কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

পুষ্টিমান অক্ষুণ্ন রেখে ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ

প্রক্রিয়াজাতকরণ হচ্ছে এমন একটি বিজ্ঞান, যার মাধ্যমে পুষ্টি ও অন্যান্য গুণগতমান অক্ষুণ্ন রেখে খাদ্যকে প্রক্রিয়াজাত করে ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত (fit condition) পরিবেশে সংরক্ষণ করা হয়। প্রক্রিয়াজাত পণ্যের গুণগতমান নির্ভর করে মূলত প্রক্রিয়াজাত প্রক্রিয়া শুরু করার সময় তাদের গুণগতমান কেমন ছিল তার উপর (Kader and Barret 2005)। পুষ্টিমান হলো একটি ফলে কি পরিমাণ ভিটামিন, খনিজ পদার্থ, আঁশ, শর্করা, প্রোটিন এবং এন্টি অক্সিডেন্ট ফাইটোক্যামিক্যালস (ক্যারটিনয়েড, ফ্ল্যাভানয়েড এবং অন্যান্য ফিনোলিক দ্রব্য) আছে তার উপর নির্ভর করে। প্রক্রিয়াজাত পণ্য তথা ফলে ফাইটোক্যামিক্যাল এর পরিমাণ প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় ফাইটোক্যামিক্যাল এর স্থায়িত্বের উপর নির্ভর করে, যা মূলত পণ্যের জারণ (oxidation) ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রতি সংবেদনশীলতার সাথে সম্পর্কযুক্ত (Leong and Oey 2012) । পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিন যেমন- ভিটামিন-সি, বি১, বি২, বি৬ এবং ফলিক এসিড তাপ সংবেদনশীল কিন্তু চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিনসমূহ তুলনামূলকভাবে তাপসহনশীল। ফলে উপস্থিত খনিজ পদার্থসমূহ প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় ততটা প্রভাবিত হয় না।
 

প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন প্রয়োজন?
অধিকাংশ ভোক্তাই সবচেয়ে তাজা ফল এবং সবজি পেতে ও খেতে চায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সকল বিচিত্র রকমের ফল ও সবজি বছরব্যাপী উৎপাদন করা যায় না। কিছু ফল আছে নির্দিষ্ট অঞ্চলে জন্মায়, আবার অনেক সুস্বাদু ফল স্বল্প সময়ের জন্য জন্মায় এবং সে সময়টি পার হওয়ার পর আর সে ফলগুলো পাওয়া যায় না। এ সমস্ত কারণে নির্দিষ্ট সময়ের পর তাজা  ফলের স্বাদ গ্রহণের জন্য ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ একটি আদর্শ বিকল্প
(alternative) । প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে ফলের ক) প্রাপ্যতা সময় বৃদ্ধি পায়, খ) ফল সংরক্ষণের সময় কম নষ্ট হয় এবং সংরক্ষণ সময় বৃদ্ধি পায়, গ) খাদ্যের অনুজৈবিক এবং রাসায়নিক নিরাপত্তা বাড়ে এবং ঘ) খাদ্যেও বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায়। ফল প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে জাত নির্বাচন এবং ফলের পরিপক্বতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় প্রক্রিয়াজাতকরণ করা যায়। গবেষণায় দেখা যায় যে, ফল তাজা, ফ্রোজেন এবং প্রক্রিয়াজাত (canned) যে অবস্থায়ই খাওয়া  হোক না কেনো, তা বর্ণ, গন্ধ, গ্রহণযোগ্যতা এবং পুষ্টিমানের দিক দিয়ে একই রকম, যদিও তা শস্য সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়ার উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।


প্রক্রিয়াজাতকরণ (পাত্রে সংরক্ষণ বা ক্যানিং, শুষ্ককরণ বা ড্রাইং, নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষণ বা ফ্রিজিং এবং জুস, জ্যাম ও জেলি তৈরিকরণ) ফলের ভক্ষণোপযোগী সময় (shelf life) বৃদ্ধি করে। প্রক্রিয়াজাতকরণের ধাপসমূহ হলো; মূল উপাদানসমূহ তৈরি (preparation of raw material) যেমন- পরিষ্কারকরণ, অপ্রয়োজনীয় অংশ ছেঁটে ফেলা ও খোসা ছাড়ানো, এবং পরবর্তীতে রন্ধন, ক্যানিং অথবা ফ্রিজিং। প্রক্রিয়াজাতকরণ স্বল্প ও দীর্ঘ সময়ের জন্য করা যায়। নিম্নে বিভিন্ন ফলের কিছু প্রক্রিয়াজাত দ্রব্যের বিবরণ দেয়া হলো:


আচার : আচার অত্যন্ত সুস্বাদু ও মুখরোচক খাবার। প্রায় সকল শ্রেণীর মানুষের কাছেই আচার খুব লোভনীয় ও আকর্ষণীয় খাবার হিসেবে পরিচিত। যে ফল বা সবজি থেকে আচার তৈরি করা হয় তার উপর আচারের পুষ্টিমান নির্ভর করে। আচারে ভিটামিন সি এবং খনিজ পদার্থ থাকে যা আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োজন। আচার খাবারে রুচি বৃদ্ধি করে।


