কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কন্ট্রাক্ট ফার্মিং পদ্ধতিতে আমের উৎপাদন বাজারজাতকরণ এবং আম রপ্তানির ভবিষৎ

বাংলাদেশে উৎপাদিত ফল ও সবজি রপ্তানির সম্ভাবনা অনেক। তবে সম্ভাবনার তুলনায় সফলতা যে খুব যে বেশি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। রপ্তানি কার্যক্রম খুব কাছে থেকে পর্যালোচনা করলে সহজেই দৃশ্যমান হবে, রপ্তানি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অনিয়মতান্ত্রিকভাবে তাদের প্রচেষ্ঠা অব্যাহত রেখেছেন। কিন্তু তাদের সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট কোনো কর্মপরিকল্পনা নেই বললেই চলে। রপ্তানির বিষয়টি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হর্ট্রেক্স ফাউন্ডেশন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ফল ও সবজি রপ্তানিকারক সমিতি, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো যৌথভাবে সম্পন্ন করে থাকে। এদেশের বিভিন্ন ধরনের সবজি এরই মধ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। দেশে উৎপাদিত সব ফল ও সবজি রপ্তানিযোগ্য নয়। রপ্তানিযোগ্য ফল ও সবজির কিছু বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার যা প্রচলিত চাষাবাদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদন করে তা অর্জন করা সম্ভব নয়। এছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো ফল ও সবজি আমদানিতে যে মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে তা যথাযথভাবে না মানতে পারলে ওই সব দেশ এদেশ থেকে ফল ও সবজি আমদানি করবে না। বাংলাদেশ থেকে এরই মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সবজি সেসব দেশে রপ্তানি হয়েছে। তবে ফলের রপ্তানি সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা খুব বেশি দূর অগ্রসর হতে পারিনি। এর কারণ হিসেবে দেখা যায়, আমরা ক্রেতাদের শর্তগুলো ঠিকমতো ও যথাযথভাবে মানতে পারি না। এর সাথে রয়েছে আমাদের ভ্রান্ত ধারণাগুলো। অনেকেই রপ্তানিযোগ্য ফল ও সবজি উৎপাদনের জন্য ফল ও সবজি চাষিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত অথচ তার জানা নেই রপ্তানির জন্য প্রধান অস্তরায়গুলো কী কী? কী ব্যবস্থা নিলে এগুলোকে দূর করা সম্ভব। শুধু পড়লে বা দেখলে একজন সাধারণ মানুষের মনে হতে পারে এদেশের ফল ও সবজিগুলো ভবিষৎতেও রপ্তানি করা সম্ভব নয়। এ ধারণা থেকে সংশ্লিষ্ট চাষিরা নিরুৎসাহিত হন প্রতিনিয়ত। বরং বাস্তবভিত্তিক ধ্যান-ধারণা থেকে বাস্তবায়নযোগ্য ম্যানুয়েল তৈরি করতে হবে যা চাষিদের জন্য সহজেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।
আমরা রপ্তানি বিষয়টিকে ততটা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা না করে আমরা বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে থাকি। প্রত্যেকটি ফল ও সবজির একটি বৈশিষ্ট্য থাকবে, যা স্যানেটারি এবং ফাইটোস্যানেটারি মানদ- অনুসরণ করে উৎপাদন করতে হবে, সংগনিরোধ বালাইমুক্ত হতে হবে যেমন ফলের মাছি পোকা, থ্রিপস, সাদামাছি ইত্যাদি, উৎপাদন ও সংগ্রহ পর্যায়ে উত্তম কৃষি ব্যবস্থাপনার প্রয়োগ করতে হবে এবং ট্রেস্যাবিলিটির জন্য উৎপাদনের সব পর্যায়ের তথ্য লিপিবদ্ধ করতে