কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

তোষা বা বগী বা গুটি পাটের আবাদ

পাট বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল। পাট আমাদের সোনালি আঁশ। আট থেকে দশ মিলিয়ন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাট ও এ জাতীয় আঁশ ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৭.৫-৮.০ লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হয় যা থেকে প্রায় ৮০ লাখ বেল পাট আঁশ উৎপন্ন হয়ে থাকে। বাংলাদেশে বছরে উৎপাদিত পাট আঁশের শতকরা প্রায় ৫১ ভাগ পাট কলগুলোতে ব্যবহৃত হয়, প্রায় ৪৪ ভাগ কাঁচা পাট বিদেশে রফতানি হয় ও মাত্র ৫ ভাগ দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারে কাজে লাগে। এ ফসল নিজেই মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বর্ধিত জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা মেটাতে বেশি পরিমাণ উর্বর জমি খাদ্য শস্য চাষের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় পাটের উর্বর আবাদি জমির পরিমাণ কম এবং ক্রমাগত প্রান্তিক ও অনুর্বর জমিতে পাট আবাদ স্থানান্তরিত হলেও জাতীয় গড় উৎপাদন বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এর প্রধান কারণ পাট চাষে বিজেআরআই উদ্ভাবিত আধুনিক প্রযুক্তি উচ্চফলনশীল জাত এবং উৎপাদন কলাকৌশলের ব্যবহার। বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় শতকরা ১২ ভাগ পাট চাষ এবং পাটশিল্প প্রক্রিয়াকরণ, আঁশ বাঁধাই, গুদামজাতকরণ, স্থানান্তর ও বিপণন কাজের সাথে জড়িত। এছাড়াও কাঁচা পাট ও পাট জাত দ্রব্য বাংলাদেশের রফতানি ক্ষেত্রে রাজস্ব আয়ের একটি বড় উৎস। পাট ফসল দেশের কর্মসংস্থানে, গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত বিরাট সহায়ক ভূমিকা রাখছে। মোট কর্মসংস্থানের শতকরা প্রায় ১০ ভাগ পাট চাষ এবং চাষ পরবর্তী বিভিন্ন প্রক্রিয়া পাট চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, আঁশ বাঁধাই, গুদামজাতকরণ, স্থানান্তর ও বিপণন কাজের সাথে জড়িত। বিশেষ করে পাটের আঁশ পচার পর আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ও শুকানো কাজে কৃষক পরিবারের মহিলা সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি দেশের মহিলা কর্মসংস্থানের এক বিরল উদাহরণ। পাটের আঁশ বিক্রির টাকা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখে, গ্রামীণ জনপদে সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ও পরবর্তী রবি শস্য চাষে আর্থিক মোকাবিলা করার সাহায্য করে এ পাট চাষ।


দেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে কমছে আবাদি জমির পরিমাণ। বিপুল জনগোষ্ঠী ও প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে খাদ্য ঘাটতি মেটানোর জন্য কৃষক ঝুঁকছে খাদ্য ফসল উৎপাদনের দিকে। ফলে পাট আবাদি জমি চলে যাচ্ছে প্রান্তিক ও অবহেলিত জমিতে। সত্তর দশকের আগে পর্যন্ত পাট আবাদের ক্ষেত্রে দেশি ও তোষা পাটের অনুপাত ছিল ৮০ ঃ ২০। উচ্চফলনশীল ও আগাম বপনযোগ্য (চৈত্র মাসে) তোষা পাটের জাত উদ্ভাবিত হওয়া এবং সারা দেশে তার উৎপাদন প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ঘটানোর মাধ্যমে বর্তমানে ওই দেশী ও তোষা আবাদের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ২০ ঃ ৮০। এ অনুপাতের প্রভাবেই পাটের গড় ফলনশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সত্তর দশকের দিকে যেখানে পাট আবাদি জমির পরিমাণ ছিল মোট আবাদি জমির প্রায় ৭-৮ শতাংশ ও জমির পরিমাণ ছিল ১০-১২ লাখ হেক্টর, কিন্তু খাদ্য ঘাটতি চহিদার জন্য আজ তা এসে দাঁড়িয়েছে মোট জমির প্রায় ৪-৫ শতাংশতে। তাই নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রান্তিক ও অবহেলিত জমিতে বেশি ফলন নিশ্চিত করাই এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায়। বর্তমানে পাটের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ২ টন। তা বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প উপায় নেই। এলক্ষ্যে বিজ্ঞানীরা পাটের এবং বিশেষ করে তোষা পাটের ফলন বৃদ্ধির জন্য নিরলসভাবে কাজও করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত তোষা বা বগী বা গুটি পাটের জাত এবং তাদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বর্ণনা দেয়া হলো।


