কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

পরিবর্তিত জলবায়ুতে কৃষি ও খাদ্য

বছর ঘুরে আবারও ফিরে এলো বিশ্ব খাদ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাদ্য এবং কৃষিও বদলাবে- Climate is Changing : Food and Agriculture are too. একেবারেই সময়ের প্রেক্ষিত। গেল বছরগুলোতে জলবায়ুর পরিবর্তনে আমাদের পরিবেশ প্রতিবেশের কি পরিবর্তনই না হচ্ছে। শুধু কি পরিবর্তন। ক্ষতি করছে সব। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে আমাদের কৃষির। আর কৃষির সাথে খাদ্য তো ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। পরিবেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিভিন্ন মাত্রায় দেখা যায়। গরমকাল আরও তাপময়, ক্ষণিকে আবার হঠাৎ ঠা-া। অনিয়মিত ও অসময়ে বৃষ্টি, কম সময়ে অধিক পরিমাণে বৃষ্টি এবং এর ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা ও ভূমি ধস, ভূমি ক্ষয়, শুকনো মৌসুমে কম বৃষ্টিপাত, বন্যার পরিমাণ ও তীব্রতা অযৌক্তিকভাবে বেড়ে যাওয়া, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘায়িত বন্যা ও খরার ফলে ফসলহানি, অতিরিক্ত ঠাণ্ডা ও গরম, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত জমির পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, নদী তীরবর্তী এলাকার ভাঙন ভূমিক্ষয়, সেচ খরচ বৃদ্ধি ও সুপেয় পানির কম প্রাপ্যতা এসবই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের ফল।
প্রতিপাদ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের আগে সংশ্লিষ্ট সবার অবগতির জন্য বিগত সময়ের বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্যগুলো এক নজরে রেখে দিলাম। ১৯৮১-৮২ সালে একই প্রতিপাদ্য ছিল সবার আগে খাদ্য
(Food Comes First), ১৯৮৩ সালে খাদ্য নিরাপত্তা (Food Security), ১৯৮৪ সালে কৃষিতে নারী (Women in Agriculture), ১৯৮৫এ গ্রামীণ দরিদ্রতা (Rural Poverty), ১৯৮৬তে জেলে ও জেলে সম্প্রদায় (Fishermen and Fishing Communities), ১৯৮৭তে ক্ষুদ্র কৃষক (Small Farmers), ১৯৮৮তে গ্রামীণ যুবক (Rural Youth), ১৯৮৯ খাদ্য ও পরিবেশ (Food and the Environment), ১৯৯০ সালে ভবিষ্যতের জন্য খাদ্য (Food for the Future), ১৯৯১ জীবনের জন্য গাছ (Trees for Life), ১৯৯২ খাদ্য ও পুষ্টি (Food and Nutrition ) ১৯৯৩ মানব কল্যাণে প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় সমাহার (Harvesting Nature’s Diversity), ১৯৯৪ জীবনের জন্য পানি (Water for Life), ১৯৯৫ সবার জন্য খাদ্য (Food for All), ১৯৯৬ ক্ষুধা ও পুষ্টির বিরুদ্ধে সংগ্রাম (Fighting Hunger and Malnutrition), ১৯৯৭ খাদ্য নিরাপত্তায় বিনিয়োগ (Investing in Food Security), ১৯৯৮ অন্ন যোগায় নারী (Women Feed the World), ১৯৯৯ ক্ষুধা জয়ে তারুণ্য (Youth Against Hunger), ২০০০ ক্ষুধামুক্ত সহস্রাব্দ (A Millennium Free from Hunger), ২০০১ দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুধামুক্তির সংগ্রাম (Fight Hunger to Reduce Poverty), ২০০২ পানি খাদ্য নিরাপত্তার উৎস (Water : source of Food Security), ২০০৩ ক্ষুধার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সংহতি (Working together for an International Alliance Against Hunger), ২০০৪ খাদ্য নিরাপত্তায় জীববৈচিত্র্য (Biodiversity for Food Security), ২০০৫ কৃষি ও আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপ (Agriculture and intercultural dialogue), ২০০৬ খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কৃষিতে বিনিয়োগ (Investing in agriculture for food security), ২০০৭ খাদ্যের অধিকার (The Right to Food), ২০০৮ বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জলবায়ুর পরিবর্তন ও জৈবশক্তি (World Food Security: the Challenges of Climate Change and Bioenergy); ২০০৯ সালে সংকটকালীন খাদ্যনিরাপত্তা অর্জন (Achieving Food Security in Times of Crisis) ; ২০১০ ক্ষুধার বিরুদ্ধে ঐক্য (United against Hunger); ২০১১ সংকট নিরসনে সহনশীল খাদ্যমূল্য নির্ধারণ (Food prices - from crisis to stabilit); ২০১২ কৃষি সমবায় : ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়ার উপায় (Agricultural cooperatives – key to feeding the world ), ২০১৩ খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির জন্য টেকসই খাদ্য কৌশল (Sustainable Food Systems for Food Security and Nutrition) ২০১৪ পারিবারিক খামার : পরিবেশসম্মত প্রয়োজনীয় খাদ্য জোগান ও সমৃদ্ধির মূল উৎস (Family Farmers - Feeding the world, caring for the earth) ২০১৫ নির্ধারিত হয়েছে  গ্রামীণ দারিদ্র্য চক্রের অবসানে সামাজিক সুরক্ষা এবং কৃষি (Social Protection and agriculture: breaking the cycle of rural poverty). আর ২০১৬ তে প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে বদলে যাচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাদ্য এবং কৃষিও বদলাবে (Climate is Changing : Food and Agriculture are too).

