কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা : কিছু কথা

কৃষিকথা রাইটার্স বিল্ডিং কলকাতা থেকে প্রকাশিত হতো সাতচল্লিশের আগে, সেটা পুরানো কথা, আমরা অনেকেই জানি। পূর্ব বাংলায় এর পাঠক সংখ্যা বেশি ছিল বলে দেশ বিভাগের পর পশ্চিম বাংলার পাঠকদের মায়া কাটিয়ে রাইটার্স বিল্ডিং ছেড়ে ঢাকায় ইডেন বিল্ডিং এ পাড়ি জমায় কৃষিকথা, এবং এদিক সেদিক ঘুরে রামকৃষ্ণ মিশন রোডের কৃষি তথ্য সংস্থায় স্থায়ীভাবে আসন গাড়ে- সেটাও নতুন নয়, প্রবীণ পাঠকদের অনেকেই জানেন। আর আশির দশক থেকে খামারবাড়ি, ঢাকায় কৃষি তথ্য সার্ভিসের অত্যাধুনিক প্রিন্টিং প্রেসের কল্যাণে কৃষিকথার আটপৌড় চেহারায় লাগে আধুনিকতার ছোঁয়া, এবং চলমান এ প্রক্রিয়াটি আজও বহমান সময়ের স্রোতে। এটিও নতুন কিছু নয়, এ সময়ের পাঠকদের খুবই জানা। তবে এসব পুরানো কথার ভিড়ে কৃষিকথার পাঠকদের জন্য নতুন খবর হলো মেঘে মেঘে যেমন বেলা বাড়ে, তেমনি কৃষিকথার বয়সও বেড়ে এখন হয়েছে ৭৫ বছর। পরিণত বয়সই বলা যায়। যা হোক, অনেকের মতো আমারও সুযোগ হয়েছিল কৃষিকথার টিমের সঙ্গে বেশ কিছু দিন কাজ করার। তাই কৃষিকথার ৭৫ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে আমাদের সময়কার বর্ণাঢ্য কর্মকা-ের উপভোগ্য কিছু খ-চিত্র এখনকার পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করা বা বলতে পারেন ফিরে দেখার বিষয়টিই হলো- কৃষি কথা : কিছু কথা।


কৃষিকথা পরিবারের সঙ্গে আমার যোগাযোগ বিগত ’৬৯-’৭০ সন থেকে। বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউট (বর্তমান শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) এর ছাত্র সংসদের সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই কৃষি বিষয়ক বিভিন্ন লেখালেখি নিয়ে নিয়মিত মুখোমুখি হতাম রামকৃষ্ণ মিশন রোডে কৃষি তথ্য সংস্থার প্রধান কারিগরি তথ্য অফিসার মুহাম্মদ মোস্তফা আলী, উপ প্রধান কারিগরি তথ্য অফিসার কলিম উদ্দীন আহমদ এবং হোসনে আরা রহমানের সঙ্গে। তারা তিনজনই লেখক ছিলেন। এছাড়া, একুশের সংকলন ও কলেজ বার্ষিকীর কভার ডিজাইন নিয়ে আলাপচারিতা চলতো শিল্পী প্রাণেশ কুমার ম-লের সঙ্গে। শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তীর সঙ্গেও দেখা হয়েছে। দেখা হতো কবি আবদুল হাই মাশরেকী, লেখক ছমিরউদ্দিন খাঁ, বেতার শিল্পী মনু দে এবং ফজলে রাব্বীর সঙ্গেও। যদিও সে সময়কার কৃষিকথার সম্পাদক সিরাজ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে আমার আলাপের সুযোগ হয়নি, তবে তার লেখালেখির সঙ্গে পরিচয় ছিল। পত্রিকায় প্রকাশিত তার ছোট গল্পগুলো ভালো লাগত। ঠিক এভাবেই কৃষি তথ্য সংস্থার কর্মকা- ভালোলাগা এবং ভবিষ্যতে গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে কৃষি তথ্য সংস্থায় যোগ দেয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করি।


