কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

সুগারক্রপের জন্য সম্ভাবনাময় এলাকা : দক্ষিণাঞ্চল

আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত চরম বাস্তবতা এখন। যতই দিন যাচ্ছে মানুষ ততই বুঝতে পারছে আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু, জীবনযাত্রাসহ সবকিছুর ওপরই প্রভাব ফেলছে এর প্রচ- থাবা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে নোনাজল এসে ঢুকে যাচ্ছে ফসলের জমিতে। নদীর নাব্য কমে যাওয়ায় বাড়ছে খরা, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস। কোথাও বা শুকিয়ে যাচ্ছে নদী, বাড়ছে চরের বালি। তাই যত দ্রুত সম্ভব এর সাথে খাপ খাওয়ানোটাই আজকের বড় চ্যালেঞ্জ। আশার কথা, সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাধ্যানুসারে সবাই এগিয়ে আসছেন। এসেছেন কৃষি বিজ্ঞানীরাও। খুঁজে বের করছেন পরিবর্তিত আবহাওয়ার উপযোগী ফসল বিন্যাস কিংবা প্রয়োজনে নতুন ফসলের প্রবর্তন। বাংলাদেশেও এর প্রভাব মোকাবিলায় কৃষি বিজ্ঞানীরা রয়েছেন অগ্রগামী। কৃষি বিজ্ঞানের সব শাখা থেকে যে যার মতো প্রস্তুত করছেন তাদের প্রযুক্তি। অগ্রযাত্রার এ ধারায় থেমে নেই সুগারক্রপের প্রযুক্তিও।
সুগারক্রপের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফসল আখ বা কুশার। প্রকৃতি প্রদত্ত ক্ষমতাতেই আখ সবচেয়ে বেশি সহিষ্ণু ফসল। যেখানে লবণাক্ততার কারণে অন্য কোনো ফসল উৎপাদন করা যায় না সেখানেও আখ ফসল তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে। আরও নির্দিষ্ট করে বলা যায় আখের উচ্চমাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করার মতো প্রচলিত ফসলধারায় অন্য কোনো ফসল নেই। সম্প্রতি অবমুক্ত কেবল দুটি ধানের জাত বিনা ধান ১০ প্রতি মিটারে ১২ ডিএস এবং ব্রি ধান ৬৭ প্রতি মিটারে ৮ ডিএস মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। কিন্তু আখ ফসল তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়েই প্রতি মিটারে ১৫ ডিএস মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। তাই লবণাক্ত এলাকার সবচেয়ে উপযোগী এবং লাভজনক ফসল আখ। গুড়ের আখের পাশাপাশি চিবিয়ে খাওয়া আখেরও এ এলাকায় যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। নতুন উদ্ভাবিত বিএসআরআই আখ ৪২ এক্ষেত্রে বিশাল এক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। এজাত ব্যবহার করে এখন অনেক চাষিই লবণাক্ত এলাকায়ও প্রতি বিঘায় এক লাখ টাকা নিট লাভ করছে।
