কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

সামুদ্রিক শৈবালের চাষ এবং রফতানি

শৈবাল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি মূল্যবান সামুদ্রিক সম্পদ। বিশ্বব্যাপী শৈবাল থেকে খাদ্যপণ্য, ঔষধিপণ্য, প্রসাধনী পণ্য, সার, বায়ো ফুয়েল ও পরিবেশ দূষণরোধক পণ্য উৎপাদন করছে। লবণাক্ত, আধা লবণাক্ত পানির পরিবেশে এটি জন্মে এবং সহজে চাষাবাদ করা যায়। জানা যায়, বাংলাদেশে ১৯টি উপকূলীয় জেলার ১৪৭টি উপজেলায় প্রায় ৩ কোটি লোক বসবাস করে। যাদের অধিকাংশেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সামুদ্রিক সম্পদ আহরণে জড়িত। এদের ন্যূনতম একটি অংশকে শৈবাল চাষে লাগানো গেলে শৈবাল উৎপাদন এবং রপ্তানি করে প্রচুর আয় করা অতি সহজ। ঋঅঙ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী গত বছর বিশ্বে সিউইডের বাজার ছিল ৭ বিলিয়ন ডলারের। এর মধ্যে চীনের দখলে ৫০ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার দখলে ৩৭ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়ার প্রধান রপ্তানি দ্রব্যই হলো সিউইড। বাংলাদেশে সিউইডের উৎপাদনে ও রপ্তানির উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ এখানকার ৭২০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকায় শৈবাল চাষ করা গেলে ২-৩ বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারের একটি অংশ সহজে দখল করা যাবে বলে মনে করেন ফ্যালকন ইন্টারন্যাশনালের উদ্যোক্তা জনাব ওমর হাসান। তার হিসেবে ২ লাখ টন শুকনো শৈবাল রপ্তানি করতে পারলে রপ্তানি আয় দাঁড়াবে ১.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সিউইড দিয়ে খাদ্য হিসেবে নুডলস জাতীয় খাবার, স্যুপ জাতীয় খাবার, সবজি জাতীয় খাবার, শরবত, সল্টেস দুধ, সমুচা, সালাদ, চানাচুর, বিস্কুট, বার্গার, সিঙ্গেরা, জেলি, ক্যান্ডি, চকলেট, পেস্টি, ক্রিমচিজ, কাস্টার্ড, রুটি, পনির, ফিশফিড,  পোলট্রিফিড, সামুদ্রিক সবজি এসব খাবার তৈরি ছাড়াও এগারএগার, কেরাজিনান, এলগ্যানিক এসিড, ক্যালসিয়াম মূল্যবান দ্রব্য ও উৎপাদন হয়। ওষুধ হিসেবে ডায়াবেটিসের ওষুধ, খাদ্য সংরক্ষণের জন্য, ল্যাবরেটরিতে ব্যাকটেরিয়া উৎপাদনের জন্য, চকলেটের উপাদান কোকোর বিকল্প হিসেবে, ক্যান্সারের ওষুধ, গ্যাসট্রিকের ওষুধ তৈরিতে ক্যারাজিনানের বহুবিদ ব্যবহার ছাড়াও আইসক্রিমের উপাদান, ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট শৈবাল থেকে তৈরি করা যায়।
সিউইড বা শৈবালের ৫টি প্রজাতী থেকে গাড়ির ও বিদ্যুতের জ্বালানি হিসেবে বায়োফুয়েল, বায়োইথানল, বায়োহাইড্রোকার্র্বন, বায়োহাইড্রোজেন যা দিয়ে হেলিকপ্টারের জ্বালানি তৈরি করা যায়। এসবের উচ্ছৃষ্ট থেকে বায়োগ্যাস তৈরি হয়। এর উচ্ছৃষ্ট থেকে জৈবসারও তৈরি করা যায়। এদিকে ব্রিটেনের ঘোষণা আগামী ২০২০ সালে এনার্জির ৮০ শতাংশ সিউইড থেকে তৈরি করবে। প্রসাধনী তৈরিতে ও সিউইড ব্যবহৃত হয়। তানজানিয়া শৈবাল নির্ভর ২১টি কারখানা আছে যেখানে সাবান, টুথপেস্ট, প্রসাধনী ক্রিম, কৃত্রিম