কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (BJRI) (মাঘ ১৪২৩)

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) দেশের অন্যতম প্রাচীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান। বিগত ১৯৩৬ সালে ইন্ডিয়ান সেন্ট্রাল জুট কমিটির (ICJC) আওতায় ঢাকায় জুট এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এদেশে পাটের গবেষণা শুরু হয়। ১৯৫১ সালে ইন্ডিয়ান সেন্ট্রাল জুট কমিটির (ICJC) স্থলে পাকিস্তান সেন্ট্রাল জুট কমিটি (PCJC) গঠিত হয় এবং বর্তমান স্থানে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপিত হয় ১৯৫১ সালে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৪ সালে এ্যাক্টের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় বর্তমান বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট। বিজেআরআই মূলত তিনটি ধারায় তার গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে ১. পাটের কৃষি পাটজাতীয় আঁশ ফসলের উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন, এর উৎপাদন ব্যবস্থাপনা এবং বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ সংক্রান্ত গবেষণা, ২. পাটের কারিগরি তথা প্রচলিত পাট পণ্যের মান উন্নয়ন এবং মূল্য সংযোজিত বহুমুখী নতুন নতুন পাট পণ্য উদ্ভাবন সংক্রান্ত গবেষণা এবং ৩. পাট ও তুলার সংমিশ্রণে বহুমুখী পাট পণ্য উৎপাদনের গবেষণা। বর্তমানে পাটের কৃষি গবেষণায় ৬টি, কারিগরি গবেষণায় ৪টি গবেষণা বিভাগ, জুট টেক্সটাইল গবেষণায় ১টি গবেষণা বিভাগ এবং পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও যোগাযোগ বিভাগসহ মোট ১২টি বিভাগ রয়েছে। কৃষককের সময়োপযোগী চাহিদা ও প্রয়োজন মোতাবেক অঞ্চল ভিত্তিক পাটের কৃষি গবেষণার জন্য মানিকগঞ্জে পাটের কেন্দ্রীয় কৃষি পরীক্ষণ কেন্দ্র এবং রংপুর, ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ ও চান্দিনায় (কুমিল্লা) চারটি পাট গবেষণা আঞ্চলিক কেন্দ্র এবং তারাবো (নারায়ণগঞ্জ), মনিরামপুর (যশোর) ও কলাপাড়ায় (পটুয়াখালী) তিনটি পাট গবেষণা উপকেন্দ্র এবং নসিপুরে (দিনাজপুর) একটি প্রজনন বীজ উৎপাদন  ও গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। উল্লেখ্য, পাট, কেনাফ ও মেস্তা ফসলের দেশি, বিদেশি বীজ সংরক্ষণ ও উন্নত জাত উদ্ভাবনে গবেষণা কাজে ব্যবহারের জন্য তৎকালীন ইন্টারন্যাশনাল জুট অর্গানাইজেশনে (IJO) সহযোগিতায় ১৯৮২ সালে বিজেআরআইতে একটি ‘জিন ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ জিন ব্যাংকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত পাট ও সমগোত্রীয় আঁশ ফসলের প্রায় ৬০০০ জার্মপ্লাজম সংরক্ষিত আছে। বর্তমান সরকারের বিগত মেয়াদ হতে পাটের গবেষণা এবং পাট উৎপাদন প্রযুক্তি সম্প্রসারণে অধিক পরিমাণে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এর ফলে দেশে নতুন নতুন উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন এবং পাট আঁশ ও বীজ উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হচ্ছে। ২০০৮-২০০৯ সাল থেকে অদ্যাবধি বিজেআরআইতে যসব গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। তাহলো-
পাটের জীবন রহস্য
(Genome sequencing) উন্মোচন : জীব প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বে সর্বপ্রথম দেশি ও তোষা পাটের জীবন রহস্য (Genome Sequencing) আবিষ্কার করা হয়েছে এবং পাটসহ পাঁচশতাধিক ফসলের ক্ষতিকারক ছত্রাক Macrophomina phaseolina এর জীবন রহস্য উন্মোচন করা হয়েছে। উন্মোচিত জেনোম তথ্য ব্যবহার করে উচ্চফলনশীল, বিভিন্ন প্রতিকূলতা সহনশীল এবং পণ্য উৎপাদন উপযোগী পাট জাত উদ্ভাবনের জন্য বর্তমান সরকার ‘পাট বিষয়ক মৌলিক ও ফলিত গবেষণা’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ আবিষ্কারের ফলে পাটের বিভিন্ন