কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

বাংলার ফলের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা

আমাদের শতাধিক ফলসমৃদ্ধ ফল ভাণ্ডারে বিভিন্ন রোগ, পোকামাকড়, ইঁদুর, বাদুড়, কাঠবিড়ালি, শিয়াল, সজারু, পেঁচা, পাখি, খরগোশ, আগাছা, পরগাছা এসব ফল ও ফলগাছের ক্ষতি করে। ক্ষতিকর এরাই বালাই। ফলের বালাই নিয়ন্ত্রণে ফলচাষিরা সাধারণত ক্ষতিকর রাসায়নিক বালাইনাশকের ওপরই বেশি নির্ভর করেন। অন্যান্য ফসলে বালাইনাশকের ব্যবহারে যতটা না জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়, ফলে বালাইনাশক ব্যবহারে ক্ষতি হয় তার চেয়ে অনেক বেশি। কেননা ফল আমরা সরাসরি গাছ থেকে পেড়ে কাঁচা ও পাকা খাই, কোনো রান্না বা প্রক্রিয়াজাত করার প্রয়োজন হয় না। তাই রাসায়নিক বালাইনাশক সরাসরি আমাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। এজন্য অন্য ফসলের আগে ফলের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা করা বেশি দরকার। কিন্তু ফলের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা যেমন জটিল তেমনি গবেষণা উদ্ভাবিত তথ্যের অভাব রয়েছে। ফলের আছে শত রকমের বালাই। ফলের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও সেজন্য খুব সহজ নয়। বিভিন্ন ফলের বালাই সুনির্দিষ্ট, কিছু নির্দিষ্ট বালাই আবার একাধিক ফলে আক্রমণ করে। সেজন্য ফলের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার কিছু সাধারণ নীতি অনুসরণ করলে বালাইমুক্ত ফল উৎপাদন করা খুব কঠিন নয়। তবুও এগিয়ে যেতে হবে।
বালাই কাকে বলে?
বালাই মানে- আপদ, বিপদ, মসিবত ও গজব। বালাই কথাটা আসলে মানুষের  সাথেও সম্পর্কিত। বালাই ফলের ক্ষতি করে ঠিকই, কিন্তু সে ক্ষতি বা পরিণতির চূড়ান্ত শিকার হয় মানুষ। সেজন্য সাধারণ অর্থে বালাই বলতে সেসব জীব ও অজীবকে বুঝায় যা মানব কল্যাণে মানুষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ক্ষতি করে। ক্ষতিকর জীবসমূহ মানুষের খাদ্যকে নষ্ট করে, আশ্রয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে, রোগের জীবাণু ছড়ায়, রোগ সৃষ্টি করে নানাবিদ সমস্যা সৃষ্টি করে। মানুষকে এমন লাখো কোটি ক্ষতিকর জীবকে মোকাবিলা করেই পৃথিবীতে টিকে থাকতে হয়। মানুষের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর জীব বা প্রাণী হলো কীটপতঙ্গ। পৃথিবীতে যত প্রাণী আছে তার প্রায় ৭৫ শতাংশ হলো পোকামাকড়। এসব পোকামাকড়ের মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশেরও বেশি মানুষ ও ফসলের জন্য ক্ষতিকর। ফলের অন্যতম ক্ষতিকর আর একটি বালাই হলো রোগ। বিভিন্ন ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, কৃমি, মাইকোপ্লাজমা, জীবাণু ফলের রোগ সৃষ্টি করে।  আগাছা পরগাছাও ফলগাছের ক্ষতি করে, ফলন কমিয়ে দেয়, রোগজীবাণু ও পোকামাকড়ের বিকল্প আশ্রয়দাতা হিসেবে কাজ করে। তাই এসব উদ্ভিদও বালাই। বিভিন্ন মেরুদণ্ডী ও অমেরুদণ্ডী প্রাণীও সম্মিলিতভাবে ফলের বালাই হিসেবে ক্ষতি করে। বিশেষ করে শিয়াল, বাদুড়, ইঁদুর, কাঠবিড়ালি, সজারু, শামুক, খরগোশ, পাখি, পেঁচা ফল খেয়ে নষ্ট করে।
ফলের বালাই কারা?