আবহাওয়া হলো কোনো স্থানের কম সময়ের বা যে কোনো মুহূর্তের বায়ুম-লীয় অবস্থা। এটি কোনো অঞ্চলে ফসলের উৎপাদন ও ফলনে বিশেষ করে কৃষিতে বেশ প্রভাব বিস্তার করে। জলবায়ু কোনো স্থানের দীর্ঘ সময়ের সাধারণত ২৫ বছর বা ততোধিক সময়ের গড় নির্দেশ করে। এটি  কোনো অঞ্চলে ফসলের প্রকার ও জাত নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করে। পরিবর্তিত জলবায়ুতে সবুজ এ পৃথিবী দিন দিন উত্তপ্ত হচ্ছে। বেশির ভাগ গবেষকদের অভিমত একবিংশ শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর তাপমাত্রা পরিমাণ হবে এমনি, যা গত দেড় লাখ বছরেও বাড়েনি। পরের শতাব্দীতে বিশ্বের তাপমাত্রা আরও ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশিও বাড়তে পারে এবং ভূপৃষ্ঠে পানির উচ্চতা ৮৮ সেন্টিমিটার উঁচু হবে। পৃথিবীতে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ গত ২ কোটি বছরের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। বর্তমানে বিশ্বের জনসংখ্যার ৩০ জনের মধ্যে একজন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়। ২০২৫ সালে ৫ হাজার কোটি লোকে এমন সব দেশে বাস করবে যেখানে পানি সরবরাহ বিপদগ্রস্ত হবে। আগামী ৫০ বছরের মধ্যে পৃথিবীর বড় শৈলশ্রেণী সামুদ্রিক উচ্চতাপে নিশ্চিহ্ন হবে। ১০০ বছর শীতকালীন প্রাকৃতিক অবস্থা এখনকার মতো থাকবে না। আগামী ২০০ বছরে পশ্চিম কুমেরুর তুষার আচ্ছাদন গলে যাওয়ার সম্ভাবনা ২০ ভাগের মধ্যে এক ভাগ। তা ঘটলে উপকূলীয় নগরগুলো নিউইয়র্ক থেকে লন্ডন এবং অটোয়া থেকে সিডনি পর্যন্ত সব ডুবে যাবে। এশিয়ার গ্রীষ্মম-লীয় অঞ্চলের ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ ২০৫০ সালের মধ্যে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। কলেরা ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগ ছড়িয়ে পড়বে। মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতির ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হবে সবচেয়ে মারাত্মক। বিশ্বের প্রায় ২.৫ কোটি মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। জাতিসংঘ মানব উন্নয়ন সূচক অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী যুক্তরাষ্ট্র ৪৪ শতাংশ, জাপান ১৩ শতাংশ, জার্মানি ৭ শতাংশ, যুক্তরাজ্য ৫ শতাংশ, স্পেন, অস্ট্রেলিয়া, কোরিয়া ৩ শতাংশ এবং বাকি ২৮ ভাগ অন্যান্য সবাই মিলে।
বিশ্ব জলবায়ুর এ পরিবর্তনে বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। আগামী কয়েক দশকের মধ্যে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি উষ্ণতা বাড়বে এবং ৪৫০ সেন্টিমিটারের বেশি সমুদ্রস্ফীতির মুখোমুখি হবে। তখন এদেশ স্থায়ীভাবে প্লাবিত হবে এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে দেশের উপকূলীয়, নিম্নাঞ্চল অর্থনৈতিক উপযোগিতা হারাবে। জলবায়ুর এ পরিবর্তনে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরাপ্রবণ এলাকায় খরার প্রকোপ আরো বাড়বে। শুধু তাই না সুন্দরবনও সাংঘাতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হবে। পরিবর্তিত এ পরিস্থিতিতে আগামী ২০৫০ সালে বাংলাদেশের এক-পঞ্চমাংশ সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাবে। বর্তমানে