কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

দক্ষিণাঞ্চলের উপযোগী ব্রি প্রযুক্তি

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল ১৪টি উপকূলীয় জেলা নিয়ে গঠিত। বাংলাদেশের ৭.৯ মিলিয়ন হেক্টর নিট ফসলি জমির মধ্যে ১.৬৭ মিলিয়ন হেক্টরই দক্ষিণাঞ্চলে। এ এলাকার জীবন যাত্রা প্রধানত কৃষি ও মৎস্য নির্ভর। নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগ; বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, জলোচ্ছ্বাসের পাশাপাশি মাটি ও পানির লবণাক্ততা এ অঞ্চলের কৃষি ও কৃষিজীবী মানুষের জীবন যাত্রা প্রতিনিয়ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এ অঞ্চলটি তিনটি কৃষি পরিবেশ অঞ্চল (AEZ) ১৩, ১৮ ও ২৩ এর অন্তর্ভুক্ত। বিস্তীর্ণ এলাকার প্রধান শস্য বিন্যাস পতিত-রোপা আমন-পতিত (৩৯ শতাংশ)। জোয়ার-ভাটার ভিত্তিতে সাধারণভাবে এলাকার ভূমিকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়; জোয়ার-ভাটাকবলিত অলবণাক্ত ও পোল্ডার বেষ্টিত লবণাক্ত এলাকা। ভূমির বন্ধুরতার ভিত্তিতে দক্ষিণাঞ্চলের মোট আবাদি জমির ৭৬ শতাংশ মাঝারি উঁচু জমি যেখানে এলাকাভিত্তিক লাগসই কৃষি প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ অঞ্চলের ফসলের নিবিড়তা বাড়ানো সম্ভব। তদুপরি পোল্ডার বেষ্টিত এলাকায় বর্ষা মৌসুমে ধান-মাছের মিশ্রচাষ, জলাবদ্ধ এলাকায় হাঁস পালন-মাছ-বোরো ধান কৃষিকে একধাপ এগিয়ে নিয়েছে। ব্রি উদ্ভাবিত প্রযুক্তি সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো।
প্রযুক্তি ১ : দক্ষিণাঞ্চলের জন্য ব্রি ধানের জাত
অলবণাক্ত পরিবেশে জোয়ার-ভাটাসহনশীল জাত ব্রি ধান৭৬ এবং ব্রি ধান৭৭ এর চারা লম্বা স্থানীয় জাত সাদা মোটা ও দুধ কলমের মতো কিন্তু ফলন হেক্টরপ্রতি ১-১.৫ মে. টন বেশি। এছাড়াও ব্রি ধান৫২ এ এলাকার মাঝারি উঁচু জমিতে চাষোপযোগী জাত হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। আমন ধানের জাত বিআর২৩, ব্রি ধান৪০, ব্রি ধান৪১,  ব্রি ধান৫৩, ব্রি ধান৫৪, ব্রি ধান৭৩ এবং ব্রিধান৭৮ লবণাক্ততাসহনশীল হিসেবে এ এলাকায় চাষাবাদ হচ্ছে। এদের মধ্যে ব্রি ধান৭৩ স্বল্পমেয়াদি হওয়ায় এটি চাষ করে সহজেই রবি শস্য আবাদ করা যায়। ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৬১, ব্রি ধান৬৭ বোরো মৌসুমের লবণাক্ততা সহনশীল জাত। অলবণাক্ত পরিবেশে উঁচু জমিতে খরা সহনশীল জাত ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৬৬ এবং ব্রি ধান৭১ চাষাবাদের সুযোগ রয়েছে। এদের মধ্যে ব্রি ধান৭১ মোটা ও উচ্চফলনশীল হওয়ায় সে এলাকার জন্য বেশ উপযোগী। নি¤œাঞ্চল এবং অস্বাভাবিক জোয়ার-ভাটাকবলিত এলাকার জন্য নাবি জাত বিআর২২, বিআর২৩ এবং ব্রি ধান৪৬ চাষ করা যায়।
প্রযুক্তি ২ : ধান চাষে গুটি ইউরিয়া-এনপিকে ব্রিকেট প্রয়োগ