ও-৪ : এ জাতের বীজ ১ বৈশাখ বা ১৫ এপ্রিলের আগে বপন করা যায় না, কারণ এতে আকালে ফুল এসে যায়। এজন্য একে বৈশাখী জাতও বলা হয়। কা- সম্পূর্ণ হালকা-সাদাটে সবুজ। পাতা সরু, বর্শাফলাকৃতি, হালকা সবুজ। এ জাতের প্রতিটি গাছই নলাকৃতি, ডগার ব্যাস থেকে গোড়ার ব্যাসে কম পার্থক্য স¤পন্ন। বপনের উপযুক্ত সময় ১৫ এপ্রিল-১৫ মে (১-৩০ বৈশাখ)। হেক্টরপ্রতি বীজের হার ৫-৬ কেজি। জীবনকাল ১১৮-১২০ দিনের। হেক্টরপ্রতি ফলন ৪.৫১ টন এবং কৃষকের জমিতে গড় ফলন ২.৩২ টন পর্যন্ত হয়।
ও-৯৮৯৭ (ফাল্গুনী তোষা) : এ জাতের গাছ সুঠাম, দ্রুত বাড়ন্ত, পূর্ণ সবুজ। পাতা লম্বা, চওড়া, বর্শাফলাকৃতি গোড়ার দিক থেকে হঠাৎ মাথার দিক সরু হয়। ফল বেশ লম্বা এবং ফলের মাথা আধ ইঞ্চির (১ সেন্টিমিটার) মতো সরু শীষের মতো হয়ে থাকে ফলে অন্যান্য তোষা পাট জাতের মতো পাকলেই ফেটে গিয়ে বীজ ঝরে পড়ে না। বীজ আকারে ছোট, হালকা সবুজাভ। এ জাতের বীজ উৎপাদনের জন্য নাবি বীজ উৎপাদন পদ্ধতি অনুসরণ করা আবশ্যক। বপনের উপযুক্ত সময় ৩০ মার্চ-৩০ এপ্রিল (১৬ চৈত্র-১৬  বৈশাখ)।  তবে এ জাতের বীজ ১৬ চৈত্র (৩০ মার্চ) থেকে বৈশাখ মাসের শেষ (১৫ মে) পর্যন্ত বপন করা চলে। হেক্টরপ্রতি বীজের হার ৫-৬ কেজি। এ জাতের গাছে নির্ধারিত সময় বপন করা হলে ১৫০ দিনের পর ফুল আসে। তাই এ জাতের আঁশ ফসলের জন্য ফুল আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা দরকার হয় না। হেক্টরপ্রতি ফলন ৪.৬১ টন। তবে কৃষকের জমিতে গড়ে প্রায় ২.৭৩ টন-হেক্টর শুকনা আঁশ পাওয়া যায়।


