কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

উপকূলে মাছ চাষ ও করণীয়

বাংলাদেশর আর্থসামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে মৎস্য সেক্টর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে তথা জিডিপিতে মৎস্য সেক্টরের অবদান, যা কৃষি খাতে উৎপাদিত মোট মূল্য উল্লেখযোগ্য। আমাদের  দৈনন্দিন প্রাণিজ আমিষের শতকরা ৬০ ভাগ জোগান দিচ্ছে মাছ। এ সেক্টরের সাথে সার্বক্ষণিকভাবে ১২ লাখ এবং খ-কালীনভাবে ১  কোটি ২০ লাখ জনগোষ্ঠী সম্পৃক্ত থেকে তাদের জীবিকা নির্বাহ করার পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর প্রাণিজ আমিষের চাহিদাপূরণ, দেশের জন্য মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, পরিবেশের উৎকর্ষতা বৃদ্ধিসহ দারিদ্র্যবিমোচন কর্মকা- হচ্ছে। মাছের বার্ষিক চাহিদা ৩৭.৬৫ লাখ মেট্রিক টন; জনপ্রতি মাছের বার্ষিক চাহিদা ২১.৯০ কেজি; জনপ্রতি বার্ষিক মাছ গ্রহণ ১৯.৭১; জনপ্রতি দৈনিক মাছের দৈনিক চাহিদা ৬০ গ্রাম। বাংলাদেশে মৎস্য উৎপাদন ও আহরণের উৎস হচ্ছে অভ্যন্তরীণ জলাশয় এবং সামুদ্রিক এলাকা। অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের পরিমাণ প্রায় ৪৩.৩৭ লাখ  হেক্টর। এর মধ্যে প্লাবনভূমিসহ মুক্ত জলাশয় ৪০.৪৭ লাখ হেক্টর এবং উপকূলীয় চিংড়ি খামারসহ বদ্ধ জলাশয় ২.৯০ লাখ হেক্টর। দেশের ৭১০ কিলোমিটার তটরেখার কাছাকাছি বেইসলাইন থেকে সাগরে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃৃত এলাকা আমাদের আওতাধীন জলসীমা। এর ফলে প্রায় ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা দেশের সামুদ্রিক জলসীমা হিসাবে অন্তর্ভুক্ত যা দেশের মূল ভূখ-ের আয়তনের  চেয়েও বড়। এ জলসীমায় আহরণযোগ্য প্রচুর চিংড়ি ও মৎস্য প্রজাতির ছাড়াও রয়েছে অনাহরিত বিপুল মৎস্য সম্পদ।
উপকূলীয় অঞ্চলে মৎস্য সম্পদ
বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চল অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং সমুদ্র তটরেখার উপকূলীয় অঞ্চলে বিস্তৃতি প্রায় ৭১০ কিলোমিটার। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে মাছ চাষের তেমন বিস্তৃৃতি না থাকলেও অপরিকল্পিতভাবে চিংড়ি চাষের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। উপকূলীয় অঞ্চলে ৬৪,২৪৬ হেক্টর চিংড়ি খামারের স্থলে বেড়ে তা বর্তমানে ২,৭৫,৫৮৩ হেক্টরে উন্নীত হয়েছে। এদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বর্তমানে  হেক্টরপ্রতি চিংড়ি উৎপাদনের হার ৩০০-৩৫০ কেজি। পৃথিবীর চিংড়ি উৎপাদনকারী দেশগুলোর তুলনায় এ উৎপাদন অনেক কম। তবে এসব চিংড়ি খামারের ওপর প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৮ লাখের ওপরে তারা সহজে তাদের জীবিকা নির্বাহ করছে। উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ির উৎপাদন বৃদ্ধি ও বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ, বৃদ্ধির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। মোহনা অঞ্চল, সুন্দরবনে সংরক্ষিত