কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

রফতানি বৃদ্ধিতে মানসম্পন্ন ফলের উৎপাদন নিশ্চিতকরণ (গত সংখ্যার পর)

ফলগাছের দৈহিক কাঠামোকে সুগঠিত করা, আকার আকৃতি নিয়ন্ত্রণ করা, নতুন অঙ্গজ বৃদ্ধিকরণ, পুষ্পায়ন ও ফলধারণে গাছের অপ্রয়োজনীয় মূল, শাখা, প্রশাখা ও পাতা ছাঁটাই করা প্রয়োজন। ছাঁটাইকরণ সাধারণত গাছের জাত, বয়স, তেজ, ফুল ধারণ ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে। ছাঁটাইকরণের প্রভাব বিভিন্ন গাছে বিভিন্ন ধরনের হয়। আমগাছ ছাঁটাই করলে একান্তর ক্রমিক ফলধরা সমস্যা অনেকাংশে কমে যায় এবং ফলন বৃদ্ধি পায়। কুলগাছ পত্রপতনশীল বৃক্ষ হওয়ায়, ডালপালা ছাঁটাইকরণ নিয়মিত প্রয়োজন। ফল সংগ্রহের পর যখন পাতা ঝরে যায়, তখন (এপ্রিল-মে) কুলগাছ ছাঁটাইয়ের উত্তম সময়। ছাঁটাইয়ের ফলে বিকশিত শাখা প্রশাখায় ফুলফল বেশি ধরে। এখানে উল্লেখ্য যে, লিচু, পেয়ারা, লেবু প্রভৃতি ফলদ গাছ নিয়মিত ছাঁটাই করলে ফলের ফলন ও গুণগতমান বৃদ্ধি পায় অথচ ফলচাষিরা ছাঁটাই না করে গাছকে বাড়তে দেয়ায় গাছ একটা ঝোপে পরিণত হয় এবং গাছের কেন্দ্রে আলো বাতাস ভালোভাবে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে ভেতরের পাতা খাদ্য তৈরি করতে পারে না বিধায় গাছের ফলন ও মান অনেক কমে যায়। এ ছাড়া তা পোকামাকড়ের আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। ফলচাষিদের ছাঁটাইকরণের কলাকৌশল ও উপকারিতা সম্পর্কে সচেতন করে ফলন ও গুণগত মানবৃদ্ধি করা সম্ভব।

সঠিক সার ব্যবস্থাপনা
উচ্চফলনশীল জাত চাষে প্রচুর পরিমাণে ভারসাম্যপূর্ণ সারের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমাদের দেশের কৃষকরা ফলগাছে সাধারণত কোনো প্রকার সারই ব্যবহার করেন না অথবা করলেও প্রয়োজনীয় পরিমাণে করেন না। এ কারণে ফলগাছের পুষ্টি জোগানে ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয় এবং ক্রমাগত এ অবস্থা চলতে থাকায় মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমে যায়, যার বিরূপ প্রতিক্রিয়া এরই মধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে। অথচ গাছের সুষম বৃদ্ধির জন্য সময়মতো সঠিক মাত্রায় সার ব্যবহার করতে হয়। ফল গাছের প্রজাতি ও জাত লাগানোর স্থানের মাটির উর্বরতার কারণে একই গাছের সারের মাত্রা তারতম্য হতে পারে। গাছের বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সার প্রয়োগের মাত্রা ভিন্নতর হয়। ফল গাছের প্রজাতি, জাত, বয়স ও মাটির উর্বরতার ওপর ভিত্তি করে অনুমোদিত সার দুই ভাগে প্রয়োগ করতে হবে। প্রথমবার বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে এবং দ্বিতীয়বার আশ্বিন মাসের শেষের দিকে প্রয়োগ করতে হবে। সাধারণত গাছের বয়স অনুসারে গোড়া থেকে ০.৫ থেকে ১.০ মিটার দূরত্বে সার প্রয়োগ করতে হয়। সঠিক সার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফলগাছের ফলন প্রচুর পরিমাণে বাড়ানো সম্ভব। কাজেই ফলন বৃদ্ধির জন্য সঠিক সময়ে পরিমাণমত সার প্রয়োগের জন্য ফলচাষিদের নিয়মিত পরামর্শ দিতে হবে।


