কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) (সাত বছরের সাফল্য)

বাংলাদেশে আধুনিক কৃষি সম্প্রসারণ ব্যাপ্তি অর্ধ শতাব্দীর মতো হলেও এর পেছনে শতাধিক বর্ষের ঘটনাবহুল ইতিবৃত্ত রয়েছে। ১৮৬২-৬৫ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ মোকাবিলার জন্য দুর্ভিক্ষ কমিশন প্রথম কৃষি বিভাগ প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে যার ফলে ১৮৭০ সালে রাজস্ব বিভাগের অংশ হিসেবে কৃষি বিভাগের জন্ম হয়। পরে ১৯০৬ সালে স্বতন্ত্র কৃষি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। একই সময়ে ঢাকায় মনিপুর (বর্তমান জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায়) কৃষি খামারটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। যা ১ হাজার একর জমি নিয়ে বিস্তৃত। খামারটি কৃষি বিভাগের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়। ১৯০৯ সালে খামারের কৃষি গবেষণার জন্য একটি ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়। ১৯১৪ সালে তৎকালীন প্রতিটি জেলায় একজন করে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়। এদের মধ্যে কোনো কৃষি বিজ্ঞানে জ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তা ছিলেন না। পরে ১৯৪৩ সালে সর্বপ্রথম বাংলাদেশ কৃষি কলেজ থেকে পাস করা গ্রাজুয়েটরা কৃষি বিভাগে যোগদান করেন এবং তখন থেকেই বাস্তবিক পক্ষে কৃষি সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়।
১৯৫০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কৃষি ও শিল্প উন্নয়ন (ভিএআইডি) প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকের সম্প্রসারণ শিক্ষা ও উন্নয়ন কর্মকা- শুরু হয়, পরে ১৯৫৬ সালে উদ্ভিদ সংরক্ষণ অধিদপ্তর, ১৯৬১ সালে বিএডিসি, ১৯৬২ সালে এআইএস, ১৯৭০ সালে ডিএইএম এবং ডিএআরই সৃষ্টি হলেও কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে তেমন কোনো পরিকল্পিত সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭২ সালে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকা-কে জোরদার করার লক্ষ্যে তুলা উন্নয়ন বোর্ড, তামাক উন্নয়ন বোর্ড, হর্টিকালচার বোর্ড এবং ১৯৭৫ সালে কৃষি পরিদপ্তর (পাট উৎপাদন), কৃষি পরিদপ্তর (সম্প্রসারণ ও ব্যবস্থাপনা) নামে ফসলভিত্তিক স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানগুলো সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু একই কৃষকের জন্য বিভিন্নমুখী-রকম সম্প্রসারণ বার্তা ও কর্মকা- মাঠপর্যায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে ১৯৮২ সালে ফসল প্রযুক্তি সম্প্রসারণে নিয়োজিত ছয়টি সংস্থা যথা ডিএ (ইঅ্যান্ডএম), ডিএ (জেপি), উদ্ভিদ সংরক্ষণ পরিদপ্তর, হর্টিকালচার বোর্ড, তামাক উন্নয়ন বোর্ড এবং সার্ডি একত্রীভূত করে বর্তমান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সৃষ্টি করা হয়। কৃষি বিভাগ ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্রবর্তিত প্রশিক্ষণ ও পরিদর্শন (টিঅ্যান্ডভি) পদ্ধতির মাধ্যমে এবং ১৯৯০ সালের পর থেকে অদ্যাবধি দলীয় সম্প্রসারণ পদ্ধতির মাধ্যমে দেশের কৃষি ও কৃষককে অত্যন্ত সফলতা ও সুনামের সাথে সেবা প্রদান করেছে। পরিকল্পিত এবং অংশীদারিত্বমূলক সম্প্রসারণ সেবা প্রদানের জন্য ১৯৯৬ সালে নতুন কৃষি সম্প্রসারণ নীতি (এনএইপি) বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। বর্তমানে ৮টি উইংয়ের সমন্বয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বিভাগীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দায়িত্ব হলো সব শ্রেণীর চাষিকে তাদের চাহিদাভিত্তিক ফলপ্রসূ ও কার্যকর সম্প্রসারণ সেবা প্রদান করা যাতে তারা তাদের সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করে স্থায়ী কৃষি ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভিশন : খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ কৃষি বাণিজ্যিকীকরণের লক্ষ্যে পরিবর্তনশীল জলবায়ুতে পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ ও টেকসই উৎপাদনক্ষম উত্তম কৃষি কার্যক্রম প্রবর্তন যাতে প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষাসহ দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মিশন : দক্ষ, ফলপ্রসূ, বিকেন্দ্রীকৃত, এলাকানির্ভর, চাহিদাভিত্তিক এবং সমন্বিত কৃষি সম্প্রসারণ সেবা প্রদানের মাধ্যমে সব শ্রেণীর কৃষকের প্রযুক্তি জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ, যাতে টেকসই ও লাভজনক ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিতকরণসহ দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন সাধিত হয়।
খাদ্যশস্য উৎপাদনের বর্তমান চিত্র
বর্তমান সরকার কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। ফলে ২০০৮-০৯, ২০০৯-১০, ২০১০-১১, ২০১১-১২, ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ সালে মোট খাদ্যশস্য (চাল, গম, ভুট্টা) উৎপাদন হয়েছিল যথাক্রমে ৩২৮.৯৫, ৩৪২.৪৬, ৩৬০.৬৫, ৩৬৮.৩৯, ৩৭২.৬৬, ৩৮১.৭৪ এবং ৩৮৪.১৯ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে চাল উৎপাদন হয় যথাক্রমে ৩১৩.১৬, ৩১৯.৭৫, ৩৩৫.৪১, ৩৩৮.৯০, ৩৩৮.৩৩, ৩৪৩.৫৬ এবং ৩৪৭.১০; গম উৎপাদন হয় যথাক্রমে ৮.৪৯, ৯.০১, ৯.৭২, ৯.৯৫, ১২.৫৫, ১৩.০২ এবং ১৩.৪৮; ভুট্টা উৎপাদন হয় যথাক্রমে ৭.৩০, ১৩.৭০, ১৫.৫২, ১৯.৫৪, ২১.৭৮, ২৫.১৬ এবং ২৩.৬১ লাখ মেট্রিক টন। এতে দেখা যায় যে, খাদ্যশস্যের উৎপাদন প্রতি বছরেই ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাছাড়া ২০০৮-০৯ সালের তুলনায় ২০১৪-১৫ সালে আলু ও সবজির উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৮-০৯ সালে যেখানে আলু ও সবজি উৎপাদন হয়েছিল যথাক্রমে ৬৭.৪৬ ও ১০৬.২২ লাখ মেট্রিক টন। সেখানে ২০১৪-১৫ সালে আলু ও সবজি উৎপাদন হয় যথাক্রমে ৯৩.২৮ ও ১৪২.৩৭ লাখ মেট্রিক টন। এ সময়ে ভুট্টার উৎপাদনও বেড়েছে। উৎপাদনশীলতার ধারাবাহিকতায় দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ।  
আউশ উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা
বোরো (২০০৯-১০) মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে হাওর এলাকার বোরো উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তা পুষিয়ে নেয়ার জন্য সারা দেশে উফশী আউশ (২০১০-১১) উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৫১টি জেলার ৩,৪৬,৮১১ জন কৃষক পরিবারকে প্রতি পরিবারে বিনামূল্যে ২০ কেজি ইউরিয়া, ১০ কেজি টিএসপি এবং ১০ কেজি এমওপি সার প্রদান করা হয়। এ কার্যক্রমে প্রায় ২৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে;
