কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ধান গবেষণা ও করণীয়

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের কৃষি খাতে দৃশ্যমান অভিঘাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০১০ অনুসারে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, অসময়ে বৃষ্টি, বন্যা, জলাবদ্ধতা, অতি উচ্চ ও নিম্ন তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও ঘন ঘন প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলোচ্ছ্বাসের মতো ঘটনা ঘটছে। ধানের রোগবালাই ও পোকামাকড় বিবর্তনের মাধ্যমে নতুন নতুন বায়োটাইপের উদ্ভবের ফলে ধান ফসলে এর আক্রমণ বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। সিডর, আইলা, রেশমি, নার্গিস এসবের কবলে পড়ে নিঃস্ব হয়েছে উপকূলীয় অঞ্চলের ১৯টি জেলার কৃষক ও কৃষি পরিবার। আইপিসিসির মতে, বর্তমান গড় তাপমাত্রার থেকে প্রতি ১ ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে ধানের ফলন ৭-১০% কমে যাওয়ার প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। আগামী ৫০ বছরের মধ্যে সমুদ্রের পানির উচ্চতা প্রায় এক মিটার বেড়ে যাওয়ার আশংকা করেছে। যার ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ১৭ শতাংশ জমি লবণাক্ত পানির মধ্যে তলিয়ে যাবে এবং প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে প্রায় দুই কোটি মানুষ। অতি বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা ও বন্যায় প্রায় ২.০ মিলিয়ন হেক্টর জমির ধান কোনো না কোনোভাবে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বৃষ্টিপাতের ধারার অস্বাভাবিক পরিবর্তনের ফলে সময়মতো বীজতলায় চারা উৎপাদন করা যায় না, ফলে ধানের রোপণ স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দেরি হয়ে যায়, তদুপরি বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির অসম বণ্টনের কারণে দেশের প্রায় তিন মিলিয়ন হেক্টর জমির আমন ধান বিভিন্ন মাত্রার খরার কবলে পড়ে, ফলে ধানের ফলন তথা উৎপাদন কমে যায়। গত দুই বছর আগাম কালবৈশাখীর কারণে ঝড়-শিলা বৃষ্টি ও অতি বৃষ্টির ফলে হাওর অঞ্চলে পাকা বোরো ধানক্ষেত তলিয়ে গেছে। তাছাড়া আগাম রোপণকৃত ধান প্রজনন পর্যায়ে নি¤œ তাপমাত্রার (গড় তাপমাত্রা ১৫-১৭ ডিগ্রি) মধ্যে পড়ে চিটা হয়ে যায়। অন্য দিকে উঁচু অঞ্চলের ধানক্ষেত ব্লাস্ট রোগের আক্রমণে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে অতি উচ্চতাপমাত্রার কারণে স¦ল্প জীবনকালের আমন ধানের চিটার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ ভাটি অঞ্চলের দেশ হওয়ার কারণে অতি বৃষ্টি হলে বাংলাদেশের প্রায় ২.৫ মিলিয়ন হেক্টর জমির আমন ধান এক বা একাধিক দফায় স্বল্প অথবা দীর্ঘমেয়াদি বন্যায় আক্রান্ত হয়। বাংলাদেশে ১৯টি জেলায় প্রায় ১.২ মিলিয়ন হে. জমি বিভিন্ন মাত্রায় লবণাক্ততা কবলিত। এসব জমিতে স্থানীয় জাতের আমন ধান চাষ করার পর জমি পতিত থাকে। বর্ষা মৌসুমে উপকূলীয় জলোচ্ছ্বাসে আমন ফসলে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সৃষ্টি হয় লবণপানির জলাবদ্ধতা। শুষ্ক মৌসুমে উপকূলীয় এলাকায় মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে প্রায় ৩০ লাখ হেক্টর জমি আমন চাষের পর পতিত থাকে।