আচারে তেল বা স্নেহ জাতীয় পদার্থ থাকে যা তাপ শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করে। যথাযথ নিয়মে তৈরি করলে ফল বা সবজির প্রায় সকল গুণই আচারে অক্ষুণœ থাকে। অল্প মূলধনেই আচার তৈরি করা যায়। আচার তৈরি ও বাজারজাত করে সহজেই একজন ব্যক্তি আয় বর্ধনের ব্যবস্থা করতে পারে।


আমের আচার : আমের প্রাপ্যতা সময় মাত্র কয়েক মাস। আবার আম ছোট থাকা অবস্থায় অনেক সময় ঝড়ে অধিকাংশ বা সমস্ত আম পড়ে যায়। ঝড়ে পড়া আম দিয়ে সুস্বাদু আচার তৈরি করে সারা বছর ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে অপচয় রোধ করে পারিবারিক আয় বাড়ানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।     


প্রস্তুত প্রণালি
১। আমের আচারের জন্য ভালো কাঁচা আম বেছে নিতে হবে। পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।
২। আমগুলো লম্বালম্বিভাবে ৬-৮ ভাগ করে কেটে নিতে হবে।
৩। এক কেজি আমের টুকরার সাথে ৪০ গ্রাম লবণ মাখিয়ে ১০-১৫ ঘণ্টা রেখে দিতে হবে।
৪। অতঃপর টুকরাগুলো উঠিয়ে ৫ গ্রাম হলুদ মিশিয়ে বাঁশের চালুনি বা ট্রেতে ৫-৬ ঘণ্টা রোদে শুকিয়ে নিতে হবে।
৫। ওজন করা টুকরাগুলো তেলের মধ্যে ভেজে নিতে হবে।
৬। আদা এবং রসুনের খোসা ছাড়িয়ে ১০০ মিলিলিটার ১% অ্যাসেটিক এসিড দ্রবণ সহযোগে পেস্ট তৈরি করে নিতে হবে।
৭। শুকনো মরিচের গুঁড়া ও হলুদের গুঁড়া আদা রসুনের পেস্টের সঙ্গে মিশিয়ে মিশ্রণটি আম ভেজে নেয়ার পর কড়াইয়ে অবশিষ্ট তেলের মধ্যে ভেজে নিতে হবে।
৮। ভাজা চলাকালীন ভাজা আমের টুকরা, চিনি, মেথি, জিরার গুঁড়া ও সরিষার গুঁড়া একে একে যোগ করতে হবে। অবশেষে লবণ এবং অবশিষ্ট অ্যাসেটিক এসিড অর্থাৎ ১০ মিলিলিটার গ্লাসিয়াল অ্যাসেটিক এসিড যোগ করে ভালোভাবে মিশিয়ে কম তাপে ৩-৫ মিনিট জ্বাল দিতে হবে।
৯। অতঃপর চুলা থেকে নামানোর পর গরম অবস্থায় জীবাণুমুক্ত কাঁচের বোতলে ভরে ছিপি এঁটে দিতে হবে।

 

জলপাই এর আচার : কাঁচা এবং পাকা উভয় অবস্থাতেই জলপাই খাওয়া যায়। জলপাইয়ে প্রচুর পুষ্টি উপাদান আছে। জলপাই এর আচার খুবই উপাদেয় এবং সহজেই তৈরি করা যায়। বাণিজ্যিকভাবে জলপাই আচার তৈরির মাধ্যমে আয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
 

প্রস্তুত প্রণালি
১। জলপাই এর জন্য ভালো জলপাই বেছে নিতে হবে। পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।
২। জলপাইগুলো লম্বালম্বি ৩ ভাগ করে কেটে নিতে হবে।
৩। এক কেজি জলপাই টুকরার সাথে ৪০ গ্রাম লবণ মাখিয়ে ১০-১৫ ঘণ্টা রেখে দিতে হবে।
৪। অতঃপর জলপাইগুলো উঠিয়ে ৫ গ্রাম হলুদ মিশিয়ে বাঁশের চালনি বা ট্রেতে ২-৩ ঘণ্টা রৌদে শুকাতে হবে।
৫। ওজন করা টুকরাগুলো তেলের মধ্যে ভেজে নিতে হবে।
৬। আদা এবং রসুনের খোসা ছাড়িয়ে ১০০ মিলি লিটার ১% অ্যাসেটিক এসিড দ্রবণ সহযোগে পেস্ট তৈরি করতে হবে।
৭। শুকনো মরিচের গুঁড়া ও হলুদের গুঁড়া আদা রসুনের পেস্টের সঙ্গে মিশিয়ে মিশ্রণটি জলপাই ভেজে নেয়ার পর অবশিষ্ট তেলে মধ্যে ভেজে নিতে হবে।
৮। ভাজা চলাকালীন ভাজা জলপাই টুকরো, চিনি, মেথি, জিরার গুঁড়া ও সরিষার গুঁড়া একে একে যোগ করতে হবে। অবশেষে লবণ এবং অবশিষ্ট অ্যাসেটিক এসিড অর্থাৎ ১০ মিলি লিটারগ্লেসিয়াল অ্যাসেটিক এসিড যোগ করে ভালোভাবে মিশিয়ে কম তাপে ৩-৫ মিনিট জ্বাল দিতে হবে।
৯। অতঃপর চুলা থেকে নামানোর পর গরম অবস্থায় জীবাণুমুক্ত কাঁচের বোতলে ভরে ছিপি এঁটে দিতে হবে।
আমড়ার আচার : আমড়া খেতে খুব সুস্বাদু। ভিটামিন-সি ছাড়াও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানসমৃদ্ধ এ ফলটি দিয়ে উন্নত মানের আচার ও চাটনি তৈরি করা যায়।

