কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

প্রাণিসম্পদের উন্নয়ন ও আধুনিক প্রযুক্তি

কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান উল্লেখযোগ্য। স্থির মূল্যে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ছিল ১.৮৭% এবং প্রবৃদ্ধির হার ২.৮৩%। মোট কৃষিজ জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান প্রায় ১৪.০৮%। তাছাড়া ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রাণিসম্পদ খাতে উৎপাদিত কাঁচা ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য রফতানি আয় ছিল প্রায় ৯০৬০.৬৯ কোটি টাকা (সূত্র : এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো, ২০১৩-১৪)। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০% সরকারি এবং ৫০% পরোক্ষভাবে প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর নির্ভরশীল। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের ভিশন হচ্ছে দেশে দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আমিষের চাহিদা পূরণপূর্বক মেধাবী, স্বাস্থ্যবান ও বুদ্ধিদীপ্ত জাতি গঠন করা। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর আধুনিক-লাগসই প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সম্প্রসারণ সম্পর্কিত কাজ করে যাচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে সম্পাদিত প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন কার্যাবলি ও সাফল্যগুলো নিম্নে উপস্থাপন করা হলো।  
 

১. দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদন ও জনপ্রতি প্রাপ্যতা বৃদ্ধি
দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদন এবং জনপ্রতি প্রাপ্যতা বৃদ্ধির জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদফতর নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। বিগত ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদন ছিল যথাক্রমে ২২.৭০ লাখ মেট্রিক টন, ১১.৩০ লাখ মেট্রিক টন, ৫৪২.২০ কোটি টি। বর্তমান সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং ভিশন ২০২১ এর আলোকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং প্রাণিসম্পদ অধিদফতর কর্তৃক কার্যকরী ও ফলপ্রসূ ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে বিগত ২০১৩-১৪ অর্থবছর শেষে দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদন বেড়ে যথাক্রমে ৬০.৯০ লাখ মেট্রিক টন, ৪৫.২০ লাখ মেট্রিক টন ও ১০১৬.৮০ কোটিতে উন্নীত হয়েছে।

 

২. দারিদ্র্যবিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরাসরি গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সাথে দেশের প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। দারিদ্র্যবিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রাণিসম্পদ বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। প্রাণিসম্পদ অধিদফতর লাখ লাখ বেকার যুবক, যুব মহিলা, ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষককে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালনে সম্পৃক্ত করে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্যবিমোচনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিগত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর কর্তৃক মোট ১০.১৫ লাখ জন (বেকার যুবক, যুব মহিলা, দুস্থ মহিলা, ভূমিহীন ও প্রান্তিক) কৃষককে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালনে প্রশিক্ষণ প্রদান করে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্ব ঘোঁচানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া নতুন উদ্যোক্তা উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে, যা বাস্তবায়ন হলে বেসরকারি পর্যায়ে প্রাণিসম্পদের ব্যাপক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ফলে দেশে কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য হ্রাসকরণে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে।

 

৩. প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে আধুনিক পদ্ধতিতে পালন, ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তির সম্প্রসারণ
ক. স্বাস্থ্যসম্মত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজাকরণ
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে লাভজনকভাবে মাংস উৎপাদনকে লক্ষ রেখে গরু মোটাতাজাকরণ প্যাকেজ প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে। এর ফলে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গরু নির্বাচন, কৃমিমুক্তকরণ, পুষ্টি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাত্র ৪ থেকে ৬ মাসের মধ্যে অধিক মাংসবিশিষ্ট গরু বাজারজাত করে খামারিরা অধিক লাভবান হচ্ছেন।

 

খ. ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য বাণিজ্যিক লেয়ার ও ব্রয়লার পালন মডেল
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের সহায়তায় ক্ষুদ্র খামারি পর্যায়ে বাণিজ্যিক লেয়ার ও ব্রয়লার পালন মডেল অনুযায়ী মুরগি পালন করে পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণসহ অর্থনৈতিক লাভবান হচ্ছে। এছাড়াও অধিদফতর কর্তৃক বিভিন্ন সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে গত এক দশকে পোলট্রি সেক্টরে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে। বর্তমানে দৈনিক ১৪০০ মেট্রিক টন মুরগির মাংস ও ১ কোটি ৫০ লাখ পিস ডিম বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হচ্ছে যা অভ্যন্তরীণ চাহিদার ১০০% পূরণ করার জন্য যথেষ্ট (সূত্র : সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ, সিপিডি)।