ওএম-১ : এ জাতের গাছ লম্বা, সুঠাম, গাছের কা- ঘন সবুজ। পাতার আকার তুলনামূলকভাবে বেশ বড় এবং ডিম্বাকৃতি, উজ্জ্বল চকচকে পাতার উপরিপৃষ্ঠ, দেখলেই চেনা যায় এবং এটি এ জাতের বৈশিষ্ট্য। সম্পূর্ণ সবুজ, আলোক সংবেদনশীলতা কম, আঁশ উন্নতমানের, পাতা লম্বাকৃতির, চওড়া ও চকচকে। ফল পাকার পরে বীজ ঝড়ে পড়ে না। বীজের রঙ গাঢ় খয়েরি। কাজেই আঁশ ফসল হিসাবে ১২০ দিন বয়স হলেই বা প্রয়োজন হলে তার আগে ফসল কেটে আঁশ নেয়া যায়। এ জাতের বীজ উৎপাদনের জন্য নাবি বীজ উৎপাদন পদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন। বপনের উপযুক্ত সময় ২০ মাচ-৩০ এপ্রিল (৬ চৈত্র-১৬ বৈশাখ)। হেক্টরপ্রতি বীজের হার ৫-৬ কেজি। জীবনকাল ১৪০-১৫০ দিনের। হেক্টরপ্রতি ফলন ৪.৬২ টন হলেও কৃষকের জমিতে গড়ে ২.৪৯ টন পর্যন্ত শুকনা আঁশ পাওয়ার তথ্য আছে।


বিজেআরআই তোষা পাট-৪ (ও-৭২) : গাছ লম্বা, মসৃণ, ও-৯৮৯৭ এর চেয়ে আগাগোড়া অধিক সুষম, সম্পূর্ণ সবুজ এ জাতের গাছের পাতা ডিম্বাকৃতি, বড়, ওএম-১ জাতের মতো। তবে চকচকে নয় বরং গাঢ় সবুজ। অন্য দুটি আগাম বপনোযোগী জাতের চেয়ে নাবি বীজ উৎপাদন প্রদ্ধতিতে জাতে অধিক বীজ উৎপাদিত হয়। বীজের রঙ নীলাভ ধূসর, আগাম বপনযোগ্য। উপযুক্ত বপন সময় দেশে সর্বাধিক প্রচলিত জাত ও-৯৮৯৭ এর চেয়ে ১৫ দিন আগে অর্থাৎ ১৫ মার্চ থেকে (১ চৈত্র) সমগ্র বৈশাখ (১৫ মে পর্যন্ত) পর্যন্ত বপন করা যায়। হেক্টরপ্রতি বীজের হার ৫-৬ কেজি। এ জাতে ১৩০-১৪০ দিনে ফুল আসে। সর্বোচ্চ ফলন হেক্টরপ্রতি ৪.৯৬ টন এবং কৃষকের জমিতে ২.৯০ টন।


বিজেআরআই তোষা পাট-৫ (লাল তোষা-৭৯৫) : গাছ লাল বা লালচে, উপপত্র স্পষ্ট লাল। পাতার বোঁটার অংশ তামাটে লাল। পাতা লম্বা ও চওড়া। বীজের রঙ নীলাভ, আগাম বপনযোগ্য মার্চের ১০ তারিখে বপন করলেও আগাম ফুল আসার কোনো সম্ভাবনা নাই। কৃষক পর্যায়ে বিজেআরআই তোষা-৪ (ও-৭২) এর চেয়ে ফলন প্রায় ১০% বেশি। আঁশের রঙ উজ্জ্বল সোনালি এবং পাট কাঠি অন্যান্য জাতের তুলনায় শক্ত। বপনের উপযুক্ত সময় ১৫ মার্চ-১৫ এপ্রিল (১ চৈত্র-১ বৈশাখ)। হেক্টরপ্রতি বীজের হার ৫-৬ কেজি। এ জাতে ১৩০-১৪৫ দিনে ফুল আসে। হেক্টরপ্রতি ফলন ৫ টন। হেক্টরপ্রতি গাছের সংখ্যা ৩.৫-৪.০ লাখ রাখা গেলে কৃষকের জমিতে হেক্টরপ্রতি ফলন ৩.৪০ টন হয়।