চামড়া, পেইন্ট, সিল্ক তৈরির ইনসুলেটিং দ্রব্য তৈরি হয়। সার তৈরিতে ও শৈবাল ব্যবহৃত হয়। যেমন চীন, ইন্দোনেশিয়া, কোরিয়া, জাপান, তানজানিয়া, ফ্রান্স, সার উৎপাদন করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করে। জনাব ওমর হাসান ফ্যালকন ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী দীর্ঘ ৮ বছর ধরে শৈবাল নিয়ে চাষ গবেষণা করে চাষ করে ২০১৫ সালে মাত্র ১ মেট্রিক টন রপ্তানির মাধ্যমে ১৬ হাজার মার্কিন ডলার আয় করেন।
গত বছর পর্যন্ত তিনি ১টি প্রজাতীর চাষ করেছেন। এ বছর ২৬ প্রজাতীর শৈবালের চাষ শুরু করেছেন। তা একদম সমুদ্র উপকূলে। সরকার থেকে ৩৭ একর উপকূলীয় জায়গা লিজ নিয়ে পরীক্ষামূলক শৈবালের চাষ শুরু হয়। গত বছর ২০১৫ পর্যন্ত ৮ মেট্রিক টন সিউইড উৎপাদন হয় এবং এ থেকে ১ মেট্রিক টন রপ্তানি করে ১৬ হাজার ডলার আয় হয়। অবশিষ্ট সিউইড  গবেষণা কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। এসব উৎপাদনে আমার খরচ হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এ বছর ২-৩ মেট্রিক টন রপ্তানির চেষ্টা হচ্ছে। আমাদের সমুদ্রে ক্লোরেলা শৈবাল পাওয়া যায়। পাউডার অবস্থায় ১ কেজি ক্লোরেলার মূল্য ৩,৮০০০০ টাকা। এটিও চাষ করা যায়। তবে এটি শুধু ল্যাবরেটরিতে চাষ করা যায়।
বাংলাদেশে যে উৎস আছে তা কাজে লাগে পারলে আগামী ২-৩ বছরে ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সিউইড রপ্তানি করা যাবে তা হবে শুকনা সিউইড। সুইজারল্যান্ডের ঝএঝ ল্যাবরেটরির মতো একটি আইসোলেশন ল্যাবরেটরি করতে পারলে খাদ্য পণ্য ওষুধ শিল্পে ব্যবহারের জন্য এগারএগার, ক্যালজিনন, এলগেনিক এসিড, সাবান, টুথপেস্ট, বেভারিজ ব্যবহারের উপাদান যা বিদেশ থেকে আমদানি করে তৈরি করা যাবে। এসব দ্রব্যাদি এখন বিদেশ থেকে আমদানি করলে ও দেশে উৎপাদিত হলে দেশের চাহিদা পূরণ করে রপ্তানিও করা যাবে। তবে আইসোলেশন ল্যাবরেটারি ছাড়া কিছুই হবে না।
বিশেষজ্ঞরাই শৈবাল থেকে খাদ্যপণ্য, ওষুধ, প্রসাধনী দ্রব্য তৈরি করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করছে। এতে দেশের মূল্যবান মেধা দেশের উন্নয়নের জন্য শতভাগ ব্যবহার করা যাবে। বর্তমানে সিউইডের আন্তর্জাতিক বাজার ৭ বিলিয়ন ডলার।
উৎপাদিত শৈবাল সহজে বিক্রি করতে পারলে তাও শৈবাল বা সিউইড উৎপাদন করবে। সিউইড লাগানোর ১০ দিন পর হারভেস্ট করা যায় অর্থাৎ মাসে ৩ বার কাটা যায়। আর ১ কেজি সিউইড বা শৈবালের আন্তর্জাতিক বাজার দর ১৬ ডলার। ১ একরে একবার হারভেস্ট করে ১০-১৫ কেজি শুকনো শৈবাল পাওয়া যায়। সে হিসাবে এক মাসে ৩ বারে ৪০ কেজি ধরলে শুকনো শৈবাল মূল্য ৪০ঢ১৬ = ৬৪০ ডলার ৬৪০ঢ৮০ = ৫১,২০০/- টাকা। বছরে ৬ মাস চাষ করলে ৫১,২০০ঢ৬ = ৩,০৭,২০০/- টাকা সহজে আয় করা যায়। এখানে সার, কীটনাশক কিছুই লাগে না। আবার জমি হলো সমুদ্র। কোন টাকার দরকার নেই। শুধু শুকনো শৈবাল উৎপাদন করে ২ লাখ টন রপ্তানি করলে ১.