সে স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটল ’৯৩তে, ততদিনে কৃষি তথ্য সংস্থার নাম সামান্য পালটে গিয়ে হয়েছে কৃষি তথ্য সার্ভিস। তবে যোগদানটা মোটেও সুখকর ছিল না। শ্রদ্ধেয় কৃষিবিদ আ, কা, মু, গিয়াস উদ্দীন মিল্কী ও কৃষিবিদ তফসীর সিদ্দিকীর সহযোগিতায় যদিওবা বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, গাজীপুর থেকে বদলি হয়ে কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অফিসার (কৃষি) পদে যোগদানের জন্য মন্ত্রণালয়ের আদেশ পেলাম, কিন্তু বিধি বাম। কৃষি তথ্য সার্ভিসের তৎকালীন পরিচালক আমাকে সহজে গ্রহণ করতে রাজি হলেন না। কারণ হিসেবে তিনি মন্ত্রণালয়কে জানালেন বর্ণিত পদের অফিসারকে লেখালেখি জানতে হবে, লেখা সম্পাদনায় অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, বেতার ও টেলিভিশনের স্ক্রিপ্ট লেখার ধারণা থাকতে হবে, ইত্যদি... ইত্যাদি... এবং আরও অনেক কথা। যদিও আমি তাকে জানিয়েছিলাম যে, তার চাহিদা অনুযায়ী সব অভিজ্ঞতাই আমার আছে। তবুও তিনি আমার পরিবর্তে অন্য একজন অফিসারের নাম প্রস্তাব করে মন্ত্রণালয়ে পাঠালেন। তবে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ জয় আমারই হলো। আমি কৃষি তথ্য সার্ভিসে যোগদান করলাম ১৯৯৩ এর জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে। কিন্তু তখনও বিপদ কাটেনি, বরং বেড়েছে। কৃষিকথা দূরে থাকুক, কোনো কাজই আমাকে দেয়া হচ্ছে না। কারণটা পরিষ্কার, কর্তৃপক্ষ আমাকে চায়নি, অথচ আমি এসে গেছি। অতএব, বসে বসে অন্য অফিসারদের সঙ্গে আড্ডা দেয়া এবং জাতীয় দৈনিকের জন্য লেখা তৈরি করা ছিল আমার তখনকার নিত্যদিনের কাজ। ফলে সে সময় আমার বেশ কিছু লেখা ইংরেজি ও বাংলা জাতীয় দৈনিকে ছাপা হয়েছিল। তারপর এলো সেই টার্নিং পয়েন্ট অক্টোবর মাস, বিশ্ব খাদ্য দিবস। জাতীয় দৈনিকে বিশ্ব খাদ্য দিবসের ক্রোড়পত্র প্রকাশ ও সেমিনারে মাননীয় কৃষিমন্ত্রীর ভাষণের খসড়া তৈরির দায়িত্ব পড়েছে কৃষি তথ্য সার্ভিসের ওপর। এ বিষয়ে পরিচালক মহোদয়ের কক্ষে সভা বসেছে। আমিও উপস্থিত সেখানে। আলোচনা হচ্ছে ক্রোড়পত্রের জন্য মহমান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় কৃষিমন্ত্রী, মাননীয় খাদ্যমন্ত্রী, মাননীয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ও কৃষি সচিব মহোদয়ের বাণীর খসড়া দরকার, কে কোনটা লিখবে? উপস্থিত অফিসারদের মধ্যে মুখচাওয়াচায়ি চলছে। এ সুযোগটা হাতে নিয়ে নিলাম। বললাম, মহমান্য রাষ্ট্রপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বাণীর খসড়া এবং মাননীয় কৃষিমন্ত্রীর ভাষণের খসড়া আমি তৈরি করে দিবো। চশমার ওপর দিয়ে আড়চোখে তাকালেন পরিচালক মহোদয়, বললেন, পারবে? বললাম- পারব। সময় বেঁধে দেয়া হলো খসড়া জমা দেয়ার। নির্ধারিত সময়ে শুধু আমার তৈরি খসড়া কয়টি জমা পড়ল, অন্যরা কের লেখা তৈরি করেননি। পরিচালকের কক্ষে আবার ডাক পড়ল, এবার পরিচালক মহোদয় তাকালেন, চশমার উপর দিয়ে নয়, চশমার গ্লাস ভেদ করে, বললেন ড্রাফ্ট ভালো হয়েছে, কৃষিকথার জন্য বিশ্ব খাদ্য দিবসের থিমের ওপর মূল লেখাটিও তুমি লিখবে, আর কৃষিকথার লেখা সিলেকশন ও টেকনিক্যাল এডিটিংয়ের কাজ এখন থেকে তুমিই করবে। .... সেখান থেকেই শুরু, তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি, এভাবে চলেছে কৃষি তথ্য সার্ভিসে বিভিন্ন পদে চাকরি করা ২০০৭ পর্যন্ত।


