কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

দক্ষিণাঞ্চলে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের প্রযুক্তি

বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী পাহাড়, গড়, নদীবাহিত পললভূমি বেষ্টিত ১,৪৭,৬১০ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট এ দেশ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সুজলা, সুফলা সোনার বাংলাদেশ। এ দেশে ১৫টি ভূপ্রকৃতি ও ৩০টি কৃষি পরিবেশ অঞ্চল রয়েছে। ৪১৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকা, যা আয়তনে ২৮,৬০০ বর্গকিলোমিটার, বাংলাদেশের প্রায় ২০ ভাগ এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। সমুদ্র বিজয়ের পর বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার দৈর্ঘ্য বেড়ে ৭১০ কিলোমিটার হয়েছে যা দেশের প্রায় ৩০ শতাংশের বেশি। দক্ষিণাঞ্চলে গংগার পললভূমি, গঙ্গার জোয়ার ভাটার পললভূমি, মেঘনা মোহনার পললভূমি, চট্টগ্রামের সমুদ্র উপকূলবর্তী জোয়ার ভাটার পলল ভূমি ও পিট বেসিন নামক ৫টি ভূপ্রকৃতি অঞ্চল রয়েছে। এ অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে প্রধানত স্থানীয় উন্নত জাতের ধানের আবাদ বেশি হয়ে থাকে। শুষ্ক মৌসুমে অধিকাংশ জমি মৌসুমি পতিত থাকে; কারণ শুষ্ক মৌসুমে দক্ষিণাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকা বিভিন্ন মাত্রায় লবণাক্ততা দ্বারা মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়। তখন সেচের জন্য উপযোগী পানির অভাব দেখা দেয়। শুষ্ক রবি মৌসুমে ব্যাপক এলাকা বিপন্নভাবে পতিত থাকে।
বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে জলবায়ুর বিরূপ পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের ইকো-সিস্টেমের এবং কৃষি পরিবেশের ওপর ঋণাত্মক প্রভাব দেখা যায়। বাংলাদেশের উপকূলবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা কার্বন নির্গমনের ফলে ওজন স্তর হালকা হওয়া, তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া, বরফ বেশি গলার ফলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়া পরিবেশগত ক্ষতি ও হুমকির দ্বারা বিপন্ন অঞ্চল। ধারণা করা হচ্ছে, আবহাওয়ার মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাবের ফলে পৃথিবীর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অন্তর্গত বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি (শস্য), মৎস্য ও জনবসতি জানমাল সর্বাধিক হুমকির সম্মুখীন; মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যা অত্যন্ত সফলভাবে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেছেন।
বাংলাদেশের আবাদি জমির শতকরা ১০ ভাগের বেশি দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলবর্তী এলাকা। এ দেশের ২৮.৬০ লাখ হেক্টর উপকূলবর্তী এলাকার মধ্যে ১০.৫৬ লাখ হেক্টর আবাদি জমি বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততা দ্বারা আক্রান্ত। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট ১৯৭৩ সাল থেকেই উপকূলীয় এলাকার পানি ও মৃত্তিকার লবণাক্ততা পরিবীক্ষণ কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পরিচালনা করে আসছে।