বিজেআরআই তোষা পাট-৬ (ও-৩৮২০) : এ জাতটি বাংলাদেশের সমগ্র অঞ্চলে চাষ উপযোগী বলে প্রমাণিত হয়েছে। এ জাতটির ছালে পুরুত্ব বেশি এবং পাটকাঠি তুলনামূলক শক্ত। গাছ লম্বা, কা- গাঢ় সবুজ মসৃণ এবং দ্রুতবর্ধনশীল। বীজের রঙ নীলাভ সবুজ। বপনের উপযুক্ত সময় চৈত্রের ২য় সপ্তাহ-বৈশাখের ২য় সপ্তাহ (এপ্রিল ১ম সপ্তাহ থেকে এপ্রিল শেষ সপ্তাহ)। হেক্টরপ্রতি বীজের হার ৫-৬ কেজি। এ জাত ১১০ দিনে ফসল কাটা যায়। হেক্টরপ্রতি ফলন ৫ টন। হেক্টরপ্রতি গাছের সংখ্যা ৪ লাখ রাখা গেলে কৃষকের জমিতে  গড়ে ৩ টন-হেক্টর ফলন পাওয়া যায়।


আঁশ উৎপাদন ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি
ভালো এবং অধিক ফসল পেতে হলে রোগমুক্ত, পরিষ্কার পরিপুষ্ট ও মানসম্মত বীজ ব্যবহার করতে হবে।

 

জমি নির্বাচন ও তৈরি : কম খরচে ভালো ফলন পেতে হলে এমন ধরনের জমি নির্বাচন করতে হবে। যেসব জমি  মৌসুমের প্রথমে বৃষ্টির পানিতে ডুবে যায় না এবং বৃষ্টির পানি সরে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে এমন জমি নির্বাচন করতে হয়। পাটের জন্য একটু উঁচু বা মধ্যম উঁচু জমি নির্বাচন করা প্রয়োজন। পাটের বীজ খুব ছোট বলে পাট ফসলের জমি মিহি এবং গভীর করে চাষ দিতে হয়। পাট চাষের জন্য খরচ কমাতে হলে যেসব জমিতে আলু বা সবজি করা হয় সেসব জমিতে একবার চাষ করে মই দিয়ে পাট বীজ বপন করেও ভালো ফসল পাওয়া সম্ভব হয়েছে। এসব জমিতে আগাছা নির্মূলজনিত খরচ কম হয়। সারি করে সিড-ড্রিলের সাহায্যে বীজ বপন করা হলে বীজগুলো মাটির নিচে সমান গভীরতায় পড়ে বলে সমভামে অংকুরোদগম হয়।


সার ব্যবস্থাপনা : পাট গাছের বাড়বাড়তি এবং অাঁশফলন বাড়ানোর ক্ষেত্রে নাইট্রোজেন হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ফসফরাস ও পটাশিয়ামের প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। ফসফরাস আঁশের মান উন্নত করে এবং নাইট্রোজেন সদ্ব্যবহারের উপযুক্ততাকে বাড়িয়ে দেয়। টিএসপি এবং এমওপি একবার প্রয়োগ এবং ইউরিয়া দুইবার পৃথক প্রয়োগ পাট চাষের জন্য যথেষ্ট  সাফল্যজনক। বাংলাদেশের যেসব জমিতে সালফার এবং জিংক ন্যূনতায় রয়েছে সেখানে সালফার ও জিংক প্রয়োগ করে ফল পাওয়া যায়। বীজ বপনের দিন প্রয়োজনীয় পরিমাণের ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম এবং জিংক সালফেট সার জমিতে শেষ চাষে প্রয়োগ করে মই দিয়ে মাটির সাথে ভালো করে মিশিয়ে দিতে হবে। দ্বিতীয় কিস্তি (৪৫ দিনে) ইউরিয়া সার প্রয়োগের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন মাটিতে পর্যপ্ত পরিমাণ রস থাকে। দ্বিতীয় কিস্তি প্রয়োজনীয় পরিমাণের ইউরিয়া সার কিছু শুকনা মাটির সাথে মিশিয়ে জমিতে প্রয়োগ করা ভালো। ইউরিয়া সার প্রয়োগের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন প্রয়োগকৃত সার গাছের কচি পাতায় এবং ডগায় না লাগে। সার ব্যবহারের মাত্রা নির্ধারণ করাটা বিজ্ঞানসম্মত হলে বেশি ভালো। আঁশ উৎপাদনে রাসায়নিক সার হলো-


