কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনে আকবর আলীর সাফল্য

পরিশ্রমী আত্মপ্রত্যয়ী মো. আকবর আলী রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলায় কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের গোগ্রাম ইউনিয়নের রানীনগর ব্লকে কর্মরত উপসহকারী কৃষি অফিসার। প্রায় ৩০ বছর ধরে কৃষির সঠিক দিকনির্দেশনা আর কৃষির উন্নত প্রযুক্তিগুলো বরেন্দ্রের মাটিতে সম্প্রসারিত করে পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনে পেয়েছেন ব্যাপক সাফল্য। ইতোমধ্যে কৃষি সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ তার মাঠভিত্তিক কার্যক্রম সরেজমিন পরিদর্শন করে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। থেমে নেই তার নতুন বিপ্লবের অগ্রযাত্রা। সরকারি দায়িত্ব পালনে নেই কোনো অবহেলা, নেই কর্তৃপক্ষের কোনো নির্দেশ পালনে কার্পণ্যতা। সার্বক্ষণিক চিন্তা কৃষি-কৃষক ও কৃষি উন্নয়নে নিবেদিত প্রাণ হয়ে বেঁচে থাকা। তার প্রবল ইচ্ছা কৃষকের পেঁয়াজ বীজের দুষ্প্রাপ্যতা ও ব্যাপক কল্পে অর্থ উপার্জনের পথে তাকে সম্পৃক্ত করে তোলে। পাশাপাশি সৎ উপায়ে জীবন-জীবিকার পথ অন্বেষণে স্বাবলম্বী হওয়া। কথা হচ্ছিল এমন একজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার সাথে।
 

প্রশ্ন : পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের উদ্যোগ আপনি কেন এবং কিভাবে নিলেন?
উত্তর : মা মাটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। গ্রামাঞ্চলের মাটি, সোনার চেয়ে খাঁটি। গ্রামের সহজ সরল কৃষক-কৃষাণীরা অক্লান্ত পরিশ্রমে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে ফসল উৎপাদন করলেও সফলতা অর্জন করতে পারে না, শুধুমাত্র ভিত্তি বা প্রত্যয়িত বীজের অভাবে। তখন থেকেই চিন্তা ভালোমানের বীজ উৎপাদন করে কৃষকদের মাঝে সরবরাহ করা, এতে কৃষক উপকৃত হবে পাশাপাশি নিজেরও আর্থিক সচ্ছলতা আসবে। সরকারি পেঁয়াজ বীজের স্বল্পতা, বিশ্বস্ত বীজ বিক্রয় কেন্দ্রের কেনা বীজে বেশির ভাগ কৃষকই প্রতারিত হয়ে থাকেন। এসব বিবেচনায় ১৯৯৬ সালে প্রায় ১ বিঘা জমিতে নিজেই পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন শুরু করি। উৎপাদিত বীজ থেকে স্থানীয় কৃষকের চাহিদা মিটিয়ে ব্যয় বাদে প্রায় ৩০ হাজার টাকা লাভ করি। সেই থেকে শুরু হলো সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অবসর সময়ে অর্থ উপার্জনের টার্নিং পয়েন্ট। এরপর থেকে প্রতি বছর খরচ-খরচা বাদে ৪-৫ লাখ টাকা উপার্জন করে আসছি।

 

প্রশ্ন : এ বছর আপনি আপনার ব্লকে কতটুকু বীজ উৎপাদন করেছেন এবং কতজন কৃষককে এ বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করেছেন?
উত্তর : তিনি জানান, রানীনগর ব্লকে মোট আবাদি জমি হচ্ছে প্রায় ২২২০ হেক্টর। গত বছর যেখানে মাত্র ৫০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন হয়েছিল। এবার কিন্তু প্রায় ৫০০ হেক্টর জমিতে কৃষকেরা পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন করেছেন। কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, গত বছর আমি নিজে ৮ বিঘা জমিতে পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন করে আয়-ব্যয় বাদে প্রায় ৫ লাখ টাকা উপার্জন করি। তা দেখে এবার এলাকায় অনেক কৃষকই আগ্রহী হয়ে বীজ উৎপাদনের ব্যবস্থা নিয়েছে। আশা করি আমার মতো তারাও বেশ লাভবান হবেন। বাবুল ডিলার, শুভ, ভুলু, জিয়া, আবু বক্কর, মুর্শেদ, হাসান, নাসিম, আজাহারসহ এ পর্যন্ত ব্লকের প্রায় ১৮০ জন আদর্শ পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনকারী কৃষককে বীজ উৎপাদনের কলাকৌশল সম্পর্কে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এছাড়া ইউনিয়ন কৃষি কমপ্লেক্সে নিয়মিত রুটিন মাফিক কাজের পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন ব্লকের প্রায় ৮০০ জন পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনকারী কৃষককে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছি। প্রশিক্ষণ প্রদানের ফলে এবার উপজেলায় প্রায় ১,২৫০ হেক্টর জমিতে কৃষকেরা পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন করেছে, যেখানে গত বছর গোটা উপজেলায় মাত্র ২-৩শত হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন করা হয়েছিল। ফলে এ দিক থেকে এটা একটা বিরাট সাফল্য বলে আমি মনে করি।

 