ক্রমহ্রাসমান প্রাকৃতিক সম্পদ, আবাদি জমি ও পানি অন্যদিকে বাড়তি জনসংখ্যা তার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) জলবায়ু অভিঘাত সহনশীল আউশ-আমন-বোরো ধানের জাত, ধানভিত্তিক লাভজনক শস্যক্রম/মাছ চাষ ও নিবিড়তা বৃদ্ধি (শস্য বহুমুখীকরণ), কৃষিতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই ও পোকামাকড়ের সমন্বিত দমন, টেকসই মাটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, খামার যান্ত্রিকীকরণ, ব্রি উদ্ভাবিত ধানের জাতের অভিযোজন ম্যাপ, বিভিন্ন জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্ট্রেস এরিয়া ম্যাপ তৈরি করা হয়েছে, ঔষধি ও জিংকসমৃদ্ধ ধান উদ্ভাবন, ভালো কৃষি অনুশীলন, দেশের কৃষি অঞ্চলভিত্তিক লাগসই ধানের জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। তদুপরি, ব্রি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত ব্রি ৪টি হাইব্রিডসহ ৮০টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। এ ছাড়াও ১২২টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন, প্রতি বছর প্রায় ১০০ টন ব্রিডার বীজ বিতরণের মাধ্যমে কৃষকপর্যায়ে উন্নতমানের বীজ সরবরাহ করা। ব্রি প্রযুক্তি সম্প্রসারণে প্রশিক্ষণ প্রদান, রাইস নলেজ ব্যাংক, মাঠ প্রদর্শনীর পাশাপাশি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিএডিসি, প্রাইভেট কোম্পানি, এনজিও, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও দাতা সংস্থার সহযেগিতায় ব্রি প্রযুক্তিসমূহ মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
 আউশের আবাদ বৃদ্ধিকরণ : পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক এলাকায় বোরো চাষ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে খাদ্য উৎপাদন ঠিক রাখতে হলে আউশের উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। বৃষ্টির পানি সর্বোত্তম ব্যবহার করতে আউশ চাষের দুটি ভিন্ন দৃশ্যপট বিবেচনায় রেখে সহজেই বৃষ্টিনির্ভর আউশ ও আমনের আবাদ বাড়ানো সম্ভব। প্রথমত, যেসব উঁচু ও মধ্যম উঁচু জমিতে বোরো ধানের আবাদ টেকসই নয় সেখানে স্বল্প সেচে বৃষ্টিনির্ভর আউশ আবাদ করা যায়। এ ক্ষেত্রে আমনের পর উপযুক্ত রবি ফসল এবং পরে আউশ চাষ করা যায়। দ্বিতীয়ত, যেসব এলাকায় বোরো ধান কাটার পর আউশ চাষ করা সম্ভব সেসব এলাকায় রোপা আউশের আবাদ বাড়ানো। এ ক্ষেত্রে সতর্কতার সাথে স্বল্পমেয়াদি বোরোর জাত নির্বাচন করতে হবে, যাতে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে আউশের চারা রোপণ সম্পন্ন করা যায়। এতে আমন চাষ ও উৎপাদন ব্যাহত হবে না বরঞ্চ প্রতি বছর ১০ লাখ টন অধিক খাদ্য উৎপাদন করা সম্ভব হবে। ব্রি উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল জাতসমূহ যেমন ব্রি ধান২৬, ব্রি ধান২৭, ব্রি ধান৪৮ ও ব্রি ধান৫৫ উল্লেখযোগ্য।
লবণ সহিষ্ণু জাত ও প্রযুক্তি : ব্রি এ পর্যন্ত প্রায় ১০টির অধিক লবণাক্ততা সহনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে, যার মধ্যে বোরো মৌসুমের ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৬১, ব্রিধান৬৭, এবং আমন মৌসুমের জন্য বিআর২৩, ব্রিধান৪০, ব্রিধান৪১, ব্রিধান৫৩, ব্রিধান৫৪, ব্রিধান৫৫ ও ব্রিধান৭৩ উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া, লবণাক্ত এলাকায় জাতের পাশাপশি বিভিন্ন ধরনের উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবন করা হয়েছে যেমন- সঠিক সময়ে বপন/রোপণ, রোপণের আগে বীজতলায় Elemental সালফার, পটাশ ও দস্তা প্রয়োগ (৬:৬:২ গ্রাম/লিটার), জৈবসার বা ছাই প্রয়োগ করা, জিপসাম ও পটাশ সার ব্যবহার, মাটি ধোয়া (Soil flashing), ডিবলিং পদ্ধতি অনুসরণ।