জলাভূমি, বেসলাইন জলভূমি ও আন্তঃদেশীয় অঞ্চলের জলাশয় আছে। প্রাকৃতিক উৎসে ব্রুড থেকে পোনা উৎপাদিত হয়। এরা উৎপাদন চক্রের বিভিন্ন অবস্থায় বিভিন্ন অবস্থানে থাকে। আতুড়ে অবস্থায় পোনা উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বা প্যারাবনে আসে একটু বড় হওয়ার পর এরা আবার গভীর সমুদ্রে ফিরে যায়। ধীরে ধীরে বাণিজ্যিকভাবে আহরণ উপযোগী এবং পরে ব্রুডে রূপান্তরিত হয়। বাংলাদেশের মৎস্য উৎপাদনের ২২-২৫ ভাগই আহরিত হয় সমুদ্র থেকে।
সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ
আমাদের সামুদ্রিক মৎস্য ও মৎস্যজাতীয় সম্পদের মধ্যে রয়েছে ৪৭৫ প্রজাতির মাছ, ২৫ প্রজাতির চিংড়ি, ৫ প্রজাতির লবস্টার, ১৫ প্রজাতির কাঁকড়া, ১২ প্রজাতির শিরোপদি, ৬ প্রজাতির কস্তুরা, ৩০১ প্রজাতির ঝিনুক-শামুক, ৩৩ প্রজাতির সাগর কুসুম, ১১ প্রজাতির তিমি-ডলফিন, ২ প্রজাতির তারা মাছ, ৩ প্রজাতির স্পঞ্জ, ৪ প্রজাতির কচ্ছপ, ৫৬ প্রজাতির শৈবাল, ১৩ প্রজাতির প্রবাল এবং সাগরশসা, সজারু, কুমির এসব। দেশের সামুদ্রিক জলসীমায় আহরিত মৎস্য প্রজাতির মধ্যে অধিকাংশই তলদেশীয় মাছ। প্রধান আহরিত তলদেশীয় মৎস্য প্রজাতি হচ্ছে, ফলি চান্দা, রূপচান্দা, সাদা দাতিনা, রাঙ্গা চইক্ক্যা, লাউখ্যা, ছুরি, লাল পোয়া, কামিলা এবং কোরাল এসব। আর সামুদ্রিক উপরিস্তরের মাছের ওপর এখনও কোনো ব্যাপক জরিপ পরিচালিত হয়নি। তবে বিভিন্ন সময়ে তলদেশীয় মাছ ও চিংড়ি সম্পদ জরিপকালে এবং বাণিজ্যিক ট্রলারের জালে বাইক্যাচ হিসেবে যেসব উপরিস্তরের সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যায়, সেগুলো হচ্ছে চ্যাপা কড়ি, মাইট্র্যো ও চম্পা, টুনা মাছ, সারডিন, ক্লপিডস, হাঙর ও ক্যারাঞ্জিড। আর  অপ্রচলিত সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের মধ্যে অনেক প্রজাতির মৎস্য রয়েছে। লবস্টার, শিরোপদি, কাঁকড়া, কস্তুরা, ঝিনুক, সামুদ্রিক শসা, শৈবাল এসব।
সাদা সোনা চিংড়ি
প্রাপ্তবয়স্ক সামুদ্রিক চিংড়ি সাগরে ট্রলার জাল দিয়ে এবং পোনা ও অপ্রাপ্ত চিংড়ি উপকূলীয় ও মোহনা অঞ্চলে বিভিন্ন সনাতনী জাল দিয়ে ধরা হয়। এসব চিংড়ি প্রজাতি হচ্ছে বাগদা, বাধাতারা, ডোরাকাটা, চাগা, বাঘ চামা, হরিণা, ললিয়া এবং রুড়া। উল্লিখিত চিংড়ি প্রজাতির মধ্যে বাগদা চিংড়ির মূল্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি থাকায় এর বাণিজ্যিক আহরণ বেশি। তবে মোট চিংড়ি উৎপাদনের সর্বাধিক অবদান রাখে হরিণা চিংড়ি। ১৯৫০ সালের সর্বপ্রথম সাতক্ষীরা জেলায় চিংড়ি চাষ শুরু হয়। ষাটের দশক থেকে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জোয়ারের পানি বাঁধ দিয়ে আটকিয়ে রেখে পানির সাথে আগত চিংড়ি ও মাছের পোনাকে ৩-৪ মাস লালনপালন করে তা আহরণ করা হয়। পরবর্তীকালে বিশ্ব বাজারে চিংড়ির চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে দেশে চিংড়ি চাষের বিস্তৃতি ঘটতে থাকে। বর্তমানে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাংশে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট ও কক্সবাজার জেলার ২ লাখ ৭৫ হাজার ৫৮৩ হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হচ্ছে। যার মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ জমি বৃহত্তর খুলনা জেলায় অবস্থিত। এছাড়াও দেশের ১৬টি জেলায় প্রায় ১২ হাজার হেক্টর জমি গলদা চাষের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। বিভিন্ন বাঁধ কোট, নদী-খালের লবণ পানি ঢুকিয়ে জমিতে ছোট বড় বেড়িবাঁধ দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে চিংড়ি চাষ করা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে একে চিংড়ি ঘের বলা হয়। ধানের চেয়ে চিংড়ি উৎপাদনের প্রায় ১০ গুণ বেশি আয় হয় ফলে দিন দিন একদিকে যেমন ধান চাষের জমির পরিমাণ কমছে অন্যদিকে চিংড়ি চাষের আওতায় আনা জমির পরিমাণ বাড়ছে। যেসব জমিতে ধান ও চিংড়ি দুটো ফসল সেখানে ধানের উৎপাদন ও মান ক্রমান্বয়ে কমছে।
চিংড়ি চাষের জন্য পরিবেশ
চিংড়ি চাষের কারণে পরিবেশ দূষণ, ইকোলজিক্যাল ভারসাম্যহীনতা, পরিকল্পনাহীনতা ও অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষের ফলে পরিবেশ ও প্রতিবেশের নানা বিপর্যয় বিশেষত উপকূলীয় বাস্তবায়ন সংস্থান ধ্বংস হচ্ছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৬,৮৭,০০০ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল বা প্যারাবন রয়েছে। প্যারাবন উপকূলীয় অঞ্চলের মাটি ও পানির পুষ্টি চক্র সমাধান করে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করে। উপকূলীয় জোয়ার-ভাটার, স্বাদু ও লবণ পানির মিশ্রণ স্থলে প্যারাবন বিশেষ বাস্তুসংস্থানগত ভারসাম্যতায় সামুদ্রিক জীবদের আঁতুড় অবস্থায় খাদ্য আহরণ ও বেঁচে থাকার পরিবেশ সৃষ্টি করে। প্যারাবন নির্মূলের ফলে উপকূলীয় ভূমিক্ষয় বাড়ে সামুদ্রিক তলানি পদ্ধতিতে পরিবর্তন হয়, তটরেখার দীর্ঘস্থায়িত্ব হুমকির সম্মুখীন হয় এবং সর্বোপরি উপকূল ভাগ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় সম্পূর্ণ অরক্ষিত থাকে। একসময় আমাদের দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে অনেক প্যারাবন ছিল। কক্সবাজার অঞ্চলের অধিকাংশ প্যারাবন চিংড়ি চাষের আগে পরে অবলুপ্ত হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত কারণে প্রাথমিকভাবে উপকূলীয় প্যারাবন পরিষ্কার করে চাষাবাদ শুরু হয় এবং পরে এর অংশ বিশেষ চিংড়ি খামারে পরিণত হয়। ধারণা করা হয়, ম্যানগ্রোভ অঞ্চল ধ্বংসের কারণে কক্সবাজার অঞ্চলের এ অংশে উপকূলীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগের ব্যাপকতা বেড়েছে।