গ. স্ল্যাট-স্টল পদ্ধতিতে ছাগল পালন
বাংলাদেশে সাধারণত উন্মুক্ত অবস্থায় ছাগল পালন করা হয়ে থাকে এবং ছাগলের জন্য বিশেষ কোনো ঘর তৈরি করা হয় না। এর ফলে ছাগল প্রায়শই নিউমোনিয়া ও বিভিন্ন প্যারাসাইটিক রোগে আক্রান্ত হয়, ফলে উৎপাদন মারাত্মক হারে ব্যাহত হয়। এসব সমস্যা রোধে এবং উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিজ্ঞানভিত্তিক সø্যাট পদ্ধতিতে বাসস্থান ও সম্পূর্ণ আবদ্ধাবস্থায় স্টলফিডিং প্রযুক্তির সম্প্রসারণে অধিদফতর কাজ করে যাচ্ছে।

 

ঘ. গ্রামীণ পরিবেশে হাঁস পালন প্রযুক্তি
নদীমাতৃক কৃষিনির্ভর এ দেশে প্রাচীনকাল থেকেই পারিবারিকভাবে হাঁস পালন হয়ে আসছে। তবে বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তিতে বছরব্যাপী আবদ্ধ বা অর্ধআবদ্ধ অবস্থায় উন্নত জাতের খাকি ক্যাম্পবেল, জিন্ডিং, ইন্ডিয়ান রানার প্রভৃতি হাঁস আদর্শ ব্রুডিং ও সুষম খাদ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পালনে অধিক লাভবান হওয়া সম্ভব। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে পালিত হাঁস মাত্র ১৮ থেকে ২০ সপ্তাহ থেকে ডিম পাড়া আরম্ভ করে এবং গড়ে বছরে ২৫০ থেকে ৩০০টি ডিম পাওয়া যায়।


ঙ. পারিবারিক পর্যায়ে কোয়েল-ককরেল- খরগোশ পালন প্রযুক্তি
জনবহুল এ দেশের খাদ্য ও পুষ্টি ঘাটতি মেটাতে প্রয়োজন খাদ্যের বৈচিত্র্যময়তা। এ লক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ খাতে নতুন সংযোজন হয়েছে খরগোশ, ককরেল এবং কোয়েল পালন। দ্রুত বর্ধনশীল, স্বল্প পুঁজি ও অধিক লাভজনক হওয়ায় এ সেক্টর দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে।

 

৪. প্রাণিসম্পদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খাদ্য ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ
গবাদিপশু ও পাখি পালনে অন্যতম বড় সমস্যা হলো পশু খাদ্যের অপ্রতুলতা। ফলে পশুখাদ্যের বিকল্প অনুসন্ধান ও পুষ্টিগুণ বৃদ্ধি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রকৃতির ভাণ্ডারের কিছু সম্ভাবনাময় খাদ্য যা নির্দিষ্ট কিছু প্রযুক্তি ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। নিম্নে তা উপস্থাপিত হলো-

 

ক. ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র (ইউ. এম. এস)
ইউ. এম. এস ইউরিয়া, মোলাসেস এবং খড় (স্ট্র) এর একটি মিশ্রিত খাবার যা গরুকে প্রতিদিন শুকনা খড়ের পরিবর্তে চাহিদা মতো খাওয়ালে বাড়ন্ত ষাঁড়ের ক্ষেত্রে দৈনিক ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজন বৃদ্ধি পায় এবং গাভীর ক্ষেত্রে দৈনিক ১.০ থেকে ১.৫ কেজি দানাদার খাদ্য কম প্রদান করেও ১.৫ থেকে ২.০ লিটার দুধ বেশি পাওয়া যায়। এটিতে খড়, ইউরিয়া এবং মোলাসেসের অনুপাত যথাক্রমে ৮২ঃ৩ঃ১৫।

