই কৃষি, কৃষি ব্যবসা এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নে কৃষক দল ও  ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা এবং জাতীয় পর্যায়ে তাদের জোটের মাধ্যমে সব শ্রেণীর কৃষক, উৎপাদক, কৃষিতে নিয়োজিত ছোট ও মাঝারি উদ্যেক্তাগণকে দক্ষ এবং কার্যকর বিকেন্দ্রীভূত চাহিদামাফিক সমন্বিত সম্প্রসারণ সেবা প্রদান করা, যাতে তারা তাদের সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারে সক্ষম হতে পারে।’

যদিও অধিকাংশ সম্প্রসারণ সংস্থা বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় মাঠ সম্প্রসারণ কর্মীদের মাধ্যমে কৃষক দল গঠন করছে কিন্তু এদের বেশির ভাগই কৃষি প্রদর্শনী, প্রশিক্ষণ বা উপকরণ সরবরাহের নিমিত্তে গড়া। ফলে কৃষক দলগুলো একটি স্বাধীন ও টেকসই প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণে দক্ষ হওয়ার পরিবর্তে প্রকল্পের উপকারভোগী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে ও সেবা হস্তান্তরের (প্রশিক্ষণ, উপকরণ ইত্যাদি) মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। নতুন কৃষি সম্প্রসারণ নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়ন অনেকাংশেই নির্ভর করছে এ দৃষ্টিভঙ্গির (অথবা এ পদ্ধতির আমূল) পরিবর্তনের ওপর, অর্থাৎ কৃষক সংগঠনসমূহকে উপকারভোগী হিসেবে অবজ্ঞা না করে বরং উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা। এক্ষেত্রে এসব সংগঠনের সক্রিয় সহায়ক হবে মাঠ সম্প্রসারণ কর্মীরা যাদের দক্ষতা বৃদ্ধিও আলোচ্য নীতিমালার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ (অনুচ্ছেদ ৬ : সম্প্রসারণ কর্মীদের সক্রিয় এবং পথনির্দেশক ভূমিকা, পৃষ্ঠা ১৩, খসড়া জাতীয় কৃষি সম্প্রসারণ নীতিমালা-২০১২)। এ নীতিমালা অনুসারে সমশ্রেণীর কৃষকদের সংগঠিত করতে মাঠ সম্প্রসারণ কর্মীদের ভূমিকা হবে ‘একজন সহায়ক-পরিচালক বা নিয়ন্ত্রক নয়’। অর্থাৎ একটি শক্তিশালী কৃষক সংগঠনের মূলনীতিসমূহ দৃঢ়ভাবে প্রয়োগের জন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হবে মাঠকর্মীর অন্যতম কাজ। এসব মূলনীতিসমূহ হচ্ছে- ১. কৃষক সংগঠনের স্বশাসন এবং সুশাসন; ২. সর্বজনস্বীকৃত কৃষক নেতৃত্ব; ৩. দৃঢ় সদস্যভিত্তি/সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ; ৪. সংগঠন কর্তৃক সদস্যদের চাহিদাভিত্তিক সেবাপ্রদান; এবং ৫. সংগঠনের জন্য একটি সুস্পষ্ট এবং স্বীকৃত উদ্দেশ্য।

