কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

জলবায়ু পরিবর্তনে পাট উৎপাদনকে কাঙ্খিত মাত্রায় পৌঁছাতে করণীয়

আমাদের চারপাশে যা যা আছে যেমন- বাতাস, পানি, গাছপালা, মাটি, বন জঙ্গল, পাহাড় পর্বতমালা, নদী, সাগর, মহাসাগর, পাখি ইত্যাদি সব কিছু সমন্বয়েই গঠিত হয় প্রাকৃতিক পরিবেশ। অতিরিক্ত গ্রিন হাউস গ্যাস ভূ-মণ্ডলের বাতাসের সাথে মিশ্রণের জন্য প্রকৃতপক্ষে ভূ-মণ্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধি পায়। ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলা থেকে শুরু করে সমুদ্রপৃৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঝড়, টর্নেডো, বন্যা, খরা, সুনামি ও জলোচ্ছ্বাসের মতো বড় বড় দুর্যোগের সৃষ্টি হয়। আর এ সবই ঘটে ধীরগতিতে পৃথিবীর তাপমাত্রার বৃদ্ধির কারণে। এ তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের আবহাওয়া, পানি ব্যবস্থাপনা, ভূতাত্ত্বিক, পরিবেশ, মাটি, জমির ব্যবহার, জীববৈচিত্র্যের বিভিন্নতা, গাছগাছালির ইত্যাদির ওপরও প্রভাব পড়ছে। এরই মধ্যে দেশের বহু প্রাকৃতিক পরিবেশে পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশে অঞ্চলভেদে আবহাওয়ার এ পরিবর্তনকে দুইভাবে চিন্তা করা যায়। প্রথমটি হলো দক্ষিণাঞ্চল, যেখানে পানি নিষ্কাশনের অপ্রতুলতার সাথে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে লবণাক্ত পানির প্রবেশ ঘটেছে। দ্বিতীয়ত উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল, যেখানে পানির অভাবে খরার সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষি-পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার উপক্রম হচ্ছে।
পাট বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ বান্ধব আঁশ ফসল। বাংলাদেশে সাধারণত দুই ধরনের জাতের পাট চাষ করা হয়। যেমন- দেশি ও তোষা। পৃথিবীর অন্যান্য পাট উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের পাটের মান উৎকৃষ্ট এবং বর্তমানে উৎপাদনের বিবেচনায় ভারতের পরে দ্বিতীয় স্থানে আছে বাংলাদেশের পাটের অবস্থা। বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭.৫ লাখ হেক্টর জমি থেকে প্রায় ১৬ লাখ টন পাট আঁশ উৎপন্ন হয়, যার শতকরা ৫১ ভাগ ভারী পাট কলগুলোতে ব্যবহৃত হয়, ৪৪ ভাগ কাঁচা পাট বিদেশে রপ্তানি হয় ও মাত্র ৫ ভাগ দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারে কাজে লাগে। গত ৭০ বা ৮০ দশকের তুলনায় বাংলাদেশে পাট আবাদের জমির পরিমাণ কমে গেলেও গত ৩-৪ বছরে এর একটি বৃদ্ধি লক্ষ করা যাচ্ছে। বর্তমানে পরিবেশ গত কারণে পাটের চাহিদার বৃদ্ধি ও সাথে সাথে উৎপাদন বৃদ্ধির একটা সম্ভাবনা লক্ষ করা যায়। যদিও বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থার বিবেচনায় পাট অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ফসল তবুও বিভিন্ন সমস্যা বা বাধা যেমন কৃষি জমির অভাব, মূল্যের জন্য কৃষকের অনীহা, আঁশের বাজারজাতকরণ ও পাট কলগুলোর দৈন্যদশা ইত্যাদি কারণে এ দেশের পাট ফসল তার অভীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছে না। বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় ৫% পাট থেকে আসে এবং দেশের জিডিপিতে এর অবদান প্রায় শতকরা ৪ ভাগ। প্রতি বছর পাট আঁশ ও পাট খড়ি বিক্রির কারণে কৃষকপর্যায়ে প্রায় ২৫০০ কোটি টাকা লেনদেন হয়ে থাকে ।