 

প্রস্তুত প্রণালি
১। আমড়ার আচার এর জন্য ভালো আমড়া বেছে নিতে হবে। পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে বঁটি বা চাকু দিয়ে আমড়ার উপরের ছাল বা ত্বক ছিলে ফেলে দিতে হবে।
২। আমড়াগুলো লম্বালম্বি ৬-৮ ভাগ করে কেটে নিতে হবে।
৩। এক কেজি আমড়ার সাথে ৪০ গ্রাম লবণ মাখিয়ে ১০-১৫ ঘণ্টা রেখে দিতে হবে।
৪। অতঃপর আমড়াগুলো উঠিয়ে ৫ গ্রাম হলুদ মিশিয়ে বাঁশের চালনি বা ট্রেতে ২-৩ ঘণ্টা রৌদ্রে শুকিয়ে নিতে হবে।
৫। ওজন করা টুকরাগুলো তেলের মধ্যে ভেজে নিতে হবে।
৬। আদা এবং রসুনের খোসা ছাড়িয়ে ১০০ মিলিলিটার ১% অ্যাসেটিক এসিড দ্রবণ সহযোগে পেস্ট তৈরি করতে হবে।
৭। শুকনো মরিচ ও হলুদের গুঁড়া আদা রসুনের পেস্টের সঙ্গে মিশিয়ে আমড়া ভেজে নেয়ার পর কড়াইয়ে অবশিষ্ট তেলের মধ্যে ভেজে নিতে হবে।
৮। ভাজা চলাকালীন সময়ে ভাজা আমড়ার টুকরা, চিনি, মেথি, জিরার গুঁড়া ও সরিষার গুঁড়া একে একে যোগ করতে হবে। অবশেষে লবণ এবং অবশিষ্ট অ্যাসেটিক এসিড অর্থাৎ ১৪ মিলিলিটারগ্লেসিয়াল অ্যাসেটিক এসিড যোগ করে ভালোভাবে মিশিয়ে কম তাপে ৩-৫ মিনিট জ্বাল দিতে হবে।
৯। অতঃপর চুলা থেকে নামানোর পর গরম অবস্থায় জীবাণুমুক্ত কাঁচের বোতলে ভরে ছিপি এঁটে দিতে হবে।

 

তেঁতুলের সস :
প্রতি ১০০ গ্রাম ভক্ষণযোগ্য তেঁতুলের ১৭-৩৫ গ্রাম পানি, ২-৩ গ্রাম আমিষ, ০.৬ গ্রাম চর্বি, ৪১-৬১ গ্রাম শর্করা, ২.৯ গ্রাম আঁশ, ৩৪-৯৪ মিগ্রা ক্যালসিয়াম, ৩৪-৭৮ মিগ্রা ফসফরাস এবং ৪৪ মিগ্রা ভিটামিন সি থাকে। পেটের বায়ু ও হাত-পা জ্বালায় তেঁতুলের শরবত উপকারী। তেঁতুলে টারটারিক এসিড থাকে যা হজমে সাহায্য করে। তেঁতুলের শরবত ব্যবহারে মাথা ব্যাথা এবং ধুতুরা, কচু ও অ্যালকোহলের বিষাক্ততা নিরাময় হয়। এটা ব্যাবহারে প্যারালাইসিস অঙ্গের অনুভূতি ফিরে আসে।


তেঁতুলের সস উপাদেয় একটি খাবার। অতি সহজেই এটা তৈরি করা যায়।           

 
প্রস্তুত প্রণালি
১। তেঁতুল (বীজসহ) তার দ্বিগুণ পরিমাণ পানির সাথে মিশিয়ে চটকিয়ে পাল্প/ম- তৈরি করতে হবে। দ্রুত করার জন্য গরম পানি ব্যবহার করা যেতে পারে।
২। পাল্প তৈরি হলে ছাকনি দিয়ে ছেকে বীজ থেকে পাল্প আলাদা করতে হবে।
৩। তেঁতুলের পাল্প এর সাথে চিনি ও লবণ মিশিয়ে জ্বাল দিতে হবে। এর সাথে মরিচ গুঁড়া মিশাতে হবে।
৪। মসলাগুলো ভেজে গুঁড়া করে নিয়ে পেঁয়াজ ঐ রসুন কুঁচি করে মসলার সাথে একত্রে পাতলা করে কাপড়ের পুটলিতে বেঁধে মিশ্রণে ছেড়ে দিতে হবে।
৫। জ্বাল চলাকালীন ঘন ঘন নাড়তে হবে এবং হাতা দিয়ে মাঝে মাঝে চেপে পুটলির রস সসের সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।
৬। ২০-২৫ মিনিট জ্বাল হলে এবং কাক্সিক্ষত ঘনত্বে এলে (টিএসএস ৪৫০ ব্রিক্রা হলে) সামান্য পানিতে সোডিয়াম বেনজয়েট গুলিয়ে সসের সাথে মিশাতে হবে।
৭। জীবাণুমুক্ত বোতলে সস গরম অবস্থাতেই ঢেলে ফেলতে হবে। ছিপি ভালভাবে বন্ধ করার পর বোতলটি কাত করে রাখতে হবে। পরে কাপড় দিয়ে মুখে বোতলগুলো সোজা করে সংরক্ষণ করতে হবে।