প্রতিকূলতা (Stress) সহনশীল (লবণাক্ততা, খরা, বিভিন্ন পোকামাকড় ও রোগজীবাণু সহনশীল), কম লিগনিন সমৃদ্ধ উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় ২৫% জমি লবণাক্ততার কারণে পতিত থাকে। এছাড়া উত্তরাঞ্চলের একটি ব্যাপক এলাকা খরাপ্রবণ। প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে ওই সব পতিত জমিতে পাট চাষ সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে। ফলে পতিত-ব্যবহার অনুপযোগী জমি আবাদের আওতায় আসবে। এছাড়া কম লিগনিন সমৃদ্ধ জাত উদ্ভাবন সম্ভব হলে বস্ত্র শিল্পে তুলার বিকল্প হিসাবে অথবা তুলার সাথে সংমিশ্রণে পাটের ব্যবহারে প্রভূত উন্নতি সাধিত হবে।   
পাট ও
Macrophomina phaseolina এর জেনোম তথ্য থেকে মেধাসত্ত্ব (IPR) অর্জনের জন্য ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের ১২টি দেশে ৭টি আবেদন জমা দেয়া হয়েছে।
জেনোম গবেষণার মাধ্যমে ফসলের কাক্সিক্ষত জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্যে বিজেআরআই এ আন্তর্জাতিক মানের একটি ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে যা প্রথমত পাট এবং পরবর্তিতে অন্যান্য ফসলের উন্নয়নে ব্যবহার করা যাবে।
নতুন জাত ও কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন : পাট ও পাট জাতীয় আঁশ ফসলের ৭টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এর মধ্যে তোষা পাটের ২টি (বিজেআরআই তোষা পাট-৫, বিজেআরআই তোষা পাট-৬), দেশি পাটের ৩টি (বিজেআরআই দেশি পাট-৭, বিজেআরআই দেশি পাট-৮ ও বিজেআরআই দেশি পাট শাক-১), কেনাফের ১টি (বিজেআরআই কেনাফ-৩) এবং মেস্তার ১টি (বিজেআরআই মেস্তা-২)। উদ্ভাবিত জাতগুলো কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারিত হলে পাটের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া পাট পচনের আপদকালীন প্রযুক্তি হিসেবে পাওয়ার রিবনার, স্বয়ংক্রিয় জুট রিবনার, শীতকালীন সবজির সাথে পাট বীজ উৎপাদন, কৃষি বনায়ন পরিবেশে নাবি পাট বীজ উৎপাদন, নিম পাতার রস দিয়ে পাটের হলুদ মাকড় দমন এবং বাটা রসুনের সাহায্যে পাট বীজ শোধন শীর্ষক কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে।  
শিল্প প্রযুক্তি উদ্ভাবন : স্বল্প মূল্যের হালকা পাটের শপিং ব্যাগ, প্রাকৃতিক উৎস থেকে রঙ আহরণ করে পাটপণ্য রঞ্জন পদ্ধতি, পাটজাত শোষক তুলা, অগ্নিরোধী পাট বস্ত্র, জুট-প্লাস্টিক কম্পেজিটসহ ৬টি নতুন পাট পণ্য প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন করা হয়েছে এবং সিনথেটিক উলের বিকল্প পাট উল ও পাট উলজাত সোয়েটার, পাট তুলা ও পাট তুলাজাত, সেনিটারি ন্যাপকিন, বেবি ন্যাপকিন, বিভিন্ন ইনসুলেটিং ম্যাটেরিয়াল, পাট এবং তুলার সংমিশ্রণে তৈরি বিভিন্ন পাটজাত টেক্সটাইল পণ্য যেমন পর্দার কাপড়, বেড কভার, সোফা কভার, জিন্স ইত্যাদি পণ্যের মান উন্নয়ন করা হয়েছে।
প্রযুক্তি হস্তান্তর
পাট আঁশ ও বীজ উৎপাদন, রিবন রেটিং পদ্ধতি, কৃষি বনায়ন পরিবেশে নাবি পাটবীজ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ও অন্যান্য কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণের জন্য ২১০০০ জন পাটচাষি, ৭০০০ জন সম্প্রসারণ কর্মী এবং ১০০০ জন সম্প্রসারণ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। এর ফলে পানি স্বল্প এলাকায় পাট পচন প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে উন্নতমানের পাট উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পাট বীজ উৎপাদনে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে;
বহুমুখী পাট পণ্য উৎপাদন প্রযুক্তি বিষয়ে ১০০০ জন পাট পণ্য উৎপাদন কর্মী এবং ৩০০ জন উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে;
