কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

পরিবর্তিত জলবায়ুতে আমাদের মৎস্য সম্পদ (কার্তিক ১৪২৩)

গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বেসিনের পলিতে গঠিত এক নদী মাতৃক দেশ, আমাদের বাংলাদেশ। আমাদের দেশ ৪৫.৭৫ লাখ হেক্টর আয়তন বিশিষ্ট নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় জলসম্পদে সমৃদ্ধ এক দেশ। জলবায়ু অনুকূলে থাকায় অদূর অতীতে আমাদের প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো ছিল মৎস্যে ভরপুর। সুস্বাদু, পুষ্টিসমৃদ্ধ ও সহজপ্রাপ্য এ মৎস্য ছিল আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যের এক উল্লেখযোগ্য অংশ, যা আমাদের ‘মাছে ভাতে বাঙালী’ হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৬ -এর তথ্য মতে, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩.৬৫ শতাংশ, মোট কৃষিজ আয়ের ২৩.৮১ শতাংশ আসে মৎস্য উপখাত থেকে। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ জোগান দেয় মাছ। দেশের প্রায় ১ কোটি ৮২ লাখ লোক জীবন-জীবিকার তাগিদে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য উপখাতের ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং আমাদের জীবন-জীবিকা ও দেশের অর্থনীতিতে মৎস্য খাতের অবদান উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে।
পরিবর্তিত জলবায়ুতে তথা প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট কারণে আমাদের দেশের মৎস্য সম্পদ সংকুচিত হচ্ছে, কমছে বা ধ্বংস হচ্ছে আবাসস্থল, বাধাগ্রস্ত হচ্ছে প্রজনন সুবিধা, বৃদ্ধি পাচ্ছে মরণ হার, কমছে উৎপাদন এমনকি বিলুপ্তির দিকে যাচ্ছে অনেক মৎস্য ও জলজ প্রজাতি। বলা যায় দেশের অভ্যন্তরীণ মৎস্য সম্পদ সংকুচিত হতে হতে আজ সংকটাপন্ন। জলবায়ু পরিবর্তন একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা আজ মূলত মনুষ্যসৃষ্ট কারণে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং পৃথিবীর প্রাণিকুল তথা মানুষের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিতে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন- বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের সংখ্যা, মাত্রা ও অস্বাভাবিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধিতে দেশের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিবর্তিত এ পরিস্থিতিতে দেশের মৎস্য সম্পদের স্থিতিশীল উন্নয়নের জন্য মৎস্য ও জলজ প্রাণীর জন্য অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখতে উপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ আজ অত্যাবশ্যকীয় হয়ে দেখা দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন একটি আন্তর্জাতিক গুরুত্ববহ বিষয়। তাই আজ পৃথিবীর স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণগুলো নিয়ন্ত্রণে সবাই তৎপর হচ্ছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য কম দায়ী হয়েও পরিবর্তিত জলবায়ুতে দেশের সম্পদ রক্ষার্থে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম গ্রহণ আমাদের জন্যও প্রয়োজন।
পরিবর্তিত জলবায়ু তথা জলবায়ু পরিবর্তন (Climate Change)
কোনো নির্দিষ্ট এলাকার তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা, বায়ু প্রবাহ ইত্যাদির সম্মিলিত রূপই হলো আবহাওয়া, যা অঞ্চল ও ঋতুভেদে পরিবর্তনশীল। আর দীর্ঘমেয়াদি সময়ের বা কমপক্ষে ৩০ বছরের কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের আবহাওয়ার গড় হলো জলবায়ু। এ দীর্ঘমেয়াদি সময়ের মধ্যে আবহাওয়ার গড় মানের যে পরিবর্তন হয়, তাই জলবায়ু পরিবর্তন। জলবায়ু পরিবর্তনের একাধিক প্রভাবক রয়েছে। এর মধ্যে তাপমাত্রাই প্রধান। মানুষের ভোগ ও জীবন-জীবিকা উন্নয়নের নিমিত্ত গৃহীত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের দ্বারা কার্বন-ডাই-অক্সাইডসহ গ্রিন হাউস গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে পৃথিবীতে আসা সূর্যকিরণ   গ্রিন হাউসের প্রভাবে তাপে রূপান্তরিত হয়ে বায়ুমণ্ডলে আবদ্ধ হচ্ছে, ক্রমাগতহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে বৈশ্বিক তাপমাত্রা। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের আবহাওয়ার ধরন ও ঋতুবৈচিত্র্য পাল্টে দিচ্ছে। পরিবর্তিত এ জলবায়ুতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন- অতিবৃষ্টি, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, ইত্যাদি ঘটার সম্ভাবনা, মাত্রা, তীব্রতা ও ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। এসব দুর্যোগে অনেক মানুষের মৃত্যু ঘটছে এবং কোটি কোটি টাকার সম্পদহানি হচ্ছে যার প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবিকার ওপর। আমাদের মৎস্য সম্পদও পরিবর্তিত এ জলবায়ুতে ব্যাপকহারে নেতিবাচক প্রভাবে প্রভাবিত।