 

খ. গোখাদ্য হিসেবে অ্যালজি উৎপাদন ও ব্যবহার
ক্লোরেলা ও সিনেডেসমাস প্রজাতির অ্যালজি অধিক প্রোটিন ও ভিটামিন সমৃদ্ধ পশুখাদ্য বিধায় আমিষ জাতীয় খাদ্য যেমন- খৈল, ফিশ মিল প্রভৃতি এমনকি কাঁচা ঘাসের পরিবর্তে অ্যালজি পানি ব্যবহার লাভজনক। ১০ বর্গমিটার আয়তনবিশিষ্ট কৃত্রিম পুকুরে ১৫ থেকে ২০ লিটার পরিমাণ অ্যালজির বীজ, ১০০ গ্রাম ডালের ভুসি ভেজানো, ১ লিটার পানি, প্রতিদিন ২ থেকে ৩ গ্রাম ইউরিয়া ও ২০০ লিটার টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লিটার অ্যালজির পানি উৎপাদন করা যায়। এ পানি গরু-ছাগলকে সাধারণ পানির পরিবর্তে বা খড়, ভুসি ইত্যাদির সাথে মিশিয়েও খাওয়ানো যায়।  

 

গ. সাইলেজ পদ্ধতিতে সবুজ ঘাস সংরক্ষণ
বর্ষা মৌসুমে অথবা যখন ঘাস উদ্বৃত্ত থাকে তখন সাইলেজ পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ বায়ুনিরোধক অবস্থায় সবুজ ঘাস সংরক্ষণ করা যায়। এর ফলে শুকনো-খরা মৌসুমের জন্য কাঁচা ঘাস যেমন জমা থাকে তেমনি ঘাসের পুষ্টিগুণও বৃদ্ধি পায়। উঁচু জায়গায় ৩ থেকে ৪ ফুট গভীরতা বিশিষ্ট কোনাবিহীন গোলাকার গর্তে পলিথিন এমনভাবে বিছাতে হবে যেন সাইলেজকে পুরোপুরি মুড়িয়ে পানি রোধক করা যায়। অতঃপর সবুজ ঘাস ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি পরিমাণ করে কেটে গর্তে এঁটে সাজাতে হবে। ঘাসে পানির পরিমাণ বিবেচনা করে ৫ থেকে ১০% শুকনো খড় পড়তে পড়তে সাজাতে হবে এবং ৩ থেকে ৪% চিটাগুড় ১ঃ১ অনুপাতে পানির সাথে মিশিয়ে প্রতি পরতে ছিটিয়ে দিতে হবে। এভাবে উপরে ৪ থেকে ৫ ফুট পর্যন্ত ঘাস সাজিয়ে খড় দ্বারা পুরু আস্তরণে ঢেকে পলিথিন দিয়ে ভালোভাবে মুড়িয়ে এর উপরে ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি পুরু করে মাটি লেপে দিতে হবে। শুষ্ক মৌসুমে গো-খাদ্যের অভাব হলে প্রতি ১০০ কেজি ওজনের জন্য ১০ কেজি সাইলেজ দৈনিক ব্যবহার করে গোখাদ্য সমস্যা কিছুটা হলেও মেটানো সম্ভব।


ঘ. গোখাদ্য হিসেবে কলাগাছের সংরক্ষণ ও ব্যবহার
প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে কলা উৎপাদিত হলেও কলাগাছের খুব নগণ্য অংশই গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সারা বছরের মাঝে বর্ষা মৌসুমেই কলা উৎপাদনের পরিমাণ বেশি হওয়ায় কলাগাছ বৃষ্টির কারণে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে গোখাদ্য হিসেবে এর উপযোগিতা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি হওয়ায় সাইলেজ পদ্ধতিতে ‘কলাগাছ সংরক্ষণ ও ব্যবহার’ প্রযুক্তিটি গোখাদ্য সমস্যা সমাধানে নতুন দিক উন্মোচন করেছে।

 