আখের পাশাপাশি দেশে এসেছে নতুন সুগারক্রপ-সুগারবিট। এ ফসলেও একই কথা প্রযোজ্য। সুগারবিট ফসল হিসেবেই লবণাক্ততা সহিষ্ণু। ফলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের যেসব এলাকায় জমিতে লবণাক্ততার সমস্যা রয়েছে সেখানে অনায়াসে সুগারবিটের চাষ প্রবর্তন করা যায়। যদিও সুগারবিট শীতপ্রধান দেশের ফসল তবে বর্তমানে ট্রপিক্যাল সুগারবিটের জাত উদ্ভাবনের কারণে এ ফসলটি এখন বাংলাদেশেও যথেষ্ট ভালো হচ্ছে। যেসব জাত এদেশে এরই মধ্যে পরীক্ষা করা হয়েছে তার মধ্যে ‘শুভ্র’ এবং ‘কাবেরি’ জাত দুটিই সবচেয়ে ভালো। এগুলো ছাড়াও ঐও ০০৪৪, ঐও ০৪৭৩, ঝত ৩৫, চঅঈ ৬০০০৮, ঝঠ ৮৮৭, ঝঠ ৮৮৯, ঝঠ ৮৯১, ঝঠ ৮৯২, ঝঠ ৮৯৩, ঝঠ ৮৯৪, ২ক৩১০, অৎধহশধ, ঝবৎবহধফধ, ঘধঃঁৎধ, এবং ইবষষবুধ জাতগুলো কয়েক বছর ধরে পরীক্ষা করে ভালো ফলন পাওয়া গেছে। এ বছরও সুগারবিটের এসব জাত বিএসআরআইয়ের সমন্বিত গবেষণা কার্যক্রম জোরদারকরণ প্রকল্পের তত্ত্বাবধানে দেশের ১২টি চিনিকলের গবেষণা খামারে এবং চিনিকল বহির্ভূত এলাকা বিশেষত লবণাক্ত এলাকায় যেমন- সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা, ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর এমনকি বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকায়ও কৃষকের জমিতে লাগানো হয়েছে।
যেহেতু সুগারবিটের প্রধান ব্যবহার হলো চিনিকলের মাধ্যমে চিনি উৎপাদন করা। আর দেশে এখনও সুগারবিট থেকে চিনি উৎপাদন করার মতো কোনো চিনিকল স্থাপিত হয়নি, তাই এসব এলাকায় সুগারবিটের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে এ ক্ষেত্রে বলা যায় এখন সুগারবিট করতে হবে শুধু পারিবারিক ব্যবহারের প্রয়োজনে। অর্থাৎ প্রত্যেকেই তার অল্প কিছু জমিতে সুগারবিট করবে এবং তা থেকে উৎপাদিত বিট দিয়ে গুড় কিংবা সিরাপ তৈরি করে তার নিজের পরিবারের চাহিদা মেটাবে। এতে সাময়িকভাবে কিছুটা জ্বালানির সমস্যা দেখা দিতে পারে। এটা বিভিন্নভাবে সমাধান করা যেতে পারে। যেমন খেজুরের গুড় জ্বালাতেও আমরা বিভিন্নভাবে জ্বালানির জোগান দিয়ে থাকি তবে ভবিষ্যতের জন্য দেশের সবগুলো চিনিকলেই সুগারবিট থেকে চিনি উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, নিকট ভবিষ্যতে বিশ্বের সর্বত্রই সুগারবিটই চিনির বাজার দখল করে নেবে। কারণ ক্রমবর্ধমান গবেষণার ফলে দ্রুতগতিতে যেভাবে সুগারবিটের উন্নয়ন হচ্ছে তাতে ভবিষতে আখ কেন্দ্রিক চিনিকলের চেয়ে সুগারবিট কেন্দ্রিক চিনিকলেই বেশি লাভ হবে। সে কারণেই এসব চিনিকলের একটা বড় অংশ সুগারবিটে রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ পরিবর্তনের সাথে তাল মিলাতে না পারলে বাংলাদেশের জরাজীর্ণ চিনিশিল্প আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সে কারণেই দক্ষিণাঞ্চলের চিনিকলগুলো দ্রুত সুগারবিট থেকে চিনি উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। দক্ষিণাঞ্চলের চিনিকলগুলোর মধ্যে দর্শনাতে রয়েছে কেরু এন্ড কোং, ঝিনাইদহে রয়েছে মোবারকগঞ্জ চিনিকল আর ফরিদপুরে রয়েছে ফরিদপুর চিনিকল। সবচেয়ে বেশি লবণাক্ত এলাকা সাতক্ষীরা। ওইখান থেকে দর্শনার দূরত্ব ১২৩ কিলোমিটার, সাতক্ষীরা থেকে ফরিদপুর ১৫৮ কিলোমিটার এবং সাতক্ষীরা থেকে ঝিনাইদহ ১১৫ কিলোমিটার। অতএব মোবারকগঞ্জ কিংবা কেরু কোম্পানিতে সাতক্ষীরা থেকে সুগারবিট এনে তা থেকে চিনি তৈরি করা যাবে। বেলজিয়ামের