ফলের বালাই বলতে যারা ফল ও ফলগাছের ক্ষতি করে তাদের বুঝায়। একেক ফলে একেক  বালাইয়ের আক্রমণ দেখা যায়। আবার অনেক ফলে একই বালাইয়ের আক্রমণ দেখা যায়। যেমন মাজরাপোকা, জাবপোকা, ছাতরা  পোকা, কা-পচা রোগ, অ্যানথ্রাকনোজ রোগ এসব। কোনো কোনো বালাই কম ক্ষতি করে, কোনোটা মাঝারি আবার কোনোটা বেশি ক্ষতি  করে। এসব বিষয় বিবেচনা করে ফলের বালাইসমূহকে কয়েকটা ভাগে ভাগ করা  যায়।
প্রধান ও অপ্রধান বালাই :  যেসব বালাই প্রায়শ ও বেশি ক্ষতি করে সবচেয়ে বেশি প্রাদুর্ভাব ঘটায়, প্রায় সর্বত্র দেখা যায়। এসব বালাইয়ের প্রাকৃতিক শত্রু থাকে কম ও ক্ষতি করার ক্ষমতা থাকে অনেক বেশি। যেমন- আমের শোষক পোকা, পেয়ারার অ্যানথ্রাকনোজ  ও ফলের মাছি পোকা। এদের মুখ্য বালাইও বলা যায়। আবার যেসব বালাই কম দেখা যায়, কম ক্ষতি করে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এরা খুব বেশি ক্ষতি করতে পারে না। প্রাকৃতিক শত্রুরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে এদের দমন করে রাখে। যেমনÑ সাইট্রাস সাইলা পোকা। এদের  গৌণ বালাইও বলা যায়।
আকষ্মিক বা হঠাৎ বালাই : সচরাচর যেসব বালাই দেখা যায় না, বিভিন্ন কারণে হঠাৎ আবির্ভাব হয়, ক্ষতি করার পর আবার উধাও হয়ে যায়। প্রাকৃতিক পরিবেশের বিপর্যয় বা প্রভাব ও মানুষের দ্বারা এসব বালাইয়ের আবির্ভাব ঘটে। যেমন- বুনো হাতি।
প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বালাই : যেসব বালাই সরাসরি ফলের ক্ষতি করে। পেয়ারার ফলের মাছি, বুলবুলি পাখি, কাঠবিড়ালি, অ্যানথ্রাকনোজ রোগ, ফলপচা রোগ এসব প্রত্যক্ষ বালাই।  আর যেসব বালাই সরাসরি ফলের ক্ষতি করে না, ফলগাছের পাতা বা গাছ খেয়ে ক্ষতি করে, ফলনে প্রভাব পড়ে। যেমন- লেবুর পাতা সুড়ঙ্গকারী পোকা। এ পোকার আক্রমণে লেবুর অনেক পাতা  নষ্ট হয়। এ কারণে গাছের খাদ্য তৈরি কমে যায় ও গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। এত ফুল ও ফল কম ধরে, ফল ধরলেও  তা অপুষ্ট হয়। এরা পরোক্ষ বালাই।
ফলের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা কী?