নির্দিষ্ট সময়ে ও নির্দিষ্ট স্থানে নিয়মিতভাবে পানির উপরিস্তর (নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর, সমুদ্র), নি¤œস্তর (অগভীর, গভীর, হ্যান্ড টিউবওয়েল) এবং মৃত্তিকা পরীবিক্ষণ করে মানচিত্রসহ প্রতিবেদন তৈরি করা হচ্ছে। লবণাক্ততা মাত্রা চিহ্নিত করে নিয়মিত উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে মৃত্তিকা পানি লবণাক্ততা মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে এবং হালনাগাদ করা হচ্ছে।
মৃত্তিকা লবণাক্ততা
মৃত্তিকা দ্রবণীয় অবস্থায় লবণ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান ধারণ করে। উদ্ভিদ দ্রবণীয় অবস্থায় তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান মৃত্তিকা থেকে গ্রহণ করে। অতিরিক্ত দ্রবণীয় লবণ মৃত্তিকাস্থ দ্রবণে থাকলে তাকে মৃত্তিকা লবণাক্ততা বলে। বেশি দ্রবীভূত লবণ দ্রবণে থাকলে উদ্ভিদের মূল দ্রবীভূত পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করতে পারে না। ফলে উদ্ভিদের বৃদ্ধি বা ফলন মারাত্মকভাবে ব্যাহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
লবণ মৃত্তিকাতে আয়ন হিসেবে অবস্থান করে। এসব আয়ন খনিজবস্তু অবক্ষয়ের মাধ্যমে অবমুক্ত হয়। সমুদ্র পানির মাধ্যমে এসব লবণের আয়ন মৃত্তিকাতে দ্রবীভূত হয়। এসব দ্রবীভূত লবণযুক্ত পানি সেচ হিসেবে ব্যবহার করলে গাছের শিকড় মাটির দ্রবণ থেকে পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করতে পারে না। ফলে এলাকা উদ্ভিদ শূন্য হয়ে পড়ে। ক্রমশ উদ্ভিদ ও পশুপাখি শূন্য হয়ে প্রকৃতি এক বিরান ভূমিতে পরিণত হয়। পানির লবণাক্ততা থেকেই মৃত্তিকার লবণাক্ততা সৃষ্টি হয়। মন্দ নিষ্কাশন-লবণযুক্ত সেচের পানি মাটির লবণাক্ততার জন্য প্রধান কারণ হতে পারে। যেহেতু উদ্ভিদ মৃত্তিকাস্থ পানি গ্রহণ করে ও মৃত্তিকাস্থ পানি বাষ্পীভূত হয়, তাই লবণ মৃত্তিকাতে জমা থাকে বা পড়ে থাকে। এ কারণে গাছের পানির ঘনত্ব মাটিতে দ্রবণের ঘনত্ব থেকে অনেক কম হয়। লবণাক্ত পানি দ্বারা অপরিকল্পিতভাবে সেচ ব্যবস্থাপনার ফলে মৃত্তিকা লবণাক্ততা মাত্রাতিরিক্তভাবে বাড়ে।
মৃত্তিকা লবণাক্ততা দূরীভূত বা প্রতিকার করার জন্য বা মৃত্তিকাতে যেন লবণাক্ততা গঠিত হতে না পারে সেজন্য প্রচুর অলবণাক্ত পানি উদ্ভিদের মূল অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত করতে হয় যাতে লবণ দ্রবীভূত হয়ে চুয়ে যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, কিছু কিছু লবণের আয়ন গাছের জন্য অপরিহার্য।
বাংলাদেশে লবণাক্ততার বর্তমান অবস্থা