৫. প্রাণিসম্পদের চিকিৎসা উন্নয়নে প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ
* গবাদিপশুর কৃমিরোগ দমন মডেল
* পিপিআর রোগের সমন্বিত চিকিৎসা
*
ELISA ভিত্তিক ক্ষুরারোগ নির্ণয় পদ্ধতি
* পিপিআর ও রিন্ডারপেস্ট রোগ নির্ণয়ে ঊওঝঅ পদ্ধতি
* বাণিজ্যিক খামারে মুরগির জৈব নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা
* পিপিআর ও সালমোনেলা ভ্যাকসিন উদ্ভাবন ও ব্যবহার ইত্যাদি।

 

এছাড়াও অধিদফতরের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দফতর এবং জেলা প্রাণি হাসপাতালগুলো থেকে কৃষক ও খামারিদের রুগ্ণ গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির চিকিৎসা, টিকা প্রদান এবং বিভিন্ন পরামর্শ সেবা প্রদান করা হয়ে থাকে। এ সেবা কার্যক্রম সেবা কর্মীদের মাধ্যমে গ্রামীণ পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে প্রায় ৬ কোটি ২৭ লাখ রুগ্ণ পশুপাখিকে চিকিৎসা সেবা ও ১৭ কোটি ৭১ লাখ পশুপাখিকে রোগ প্রতিরোধের জন্য ১৭ প্রকারের টিকা প্রদান করা হয়েছে।
 

৬. প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে সম্প্রসারণমূলক কার্যক্রম
ক. কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও গবাদিপশুর জাত উন্নয়ন
প্রাণিসম্পদ অধিদফতর সারা দেশে মোট ৩,২৬৪টি কৃত্রিম প্রজনন উপকেন্দ্র/পয়েন্টের মাধ্যমে (ডিসেম্বর-২০১৪) দেশব্যাপী গবাদিপশুর কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। ২০১৩-১৪  অর্থবছরে গবাদিপশুর জাত উন্নয়নের জন্য প্রায় ২৯ লাখ ৭৪ হাজারটি গাভীকে কৃত্রিম প্রজনন করা হয়েছে। আলোচ্য অর্থবছরে গবাদিপশুর কৃত্রিম প্রজনন ফি ও ছাগি প্রজনন ফি বাবদ মোট ৬ কোটি ৫০ লাখ ৪০ হাজার ৭৭৭ টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে। এছাড়া দেশের প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি পূরণের জন্য আবহাওয়া উপযোগী সংকর জাতের বিফ ক্যাটল উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি প্রকল্প চলমান আছে, যা দেশের মাংস উৎপাদন বৃদ্ধি ও জনপ্রতি মাংসের প্রাপ্যতা বাড়াতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।


খ. প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশনে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার  
প্রাণিসম্পদ বিভাগের কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন করার প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে এবং অধিদফতরের ওয়েবসাইটটি
(www.dls.gov.bd) চালু রয়েছে। Local Area Network (LAN), e-livestock, online monthly/quarterly report  প্রদান, টেন্ডার, চাকরির বিজ্ঞপ্তি, বদলির আদেশ এবং অধিদফতর সংশ্লিষ্ট সর্বশেষ তথ্য ওয়েবসাইটে নিয়মিত দেয়া হচ্ছে। এছাড়া এসএমএস গেটওয়ে সিস্টেমের(SMS Gateway System) মাধ্যমে ডিজিস সার্ভিলেন্স কার্যক্রম চলমান আছে। এটি ব্যবহার করে অতি দ্রুত মাঠ পর্যায় থেকে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগের একটি সার্ভিলেন্স কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্রুত এ রোগ নির্ণয় ও নিয়ন্ত্রণের ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে।
 

গ. গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির চিকিৎসা প্রদান ও রোগ নিয়ন্ত্রণ
অধিদফতরের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দফতর এবং জেলা প্রাণি হাসপাতালগুলো থেকে কৃষক ও খামারিদের রুগ্ণ গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির চিকিৎসা, টিকা প্রদান এবং বিভিন্ন পরামর্শ সেবা প্রদান করা হয়ে থাকে। এ সেবা কার্যক্রম সেবা কর্মীদের মাধ্যমে গ্রামীণ পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে প্রায় ৬ কোটি ২৭ লাখ রুগ্ণ পশু পাখিকে চিকিৎসা সেবা ও ১৭ কোটি ৭১ লাখ পশুপাখিকে রোগ প্রতিরোধের জন্য টিকা প্রদান করা হয়েছে।