সম্প্রতি (২০১৩) জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের কৃষক সংগঠন : বর্তমান অবস্থা চিত্রায়ন এবং দক্ষতা যাচাই’ শীর্ষক সমীক্ষায় বাংলাদেশে প্রায় দুই লাখ নানামাত্রিক কৃষক দল চিহ্নিত করা হয়েছে। তন্মধ্যে শতকরা ৮১ ভাগ সংগঠন সরকারি সহায়তায়, শতকরা ১৪ ভাগ জাতীয় পর্যায়ের এনজিও সহায়তায়, শতকরা ৫ ভাগ আন্তর্জাতিক এনজিও সহায়তায় এবং স্বল্পসংখ্যক (০.০১%) মাত্র ১২টি সংগঠন পাওয়া গেছে যারা স্বাধীনভাবে গড়ে উঠেছে। শতকরা মাত্র ২ ভাগ সংগঠনকে কোনো না কোনো পর্যায়ে জোটভুক্ত হতে দেখা গেছে। সমীক্ষা মতে এসব কৃষক সংগঠন সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এবং বিনিয়োগ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত তিনটি বাধার সম্মুখীন হচ্ছে-
কৃষক সংগঠনের একটা বৃহত্তর অংশ ক্ষুদ্র (গোষ্ঠী/সমাজভিত্তিক পর্যায়ে) এবং বিচ্ছিন্ন
বেশির ভাগ কৃষক সংগঠন সরকারি সংস্থা, এনজিও এবং প্রকল্প সহায়তাপুষ্ঠ
শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মূলনীতিসমূহ দৃঢ়ভাবে প্রয়োগ করা হয় না
এ বাধাসমূহ অতিক্রম করার জন্য সমীক্ষাটি বিভিন্ন সুপারিশ পেশ করে, তন্মধ্যে কৃষক সংগঠনের সঙ্গে যারা প্রত্যক্ষভাবে কাজ করে, অর্থাৎ কৃষি সম্প্রসারণ মাঠকর্মীদের সহায়ক হিসেবে দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেয়া হয়। ফলে একটি টেকসই ও গতিশীল কৃষক সংগঠন গড়তে সহায়ক হিসেবে সম্প্রসারণ কর্মীদের সক্ষমতা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। বিশেষ করে দল গঠনের পূর্ববর্তী কাজসমূহ যেমন- অংশগ্রহণমূলক স্থানীয় সমস্যা চিহ্নিতকরণ, উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠী চিহ্নিতকরণ, দরিদ্র-প্রান্তিক কৃষকদের শনাক্ত করা, কৃষক সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ অনুশীলন, সংগঠনের সদস্যদের ক্ষমতায়ন, সংগঠনের মূল্যবোধ বিকশিত করার মতো বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া ইত্যাদি বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা অত্যাবশ্যক।
একটি কার্যকর কৃষক সংগঠন গড়ে তুলতে বা কোনো দুর্বল সংগঠনকে গতিশীল করতে সহায়ক হিসেবে মাঠ সম্প্রসারণ কর্মীকে সর্বপ্রথম ওই সংগঠন যে এলাকায় কাজ করবে বা করে সেটির স্থানীয় প্রেক্ষাপট জেনে নিতে হবে। অর্থাৎ সংগঠন যে গ্রামে বা ইউনিয়নে কাজ করে তার আর্থসামাজিক অবস্থা, প্রাকৃতিক সম্পদ, অবকাঠামো, প্রতিষ্ঠানাদি, কৃষিতে বিদ্যমান সমস্যা ও জনগণের মতামতে সমস্যার সমাধান, ইত্যাদি বিষয়ে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল হতে হবে। স্থানীয় এসব প্রেক্ষাপটের বিশদ তথ্য আহরণে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করা হয়, যেমন-ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার (individual interview), দলীয় আলোচনা (Focus Group Discussion), প্রাথমিক পরিদর্শন (Reconnaissance Visit) ইত্যাদি। তন্মধ্যে অংশগ্রহণমূলক গ্রামীণ সমীক্ষা বা Participatory Rural Appraisal (PRA) এর বিভিন্ন টুল্স বা হাতিয়ার এর ব্যবহার সমাজ বিজ্ঞানীদের কাছে সর্বাধিক জনপ্রিয়।
বাংলাদেশের কৃষকগণ স্মরণাতীত কাল থেকে কৃষিতে তাদের অস্তিত্বের প্রয়োজনে নিজেদের মেধা এবং উদ্ভাবনী শক্তির মাধ্যমে নানা প্রতিকূলতা নিরসনে সব মিলে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এবং তার সফল বাস্তবায়নও করতে পেরেছে। তাই যে কোনো স্থানীয় জ্ঞান আহরণে, সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও তার সমাধানে, কৃষি বিষয়ক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে তাদের সেই অভিজ্ঞতাকে বাদ দিয়ে কিভাবে তাদের জন্য পরিকল্পনা করি? আমাদের মনগড়া কৃষক দল অথবা চাপিয়ে দেয়া পরিকল্পনাও বা কিভাবে তাদের কাজে লাগবে? তাই কৃষক সংগঠন গড়তে সর্বপ্রথম প্রয়োজন একদল সমশ্রেণীর কৃষক যাদের সমস্যা একই ধরনের। আর এ সমশ্রেণীর কৃষক চিহ্নিতকরণ, তাদের সমস্যা নিরূপণ ও সম্ভাব্য সমাধানে অংশগ্রহণমূলক গ্রামীণ সমীক্ষা বা PRA গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
স্থানীয় জনসাধারণের অংশগ্রহণে কোনো নির্দিষ্ট গ্রাম-এলাকা সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ, কৃষির সমস্যা চিহ্নিতকরণ, সমাধানের সম্ভাব্য উপায়, কৃষকের চাহিদা নিরূপণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন করার সমন্বিত একটি পদ্ধতি হচ্ছে চজঅ। অর্থাৎ যাদের জন্য উন্নয়ন প্রয়োজন তাদের মাধ্যমেই সমস্যা চিহ্নিতকরণ, বিশ্লেষণ ও সমাধান নির্ণয় করাকেই চজঅ বলা হয়। এজন্য যারা মাঠ সম্প্রসারণ কর্মী হিসেবে কাজ করছেন তাদের PRA এবং এর বিভিন্ন টুল্সের প্রয়োগ পদ্ধতি সম্পর্কে দক্ষ হতে হবে। মাঠপর্যায়ে কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে PRA পদ্ধতি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। যেহেতু একটি টেকসই কৃষক সংগঠন গড়ে ওঠে নির্দিষ্ট কোনো সমস্যা সমাধানের তাগিদে বিশেষ করে যেসব সমস্যা তাদের সবাইকেই প্রভাবিত করে, যা এককভাবে সমাধান করা যায় না। মাঠ সম্প্রসারণ কর্মীগণ স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে PRA এর বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে কৃষিতে তাদের সাধারণ সমস্যা চিহ্নিত করে তার সমাধানে সমবেতভাবে সমশ্রেণীর কৃষকদের নিয়ে একটি কৃষক দল গড়ে তুলতে পারেন।