 

কুলের চাটনি :
কুল বাংলাদেশের একটি অন্যতম উৎকৃষ্ট ফল। এর ফল এবং পাতা বাটা বাতের জন্য উপকারী। কুল রক্ত শোধন, রক্ত পরিষ্কার ও হজমে সাহায্য করে। কুল থেকে উৎকৃষ্ট মানের চাটনি তৈরি করা যায়।

 

প্রস্তুত প্রণালি
১। ভালো কুল বেছে নিয়ে বোঁটা ছাড়িয়ে পানিতে ধুয়ে ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে।
২। প্রয়োজনমতো নরম না হলে ভিজিয়ে রাখা পানি থেকে অল্প পরিমাণ পানি দিয়ে সিদ্ধ করতে হবে।
৩। ঠাণ্ডা হলে কাঠের হাতল/হাত দিয়ে কচলিয়ে ম- করতে হবে।
৪। সকল মসলা ভেজে গুঁড়া করতে হবে।
৫। চিনি ও মন্ড এক সাথে মিশিয়ে জ্বাল দিতে হবে।
৬। কিছুটা ঘন হলে (টিএসএস ৫৫০ ব্রিক্রা) সকল মসলা ও লবণ মিশিয়ে দিতে হবে।
৭। আরও ঘন (টিএসএস ৫৮০ ব্রিক্রা) হলে অ্যাসিটিক এসিড যোগ করতে হবে।
৮। অন্য একটি পাত্রে সরিষার তেল গরম করে চাটনিতে মিশাতে হবে।
৯। পুরোপুরি ঘন (টিএসএস ৬০০ ব্রিক্রা) হলে সামান্য পানিতে সোডিয়াম বেনজয়েট গুলিয়ে চাটনিতে মিশাতে হবে।
১০। জীবাণুমুক্ত বোতলে ভরে ঠা-া হলে উপরে মোমের প্রলেপ দিয়ে ছিপি এঁটে সংরক্ষণ করতে হবে। (উপকরণ ও পরিমাণ ছক-১ দেখানো হয়েছে)

 

চালতার চাটনি:  চালতার চাটনি সবার কাছেই খুবই মুখরোচক ও স্বুস্বাদু খাবার। শিশু, কিশোর এবং মহিলাদের কাছে এর চাহিদা অত্যন্ত বেশি। বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গায় চালতা বুনো গাছ হিসেবে জন্মে থাকে। চালতাতে অনেক পুষ্টি উপাদান রয়েছে। কচি ফল পেটের গ্যাস, কফ, বাত ও পিত্ত নাশক। পাকা ফলের রস চিনিসহ পান করলে সর্দিজ্বর উপশম হয়। চালতা চাটনি তৈরির মাধ্যমে নিজের চাহিদা মিটিয়েও বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।     
প্রস্তুত প্রণালি
১। পরিপক্ব চালতা নিয়ে পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে।
২। আঙ্গুলের মতো টুকরা করে নিতে হবে।
৩। গর্ভাশয়, বীজ এবং অন্যান্য বর্জ্য ফেলে দিতে হবে।
৪। টুকরোগুলো ধুয়ে কড়াইতে সমপরিমাণ পানি দিয়ে জ্বাল দিতে হবে।
৫। চালতা ঠাণ্ডা করে হাত দিয়ে কচলিয়ে গলিয়ে নিতে হবে।
৬। অধিকাংশ আঁশ (৮০% এর বেশি) ফেলে দিতে হবে।
৭। মসলাগুলো আলাদাভাবে ভেজে নিয়ে গুঁড়া করে চালতার পরিমাণ অনুযায়ী মেপে নিতে হবে।
৮। কচলানো চালতার পাল্পের সাথে পরিমাণমতো চিনি মিশিয়ে রান্না করতে হবে এবং ঘন ঘন নাড়তে হবে।
৯। যখন পাল্প ঘন হয়ে (টিএসএস ৫৬০ ব্রিক্রা) আসে তখন লবণ এবং গুঁড়া করা মসলা দিয়ে নাড়তে হবে।
১০। তারপর অ্যাসিটিক এসিড যোগ করতে হবে।
১১। যখন জ্বাল দেয়া পাল্প ঘন হয়ে (টি এস এস ৬২০ ব্রিক্রা) আসে তখন সামান্য পানির সাথে গুলিয়ে প্রিজারভেটিভ হিসেবে সোডিয়াম বেনজয়েট মিশিয়ে এবং ১-২ মিনিট পর জ্বাল বন্ধ করতে হবে।
১২। জীবাণুমুক্ত বোতলে ভরে ছিপি হালকাভাবে লাগিয়ে রাখতে হবে।
১৩। পরের দিন চাটনির উপর মোমের প্রলেপ দিয়ে ছিপি শক্তভাবে লাগিয়ে শুষ্ক ও ঠা-া জায়গায় সংরক্ষণ করতে হবে। (উপকরণ ও পরিমাণ ছক-২ দেখানো হয়েছে)
আনারসের জেলি : আনারসে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, বি এবং সি থাকে। উৎপাদন মৌসুমে অধিক পরিমাণে উৎপাদিত হওয়ায় এবং পচনশীল বিধায় এর মূল্য কমে যায় এবং প্রচুর পরিমাণে নষ্ট হয়। কিন্তু যদি আনারস প্রক্রিয়াজাত করা যায় তাহলে এর সংরক্ষণ কাল বেড়ে যায় বহুগুণে। যেমন আনারস থেকে উন্নতমানের জেলি তৈরি করা যায়। জেলি খুবই সুস্বাদু ও দেখতে আকর্ষণীয়।