পরিবেশ রক্ষায় পাট ফসলের গুরুত্ব
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ১০০ দিন সময়ের মধ্যে এক হেক্টর পাটের ফসল বাতাস থেকে প্রায় ১৪.৬৬ টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে সক্ষম হয়। যার জন্য বলা যায় পাট ফসল বায়ুম-লের দূষিত কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করে বায়ুম-লেকে পরিশোধিত করে। ফলে পাট ফসল পৃথিবীর গ্রিন হাউস গ্যাস ও তার পরিপ্রেক্ষিতে তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে কিছুটা হলেও ব্যাহত করে পৃথিবীকে তার পরিবেশ রক্ষায় সহায়তা  করে। আবার অন্য দিকে, প্রতি হেক্টর পাট ফসল ১০০ দিন সময়ে ১০.৬৬ টন অক্সিজেন ত্যাগ করে বায়ুম-লকে শুদ্ধ করে। এ মাত্রায় বাংলাদেশের চাষকৃত পাট ফসল তার মোট চাষ এলাকার বায়ুম-ল থেকে প্রতি বছর ১০০ দিনে প্রায় ৮১১৫.১৯ হাজার টন কার্বন-ডাইঅক্সাইড শোষণ করে এবং প্রায় ৫৯০০.৯৫ হাজার টন অক্সিজেন ত্যাগ করে।
বিশ্বে বছরে কমবেশি প্রায় ৪৭.৬৮ মিলিয়ন টন কাঁচা সবুজ পাট গাছ উৎপাদিত হয়, যার প্রায় ৫.৭২ মিলিয়ন টন কাচা পাতা এবং ২১.৯৩ মিলিয়ন টন কাঁচা সবুজ কা-। বর্তমান বিশ্বে পাট আঁশের উৎপাদন প্রায় ২.৯৮ মিলিয়ন টন। আঁশের সাথে অতিরিক্ত হিসেবে ১.৪৩ মিলিয়ন টন শুকনা পাতা ও ৬.২০ মিলিয়ন টন শুকনা পাট কাঠি বায়োমাস হিসেবে উৎপাদিত হয়। পাটপাতা সবজি হিসেবে এবং সাথে সাথে ঔষধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে বহু প্রাচীনকাল থেকে। এছাড়াও মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সবুজসার তৈরির জন্য পাটের পাতার অবদান অপরিসীম।
একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, পাট ফসল উৎপাদন কালে হেক্টরপ্রতি ৫ থেকে ৬ টন পাটপাতা মাটিতে পড়ে। এছাড়াও পাট ফসল কর্তনের পর জমিতে যে পাট গাছের গোড়াসহ শিকড় থেকে যায় তা পরবর্তীতে পচে মাটির সাথে মিশে সার তৈরি করে, এতে পরবর্তী ফসল উৎপাদনের সারের খরচ কম লাগে। পাতা পড়া এবং গোড়াসহ শিকড় থেকে যে পরিমাণ সার হয়, তার খাদ্য উৎপাদন মূল্যায়নে দেখা গেছে তা প্রায় ইউরিয়া ২৫১৭৪ টন, টিএসপি ৩৭৩৩ টন, এমপি ২৭৩৩ টন, জিপসাম ৩৮০৮০ টন এবং ডোলমাইট ৩০৫৪৫ টনের সমমানের। এছাড়া মাইক্রো খাদ্য উপাদান যেমন- ফেরাস সালফেট ৩৬০ টন, ম্যাগনেসিয়াম সালফেট ১৬০ টন ও জিংক সালফেট ৩৩ টনের সমমান পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গেছে পাট পচানোর সময় যে গ্যাস উৎপন্ন হয় তাতে ৫০% থেকে ৬০% মিথেন থাকে যা থেকে বসতবাড়িতে বা শিল্প কারখানায় ব্যবহার উপযোগী জ্বালানি গ্যাস তৈরি করা যেতে পারে। পাট পচনশীল এবং পাট থেকে কোনো বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয় না।  