হবে। এসব বিষয়গুলো সঠিকভাবে ও যথাযথ নিয়মে করতে হলে কন্ট্রাক্ট ফামিং বা চুক্তিভিত্তিক ফসল চাষের বিকল্প নেই। এছাড়াও দেশের নামিদামি সুপারশপগুলোতে নিরাপদ ফল ও সবজি সরবরাহের জন্যও এটি বেশ কার্যকরী। আম রপ্তানি আম গবেষকদের কাছে অনেকটাই কঠিন কাজ ছিল তবে লক্ষ্য অর্জনে প্রচেষ্ঠাও অব্যাহত ছিল। কিন্তু অতীতে কখনও কাক্সিক্ষত শর্তগুলো পূরণ করা সম্ভব হয়নি। আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে হর্টেক্স ফাইন্ডেশনের মাধ্যমে ২০০৯ সালের জুন মাসে কিছু বারি আম-২ আম ইউরোপীয় ইউনিয়নে পাঠানো হয়েছিল। আমগুলো পাওয়ার পর আমগুলো তারা সাদরে গ্রহণ করেছিল এবং জুলাই মাসে এক ফ্যাক্স বার্তায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটকে জানানো হয়েছিল যে, পাঠানো আমগুলো তাদের পছন্দ হয়েছে এবং বাংলাদেশের এ আমটি তারা নিতে চায়। কিন্তু ততক্ষণে বারি আম-২ এর মৌসুম শেষ। আর মৌসুম থাকলেও বা কি! এক টন আমের চাহিদা মেটাতে ১০ টনের মতো আম প্রয়োজন হতো। এরপর চলতে থাকে আরও গবেষণা। একবার কিছু কৃষি বিজ্ঞানীকে দক্ষ প্রশিক্ষক গড়ে তোলা হলো এবং ২০১৫ সালে তাদের মাধ্যমে আমচাষিদের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনের জন্য প্রশিক্ষণ দেয়া হলো। সবার আশা ছিল এবার হয়ত বেশকিছু আম বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে। কিন্তু ঘটল তার উল্টোটা। আম সুন্দর হওয়া তো দূরের কথা, অত্যধিক বৃষ্টির কারণে আমের রঙ ধরে রাখা সম্ভব হয়নি এবং আমের মাছি পোকা দমন করা অনেকটাই কঠিন হয়েছিল। ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো। দক্ষ বিদেশি প্রশিক্ষকের মাধ্যমে আমচাষিদের প্রশিক্ষিত করেও আম রপ্তানি সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের ধারণাও ছিল না অত্যধিক বৃষ্টিপাতের ফলে আমগুলো কিভাবে সুন্দর থাকবে, আমের মাছি পোকা কিভাবে শতভাগ দমন করা যাবে এবং আমগুলো কিভাবে বেশি দিন সংরক্ষণ করা যাবে। সুতরাং এটা স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে, পরিকল্পনা যদি সঠিক না হয় তাহলে লক্ষ্য অর্জন অনেকটাই কঠিন। অথচ ২০১৫ সালে সাতক্ষীরা জেলা থেকে মে মাসে নন ব্যাগিং প্রযুক্তিতে উৎপাদিত হিমসাগর আম এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ব্যাগিং প্রযুক্তিতে উৎপাদিত ল্যাংড়া ও ফজলি আম বিদেশে রপ্তানি হয়। এর পরের মৌসুমে অর্থাৎ ২০১৬ সালে সারা দেশ থেকে প্রায় ৩০০ টনের মতো আম ফ্রান্স, ইতালি, ইংল্যান্ড, জার্মানি, সুইডেন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ায় রপ্তানি হয়। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে পৃথিবীর প্রধান প্রধান আম রপ্তানিকারক দেশে ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তিটি ব্যবহার করে আম উৎপাদন করা হচ্ছে। শুধু তাই নয় এ আমগুলো শতভাগ রপ্তানি উপযোগী। গবেষণার মাধ্যমে এরই মধ্যে প্রমাণিত হয়েছে যে, ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি একটি পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনের সহজ উপায়। কন্ট্রান্ট ফামিং ধারণাটি যদিও রপ্তানিযোগ্য ফল ও সবজি উৎপাদনে একটি কার্যকরী ও ফলপ্রসূ পদক্ষেপ তথাপিও সংশ্লি­ষ্ট ব্যক্তিবর্গের