 

প্রস্তুত প্রণালি
১। পাকা আনারস ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।
২। খোসা ছাড়িয়ে টুকরো করতে হবে।
৩। টুকরোগুলো হাত দিয়ে চাপ দিয়ে পাল্প আলাদা করে নিতে হবে।
৪। পরিমাণ অনুযায়ী সকল উপকরণ নিতে হবে।
৫। পেকটিনের দ্বিগুণ পরিমাণ চিনি মেপে নিয়ে আলাদা করে রাখতে হবে।
৬। একটি সসপ্যানে পাল্প ও চিনি একত্রে মিশিয়ে জ্বাল দিতে হবে।
৭। কিছু ঘন হয়ে আসলে (টিএসএস ৫৫০ ব্রিক্রা) পেকটিন অবশিষ্ট চিনির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে পাত্রে যোগ করে ভালোভাবে নাড়তে হবে।
৮। আরো ঘন হলে (টিএসএস ৫৮০ ব্রিক্রা) সাইট্রিক এসিড যোগ করতে হবে।
৯। জেলি তৈরি হয়ে আসলে (টিএসএস ৬৫০ ব্রিক্রা) সামান্য পরিমাণ পানির সাথে সোডিয়াম বেনজয়েট গুলিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।
১০। জীবাণুমুক্ত বোতলে গরম অবস্থাতেই ঢালতে হবে। ঠাণ্ডাহয়ে আসলে উপরে মোমের প্রলেপ দিয়ে ছিপি এঁটে সংরক্ষণ করতে হবে। (উপকরণ ও পরিমাণ ছক-৩ দেখানো হয়েছে)

 

ড. বাবুল চন্দ্র সরকার১ ড. মদন গোপাল সাহা২ ড. মো: আতিকুর রহমান৩  

১প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মোবা : ০১৭১৬০০৯৩১৯ ২মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মোবা : ০১৫৫২৪৫০১৬২ ৩ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মোবা : ০১৭৪৩১৩৪৫৮৪, ফল বিভাগ, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বারি, গাজীপুর

ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ

বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের প্রায় ৮০% জনগণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি অনেকটাই কৃষিনির্ভর। বিভিন্ন কৃষি পণ্য উৎপাদনের জন্য যেসব অনুকূল পরিবেশগত উপাদান প্রয়োজন তার সবই এখানে আছে। কৃষি পণ্যের মধ্যে বাংলাদেশে উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের ফল একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। দেশীয় ফলের পাশাপাশি বিদেশি ফলেরও সাফল্যজনক আবাদ চলছে। আমাদের দেশে সারা বছরই কোনো না কোনো ফল পাওয়া যায়। কোনো কোনো ফলের আবাদ হয় সারা বছর। তবে অধিকাংশ ফলই মৌসুমি। মৌসুমি ফলের মধ্যে ইতোমধ্যে কয়েকটি ফলের আবাদ অন্য ঋতুতেও শুরু হয়েছে। ফলভেদে পুষ্টিগুণ, ঔষধিগুণ, ঘ্রাণ, বর্ণ, স্বাদ এসবের ভিন্নতা আমাদের দেশের ফলে এনেছে বৈচিত্র্য।