প্রয়োজনীয় পানি সেচ ও নিষ্কাশনের ব্যবস্থাকরণ
ফলগাছে প্রয়োজনীয় সেচের অভাবে ফুল ও ফল ঝরে যায়। খরা মৌসুমে ফলের প্রজাতি, মাটির গুণাগুণ ও আবহাওয়ার তারতম্য অনুসারে পানি সেচের প্রয়োজন এবং পরিমাণ ভিন্নতর হয়। চারা গাছে বেলে মাটিতে সপ্তাহে ২ থেকে ৩ বার এবং বেলে-দো-আঁশ মাটিতে ১ থেকে ২ বার সেচ দিতে হবে। ফল ধারণের পর নিয়মিত সেচ দিলে গুণগত মানসম্পন্ন ফলের ফলন বেড়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, আমের মুকুল পূর্ণ ফোটা পর্যায়ে একবার এবং ফল মটরদানার আকৃতি ধারণ পর্যায়ে আর একবার, মোট দুইবার রূপান্তরিত বেসিন পদ্ধতিতে সেচ প্রয়োগ করলে অধিক মাত্রায় মানসম্পন্ন আম সংগ্রহ করা যায়। আবার বর্ষাকালে সেচের প্রয়োজন হয় না। তবে জলাবদ্ধতা থেকে গাছকে রক্ষার জন্য পানি সুনিষ্কাশনের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। এছাড়াও সেচের উপযুক্ত সময়টাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যেমন আমে মুকুল হওয়ার আগে বৃষ্টিপাত বা পানি সেচ উভয়ই ক্ষতিকর এবং সেক্ষেত্রে কোনো কোনো সময় মুকুল না হয়ে তা সবুজ পাতায় পরিণত হয়। কাজেই ফলচাষিদের সেচ ও নিষ্কাশনের উপকারিতা সম্পর্কে অবহিত এবং প্রয়োগের মাধ্যমে গুণগত মানসম্পন্ন ফলের ফলন বৃদ্ধি করা সম্ভব।

 

সময়মতো রোগ ও পোকামাকড় দমন
রোগবালাই ও পোকামাকড় গাছের স্বাভাবিক জীবন চক্রে ব্যাঘাত ঘটায়। ফলগাছে বিভিন্ন বয়সে নানা ধরনের রোগবালাই ও পোকামাকড় দেখা যায়। তবে মানসম্পন্ন ফলের ফলন খুবই কম হওয়ার জন্য যেসব বিষয় দায়ী তাদের মধ্যে অন্যতম হলো পোকামাকড়ের আক্রমণ। উদাহরণস্বরূপ, আমের হপার পোকা আমের মুকুল শতকরা ১০০ ভাগ ধ্বংস করতে সক্ষম। কাজেই গুণগত মানসম্পন্ন ফলের ফলন বৃদ্ধির জন্য সময়মতো কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করার পাশাপাশি সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন করতে হবে। এজন্য একদিকে যেমন কৃষকদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান দান করতে হবে অন্যদিকে সময়মতো স্বল্পমূল্যে প্রয়োজনীয় উপকরণের সরবরাহ বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণে নিশ্চিত করতে হবে।


আগাছা দমন
গাছের চারিদিকে যেসব আগাছা থাকে সেগুলো তুলে ফেলা প্রয়োজন। কারণ এরা গাছের খাদ্য ও পানি গ্রহণে অংশীদার হয় বিধায় গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করে এবং ফলন কমে যায়। বিভিন্ন নিরাপদ আগাছানাশক সহজ লভ্য করতে হবে।


