কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

পাট ফসলে আগাম ফুল : কারণ ও প্রতিকার

পাট বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল। পাটের ব্যবহারিক উপযোগিতা, অর্থনৈতিক গুরুত্ব ইত্যাদি বিবেচনা করে পাটকে ‘সোনালী আঁশ’ বলে অভিহিত করা হয়। পাট ও পাট জাতীয় আঁশ ফসল সারা বিশ্বে তুলার পর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক আঁশ ফসল হিসেবে অবস্থান করছে। আট থেকে ১০ মিলিয়ন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাট ও এ জাতীয় আঁশ ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ৫-৬% আসে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে। এ ফসল নিজেই মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।  বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৭.৫-৮.০ লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হয় যা থেকে প্রায় ৮০ লাখ বেল পাট আঁশ উৎপন্ন হয়ে থাকে। বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় শতকরা ১০-১২ ভাগ পাট চাষ এবং পাটশিল্প যেমন প্রক্রিয়াকরণ, আঁশ বাঁধাই, গুদামজাতকরণ, স্থানান্তর ও বিপণন ইত্যাদি কাজের সাথে জড়িত।

বাংলাদেশে প্রধানত দুই প্রকার পাট ফসল চাষ হয়। একটি তোষা ও অন্যটি দেশি বা সাদা পাট। দেশি পাটের পাতার স্বাদ তিতো এবং ফলগুলো গোলাকার এবং খাঁজকাটা। এ পাট নিচু জমিতে উৎপাদন করা যায় এবং পরিপক্ব অবস্থায় কয়েক ফুট পানির নিচে থাকতে পারে। তবে তোষা পাটের পাতার স্বাদ তিতো হয় না এবং এর ফল লম্বা ক্যাপসুলের মতো হয়, আগা চোখা। এ পাট কোনো অবস্থাতেই গোড়ায় পানি জমা সহ্য করতে পারে না তাই নিচু জমিতে এ পাট চাষ করা য়ায় না ।
সাধারণত দেশি পাট ১৫ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত এবং তোষা পাট ১৫ এপ্রিল থেকে ১৫ মে পর্যন্ত বপন করার উপযুক্ত সময়। তবে জাতভেদে এ সময়ের কিছু পার্থক্য দেখা যায়। যদি কোনো পাটের জাত তার উপযুক্ত সময় এর চেয়ে আগাম বপন করা হয় তবে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয় এবং শেষ পর্যন্ত ফলন কমে যায়। যখন পাটের জাত সময় মতো বপন করা হয়, তখন সাধারণত ফুল আসে আগস্ট মাস, অর্থাৎ তখন দিনের আলোর দৈর্ঘ্য কমতে শুরু করে। পাট হলো একটি খাটো দিন দৈর্ঘ্য ফসল। তাই পাট ফসলও অন্যান্য স্বল্প দৈর্ঘ্য দিনের ফসলের ন্যায় ফটো পিরিয়ড (আলোক দৈর্ঘ্য) সংবেদনশীল।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, খরা বা অন্য কোনো বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয় এমন কোনো পরিবেশে পাট চাষ করলে, সেই পাট ফসলে আগাম বা অপরিপক্ব অবস্থায় ফুল চলে আসে। নিচু জমিতে বপন করা পাটে অথবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আগাম বৃষ্টি/বন্যার সময় যখন চাষিরা আগাম পাট বপন করে অর্থাৎ উপযুক্ত সময়ের আগেই, তখন ওই পাট ফসলের জমিতে ১-২ ফুট উচ্চতাসম্পন্ন গাছেই ফুল দেখা দেয়। বিশেষ করে এ আগাম ফুল দিনের স্বল্প আলোক দৈর্ঘ্যরে তারতম্যের জন্যই হয়ে থাকে।
আগাম ফুল আসার মূল কারণগুলো হলো-
১. পাট জাতের উপযুক্ত সময়ের পূর্বে বপন করা ।
২. লম্বা খরা, শুষ্ক বায়ু প্রবাহ, কোনো কারণে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, মাটির দুর্বল উর্বরতাশক্তি, জলাবদ্ধতা, মেঘাচ্ছন্ন-আবহাওয়া, দিনরাতের তাপমাত্রার পার্থক্য খুবই কমে যাওয়া ইত্যাদি।
আগাম ফুল পাট ফসলের ওপর প্রভাব-
১. পাটের গাছের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়।
২. শাখা-প্রশাখা জন্মানো শুরু হয়।
৩. খুবই দ্রুততার সাথে ফলন ও আঁশের মান খারাপ হয়।