ব্যবস্থাপনা হলো সমন্বয় করা। ফলের বালাই ব্যবস্থাপনায় অধিকাংশ কৃষক বালাইনাশকের ওপর নির্ভরশীল বেশি। কেননা বালাইনাশক বাজারে সুলভ, চাইলেই হাতের কাছে পাওয়া যায়, সহজে ব্যবহার করা যায় এবং দ্রুত ফল দেয়। আবার আইপিএমের ধারণাটি সাধারণ চাষিদের কাছে ততটা সহজ বোধগম্য নয়, অনেক কৌশল সম্পর্কে তারা জানেন না ও সেসব কৌশলের কার্যকারিতা সম্পর্কে বেশ অনাস্থা রয়েছে। বাণিজ্যিক ফলচাষিরা চান রোগ ও পোকামুক্ত আকর্ষণীয় ফল, তাতে যতবার যত বালাইনাশক দেয়া লাগে তারা ততবার তা দেন। সেজন্য ফলচাষিদের কাছে আইপিএম ধারণার গ্রহণযোগ্যতা এখনও বালাইনাশকের মতো হয়ে ওঠেনি। পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে ভবিষ্যতে ফলের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষত যদি বিদেশে ফল রপ্তানি করতে হয় তাহলে সেসব দেশের ক্রেতারা ক্ষতিকর রাসায়নিক দেয়া ফল কিনবে না। তাছাড়া উপর্যুপরি ক্ষতিকর রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহারে ফলে অধিকাংশ বালাইয়ের পুনরুজ্জীবন লাভ, পুনরুত্থান, নতুন বালাইয়ের আবির্ভাব, মানুষের  স্বাস্থ্য নষ্ট ও পরিবেশের স্থায়ী ক্ষতি হয়। তাই মানসম্মত ও লাভজনক নিরাপদ ফল উৎপাদনে ফলের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই। আইপিএম একটি পরিবেশ ও মানব স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থাপনা কৌশল, যার মাধ্যমে বালাই ব্যবস্থাপনার উপযোগী কলাকৌশলের মধ্য থেকে বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে একাধিক কৌশল বেছে নিয়ে একযোগে প্রয়োগ করে বালাইয়ের সংখ্যাকে আর্থিক ক্ষতিসীমার নিচে নামিয়ে রাখা হয় এবং বালাই ব্যবস্থাপনার সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রয়োগের একটি প্রক্রিয়া। এর অর্থ এই নয় যে, আইপিএমে মাধ্যমে সব বালাই দমন বা নিধন করা হয়। বরং এর মাধ্যমে এমন এক পরিবেশ বা অবস্থা সৃষ্টি করা হয় যাতে বালাই কমবে বা নিয়ন্ত্রিত হবে। আইপিএম একাধিক প্রাকৃতিক উপাদানকে বিবেচনা করে কাজ করে বিধায় এটি পরিবেশসম্মত হয়ে পোকা দিয়ে পোকা দমন, রোগজীবাণু দিয়ে পোকা ও রোগ ধ্বংস, প্রাকৃতিক শক্তি বিশেষ করে সূর্যালোক, পানি, তাপকে আইপিএমে বিবেচনা করে। এর সফলতা বা কার্যকারিতা আসলে নির্ভর করে নিয়মিত মনিটরিং বা ফলগাছ পর্যবেক্ষণ, অবস্থা বিশ্লেষণ, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের ওপর। নিরাপদ ফল উৎপাদনের জন্য বালাই নিয়ন্ত্রণে আইপিএম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মূল উদ্দেশ্য