স্বাস্থ্য সংরক্ষণে পৃথিবীতে যত খাবার আছে সেগুলোর মধ্যে গুরুত্বের দিক দিয়ে ফলের স্থান সবার ওপরে। কার্বহাইড্রেট ও প্রোটিনের উপযুক্ত মাত্রায় অবস্থিতির পাশাপাশি আছে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ লবণের সুষম অবস্থান। তাই শরীর সুস্থ ও সবল রাখতে ফলের প্রয়োজনীয়তার কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কাজেই সারা বছর ফলের আবাদ ও প্রাপ্যতার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। ফলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মানুষের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় উপকারী পুষ্টি উপাদানের অধিকাংশই বিভিন্ন ফলে আছে। প্রাকৃতিকভাবেই অধিকাংশ ফলে চর্বি ও সোডিয়াম কম থাকে, কোলেস্টেরল থাকে না বললেই চলে। ফলে পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে পটাসিয়াম, খাদ্য আঁশ, ভিটামিন সি ও ফলিক এসিড। ধারণ করা হয়, শরীরের জন্য উপকারী হাজারও রকমের যৌগ ফলে থাকে, যা এখন পর্যন্ত নির্নীত হয়নি।
ফলে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান যেভাবে আমাদের শরীরে কাজ করে তাহলো পটাসিয়ামসমৃদ্ধ ফল গ্রহণ করলে নিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ বজায় থাকে এবং কিডনিতে পাথর জন্মানোর ঝুঁকি কমে যায়। পটাসিয়ামসমৃদ্ধ ফলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- কলা, কমলা, বরই, পিচফল ও বিশুষ্কিত খেজুর। ফলের খাদ্য আঁশ রক্তের কোলস্টেরল কমায় এবং ফলশ্রুতিতে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে যায়। এটি কোষ্ঠকাঠিন্য কমিয়ে থাকে। খাদ্যে আঁশ পেতে হলে ফলের জুস না খেয়ে পুরো ফল খাওয়ার ওপর অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। ভিটামিন সি দৈহিক কোষ বৃদ্ধি ও মেরামতে ভূমিকা রাখে। দেহের জখম নিরময় ও দাঁত সুস্থ রাখতে কাজ করে। দেহের মুক্ত রেডিক্যাল প্রশমনে এটি এন্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল হলো কমলা, আম, আপেল ও আঙুর। ফলিক এসিড দেহের লাল রক্তিকনিকা তৈরিতে ফলেট ভূমিকা রাখে। গর্ভবর্তী মেয়েদের জন্য এটি খুবই গুরত্বপূর্ণ। ফলেটসমৃদ্ধ ফল হলো- কমলা ও কলা। প্রোটিন দেহকোষ তৈরি ও ক্ষয়পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এনজাইম, জিন ও হরমোন তৈরিতে প্রোটিন সহযোগিতা করে। প্রোটিনসমৃদ্ধ ফল হচ্ছে খেজুর, ডুমুর ও চীনাবাদাম। কিছু কিছু চর্বি শরীরে উপকারী ভূমিকা রাখে এবং এরা অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড সরবরাহ করে। এ ধরনের চর্বি অধিকাংশ ফলে আছে। চর্বি শরীরে ভিটামিন এ, ডি ও ই-এর শোষণে ভূমিকা রাখে। যেসব ফলে অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড থাকে সেগুলোর মধ্যে জলপাই, চীনাবাদাম ও বিভিন্ন ধরনের বীজ উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশে ১৩০টিরও বেশি ফল আছে। তার মধ্যে কিছু বেশি উল্লেখযোগ্য ফল হলো আম, আনারস, কাঁঠাল, কালজাম, নারিকেল, কলা, পেয়ারা, লিচু, জলপাই, আঙুর, বাতাবিলেবু, খেজুর, তাল, বেল, তরমুজ, বরই, তেঁতুল, আমড়া, পেঁপে, কমলা এসব। ফল খেলে আমাদের যেসব উপকার হয়
ক. শরীরে সুস্থতা প্রদান করে গ্রহণযোগ্য ওজন বজায় রাখতে সহায়তা করে; হৃদরোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে; কোলস্টেরল ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কাজ করে; বয়স বাড়ার সাথে হাড়ের যে ক্ষয় হয় তা কমিয়ে দেয়; কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়; মানসিক অস্থিরতা ও বিষণœতা প্রশমনে ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়া ফল চাষে জন্য যথেষ্ট উপযোগী।
বিভিন্ন চিত্তাকর্ষক বর্ণ ও ঘ্রাণ আমাদের ফলে এনেছে বিশষে ধরনের বৈশিষ্ট্য। বর্ণভেদে মানবদেহে ফলের উপকারেও ভিন্নতা রয়েছে। কয়েকটি বর্ণের ফলের কার্যকারিতা এমন-
নীল বা বেগুনি-লাল : এ বর্ণের ফলে স্বাস্থ্য সুরক্ষার সাথে জড়িত বিভিন্ন মাত্রায় ফাইটোকেমিক্যাল যেমন এনথোসায়ানিন ও ফিনোলিক থাকে। এসব যৌগ এন্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। নীল বা বেগুনি-লাল বর্ণের ফল ব্যবহারে- কিছু কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে; মূত্রাশয় নালি ভালো থাকে; স্মৃতিশক্তি উন্নত হয়। লাল বা বেগুনি-লাল বর্ণের ফলের মধ্যে রয়েছে: কালজাম, বিশুষ্কিত বরই, বেগুনি-লাল বর্ণের ডুমুর, বেগুনি-লাল বর্ণের আঙুর ও কিশমিশ। সবুজ ফলে লিউটিন ও ইনডোল ফাইটোকেমিক্যাল থাকে। এ বর্ণের ফলের উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে- কিছু কিছু ক্যান্সার প্রতিরোধ করে; দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে; হাড় ও দাঁত শক্ত রাখে। সবুজ ফলের মধ্যে সবুজ আপেল, সবুজ আঙুর, লেবু, সবুজ নাশপাতি ও অ্যাভোকেডো উল্লেখযোগ্য। সাদা ফল : সাদা ও বাদামি ফল বিভিন্ন মাত্রায় ফাইটোমিক্যাল বহন করে। রসুনে এলিসিন এবং মাশরুমে সেলেনিয়াম থাকে। এ নিয়ে যথেষ্ট গবেষণার সুযোগ রয়েছে। এ ধরনের ফল থেকে যেসব উপকার পাওয়া যেতে পারে তা হলো- হৃৎপি- সুস্থ থাকে; কোলস্টেরল মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে; কিছু কিছু ক্যান্সার প্রতিরোধে কাজ করে। উল্লেখযোগ্য সাদা ফল হচ্ছে- কলা, বাদামি নাশপাতি, খেজুর ও সাদা পিচফল।