উপকূলীয় চিংড়ি চাষ, যা মূলত বৈদেশিক বাণিজ্যমুখী এবং এর বিকাশ ঘটেছে অত্যন্তু দ্রুত; কিন্তু তা হচ্ছে অপরিকল্পিত, অনিয়ন্ত্রিত এবং সমন্বয় ছাড়া। উপকূলীয় চিংড়ি চাষের প্রসারের সাথে পরিবেশগত, বাস্তুসংস্থানগত এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর এর কী কী প্রভাব পড়ে এ সম্পর্কে সুনিবিড় সমীক্ষা হয়নি। বিচ্ছিন্নভাবে যেসব কাজ হয়েছে তার ফল এবং সম্ভাব্য প্রভাবের সাথে প্রত্যক্ষ যোগসূত্র নির্ণয় করা সম্ভব নয়। প্রাকৃতিক উৎস থেকে বাগদা চিংড়ি পোনা আহরণ কালে ১০০-১০৫টি প্রজাতির মাছ ও অন্য প্রজাতির চিংড়ি  পোনা মারা যায় এবং বহু অদেখা ক্ষুদ্র জলজ প্রাণীর রেণু ও পোনা নষ্ট হয়ে বঙ্গোপসাগর মৎস্য কমে যাচ্ছে। সংরক্ষিত সুন্দরবনের নদীখাল থেকে চিংড়ির পোনা ধরতে গিয়ে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা চরের বিপর্যয় হওয়া ছাড়াও বন্যপ্রাণীর জীবনচক্র বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, চিংড়ির পোনা সংগ্রহকালে নির্বিচারে নিধন হচ্ছে অসংখ্য ছোট ছোট গাছপালা। এভাবে চিংড়ি চাষের ফলে উপকূলীয় এলাকায় পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
দূষণের শিকার উপকূলীয় মৎস্য সম্পদ
উপকূলীয় অঞ্চল মাছের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু প্রতি বছরই নদনদীতে লবণাক্ততার পরিমাণ ও স্থায়িত্ব বাড়ছে। আগে সামান্য বৃষ্টি ও হিমালয়ের বরফ গলা পানির স্পর্শ পেলেই লবণ দূরীভূত হয়ে যেত। কিন্তু বর্তমানে প্রবল বর্ষণেও লবণ দূর হয় না। লবণ পানির প্রভাবে মাটি ও ভূগর্ভে লবণাক্ততার পরিমাণ কেবল বাড়ছেই।
বঙ্গোপসাগরে ব্যাপক দূষণের ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে মাছের মজুদ দ্রুত কমে যাচ্ছে। দূষণ যদি এ মাত্রায় চলতে থাকে তবে এ মজুদ আরও কমে যাবে। এর ফলে ডানাওয়ালা ও খোলসমুক্ত মাছের প্রজাতিগুলো একেবারেই হারিয়ে যেতে পারে। যেসব কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের জলীয় পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে সেগুলো হলো শিল্পের বিষাক্ত আবর্জনা, নৌযান থেকে চুইয়ে পড়া তেল, অপ্রয়োজনীয় মাছ সমুদ্রে ফেলে দেয়া, বেআইনি ও বেশি পরিমাণে মাছ শিকার, পলি জমা হওয়া এবং দীর্ঘসময় বন্যার পানি জমে থাকা, উজান থেকে বেশি পরিমাণে আবর্জনা বয়ে আসা, কৃত্রিম হ্যাচারি, বঙ্গোপসাগরে মাছের মজুদ সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং মৎস্য খাতের নানা অব্যবস্থাপনা। মাছ থেকে শুঁটকি তৈরির সময় যে কীটনাশক ও রাসায়নিক উপাদান মেশানো হয় সেগুলো চুইয়ে পানিতে মিশে। এ বিষ উপকূলীয় অঞ্চলের উদ্ভিদ ও প্রাণীর সহাবস্থানে থাকা প্রতিবেশ ধ্বংস করে দিতে পারে। ফলে মাছের খাদ্য জুপ্লাংকটন এবং ফাইটো প্লাংকটনের মতো গুরুত্ব¡পূর্ণ উপাদানের ক্ষতি হতে পারে ও হুমকির সম্মুখীন হতে পারে উপকূলীয় জীব বৈচিত্র্যতা। শিল্পের বর্জ্যরে সাথে সাথে চিংড়ি ঘের, ভবিষ্যতে মাছের বংশবিস্তারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। কৃষিতে যেসব রাসয়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহৃত হয় সেগুলোও উপকূলীয় মাটি ও পানি দূষণের জন্য দায়ী। এসব কারণে বঙ্গোপসাগরের দূষণ চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে এ অঞ্চল, মাছের বসবাসের অনুপোযোগী হয়ে পড়বে, বিনষ্ট হবে অর্থনৈতিক অবস্থা, জীবনযাত্রা এবং জীববৈচিত্র্য।