২০১০-১১ আউশ মৌসুমে  ৫১টি জেলার ৫,৩৭,৪৭৭ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে ১ বিঘা আউশ ধান আবাদের জন্য বিনামূল্যে রাসায়নিক সার প্রদান করা হয়েছে। ফলে আউশের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে;
খরিফ-১/২০১২ মৌসুমে ৩০টি জেলার ৫৬,২৫০ জন কৃষককে নেরিকা আউশ ও  ৫৬টি জেলার ৩,০৮.৯৫৬ জন কৃষককে উফশী আউশ ধান চাষাবাদে প্রত্যেককে ১ বিঘা জমি আবাদের জন্য বিনামূল্যে বীজ ও রাসায়নিক সার প্রদান করা হয়েছে। এ কার্যক্রমে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে;
খরিফ-১/২০১৩ মৌসুমে প্রণোদনা হিসেবে বোনা আউশ (নেরিকা) আবাদে ১৮টি জেলার ৭,০০০ জন ও  উফশী আউশ ধান চাষাবাদে ৪৭টি জেলার ৩,২৫,৫০০ জন কৃষককে ১ বিঘা করে  জমি আবাদের জন্য বিনামূল্যে বীজ ও  রাসায়নিক সার প্রদান করা হয়। এ কার্যক্রমে ৪৩০৮.৯২ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এ কর্মসূচিতে সেচ ও আগাছা দমনে কৃষি উপকরণ কার্ডের মাধ্যমে নগদ অর্থ সহায়তাও প্রদান করা হয়েছে।
২০১৩-১৪ অর্থবছরে আউশ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে  ৪৪টি জেলার ২,৩৪,৬০০ জন কৃষককে ১ বিঘা করে উফশী জাতের আউশ ধান ও ৩৭টি জেলার ১০,০০০ জন কৃষককে ১ বিঘা করে নেরিকা জাতের আউশ আবাদের জন্য বিনামূল্যে বীজ ও রাসায়নিক সার প্রদান করা হয়। এ কার্যক্রমে সরকারের ৩০৬৮.৬৪৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এ কর্মসূচিতে সেচ ও আগাছা দমনে কৃষি উপকরণ কার্ডের মাধ্যমে নগদ অর্থ সহায়তাও প্রদান করা হয়।
খরিফ-১/২০১৫-১৬ মৌসুমে উফশী আউশ ধান ও বোনা আউশ ধান (নেরিকা) চাষে প্রণোদনার লক্ষ্যে উফশী আউশ ধান চাষাবাদে ৪৮টি জেলার ১,৮০,০০০ জন কৃষককে ১ বিঘা করে মোট ১,৮০,০০০ বিঘা উফশী আউশ ধান ও বোনা আউশ (নেরিকা ) আবাদে ৩৭টি জেলার ৩০,০০০ জন কৃষককে ১ বিঘা করে মোট ৩০,০০০ বিঘা বোনা আউশ (নেরিকা) ধান আবাদের জন্য সর্বমোট ২,১০,০০০ জন কৃষককে বিনামূল্যে বীজ ও রাসায়নিক সার প্রদান করা হয়েছে। এ কর্মসূচিতে সেচ ও আগাছা দমনে কৃষি উপকরণ কার্ডের মাধ্যমে নগদ  অর্থ সহায়তাও প্রদান করা হয়।
কৃষি পুনর্বাসন ও প্রণোদনা
এ কর্মসূচির আওতায় ২০০৮-২০০৯ সালে ২৭৪৬.৩১ লাখ টাকা ব্যয়ে এবং ২০০৯-১০ সালে ৩২১৫.০৫ লাখ টাকা ব্যয়ে কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ করা হয়।
 বন্যাপ্রবণ এলাকায় বন্যার ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে বিএডিসি, ডিএই, ব্রি ও বারি ফার্মে ২০০৮-২০০৯, ২০০৯-১০ ও ২০১০-১১ সালে ১০০ একর নাবি রোপা আমন ধানের বীজতলা তৈরি করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের মাঝে রোপা আমনের চারা বিতরণ করা হয়েছে। এতে ওই ৩ বছর প্রায় ২০০০ একর জমিতে রোপা আমন ধান চাষ করা সম্ভব হয়েছে।
খরিফ-২/২০১২-১৩ মৌসুমে দেশের ৬টি জেলায় (জামালপুর, কুড়িগ্রাম, বগুড়া, গাইবান্ধা, টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ) অতিবৃষ্টি/উজান খেকে নেমে আসা প্লাবনে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের মাঝে ৬৮০.৮১ লাখ টাকার কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়েছে। এতে ৭৮,০১১ জন কৃষককে বিনামূল্যে সরিষা/গম/ভুট্টা বীজ ও সার বিতরণ করা হয়।