উচ্চফলনশীল ধানের চারা লাগানোর ৭-১০ দিনের মধ্যে যখন ভাটা হবে তখন প্রতি চার গোছার মাঝখানে ৭.৫-১০ সেন্টিমিটার কাদার গভীরে গুটি পুঁতে দিতে হবে। আউশ ও আমন ধানের  জন্য ০.৯০ গ্রাম এর দুটি বা ১.৮ গ্রাম এর একটি গুটি প্রয়োগ করা। তবে বোরো ধানের জন্য ০.৯০ গ্রাম এর তিনটি বা ২.৭ গ্রাম এর একটি গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করা। এ প্রযুক্তি ব্যবহারে ২৫-৩০ শতাংশ নাইট্রোজেন সাশ্রয়ের পাশাপাশি ১৫-২০ শতাংশ ফলন বেশি পাওয়া যায়।
প্রযুক্তি ৩ : লবণাক্ত জমিতে পটাশিয়াম সার ব্যবস্থাপনা
মাটি পরীক্ষাভিত্তিক রাসায়নিক সারের মাত্রার সাথে অতিরিক্ত হিসেবে হেক্টরপ্রতি ৫ টন ছাই শেষ চাষের সময় ব্যবহার করলে পটাশিয়ামের প্রাপ্যতা বাড়ে, মাটির ফাটল বন্ধ হওয়ার কারণে ক্যাপিলারি ছিদ্র দিয়ে লবণ ভূপৃষ্ঠে আসতে পারে না ফলে ধানের ফলনও বাড়ে। ছাই প্রয়োগ সম্ভব না হলে হেক্টর প্রতি অতিরিক্ত ৪০ কেজি এমওপি সার ধানের সর্বোচ্চ কুশি পর্যায়ে উপরিপ্রয়োগ করতে হবে।
প্রযুক্তি ৪ : সমন্বিত সার ব্যবস্থাপনায় ধানের খড় ব্যবহার
ধান কাটার সময় জমিতে ২০ সেন্টিমিটার খড় রেখে চাষ দিয়ে জমিতে মিশিয়ে দেয়ার পর ধানের চারা লাগানো। ধান কাটার সময় খড় জমিতে না রাখলে জমি তৈরির সময় খড় দিয়ে তা ভালোভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়ার ৫-৭ দিন পর চারা লাগানো যায়। হেক্টরপ্রতি জমিতে ৪.৫ টন ধানের শুকনো খড় ব্যবহার করলে ৫০ কেজি ইউরিয়া, ১৮ কেজি টিএসপি, ১৪৪ কেজি এমওপি এবং ২৫ কেজি জিপসাম সার সাশ্রয়, ধানের ফলন বৃদ্ধি, মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং মাটির ঊর্বরতাও বাড়ে।
প্রযুক্তি ৫ : রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে মুরগির বিষ্ঠা ব্যবহার
আমন ও বোরো মৌসুমে যথাক্রমে প্রতি হেক্টর জমিতে শুকনো ৩ এবং ৫ মেট্রিক টন মুরগির বিষ্ঠা জমি তৈরির শেষ চাষে প্রয়োগের পর মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া এবং ৩-৪ দিন পর চারা রোপণ করা। চারা রোপণের প্রায় ১৪ দিন পর্যন্ত জমিতে ৫-১০ সেন্টিমিটার পানি ধরে রাখা। বিষ্ঠা প্রয়োগে টিএসপি, এমওপি ও গন্ধক সারের সাশ্রয় হয় এবং ফলন বাড়ে।
প্রযুক্তি ৬ : বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ধানের সম্পূরক সেচ ও শীতকালীন শাকসবজি চাষ
লবণাক্ত এলাকায় একটি জমির এক-পঞ্চমাংশে ২.২৫ মিটার গর্ত করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা এবং আমন ধানে থোড় আসা অবস্থায় সম্পূরক সেচ দেয়া। এতে খরা ও লবণাক্ততার কারণে ধানের ফলনের ঘাটতির ১৫-২০ শতাংশ কমানো সম্ভব। আমন ধানে সম্পূরক সেচ প্রদানের পর অবশিষ্ট পানি দিয়ে রবিশস্য; টমেটো, মরিচ, লালশাক চাষ করা সম্ভব। এতে ফসলের নিবিড়তা ও শস্য বৈচিত্র্যতা বাড়বে।
প্রযুক্তি ৭ : ডিবলিং পদ্ধতিতে আউশ ধান চাষ
লবণাক্ত চর অঞ্চলে ডিবলিং পদ্ধতিতে আউশ ধান বপন এবং বীজ গজানোর ২৫-৩০ দিনের মধ্যে ১ম বা ২য় বৃষ্টির সময় ডিবলিং পদ্ধতির অর্ধেক চারা তুলে সমপরিমাণ অন্য জমিতে রোপণ করলে ফলনে কোন তারতম্য হয় না, বরং এতে কৃষকের খরচ সাশ্রয় হয়, আবাদি জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ফসলের এলাকা বাড়ে।