গরমকালে প্রচ- তাপদাহ এবং শীতকালে শীতের তীব্রতা এ দেশের আবহমান আবহাওয়ার পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। পঞ্চগড়ে ১০-১২ বছর ধরে অস্বাভাবিক শীতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় ধানে পোকার আক্রমণ বেড়েছে। শ্রীমঙ্গল এলাকায় বৃষ্টিপাত বেড়ে যাওয়ায় রবিশস্যের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। অতীতে এদেশে প্রায় ৮ হাজার প্রজাতির ধান উৎপাদিত হতো। এখন ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে। আগামী ৫০ বছরে ধানের উৎপাদন এক দশমাংশ কমার আশঙ্কা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এভাবে বিলুপ্ত হতে পারে আলুর বিভিন্ন প্রজাতির এক চতুর্থাংশ। এছাড়া ২০ শতাংশের বেশি মাছের প্রজাতির অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়বে। বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে ১৭টি নদী। ড. আইনুন নিশাতের মতে জলবায়ু পরিবর্তনের লক্ষণগুলো হলো- বর্ষায় বৃষ্টিপাত কম হওয়া, সঠিক সময়ে না হওয়া, সঠিক সময়ে শীত শুরু না হওয়া, শীতের প্রকোপ কমে যাওয়া, শীতকালের দৈর্ঘ্য কমে যাওয়া, প্রতি বছর তাপমাত্রা অল্প করে বেড়ে যাওয়া, আগাম পানি আসা, পানির চাপ বাড়া। ২০৩০ সালের বাংলাদেশের জলবায়ুর অবস্থা দাঁড়াবে গরমকালে তাপমাত্রা ০.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাবে এবং শীতকালে ১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমবে, গরমকালে বৃষ্টিপাত বাড়বে শতকরা ১১ ভাগ কিন্তু শীতকালে কমবে শতকরা ৩ ভাগ, গরমকালে বাষ্পীভবন বাড়বে শতকরা ১৫.৮ ভাগ এবং শীতকালে বাড়বে শতকরা ০.৯ ভাগ।
পরিবর্তিত জলবায়ুতে বাংলাদেশের কৃষি ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং হুমকির মুখে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বীজের গজানো, পরাগায়ন, ফুল ও ফল ধরা, পরিপক্বতা হতে সুনির্দিষ্ট তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত ও সূর্যালোক প্রয়োজন। জলবায়ুর এ উপাদানগুলো পরিবর্তিত হয়েছে কিন্তু বীজ বপন ও চারা রোপণের সময় পরিবর্তন সম্ভব হয়নি। ফলে কৃষি মৌসুমের সাথে ফসল চাষাবাদ খাপ খাওয়ানো যাচ্ছে না। গড় তাপমাত্রা বাড়ার কারণে গম, ছোলা, মসুর, মুগডালসহ কিছু কিছু ধানের উৎপাদন কমে যাওয়ায় কৃষকও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। গমের বীজ গজানোর তাপমাত্রা হলো ১৫-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর কম বেশি হলে বীজ গজাবে না। গম পাকার সময়ে আর্দ্রতা বেশি ও ঘন কুয়াশা থাকলে ব্ল্যাক পয়েন্ট রোগ হবে। ফলনও কম হবে। পাট ও বোরো ফসলের ফলনও কমে যাবে মারাত্মকভাবে। টাস্কফোর্স রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২০৫০ সাল পর্যন্ত ১ মিটার বাড়তে পারে। এর প্রভাবে ৩ হাজার মিলিয়ন হেক্টর উর্বর জমি স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাবে, ২ মিলিয়ন টন ধান, গম, আখ, পাট, মটরসহ রবিশস্য উৎপাদন কমে যাবে। ব্রি’র মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। ধানে রোগ ও পোকার আক্রমণ হচ্ছে। কৃষক আবহাওয়া বুঝতে পারছে না। বৈশ্বিক উঞ্চায়নের কারণে বৃষ্টিপাত বেড়ে যাবে এবং বর্তমান শতাব্দীতে বাংলাদেশে বন্যার পরিমাণ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