রবি মৌসুমে শিলাবৃষ্টি/ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাসহ নেরিকা চাষের সম্ভাবনাময় জেলার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে উফশী ও রোপা আমন চাষে সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে ৯৯৯.৭৬ লাখ টাকার কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়েছে। এতে সর্বমোট ১,০১,৭২২ জন কৃষককে বিনামূল্যে বীজ ও সার প্রদান করায় এ কর্মসূচিতে ৯৯৯.৭৬০৫৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
২০১৪-১৫ সালে উজানের ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের গম, সরিষা, ভুট্টা ও বোরো ফসল উৎপাদনে সহায়তার জন্য বিনামূল্যে বীজ ও রাসায়নিক সার সরবরাহের কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ৮৪৮.৮৯২১৮ লাখ টাকা এবং দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলো গম, ভুট্টা, ফেলন ও বারি খেসারি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিনামূল্যে বীজ ও সার সরবরাহ করাার নিমিত্ত ১৫৪৮.৯০ লাখ টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে। এতে সর্বমোট ২,০৫,০১৫ জন কৃষক-কৃষাণী উপকৃত হয়েছেন।
২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত জেলাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য কৃষি পুনর্বাসন এবং ফসলের উন্নত ও নতুন জাত সম্প্রসারণে প্রণোদনার (রবি/২০১৫-১৬ মৌসুমে) জন্য মোট ৩,১০,৯১৯ জন (পুনর্বাসনের জন্য ২,১২,৬৭৯ এবং প্রণোদনার জন্য ৯৮,২৪০) ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে গম, সরিষা, আলু, খেসারি, ফেলন ও গ্রীষ্মকালীন মুগ চাষের জন্য বিনামূল্যে বীজ ও রাসায়নিক সার  বিতরণের কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে। এতে সরকারের ৩২,৪৯,৩১,৮৯০ টাকা ব্যয় হয়েছে।
তাছাড়া হাওরে উৎপাদিত শস্য, ধান দ্রুত এবং নিরাপদে আহরণ করার লক্ষ্যে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি দ্বারা ধান কাটা, মাড়াই করার নিমিত্ত হাওড়ের ৭টি জেলার (সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়ীয়া) সব উপজেলায়  ১০৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০০টি রাইস ট্রান্সপ্লান্টার এবং ২৭৫টি রিপার কৃষকের মাঝে সরবরাহের পরিকল্পনা বর্তমান সরকারের রয়েছে।
ভুট্টা প্রণোদনা
গত ২০১১-১২ রবি মৌসুমে ভুট্টা উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৬.৫০ কোটি  টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় দেশের ১১টি জেলায় ৫০,০০০ কৃষকের প্রত্যেককে বিনামূল্যে ৩ কেজি ভুট্টা বীজ, ২৫ কেজি ডিএপি ও ২৫ কেজি এমওপি সার সরবরাহ করা হয়েছে ।
কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড বিতরণ ও কৃষকের ব্যাংক হিসাব
কৃষকের মাঝে কৃষি উপকরণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য কৃষক পরিবারকে ২,০৫,৮২,৮২৪টি কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে কৃষাণীদের ১২,৫৮,৬৪৭টি এবং কৃষকের ১,৯৩,২৪,১৭৭টি কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড প্রদান করা হয়। ফসল উৎপাদনে ঋণ, উপকরণ সহায়তা প্রাপ্তিতে কৃষক এ কার্ড ব্যবহার করতে পারবেন ও ১০ টাকার বিনিময়ে কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার কার্যক্রম চালু রেখে কৃষকের সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
হাওরাঞ্চলের পাঁচটি জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত বোরো চাষিদের সহায়তা কর্মসূচি