প্রশ্ন : পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনের কলাকৌশল সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতার কথা কিছু বলুন?
উত্তর : এ বছর আমি নিজের ১২ বিঘা জমিতে পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন করেছি। স্থানীয় দুটি জাত, জাত দুটি হচ্ছে- তাহেরপুরী ও তাহেরপুরী কিং। স্থানীয় জাত হলেও জাত দুটি রোগ প্রতিরোধী এবং ফলনশীল। নিজ জেলা ও জেলার বাইরে এ দুটি বীজের চাহিদা ও জনপ্রিয়তা খুবই বেশি।
চাষাবাদ কৌশল : পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের জন্য পানি সেচ সুবিধা আলো-বাতাস ঠিকমতো থাকে এরকম উর্বর দো-আঁশ ও এঁটেল মাটি নির্বাচন করে কমপক্ষে ৪-৫টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে তৈরি করে নিতে হবে।
জমি তৈরির সময় পর্যাপ্ত পচা গোবর বা আবর্জনা পচা সার ও শেষ চাষে বিঘাপ্রতি ইউরিয়া সার ৩৫ কেজি, টিএসপি সার ২৭ কেজি, এমওপি সার ২০ কেজি, জিপসাম সার ১ কেজি, বোরন সার ২ কেজি ছিটিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।
বীজ হিসেবে পেঁয়াজের বাল্ব/কন্দ ব্যবহার হয়ে থাকে আর বিঘাপ্রতি ৫-৬ মণ বীজ লাগে। (মণপ্রতি তাহেরপুরী বীজেরমূল্য ২৩০০ ও তাহেরপুরী কিং বীজের মূল্য ২৭০০ টাকা। ১২ বিঘা জমিতে দুই জাতের বীজ লেগেছে মোট ১২০ মণ যার মূল্য প্রায় ৩ লাখ টাকা।
পুরো নভেম্বর মাস বীজ উৎপাদনের জন্য কন্দ/বাল্ব রোপণের উপযুক্ত সময়। জমির আকার অনুসারে প্লট করে প্রতি প্লটে ৩-৪টি সারি বা লাইন করে নিতে হবে। লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ২৫ সেমি. বা ১০ ইঞ্চি। প্রতি সারিতে ১৫ থেকে ২০ সেমি. বা ৬-৮ ইঞ্চি দূরে দূরে (মাতৃ বাল্ব) বীজ বা কন্দ রোপণ করতে হবে।
বীজ রোপণের ৩০ দিন পর প্রতি বিঘায় ১ম দফায় ৬০ কেজি ইউরিয়া ও ২০ কেজি এমওপি সার একত্রে এবং ৬০ দিন পর ২০ কেজি ইউরিয়া ও ১০ কেজি এমওপি সার একত্রে উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে হালকাভাবে পানি সেচ দেয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে।
পেঁয়াজের জীবন চক্র যাতে ব্যাহত না হয় তার জন্য ঘন ঘন ক্ষেত পরিদর্শন করে দুর্বল ও রোগাক্রান্ত গাছগুলো উঠিয়ে ফেলতে হবে। ছত্রাকজনিত পাপল ব্লচ রোগ দমনে ১০-১২ দিন পর পর রোভরাল/রিডোমিল এম জেড-৭২ একত্রে স্প্রে করে দিতে হবে।  
বীজ/বাল্ব রোপণ থেকে বীজ সংগ্রহ পর্যন্ত ১৬৫ থেকে ১৭০ দিন সময় লাগে।

 

জনাব আকবর আলী জানান, এ পর্যন্ত তার ১২ বিঘায় বীজ খরচ ৩ লাখ টাকা, চাষ, সেচ, লেবার ও আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা সর্বমোট ৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বিঘাপ্রতি ১০০ থেকে ১২০ কেজি বীজ পাওয়া যাবে। গড়ে বিঘাপ্রতি ১২৫ কেজি মানসম্মত বীজ পেলে এবং প্রতি কেজি গড়ে ২০০০ টাকা দরে বিক্রি হলে ৩০ লাখ টাকা পাওয়া যাবে, যা খরচ বাদে তার ২০-২২ লাখ টাকা লাভ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
 

প্রশ্ন : বীজ উৎপাদন কৌশল ও উৎপাদিত বীজ  সরবরাহে কৃষক সমাজ কতটুকু অনুপ্রাণিত ও উপকৃত হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
উত্তর : এক কথায় বলা যায়, শতভাগ না হলেও আশি ভাগ কৃষক বর্তমানে পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের সাথে জড়িত। বর্তমানে উপজেলার প্রায় ৪-৫ হাজার কৃষক এখন প্রায় ১২৫০ হেক্টর জমিতে বীজ উৎপাদন করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এবং আশা করি লাভবান হবেন। তিনি আরও জানান, নিজ এলাকা ছাড়াও সাঁথিয়ার রব্বানী, ওসমান ও ওহাব পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনকারী চাষি এবং ফরিদপুরের সালতা থানার হারুন অর রশিদ পেঁয়াজ চাষি ইতোমধ্যে তার সাথে পেঁয়াজের বীজ ক্রয়ের জন্য যোগাযোগ স্থাপন করে রেখেছে।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জনাব আকবর আলীকে শুধু ব্লকের কৃষকেরাই চিনে তা নয়, জেলা উপজেলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের কৃষকেরা পেঁয়াজ আকবর হিসেবে তাকে চিনে। সে প্রতি বছর ৪-৫ লাখ টাকা আয় করে থাকে। মেধা ও শ্রমের বিনিময়ে/অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী আকবর আলী তার দুই সন্তানকে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে গড়ে তুলেছেন। পরিশ্রমই সৌভাগ্যের সোপান, শ্রম  কখনও বিফলে যায় না। মেধা, শ্রম ও কৃষির উন্নত প্রযুক্তিকে সতর্কতার সাথে কাজে লাগিয়ে অনায়াসে যে কেউ আকবর আলীর মতো বীজ শিল্পের উন্নয়নের পাশাপাশি সচ্ছলভাবে জীবন-জীবিকার পথে অগ্রসর হতে পারবে।

তুষার কুমার সাহা*
* এআইসিও, কৃষি তথ্য সার্ভিস, রাজশাহী

 


Share with :

Facebook Facebook