কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

দক্ষিণাঞ্চলের উপযোগী তুলাচাষ প্রযুক্তি

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর জেলাগুলো তুলা চাষের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় অঞ্চল। বাংলাদেশের মোট আয়তনের ২০ ভাগ অর্থাৎ ২.৮৫ মিলিয়ন হেক্টর উপকূলীয় এলাকার মধ্যে প্রায় ০.৮৩ মিলিয়ন হেক্টর আবাদি জমি রয়েছে। দেশের গড় ফসল ১৯১ শতাংশ হলেও  উপকূলে ফসলের নিবিড়তা ১৩৩ শতাংশ মাত্র। জমিতে লবণাক্ততার কারণেই এসব জেলায় ফসলের নিবিড়তা কম। বাংলাদেশের প্রধান প্রধান ফসলগুলো লবণাক্ততা সংবেদনশীল হওয়ার কারণে অধিকাংশ জমিই রবি মৌসুমে পতিত থাকে। তুলা লবণাক্ত অঞ্চলে জন্মানোর একটি উপযোগী ফসল। তবে খরিফ মৌসুমে তুলা বপনকালীন জলাবদ্ধতার কারণে ওই অঞ্চলে সমতল ভূমির অন্যান্য অঞ্চলের মতো খরিফ-২ মৌসুমে তুলা আবাদের উপযোগিতা কম। এ অঞ্চলে তুলা চাষের উপযোগী সময় হলো রবি মৌসুম। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের  দক্ষিণাঞ্চলে রবি মৌসুমে আমন ধান কাটার পরে তুলার চাষ করা হয়। বিগত কয়েক বছর ধরে তুলা উন্নয়ন বোর্ড আমন ধান কাটার পর রবি মৌসুমে দক্ষিণাঞ্চলে তুলার উপযোগিতা যাচাইয়ের জন্য এডাপ্টিভ ট্রায়াল স্থাপন করেছে। ওই এডাপ্টিভ ট্রায়ালগুলো ফলাফল থেকে দেখা যায়, দক্ষিণাঞ্চলে আমন ধান কাটার পর তুলাবীজ বপন করা হলে বিঘাপ্রতি ২৬১.০-২৯৮ কেজি তুলার ফলন পাওয়া যায়। তবে বৈশাখ মাসের বৃষ্টিতে তুলার ফুটন্ত বোল যেন নষ্ট না হয় সে লক্ষ্যে যথাসময়ে বীজ বপন ও আগাম বীজতুলা সংগ্রহের জন্য ফসল ব্যবস্থাপনা করতে হয়। আমন ধান কাটার পর বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ব্যাপক এলাকা পতিত থাকে। উল্লিখিত পতিত জমিতে তুলা চাষ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে  চলতি ২০১৬-২০১৭ মৌসুমে  তুলা উন্নয়ন বোর্ড দক্ষিণাঞ্চলের ঝালকাঠি, রাজাপুর, বাবুগঞ্জ, তালা, আমতলী, কলাপাড়া, দশমিনা, গলাচিপা উপজেলাগুলো ১০০টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করেছে। এসব জেলাগুলো তুলা চাষ সম্প্রসারণ করে ফসলের নিবিড়তা বাড়িয়ে উপকূলীয় চাষিদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের পাশাপাশি টেক্সটাইল মিলের প্রধান কাঁচামাল আশতুলার সরবরাহ করা যাবে।
বপন সময় : ১৫ কার্তিক থেকে শুরু করে ৩০ কার্তিক পর্যন্ত তুলা বীজ বপন করতে হবে। এ সময় আমন ধান কাটা হয়ে গেলে ও জমিতে জো থাকলে জমি তৈরি করে সরাসরি জমিতে বীজ বপন করতে হবে। এ সময় জমি বীজ বপনের উপযুক্ত না থাকলে বীজতলা তৈরি করে বীজ বপন করতে হবে।