পাট থেকে পাল্প এবং কাগজ তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। খুবই উন্নতমানের কাগজ সবুজ পাট থেকে উৎপন্ন করা সম্ভব। তাছাড়া পাট কাঠি কাঠের বিকল্প হিসেবে আসবাবপত্র, পলিউড, পার্টেক্স, চারকোল ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। গবেষণার ফলে জুট জিও-টেক্সটাইল তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। এ জিও-টেক্সটাইল নদীভাঙন রোধে, সেচ নালার ভাঙন রোধে, পাহাড়ের ধস রোধ, সেচ নালা হিসেবে ও রাস্তাঘাট তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব। তাছাড়া পাটের ব্যাগ বার বার ব্যবহার করা যায় এবং ব্যবহারের বিবেচনায় পাটের ব্যাগ খুবই সস্তা।   
আমাদের দেশের বন সম্পদ সংরক্ষণে পাট কাঠির প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পরিবেশবিদদের মতে, বাংলাদেশের মোট ভূমির তুলনায় এখানে ২৫% বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে এ দেশের বনভূমির পরিমাণ শতকরা মাত্র প্রায় ৮ থেকে ৯ ভাগ। আমাদের  দেশে প্রতি বছর প্রায় ০.৭০ থেকে ০.৭৫ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হয়। যা থেকে কিছু পরিমাণ হলেও পাট মৌসুমে দেশের বন সম্পদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে।
পাটের আবাদি জমির পরিমাণ, উৎপাদন ও ফলন
বর্ধিত জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা মেটাতে অধিক পরিমাণ উর্বর জমি খাদ্যশস্য চাষের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায়, পাটের উর্বর আবাদি জমির পরিমাণ কম এবং ক্রমাগত প্রান্তিক ও অনুর্বর জমিতে পাট আবাদ স্থানান্তরিত হলেও জাতীয় গড় উৎপাদন বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। সিপিডির এক সমীক্ষা পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিগত ২০০১-০২ সালের তুলনায় ২০০৬-০৭ সালে পাটের মোট আবাদি জমির পরিমাণ ৮.২৯% কমেছে কিন্তু মোট উৎপাদন ৩.১৮% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গড় ফলন বৃদ্ধি পেয়েছে ১২.৫০% (পাটের আবাদি জমির পরিমাণ, উৎপাদন ও ফলন। তবে ২০০৬-০৭ সালের পর থেকে ২০১৪-১৫ সাল পর্যন্ত এ বৃদ্ধিও হার ঊর্ধ্বমুখী পাওয়া যায়, উল্লেখ্য যে, গত ২০০৯-১০ সালে এর মাত্রা সবচেয়ে বেশি ছিল। এর প্রধান কারণ পাট চাষে বিজেআরআই কর্তৃক উদ্ভাবিত আধুনিক প্রযুক্তি যেমন উচ্চফলনশীল জাত এবং উৎপাদন কলাকৌশলের ব্যবহার। সময়োপযোগী ও প্রচলিত শস্যক্রমের সাথে মানানসই তোষা পাট জাত উদ্ভাবন করার ফলে দেশে দেশি ও তোষা পাটের চাষের হার যথাক্রমে ৭০:৩০ এর স্থলে বর্তমানে প্রায় ২০:৮০ অনুপাতে এসে দাঁড়িয়েছে।
জলবায়ুর পরিবর্তনে পাট চাষের ওপর প্রভাব যদি চিন্তা করা যায়, তা হলে এর চাষ এলাকা ও উৎপাদনের দিকে লক্ষ করতে হবে। গত ৩৫ বছরের (১৯৭২-৭৩ থেকে ২০০৬-০৭ সাল পর্যন্ত) পাটের চাষ এলাকা ও আঁশ উৎপাদন এর পর্যালোচনা থেকে দেখা যায়, ১৯৭২-৭৩ থেকে ১৯৮০-৮১ সাল এ ৯ বছরকে ৭০ দশক বলা হলে এ দশকে গড় চাষ এলাকা ছিল ৪৮০.৮৩ হাজার হেক্টর এবং তখন গড় উৎপাদন ছিল ৯৫২.৩৩ হাজার টন। আবার ৮০ দশকে (১৯৮১-৮২ থেকে ১৯৯০-৯১) গড় চাষ এলাকা ছিল ৪৯০.৯৩ হাজার হেক্টর এবং উৎপাদন ছিল ৯৭২.৩৩ হাজার টন। তবে এর পর থেকে একটু কমতে থাকে যেমন- ৯০ দশকে ও ২০০০ দশকে চাষ এলাকা ছিল যথাক্রমে, ৪৪১.