সাধারণভাবে আইপিএমের উদ্দেশ্য হচ্ছে, সুস্থ ও মানসম্পন্ন ফসল উৎপাদনে কৃষকের প্রচলিত চাষাবাদ পদ্ধতির পরিবর্তন এবং ক্রমবর্ধমানভাবে ফসল উৎপাদন ও কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি সামগ্রিক পরিবেশ তথা জনস্বাস্থ্যের উন্নতি। অনেকের ধারণা যে, আইপিএম পদ্ধতিতে আদৌ কোনো বালাইনাশক ব্যবহার চলবে না। আসলে তা নয়। পোকামাকড় ও রোগবালাই যদি অন্যান্য দমন পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হয়, শুধুমাত্র তখন শেষ ব্যবস্থা হিসেবে বালাইনাশক ব্যবহার করা যাবে। তবে তার ব্যবহার করতে হবে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে ও যুক্তিসংগতভাবে। এর মধ্যে আছে- নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন, কৃষি পরিবেশ বিশ্লেষণ ও নিয়মিত বালাই জরিপ নিশ্চিত করা; ক্ষেতে ক্ষতিকর ও উপকারী পোকামাকড়ের ভারসাম্য বজায় রাখা; শুধু বালাইনাশকের ওপর নির্ভরশীল না হওয়া ও বালাইনাশকের এলোপাতাড়ি ব্যবহার বন্ধ করা; আইপিএম ধারণায় কৃষককে দক্ষ করে গড়ে তোলা- যাতে করে নিজের ফসলের বালাই ব্যবস্থাপনার সঠিক সিদ্ধান্ত তারা নিজেরাই গ্রহণ করতে পারেন।

সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার সুফল
সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমরা যে সব সুফল পেতে পারি তাহলোÑ সুস্থ সবল উৎপাদন; ফসলের উৎপাদন খরচ কমানো; পরিবেশ দূষণমুক্ত ফসল উৎপাদন; বালাইনাশকের ব্যবহার বন্ধ বা কমানো; জমিতে বন্ধুজীবের সংখ্যা বাড়ানো; বালাই ব্যবস্থাপনার খরচ তথা ফলের উৎপাদন খরচ কমানো; বালাই ব্যবস্থাপনায় কৃষকের দক্ষতা বাড়ানো; কৃষকের স্বাস্থ্য ভালো রাখা; কৃষকের অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে লাভবান করাই হলো বালাই ব্যবস্থাপনার সুফল।

সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার  উপাদান/কৌশল
বাংলাদেশে প্রচলিত ও বহুল ব্যবহৃত আইপিএমের প্রধান ৫টি উপাদান বা কৌশল হলো-
১. বালাই সহনশীল জাতের ফল চাষ : এটি সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার একটি উপাদান কিন্তু ফলের ক্ষেত্রে এ উপাদানের কার্যকারিতা কম। কেননা, এ দেশে ফলের যত জাত উদ্ভাবিত হয়েছে সেসব জাতের বালাই সহনশীলতা বা প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পর্কিত তথ্য খুব বেশি নেই। তবু যা আছে তার ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেয়া যায়। বিশেষ করে কোনো এলাকায় যদি কোনো নির্দিষ্ট বালাইয়ের আক্রমণ নিয়মিতভাবে প্রতি মৌসুমে ঘটতে থাকে তাহলে নতুন বাগান করার ক্ষেত্রে সে বালাই প্রতিরোধী জাতের চারা বা কলম সংগ্রহ করে তা লাগাতে হবে। যেমন- অ্যানথ্রাকনোজ রোগ প্রতিরোধী জাতের পেয়ারা চাষ করে বাউ পেয়ারা ১. বাউ পেয়ারা ২. বাউ পেয়ারা ৩. মুকুন্দপুরী ও কাঞ্চননগর জাতে এ রোগের আক্রমণ কম হয়। অন্য দিকে স্বরূপকাঠি ও কাজী পেয়ারাতে এ রোগ বেশি হয়।