খরার সহিষ্ণু জাত ও প্রযুক্তি : আউশ মৌসুমে বিআর২০, বিআর২১, বিআর২৪, ব্রি ধান৪২, ব্রি ধান৪৩, ব্রি ধান৬৫ (বোনা আউশ), আমন মৌসুমের জন্য উদ্ভাবিত স্বল্প জীবনকালের উচ্চফলনশীল ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬৬ এবং ব্রি ধান৭১ জাতগুলো আবাদের পর সহজেই দ্বিতীয় ফসল চাষ করা সম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অঞ্চলভেদে খরাসহনশীল জাতগুলো প্রবর্তন করা গেলে কাক্সিক্ষত উৎপাদন পাওয়া সম্ভব।
বন্যা সহিষ্ণু জাত ও প্রযুক্তি : ব্রি এ পর্যন্ত দুইটি বন্যা সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। উদ্ভাবিত জাতগুলো হলো ব্রি ধান৫১ ও ব্রি ধান৫২। জাত দুটি দুই সপ্তাহ পর্যন্ত পানির নিচে ডুবে থাকলেও বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরে কাক্সিক্ষত ফলন দিতে সক্ষম। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরে ৫ দিনের মধ্যে আগাছা পরিষ্কার, ১০ দিন পর বিঘাপ্রতি ৬ কেজি ইউরিয়া ও ৪ কেজি পটাশ সার প্রয়োগ করতে হবে। প্রথম সার প্রয়োগের ১০ দিন পর পুনরায় একই মাত্রায় ইউরিয়া ও পটাশ সার প্রয়োগ করলে ভালো ফলন পাওয়া যাবে।
অলবণাক্ত জোয়ার-ভাটা সহিষ্ণু জাত ও প্রযুক্তি : দীর্ঘকাল গবেষণার পর সম্প্রতি ব্রি উচ্চফলনশীল দুটি জাত ব্রি ধান৭৬ এবং ব্রি ধান৭৭ অবমুক্ত করেছে। এ জাত দুইটি স্থানীয় জাতের চেয়ে হেক্টরপ্রতি ১.৫ টন ফলন বেশি দেয়। ৩৫-৪০ দিনের চারার উচ্চতা স্থানীয় জাতের ন্যায় ৭০-৭২ সেমি. হওয়ায় জাত দুটি বরগুনা ও বরিশাল অঞ্চলে ধান উৎপাদনে অবদান রাখবে। এ ছাড়াও কাক্সিক্ষত ফলন হেক্টরপ্রতি ৫.০ টন পেতে NPK Briquttee সার ব্যবহার করতে হবে।
জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু জাত ও প্রযুক্তি : বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও বৃহত্তর যশোরের বিশাল এলাকা জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত হয়। এই এলাকার উপযোগী জাত বিআর১০, বিআর২৩ ও বিআর৩০। ধান গাছের গোড়ার অংশ পানির নিচে থাকলেও কুশি উৎপাদন করতে সক্ষম।
টেকসই মাটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা : ধানের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণই শেষ কথা নয়। একটি জাতের সর্বোচ্চ ফলন পেতে হলে মাটির জৈব পদার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আমাদের বোরো মৌসুমে ১০ টন/হেক্টর ফলন দিতে সক্ষম এমন জাত রয়েছে। কিন্তু মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ কম থাকায় সর্বোচ্চ ফলন ফলানো সম্ভব হচ্ছে না। গবেষণায় দেখা গেছে মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ২.০-২.৪% এর মধ্যে থাকলে সর্বোচ্চ কাক্সিক্ষত ফলন ফলানো সম্ভব। দীর্ঘ সময় ধরে ধান-ধান শস্য বিন্যাসে ২০ সেমি. নাড়া/খড় রেখে কর্তনের পর তা চাষ দিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দিলে জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ আস্তে আস্তে ২.৪% উন্নীত করা সম্ভব। তা ছাড়া জমিতে সুষম সার (জৈব ও অজৈব) ব্যবহারের মাধ্যমেও ফলন বাড়ানো সম্ভব।
পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন ব্যবস্থাপনা : ধান উৎপাদনে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের প্রকোপও বৃদ্ধি পাচ্ছে। রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণে ৮০% পর্যন্ত ফলনের ক্ষতি হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক গৌণ ক্ষতিকর পোকা মুখ্য ক্ষতিকর পোকা হিসেবে পুনঃআবির্ভূত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধারা অব্যাহত থাকবে। উদাহরণস্বরূপ সারা দেশে পাতা