 

ঘ. চিড়িয়াখানার জীববৈচিত্র্য উন্নয়ন ও চিত্তবিনোদন
ঢাকা চিড়িয়াখানার প্রাণি বৈচিত্র্য উন্নয়নে এবং স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের চিত্তবিনোদনে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর নানাবিধ কার্যক্রম এরই মধ্যে গ্রহণ করেছে। এ চিড়িয়াখানায় বর্তমানে ১৪৩ প্রজাতির ২৩৭৪টি পশুপাখি ও অ্যাকুয়ারিয়াম ফিশের মাধ্যমে চিড়িয়াখানাটির জীব বৈচিত্র্য সমৃদ্ধশালী করা হয়েছে। গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ঢাকা চিড়িয়াখানায় প্রায় ৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে। তাছাড়া ঢাকা ও রংপুর চিড়িয়াখানা দুটিকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ডিজিটাল সার্ভে করা হয়েছে। সামাজিক কার্যক্রম স্বরূপ অটিস্টক শিশুসহ সব প্রকার প্রতিবন্ধী শিশু-কিশোরদের চিড়িয়াখানায় প্রবেশ ফি সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে।


ঙ. মানবসম্পদ উন্নয়ন ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার
ঝিনাইদহ সরকারি ভেটেনারি কলেজে ৫ বছর মেয়াদি ভেটেনারি গ্র্যাজুয়েশন কোর্সের শিক্ষা কার্যক্রম ২০১৩-১৪ শিক্ষা বর্ষ থেকে শুরু হয়েছে। এ কলেজে প্রতি শিক্ষা বর্ষে মোট ৬০ জন ছাত্রছাত্রী ভর্তি করা হচ্ছে এবং তাদের শিক্ষা কার্যক্রম নিয়মিতভাবে চলছে। ‘সিরাজগঞ্জ সরকারি ভেটেরিনারি কলেজ স্থাপন’ প্রকল্পের আওতায় ভেটেরিনারি শিক্ষার প্রসারে নতুন একটি সরকারি ভেটেরিনারি কলেজ প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম চলমান আছে। এছাড়াও প্রাণিসম্পদ খাতে সাব-প্রফেশনাল জনবল সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘এস্টাবলিসমেন্ট অব ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলোজি প্রজেক্ট’ প্রকল্পের আওতায় ৫টি প্রাণিসম্পদ ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট স্থাপনের কার্যক্রম চলমান আছে। ওই প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি শিক্ষা বর্ষে ২০০ জন ছাত্রছাত্রী প্রাণিসম্পদের ওপর ডিপ্লোমা কোর্সে অধ্যয়ন করতে পারবে।


চ. ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রজেক্ট (NATP)
বিশ্ব ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ সেবা উপজেলা থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিকেন্দ্রীকরণ এবং খামারি/কৃষকের চাহিদামত প্রযুক্তি নির্ভর সেবা কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্দেশে গ্রামে গ্রামে Common Interest Group (CIG), Producer Organization (PO), ইউনিয়ন পর্যায়ে Community Extension Agent for Livestock (CEAL) এবং উপজেলা পর্যায়ে প্রাণিসম্পদ বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি করার জন্য NATP প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় ১,২৮০ জন সিল (কমিউনিটি এক্সটেনশন এজেন্ট ফর লাইভস্টক) ইউনিয়ন পর্যায়ে খামারিদের বিভিন্ন প্রকার চাহিদামাফিক সেবা প্রদান করছে। ৭৩২টি ফিয়াক (ফার্মারস ইনফরমেশন অ্যান্ড এডভাইজ সেন্টার) হতে বছরে প্রায় ২.৩০ লাখ খামারির বিভিন্ন সমস্যা সমাধান বিষয়ক পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।
 