চিনিকল ইসকল (ওঝঈঅখ) ১৫০ কিলোমিটার  দূর থেকে সুগারবিট এনে চিনি তৈরি করেও যথেষ্ট লাভ করে। জার্মানির চিনিকল চভবরভবৎ ্ খধহমবহ ১০০ কিলোমিটার দূর থেকেও সুগারবিট এনে চিনি তৈরি করে লাভ করে। ইউরোপের তো আর আমাদের মতো আবাদি জমির অভাব নেই। তারপরও তারা যদি সে দূরত্ব থেকে কাঁচামাল এনে চিনি তৈরি করে এবং লাভ করে তাহলে আমরা কেন পারব না। তাই আমাদেরও উচিত দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত জমিগুলোকে সুগারবিট উৎপাদনের মাধ্যমে সফল ব্যবহার করে একদিকে এ এলাকার কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে সাহায্য করা, অন্যদিকে এ এলাকায় উৎপাদিত সুগারবিট দিয়ে দুটি চিনিকলের উৎপাদন বাড়িয়ে সেগুলোকে লাভজনক চিনিকলে পরিণত করা। আমাদের জানা দরকার কেবল আখের অভাবে আমাদের সবগুলো চিনিকলই বছরে এক মাসের বেশি চলতে পারে না। এর কারণ সবগুলো চিনিকলই আখ নির্ভর। আর আখ চাষ করতে সময় লাগে ১২ মাস। ফলে চাষিরা এখন আখের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। অন্যদিকে পটুয়াখালী, বরগুনা সদর এবং পাথরঘাটার বিশাল একটি অংশ লবণাক্ত এলাকা। যদিও এসব এলাকা থেকে এসব চিনিকলের দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার। তবুও এসব এলাকা থেকেও সুগারবিট আনা যেতে পারে। কারণ আমন ধান করার পর এসব এলাকার জমি লবণাক্ততার কারণে ফাঁকা পড়ে থাকে। এ সময়ই সে জমিতে সুগারবিট আবাদ করে তা মাত্র ৫ মাসেই তুলে আনা যেতে পারে।
দক্ষিণাঞ্চলের জন্য সুগারক্রপের আরও তিনটি ফসল তাল, খেজুর এবং গোলপাতা। এ ফসলগুলোর চাষ সম্প্রসারণেরও যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এ ফসলগুলোর জন্য তেমন কোনো জায়গা লাগে না অথচ প্রতিটি গাছ থেকে বছরে প্রায় ২৫ কেজি গুড় পাওয়া যায়। তাছাড়া সিডর-আইলা ও মহাসেন-এর মতো যে কোনো দুর্যোগে তাল এবং খেজুরগাছই সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে। তাছাড়া তালগাছ সবচেয়ে বেশি কার্বন গ্রহণ করে। ফলে পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে তাল গাছই সবচেয়ে বেশি সহায়তা প্রদান করতে পারে। আর গোলপাতা হয় সবচেয়ে বেশি লবণাক্ত জমিতে বা নদীর পাড়ে, যেখানে জোয়ার-ভাটার কারণে লবণাক্ত পানি আসা-যাওয়া করে। ফলে এখানে চাষ করার মতো অন্য কোনো ফসল নেই কিংবা খুব শিগগির কোনো ফসল পাওয়ার আশাও নেই। ফলে এ ফসলটি পতিত জমিই ব্যবহার করে। অথচ এ ফসলেরও রয়েছে অর্থনৈতিক অপার সম্ভাবনা। কারণ গোলগুড় স্বাদেও অনন্য, মানেও সেরা। আশার কথা, বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে গোলপাতা গাছের গুড় উৎপাদনের বিষয়েও পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

ড. সমজিৎ কুমার পাল*
*মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালক, বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঈশ্বরদী পাবনা, বাংলাদেশ


Share with :

Facebook Facebook