মোড়ানো পোকা ও দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে পামরী পোকার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এজন্য নতুন নতুন প্রতিরোধ ব্যবস্থা উদ্ভাবনের পাশাপাশি নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন এবং পরিবেশবান্ধব সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনা যেমন- আলোক ফাঁদ, হলুদ আঠালো ফাঁদ, পার্চিং, ইকো ইঞ্জিনিয়ারিং, বোটানিক্যালস এবং উপকারী পোকা সংরক্ষণ জোরদার করার মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব।
ধানের ফলন হ্রাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো রোগবালাই। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ধানের ৩২টি বিভিন্ন ধরনের রোগ শনাক্ত ও প্রতিকার ব্যবস্থা উদ্ভাবন করা হয়েছে। বর্তমানে ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতাপোড়া এবং ছত্রাকজনিত নেক ব্লাস্ট রোগ আমন ও বোরো ধানে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ ছাড়াও তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে খোলপোড়া রোগের প্রাদুর্ভাব আমন ও আউশ মৌসুমে ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে। পানি স্বল্পতা বা খরার কারণে আউশ মৌসুমে টুংরো ও শিকড়গিট রোগ অত্যন্ত হুমকি হয়ে দেখা দেবে। এ সব রোগ ব্যবস্থাপনার জন্য উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ সমন্বিত রোগবালাই ব্যবস্থাপনা উদ্ভাবন করেছে।
ঠাণ্ডা সহনশীল জাত ও প্রযুক্তি : শৈত্যপ্রবাহের কারণে উত্তরের জেলাগুলোতে নভেম্বর-ডিসেম্বর বা জানুয়ারি মাসে বোরো বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। বোরো মৌসুমে তীব্র শীতে সুস্থ সবল চারা উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবন করেছে ব্রির বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানীদের মতে, বোরো ধানের চারা উৎপাদনের সময় শৈত্যপ্রবাহ হলে অর্থাৎ তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে চলে গেলে বীজতলা দিনে সূর্য ওঠার ৪-৬ ঘণ্টা পর স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। সূর্য অস্ত যাওয়ার আগেই পলিথিন সরিয়ে রাখতে হবে। এ ছাড়াও বীজতলায় ২-৪ সেমি. দাঁড়ানো পানি রেখে চারাকে অতিরিক্ত ঠাণ্ডার ক্ষতি থেকে রক্ষা করা সম্ভব। বোরো ধানের চারা রোপণের সময় শৈত্যপ্রবাহ চলতে থাকলে কয়েক দিন দেরিতে অর্থাৎ শৈত্যপ্রবাহের শেষে চারা রোপণ করলে মূল জমিতে চারার মৃত্যু কমানো সম্ভব। বোরো মৌসুমে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ থেকে বীজতলা রক্ষার প্রযুক্তির পাশাপাশি ঠাণ্ডা সহিষ্ণু জাত ব্রি ধান৩৬ ও ব্রি ধান৫৫ উদ্ভাবন করা হয়েছে।
ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধির মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি : ব্রি এ পর্যন্ত কৃষি অঞ্চলভিত্তিক ৪১টি লাভজনক শস্যক্রম উদ্ভাবন করেছে। ব্রি উদ্ভাবিত শস্যক্রম অনুসরণ করে এক ফসলি থেকে দোফসলি, দোফসলি জমিকে তিন ফসলি এবং তিন ফসলি জমি চার ফসলি জমিতে রূপান্তর করে শস্য চাষ নিবিড়তা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ব্রিধান৬২-আলু-মুগডাল-ব্রি ধান৪৮ শস্যক্রমটি ঠা-াপ্রবণ রংপুর অঞ্চলের জন্য উপযোগী এবং লবণাক্ত এলাকার জন্য ঘেরের জমিতে বর্ষা মৌসুমে ধান+মাছ+মাচায় সবজির মিশ্র চাষ-সরিষা/সূর্যমুখী অত্যন্ত লাভজনক। দেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের খরা কবলিত বৃষ্টিনির্ভর এলাকায় ব্রি ধান৫৬/৬৬/৭১-খেসারি/মসুরি/ছোলা এবং আংশিক সেচনির্ভর এলাকায় ব্রি ধান৫৬/৬৬/৭১-মসুরি/সরিষা/গম/ আলু-আউশ (ব্রি ধান৪৮) শস্যক্রম সম্ভাবনাময় এবং লাভজনক। এ ছাড়াও ধান পাট রিলে ক্রপিংয়ে ব্রি ধান৩৩ ও ব্রি ধান৩৯ অত্যন্ত উপযোগী জাত।