গাছের ফুল ছাঁটাইকরণ
কলমের গাছ যে বছর লাগানো হয় সে বছর হতেই অনেক গাছে ফুল আসে কিংবা পূর্ণ বৃদ্ধি প্রাপ্ত হওয়ার পূর্বেই কিছু কিছু গাছে ফুল ধরতে দেখা যায়। এ ফুলগুলো যদি না ভেঙে দেয়া হয় তবে তাতে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এর ফলে গাছের শক্ত মজবুত কাঠামো তৈরি ব্যাহত হয় এবং আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায় না। এজন্য কলমের গাছ পূর্ণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়ার আগে ফুল এলে তা ভেঙে দিতে হবে এবং গাছ পূর্ণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়ার পরই ফুল ও ফল ধরতে দেয়া উচিত।


ফল পাতলাকরণ
বেশ কিছু ফল গাছে ফল পাতলাকরণ একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ফল পাতলা না করলে গাছ ভেঙে যাবে এবং মরেও যেতে পারে। কাজী পেয়ারার প্রতি ৫০টা পাতার জন্য একটা ফল রাখতে হবে অথবা ফল যখন মার্বেল আকারের হবে তখন কমপক্ষে শতকরা ৫০ ভাগ ফল ছাঁটাই করতে হবে। প্রতিটি থোকায় একটার বেশি ফল রাখা কোনো ক্রমেই উচিত নয়। অন্যদিকে পেঁপে গাছের প্রতিটা পত্রকক্ষে একটা ফল রাখাই উত্তম। কেননা জড়াজড়ি করে থাকার কারণে কিছুসংখ্যক ফলের আকৃতি স্বাভাবিক থাকে না। ফল পাতলাকরণের মাধ্যমে আকর্ষণীয় আকারের ফল পাওয়া যাবে এবং গাছটাও ভালো থাকবে।


ফল ঢেকে (ব্যাগিং) দেয়া
ব্যাগিংয়ের মাধ্যমে ফলকে পোকামাকড়, সূর্যকিরণ, ধুলাবালি, পাখি ইত্যাদি হতে রক্ষা করা যায় এবং ফলের আকার বড় ও রঙ আকর্ষণীয় হয়। ব্যাগিং ফল পাকার দেড় মাস পূর্বেই করতে হয় তবে তা ফলের প্রজাতি অনুযায়ী ভিন্নতর হবে। ব্যাগিং বাদামি কাগজ বা নীল পলিথিন বা বাটার পেপার দিয়ে করা যেতে পারে। পলিথিন দিয়ে ব্যাগিং করলে পলিথিনের গায়ে ছোট ছোট বেশ কিছু ছিদ্র করে দিতে হবে। ব্যাগিং সম্পর্কে চাষিদের জ্ঞান দান ও তা প্রয়োগের মাধ্যমে উন্নত গুণাগুণসম্পন্ন ফল উৎপাদন সম্ভব।


ফল সংগ্রহ ও সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা
ফল একটি পচনশীল দ্রব্য। উপযুক্ত পর্যায়ে ও সুষ্ঠুভাবে ফল সংগ্রহের ওপর ফলের পরিপক্বতা, গুণাগুণ ও সংরক্ষণ ক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভরশীল। অপরিণত অবস্থায় ফল সংগ্রহ করলে অম্লতার পরিমাণ বাড়ে এবং প্রকৃত স্বাদ ও গন্ধ পাওয়া যায় না। অপরপক্ষে বেশি পাকা অবস্থায় ফল সংগ্রহ করলে পোকা ও রোগজীবাণুর সংক্রমণ বেশি হয়, সংরক্ষণ ক্ষমতা কমে যায় এবং দূরবর্তী স্থানে পরিবহনে সমস্যার সৃষ্টি হয়। তাই ফল পূর্ণতা প্রাপ্তির লক্ষণ দেখে সঠিক সময়ে সংগ্রহ করতে হবে।