২. জৈবিক পদ্ধতি : এটা হলো সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মূলভিত্তি। প্রকৃতিতেই বালাই নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে। শুধু সেসব ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো হলো আমাদের কাজ। এসব প্রাকৃতিক শত্রুর কেউ পরভোজী, কেউ পরজীবী আবার কেউবা বালাইয়ের দেহে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু। ফলবাগানে কোনো রাসায়নিক বালাইনাশক প্রয়োগ না করলে এসব উপকারী প্রাকৃতিক শত্রুদের সংখ্যা বাড়ে ও প্রকৃতির নিয়মে তারাই বিভিন্নভাবে বালাই নিয়ন্ত্রণ করে। এতে পরিবেশের মধ্যে শত্রু মিত্রের ভারসাম্য বজায় থাকে। এজন্য বালাই কোনো ক্ষতি করতে পারে না। তাই ফলবাগানে এসব বন্ধুজীব বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। ফলবাগানে প্রধানত যেসব বন্ধু পোকামাকড় দেখা যায় তাদের কয়েকটির পরিচয় দেয়া হলো-
লেডিবার্ড বিটল : এরা ফলের ক্ষতিকর জাব পোকা, স্কেল পোকা, মাকড় ও নরম দেহের অন্যান্য পোকা শিকার করে খায়। অনেক রঙের ও রকমের লেডিবার্ড বিটল আছে। বড়দের চেয়ে বাচ্চারা বেশি সক্রিয় ও বেশি শত্রুপোকা খায়।
ইয়ার উইগ : এরা ফলের সাইলা নিম্ফ, জাব পোকা ও নরম দেহের পোকাদের শিকার করে খায়। ইয়ার উইগের পেছনে চিমটার মতো অঙ্গ আছে, যা দিয়ে তারা শিকার ধরতে ও শিকারকে কাহিল করতে পারে। স্ত্রী ইয়ার উইগের চিমটা বাঁকা, পুরুষদের চিমটা সোজা। বাচ্চারাও দেখতে বড়দের মতো, তবে বাচ্চাদের আকার ছোট। এরা রাতে সক্রিয় থাকে, দিনে লুকিয়ে থাকে। এরা আলোতে আকৃষ্ট হয়।
প্রিডাসিয়াস মিজ : পূর্ণাঙ্গ প্রিডাসিয়াস মিজ ক্ষুদ্র,  লম্বা পা বিশিষ্ট, বাদামি হলদে মাছিরা রাতে সক্রিয় থাকে, এজন্য এদের খুব কম দেখা যায়। এর বাচ্চারা শিকার করে খায়। বাচ্চারা হলদে রঙের। এরা জাব পোকা শিকার করে খায়।
সিরফিড মাছি : এরা ফলের জাব পোকা, স্কেল পোকা ও থ্রিপস শিকার করে খায়। এর বাচ্চারা শিকার করে। বাচ্চারা পাবিহীন, চ্যাপ্টা দেহের, মাথার দিক সুচাল। পূর্ণাঙ্গ মাছির হলদে বাদামি ডোরাকাটা দেহ।  
অ্যানথোকোরিড বাগ : পূর্ণাঙ্গ অ্যানথোকোরিড বাগ জাব পোকা, সাইলা, স্কেল, থ্রিপস ও অন্যান্য নরম দেহের পোকা শিকার করে খায়। পূর্ণাঙ্গ পোকাকে অনেক সময় ক্ষুদ্র পাইরেট বাগ নামে ডাকা হয়। এদের দেহ সরু, সুচালো মাথা, চ্যাপ্টা ও মসৃণ দেহ, পিঠে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দাগ থাকে।
মুলিয়েন বাগ : এরা সাইলা, মাকড় ও জাব পোকা শিকার করে খায়। বাচ্চারা হলদে থেকে হালকা সবুজ রঙের। এরা দ্রুত চলাচল করে।
বোলতা : এরা পাতা সুড়ঙ্গকারী পোকার পরজীবী। এ পোকার পূর্ণাঙ্গ অবস্থা ছাড়া জীবনের বাকি সব স্তরই পাতার সুড়ঙ্গের মধ্যে কাটায়। বছরে এরা কয়েকবার বংশবৃদ্ধি করে। এ পোকার বাচ্চা সাদা। এর বাচ্চারা পাতা সুড়ঙ্গকারী পোকার দেহ বাইরে থেকে খেয়ে মেরে ফেলে। এই পরজীবী পোকা পরজীবীতার দ্বারা প্রায় ৯৫ শতকরা পাতা সুড়ঙ্গকারী পোকাকে মেরে ফেলতে পারে।