বীজের পরিমাণ ও গাছের ঘনত্ব প্রচলিত এবং জনপ্রিয় পদ্ধতি হচ্ছে ছিটিয়ে বপন করা। সারিতে বপন করা কষ্টসাধ্য ব্যয়বহুল মনে হলেও এর উপকারিতা বেশি। এতে জমির সর্বত্র গাছের বিস্তৃত সমভাবে থাকে, পরিচর্যার সুবিধা হয়। সারিতে বপন করা হলে বীজের পরিমাণ কম লাগে এবং গজায়ও ভালো। ৩০ সেন্টিমিটার দূরে দূরে সারি করে বীজ বপন করলে সবচেয়ে ভালো হয়। গাছ থেকে গাছের দূরত্ব সব সময় ঠিক রাখা না গেলেও পরিমিত অবস্থায় ৭ থেকে ১০ সেন্টিমিটার ধরা হয়। সারিতে বীজ বপন করার জন্য বীজ বপন যন্ত্র বা সিডার ব্যবহার লাভজনক।


নিড়ানি ও পাতলাকরণ : বাংলাদেশের পাট ক্ষেতে ৩৯টি গোত্রের অন্তর্গত ৯৯টি গণ এর ১২৯টি প্রজাতির উদ্ভিদ আগাছা হিসেবে জন্মে। এদের মধ্যে ২৭টি প্রজাতি আগাছা হিসেবে খুব গুরুত্বপূর্ণ। এদের ঘনত্ব প্রতি ৩ বর্গফুটে ৫ থেকে ১০২টি আগাছা হতে পারে। পাটের আবাদে যে খরচ হয় তার একটা বড় অংশই নিড়ানি ও পরিচর্যার জন্য হয়। চারা গজানোর ১৫-২০ দিনের মধ্যে চারা পাতলা করা প্রয়োজন। সারিতে বপন করা হলে হাত দিয়ে বা ছিটিয়ে বপন করা হয়ে থাকলে আঁচড়া দিয়ে প্রাথমিকভাবে চারা পাতলা করা যায়। পাট গাছের বয়সের ৪০-৫০ দিনের মধ্যে একবার নিড়ানি দেয়ার সময় কৃষক কোনো কোনো ক্ষেতে চারা ও পাতলা করেন। তবে বয়স ৬০-৭০ দিনের মধ্যে যে চারা পাতলা করা হয় তা টানা বাছ নামে এবং বয়সের ৮৫-৯০ দিনের মধ্যে চারার গোড়া কেটে যে পাতলা করা হয় তা কাটা বাছ নামে পরিচিত। এ কচি গাছ না ফেলে পচিয়ে খুব উন্নত মানের পাট পাওয়া যায়, যা সুতা তৈরি করায় ব্যবহৃত হতে পারে।


পানি নিষ্কাশন : পাটের জমিতে জমে থাকা পানি নিকাশ অত্যন্ত জরুরি। জমিতে পানি জমলে মাটির ভেতর বাতাস প্রবেশ করতে পারে না ফলে গাছের শিকড়ের শ্বাস-প্রশ্বাস বিঘ্নিত হয়, গাছ স্বাভাবিকভাবে খাদ্য গ্রহণ করতে পারে না, ফলে গাছের দৈহিক বৃদ্ধি ঘটে না এবং শেষ পর্যন্ত গাছ মারা যায়। দেশী পাটের জাত চারা অবস্থায় পানি সহ্য ক্ষমতা থাকে না। তবে এ জাতের গাছের বয়স ও উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে। কিন্তু তোষা পাট চারা অবস্থায় পানি সহ্য করতে পারে না, এমনকি বড় হলেও দাঁড়ান পানি বা জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না।


