কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট (BSRI)

(সাত বছরের সাফল্য)
পরিবর্তিত আবহাওয়া এবং জলবায়ুতে দেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনের স্বার্থে ইক্ষুর পাশাপাশি অন্যান্য চিনি উৎপাদনকারী ফসলের ওপর গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিগত ৯ নভেম্বর ২০১৫ থেকে বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউটের নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট (
Bangladesh Sugarcrop Research Institute) রাখা হয়। বর্তমান সরকারের আমলে বিগত ৭ (সাত) বছরে বিএসআরআইয়ের অর্জিত উল্লেখযোগ্য সাফল্য হলো-
ইক্ষু জাত উদ্ভাবন : এ সময় ৬টি উচ্চফলনশীল ও অধিক চিনিযুক্ত ইক্ষু জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। যেমন- ঈশ্বরদী ৩৯, ঈশ্বরদী ৪০, বিএসআরআই আখ ৪১, বিএসআরআই আখ ৪২, বিএসআরআই আখ ৪৩ এবং বিএসআরআই আখ ৪৪। এ জাতগুলোর গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ১০০ টনেরও বেশি এবং চিনি আহরণের হার ১২ শতাংশ এর ঊর্ধ্বে। এ জাতগুলো বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থায় বিশেষ করে লবণাক্ত এলাকায়ও চাষাবাদ উপযোগী। এছাড়া বিএসআরআই আখ ৪১ জাতটি চিনি ছাড়াও গুড়, রস তৈরি এবং চিবিয়ে খাওয়ার জন্য বিশেষ উপযোগী। এর গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ১৫০ টনেরও বেশি। বিএসআরআই আখ ৪২ জাতটিও চিবিয়ে খাওয়ার উপযোগী এবং আকর্ষণীয়।
সুগারবিটের জাত নির্বাচন : বাংলাদেশের প্রধান চিনি উৎপাদানকারী ফসল আখ থেকে উৎপাদিত চিনি ও গুড়ের পরিমাণ দেশজ মোট চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত হওয়ায় তা পূরণের লক্ষ্যে ইক্ষুর পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি ট্রপিক্যাল সুগারবিটের চাষাবাদ প্রবর্তন করা হয়েছে। বাংলাদেশে চাষাবাদ উপযোগী ট্রপিক্যাল সুগারবিটের ৯টি জাত যথা- শুভ্রা, কাভেরী, এইচ আই-০০৪৪, এইচ আই-০৪৭৩, সিএস-০৩২৭, সিএস-০৩২৮, এসজেড-৩৫, পিএসি-৬০০০৮ এবং এসভি-১ প্রাথমিকভাবে সুপারিশ করা হয়েছে যা বাণিজ্যিকভাবে সুগারবিট চাষের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। পরবর্তীতে বিভিন্ন বীজ কোম্পানি  থেকে আরও কিছু ট্রপিক্যাল সুগারবিটের জাত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং জাতগুলো নিয়ে গবেষণা-মূল্যায়ন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
তাৎক্ষণিকভাবে পানি ও পুষ্টির জন্য ইক্ষুর রস ব্যবহার : বন্যা, ঘূর্ণিঝড় প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর তাৎক্ষণিকভাবে পানি ও পুষ্টির জন্য ইক্ষুর রস ব্যবহার করার লক্ষ্যে বাড়ির আঙিনায় চিবিয়ে খাওয়া আখের কয়েকটি ঝাড় লাগিয়ে উৎপাদিত আখ সারা বছর ব্যবহার করার সুপারিশ করা হয়েছে।
সাথীফসল ও মুড়ি ইক্ষু ব্যবস্থাপনা  সাথীফসলসহ ইক্ষু আবাদের ‘কৃষিতাত্ত্বিক প্যাকেজ গুলির’ উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন করা হয়েছে।
যেমন- এক সারি ইক্ষুর সাথে আলু/পেঁয়াজ/রসুন এবং জোড়া সারি ইক্ষুর সাথে আলু/পেঁয়াজ/রসুন-মুগডাল/সবুজ সার। অধিক চিনি আহরণের জন্য এবং আখ চাষকে আরও লাভজনক করতে মুড়ি ইক্ষু ব্যবস্থাপনার প্রযুক্তি প্যাকেজের আধুনিকায়ন করা হয়েছে।
অন্যান্য প্রযুক্তি ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণ : ইক্ষুর সারের মাত্রা ও প্রয়োগ পদ্ধতি, সেচ ও পানি নিষ্কাশন, রোগ বালাই ও পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা, ইক্ষু চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় কৃষি যন্ত্রপাতিগুলোর আধুনিকায়ন করা হয়েছে এবং এ সময় বিএসআরআই পাওয়ার উইডারের উদ্ভাবন করা হয়েছে।
এছাড়াও উল্লিখিত সময়ের ভেতরে বিএসআরআই থেকে যেসব প্রযুক্তিগুলো উদ্ভাবন করা হয়েছে তাহলো-
১. ইক্ষুতে বায়োলজিক্যাল নাইট্রোজেন ফিক্সিংয়ে সক্ষম দুইটি ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করা হয়েছে;
২. দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে সুগার বিটের গ্রানুলার গুড় উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে;
৩. সুগারবিট স্লাইসার যন্ত্রের উন্নয়ন ঘটানো হয়েছে;
৪. সুগারবিটের উৎপাদিত গুড় ব্যাবহার করে পারিবারিক পর্যায়ে নাড়– মোয়া প্রভৃতি তৈরির মাধ্যমে সুগারবিটের ব্যবহারিক কলাকৌশল উদ্ভাবন করা হয়েছে;
৫. চরাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকায় চাষাবাদ উপযোগী লাভজনক গুড় উৎপাদনকারী এবং চিবিয়ে খাওয়া ইক্ষু জাত ও প্রযুক্তি বাছাই এবং গুড় উৎপাদন অথবা সরাসরি বাজারজাতকরণের মাধ্যমে দারিদ্র্যবিমোচনে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে;
৬. ভেষজ পদ্ধতিতে পরিষ্কারকৃত হাইড্রোজবিহীন স্বাস্থ্যসম্মত আখের দানাদার গুড় উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে;
৭. নিপা ভাইরাসমুক্ত স্বাস্থ্যসম্মত খেজুরের সিরাপ, গোলপাতার স্বাস্থ্যসম্মত গুড় উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ প্রযুক্তির বিস্তার ঘটানো হয়েছে;
৮. ফলন বৃদ্ধি ও কাক্সিক্ষত চিনি আহরণ হার প্রাপ্তির লক্ষ্যে ইক্ষু এবং সুগারবিটের সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি সুপারিশ করা হয়েছে;
৯. ডায়াবেটিস রোগীর জন্য ক্যালরিবিহীন মিষ্টিফসল স্টেভিয়া পাউডার, স্টেভিয়া রেডি টি ব্যাগ তৈরি করা হয়েছে এবং
১০. আখের টিস্যু কালচারকৃত চারা উৎপাদন ও বিস্তার ঘটানো হয়েছে।

উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন
বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউটের বায়োটেকনোলজি গবেষণা জোরদারকরণ প্রকল্প:  ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের আওতায় বায়োটেকনোলজি গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, জনবল সংগ্রহ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বায়োটেকনোলজি ল্যাবরেটরি পরিমার্জন করা হয়েছে। বায়োটেকনোলজির মাধ্যমে লালপচা  রোগ প্রতিরোধী ইক্ষুজাত এবং সুগারবিটের অঙ্গজ বৃদ্ধির মাধ্যমে চারা উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে।
তাল, খেজুর ও গোলপাতা উন্নয়নের জন্য পাইলট প্রকল্প : ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের আওতায় তাল, খেজুর ও গোলপাতার জার্মপ্লাজম সংগ্রহ, চারা উৎপাদন প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্যসম্মত গুড় উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে এবং এ যাবত ১,৭৮০০০ খেজুর এবং ৩৮,০০০ তালের চারা সড়ক বিভাগের রাস্তার পাশে রোপণ করা হয়েছে।
বৃহত্তর রংপুরের চরাঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ইক্ষু চাষ প্রকল্প : ২০১১-১২ অর্থবছর থেকে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের আওতায় বৃহত্তর রংপুর এলাকার চরাঞ্চলে ইক্ষু চাষ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এ যাবত ২৭৫০টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন, ইক্ষু চাষের সাথে সংশ্লিষ্ট ৫০০ জন সম্প্রসারণ কর্মকর্তা-কর্মী ও ৮০০০ জন চাষিকে প্রশিক্ষণ প্রদান, ১৫টি যন্ত্রচালিত উন্নত মানের ইক্ষু মাড়াইকল ও ১০০০ টন ইক্ষু বীজ বিতরণ করা হয়েছে। ফলে এসব চরাঞ্চলে ইক্ষু চাষ ও তা থেকে গুড় উৎপাদনের বিরাট সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে এবং কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ বিএসআরআইকে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার ১৪২০ রৌপ্যপদকে ভূষিত করা হয়।  
বাংলাদেশে সুগারবিট চাষাবাদ প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য পাইলট প্রকল্প : ২০১১-১২ অর্থবছর থেকে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের আওতায় সুগারবিট চাষাবাদের জন্য কৃষি প্রযুক্তির উদ্ভাবন করা হয়েছে। সুগারবিটের চারা তৈরি এবং মাইক্রোপ্রোপাগেশন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। সুগারবিটের গুণগত মান বিশ্লেষণের জন্য ল্যাবরেটরি স্থাপন-উন্নয়ন এবং সুগারবিট থেকে চিনি ও অন্যান্য উপযাত তৈরির উদ্দেশ্যে মাড়াই পরবর্তী প্রযুক্তি ও বাজারজাতকরণ পদ্ধতি উন্নয়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় লবণাক্ত এলাকাসহ ২৩টি উপজেলায় গবেষণায় নিম্নরূপ ফল পাওয়া গেছে।
ক. বাংলাদেশে সুগারবিটের ফলন হেক্টরপ্রতি ৮১-১৩৫ টন এবং চিনি ধারণক্ষমতা ১৪-১৫ শতাংশ।
খ. এক সারি ও জোড়া সারি পদ্ধতিতে আবাদকৃত আখের সাথে সাথীফসল হিসেবে সুুগারবিট আবাদ করা যায়।
গ. সুুগারবিট থেকে গুড় উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে।
ঘ. সুগারবিটের পাল্প থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ইক্ষু চাষ সম্প্রসারণ পাইলট প্রকল্প : পূর্বতন সময়ে গৃহীত চলমান এ প্রকল্পটিতে সর্বাধিক সফলতা এসেছে এ সময়ে। ওই এলাকার আখচাষিরা এখন আখের অর্থনৈতিক সুবিধা বুঝতে পেরে নিজেরাই চিবিয়ে খাওয়া আখ এবং গুড় উৎপাদন উপযোগী আখের চাষ করছেন। এ প্রকল্পের সাফল্য হলো ইক্ষু চাষের মাধ্যমে পার্বত্য এলাকার অনেক তামাক চাষি তামাক ছেড়ে ইক্ষুর চাষাবাদ শুরু করেছে তথা ইক্ষু চাষের মাধ্যমে তামাকের চাষ বহুলাংশে কমেছে।


*সংকলিত, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫


Share with :

Facebook Facebook