কোটেশিয়া বোলতা : এ বোলতার বাচ্চারা ফলের বিভিন্ন লেদা ও বিছা পোকার কীড়া এবং জাব পোকাদের পরজীবীতার দ্বারা মেরে ফেলে। প্রজাতির ওপর নির্ভর করে কোটেশিয়া বোলতাদের দেখতে বিভিন্ন রকম হয়। প্রধানত পূর্ণাঙ্গ পোকার রঙ কালো। পূর্ণাঙ্গ কোটেশিয়া বোলতা লেদা বা জাব পোকার দেহের ভেতরে ডিম পাড়ে, সেখানে বাচ্চা ফুটে খায় ও পোষক শত্রুকে মেরে তার দেহের বাইরে এসে মুড়ির মতো সাদা খোলসের মধ্যে পুত্তলিতে যায়।
পরভোজী মাকড় : এরা ফলের ক্ষতিকর ক্ষুদ্র মাকড়দের শিকার করে খায়। ক্ষতিকর মাকড়দের চলাচল খুব ধীর। অন্যদিকে পরভোজী মাকড়দের চলাচল খুব দ্রুত। এদের রঙ সাদা।
আধুনিক প্রযুক্তিতে ফল চাষ
ফল চাষের যত ভালো উন্নত প্রযুক্তি আছে সব মেনে ফল চাষ করাই হলো আধুনিক নিয়মে ফল চাষ। এতে সুস্থ সবল গাছ হয়, গাছের বৃদ্ধি ও তেজ ভালো থাকে। এসব গাছ প্রাকৃতিকভাবে অনেক বালাই প্রতিরোধ করতে পারে। এজন্য ফলগাছের উন্নত চাষাবাদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে যা করা দরকার তা হলোÑ এলাকার উপযোগী উন্নত জাতের ফলগাছ লাগানো; সঠিকভাবে, সঠিক সময়ে ও সঠিক মাত্রায় সার দেয়া। অতিরিক্ত ইউরিয়া সার ফলগাছে না দেয়া; আগাছা ও পানি ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করা; নিয়মিত গাছ ছাঁটাই করা; আক্রান্ত ফল ও গাছের আক্রান্ত অংশ সংগ্রহ করে ধ্বংস করা।
যান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা : ফলের বালাই নিয়ন্ত্রণে হাত বা যে কোনো যন্ত্রের ব্যবহারই হলো যান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা। এর মাধ্যমে বালাইসমূহ বিতাড়িত হয়, মরে যায় অথচ উপকারী জীবের কোনো ক্ষতি হয় না। যান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে যেসব বিষয়াদি বিবেচনা করতে হবে তাহলোÑ ফলের মাছি পোকা নিয়ন্ত্রণের জন্য সেক্স ফেরোমন ফাঁদ বা বিষটোপ ফাঁদ ব্যবহার; কাইরোমন ফাঁদ ব্যবহার করা; গাছ যখন দুর্বল বা আঘাতপ্রাপ্ত হয় তখন তা থেকে কাইরোমন নিঃসৃত হয়, যা অনেক পোককে আকৃষ্ট করে। কৃত্রিমভাবে এরূপ কাইরোমোন ব্যবহার করে ফাঁদ তৈরি করে পোকাদের আকৃষ্ট ও ফাঁদে আটকে মারা যায়;  আলোক ফাঁদ ব্যবহার করা; বর্ণফাঁদ ব্যবহার করা; ইঁদুরের কল বা ফাঁদ  ব্যবহার করা; গাছের তলার মাটি চষে দেয়া; পাখি ও বাদুড় তাড়ানোর জন্য আওয়াজ সৃষ্টিকারী টিন/যন্ত্রের ব্যবস্থা করা; বিভিন্ন ব্যাগ দিয়ে ফল ঢেকে দেয়া; মালচিং করা; করাত বা দা দিয়ে কেটে আক্রান্ত অংশ সরিয়ে ফেলা।
রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা : রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা হলো রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে বালাই নিয়ন্ত্রণ। বর্তমানে বিভিন্ন জৈব ও জৈব রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা হচ্ছে। রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে যেসব বিষয়াদি বিবেচনা করা যায় তাহলো- মরিচের গুঁড়া, আদা ও রসুনের রস এসব। জৈব পদার্থগুলো স্প্রে করে বিভিন্ন পোকাকে বিতাড়িত করা যায়; এসিটিক এসিড, লবঙ্গের তেল, ফ্যাটি এসিড প্রভৃতি স্প্রে করা; সালফার ও চুন প্রয়োগ করা; বোর্দো মিশ্রণ প্রয়োগ করা; ট্রাইকোডার্মা বা ট্রাইকো কম্পোস্ট ব্যবহার করা।