বীজ হার : বিঘাপ্রতি ১.০ কেজি উফশি কিংবা ৫০০-৬০০ গ্রাম হাইব্রিড  বীজের প্রয়োজন হয়। বীজ বপনরে আগে তুলাবীজ ৩-৪ ঘণ্টা পানেিত ভিজিয়ে শুকনো মাটি বা ছাই দিয়ে ঘষে নেয়া উত্তম।
জমি তৈরি : রোপা আমন কাটার পর বিঘাপ্রতি ১.০-১.৫ মেট্রিক টন গোবর-কম্পোস্ট সার জমিতে ছটিেিয় দিয়ে ৩-৪টি চাষ ও মই দিয়ে জমি সমতল ও ঝুরঝুরে করে নিতে হবে।
বীজ বপন : তুলা বীজ সারেিত বপন করতে হয়। সব জাতের ক্ষেত্রেই সারি থেেক সারি ৯০ সেন্টিমিটার (৩ ফুট বা ২ হাত) এবং গাছ  থেকে গাছরে দূরত্ব ৪৫ সেন্টিমিটার (১.৫ ফুট বা ১ হাত) বজায় রেেখ বীজ বপন করতে হবে।
তুলার চারা রোপণ : আমন ধান কাটার পর জমি ভিজা, স্যাঁতস্যাঁতে ও বপন উপযোগী না থাকলে, বসতবাড়ির আশপাশে শুকনো জমিতে বীজতলা তৈরি করে তুলার বীজ বপন করতে হবে। বীজতলার মাটি চাষ দিয়ে ঝুরঝুরে করে  গোবর, ছাই ও সামান্য পরিমাণে পটাশ সার মিশিয়ে সারিতে গর্তে বীজ বপন করে পলিথিন দিয়ে মাটি ঢেকে দিতে হবে।  পরে উপযুক্ত সময়ে জমি তৈরি করে ১০-২০ দিন বয়ষ্ক চারা বীজতলা থেকে মাঠে রোপণ করতে হবে।
সার প্রয়োগ : ভালো ফলন পেতে হলে তুলা ক্ষেতে উপযুক্ত সার সঠিক পরিমাণ ও নিয়মমাফিক ব্যবহার করতে হয়। মাটিতে জৈব ও রাসায়নিক উভয় প্রকার সার প্রয়োগ করা প্রয়োজন। জৈব সার ব্যবহারে মাটির জৈব পদার্থ বাড়ে ফলে মাটির পানি ধারণক্ষমতা বাড়ে, অনুজীবের কার্যকারিতা বাড়ে এবং অনুখাদ্যের পরিমাণ বাড়ে বিঘাপ্রতি সারের মাত্রা হলো ইউরয়িা  ২৫-৩০ কেজি; টিএসপি ৩০-৩৫ কেজি; এমওপি ৩৫-৪০ কেজি; জিপসাম ১৪-১৬ কেজি; সলুবর বোরন ২.৫-৩ কেজি; জিংক ২.৫-৩; ম্যাগ. সালফটে ২.৫-৩। প্রাথমিক সার বীজ বপনের জন্য তৈরি নালায় অথবা পৃথক নালা কেটে প্রয়োগ করতে হবে। পার্শ্ব প্রয়োগের ক্ষেত্রে সারি থেকে ৫-৬ সেন্টিমিটার দূরে নালা কেটে সার প্রয়োগ করে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে৷ একবার সারির যে দিকে পার্শ্বপ্রয়োগ করা হবে পরবর্তিতে তার বিপরীত দিকে পার্শ্বপ্রয়োগ করতে হবে৷ আগাম ফসল ব্যবস্থাপনার জন্য ৯০ দিন পর ইউরিয়া সার প্রয়োগ করা যাবে না।
মাটি দিয়ে গোড়া বেঁধে দেয়া : বীজ বপনের ৪০ দিন পর ইউরিযা সার পার্শ্বপ্রয়োগ করে ১ম বার  এবং আবার বীজ বপনরে ৬০ দিন  পর পুনরায় ইউরিযা সার পার্শ্বপ্রয়োগ করে ২য় বার  গাছের গোড়া মাটি দিয়ে ভালো করে বেঁধে দিতে হবে।
তুলার ক্ষতিকারক পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা ক্ষতির ধরন অনুসারে তুলা ফসলের অনিষ্টকারী পোকামাকড়কে প্রধানত দুই শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। যথা- শোষক ও চর্বনকারী পোকা।
শোষক পোকা : যেসব পোকামাকড় গাছের কচিপাতা, ডগা, কুঁড়ি, ফুল অংশ থেকে রস শোষণ করে গাছেরসমূহ ক্ষতি করে থাকে তাদের শোষক পোকা বলা হয়। তুলার প্রধান প্রধান শোষক পোকা হলোÑ জ্যাসিড; জাব পোকা; লাল গান্ধি পোকা; সাদা মাছি; থ্রিপস; লাল মাকড়।