প্রযুক্তি ৮ : হলুদ মাজরা পোকা দমনে ফেরোমোন ট্র্যাপ
জোয়ারভাটা অঞ্চলে হলুদ মাজরা পোকার প্রাদুর্ভাব অত্যন্ত বেশি এবং মাজরা দমনে ফেরোমোন ট্র্যাপ খুবই কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়াও ব্রি কর্তৃক উদ্ভাবিত পার্চিং, আলোকফাঁদ, হাতজাল ও ডিমের গাদা সংগ্রহ করে পোকার আক্রমণ কমিয়ে আনা সম্ভব।
প্রযুক্তি ৯: পামরি পোকা দমনে পরজীবী বোলতার ব্যবহার
কৃত্রিম উপায়ে প্রতিপালিত পরজীবী বোলতা, পামরি পোকা আক্রান্ত ধান ক্ষেতে ছেড়ে দিলে ৮৭ শতাংশ পর্যন্ত পামরি পোকার ডিম নষ্ট করতে পারে এবং পামরি পোকার আক্রমণজনিত ক্ষতি রোধ করে। রশিতে কেরোসিন মাখিয়ে আক্রান্ত ধান ক্ষেতের ওপর দিয়ে টেনে দিলে পূর্ণ বয়স্ক পোকা এবং পাতার আগা কেটে পামরি পোকার গ্রাব দমন করা যায়। সর্বশেষ ব্যবস্থা হিসেবে ম্যালাথিয়ন গ্রুপের কীটনাশক প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
প্রযুক্তি ১০ : ডাবল নজল প্রেয়ার ব্যবহারে বাদামি গাছফড়িং ব্যবস্থাপনা
সারি পদ্ধতিতে রোপণকৃত জমিতে দুই নজলযুক্ত স্প্রেয়ার ব্যবহারে বাদামি ও সাদাপিঠ গাছফড়িং দমন অত্যন্ত ফলপ্রসূ যাতে ধানের ফলন ২.৯৫-১৪.৭৬ শতাংশ বাড়ে। দুই নজলযুক্ত স্প্রেয়ারটি এক নজলের তুলনায় কৌশলগতভাবে উন্নত, সহজে ব্যবহারযোগ্য এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক।
প্রযুক্তি ১১ : লাভজনক শস্যবিন্যাস
জোয়ার-ভাটা কবলিত মিষ্টি পানির জন্য-রোপা আউশ (ব্রি ধান২৭/মালা)-নাবি রোপা আমন (বিআর২২/বিআর২৩)
অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে রোপা আউশ (ব্রি ধান২৭/মালা)-রোপা আমন (ব্রি ধান৪৪)-রিলে খেসারি
প্রযুক্তি ১২ :  মোডিফাইড সর্জান একটি লাভজনক প্রযুক্তি
নালাতে দেশি শিং ও মাগুর, মাচায় শসা, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া এবং বেডে বছরব্যাপী সবজি চাষ করে বছরে ৫০ শতাংশ জমি থেকে ২ লাখ টাকার মতো নিট মুনাফা পাওয়া যায়।   
প্রযুক্তি ১৩ : অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকায় রোপা আমন-মুগডাল প্রযুক্তি
 রোপা আমনে ব্রি ধান৪৪ এবং রবি মৌসুমে বারি মুগ৬ বা বিনা মুগ৭ ব্যবহারে ফসলের এলাকা বৃদ্ধিসহ ফসলের নিবিড়তা বাড়বে।
প্রযুক্তি ১৪ : জোয়ার-ভাটা কবলিত লবণাক্ত পানির জন্য রোপা আমন ও সূর্যমুখী প্রযুক্তি
অপেক্ষাকৃত মাঝারি উঁচু এলাকায় রোপা আমন মৌসুমে বিআর১০/বিআর২৩/ব্রি ধান৪১/ব্রি ধান৫৩/ব্রি ধান৫৪/ব্রি ধান৭৩ এবং রবি মৌসুমে সূর্যমুখী (হাইসান৩৩)/তরমু /ফুটি/ঢেঁড়শ চাষ করে অধিক লাভবান হওয়া যায়।

ড. মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল*, ড. মো. আনছার আলী**
ড. মো. শাহজাহান কবীর*** ড. ভাগ্য রানী বনিক****

* সিএসও, ** পরিচালক, *** পরিচালক ****মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট
maalibrri@yahoo.com, dr@brri.gov.bd


Share with :

Facebook Facebook