কর্মতৎপরতা ততটা সন্তোষজনক নয়। বিগত মৌসুমগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, আমের ক্ষেত্রে কন্ট্রান্ট ফামিং নিয়ে কৃষকের কাছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ আসেন জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে। যে সময়ে বাগান ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রায় সম্পন্ন হয়ে যায়। এরপর এক শ্রেণীর ব্যক্তিবর্গ শুধুই ভুল খুঁজে পান আমচাষিদের কিন্তু শোধরানোর কোন পথ তাদের জানা নেই। আসলে এ দোষ কি আমচাষিদের? কন্ট্রান্ট ফামিংয়ের ধারণা থেকে বুঝা যায়, ফল বা সবজি উৎপাদনের শুরু থেকে সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত চাষিদের প্রথমেই ধারণা দেয়া হবে। এরপর চাষিরা সে নিয়মনীতিগুলো সঠিকভাবে মেনে চলার চেষ্ঠা করবেন। সংশ্লি­ষ্ট ব্যক্তিবর্গ উৎপাদনের বিভিন্ন সময় মনিটরিং করবেন এবং পরামর্শ দেয়ার থাকলে তা সে সময়ে চাষিকে অবহিত করবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় এর উল্টোটা। আমরা বেশিরভাগ সময়েই মনিটরিং নিয়ে ব্যস্ত থাকি যেটি মোটেই কাম্য নয়। প্রথমবারের মতো কন্ট্রান্ট ফামিংয়ের মাধ্যমে উৎপাদিত আম বিদেশের বাজারে রপ্তানি করা হয়। মেহেরপুর, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার প্রায় শতভাগ ব্যাগিং প্রযুক্তিতে উৎপাদিত আম রপ্তানি হয়। প্রথমে রপ্তানিকারকদের চাহিদা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানানো হয়, পরে চুক্তিভিত্তিক চাষির কাছ থেকে নির্দিষ্ট স্থানে আমগুলো নিয়ে আসা হয়। পরে সেখান থেকে সর্টিং, গ্রেডিং শেষে মনোরম প্যাকেটে প্যাকিং করা হয়। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, এদেশে আম উৎপাদনকারী অঞ্চলে আমের কোনো আধুনিক প্যাকিং হাউস নেই। যেসব জায়গায় বেশি পরিমাণে গুণগত মানসম্পন্ন আম উৎপাদিত হয় সেসব স্থানে প্যাকিং হাউস নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি বলে। আশাকরি, রপ্তানি সংশ্লি­ষ্ট ব্যক্তিবর্গ বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে কার্যকরী পদক্ষেপ সময়মতো নেবেন যার ফলাফল আমরা আগামী মৌসুমে দেখতে পাব। সুতরাং কন্ট্রান্ট ফার্মিংয়ের চাষিরা আম উৎপাদনের উত্তম ফসল ব্যবস্থাপনার (প্রুনিং, ট্রেনিং, সার ব্যবস্থাপনা, সেচ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব বালাই ব্যবস্থাপনা) সাথে ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে খুব সহজেই রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন করতে পারবেন।
একটি কথা মনে রাখতে হবে, রপ্তানি একটি দেশের জন্য অত্যন্ত সম্মানের বিষয়, কারও কোনো অসাধু তৎপরতাই যেন এটি বন্ধ না হয় সেই বিষয়ে সবাইকে আন্তরিক হতে হবে। এখানে ব্যক্তিগত স্বার্থ পরিহার করে দেশের স্বার্থকে প্রধান্য দিতে হবে। তবেই আমাদের দেশের আম রপ্তানির ধারা অব্যাহত থাকবে। নিরাপদ, বিষমুক্ত ও রপ্তানিযোগ্য আমের উৎপাদন সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য যোগাযোগ করতে পারবেন এ ঠিকানায় sorofu@yahoo.com

ড. মো. শরফ উদ্দিন*
*ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, চাঁপাইনবাবগঞ্জ


Share with :

Facebook Facebook