সঠিক পদ্ধতিতে ফল সংগ্রহের অভাবে এর সংগ্রহোত্তর অপচয় বেশি হয়ে থাকে। আঘাত ও চাপ প্রাপ্তিতে ফলের সংরক্ষণশীলতা ও আহারোপযোগিতা কমে যায়। সঠিক পদ্ধতিতে যত্ন সহকারে ফল সংগ্রহ করা প্রয়োজন যেন ফলে কোনো আঘাত না লাগে বা ক্ষত সৃষ্টি না হয়। গাছের নিচে সাময়িকভাবে রাখতে হলেও খড় বিছিয়ে তার ওপর ফল রাখা উচিত। ফল সংগ্রহের পর সঠিকভাবে বাছাই, শ্রেণীবিন্যাস, মোড়কীকরণ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহনের ব্যবস্থাকরণ আবশ্যক।


মানসম্পন্ন ফল উৎপাদন প্রযুক্তি
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র থেকে ফলের বেশ কিছু উৎপাদন কলাকৌশল উদ্ভাবন করা হয়েছে। উদ্ভাবিত উৎপাদন কলাকৌশলগুলোর মধ্য থেকে কিছু উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তি নিম্নে উল্লেখ করা হলো-
হরমোন প্রয়োগ করে সারা বছর আনারস উৎপাদন : অমৌসুমে আনারস উৎপাদনের জন্য ৯ থেকে ১৩ মাস বয়সী গাছে ইথরেল (৩৯% সক্রিয় অংশ) ৫০০ পিপিএম (১.৩ মিলি/লিটার পানিতে) প্রয়োগ করার সুপারিশ করা হয়েছে।


আমের হপার পোকা এবং অ্যানথ্রাকনোজ ও পাউডারি মিলডিউ রোগ দমন : আম গাছে ফুল আসার পর তা ফোঁটার পূর্বে একবার এবং ফল মটর দানার সমান হলে আর একবার সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের যে কোন কীটনাশক এবং টিল্ট নামক ছত্রাকনাশক একত্রে স্প্রে করে আমকে পোকা (ম্যাংগো হপার) এবং রোগের (অ্যানথ্রাকনোজ ও পাউডারি মিলডিউ) আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করার প্রযুক্তি অনুমোদন করা হয়েছে।


আমের সেচ প্রয়োগ পদ্ধতি : মডিফাইড বেসিন পদ্ধতিতে ফুল ফোঁটা অবস্থায় একবার এবং ফল মটর দানার সমান হলে আর একবার সেচ প্রদানের মাধ্যমে আমের ফল ঝরা বন্ধ করে গুণগতমানসম্পন্ন ফলন বৃদ্ধি করা সম্ভব।


পেয়ারার ফল ছাঁটাইকরণ : পেয়ারা গাছকে দীর্ঘদিন ফলবান রাখতে ও মানসম্পন্ন ফল উৎপাদন করার জন্য ফল ছোট থাকা অবস্থায় অর্থাৎ মার্বেল আকৃতি হলেই কমপক্ষে শতকরা ৫০ ভাগ ফল ছাঁটাই অনুমোদন করা হয়েছে।


ব্যাগিংয়ের মাধ্যমে কলার বিটল পোকা দমন : ছিদ্রযুক্ত পলিথিন দিয়ে কলার কাদি (bunch) ব্যাগিং করে কলার বিটল পোকা দমন করার পদ্ধতি অনুমোদন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে মোচা থেকে কলা বের হওয়ার আগেই কাদির গায়ে বড় আকারের দুইমুখ খোলা বিশিষ্ট ছিদ্রযুক্ত পলিথিন ব্যাগের এক মুখ দিয়ে মোচাকে আবৃত করে কাদির সাথে আলতোভাবে বেধে দিতে হয় এবং নিচের দিকের মুখ খোলাই থাকে। কাদি সম্পূর্ণ বের হওয়ার একমাস পর ইচ্ছা করলে পলিথিন খুলে ফেলা যায়। তবে ফিলিপাইনের দাবাউ (Davao)  এর কলাচাষিরা সারা বছরই কাদিতে ছিদ্রযুক্ত পলিথিন রেখে দেয়।


মানসম্পন্ন পেয়ারা উৎপাদন কৌশল : পেয়ারা ছোট অবস্থায় (মার্বেল আকার) বাদামিকাগজ বা ছিদ্রযুক্ত পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিয়ে বড় এবং আকর্ষণীয় রঙ এর মানসম্পন্ন পেয়ারা উৎপাদনের কৌশল অনুমোদন করা হয়েছে।