যে কোনো সম্প্রসারণ কর্মী দল গঠনের জন্য কোনো গ্রামে প্রবেশ করেন তখন তার সর্বপ্রথম কাজ হবে জনগণের সঙ্গে আন্তরিকভাবে সম্পর্ক স্থাপন (Rapport building)। এটি হতে পারে কোনো হাটে, বাজারে, চায়ের দোকানে বা লোকসমাগম হয় এমন স্থানে জনগণের সঙ্গে মিশে যাওয়া। মাঠ সম্প্রসারণ কর্মী জনগণের সঙ্গে পরিচিত হবেন, নিজের পরিচয় দেবেন, আসার উদ্দেশ্য বলবেন, গ্রামটিকে ঘুরে ফিরে দেখতে গ্রামের জনগণের সহায়তা চাইবেন। একটি গ্রামে প্রবেশের পর জনগণকে বুঝাতে হবে যে বাংলাদেশের গ্রাম, কৃষি ও সমাজকে আপনাদের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করব, এ গ্রামে কয়টি পাড়া আছে, কৃষিতে কতভাগ পরিবার যুক্ত আছেন, কী কী কৃষি কাজ হয়, এ গ্রামে কৃষির মূল সমস্যা কী, এখানে কৃষকদের কোনো সংগঠন আছে কি না, না থাকলে কৃষক ও কৃষির সমস্যাকে মোকাবিলা করার জন্য কৃষকরা কিভাবে সংগঠিত হতে পারে, কেনই বা এখানে কৃষকরা অতীতে সংগঠিত  হননি, সংগঠিত হওয়ার সুফল ও প্রতিকূলতা/বাধাসমূহ ইত্যাদি বিষয়ে আমরা এ গ্রামের নানা শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে কথা বলব। যে কয়জনের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক সৃষ্টি হবে তাদের বলতে হবে যে আপনাদের গ্রামকে, গ্রামের কৃষি ও সমাজকে বুঝতে আমরা আপনাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে কতগুলো পদ্ধতি অনুসরণ করে করব। এ পদ্ধতিকে অংশগ্রহণমূলক গ্রামীণ সমীক্ষা (PRA) বলে। আলাপের ফাঁকে নিম্নের উদাহরণে ব্যবহৃত সমাজমিতির (sociometry) অনুশীলনটি করা যেতে পারে:

সম্ভাবনাময় নেতা চিহ্নিতকরণ : সোসিওমেট্রি/সমাজমিতি পদ্ধতি
গ্রামের কোনো একটি চায়ের দোকানে বা বাজারে বা লোকসমাগম হয় এমন কোন স্থানে সাধারণ গল্প বা আলোচনার ফাঁকে কয়েকজনকে নিম্নের প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করুন:
ক. আমি এ গ্রামে নতুন এসেছি। অনুগ্রহ করে আপনি কি আমাকে এ গ্রামের তিনজন নেতার নাম বলবেন? (গ্রামের সাধারণ জনগণ একবাক্যে যাদের নেতা হিসেবে চিহ্নিত করেন তারা হচ্ছেন অবস্থানগত নেতা (opinion leader), যারা রাজনৈতিক কোনো মতাদর্শের হতে পারেন এবং বর্তমানে গ্রামে নেতৃত্বদানকারী অবস্থানে আছেন)। প্রশিক্ষণার্থীরা তাদের নাম নোটে লিখে রাখবে।

খ. এবার আপনি আমাকে এমন কয়েকজন কৃষকের নাম বলুন কৃষি বিষয়ে যার মতামত বা ধারণা সাধারণ কৃষক এমনকি সমাজ নেতারাও  আমলে নেন, (তারা হচ্ছেন মতামত প্রদানকারী নেতা (opinion leader), তবে আর্থসামাজিক বিন্যাস অনুসারে এ ধরনের নেতৃত্ব বিভিন্ন স্তরে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, কাজেই সেভাবে প্রশ্ন করে উত্তর নিতে হবে)। তবে কোনো কোনো গ্রামে কখনো কখনো এ ধরনের মতামত প্রদানকারী কৃষক ভিন্ন ভিন্ন না হয়ে একজনও হতে পারে যার  নিকট সব শ্রেণীর কৃষকরাই গিয়ে থাকেন।
১. প্রান্তিক, বর্গা ও ভূমিহীন কৃষকদের মতামত প্রদানকারী নেতা ----------------------------------------------------
২. ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের মতামত প্রদানকারী নেতা --------------------------------------------------------------
৩. বড়-ধনী কৃষকদের মতামত প্রদানকারী নেতা -------------------------------------------------------------------
ধারণা সূত্র : শংকরিয়া চামালা ও পিএম সিঙ্গি, ১৯৯৭, Improving agricultural extension: a reference manual, FAO and the International Program for Agricultural Knowledge System (INTERPAKS), College of Agricultural, Consumer, and Environmental Sciences, University of Illinois at Urbana-Champaign, United States.
ওপরের সমাজমিতি পদ্ধতি অনুসারে মাঠ সম্প্রসারণ কর্মী এ গ্রামে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, ভূমিহীন/বর্গা কৃষকরা কৃষির বিভিন্ন সমস্যায় যাকে সবচেয়ে আগে স্বার্থহীনভাবে কাছে পান সে ধরনের মতামত প্রদানকারী নেতা চিহ্নিত করতে পারবে। এভাবে জনগণের মতামতে চিহ্নিত মতামত প্রদানকারী নেতার কাছে থেকে স্থানীয় কৃষির সম্ভাবনা, সমস্যা, সমাধান ইত্যাদি বিষয়ে সম্যক ধারণা নিয়ে কৃষকদের সঙ্গে PRA  অনুশীলন শুরু করা যেতে পারে। এতে সহায়ক হিসেবে মাঠ সম্প্রসারণ কর্মী স্থানীয় কৃষকদের অনেক বিষয় বুঝতে পারবেন।