বিগত ২০০৯-১০ অর্থবছরে হাওরাঞ্চলের নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলায় আগাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৩ লাখ ৮৫ হাজার কৃষককে  রবি/২০১০-১১ মৌসুমে উফশী বা আধুনিক জাতের বোরো ফসল চাষাবাদে সহায়তার জন্য বিনামূল্যে বীজ ও রাসায়নিক সার প্রদান করা হয়। এ কার্যক্রমে ৪৮৪৯.০৮ লাখ টাকার সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের কারণে সহায়তা
ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত দেশের  ৪টি জেলায় (পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা ও বরিশাল) খরিফ-২/২০১৪ মৌসুমে উফশী আমন চাষাবাদে সহায়তা প্রদানের  লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক প্রতি কৃষক পরিবারকে সর্বোচ্চ ১ বিঘা জমির বীজ বিনামূল্যে সরবরাহ করার জন্য সর্বমোট ২৩৪৯২৫ বিঘা জমির জন্য (বিঘাপ্রতি ৫ কেজি বীজ) বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণের নিমিত্ত ২,৩৪,৯২৫টি কৃষক পরিবারকে (৩৯৯.৫৭২৫+২০৯১.২৩২৫) = ২৪৯০.৮০৫ লাখ টাকা ২০১২-১৩ অর্থবছরে ব্যয় করা হয়েছে।
পাট ও পাট বীজ উৎপাদন
পাট মৌসুমে (২০১০-১১) পাট আঁশের মান উন্নয়ন ও চাষি সহায়তার লক্ষ্যে ২৯টি জেলায় ১৫ লাখ ৩৯ হাজার ৬০০ পাট চাষিকে ১০ টাকার বিনিময়ে ব্যাংক হিসাব খুলে ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে জনপ্রতি ২০০ টাকা হারে সহায়তাসহ প্রতি ১০০ জনের জন্য ১টি করে সর্বমোট ১৫ হাজার ৩৯৬টি রিবনার সরবরাহ এবং কৃষককে রিবন রেটিং পদ্ধতির ওপর হাতে কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। ওই কর্মসূচিতে সরকারের সর্বমোট ৩৩ কোটি ৭৯ লাখ ২ হাজার টাকা ব্যয় হয়। বর্তমানে রিবনারগুলো চাষিপর্যায়ে যথাযথভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য গৃহীত অন্যান্য পদক্ষেপ
১. ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি ও মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণের জন্য কৃষকপর্যায়ে সুষম সারের চাহিদা দূরীভূত করতে সরকার কর্তৃক সার বিতরণ মনিটরিং কার্যক্রম জোরদারকরণ;
২. সারের ক্রয়মূল্য চার দফায় কমানোর ফলে সুষম সার ব্যবহার নিশ্চিতকরণ;
বর্তমানে ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সারের বাজারমূল্য কেজি প্রতি যথাক্রমে ১৬ টাকা, ২২ টাকা, ১৫ টাকা এবং ২৫ টাকা নির্ধারণ। কৃষক পর্যায়ে সার প্রাপ্তি সহজলভ্য করা। এ নীতিমালার আওতায় প্রতি ইউনিয়নে একজন করে সার ডিলার এবং ৯ জন করে খুচরা সার বিক্রেতা নিয়োগ প্রদান;
৩.  কৃষি যান্ত্রিকীকরণে বর্তমানে ৩০ শতাংশ ভর্তুকি মূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি  ক্রয়ে কৃষকপর্যায়ে উন্নয়ন সহায়তা প্রদান;
৪. মানসম্মত বীজ সরবরাহ ও সহজলভ্যতা নিশ্চিতকরণ। বিভিন্ন ফসলের হাইব্রিড ও উফশী জাতের ব্যবহার বৃদ্ধিকরণ;
৫. উপযুক্ত সেচ ব্যবস্থা/কার্যক্রম গ্রহণে কৃষককে উৎসাহিতকরণ। সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ দ্বারা সেচ প্রদানে স্মার্টকার্ড প্রচলন;
৬. খরা, বন্যা ও লবণাক্ততাসহিষ্ণু বিভিন্ন ফসলের আধুনিক জাতের আবাদ সম্প্রসারণ;        
৭. ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন উন্নত ও আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণে কৃষককে উৎসাহিতকরণ;
৮. দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাস ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিযোজনের জন্য আধুনিক লাগসই কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন, প্রশিক্ষণ ও সম্প্রসারণ;