পাট কাটা : বপনের ৬০-১২০ দিনের মধ্যে পাট ফসল কর্তন করা যায়, তবে আঁশের ফলন এবং মানের মধ্যে সমতা পেতে হলে ১০০-১২০ দিনের মধ্যেই পাট কাটার প্রকৃত সময়। সাধারণত পাট গাছে যখন ফুল আসা শুরু হয় তখন বা তার আগে প্রয়োজনমতো সুবিধাজনক সময় পাট ক্ষেত কাটা হয়। কৃষক অনেক সময় ফলন বেশি পাওয়ার জন্য দেরিতে পাট গাছ কাটেন।
০১. পর্যাপ্ত পানি থাকা অঞ্চল : পর্যাপ্ত পানি থাকা অঞ্চলের জন্য পাট পচন প্রক্রিয়াকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে-
ক. বাছাইকরণ : পাট কাটার পর ছোট, বড়, মোটা ও চিকন গাছকে পৃথক করে আলাদা আলাদা আঁটি বাঁধতে হয়। একটি আটির ওজন ১০ কেজির হবে। ছোট ও চিকন এবং মোটা ও বড় পাটের গাছেরগুলোকে পৃথক পৃথকভাবে জাক দিতে হবে। পাটের আঁটি কখনও খুব শক্ত করে বাঁধা যাবে না। এতে পাট পচতে বেশি সময় লাগে। কারণ শক্ত আঁটির মাধ্যে পানি পচনকালে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণু ভালোভাবে প্রবেশ করতে পারে না।
খ. পাতা ঝরান : আঁটি বাঁধা শেষ হলে সেগুলোকে ৩-৪ দিন জমির ওপর স্তূপ করে রাখতে হয়। এ সময়ের মধ্যে পাতা ঝরে যাবে এবং গাছগুলো কিছুটা শুকিয়ে যাবে। পাতাগুলোকে জমির ওপরে ছড়িয়ে দিতে হয়। পাট গাছগুলো কিছুটা শুকানো ফলে পানিতে ডুবানোর পর গাছের ভেতর তাড়াতাড়ি পানি প্রবেশ করতে পারে।
গ. গোড়া ডুবান অথবা গোড়া থেতলান : আঁশ শুকানোর পর দেখা যায় গোড়ার দিকে কিছু অংশ ছালযুক্ত অবস্থায় রয়ে গেছে। এ ছালযুক্ত অংশকে কাটিং বলে। পাতা ঝরার পর পাট গাছের গোড়ার দিকে প্রায় ৪৫ সেন্টিমিটার বা দেড় ফুট পরিমাণ অংশ ৩-৪ দিন পানির নিচে ডুবিয়ে রাখতে হয়। এতে গোড়ার অংশ অনেক নরম হয়ে যাবে। পাট গাছের গোড়ার প্রায় ৪৫ সেন্টিমিটার বা দেড় ফুট পরিমাণ অংশ একটি কাঠের হাতুড়ির সাহায্যে সামান্য থেতলানোর পর আঁটিগুলোকে পানির নিচে ডুবিয়ে দিতে হয়।
ঘ. পানি নির্বাচন : যে পানি খুব পরিষ্কার এবং তার মধ্যে অল্প স্রোত থাকে সে পানি পাট পচনের জন্য সবচেয়ে ভালো। কোনো নিকটবর্তীস্থান এ ধরনের পানি থাকলে সে পানিতে পাট পচনের ব্যবস্থা করতে হবে।