৫৭ হাজার হেক্টর এবং ৪৬০.১৩ হাজার হেক্টর। তবে উৎপাদন ৯০-এর দশকের চেয়ে ২০০০ দশকে কিছুটা বেশি ছিল যথাক্রমে, যেমন- ৮৭৪.৫৯ হাজার টন ও ৯১১.৩৩ হাজার টন। এ চিত্র থেকে খুব সহজেই উপলব্ধি করা যায় যে, পাট চাষের এলাকা, গত ৭০ দশকের চেয়ে বর্তমানে ২০০০ দশকে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে, কিন্তু উৎপাদনের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় ৭০ দশকে ছিল ৯৫২.৩৩ এবং ২০০০ দশকে তা দাঁড়িয়েছে ৯১১.৩৩ হাজার টন যা প্রায় কাছাকাছি। উল্লেখ্য যে, ২০০৭-০৮ থেকে ২০১৪-১৫ দশকে গড় উৎপাদন এলাকা ও গড় উৎপাদন উভয়ই পূর্বের যে কোনো সময়ের চেয়ে অধিক। এর কারণ খুঁজলে অবশ্যই বলা যায় পাট চাষে কৃষকের জ্ঞান বৃদ্ধি, উন্নত জাত, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত চাষ ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই, পোকামাকড় দমন ব্যবস্থা ইত্যাদির কথা। জলবায়ুর পরিবর্তনের সাথে সম্পর্ক চিন্তা করলে, আগে বাংলাদেশে দেশি জাতের পাট বেশি চাষ হতো, বর্তমানে হয় তোষা জাতের বেশি। আগে নিচু এলাকায় পাট চাষ হতো এখন হয় কিছুটা উঁচু এলাকায়। আগে বাংলাদেশর পূর্বাঞ্চলে ভালো পাটের চাষ হতো এখন হয় উত্তরাঞ্চলে।
পাট আঁশের উৎপাদন কাঙ্খিত মাত্রায় পৌঁছাতে করণীয়
এখন পর্যন্ত বলা যায়, বাংলাদেশের পাট ফসল জলবায়ুর সাথে খাপখাইয়ে বহাল তবিয়তে চাষ হচ্ছে। কারণ মার্চ-এপ্রিল মাসে আগাম বৃষ্টিপাতের সাথে সাথে পাট চাষের জন্য জমি তৈরি ও বীজ বপনের ব্যবস্থা করা হয়। তারপর মে-জুন মাসের দিকে অল্প কিছু এবং মাঝে মাঝে বৃষ্টির ফলে মাটিতে রসের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় যা পাট ফসলের বৃদ্ধিতে কাজে লাগে। পরবর্তীতে জুলাই-আগস্টের অতিরিক্ত বৃষ্টিতে দেশের সব নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর-নালা পানিতে ভরে যায়, যা পাট ফসল কর্তনের পর পচানো ও আঁশের মান্নোনয়নে সহায়ক হয়। বাংলাদেশে দেশি তোষা উভয় জাতের পাটের চাষ হয়। তবে দেশির তুলনায় তোষা জাতের পাটের চাষ বর্তমানে বেশি হচ্ছে। এর কারণ হলো পূর্বের যেসব এলাকায় দেশি পাটের চাষ হতো, তা ছিল নিচু এলাকা। বর্তমানে খাদ্যশস্যের চাহিদার জন্য ওই সব এলাকা ধান চাষের আওতায় চলে গেছে। পাট চলে গেছে তুলনামূলকভাবে উঁচু ভূমি এলাকা যেখানে বৃষ্টি নির্ভরতা বেশি। দেশি জাতের চাষ কৃষক পর্যায়ে কমে যাওয়ায় এর বীজ উৎপাদনও ব্যাহত হয় ফলে তোষার জমির পরিমাণ বাড়তে থাকে। কারণ তোষা পাটের বীজের সহজ প্রাপ্যতা।
পাট নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের ফসল। পাটের বীজ সাধারণত ৩০ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রায় অঙ্কুরিত হয়, তবে অস্বাভাবিক অবস্থায় ২০ ডিগ্রি সে. থেকে ৪০ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রাতেও অঙ্কুরিত হওয়ার ক্ষমতা রাখে। ফলে গাছ জন্মানোর পর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলেও পাট গাছের বৃদ্ধিতে তেমন কোনো খারাপ প্রভাব ফেলে না এবং ফলন ভালো হয়। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ত ও শুষ্ক এলাকায় অনেক অনাবাদি এবং এক বা দুই ফসলি জমি আছে, যেখানে পাট উৎপাদন কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে। এরই মধ্যে লবণাক্ত, খরা ইত্যাদি সহিষ্ণু পাট ও কেনাফ জাত বিজেআরআই কর্তৃক উদ্ভাবিত হয়েছে। ওই জাতগুলো নির্দিষ্ট এলাকায় চাষের জন্য প্রয়োজনীয় বীজ, প্রযুক্তি ও বাজার ব্যবস্থাপনার সমন্বয় ঘটাতে হবে।