হলুদ বা কমলা ফল : এ বর্ণের ফল বিভিন্ন মাত্রায় এন্টিঅক্সিডেন্ট যেমন ভিটামিন ‘সি’ বহন করে। অন্যান্য এন্টিঅক্সিডেন্ট হলো- ক্যারোটিনয়েড ও বায়োফ্লাভোনয়েড। এগুলোর উল্লেখযোগ্য কাজগুলো হলো- হৃৎপি- ভালো রাখে; দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে; রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে; কিছু কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। হলুদ বা কমলা বর্ণের ফলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- হলুদ আপেল, হলুদ ডুমুর, লেবু, আম, কমলা, পেঁপে, পিচ, হলুদ নাশপাতি, আনারস, হলুদ তরমুজ, মিষ্টিকুমড়া ও হলুদ টমেটো। লাল ফল : এ ধরনের ফলে বিদ্যমান ফাইটোকেমিক্যাল হলো- লাইকোপেন ও এনথোসায়ানিন। লাল ফলের উল্লেখযোগ্য কাজগুলো হলো- হৃৎপি- ভালো রাখে; স্মৃতিশক্তি উন্নত রাখে; মূত্রনালী ভালো রাখে; কিছু কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। উল্লেখযোগ্য লাল ফল হচ্ছে : লাল আপেল, লাল কমলা, লাল আঙুর, লাল নাশপাতি, তরমুজ, স্ট্রবেরি ও টমেটো। তবে উৎপাদিত ফলের অধিকাংশই মৌসুমি। ফলকে সারা বছর ব্যবহার উপযোগী করতে প্রয়োজন উপযুক্ত সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থাপনা। এতে কৃষির ভিত হবে মজবুত ও বহুমুখী। উৎপাদিত ফলের অপচয় বহুলাংশে হবে রোধ। কৃষক পাবে উৎপাদিত ফলের উপযুক্ত বাজার। দেশে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ পরিসরে গড়ে উঠবে আরও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং সে সাথে ঘটবে অব্যবহৃত বা অপর্যাপ্তভাবে ব্যবহৃত শ্রমের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি। জাতীয় কৃষিনির্ভর অর্থনীতি হবে মজবুত ও গতিশীল।
আমাদের দেশে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কর্মকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ফল ও ফলজাত পণ্য। কাজেই ফলের আবাদ বাড়ানো ও বহুমুখী করা খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের জন্য অনুকূল পরিবেশ বয়ে আনবে। ফল প্রক্রিয়াজাতকরণের কথা বিবেচনা করলে, গাছে পরিপক্ব পাকা ফল নির্বাচন করা দরকার। উন্নতমানের প্রক্রিয়াজাতকৃত পণ্য পেতে এ বিষয় অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। ফল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য আমাদের দেশে থাকা সহায়ক উপাদানসমূহ হচ্ছে-
১. মৌসুমে ফলের সহজপ্রাপ্যতা ও স্বল্প বাজার মূল্য;
২. অন্যান্য দেশের তুলনায় অব্যবহৃত প্রচুর শ্রমের উপস্থিতি ও তার স্বল্পমূল্য;
৩. দেশে ও বিদেশে প্রক্রিয়াজাতকৃত পণ্যের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার ও জনপ্রিয়তা;
৪. এ কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পানি, যা দেশের সর্বত্রই পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে;
৫. মোড়কীকরণ সামগ্রী ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ রাসায়নিক দ্রব্য এখন আমাদের দেশে সহজেই পাওয়া যায়;
৭. সরকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রবর্ধনের ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে বিধায় ক্ষুদ্র পরিসরে খাদ্য বা ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
ফল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পদ্ধতি হচ্ছে-এসেপসিস বা খাদ্য থেকে অনুজীবকে দূরে সরিয়ে রাখা; খাদ্য থেকে অনুজীব অপসারণ; অবায়বীয় অবস্থার সৃষ্টি; শুষ্কীকরণ; নিম্ন তাপমাত্রার প্রয়োগ; উচ্চ তাপমাত্রার প্রয়োগ; রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার; তেজস্ক্রিয় রশ্মির ব্যবহার; অনুজীবের যান্ত্রিক বিনাশকরণ। সংরক্ষিত ফল : বিভিন্ন পদ্ধতিতে খাদ্য সংরক্ষণের যেসব মূলনীতিগুলো অনুসৃত হয়।
  ক. অনুজৈবিক কার্যকলাপে বাধা দেয়া অথবা বিলম্ব ঘটানো;
   ১. অনুজীবকে দূরে সরিয়ে রেখে; ২. অনুজীব অপসারণ করে, যেমন- ছাঁকার মাধ্যমে;
   ৩. অনুজীবের জন্ম বা কার্যকলাপ চালাতে বাধাপ্রদান, যেমন- নিম্ন তাপমাত্রা প্রয়োগ, রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের মাধ্যমে; ৪. অনুজীবকে মেরে ফেলা, যেমন- উচ্চ তাপমাত্রার প্রয়োগ, তেজস্ক্রিয় রশ্মির ব্যবহারের সাহায্যে।
  খ. খাদ্যে স্ব-বিয়োজনে বাধাপ্রদান বা বিলম্বিত করা;
  ১. খাদ্যস্থিত উৎসেচক ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করা, যেমন ব্লাঞ্চিং করে; ২. রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বাধাপ্রদান বা বিলম্বিত করা, যেমন-এন্টিঅক্সিডেন্ট ব্যবহারে অক্সিডেশন রোধ করা।
  গ. কীটপতঙ্গ, পোকামাকড়, প্রাণী বা যান্ত্রিক কারণে খাদ্য নষ্ট হওয়া রোধ করা।
পরিপক্ব কাঁচাফল যেমন- আম, জলপাই, আমড়া এসব ব্যবহার উপযোগী টুকরা করে ১৫-২০% খাবার লবণের দ্রবণে ফুডগ্রেড মোটা প্লাস্টিকের ড্রামে সংরক্ষণ করা যায়। দ্রবণের সাথে ফলের ওজন অনুপাতে প্রতি কেজি ফলের জন্য ১-২ গ্রাম কেএমএস যোগ করলে সংরক্ষণে যথেষ্ট ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। পাকা আম, টমেটো, আনারস, পাকা পেঁপে পাল্প হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। পাল্প ফুটিয়ে ঘন করে ০.০৫% হারে কেএমএস যোগ করে জীবাণুযুক্ত ফুডগ্রেড মোটা প্লাস্টিকের ড্রামে পুরিয়ে সম্পূর্ণ বায়ুরোধী করে ঢাকনা বন্ধ করে নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয়। ফুটন্ত অবস্থায় ভরার কারণে ঠাণ্ডায় পাল্প স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে ড্রামের ভেতরের উপরিভাগে শূন্যাবস্থার সৃষ্টি হয়, যা অনুজীবের কার্যকলাপ চালানোর প্রতিকূল অবস্থা সৃষ্টি করে। ফলে পাল্প অনেক দিন ভালো থাকে।
খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে এসব পদ্ধতিগুলো কখনও এককভাবে এবং অধিকাংশ সময় সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ফল থেকে ব্যবসায়িক ভিত্তিতে যেসব খাদ্যসামগ্রী তৈরি করা হয় সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-চাটনি, আচার, সস, জ্যাম বা জেলি, স্কোয়াশ, জুস, ফ্রুটক্যান্ডি, ফ্রুটলেদার এসব।