গরম পানিতে আম শোধন : গাছ থেকে আম সংগ্রহের পর পরই ৫৫ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রার গরম পানিতে ৫ মিনিট ডুবিয়ে শোধনের মাধ্যমে বোঁটা পচা ও অ্যানথ্রাকনোজ রোগ দমন করে আমের সংরক্ষণকাল অতিরিক্ত প্রায় দুই সপ্তাহে বাড়ানো যায় এবং সংগ্রহোত্তর অপচয় রোধ করা সম্ভব।


ফল ছিদ্রকারী পোকা দমন : ফলের ভোমরা পোকা (ফ্রুট-উইভিল/বোরার) এর আক্রমণে আম, কাঁঠাল, লিচু, ডালিম, কুল প্রভৃতি ফল আক্রান্ত হয়ে থাকে। এসব পোকায় আক্রান্ত ফল খাওয়ার উপযোগী থাকে না। আক্রান্ত ফল পোকাসহ নষ্ট করতে হবে। ফলের বাগান পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। সুমিথিয়ন ৫০ ইসি বা লিবাসিড ৫০ ইসি ২ মিলিলিটার হারে প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রতি ১৫ দিন পর পর ২ থকে ৩ বার প্রয়োগ করতে হবে।


ফলের মাছি পোকা দমন : ফলের মাছি পোকা আম, পেয়ারা, কুল প্রভৃতি ফল আক্রমণ করে ক্ষতি করে থাকে। আক্রান্ত ফল কাটলে তার মধ্যে অসংখ্য কীড়া দেখা যায় এবং ফল খাওয়ার অযোগ্য হয়ে যায়। গাছের নিচে পড়ে থাকা ও আক্রান্ত ফল সংগ্রহ করে মাটির নিচে পুঁতে বা পুড়িয়ে ধ্বংস করতে হবে। অতিরিক্ত পাকার আগে ফল সংগ্রহ করতে হবে। বাদামি কাগজ বা ছিদ্রযুক্ত পলিথিন বা বাটার পেপার দিয়ে ফল ব্যাগিং অথবা ফেরোমন ট্র্যাপ ব্যবহার করতে হবে।


অ্যানথ্রাকনোজ রোগ দমন : অ্যানথ্রাকনোজ রোগের আক্রমণে ফল গাছের পাতা, কা-, মুকুল ও ফলে ধূসর বাদামি রঙের দাগ পড়ে। এ রোগে আক্রান্ত মুকুল ঝরে যায়, ফলের গায়ে কালচে দাগ হয় এবং ফল পচে যায়। এ রোগে আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, ডালিম প্রভৃতি ফল আক্রান্ত হয়ে থাকে। গাছের নিচে ঝরে পড়া পাতা ও ফল সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। গাছে মুকুল আসার পর কিন্তু ফুল ফোঁটার প্রতি লিটার পানিতে টিল্ট ২৫০ ইসি ০.৫ মিলিলিটার অথবা টপসিন এম নামক ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।


পাউডারি মিলডিউ রোগ দমন : পাউডারি মিলডিউ আম ও কুলের একটি মারাত্মক রোগ। এ রোগের আক্রমণে মুকুলে সাদা পাউডারের মতো আবরণ দেখা যায়। আক্রান্ত ফুল ও ফল গাছ হতে ঝরে পরে। আর্দ্র আবহাওয়ায় বিশেষ করে মেঘাছন্ন অবস্থায় এ রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে। গাছে মুকুল আসার পর একবার এবং ফল মটরদানা আকারের হলে আর একবার থিওভিট প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম অথবা টিল্ট ২৫০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলিলিটার মিশিয়ে ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে।  