এ কারণে উপকূলীয় এলাকার মাটি, খাল,পুকুরে লবণাক্ততা বেড়ে যাবে; চারণভূমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় গোখাদ্যের অভাব, গৃহপালিত পশুপাখির সংখ্যা কমে যাবে; ফসলের নিবিড়তা ও ফসল চক্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে; চিংড়ি ঘেরে লবণ পানি আটকে রাখার ফলে মাটিতে ও ভূগর্ভস্থ স্তরে ক্রমাগত লবণ পুঞ্জীভূত হবে; সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় অসংখ্য ঘের গড়ে তোলায় লবণ পানির প্রবাহ ক্রমশ উত্তরমুখী হয়ে দ্রুত ধাবিত হবে; লবণাক্ততার বৃদ্ধির কারণে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে।
সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা ও উন্নয়ন    
উপকূলীয় জলাশয়গুলোতে বাগদা পোনা আহরণকালে পোনার সাথে বিভিন্ন প্রজাতির চিংড়ি, জুপ্ল্যাংকটন ও সাদা মাছের লার্ভা প্রচুর পরিমাণে ধরা পড়ে, যেগুলো একে অন্যের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। খাদ্য পিরামিডের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় পিরামিডে বড় প্রাণীদের তুলনায় ছোট প্রাণীরা সবচেয়ে বড় স্থান দখল করে আছে। বড় প্রাণীগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ছোট প্রাণীদের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন বিভিন্ন প্রজাতির অসংখ্য লার্ভা বিনষ্ট হওয়ায় প্রাণিকূল থেকে এক বিরাট অংশ হারিয়ে যাচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে তাদের প্রজনন ও ডিম দেয়ার ক্ষমতা। উন্নয়নমূলক কাজের জন্য অন্যদিকে বিনষ্ট হচ্ছে জলজ প্রাণীদের বিচরণ ভূমি।
উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য...
উপকূলীয় ভূমি ব্যবহার নীতিমালা প্রণয়ন ও ভূমির শ্রেণিবিন্যাস করে স্থানীয় সুযোগ-সুবিধা ও পরিবেশ সহনীয় লাগসই প্রযুক্তিভিত্তিক চিংড়ি চাষ জোন নির্ধারণ ও চিংড়ি চাষের আলাদা নীতিমালা প্রণয়ন;
পরিবেশ অনুকূল সম্ভাব্য স্থানে ক্রমান্বয়ে আধা নিবিড় ও নিবিড় চাষ সম্প্রসারণ;
চিংড়ির পর মাছ বা চিংড়ির পর কৃষি ফসলের উৎপাদন আবর্তন বজায় রেখে রোগ প্রতিরোধ এবং পরিবেশ অনুকূল চিংড়ি চাষ প্রবর্তন;
চিংড়ি খামারের পানি সরববাহ ও নিষ্কাশন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ বা সহজ শর্তে ঋণ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা ;
চিংড়ির প্রাকৃৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র ও নার্সারি এলাকা সংরক্ষণ এবং এর প্রজনন মৌসুমে ট্রলিং এর মাধ্যমে চিংড়ি আহরণ নিষিদ্ধ করণ।
ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ধ্বংস বন্ধ এবং খামার-ঘের ও নদী তীরের মাঝে যে ভূমি রয়েছে তাতে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সৃষ্টি।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব¡ সম্পন্ন মাছ চাষ সম্প্রসারণ;
চিংড়ি-মাছ চাষ সহায়ক সব সরঞ্জামাদি ও উপকরণাদি সহজলভ্য করা ও প্রয়োজনে আমদানি করা।

কৃষিবিদ হুমায়ুন কবীর চৌধুরী*
*বারইয়ার হাট, মিরেরসরাই, চট্টগ্রাম


Share with :

Facebook Facebook