কৃষক সংগঠন গড়ার আগে সচরাচর যেসব PRA টুল্স/কৌশল ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে পরিভ্রমণ, ভৌত মানচিত্র, সামাজিক মানচিত্র, চাপাতি চিত্র, প্রাতিষ্ঠানিক বৃত্তান্ত, ঋতু চিত্র, শস্যবিন্যাস চিত্র, বিবর্তনের ধারা বিশ্লেষণ, সময় চিত্র, উৎপাদন প্রবাহ চিত্র, সমস্যা অনুক্রম ছক, পছন্দ অনুক্রম ছক, স্থানীয় কারিগরি জ্ঞান ইত্যাদি। তন্মধ্যে সময়, উদ্দেশ্য বিবেচনায় রেখে অত্যাবশ্যকীয় ৫টি PRA কৌশলের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি নিম্নে দেয়া হলো-

কৌশল

যেসব তথ্য সংগ্রহের জন্য ব্যবহার করা হয়

ব্যবহার পদ্ধতি

কখন করা হয়

পরিভ্রমণ/ Transect walk

ভূমির ধরন (উঁচু, মধ্যম, নিচু), মাটির ধরন, ভূমির ব্যবহার : ফসলি জমি ও শস্যবিন্যাস,  জলাভূমি (পুকুর, নদী, খাল, বিল ইত্যাদি) গাছপালা, গো-চারণভূমি, মানব বসতি এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের অবস্থান চিত্রায়ন

নির্বাচিত গ্রামটির একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত পর্যন্ত হাঁটতে হবে এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ এর মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদসমূহ চিহ্নিত করতে হবে। হাঁটার সময় অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে রাখলে জানতে ও বুঝতে সুবিধা হয়।

গ্রামে কাজ করার শুরুতেই।

সামাজিক মানচিত্র/ Social Mapping

গ্রামের সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহ যেমন- স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ-মন্দির-গির্জা, খানার বিস্তৃতি, হাটবাজার, দোকানপাট, উপকরণের দোকান, পুকুর বা জলাশয়, বাঁধ ইত্যাদির আপেক্ষিক অবস্থান প্রদর্শন

১০-১২ জন নারী-পুরুষের  ছোট দলে গ্রামটি ঘুরে দেখতে হবে এবং ভৌত সম্পদসমূহ চিহ্নিত করে ফিরে এসে একটি নির্দিস্ট ছায়াঘেরা স্থানে বসতে হবে এবং দলের সবার সহযোগিতায় মাটিতে বড় কাগজে মানচিত্রটি আঁকতে হবে।

পরিভ্রমণ এর পরপরই এ কাজটি করে নিতে হবে।

আর্থিক সচ্ছলতার স্তর বিন্যাস Wealth Ranking

সম্পদের ভিত্তিতে গ্রামের জনগণের স্তর বিন্যাস। এ অনুশীলনের মাধ্যমে গ্রামের ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, ভূমিহীন ও বর্গা কৃষকদের তালিকা তৈরি করা যায়, যা পরবর্তীতে এ শ্রেণীর কৃষকদের নিয়ে সংগঠন গড়ে তুলতে সদস্য প্রোফাইল হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