মৎস্য খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও বিপন্নতা (Risk and vulnerability in fisheries sector) আপদ মোকাবিলার সক্ষমতার বিবেচনায় কোনো আপদ দুর্যোগে রূপান্তরিত হওয়ার যে সম্ভাবনা তাই ঝুঁকি ও বিপন্নতা। পরিবর্তিত এ জলবায়ুতে দেশের সামগ্রিক কৃষিজ উৎপাদন ব্যবস্থা, ভূমির ব্যবহার পদ্ধতি, জীবনধারণের কৌশল ও জীবিকা যেমন ঝুঁকিপ্রবণ, ঠিক তেমনই মৎস্য খাতও মারাত্মকভাবে ঝুঁকিপ্রবণ ও বিপন্ন। দেশের মৎস্য খাতে সার্বিক ঝুঁকি ও বিপন্নতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
জলজ আবাস ও জীববৈচিত্র্যের ক্রমাবনতি;
মাছের প্রজনন, নার্সারি ও উৎপাদন এলাকার পর্যায়ক্রমিক হ্রাস;
প্লাবনভূমিসহ বিল ও অন্যান্য জলাশয়ের পানি শুকিয়ে যাওয়া;
নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া;
ভূনিম্ন পানির স্তরের নিম্নগামিতা;
বিল-বাঁওড়ের সাথে নদীর সংযোগ বিছিন্ন হওয়া;
মাছের অভিপ্রয়াণ পথ ভরাট ও বন্ধ হওয়া;
দিন-রাত ও ঋতুভেদে তাপমাত্রার অতি পার্থক্য/বৃদ্ধি;
বৃষ্টিপাতের মাত্রা, তীব্রতা, সময় ও ধরনে পরিবর্তন;
বন্যা, খরা, ঝড়, তাপদাহ, সাইক্লোনের মাত্রা ও তীব্রতা বৃদ্ধি এবং
ঋতুবৈচিত্র্যে, পানির গুণাগুণ এবং পরিমাণে পরিবর্তন।
মৎস্য খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব (
Climate change impact in fisheries sector)
জলবায়ু পরিবর্তনে মৎস্য খাতে প্রভাব প্রধানত তিনটি পর্যায়ে পরিলক্ষিত হচ্ছে প্রথমত উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের সার্বিক উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রভাব; দ্বিতীয়ত, মাছ চাষের উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রভাব এবং তৃতীয়ত, মাছের সাথে সংশ্লিষ্ট সব মহলের জীবিকায় প্রভাব। মৎস্য খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসমূহ নিম্নে উল্লেখ করা হলো-
অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয় : উন্মুক্ত জলাশয়ের সার্বিক মাছ উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্য জলবায়ু পরিবর্তনের সুস্পষ্ট বিরূপ প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে, যা সমগ্র মৎস্য খাতের জন্য উদ্বেগজনক। উল্লেখযোগ্য প্রভাব হলো-
নদীসহ সব সংযোগ খালের নাব্য হ্রাস পাওয়ায় পানির প্রবাহ বন্ধ বা অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া।
আবাসস্থল নষ্ট বা সংকুচিত হওয়ার কারণে প্রজনন কম হওয়ায় উন্মুক্ত জলাশয়ে নতুন মজুদ কমে যাচ্ছে।
প্লাবনভূমিসহ বিল ও অন্যান্য জলাশয়ের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় বা পানি কমে যাওয়ায় সেচে মাছ ধরার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে বা জলাশয়ের মাছের বংশ ধ্বংস হচ্ছে।
পলি জমাটের হার বৃদ্ধির কারণে পানি কমে বা শুকিয়ে যাওয়ায় অভিপ্রয়াণ বা স্বাভাবিক বিচরণ বিঘিœত হচ্ছে।
উন্মুক্ত জলাশয়ে পানির অস্বাভাবিক হ্রাস-বৃদ্ধি; তাপমাত্রার অতি পার্থক্য; বৃষ্টিপাতের সময় ও পরিমাণে তারতম্য হওয়ার কারণে পানির ভৌত-রাসায়নিক ও জৈবিক গুণাবলিরক্রমাবনতি হচ্ছে।
সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বিশেষ করে শুকনা মৌসুমে নদীর উজানে লোনাপানির অনুপ্রেবেশের ফলে স্বাদু পানির জীববৈচিত্র্য হ্রাস পাচ্ছে।
উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার হ্রাস-বৃদ্ধির ফলে এ অঞ্চলের মাছের প্রজননসহ স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।
উপরিউক্ত বিবিধ কারণে মাছের পরিপক্বতায় ও প্রজননকাল পরিবর্তন হচ্ছে এমন কি অঞ্চলভেদে কোন কোন মাছ তাদের প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ না পাওয়ায় প্রজনন বিরত রাখছে।
মাছের জীববৈচিত্র্য কমে যাচ্ছে, কোন কোন মাছ বিপন্ন অবস্থায় আছে যেমন- মলা, টেংরা, বজুরি, বাতাশি, শিং, পাবদা, গুলশা, আইড়, মেনি/ভেদা, রিঠা, বাঁশপাতা, কাউনিয়া, রায়েক/টাটকিনি, সরপুঁটি, জাতপুঁটি, চ্যাং, টাকি/লাটি, শোল, গজার, বাইম, গুচি, তারাবাইম ইত্যাদি। এ ছাড়াও কিছু মাছ (কাউনিয়া, এলঙ্গ, রিঠা, পাবদা, ফ্যাসা, শিলং, বাচা ও ঘাওড়া) নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে।
বদ্ধ জলাশয়
 জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানান কারণে মাছ চাষে সার্বিক উৎপাদন ব্যবস্থায় বিরূপ প্রভাব পড়ছে যা মৎস্য খাতের জন্য সতর্কতামূলক। মাছ চাষে উল্লেখযোগ্য প্রভাবের ক্ষেত্র ও কারণসমূহ নিম্নরূপ-
হ্যাচারির উৎপাদন ব্যবস্থা : প্রয়োজনীয় পানির ঘাটতি, উচ্চ ও নিম্ন তাপমাত্রা এবং দিবা-রাত্র তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে হ্যাচারিতে ব্রুড মাছসহ পোনার উৎপাদন ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে এমনকি কোনো কোনো এলাকায় হ্যাচারি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
মাছ চাষ উৎপাদন ব্যবস্থা : পুকুরসহ চাষ উপযোগী সব জলাশয়ের পানি ধারণক্ষমতা ও পানি ধারণকাল হ্রাস; ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া; পানির ভৌত-রাসায়নিক ও জৈবিক গুণাবলির অবনতি এবং উচ্চ ও নিম্ন তাপমাত্রার অতি ওঠানামার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মাছ চাষিরা বিপাকে রয়েছেন।  
সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ
সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বিশেষ করে শুকনা মৌসুমে নদীর উজানে লোনাপানির অনুপ্রবেশ।
উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার হ্রাস-বৃদ্ধির ফলে এ অঞ্চলের মাছের প্রজননসহ স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।
সাগর ও উপকূলে ইলিশ মাছের প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্রের পরিবর্তন।
উপকূলীয় এলাকায় মাছের প্রজাতি বৈচিত্র্য ও প্রাপ্যতায় পরিবর্তন।
ফিশিং গ্রাইন্ড পরিবর্তন।
সামুদ্রিক মাছ অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজনন ও নার্সারি ক্ষেত্র পরিবর্তন ও নষ্ট।
জীবন-জীবিকা
উন্মুক্ত জলাশয়ে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সার্বিক মাছ উৎপাদন ব্যবস্থায় বিরূপ প্রভাব পড়ায় প্রতি দিনের মাছ আহরণের গড়হার ক্রমাবনতির ফলে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী যেমন- জেলে সম্প্রদায়ের জীবিকা বিপন্ন। দেশব্যাপী জেলে সম্প্রদায়ের প্রায় ১৫% এরই মধ্যে তাদের আদি জীবিকা পরিবর্তন করে অন্য জীবিকা ধারণের চেষ্টা করছে।
পরিবর্তিত জলবায়ুতে মৎস্য খাতের ঝুঁকি ও প্রভাব মোকাবিলায় করণীয়