মনে হচ্ছে এতক্ষণ ধান বানতে শিবের গিত গাইলাম। যা হোক, এবার কৃষিকথায় আসি। সেসময় লেখা নির্বাচন ও সম্পাদনার কাজে যে টিম কাজ করত, সে টিম মেম্বারদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কৃষিবিদ মানজুমুল হক। এছাড়া কৃষিবিদ আহমেদ আলী চৌধুরী ইকবাল, কৃষিবিদ রাগিব হাসান, কৃষিবিদ রেজাউল হক এবং ড. জাহাঙ্গীর আলম বিভিন্ন সময়ে আমার সঙ্গে কাজ করেছেন। তবে সম্পাদক সিরাজ উদ্দিন আহমেদ, সহসম্পাদক তাজুল ইসলাম ও পরবর্তিতে মো. মতিয়ার রহমান বরাবরই আমাদের সাথে ছিলেন এবং তারা গল্প ও কবিতাগুলো সম্পাদনা করতেন। আমি আর মানজুমুল একই রুমে পাশাপাশি বসে দীর্ঘ সময় কাজ করেছি। মানজুমুলকে দেখতাম অসম্ভব ধৈর্য ধরে সম্পাদনার কাজটি করতেন। গবেষকদের তথ্য উপাত্তে ঠাসা এবং কঠিন কঠিন শব্দ চয়ন ও বাক্য গঠনে সমৃদ্ধ কারিগরি লেখাগুলোকে এভরি ডে ভোকাবলারি দিয়ে তিনি পপুলার আর্টিকেলে রূপান্তরিত করতেন। সম্পাদনায় মনোসংযোগ ও প্রুফ দেখার বিষয়টি শিখেছি মানজুমুলের কাছ থেকে। ইকবাল, রাগিব, রেজাউল ও জাহাঙ্গীর এরা সবাই বিভিন্ন সময়ে আমার সহকর্মী ছিলেন, তারা লেখা নির্বাচনে সহায়তা করতেন, নিয়মিত কলাম চিঠিপত্রের জবাব ও আগামী মাসের কৃষি লিখতেন এবং স্ট্যান্ড বাই বা ফিলার লেখক হিসেবে বিশেষ সংখ্যার কোন লেখা পাওয়া না গেলে সেটি লিখে দিতেন। আহমেদ সিরাজ নামে সম্পাদক সিরাজ উদ্দিন আহমেদ নিয়মিত কৃষি বিচিত্রা লিখতেন। তাজুল ইসলাম ও মতিউর রহমান লিখতেন কৃষি সংবাদ ও আমাদের কথা। কৃষিকথায় আমার প্রথম লেখাটি ছাপা হয়েছিল ৫৩তম বর্ষ : ৭ম সংখ্যা, কার্তিক ১৪০০, অক্টোবর ১৯৯৩ তে বিশ্ব খাদ্য দিবসের থিম Harvesting Nature’s Diversity এর ওপর ভিত্তি করে - বিশ্ব খাদ্য দিবস ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা শিরোনামে।


কৃষিকথার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে অনেক গুণী লেখকদের সাথে পরিচয় হয়েছিল। তাদের মধ্যে অন্যতম কয়েকজন ছিলেন- ব্রির ড. হাসানুজ্জমান ও ড. ফরহাদ জামিল, বিএআরসির ড. কামাল এবং বাংলাদেশ সুগারকেন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ওসমান গনি। তারা সবাই গবেষক ছিলেন, অথচ লিখতেন কৃষক ও কৃষি কর্মীদের উপযোগী করে। বিশেষ কোন লেখা চাওয়া মাত্র ড. হাসানুজ্জমান ও ড. ফরহাদ জামিল লেখা পাঠিয়ে দিতেন। ড. জামিলের লেখা ধান উৎপাদন প্রযুক্তির ছড়া এখনও মনে পড়ে। ড. কামাল লেখা নিয়ে নিজেই চলে আসতেন। শেষ বয়সে তিনি আমেরিকা চলে গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকেই তিনি পরপারে চলে যান। তবে প্রবাস জীবনে দেশে ফিরেই আসতেন আমাদের অফিসে। আড্ডা দিতেন, নতুন লেখালিখি নিয়ে কথা হতো। চাকরির শেষের দিকে এসে তিনি পিএইচডি করেছিলেন। পিএইচডি ডিগ্রি নেবার পর একদিন আমাদের রুমে আসার পর তিনি কেমন আছেন জানতে চাইলে তাৎক্ষণিক জবাব দিয়েছিলেন, বুড়ো বয়সে তরুণী বিয়ে করার মতো অবস্থা, লজ্জা পাচ্ছি। অপর দিকে ওসমান গনির লেখার সঙ্গে পরিচয় থাকলেও ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় ছিল না। পাণ্ডুলিপি পড়ে বুঝা যেত সাহিত্য চর্চা আছে, তাই লিখেন ভালো। কিন্তু তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল অনেক পরে, ঈশ্বরদীতে। দেখলাম তিনি লেখক হিসেবে যেমন ভালো, তেমনি লোক হিসেবেও।