জলবায়ুর পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ইস্যু খাদ্য নিরাপত্তা। এ পৃথিবীর গরিবদের মধ্যে আছে কৃষক, জেলে এবং গবাদিপশু পালনকারী। এরাই পরিবর্তিত জলবায়ু বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয় বেশি। কেননা এরা তো নুন আনতে পান্তা ফুরানোর দলের মানুষ। এদের না আছে থিত নাছে ভিত। এরা বড় অসহায়। এর মধ্যে জনসংখ্যা বাড়ার প্রবণতা এগিয়েই চলছে। তথ্য বলে আগামী ২০২৫ সাল নাগাদ পৃথিবীর জনসংখ্যা দাঁড়াবে ৯.৬ বিলিয়নে। এ বাড়তি জনসংখ্যার দুই মুঠো খাদ্য জোগানে এক বৈরী পরিবেশ আর অবস্থার মধ্যেও খাদ্য জোগানে ব্যস্ত থাকতে হবে কঠিনভাবে। আমাদের উৎপাদনশীলতা আর স্থায়িত্বকে যদি সঠিকভাবে ধরে না রাখা যায় তাহলে অবস্থা বেগতিক হয়ে যাবে যে কোনো সময়। সুতরাং সবার আগে ভাবতে হবে পরিবেশ প্রতিবেশ আর নির্ভেজাল বাঁচার সমীকরণ নিয়ে।
এ কথা তো ঠিক দিন দিন আমাদের আবাদি জমি কমছে আতংকিত হারে। আর খাদ্য চাহিদা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। এ অসম সমীকরণে আমাদের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে ঠিক রাখার জন্য আমাদের বহুমুখী সম্মিলিত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। খাদ্য উৎপাদনক ট্রেন্ডকে ঠিক রেখে সব ধরনের এবং সব পর্যয়র অপচয় রোধ করতে হবে যৌক্তিকভাবে। নৈতিকতা, নীতি উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা, কর্তন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, বিপণন, অবকাঠামো সবখানেই সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে কাক্সিক্ষত মাত্রায়। সে কারণেই বিশ্ব খাদ্য সংস্থা এবারের প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে জানান দিচ্ছে পৃথিবী বদলে যাচ্ছে, সুতরাং বদলাচ্ছে আমাদের সব কিছু। বিশেষ করে আমাদের কৃষি আমাদের খাদ্য। সে পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে দেরি না করে।
ক্ষুদ্র প্রান্তিক কৃষকদের যে কোনো পরিস্থিতিতে সহায়তা ও সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের সক্ষমতাকে আরও সুদৃঢ় শক্ত সময়োপযোগী করতে হবে। তখনই আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চিয়তা দেয়া যাবে অনায়াসে। জলবায়ুর পরিবর্তনে আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ঋণাত্মক প্রভাব পড়ছে বা পড়বে। এফএও মনে করে আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ পুরো পৃথিবীর মানুষকে দুই বেলা খাওয়াতে হলে আমাদের সবার খাদ্য উৎপাদন ৬০ শতাংশ হারে বাড়াতে হবে।
সর্র্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে আমাদের সম্মিলিতভাবে ভাবতে হবে পরিবর্তিত জলবায়ুতে আমাদের বিভিন্ন আঙ্গিকে করণীয় কি। এর সাথে আমাদের ক্ষুদ্র প্রান্তিক কৃষকের সার্বিক কল্যাণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। বিশেষ করে খাদ্য উৎপাদন চক্রের প্রতিটি পর্যায়ে আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। যে করেই হোক চাহিদা মতো উৎপাদন, প্রয়োজন মতো পুষ্টিসম্মত খাদ্য গ্রহণ এবং পরিবেশ ঠিক রেখে সব কাজের সুষ্ঠু সমন্বয় করা। তবেই আমরা