ঙ. জাক তৈরি ও ইউরিয়া ব্যবহার : জাক তৈরির সময় পাটের আঁটিগুলোকে প্রথম সারিতে লম্বালম্বিভাবে সাজাতে হবে। দ্বিতীয় সারিতে আড়াআড়িভাবে সাজাতে হবে। তৃতীয় সারিতে আবার লম্বালম্বিভাবে সাজাতে হবে। এভাবে জাক তৈরি করলে পানি এবং পচন জীবাণু জাকের মধ্যে সহজে চলাফেরা করতে পারে। বদ্ধ পানিতে বা ছোট পুকুর বা ডোবার পাট পচালে ইউরিয়া সার ব্যবহার করতে হবে। এতে পাট তাড়াতাড়ি পচে এবং আঁশের রঙ ভালো হয়। প্রতি ১০০ আঁটি কাঁচা পাটের জন্য প্রায় ১ কেজি ইউরিয়া ব্যবহার করা যেতে পারে। ইউরিয়া সার কোনো পাত্রে গুলে পানিতে মিশেয়ে অথবা সরাসরি জাকের আঁটির সারিতে ছিটিয়ে দিতে হবে।
চ. পচন নির্ণয় : পাট পচনের শেষ সময় ঠিক করা অর্থাৎ পচন সমাপ্তি নির্ণয় অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। পাট খুব বেশি পচলে আঁশ নরম হয় আবার খুব কম পচলে আঁশের গায়ে ছাল লেগে থাকে। কাজেই এমন সময় পচন থামাতে হবে যখন আঁশগুলো একটার সাথে আর একটা না লেগে থাকে কিন্তু শক্ত থাকে। জাক দেয়ার ৮-১০ দিন পর থেকে জাক পরীক্ষা করা উচিত। ২-৩টি পাট জাক থেকে বের করে ধুয়ে আঁশ পরীক্ষা করলে পচনের শেষ সময় ঠিক করা যায়। পচা পাটের মধ্যাংশ থেকে ১ ইঞ্চি বা আড়াই সেন্টিমিটার পরিমাণ ছাল কেটে ছোট শিশির ভেতর পানি দিয়ে ঝাঁকানোর পর শিশির পানি ফেলে আবার পরিষ্কার পানি দিয়ে ঝাঁকিয়ে যদি দেখা যায় যে আঁশগুলো বেশ পৃথক হয়ে গেছে তখন তখন বুঝতে হবে যে পচন শেষ হয়েছে। বেশি পচনের চেয়ে একটু কম পচন ভালো।
০২. অপর্যাপ্ত পানি অঞ্চলে পাটের ছাল পচন পদ্ধতি :  বিরন পদ্ধতি : ক. রিবন পদ্ধতিতে কাঁচা থাকাবস্থায় গাছ থেকে ছাল পৃথক করে নেয়া। ছালগুলোকে তিনভাবে পচানো যায় ক. বড় মাটির চাড়িতে ছালগুলোকে গোলাকার মোড়া বেঁধে সাজিয়ে রেখে পরিষ্কার পানি দিয়ে চাড়িটি ভরে দিতে হবে। একটি বড় চাড়িতে প্রায় ৩০ কেজি ছাল পচানো যায়। খ. যদি আশপাশের ছোট ডোবা বা পুকুর বা খাল বা কম গভীরতা স¤পন্ন জলাশয় থাকে তবে ছালগুলোকে গোলাকৃতি মোড়া বেঁধে একটা লম্বা বাঁশের সঙ্গে ঝুলিয়ে পানির মধ্যে ডুবিয়ে দিয়ে পচানো যাবে। গ. বাড়ির আশপাশে অথবা ক্ষেতের পাশে ১৫-১৬ ফুট লম্বা, ৬-৮ ফুট প্রস্ত এবং ২ ফুট গভীর গর্ত খুঁড়ে গর্তের তলা ও কিনারা পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিয়ে যে কোনো স্থান থেকে পরিষ্কার পানি দিয়ে গর্তটি ভরে সেখানে ছালগুলো পচানো যায়। সম্ভব হলে কচুরিপানা দিয়ে ছালের মোড়াগুলো ঢেকে দেয়া যায়।