 

বাংলাদেশে মার্চের শেষে দিনের দৈর্ঘ্য হয় প্রায় ১২ ঘণ্টা এবং এপ্রিলের মাঝা মাঝি অর্থাৎ ১৫ এপ্রিল এ দৈর্ঘ্য হয় ১২.৫ ঘণ্টার ওপরে। মার্চের শেষে দেশি এবং মধ্য সময়ে তোষা পাট জাত বপন করলে অপরিপক্ব অবস্থায় ফুল আসার ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। অনেক সময় মাঠের মধ্যে কিছু গাছে  এদিক সেদিক আগাম ফুল দেয়া যায়। এটা আঁশ উৎপাদনের জন্য তেমন প্রভাব ফেলে না। কারণ আগাছা পরিষ্কার বা গাছ পাতলাকরণের সময় সেগুলো তুলে ফেলা হয় অথবা এ অবস্থাতেই বাড়তে দেয়া যায় মধ্য আগস্ট পর্যন্ত ফসল প্রয়োজনীয় ফুল আসা শুরু হয়। এ সময় দিনের দৈর্ঘ্য কমতে শুরু করে এবং কমতে কমতে ১২.৫ থেকে ১২ ঘণ্টায় পৌঁছায়। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত দেশি ও তোষা (আঁশ উৎপাদনের জন্য) পাটের জাত ও প্রকৃত বপন সময় ছক-১ এ দেখান হলো।    
পাটের দেশি তোষা উভয় জাতই স্বল্প দিন দৈর্ঘ্যরে ফসল। দিন দৈর্ঘ্য ১২.৫ ঘণ্টা বা তার নিচে হলেই পাট ফসলে আগাম ফুল আসবে। লম্বা দিন দৈর্ঘ্য যেমন ১২.৫ ঘণ্টা বা তার বেশি হলে ফুল আসা বিলম্বিত হয়। দিন দৈর্ঘ্য ১০-১২ ঘণ্টা হলে ৩০-৩৫ দিন বয়সের যে কোনো পাট গাছে ফুল চলে আসে। এরূপ দিন দৈর্ঘ্যর প্রভাব দেশি পাটের চেয়ে তোষা পাটে বেশি পরিলক্ষিত হয়।
পূর্বে দেখা গেছে, দেশি জাত সি-৬ এবং ডি-১৫৪ যদি মধ্য বা শেষ মার্চের পূর্বে বপন করা হতো তবে আগাম ফুল দেখা দিত এবং তোষার জাত ও-৪ যদি মধ্য এপ্রিলের পূর্বে বপন করা হতো তবে অপরিপক্ব ফুল দেখ দিত (আহমেদ, ১৯৮৯)। বাংলাদেশে মার্চের শেষ পর্যন্ত দিনের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ ঘণ্টা থাকে এবং এটা মধ্য এপ্রিলের সময়েই বৃদ্ধি পেয়ে ১২.৫ ঘণ্টার ওপরে চলে যায়। তাই দেশি পাট মার্চের শেষ সময় থেকে এবং তোষা পাট মধ্য এপ্রিল থেকে বপন শুরু করলে এ অপরিপক্ব আগাম ফুল এর প্রভাব থাকে না। যদিও ফসলের মাঠে এদিক-সেদিক কিছু গাছে ফুল দেখা দিলেও তা আঁশ উৎপাদনে তেমন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে না।