লেবুর ক্যাংকার রোগ দমন : এ রোগের আক্রমণে লেবু গাছের কচি পাতা, শাখা ও ফলে ধূসর বা বাদামি রঙের গুটি বসন্তের মতো দাগ পড়ে। আক্রান্ত ডগা ও শাখা ছাঁটাই করতে হবে এবং কাটা অংশে বর্দোপেস্টের (১০%) প্রলেপ দিতে হবে। বর্ষা শুরুর আগে এবং পরে বর্দো মিশ্রণ বা অনুমোদিত ছত্রাকনাশক যেমন- রিডোমিল এম-জেড বা ব্যাভিস্টিন প্রতি লিটার পানির সাথে ২ গ্রাম হারে এবং টিল্ট ২৫০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি লিটার মিশিয়ে ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে। সোডিয়াম অর্থো-ফিনাইল ফিনেট ২.৩% দ্রবণে লেবু পরিশোধনের মাধ্যমে লেবু ক্যাংকার মুক্ত করার প্রযুক্তি বিএআরআই-হর্টেক্স ফাউন্ডেশন কর্তৃক রপ্তানির জন্য অনুমোদন করা হয়েছে।
 

সুপারিশমালা
ক্রমপরিবর্তনশীল বিশ্ব প্রতিযোগিতামূলক রফতানিবাজার এবং বিশ্বায়নের উদীয়মান ও সম্ভাবনাময় বিশেষ করে
niche market এর সুযোগগুলোকে কাজে লাগিয়ে ফল রফতানি বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে নিম্নবর্ণিত সুপারিশমালা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে :
 

গুণগতমানসম্পন্ন ফল রফতানির উন্নয়নসাধন কল্পে হর্টেক্স ফাউন্ডেশনসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক ও কারিগরিভাবে শক্তিশালীকরণ করা দ্রুত প্রয়োজন।
বর্তমান বাজারজাতকরণ ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করে চুক্তিবদ্ধ-দলীয়-সমবায় চাষ পদ্ধতিতে উত্তম কৃষি পদ্ধতি অনুসরণপূর্বক নির্দিষ্ট জোগান চেইন তৈরি করে উৎপাদিত পণ্যের গুণগতমান নিশ্চিত করে রফতানির লক্ষ্যে সরাসরি খামার থেকে বাজারে বিপণন ব্যবস্থা প্রতিস্থাপন করা প্রয়োজন।


আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদানুযায়ী বাংলাদেশের আবহাওয়ায় উৎপাদন উপযোগী জাত নির্বাচন করে এর সার্বিক মান উন্নয়নে বাস্তব এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। রফতানি উপযোগী জাতগুলোর উন্নত উৎপাদন কলাকৌশল, সংগ্রহ ও সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা, মোড়কীকরণ ও সংরক্ষণ প্রযুক্তিবিষয়ক গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।


বিশ্ববাজারের চাহিদা মোতাবেক ফলের গুণগতমান উন্নয়নের লক্ষ্যে ফল উৎপাদক, রফতানিকারক ও জোগান চেইনের অন্যান্য ব্যক্তিদের আধুনিক উৎপাদন কলাকৌশল, সংগ্রহকরণ, সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মোড়কীকরণের ওপর বাস্তবসম্মত প্রশিক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
উৎপাদন এলাকায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্যাক হাউজ স্থাপন, সার্বক্ষণিক পরিবীক্ষণ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যানবাহন ব্যবহার এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
রফতানির জন্য ফল পরিবহনে বিভিন্ন এয়ারলাইন্স এবং মালামাল বহনকারী কার্গো বিমানে পর্যাপ্ত স্থানের নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।
ফল রফতানি খাতকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং ব্যবহারের ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে।
রফতানি উপযোগী নিরাপদ ফল উৎপাদন ও সুষ্ঠু বিপণনের জন্য ট্রেসাবিলিটি
(Traceabilit) ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

 

ড. মো. আবদুল জলিল ভূঁঞা*
মিটুল কুমার সাহা**

* ব্যবস্থাপনা পরিচালক, **সহকারী মহাব্যবস্থাপক, হর্টেক্স ফাউন্ডেশন, সেচ ভবন (৪র্থ তলা), ২২ মানিক মিয়া এভিনিউ, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা-১২০৭

 


Share with :

Facebook Facebook