কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

দক্ষিণাঞ্চলের উপযোগী বিনা উদ্ভাবিত প্রযুক্তি

বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) একটি বিশেষায়িত কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। পরমাণু ও জীবপ্রযুক্তিসহ অন্যান্য আধুনিক  কৌশল ব্যবহার করে প্রতিকূল পরিবেশ উপযোগী ফসলের উন্নত জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিতকরণ এবং আর্থসামাজিক উন্নয়ন বিনার উদ্দেশ্য। বর্তমানে ১১টি বিভাগ, ১৩টি উপকেন্দ্র এবং পাঁচটি গবেষণা ক্ষেত্রের মাধ্যমে এ  ইনস্টিটিউটের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এ যাবৎ এ প্রতিষ্ঠান থেকে ১৩টি ফসলের মোট ৯০টি উন্নত জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকার ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততাসহ প্রতিকূল পরিবেশে চাষ উপযোগী বিনা থেকে উদ্ভাবিত বিভিন্ন ফসল জাতের  সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়া হলো-
বিনাধান-৭ : আমন মৌসুমে চাষাবাদের জন্য ২০০৭ সালে জাতটি অবমুক্ত করা হয়। এটি স্বল্প জীবনকালীন ও উচ্চফলনশীল। জীবনকাল ১১৫-১২০ দিন, প্রতি হেক্টরে গড় ফলন ৪.৮ মেট্রিক টন, দেশের প্রায় সব রোপা আমন অঞ্চলে এ জাতটি চাষ করা যায়। আষাঢ় মাসের প্রথম থেকে তৃতীয় সপ্তাহ (মধ্য জুন থেকে জুলাই মাসের ১ম সপ্তাহ) সময়ে বীজ বপন করে ২০-২৫ দিন বয়সের চারা রোপণ করতে হবে। ৩০ দিনের বেশি বয়সের চারা লাগালে অতি দ্রুত ধানের শীষ বের হয়ে ফলন কমে যায়। হেক্টরপ্রতি ইউরিয়া, টিএসপি এবং এমওপি, জিপসাম ও দস্তার মাত্রা যথাক্রমে ১৭৩, ১১১, ৬১, ৪৯, ৪.০ কেজি। শেষ চাষের সময় ইউরিয়া বাদে অন্যান্য সার মাটিতে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। ইউরিয়া সার সমান দুই ভাগে ভাগ করে চারা রোপণের ৭-১০ দিন পর প্রথম কিস্তি এবং ২৫-৩০ দির পর দ্বিতীয় কিস্তি প্রয়োগ করতে হবে। আগাছা দমন, আন্তঃপরিচর্যা ও পোকামাকড় দমন প্রয়োজন অনুযায়ী করতে হবে।
বিনাধান-৮ : বোরো মৌসুমে চাষাবাদের জন্য ২০১০ সালে লবণসহিষ্ণু উন্নত জাত হিসেবে অবমুক্ত করা হয়। এটি কুশি অবস্থা থেকে পরিপক্বতা পর্যন্ত ৮-১০ ডেসিসিমেন মিটার মাত্রার লবণাক্ততা সহনশীল। জীবনকাল ১৩০-১৩৫ দিন, ফলন ক্ষমতা প্রতি হেক্টরে ৫.০-৫.৫ মে. টন, দেশের লবণাক্ত এলাকায় বেলে দোআঁশ ও এঁটেল দোআঁশ মাটিতে জাতটি চাষের উপযোগী। বিনাধান-৮ এর চাষাবাদ অন্যান্য বোরো ধানের মতো। ২৫-৩০ অগ্রহায়ণ (ডিসেম্বর মাসের ২য় সপ্তাহ) বীজতলা করে ৩৫-৪০ দিনের চারা রোপণ করতে হবে। এ জাতে হেক্টরপ্রতি ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম ও জিংক সালফেটের মাত্রা যথাক্রমে ২২২, ১১১, ৬৯, ৪৪, ৬৫.০ কেজি। জাতটির চাষাবাদ পদ্ধতি বিনাধান-৭ ধানের মতো।
বিনাধান-১০ : বোরো মৌসুমে চাষাবাদের জন্য ২০১২ সালে লবণসহিষ্ণু উন্নত জাত হিসেবে অবমুক্ত করা হয়। এটি কুশি অবস্থা থেকে পরিপক্বতা পর্যন্ত ১০-১২ ডিএস-মিটার মাত্রার লবণাক্ততা সহনশীল। জীবনকাল ১২৫-১৩০ দিন, ফলন ক্ষমতা প্রতি হেক্টরে ৫.৫-৬.০ মে. টন, দেশের লবণাক্ত এলাকায় বেলে দোআঁশ ও এঁটেল দোআঁশ মাটিতে চাষের উপযোগী। জাতটির চাষাবাদ পদ্ধতি বিনাধান-৭ ধানের মতো।
বিনাধান-১৭ : আমন মৌসুমে চাষাবাদের জন্য ২০১৫ সালে জাতটি অবমুক্ত করা হয়। এটি আগাম পাকে বলে উৎপাদন খরচ কম এবং সহজেই রবি ফসল চাষ করা যায়। জীবনকাল ১১০-১১৫ দিন, প্রতি হেক্টরে গড় ফলন ৭.০ মে. টন। বিনাধান-১৭ এর চাষাবাদ বিনাধান-৭ ধানের মত তবে পানি ও ইউরিয়া সার ২০-৩০ ভাগ কম লাগে।