রিবন রেটিং পদ্ধতি সম্প্রসারণের জন্য ৩০০০টি রিবনার বিনামূল্যে কৃষককের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় আরও ৩০,০০০টি রিবনার বিনামূল্যে কৃষককের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে।  এছাড়া মান সম্পন্ন পাটপণ্য উৎপাদন, রঞ্জন, ডিজাইন প্রযুক্তি সম্প্রসারণের জন্য ২০০০ জন পাটপণ্য উৎপাদন কর্মীকে প্রশিক্ষণ প্রদান;
রাস্তার মাটিধস, নদীর বাঁধ ও পাহাড়ের ঢাল সংরক্ষণে ৪০০০০ মিটার জুট জিও টেক্সটাইল রাসায়নিক প্রক্রিয়াকরণ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং ওয়াপদাকে প্রদান।
উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন
পাটের জীবন নকশা (এবহড়সব ঝবয়ঁবহপরহম) উন্মোচনের ফলে পাটের বিভিন্ন প্রতিকূলতাসহনশীল (লবণাক্ততা, ক্ষরা, দ্রুত পচনযোগ্য, বিভিন্ন পোকামাকড় ও রোগজীবাণু সহনশীল) উচ্চফলনশীল পাট জাত উদ্ভাবনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য সরকার ১১৮২০.০০ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ‘পাটের মৌলিক ও ফলিত গবেষণা’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিকূলতাসহনশীল (লবণাক্ততা, ক্ষরা, দ্রুত পচনযোগ্য, বিভিন্ন পোকামাকড় ও রোগজীবাণু সহনশীল) উচ্চফলনশীল পাট জাত উদ্ভাবনের গবেষণা কার্যক্রম চলছে।
এছাড়া, বিজেআরআই পাট ও পাট জাতীয় ফসলের লবণাক্ততা এবং অন্যান্য প্রতিকূলতাসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন, আধুনিক পাট আঁশ ও বীজ উৎপাদন প্রযুক্তি কৃষক পর্যায়ে হস্তান্তর এবং বহুমুখী পাটজাত পণ্য হস্তান্তর ও জনপ্রিয়করণ, বিজেআরআইয়ের মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বিজেআরআইয়ের প্রধান কার্যালয় এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক উপকেন্দ্রের গবেষণাগার, প্রদর্শনী কেন্দ্র, প্রশিক্ষণ ও মাঠ গবেষণা সুবিধার উন্নয়নের লক্ষ্যে ২১৩৯.০০ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ‘পাট ও পাট জাতীয় ফসলের কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও হস্তান্তর’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।  
পাট, কেনাফ ও মেস্তার প্রজনন বীজ এবং মান ঘোষিত বীজ (TLS) উৎপাদন ও বিতরণ : বিগত সাত বছরে পাট, কেনাফ ও মেস্তার ১৪০০০ কেজি প্রজনন বীজ উৎপাদন এবং বিএডিসিসহ অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিতরণ করা হয়েছে এবং ৪৬০ টন মান ঘোষিত বীজ (TLS) উৎপাদন করে কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। এ কার্যক্রম দেশের পাট বীজের ঘাটতি মোকাবিলায় ভূমিকা পালন করেছে।  
পাটের কৃষি প্রযুক্তি এবং বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন প্রযুক্তি হস্তান্তরের লক্ষ্যে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর : পাটের বহুমুখী ব্যবহার সংক্রান্ত প্রযুক্তি এবং পাটের কৃষি প্রযুক্তি হস্তান্তরের লক্ষ্যে এনজিও এবং শিল্পোদ্দোক্তাদের সাথে ৮টি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর ফলে বাণিজ্যিকভাবে পাটপণ্য উৎপাদিত হবে এবং পাটের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করে পরিবেশ উন্নয়ন ও জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণে ভূমিকা রাখবে।
ইনস্টিটিউটের মানবসম্পদ উন্নয়ন : বিগত সাত বছরে ১৫ জন বিজ্ঞানী স্থানীয় এমএস,  ১৫ জন বিজ্ঞানী স্থানীয় পিএইচডি, ৪ জন বিজ্ঞানী  বৈদেশিক পিএইচডি এবং  ৩১ জন বিজ্ঞানী বিদেশে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে ১৬ জন বিজ্ঞানী স্থানীয় পিএইচডি, ৭ জন বৈদেশিক পিএইচডি এবং ১ জন বিজ্ঞানী বৈদেশিক এমএস লিডিং পিএইচডি অধ্যয়নরত আছেন। উচ্চশিক্ষার ফলে প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীদের জ্ঞান এবং কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

(সাত বছরের সাফল্য)

*সংকলিত, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫


Share with :

Facebook Facebook