সর্বশেষ ব্যবস্থা হিসেবে বুদ্ধিমত্তার সাথে বালাইনাশক ব্যবহার করা। যে কোনো বালাইনাশক ব্যবহারে আগে তার ব্যবহারের নির্দেশনা পড়তে হবে। বালাইনাশক সাধারণত কারখানায় তৈরি করা কৃত্রিম রাসায়নিক দ্রব্য। এ ছাড়া প্রাকৃতিক বা জৈবিক বালাইনাশকও আছে। জৈবিক বা প্রাকৃতিক বালাইনাশক ব্যবহারে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কিছু বালাইনাশকের কার্যকারিতা ব্যাপক, একই বালাইনাশক বহু রকমের বালাইকে মেরে ফেলতে পারে। কিছু বালাইনাশকের কার্যকারিতা পোষক বা বালাই সুনির্দিষ্ট। নির্দিষ্ট বালাইকে তারা মারতে পারে। এরূপ বালাইনাশক ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।  কিছু বালাইনাশকের অবশেষ ক্রিয়া দ্রুত শেষ হয়ে যায় (যেমন বিটি)। কিছু বালাইনাশকের (ডিডিটি) অবশেষ ক্রিয়া থাকে অনেক দিন। কম অবশেষ ক্রিয়াসম্পন্ন বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে। ফলে কোনো তীব্র বিষাক্ত বালাইনাশক ব্যবহার করা যাবে না। রাসায়নিকের চেয়ে জৈব বালাইনাশক ব্যবহারে অধিক আগ্রহী হতে হবে। তবে বালাইনাশক ব্যবহার করতে হলে অবশ্যই সঠিক বালাইনাশক, সঠিক সময়ে, সঠিক পদ্ধতিতে, সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। তানা হলে ফল ভালো আসবে না।
ফলের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার বাস্তবায়ন কৌশল
ফলের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনাকে ফলপ্রসূ করার জন্য বিভিন্ন কৌশলগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে হবে। সেগুলো হলো-
১. ফলের বালাইগুলো চেনা ও তথ্য জানা : সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের প্রথম কাজই হলো কোন ফল গাছে ও ফলে কী কী রোগ, পোকা ও অন্যান্য বালাইয়ের আক্রমণ ঘটে সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নেয়া। যথাসম্ভব সেসব বালাই শনাক্তকরণে দক্ষতা অর্জন করা। সেসব বালাই দ্বারা কী ক্ষতি হচ্ছে সেসব লক্ষণ চেনাও দরকার। পাশাপাশি কোন বালাইয়ের আক্রমণ কোন স্তরে ও কোন পরিস্থিতিতে বাড়ে তাও জানতে হবে।
২. নিয়মিত ও পরিমিত খেয়াল রাখা : দ্বিতীয় ধাপ হলো ফলগাছ অন্তত সপ্তাহে একবার পর্যবেক্ষণ করা। ফলগাছে উপস্থিত রোগ, পোকামাকড় তা শত্রু বা বন্ধু পোকা হোক ও অন্যান্য বালাই পরিস্থিতি জরিপ করে কোন বালাইয়ের তীব্রতা কত তা নির্ণয় করা দরকার। নমুনায়ন করেও এ কাজ করা যায়। এ কাজে চাক্ষুষ পদ্ধতি সবচেয়ে ভালো। বিভিন্ন ফাঁদ পেতেও বালাই জরিপ কাজ করা যায়।