বিনাগম-১ : ২০১৬ সালে জাতটি অবমুক্ত করা হয়। এটি অঙ্গজ বৃদ্ধি পর্যায় থেকে পরিপক্ব হওয়া পর্যন্ত ১২ ডিএস-মিটার পর্যন্ত লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে, জীবনকাল ১০৫-১১০ দিন, গড় ফলন প্রতি হেক্টরে লবণাক্ত মাটিতে ২.৯ মে. টন এবং অলবণাক্ত মাটিতে ৩.৮ মে. টন। দানা ছোট ও বাদামি রঙের, ১০০০ দানার ওজন ৩৬.৬ গ্রাম। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকা পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর, বরগুনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও খুলনায় এ জাত চাষাবাদের উপযোগী। নভেম্বর মাসের ১৫ থেকে ডিসেম্বরের ৭ তারিখ পর্যন্ত বীজ বপন করা যায়। হেক্টরপ্রতি ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম ও দস্তার মাত্রা যথাক্রমে ২৪৭, ১৪৮, ১২৩, ৮৬, ৬.০ কেজি। শেষ চাষের সময় অর্ধেক ইউরিয়া ও অন্যান্য সম্পূর্ণ সার প্রয়োগ করতে হবে। বাকি অর্ধেক ইউরিয়া বপনের ২০-২৫ দিন পর ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। আগাছা দমন, আন্তঃপরিচর্যা ও পোকামাকড় দমন প্রয়োজন অনুযায়ী করতে হবে।
বিনাচিনাবাদাম-৫ ও বিনাচিনাবাদাম-৬ : জাত দুটি ২০১১ সালে অবমুক্ত করা হয়, ফুল ফোঁটা থেকে পরিপক্ব হওয়া সময়ে ৮ ডিএস-মিটার লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে, জীবনকাল ১৪০-১৫০ দিন, প্রতি হেক্টরে গড় ফলন ২.৪ মে. টন। পটুয়াখালী ও খুলনা অঞ্চলে জাত দুটি ভালো ফলন দেয়। ডিসেম্বরের ১৫ থেকে  জানুয়ারির ৩০ তারিখ পর্যন্ত (পৌষের ১ম থেকে মাঘ মাসের ৩য় সপ্তাহ) হেক্টরপ্রতি ১৪৮ কেজি বীজ সারিতে বপন করতে হবে। সারি থেকে সারির দূরত্ব ১৫ সেন্টিমিটার এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ২.৫-৪ সেন্টিমিটার হতে হবে। হেক্টরপ্রতি ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম, বোরন এবং দস্তার মাত্রা যথাক্রমে ৪৯, ১৬৩, ১৪৮, ১১৮, ৭ ও ৪.৫ কেজি। শেষ চাষের সময় সব সার প্রয়োগ করতে হবে। দানা পুষ্ট হওয়ার জন্য বোরন ও জিপসাম সার পরিমাণ মতো দিতে হবে। আগাছা দমন, আন্তঃপরিচর্যা, রোগ ও পোকামাকড় দমন প্রয়োজন অনুযায়ী করতে হবে।
বিনাচিনাবাদাম-৭, ৮ ও ৯ : জাত তিনটি ২০১৪ সালে অবমুক্ত করা হয়, ফুল ফোঁটা থেকে পরিপক্বতা পর্যন্ত ৮ ডিএস/মিটার লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে, জীবনকাল ১৪০-১৫০ দিন, জাত ৩টির প্রতি হেক্টরে গড় ফলন যথাক্রমে ২.৫২, ২.৫৬ ও ২.৯ মেট্রিক টন (হেক্টরপ্রতি গড় ফলন লবণাক্ত অবস্থায় ১.৯ মেট্রিক টন)। জাতগুলোর চাষাবাদ পদ্ধতি বিনাচিনাবাদাম-৫ ও বিনাচিনাবাদাম-৬ এর অনুরূপ।
বিনাতিল-২ : খরিফ-১ মৌসুমে চাষাবাদের জন্য জাতটি ২০১১ সালে অবমুক্ত করা হয়, জীবনকাল ৯১-৯৮ দিন, প্রতি হেক্টরে গড় ফলন ১.৪ মেট্রিক টন, বীজে তেলের পরিমাণ শতকরা ৪৪ ভাগ। ফেব্রুয়ারি মাসের ৩য় থেকে মার্চ মাসের ২য় সপ্তাহ (ফাল্গুন মাস) সময়ে হেক্টরপ্রতি ৭ কেজি বীজ সারিতে বপন করতে হবে।  হেক্টরপ্রতি ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম, জিংক সালফেট এবং বরিক এসিড/সলুবলের মাত্রা যথাক্রমে- ১২৩, ১৩৫, ৬১, ৩.৭ এবং ৭.৪ কেজি। শেষ চাষের সময় অর্ধেক ইউরিয়া ও অন্যান্য সম্পূর্ণ সার মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে। বাকি অর্ধেক ইউরিয়া বীজ বপনের ২৫-৩০ দিন পর ফুল আসার সময় জমিতে হালকা সেচ দিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। দানা পুষ্ট হওয়ার জন্য বোরন ও জিপসাম সার পরিমাণ মতো দিতে হবে। ক্ষেতে যাতে পানি জমে না থাকে সে জন্য উপযুক্ত নালার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