আগামী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারব অনায়াসে। আমাদের প্রাণের পৃথিবী দিন দিন উষ্ণময় হচ্ছে। বরফ গলে নদী সাগরে মিশছে, নদী সাগরের পানির উচ্চতা বাড়ছে কেবলি। এরই সাথে বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ধেয়ে আসছে প্রতিনিয়ত। এ কারণে দুটো জিনিস বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। ০১. যারা গরিব কৃষক তাদের উৎপাদন আর যাপিত জীবনের ওপর যারা অন্ন জোগায় খাদ্যের জন্য আর ০২ হচ্ছে ২০২৩ সাল নাগাদ ক্ষুধাকে নির্মূল করার কাজে আঘাত হানছে। এরই মাঝেও সুখের খবর আছে। এখনও আমরা আমাদের সাহায্য সহযোগিতা করতে পারি। খাদ্য অপচয়, বনায়নকে আরও বিস্তৃত করা। আমাদের উৎপাদনের মূল আধার জমি ও পানিকে দূষণমুক্ত রেখে আগামীর পথে এগিয়ে যাওয়া।
পরিবর্তিত জলবায়ুতে কৃষি ক্ষেত্রে খাপ অভিযোজন কলকৌশল
০১. লবণাক্ততা সহনশীল জাতের উন্নয়ন ও এর আবাদ এলাকা বাড়ানো, ফসলের চাষ, চিংড়ি চাষ, দ্রুত ও গভীর চাষের মাধ্যমে মাটির ক্যাপিলারি নালিকা ভেঙে দিয়ে লবণাক্ততা কমানো। এজন্য পাওয়ার টিলার দিয়ে চাষাবাদের এলাকা বৃদ্ধি করলে এ সুবিধা পাওয়া যাবে; আমন মৌসুমে বিআর ২৩, ব্রি-ধান ৪০ এবং ৪১ এর চাষ। বোরো মৌসুমে লবণাক্ততা সহনশীল জাতের চাষ;
০২. চাষ পদ্ধতির পরিবর্তন, পানি কম লাগে এমন ফসলের চাষ, মালচিং ও ড্রিপ সেচের প্রবর্তন, এসআরআই পদ্ধতি অনুসরণ, অল্পচাষ বা বিনা চাষে উৎপাদন পদ্ধতিকে উৎসাহিত করে উপযোগী ফসলের চাষ করতে হবে, খরাসহিষ্ণু স্থানীয় জাতের উন্নয়ন ও এর আবাদ এলাকা বাড়ানো। অধিক দামি সবজি জাতীয় ফসল যেমন- টমেটো, তরমুজ, শসা, মরিচের চাষ। মিনি পুকুর, প্লাস্টিক পাইপ-ফিতা পাইপের ব্যবহার বাড়ানো। আইল উঁচু করে চাষ করা। খরার কারণে ধান লাগাতে বেশি দেরি হলে নাবি ও আলোক সংবেদনশীল বিআর ২২, ২৩ ও ব্রি-ধান ৪৬ এর চাষ করা। আউশ মৌসুমে বিআর ২৪, বিআর ২৬, বিআর  ২৭, ব্রি ধান৪২ ও ব্রি ধান৪৩ আবাদ করা। আমন ধান কাটার পরে খরা সহনশীল ফসল যেমন- ছোলা চাষ করা যায়। তেল ফসল হিসেবে তিলের চাষ করা যায়। এছাড়াও মাটির গভীরে বীজ বপন, আগে ভিজানো বীজ বপন, মিতব্যয়ী পদ্ধতিতে পানি সেচ, সম্পূরক সেচের ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে খরা মোকাবিলায় কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া যায়;
০৩. ক. আগাম ঢল বন্যাপ্রবণ এলাকায় স্থানীয় ও উফশী জাতের আগাম পাকা ও স্বল্পমেয়াদের বোরো চাষাবাদ ক্ষয়ক্ষতি অনেকটা কমিয়ে আনতে পারে। প্রচলিত জাতের চেয়ে আগাম পাকে এমন ফসলের জাত চাষ, যেমন- ব্রি-ধান২৯ এর চেয়ে ব্রি-ধান২৮ পনের দিন আগে কাটা যায়। শিষ পাকা পর্যায়ে ব্রি ধান২৯ ও ব্রি ধান৩৬ এর জলমগ্নতা সহ্য করার ক্ষমতা আছে। এছাড়াও ব্রি ধান৪৫ চাষ করা যায় যার জীবনকাল ১৪০ থেকে ১৪৫ দিন। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে ব্রি-ধান২৯ এর ২০-৩০ দিন বয়সের চারা সঠিক সময়ে (১৫-৩০ কার্তিক) রোপণের মাধ্যমে এর জীবনকাল ১৫ দিন কমিয়ে আনা সম্ভব। স্থানীয় জাতের পশুশাইল যথেষ্ট ফলন দিতে সক্ষম।
খ. ভাসমান ধাপে ফসলের-সবজির চাষ। বন্যা পরবর্তী সময়ে নাবি জাতের ধান যেমন- নাইজারশাইল, বিআর-২২ ও ২৩ এবং ব্রি-ধান৪৬ চাষ করা। দাপোগ পদ্ধতির বীজতলা তৈরি। বন্যা পরবর্তী সময়ে বেশি বয়সের চারা ঘন করে লাগানো যেতে পারে।