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের গবেষণা ও জরিপ লব্দ তথ্য থেকে জানা যায়, ১৯৭৩ সালে লবণাক্ততা আক্রান্ত এলাকা ছিল ৮.৩৩ হেক্টর। পরবর্তিতে উপকূলবর্তী এলাকায় লবণাক্ততার তীব্রতা দিন দিন বাড়তে থাকে। বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের এ তীব্রতা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। দেখা যাচ্ছে, সাতক্ষীরা, যশোর, নড়াইল ও গোপালগঞ্জে লবণাক্ততা উত্তর দিকে ধেয়ে এসেছে। কোথাও কোথাও ১০-১২ কিলোমিটার উত্তর পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে। এর কারণ হলো উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং সমুদ্র পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়া। গবেষণায় আরও জানা যায়, ২০০০ সালে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ১৪.৫৯ লাখ হেক্টর এর মধ্যে ১০.২০ লাখ হেক্টর জমি বিভিন্ন মাত্রায় লবণ দ্বারা আক্রান্ত। ২০০৯ সালে আবাদি জমির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৬.৮৯ লাখ হেক্টর এর মধ্যে লবণাক্ত আক্রান্ত এলাকার আয়তন দাড়ায় ১০.৫৬ লাখ হেক্টর। এতে প্রতীয়মান হয়, ২০০০ থেকে ২০০৯ সালে ৯ বছরে লবণাক্ত জমি ৩৬ হাজার হেক্টর বৃদ্ধি পেয়েছে অর্থাৎ প্রতি বছর নতুন করে ৪০০০ হেক্টর জমি লবণ দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে।
দক্ষিণাঞ্চলে মৃত্তিকা ও পানির লবণাক্ততা ব্যবস্থাপনা
লবণাক্ততা এলাকায় মৃত্তিকা ও পানির লবণাক্ততা নিয়মিত পরীক্ষণকরণ ও চিহ্নিতকরণ;
কলসি সেচ প্রযুক্তি;
দ্বিস্তর বিশিষ্ট আচ্ছাদন;
ছোট ছোট খামার পুকুর তৈরির প্রযুক্তি;
রিজ ও ফারো পদ্ধতিতে চাষাবাদ;
প্রদর্শনীর মাধ্যমে বিভিন্ন মাত্রায় বিভিন্ন জাতের লবণসহিষ্ণুতা যাচাইকরণ;
শাকসবজি ও ফসলের বেড উঁচু তৈরি করা;
বিভিন্ন প্রকার জৈব সার ব্যবহার করা;
জমিকে চাষ দিয়ে ঝুরঝুরে ও আর্দ্র অবস্থায় রাখা;
স্থানভিত্তিক লবণাক্ততা মাত্রা জেনে উপযোগী ও সহনশীল ফসলের জাত নির্বাচন করে চাষাবাদ করুন।
কলসি সেচ প্রযুক্তি
কলসিতে ৩-৪ ছোট ছিদ্র রাখুন;
৪-৫ ফুট লম্বা পাটের রশি প্রতি ছিদ্র দিয়ে ঝুঁলিয়ে দিন;
কলসিটিকে মাটিতে এমনভাবে স্থাপন করুন যাতে রশিগুলো ফসলে চার মূলের চার দিকে ছড়িয়ে থাকে।
কর্ষণ স্তরের ১০-১৫ সে. মি. (৪-৬ ইঞ্চি) নিচে ১০-১৫ সে.মি. (৪-৬ ইঞ্চি) মতো উঁচু করে ধানের খড় বিছিয়ে দিন;
খড়ের ওপরের মাটিতে সুষম সার মাত্রা অনুসারে জৈব ও রাসায়নিক সার মিশিয়ে দিন;
সুষম সার মিশ্রিত মাটিতে চারা রোপণ বা বীজ বপন করা হয়;
মাটির উপরে আবার ধানের খড় বিছিয়ে দিন;
নিচের খড়ের স্তর মাটির নিচ থেকে লবণ উপরে উঠতে বাধা দেবে। ওপরের শক্ত মাটিতে রস ধারণ করতে সহায়তা করবে;
ফলে মাটির লবণাক্ততা কমতে থাকবে।
ছোট ছোট খামার পুকুর প্রযুক্তি
বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য ২.২৫ মিটার গভীর ছোট ছোট পুকুর জমির ১/৫ অংশে খনন করুন।
১ থেকে ১.৫ মিটার উঁচু আইল তৈরি করতে হবে। যাতে ৩ মিটার পর্যন্ত উচ্চতায় পানি থাকতে পারে।
১/৫ অংশের উত্তোলিত মাটি অবশিষ্ট ৪/৫ অংশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে নিতে হবে।
প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
আটকানো পানি উদ্যান ফসল ও শাকসবজি চাষে ব্যবহার করা যাবে ।
পুকুরের পানির উচ্চতা মাপার গজ থাকতে হবে।
স্বল্প পরিসরে শুষ্ক জমির ফসল (আপল্যান্ড ক্রপ) আবাদ করা যাবে।

মো. দেলোয়ার হোসেন মোল্লা*
*মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, ঢাকা


Share with :

Facebook Facebook