বিনাসয়াবিন-২ : জাতটি ২০১১ সালে অবমুক্ত করা হয়, জীবনকাল রবি মৌসুমে ১০৮-১১২ দিন এবং খরিফ-২ মৌসুমে ১১৫-১২০ দিন, প্রতি হেক্টরে গড় ফলন রবি ও খরিফ-২ মৌসুমে যথাক্রমে ২.৪ ও ২.৭  মেট্রিক টন। ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি থেকে জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ এবং খরিফ-২ মৌসুমে জুলাই মাসের ১ম থেকে আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত হেক্টরপ্রতি ৫৪ কেজি বীজ সারিতে বপন করতে হবে। সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩৫ সে.মি. এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৫-৭ সে.মি.। হেক্টরপ্রতি ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি ও জিপসাম সারের মাত্রা যথাক্রমে ৬১, ১৭৩, ৯৮ ও ১১১ কেজি। শেষ চাষের সময় সব সার মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে। আগাছা দমন, আন্তঃপরিচর্যা ও পোকামাকড় দমন প্রয়োজন অনুযায়ী করতে হবে।
বিনাসয়াবিন-৩ : জাতটি ২০১৩ সালে অবমুক্ত করা হয়, জীবনকাল রবি মৌসুমে ১০৯-১১৬ দিন এবং খরিফ-২ মৌসুমে ১০৫-১১৫ দিন, প্রতি হেক্টরে গড় ফলন রবি ও খরিফ-২ মৌসুমে যথাক্রমে ২.৩ ও ২.৪ মেট্রিক টন। জাতটির চাষাবাদ পদ্ধতি বিনাসয়াবিন-২ এর অনুরূপ।
বিনামুগ-৮ : জাতটি ২০১০ সালে খরিফ-১ মৌসুমে চাষাবাদের জন্য অবমুক্ত করা হয়, জীবনকাল ৬৪-৬৭ দিন, প্রতি হেক্টরে গড় ফলন ১.৮ মেট্রিক টন। জানুয়ারি মাসের ২য় থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের ২য় সপ্তাহ (ফাল্গুন থেকে চৈত্র মাসের মাঝামাঝি) সময়ে হেক্টরপ্রতি ১০-১২ কেজি বীজ বপন করতে হবে। ২৪-২৯ হেক্টরপ্রতি ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপি সার এর মাত্রা যথাক্রমে ১২, ২৮ ও ১৪ কেজি। সব সার শেষ চাষের সময় প্রয়োগ করতে হবে। আগাছা দমন, আন্তঃপরিচর্যা ও পোকামাকড় দমন প্রয়োজন অনুযায়ী করতে হবে।
বিনা থেকে উদ্ভাবিত উন্নত জাতের ধান, চিনাবাদাম, তিল, সয়াবিন ও মুগের জাত এবং উন্নত শস্য বিন্যাস কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও চাষিদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখতে সক্ষম হবে। বিশেষ করে স্বল্প জীবনকাল বিশিষ্ট এবং উচ্চফলনশীল আমন জাত বিনাধান-১৭ (হেক্টরপ্রতি গড় ফলন প্রতি ৭ মেট্রিক টন) ব্যাপক সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশে অতিরিক্ত ২০ লাখ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এছাড়া এ জাতের জীবনকাল (১১৫-১২০ দিন) কম হওয়ায় দুই ফসলের স্থলে সহজেই তিন ফসল চাষ করা যাবে। বিনা উদ্ভাবিত উন্নত ফসল চাষাবাদের মাধ্যমে দানাদার ফসলের পাশাপাশি ডাল ও তেল ফসলেও সহজেই দেশ স¦য়ংসম্পূর্ণ হতে পারবে। সরকার ঘোষিত রূপকল্প ২০২১ বাস্তÍবায়নে বিনা যোগ্য অংশীদার হতে পারবে।

ড. এম রইসুল হায়দার*
*মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং গবেষণা সমন্বয়ক, বিনা, মংয়মনসিংহ; ০১৭১৫৩৭২৭৪০


Share with :

Facebook Facebook