ছ. প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম
প্রাণিসম্পদের অধিদফতরের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বেকার যুবক ও যুব মহিলা, দুস্থ পরিবার, ভূমিহীন, প্রান্তিক চাষিদের আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে আয়ের সুযোগ সৃষ্টি ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৯৬-৯৭ থেকে ১৯৯৯-২০০০ পর্যন্ত ‘প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন কার্যক্রমে আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রকল্প (১ম পর্যায়)’-এর মাধ্যমে ২৫.০৪ কোটি টাকা ও ২০০০-০১ থেকে ২০০৪-০৫ পর্যন্ত ‘প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন কার্যক্রমে আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রকল্প (২য় পর্যায়)’-এর মাধ্যমে ৮.৬৭ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ২০০৩-০৪ থেকে ২০০৫-০৬ সন পর্যন্ত ‘দারিদ্র্যবিমোচনে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম (ছাগল, ভেড়া ও হাঁস-মুরগি) কর্মসূচি’-এর মাধ্যমে ৪৪০টি উপজেলায় ৩২.৯৮ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। নতুন প্রণীত কার্যনির্দেশিকা-২০১১ অনুসারে পুনঃক্ষুদ্রঋণ বিতরণ কার্যক্রম চলমান আছে।


জ. প্রাণিসম্পদের উৎপাদনের ওপর জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলা
বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে গবাদিপ্রাণীর ওপর বর্ধিত তাপমাত্রার পীড়নের ফলে উৎপাদন সরাসরি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং নতুন নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে চারণভূমি হ্রাস পাচ্ছে। বর্তমানে উপকূলীয় এলাকায় নতুন জেগে ওঠা চর কিংবা সরকারের খাস জমিতে সমবায়ের ভিত্তিতে চারণভূমি স্থাপনের জন্য নীতিমালা প্রণয়নের কাজও এগিয়ে চলছে। দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ‘কম্প্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম ফেজ-২ (সিডিএমপি-২)’ আমব্রেলা প্রকল্পের প্রাণিসম্পদ অংশের কার্যক্রমের আওতায় দুর্যোগ ও জলবায়ু বিষয়ক একটি অ্যাকশন প্লান তৈরি করা হয়েছে, সচেতনতামূলক কৃষক সভা ও উন্নয়নমূলক ডেমন্সট্রেশন কার্যক্রমের আওতায় ২ হাজার ৪০০ কৃষককে সচেতনতা মূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে, কর্মকর্তাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু অভিযোজন বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান এর আওতায় ৫০০ জন কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে, আইসিটি সেল স্থাপন ও জলবায়ু বিষয়ক কন্ট্রোল রুম স্থাপন কার্যক্রম চলমান আছে। দুর্যোগ প্রতিরোধে দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় দক্ষ কর্মী তৈরি করা কার্যক্রমের আওতায় ৬০ জন কর্মী তৈরি করা হয়েছে। ইনটিগ্রেটেড রেজিলিয়েন্ট মডেল ভিলেজ স্থাপন করা এবং প্রাণিসম্পদ টেকনোলজি ট্রান্সফারের মাধ্যমে ডিজাস্টার প্রুফ ভিলেজ তৈরির আওতায় ১০টি মডেল ভিলেজ স্থাপন করা হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের কারিগরি সহায়তায় বন অধিদফতর কর্তৃক বাস্তবায়িত ‘কমিউনিটি বেসড্ এডাপ্টেশন টু ক্লাইমেট চেঞ্জ (সবিএসিসি)’ প্রকল্পের কার্যক্রমের আওতায় উপকূলীয় ৪টি ইউনিয়নে নির্বাচিত সুফলভোগীদের (৫৫০ জন) প্রতিকূল পরিবেশে পশুপাখি পালনে খাপখাইয়ে নেয়ার সক্ষমতা অর্জন বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।

 

অজয় কুমার রায়*
*মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব), প্রাণিসম্পদ অধিদফতর, বাংলাদেশ, ঢাকা, মোবাইল : ০১৭১১১৬৪০৯৬

 


Share with :

Facebook Facebook