 

চাটনি : চাটনি উৎপাদনে ফল বা ফলের টুকরার সাথে এমন পরিমাণে চিনি যোগ করা হয় যাতে চাটনির শেষ অবস্থায় টিএসএস দাঁড়ায় ৫০-৭০%। বিএসটিআই এর আদর্শ মান হচ্ছে চাটনিতে টিএসএস থাকবে কমপক্ষে ৬০%। চাটনির মিষ্টির তীব্রতা গ্রহণযোগ্য মাত্রায় আনার জন্য এসিড, বিশেষ করে সাইট্রিক এসিড যোগ করা হয়। ফলের টকের মাত্রা ও ভোক্তার রুচির ওপর নির্ভর করে সাইট্রিক এসিডের পরিমাণ। চিনির উচ্চ ঘনমান চাটনিতে সংরক্ষক হিসেবে কাজ করে। তাছাড়া তাপ প্রয়োগে চাটনিতে পানির পরিমাণ এতই কমানো হয় যে, অনুজীব জন্মাতে ও বংশবৃদ্ধি করতে বেশ প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হয়। চিনি দীর্ঘসময় ধরে তাপের সান্নিধ্যে থাকলে চিনিতে ক্যারামেলাইজেশন ঘটতে পারে এবং এতে চিনি ও চাটনির স্বাভাবিক প্রকৃতি ও রূপ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শুরুতে কত চিনি যোগ করতে হবে, তা নির্ভর করে ফলের টকমাত্রার ওপর। প্রয়োজনের তুলনায় কম চিনি যোগ করলে চাটনি অল্প সময়েই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। চাটনিতে চিনি যেহেতু সংরক্ষক হিসেবে কাজ করে, সেহেতু তেল যোগ করার প্রয়োজন নেই। (চলবে)।
 

কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম*
*উপপরিচালক (গণযোগাযোগ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫


Share with :

Facebook Facebook