হাওর অঞ্চলের উপযোগী জাত উদ্ভাবন  হাওরাঞ্চলে একটিমাত্র ফসল বোরো। দুঃখ কিংবা গর্ব যাই হোক- একফসলি ধান; হাওরবাসীর প্রাণ। সত্যিই বছরে একটিমাত্র ফসল হলেও বিরল বিচিত্র দেশি জাতের অনেক ধান এখনো এই হাওরাঞ্চলে উৎপাদিত হয়। হাওর এলাকার উপযোগী জাত বিআর১৭, বিআর১৮ এবং বিআর১৯, ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯ এবং ব্রি ধান৫৮ উদ্ভাবন করা হয়েছে।

 

ভবিষ্যৎ করণীয় : জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তবে পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর কৌশল অবলম্বন করতে হবে। যেমন- বৈরী জলবায়ুর (লবণাক্ততা, বন্যা, খরা, জলাবদ্ধতা ও অধিক তাপ সহিষ্ণু) সাথে খাপখাওয়ানোর মতো উচ্চফলনশীল ফসলের নতুন নতুন জাতের উদ্ভাবন ও ব্যবহার এবং এগুলোর চাষাবাদ বাড়াতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। নতুন শস্যপর্যায় ও অভিযোজন কৌশলের ওপর ব্যাপক গবেষণা জোরদার করতে হবে। অভিযোজন কৌশল ও নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে সরকারের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ট সবার সচেতনতা বাড়াতে হবে। লবণ সহিষ্ণু, বন্যা সহিষ্ণু, খরাসহিষ্ণু, ঠাণ্ডা ও তাপ সহিষ্ণু, আলোক অসংবেদনশীল ধানসহ বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবন করা। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপখাইয়ে শস্য বিন্যাস ও শস্যপর্যায় অনুসরণ করা। রোগবালাই সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন করা। জলবায়ু ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস কৃষকের কাছে দ্রুত পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা। কৃষিতে তথ্য প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট, মলিকুলার ও বায়োটেকনোলজি প্রযুক্তির ব্যবহার করা। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, সূর্যালোক নিয়ন্ত্রিত গ্রিন হাউস খামার তৈরি করা। শস্যবীমা চালু করা। সর্জান পদ্ধতিতে সারা বছর ফল ও শাকসবজি চাষ। জলমগ্ন/হাওর এলাকায় পানিতে ভাসমান পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা এবং কৃষিতে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার করা। ভবিষ্যৎ কৃষিকে টেকসই করার জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ করা প্রয়োজন। পরিশেষে বলা যায়, দেশের প্রতিটি উপজেলায় জলবায়ুর ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি করে কৃষি, খাদ্য ও অবকাঠামোসহ সবগুলো বিষয় নিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা, গবেষণার মাধ্যমে বৈরী জলবায়ুর সাথে অভিযোজন ক্ষমতাসম্পন্ন কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও তার স্বতঃস্ফূর্ত বাস্তবায়ন ঘটানোর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ কৃষির ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া সম্ভব।

 

ড. মো. আনছার আলী* ড. মো. শাহজাহান কবীর** ড. ভাগ্য রানী বণিক***
এম আব্দুল মোমিন**** ও মো. আবুল কাসেম*****

*পরিচালক (গবেষণা), **পরিচালক (প্রশাসন), ***মহাপরিচালক, **** সিনিয়র লিয়াজোঁ অফিসার, ***** টেকনিক্যাল এডিটর, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, জয়দেবপুর


Share with :

Facebook Facebook