গ. বন্যা মোকাবিলা সক্ষম ধানের পাশাপাশি সবজি ও অন্যান্য ফসলের চাষ করা সম্ভব। ফ্রেঞ্চ শিম, মুলা, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মিষ্টিকুমড়া, লালশাক, করলা, চালকুমড়া, পালংশাক, পুঁইশাক, মটরশুটি এসব চাষ লাভজনক বলে প্রমাণিত হয়েছে।
০৪. কালবৈশাখী, ঝড়/শিলাবৃষ্টিতে বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হলে দ্রুত আউশ ধান বা সবুজসার প্রয়োগ করার পর রোপা আমন ধান চাষ করতে হবে। এতে অধিক ফসল নিশ্চিত করার পাশাপাশি বোরোর ক্ষয়ক্ষতি আংশিক পূরণ করা যেতে পারে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ক্ষতির প্রকৃতি, এলাকার মাটি বা ভূপ্রকৃতি ও আর্থসামাজিক অবস্থার আলোকে জলোচ্ছ্বাস পরবর্তী ফসল চাষে ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে আউশ মৌসুমে উফশী রোপা আউশ যেমন- বিআর ১৪, বিআর ৯, বিআর ২০, বিআর ২১, বিআর ২৬, ব্রি ধান২৭, ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৪৫ এর ১ মাস বয়সী চারা বৈশাখ মাসের মধ্যে রোপণ করতে হবে।
০৫. তাপমাত্রা সহনশীল ফসলের জাতের চাষ করা; ০৬. নতুন শস্যপর্যায়ের ওপর ব্যাপক গবেষণা জোরদার করা; ০৭. বালাইসহনশীল ফসলের চাষ করা। বালাই প্রতিরোধী জিএমও ফসলের চাষ; ০৮. বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে। ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানো; ০৯. আবহাওয়ার সব তথ্য ক্ষতিপ্রবণ ও আশংকাজনক এলাকাসমূহে আগাম জানানোর মাধ্যমে ফসল চাষের পরামর্শ প্রদান; ১০. নতুন শস্যপর্যায় উদ্ভাবন করা এবং এর ব্যাপক প্রচলন করা।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে আমাদের কৃষিও খাদ্যে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। আমরা আমাদের স্বাভাবিক ট্রেন্ড নিয়ে কৃষিকে আর খাদ্য নিয়ে পরিকল্পনা, উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিপণন, সংরক্ষণ এসব করতে পারছি না। এজন্য বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করছে বা করার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু অধিকাংশ কার্যক্রমই পাইলট আকারে গুটিকয়েক জেলা বা উপজেলায় বিস্তৃত এবং একটি সংস্থার সাথে আরেকটি সংস্থার কাজের কোনো সমন্বয় নেই। এ ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে কৃষি ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিভিন্ন খাপ খাওয়ানোর কলাকৌশল সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। কারণ এ প্রতিষ্ঠানটির মাঠ পর্যায় পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আছে, যা অন্য কোনো সংস্থার নেই। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এটা বলা যায় যে, ব্যাপক ও সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করলে আমাদের দেশের চাষিরা উপকৃত হবে তথা দেশ উপকৃত হবে। আমরা সক্ষম হবো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে পরিবর্তিত জলবায়ুতে কৃষি ও খাদ্যকে টিকিয়ে রাখতে।

কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম*
 *উপপরিচালক (গণযোগাযোগ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫ ংঁনড়ৎহড়সষ@মসধরষ.পড়স


Share with :

Facebook Facebook