 

অপরিপক্ব বয়সের ফুলের জন্য দায়ী বিষয়গুলো
১. যেহেতু পাট স্বল্প দিবা দৈর্ঘ্য সহিষ্ণু ফসল, তাই দেশি পাটের কিছু জাত মধ্য-মার্চের পূর্বে এবং কিছু জাত শেষ মার্চের পূর্বে বপন করলে আগাম ফুল দেয়। তেমনি তোষার ও-৪ জাতটি যদি মধ্য এপ্রিলের পূর্বে বপন করা হয় তবে গাছে ফুল আসে।
২. তোষা জাতের পাটের ফসলের শতকরা কিছু গাছ অপরিপক্ব অবস্থায় ফুল দেখা দিয়ে থাকে। তবে সেগুলো জাতের সাথে কৌলিক বিশুদ্ধতায় ভিন্ন হয়, সেগুলো পাতার চেহারা দেখে চেনা যায় আবার অনেক সময় পার্থক্য করাও কঠিন হয়। এগুলো সাধারণত লোকাল জাতের সাথে বা বীজ উৎপাদনের সময় স্বল্প দূরত্বে থাকায় ক্রস পলিনেশনের ফলে তৈরি হয়ে থাকে। এ রকম অনেক সময় প্রজনন বীজের মধ্যেও পাওয়া যায়।
৩. উচ্চ উর্বরতা ও আর্দ্রতা থাকা, মাটিতে পাট বীজ বপন করলে স্বাস্থ্যগত কারণেই গাছের জন্ম ও বৃদ্ধি দ্রুত হয় এবং সাথে সাথে আগাম ফুলও দেখা দেয়, যা ক্রিটিক্যাল ফটোপিরিয়ডে পরে বপন করলে দেখা যায় না।
বোর্স (১৯৭৪-৭৬) এক প্রতিবেদনে লিখেছেন, দেশি ও তোষা উভয় পাটের ফুলই দিবারাত্রির তাপমাত্রার পার্থক্যের জন্য তাপমাত্রাগুলো যেমন ৩২/২৭, ২৭/২৭, ২৪/২৪ ডি.সে. এর সাথে রাতের তাপমাত্রাখান ১৭ ডি.সে. পার্থক্য বিবেচনা করা হয়। এ অবস্থায় প্রায় ২০ দিন আগেই ফুল চলে আসে। অথচ ৯ ঘণ্টা ফটোপিড়িয়ড এ ফুল চলে আসে যা বাংলাদেশর সাধারণ স্বল্প দৈর্ঘ্য দিন ১০ ঘণ্টার চেয়ে অনেক কম।
ওয়াসেক  (১৯৮২) প্রতিবেদন করেছেন যে, পানির স্বল্পতার প্রভাব পাটের বেশি ফুল আসাকে বিলম্বিত করে, যেখানে খরা আরো বেশি প্রভাব ফেলে। আবার গোট্রিজ (১৯৬৯) বলেছেন পানির স্বল্পতা পাটে দ্রুত ফুল আসাকে প্রভাবিত করে। জোহানসেন (১৯৮৫) বলেন পাটের আঁশের ফলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হলো পাট ফসলের ফুল ধরার সময়টি। কারণ ফুল আসার সাথে সাথে পাট গাছের কাণ্ডের উপরি অংশে শাখা প্রশাখার বিস্তার ঘটে এবং প্রধান কাণ্ডের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। পাটের স্বল্প দিবা দৈর্ঘ্যর ফুল আসা সাধারণত নির্ভর করে দেশি পাটের জন্য প্রায় ১২ ঘণ্টা এবং তোষা পাটের জন্য ১২.৫ ঘণ্টা। তিনি আরও বলেন তাপমাত্রার বৃদ্ধি বিশেষ করে রাত্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে পাট ফসলে দ্রুত ফুল আসে। বিশেষ করে রাতের তাপমাত্রা যদি ২০ ডি. সে. এর কম হয় তবে মাটি থেকে চারা গজানো এবং ছোট বয়সের পাট গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, ফলে অল্প বয়সেই ফুল আসার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