(Stapes to address climate change impact in fisheries sector)
মৎস্য খাতের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও প্রভাব মোকাবিলায় করণীয় ও দায়িত্ব সবারই। তাই প্রয়োজন এ খাতে স্থিতিশীল উন্নয়ন উপযোগী মৎস্য ব্যবস্থাপনা কৌশল সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা।
উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের আবাসস্থলের উন্নয়নসহ মাছের প্রাচুর্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের কার্যক্রম গ্রহণ;
নদী, খাল ও বিলসহ সব প্লাবনভূমির সংযোগ খাল উন্নয়নের মাধ্যমে অবাধ পানি প্রবাহের কার্যক্রম গ্রহণ করা;
পানির গুণগতমান ও পরিমাণের ঘাটতি এবং তাপমাত্রার পার্থক্য মোকাবিলায় হ্যাচারি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের কৌশল নির্ধারণ ও কার্যক্রম গ্রহণ;
মৎস্য সম্পদ রক্ষা ও দুর্যোগের ক্ষতি মোকাবিলায় প্রতিরোধমূলক ও অভিযোজন কার্যক্রম গ্রহণ;
বিরূপ পরিবেশে ও স্বল্প সময়ে চাষ করা যায় এমন মাছের প্রজাতির চাষ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ;
এলাকাভিত্তিক উপযোগী স্থায়ী মৎস্য অভয়াশ্রম গড়ে তোলা;
জলাধার নির্মাণ ও যথাযথ ব্যবহার করা;
ভূগর্ভস্থ পানির নিয়ন্ত্রিত উত্তোলন ও পুনঃব্যবহারের ব্যবস্থা গ্রহণ;
ভূগর্ভস্থ পানি পুনঃপূরণের নিমিত্ত কার্যক্রম গ্রহণ;
উপকূলীয় মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণের কৌশল নির্ধারণ;
লবণাক্ততা সহনশীল প্রজাতির চাষ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ;
মৎস্য খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও করণীয় সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা এবং অভিযোজন কার্যক্রম গ্রহণ; এবং
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তনে অভিযোজন বিষয়ক অনুমোদিত অনুস্বাক্ষরিত দলিলপত্রের সাথে সমন্বয় করে নীতিমালা প্রণয়ন এবং কার্যক্রম গ্রহণ।