৩. পর্যবেক্ষণের পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ : ফল ও ফলগাছের বালাই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করে বালাই ব্যবস্থাপনার সম্ভাব্য কলাকৌশল বিবেচনা করে সর্বোত্তম কৌশল নির্বাচন করাই হলো সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এ সময় বিবেচনা করতে হবে কোন কৌশলটি প্রয়োগ করলে সবচেয়ে সহজে করা যাবে, স্থানীয়ভাবে পাওয়া যাবে, খরচ কম হবে, লাভ বেশি হবে। অবশ্যই সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর করতে শুধু একটি কৌশলের ওপর নির্ভর করা উচিত হবে না, একাধিক কৌশলকে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করতে হবে। সবশেষে প্রয়োগের জন্য রাখতে হবে রাসায়নিক ব্যবস্থাপনাকে। রাসায়নিক ব্যবহার ব্যবস্থায় সঠিক ওষুধ, সঠিক সময়ে, সঠিক মাত্রায়, সঠিক কৌশলে প্রয়োগ করলেই লাভ বেশি হবে।
৪. কাজ শেষে কার্যক্রম মূল্যায়ন : সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার প্রতিটি কৌশল প্রয়োগের কার্যক্রম মূল্যায়ন করে তার ফলাফল যাচাই করতে হবে ও তার তথ্য সংরক্ষণ করে রাখতে হবে। এতে পরবর্তীতে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও সহজ হবে এবং বেশি আস্থার সাথে করা যাবে।
ফলের দেশ বাংলাদেশ। আমাদের ফলভাণ্ডারে একশত ৩০টির বেশি ফল আছে। এর মধ্যে ৭০টি বেশ প্রচলিত। আর ১০-১২টি খুব বেশি প্রচলিত। ফল চাষ করি আমরা কিন্তু কখনও সুপরিকল্পিকভাবে করি না। আমরা একটু সচেতন হয়ে যদি পরিকল্পিতভাবে ফলের আবাদ আর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারি তাহলে ফল দিয়েই আমরা নতুন এক মাত্রায় পৌঁছতে পারব। গত দুইবছর ফল দিয়ে আমরা বিশ্ব মাতানো চেষ্ট শুরু করেছি। এটি আরও সম্প্রসারিত হবে যদি আমরা সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে ফলের আবাদ উৎপাদন আর ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক প্রদ্ধতি প্রযুক্তি অবলম্বন করি। সব চেয়ে বড় কথা ফলের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা আমাদের ফলভিত্তিক সমৃদ্ধিতে আরো অনেক দূরে নিয়ে যাবে। আমাদের দেশে ১২ মাসের সব সময় সামনভাবে ফল আসে না। মোট ফলের মধ্যে জানুয়ারিতে ৫%, ফেব্রুয়ারিতে ৫%, মার্চ ৭%, এপ্রিলে ৭% এ ৪ মাসে ২৪%, মে ১৩%, জুন ১৪% জুলাই ১৫% আগস্ট ১২% এর ৪ মাসে ৫৪%,  সেপ্টেম্বর ৫% অক্টোবর ৫% নভেম্বর  ৬% ডিসেম্বর  ৬% এ ৪ মাস মিলে ২২% ফল পাওয়া যায়। সুতরাং ফলের বালাই ব্যবস্থাপনাও এ তথ্যভিত্তিক হলে এবং এভাবেই হিসাব করে বাস্তবায়ন করতে হবে। তবেই কাজ হবে। ফল সমৃদ্ধ আয়েশি ভাণ্ডার থেকে আমরা আমাদের চাহিদা অনুযায়ী ফল খাব, বাড়তি ফল বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে দেশকে কৃষিতে সমৃদ্ধ কর।

কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম*
*উপপরিচালক (গণযোগাযোগ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫

 


Share with :

Facebook Facebook