আঁশ ছাড়ানো প্রক্রিয়া : পচন শেষে শুকনা জায়গায় বসে একটা একটা করে আঁশ ছাড়ানো যেতে পারে অথবা, পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে বাঁশের আড়ার সাহায্যে এক সাথে অনেকগুলো গাছের আঁশ ছাড়ানো যায়। যে পদ্ধতিতেই আঁশ আঁশ ছাড়ানো হোক না কেন আঁশ ছাড়ানোর সময় গাছের গোড়ার আঁশের পচা ছাল হাত দিয়ে চিপে টেনে মুছে ফেলে দিলে গোড়ার শক্ত অংশের পরিমাণ অনেক কম হয়। এছাড়া আঁশ ছাড়ানোর সময় পাট গাছের গোড়ার অংশ এক টুকরা শক্ত কাঠ বা বাঁশ দিয়ে থেতলে নিলে আঁশের কাটিংসের পরিমাণ অনেক কম হয়। গাছ থেকে একটি একটা করে আশ ছাড়ালে আঁশের গুণাগুণ ভালো হয়।
কম সময়ে ছাল পচানো : পচন সময় দুইভাবে কমানো যায়Ñ১. প্রতি ১০০ মণ বা ৩৭৩২ কেজি কাঁচা ছালের জন্য ০.৫ কেজি ইউরিয়া সার ব্যবহার করুন। ২. অথবা একটা ছোট হাঁড়িতে দুই একট পাট গাছ ছোট ছোট টুকরা করে পচিয়ে নিন এবং পরে ছাল পচাবার সময় ওই পানি ব্যবহার করুন। ছাল পচতে খুব কম সময় লাগে, কাজেই ছাল পানিতে ডুবানোর ৭-৮ দিন পর থেকে পরীক্ষা করতে হয়। দু-একটা ছাল পানি থেকে তুলে ভালো করে ধুয়ে দেখতে হবে যদি আঁশগুলোকে বেশ পৃথক পৃথক মনে হয় তখনই বুঝতে হবে পচন সময় শেষ হয়েছে। সাধারণত ছাল পচনে ১২-১৫ দিন সময় লাগে। মনে রাখতে হবে পাট আঁশের গুণাগুণের ওপরই প্রকৃত মূল্য পাওয়া নির্ভর করে।
আঁশ ধোয়া ও শুকানো : আঁশ ছাড়ানোর পর আঁশগুলোকে পরিষ্কার পানিতে ধোয়া উচিত। ধোয়ার সময় আঁশের গোড়া সমান করে নিতে হবে। এমনভাবে আঁশ ধুতে হবে যেন কোনো রকম পচা ছাল, ভাঙা পাট-খড়ি, অন্য কোনো ময়লা, কাদা আঁশের গায়ে লেগে না থাকে। কারণ এতে পাটের মান নষ্ট হয় এবং বাজারে এসব আঁশের চাহিদও কমে যায়। আঁশ ধোয়ার পর খুব ভালো করে আঁশ শুকানো উচিত। আঁশ কখনও মাটির ওপর ছড়িয়ে শুকানো উচিত নয়, কারণ তাতে আঁশে ময়লা, ধুলো-বালি লেগে যায়। বাঁশের আড়ায়, ঘরের চালে, ব্রিজের রেলিং বা অন্য কোনো উপায়ে ঝুঁলিয়ে ভালোভাবে আঁশ শুকাতে হবে। ভেজা অবস্থায় আঁশ কখনই গুদামজাত করা উচিত নয়। কারণ এতে আঁশের মন নষ্ট হয়ে যায়।

কৃষিবিদ ড. মো. মাহবুবুল ইসলাম*
*মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রধান, কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, বিজেআরআই, ঢাকা-১২০৭;
mahbub_agronomy@yahoo.com


Share with :

Facebook Facebook