১০-১২ জন নারী-পুরুষের  ছোট দলে সবার মতামতের ভিত্তিতে গ্রামের সব শ্রেণীর কৃষকদের (ধনী, মাঝারি, ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষক) খানা চিহ্নিত করা এবং বিশ্লেষণমূলক ছক তৈরি করা। এ অনুশীলনের মাধ্যমেই ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করা যায়। 

সামাজিক মানচিত্রের পরের ধাপে এ কাজটি করে নিতে হবে।

কৃষি বিষয়ক সমস্যা ও সমাধান  চিহ্নিতকরণ

স্থানীয় কৃষির সমস্যাসমূহ যেমন- উপকরণে, উৎপাদনে, ফলন পরবর্তী প্রক্রিয়াজাতকরণে, বাজারজাতকরণে এবং অর্থ, প্রযুক্তি ও তথ্য প্রাপ্তি, ইত্যাদি চিহ্নিতকরণ এবং সম্ভাব্য সমাধানসমূহ  গুরুত্ব অনুসারে নিরূপণ। এসব সমস্যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের  প্রভাবিত করে। এবং এসব সমস্যা সমাধানের পথ হিসেবেই কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়।

১০-১২ জন নারী-পুরুষের  ছোট দলে সবার মতামতের ভিত্তিতে গ্রামের ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের  কৃষি বিষয়ক বিভিন্ন সমস্যা ও তার সমাধান চিহ্নিত করা এবং বিশ্লেষণমূলক ছক তৈরি করা। 

Wealth Ranking ধাপে এ কাজটি করে নিতে হবে।

চাপাতি চিত্র/ Venn Diagram

কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ঋণপ্রদানকারী সেবা প্রতিষ্ঠান ও  স্থানীয় দল  (যেমন কৃষক দল) চিহ্নিত করা, এসব প্রতিষ্ঠান হতে গ্রামের জনগণের সেবা গ্রহণের শতকরা হার নির্ণয়

১০-১২ জন নারী-পুরুষের  ছোট দলে সবার মতামতের ভিত্তিতে ছোট বড় চাপাতির মাধ্যমে উল্লিখিত সামাজিক প্রতিষ্ঠান হতে শতকরা সেবা গ্রহণের চিত্র আঁকতে হবে।

Wealth Ranking পরের ধাপে এ কাজটি করে নিতে হবে।

প্রতিষ্ঠান বৃত্তান্ত/  Institutional Profile

চাপাতি চিত্রে চিহ্নিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের একটি বিশ্লেষণমূলক চিত্র প্রণয়ন যাতে এসব প্রতিষ্ঠানের সেবাসমূহ, সেবা প্রদানে সমস্যা, সমস্যা সমাধানের উপায়। এ সেশনে সহায়ক এ গ্রামে কোন কৃষক সংগঠন আছে কিনা তা ভালো করে যাচাই করে নেবেন এবং থাকলে কৃষক সংগঠনের জন্যও অনুরূপ বিশ্লেষণমূলক তথ্যাদি আহরণ করবেন।

১০-১২ জন নারী-পুরুষের  ছোট দলে সবার মতামতের ভিত্তিতে ছক আকারে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নাম, মূল সেবা, সেবা প্রদান ও গ্রহণে সমস্যা, সমস্যা সমাধানের উপায় নিয়ে আলোচনা করবেন। কৃষক সংগঠন থাকলে সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে আলাদাভাবে দলীয় আলোচনা নির্দিষ্ট চেকলিস্ট অনুযায়ী করতে হবে

চাপাতি চিত্রের পরের ধাপেই এ কাজটি করে নিতে হবে।

ড. ইমানুন নবী খান*  মাহমুদ হোসেন**

*প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, আইএপিপি-টিএ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ** ন্যাশনাল টিম লিডার, আইএপিপি-টিএ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা

 


Share with :

Facebook Facebook