মৎস্য খাতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিযোজন (Adaptation in Fisheries sector due to climate change)

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে মানুষের জীবন ও জীবিকায় ঝুঁকি হ্রাস ও দুর্যোগ মোকাবিলায় গৃহীত উপযোগী কৌশল হলো জলবায়ু পরিবর্তনে ‘অভিযোজন’। তেমনই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে মৎস্য খাতের ক্ষয়ক্ষতি পূরণের নিমিত্ত গৃহীত কৌশলই হবে মৎস্য খাতের অভিযোজন। মৎস্য খাতে উন্মুক্ত জলাশয় ও মৎস্য চাষ উভয়ের জন্যই অভিযোজন প্রয়োজন।
উন্মুক্ত জলাশয়ের উপযোগী অভিযোজন- মাছ জলজ প্রাণী, তাই এর প্রাচুর্যতা ও সার্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন সুস্থ জলজ পরিবেশ, যা প্রতিনিয়ত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বিপন্ন হচ্ছে। তাই জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন উন্মুক্ত জলাশয়ে অভিযোজন উপযোগী মৎস্য ব্যবস্থাপনার কৌশল নির্ধারণ, কৌশল সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি ও বাস্তবায়নে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।
উন্মুক্ত জলাশয়ে অভিযোজনের উপযোগী নিম্নের ক্ষেত্রগুলোতে অভিযোজন কৌশল নির্ধারণ করা যেতে পারে।
জলজ আবাসস্থল উন্নয়ন ও সংরক্ষণ;
জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ (আবাসস্থল উন্নয়ন ও অভয়াশ্রম স্থাপন);
মাছের মজুদ বৃদ্ধি (জলজ আবাসস্থল উন্নয়ন, অভয়াশ্রম স্থাপন ও বিল নার্সারি);
নদী, বিল, প্লাবনভূমি, বাঁওড় ও দামুস/কোলে সমাজভিত্তিক জলাশয় ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ;
সব সংযোগ খালের উন্নয়ন যাতে অবাধ পানির প্রবাহ নির্বিঘ্ন করা যায়;
পানির গভীরতা বৃদ্ধি (নদী, খাল, বিল খনন/পুনখনন) এবং
মাছের সব অভিপ্রয়াণ পথ সচল ও নির্বিঘ্ন করা।
মাছ চাষে সম্ভাব্য অভিযোজন কৌশল- মাছ চাষে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ আপদ মাছের স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত করছে এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। মাছচাষে জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকি মোকাবেলা ও ঝুঁকি হ্রাসের জন্য অভিযোজন উপযোগী চাষযোগ্য মাছ চিহ্নিতকরণ; অভিযোজন উপযোগী মাছ চিহ্নিতকরণ, এর চাষ পদ্ধতির উন্নয়ন এবং সম্প্রসারণ কাজগুলো অতীব জরুরি। তাই-
সব পর্যায়ে মাছ চাষে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, প্রভাব ও দুর্যোগ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা;
কম ও বেশি তাপমাত্রা সহনশীল মাছের প্রজাতি নির্ধারণ, চাষ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ;
স্বল্প সময়ে বাজারজাতযোগ্য মাছ চাষের প্রজাতির চাষ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ;
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও দুর্যোগ বিবেচনায় নিরাপদ মাছ চাষ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ এবং লবণাক্ততা সহনশীল প্রজাতি মাছের চাষ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ।
ইতোমধ্যেই মৎস্য অধিদপ্তর কর্তৃক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। যেমনÑ আবাসস্থল উন্নয়ন, অভায়াশ্রম প্রতিষ্ঠা, উন্মুক্ত জলাশয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে মৎস্যচাষ, পোনা অবমুক্তি, বিল নার্সারি, জলবায়ু সহিষ্ণু মৎস্যচাষ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ইত্যাদি কার্যক্রম গ্রহণ করে। তাছাড়াও জেলেদের পুনর্বাসন ও ঝুঁকি মোকাবিলায় ভিজিএ ও এআইজি কার্যক্রমসহ পুনর্বাসন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়।  
পৃথিবীর জলবায়ু আজ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এ পরিবর্তনের মূলে রয়েছে বৈশ্বিক তাপমাত্রা। এ তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে পানি বরফ, তরল ও বাষ্পীয় অবস্থায় অবস্থান করে এবং বায়ুপ্রবাহ অব্যাহত থাকে, যা চক্রাকারে পৃথিবীর সমস্ত অংশে জীবকুলের জন্য অত্যাবশ্যকীয় পানির প্রবাহ বিদ্যমান রেখে জৈবিক ক্রিয়াকে অব্যাহত রাখে। অথচ বর্তমানে তাপমাত্রার অতি বৃদ্ধিতে পৃথিবীতে পানি ও বায়ুর মধ্যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়ে ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি/অনাবৃষ্টি, বন্যা, খরা প্রভৃতি আবহাওয়াজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে দেশের মৎস্য খাত ও এ খাতের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা আজ সংকটাপন্ন। জলবায়ু পরিবর্তনের এ হার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে দেশের মৎস্য খাত তথা জাতির জন্য হুমকি হিসেবে দেখা দিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশের দায় ও করণীয় ন্যূনতম, অথচ দেশে এর প্রভাব গুরুতর। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রতিরোধ ও মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত দেশের সম্পদ রক্ষা করে আত্মরক্ষার কাজ আমাদেরই করতে হবে।

ড. আলী মুহম্মদ ওমর ফারুক*
*সিনিয়র সহকারী পরিচালক, মৎস্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ, ঢাকা


Share with :

Facebook Facebook