 

অনেকের মতে, বীজের বয়স পাট ফসলে ফুল আসার জন্য দায়ী। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, ১-২ বছরের পুরাতন বীজ অথবা নতুন বীজ, যে কোনো বীজ যদি তার অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা ভালো থাকে (৮০% এর উপরে) তবে কোনো ফুল আসে না এবং সমান বৃদ্ধি ও ফলন হয়। বিজেআরআই এর উদ্ভাবিত অনেক জাত আছে যেমন বিজেআরআই দেশি পাট-৫, ও-৯৮৯৭, বিজেআরআই তোষা পাট-৪, বিজেআরআই তোষা পাট-৫ ইত্যাদি মাঠে বপন করার পর কিছু আগাম ফুল হলেও তা আঁশের ফলনে বা গাছের বৃদ্ধিতে বা আঁশের গুণগতমানে তেমন কোনো ব্যঘাত ঘটায় না।
শুধু পাট নয় অন্য যে কোনো ফসলের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, গাছের বৃদ্ধির সময় যে কোনো কারণে যদি বৃদ্ধিতে বাধার প্রভাব পরে তবে গাছ দ্রুততার সাথে প্রজনন পর্যায়ে চলে যায় এবং গাছে ফুল দেখা দেয়।
অপরিপক্ব বয়সের ফুলের প্রভাব থেকে প্রতিকার পাওয়ার উপায়  
পাট ফসলের আঁশ উৎপাদনের সময় আগাম/অপরিপক্ব বয়সে ফুল আসা খুবই বিপদজ্জনক। কখনো কখনো এ কারণে পাটের ফলন ও আঁশের মান খারাপ হয় এবং কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক কথায় বলতে গেলে পাটের আগাম ফুলের প্রভাব দূর করতে হলে উপযুক্ত সময়ে বীজ বপন করতে হবে। তাছাড়া  জমির দুর্বল উর্বরতা, জলাবদ্ধতা, খরা, শুষ্ক বায়ু প্রবাহ, দিবা রাত্রির তাপমাত্রার পার্থক্যের পরিমাণ বেশি হওয়া, মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়া ইত্যাদি। এমনকি যদি দিনের আলোক দৈর্ঘ্য তার পরিমিত মাত্রা ছাড়িয়ে য়ায়, তখনও ফুল দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এটা সাধারণত মে, জুন এমন কি জুলাই মাসেও হতে পারে। অতএব, প্রকৃত অর্থে পাট ফসল কে আগাম বা অপরিপক্ব বয়সের ফুল থেকে রক্ষা করতে হলে বিশুদ্ধ পাট জাতের বীজ ব্যবহার করতে হবে এবং উপযুক্ত সময় বীজ বপন করতে হবে। বৃষ্টি না হলে বা কমে হলে, বীজ বপনের পর অন্তত এক বার জমিতে সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। অতিরিক্ত উর্বর না হলেও মোটামুটি উর্বরতা সমৃদ্ধ জমিতে পাট ফসল চাষ করতে হবে। তবেই আমাদের দেশের পাটচাষিদের মানের আশা পূরণ হবে। উচ্চফলন ও ভালোমানের আঁশে কৃষকের মাচা ভরে উঠবে, কৃষক ভাইয়েরা অর্থিকভাবে লাভবান হবেন।

কৃষিবিদ ড. মো. মাহবুবুল ইসলাম*
*মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রধান, কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা-১২০৭। মোবাইল : +৮৮০১৫৫২৪১৬৫৩৭

 


Share with :

Facebook Facebook