৬ বিলিয়ন ডলার আয় করা যাবে। কোস্টট্রাস্ট, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্র, জাহানারা ইসলাম কক্সবাজার, কৃষি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট শৈবাল বা সিউইড নিয়ে গবেষণা করছেন। গবেষণায় বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের বিজ্ঞানীরা গবেষণায় কোষ্টকাঠিন্যসহ পরিপাকতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে, দেহের অতিরিক্ত চর্বি কমাতে (পেটের মেদ) ওজন কমাতে, থাইরয়েড গ্রন্থির যে কোনো সমস্যা সমাধানে স্তন ও অন্ত্রের ক্যান্সার নিরাময় ও প্রতিরোধ, খনিজ ঘাটতি পূরণে, স্টেস, উচ্চরক্ত চাপ, হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে সিউইড থেকে উৎপাদিত ঔষধিপণ্য অতি কার্যকর হিসেবে গণ্য করছেন এবং ঔষধিপণ্য উৎপাদনে সক্ষম হয়েছেন।
আধুনিক একটি আইসোলেশন ল্যাবরেটরি দরকার। এ ল্যাব এ আমরা সিউইড থেকেই মূল্যবান এলগ্যানিক এসিড তৈরি করেত পারব যা অনেক ডলার খরচ করে বিদেশ থেকে আমদানি করে ওষুধ শিল্পের জন্য। এছাড়া এগারএগার, ক্যারোজিনান এবং এলগ্যানিক এসিড বিদেশ থেকে আমদানি করে এটিও বন্ধ হবে। ফুড, বেভারিজ তৈরির জন্য এগারএগার এবং আইসক্রিম তৈরির জন্য ক্যারোজিনান ব্যবহৃত হয়। এসব আমরা সিউইড দিয়ে ল্যাব এ তৈরি করলে অনেক আমদানি খরচ বেঁচে যাবে। এটাও আমাদের আয় এবং এসব রপ্তানি করেও প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যাবে। এছাড়াও মাত্র ২ লাখ টন সিউইড রপ্তানি করে ১.৬ বিলিয়ন ডলার আয় করা যাবে। ল্যাবরেটরিতে উৎপাদিত পণ্যের আয় হবে অতিরিক্ত অর্জন। সিউইড চাষ করা এত সহজ যে, বাচ্চারাও চাষ করতে পারে। এটি চাষের জন্য দরকার শুধু কিছু রশি ও বাঁশের খুঁটি। রশিতে ১০-২০টি সিউইড ১ ফুট দূরে দূরে বেঁধে দিয়ে বাঁশের সাথে দুই পাশের রশি বেঁধে দিলে হয়ে গেল। সমুদ্রের জোয়াভাটার অবস্থা বুঝে ৫-৬ হাত লম্বা বাঁশে ১ হাত পর পর ৪-৫টি রশি বাঁধা যায়। ১০ দিন পর এগুলো ১২-১৪ ইঞ্চি লম্বা হলে কেটে নিয়ে ছায়ায় শুকিয়ে নিলাম। শুকনো সিউইড রশিতে তৈরি হয়ে গেল। ৪-৫ ইঞ্চি করে মাতৃ সিউইড রেখে দিলাম। ১০ দিন পর আবার কাটা যায় এভাবে মাসে ৩ বার কাটতে পারে।
এ পণ্যটির গুরুত্ব অনেক বেশি এবং রপ্তানিতে এর স্থান পোশাক শিল্পের পরে হতে পারে। গবেষকদের মুখে শোনা সরকার যদি উপযুক্ত সুযোগ দেয় পোশাক শিল্পের চেয়ে বেশি আয় সমুদ্র শৈবাল বা সিউইড থেকে আসবে। এতে হাজার কোটি টাকা ঋণের দরকার নেই। শুধু প্রশিক্ষণ ও উৎপাদন, গবেষণা, রপ্তানি নেটওর্য়াক ঠিক করা। কৃষি মন্ত্রণালয় ও মৎস্য মন্ত্রণালয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে; শৈবাল উৎপাদনে কৃষককে অনুপ্রাণিত করবে; উৎপাদিত পণ্য ক্রয়ের জন্য ক্রেতাকে কম সুদে ঋণ এর ব্যবস্থা করে দেবে। যাতে কৃষক উৎপাদিত পণ্য হাতের নাগালে বিক্রি করে নগদ টাকা পায়; প্রতি কেজি শুকনো শৈবালের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে; রপ্তানির জন্য যা যা করার দরকার তা করতে হবে।

আশরাফুল আলম কুতুবী*
*লিয়াজোঁ অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, কক্সবাজার; মোবাইল ০১৮১৯৬৩৫৪৭৬


Share with :

Facebook Facebook