চর্বনকারী পোকা : এ পোকাগুলো গাছের পাতা, ফুল, কুঁড়ি চর্বন করে এবং ডগা বা বোল ছিদ্র করে ভেতরে প্রবেশ করে ক্ষতি করে। এ পোকা সাধারণত শুককীট অবস্থায় গাছের ক্ষতি করে থাকে। এ ধরনের ক্ষতিকারক পোকাগুলো হলোÑ গুটি পোকা; আঁচা পোকা; পাতা মোড়ানো পোকা; ঘোড়া পোকা। আমাদের দেশে ক্ষতিকারক পোকার মধ্যে সাদা মাছি, জ্যাসিড, জাবপোকা, স্পটেড বোলওয়ার্ম, আমেরিকান বোলওয়ার্ম ও আঁচা পোকার নামই সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য। এ পোকা দিয়ে তুলা ফসল আক্রান্ত হলে এবং সময়মতো ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে তুলার ফলন আশংকাজনকভাবে কমে যায়। কীটনাশক প্রয়োগ করে ক্ষতিকারক পোকামাকড়কে দমন করা যায়। তবে মাঠে কীটনাশক প্রয়োগের আগে স্কাউটিং করে জমিতে ক্ষতিকারক পোকামাকড়ের সঠিক অবস্থা নির্নয় করা আবশ্যক।
বীজতুলা সংগ্রহ : তুলা গাছের বৃদ্ধি ইনডিটারমিনেট টাইপ হওয়াতে বীজতুলা একবারে সংগ্রহ করা যায় না। ৩-৪ বারে সংগ্রহ করার প্রয়োজন হয়। বপনের পর জাত ভেদে ১১০-১২০ দিনের মধ্যেই তুলার বোল ফাটতে শুরু করে। প্রথম বার তুলা সংগ্রহ এর সময় ৪০-৫০ ভাগ বোল ফাটার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া দরকার। দ্বিতীয় সংগ্রহ এ ২৫-৩০ ভাগ তুলা সংগ্রহ করা যেতে পারে। অবশিষ্ট ২০ ভাগ তুলা তৃতীয় বা শেষ বারে সংগ্রহ করা যেতে পারে। এভাবে বীজতুলার সংগ্রহ স¤পন্ন করতে প্রায় ৪০-৫০ দিন সময় দরকার হয়।
তুলার চাষ বিভিন্নভাবে চাষিদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তুলার বীজ বপন থেকে শুরু করে বীজ তুলা প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যন্ত মহিলা শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। উৎপাদিত বীজতুলা থেকে ৪০ শতাংশ আঁশ ও ৬০ শতাংশ বীজ পাওয়া যায়। বীজ থেকে পুনরায় ১৫ শতাংশ ভোজ্যতেল ও ৮৫ শতাংশ খৈল পাওয়া যায়। তুলার খৈল মাছ ও পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অপরদিকে শুকনো তুলা গাছ জ্বালানি কাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।  আমন ধান কাটার পর দক্ষিণাঞ্চলের ব্যাপক অনাবাদি জমিতে তুলার আবাদ করে বস্ত্রশিল্পের প্রধান কাঁচামাল তুলার আঁশ জোগানোর পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে তুলা উন্নয়ন বোর্ড আগ্রহী তুলা চাষিদের সব প্রকার সহযোগিতা প্রদান করে থাকে।


ড. মো. ফরিদ উদ্দিন*
*নির্বাহী পরিচালক, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, খামারবাড়ি, ঢাকা


Share with :

Facebook Facebook