৯. অটোমেটেড রিপোর্ট রিটার্নিং সিস্টেম চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ এবং ফসল উৎপাদন সংক্রান্ত কৃষি বিষয়ক প্রশ্ন করে বিশেষজ্ঞের উত্তর পেতে ডিএইতে ইন্টারনেট কানেকশন স্থাপন;
১০. অব্যবহৃত চর, উপকূলীয় ও পার্বত্য এলাকায় মাশরুম, সয়াবিন, সুগারবিট, চিউয়িং আখ, তরমুজ, ভুট্টা, মরিচ, পাট এবং ডাল, তেল ও মসলা জাতীয় ফসল আবাদ সম্প্রসারণ করে পতিত জমি নিবিড় চাষাবাদের আওতায় এনে শস্যের নিবিড়তা বাড়ানো;
১১. কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জনবল বৃদ্ধি ও জনবল অবকাঠামো পুনর্বিন্যাসে ব্যবস্থা গ্রহণ;
১২. ন্যূনতম পরিমাণে কীটনাশক ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে সমন্বিত শস্য ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব ধান ও সবজির উৎপাদন প্রযুক্তি সম্প্রসারণে কৃষককে উৎসাহিতকরণ;
১৩. বসতবাড়ির আঙিনায় সবজি আবাদ এবং বিলুপ্ত প্রায় বিভিন্ন অপ্রচলিত ও প্রচলিত ফল লাগাতে চাষিদের উদ্বুদ্ধকরণ;
১৪. দেশব্যাপী বহিরাগত পোকামাকড় ও রোগবালাই প্রতিরোধের জন্য উদ্ভিদ সংগনিরোধ আইন ২০১১ বায়ন;
১৫. রবি/২০১৫-১৬ মৌসুমে বিএডিসির ৫২ মেট্রিক টন এবং বিনা ও বারির পক্ষ থেকে যথাক্রমে ৪.২ ও ৩১.১ মেট্রিক টন বিভিন্ন ফসলের (সর্বমোট ৮৭.৩ মেট্রিক টন)  বীজ/বীজ থেকে উৎপাদিত চারা বগুড়া, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, শেরপুর ও লালমনিরহাট জেলার ১০,২৫৭ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ;
১৬. ডাল, তেল, মসলা ও ভুট্টাসহ ২৪টি ফসল উৎপাদনের নিমিত্ত ৪% সুদহারে বিশেষ কৃষি ঋণ প্রদান;
১৭. প্রযুক্তি সম্প্রসারণে বিভিন্ন সম্প্রসারণ কার্যক্রম গ্রহণ (প্রদর্শনী, মাঠ দিবস, চাষি র‌্যালি, উদ্বুদ্ধকরণ ভ্রমণ, প্রযুক্তি মেলা, কর্মশালা) এবং প্রতিটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে শতকরা ৩০ ভাগ কৃষাণীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ;
১৮. সারা দেশে ৭২৭টি কৃষক তথ্য ও পরামর্শ কেন্দ্র (ফিয়াক) স্থাপন ও কৃষকের প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরামর্শ প্রদান ।
বিগত ৭ বছরের শাসনকালে সরকার দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সারের উৎপাদন, সরবরাহ ও বিতরণ করে কৃষকদের সার প্রাপ্তি ও ব্যবহারে সহায়তা করার ফলে দেশ খাদ্যে স্বয়ংস¤পূর্ণতা অর্জন করেছে এবং অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে।
তাছাড়া কৃষকের অর্থনৈতিক কথা বিবেচনা করে সরকার বিভিন্ন সময়ে ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সারে ভর্তুকি দিয়ে কৃষককে সহায়তা করেছে এবং কয়েক দফায় ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সারের মূল্য কেজি কমিয়ে আনার ফলে কৃষক সুষম সার ব্যবহারে আগ্রহী হয়েছে। সুষম সার ব্যবহারের ফলে কৃষকের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকের অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে। কৃষিতে বর্তমান সরকারের সার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এসব কার্যক্রম সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে বিবেচ্য।

*সংকলিত, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫


Share with :

Facebook Facebook