পাট চাষি ও মাঠকর্মীদের জন্য পাট চাষবিষয়ক উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ বেশি বেশি প্রদানের মাধ্যমে পাট ফসল চাষে আগ্রহী  করে তুলতে হবে। পানি স্বল্প স্থানে পাট পচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে রিবন রেটিং প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ ও বিস্তার ঘটাতে হবে। কৃষক পর্যায়ে উচ্চফলনশীল পাট জাতের বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যে ‘নিজের বীজ নিজে করি’ পদ্ধতিতে বীজ উৎপাদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাট আঁশের বাজার মূল্য স্থিরকরণ ও প্রয়োজনে সরকারিভাবে ক্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকের জন্য পাট আঁশের বাজার ব্যবস্থা সহজলভ্য করতে হবে। সুন্দর ও নিত্যনতুন পাট পণ্য উদ্ভাবন করে দেশের অভ্যন্তরে তার ব্যবহার বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। উচ্চমূল্য বিশিষ্ট ফসল চাষের ফলে পাটের বীজ উৎপাদনের জমি হ্রাস পাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সাথীফসল হিসেবে এবং বনায়ন পরিবেশে প্রয়োজনমাফিক ‘নিজের বীজ নিজে করি’ কর্ম পদ্ধতিতে পাট বীজ উৎপাদনে চাষিদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ সচেতনতার ফলে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বাজারে পাটের মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে এবং কৃষক পাটের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে। ফলে কৃষক আবার পাট চাষে উৎসাহিত হচ্ছে এবং পাট চাষে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করায় একক আয়তনে ফলন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে উদ্ভাবিত পাটের জাতগুলোর ফলনশীলতা অনেক বেশি যেমন- ৪৫০০ কেজি/হে. এর ওপরে। পাটের উৎপাদনকে কাক্সিক্ষত মাত্রায় পৌঁছাতে যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো হলো- সময়মতো বপন, অন্তর্বর্তী পরিচর্যা, সঠিক সময়ে কর্তন, পরিমিত পাতলাকরণ, উন্নত পচন ব্যবস্থা ইত্যাদি থেকে ভালো মানের আঁশের কাক্সিক্ষত মাত্রায় ফলন পাওয়া সম্ভব। অতএব, জলবায়ু পরিবর্তন সত্ত্বেও আমাদের কৃষি পরিবেশ পাট চাষের জন্য বেশ উপযোগী থাকবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

ড. মো. মাহবুবুল ইসলাম* ড. রহিমা খাতুন**
মোঃ আসাদুজ্জমান*** ড. মোঃ কামাল উদ্দিন****

*মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, **পরিচালক (কৃষি), ***পরিচালক (কারিগরি),  ****মহাপরিচালক, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, মানিক মিয়া এভিনিউ, ঢাকা-১২০৭


Share with :

Facebook Facebook