কৃষিকথার ডিজাইন ও অঙ্গসজ্জা প্রসঙ্গে শিল্পী প্রাণেশ কুমার ম-লকে মনে পড়ে। প্রাণেশ বাবুর ইলাস্ট্রেশন বা একটি তুলির আঁচড়ে গ্রামবাংলার কৃষক বা কিষাণ বধূর যে ছবি ফুটে উঠতো কৃষিকথায়, তার অবসর গ্রহণের পর আর কখনও সেটি খুঁজে পাইনি। শিল্পী সরদার শামসুল ইসলাম একসময় বাংলাদেশ টেলিভিশনে গ্রাফিক্সের কাজ করতেন। তার হাতের লেখা টাইটেল টেলিভিশনের স্ক্রিনে দেখতাম। কৃষিকথায়ও তিনি আর্টিকেলের শিরোনাম অর্থাৎ টাইটেল করে দিতেন। তবে কম্পিউটার গ্রাফিক্স চালু হওয়ার পর হাতের লেখা বন্ধ হয়ে যায়। কম্পিউটার গ্রাফিক্সের কাজ করতো শিল্পী মেজবাহ ও শিল্পী নূর, এখনও তারা আছেন। মেজবাহ ও নূর কিন্তু কেবল চারু কলার শিল্পীই নন, একজন নাট্যশিল্পী অন্যজন যাদুশিল্পীও। আমাদের সম্পাদনা টিমে এ শিল্পী দলটিও কাজ করত, কভার ডিজাইন, ভেতরের ছবি ও ফটোশপ নিয়ে আমাদের মধ্যে মতামত বিনিময় হতো। আমরা সবাই চেষ্টা করতাম একটি ভালো প্রোডাকশন করার জন্য।


মুদ্রণ প্রসঙ্গে তৎকালীন প্রেস ম্যানেজার বেলাল উদ্দিন আহমেদকে তো ভুলা যাবে না। একটু পাগলাটে টাইপের ছিলেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তার কৃষিকথা বের করা চাই, সেটা যেভাবেই হোক। অনেক দিন সকালে অফিসে যেয়ে তাকে দেখেছি সারা রাত জেগে কৃষিকথা ছাপানোর কাজ শেষ করে প্রেসের ভেতর দুই টেবিল জোড়া লাগিয়ে তার ওপর ঘুমিয়ে আছেন। রণজিৎ দত্ত, মাস্কিংম্যান তাকেও দেখতাম রাত জেগে কাজ করত, হাতের কাজ শেষ না করে বাড়ি যেত না। এভাবে ম্যানেজার থেকে লোডার পর্যন্ত প্রেসের প্রতিটি কর্মীর রাত জাগা শ্রম ও আন্তারিকতায় বের হতো প্রতি বাংলা মাসের প্রথম সপ্তাহে মাসিক কৃষিকথার প্রতিটি সংখ্যা।


এবার কৃষিকথার লেখালেখি নিয়ে মজার কিছু প্রসঙ্গ। অনেক সময় বাধ্য হয়ে কিছু ফরমায়েশি লেখা লিখতে হতো এবং ছাপাতে হতো কৃষিকথায়। এমনি একটি লেখা ছাপানোর পর চার দিকে বেশ হৈ চৈ। প্রচুর টেলিফোন আসতে লাগলো। লেখাটি ছিল ডিএইর ডিজি সাহেবকে নিয়ে। যারা ডিজি সাহেবকে পছন্দ করতেন তারা আমার লেখাটির উচ্ছ্বসিত প্রসংশা করলেন। অন্য দিকে যারা তাকে পছন্দ করতেন না, তারা আমার সমালোচনা করলেন এবং ধরে নিলেন আমার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ। এ বিষয়ে সমালোচনার তুঙ্গে ছিলেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের একজন এডিশনাল ডিরেক্টর। তার সঙ্গে চট্টগ্রামে একটি ট্রেনিং প্রোগ্রামে দেখা হলে তিনি যথারীতি রেগে গেলেন। তারপর একটু থেমে বললেন, ফ্লাস ফ্লাডের ওপর বাংলাদেশ বেতার ঢাকা কেন্দ্র থেকে তোমার একটি লাইভ প্রোগ্রাম শুনেছি। তোমার সঙ্গে মোতাহার চৌধুরী ও নাজমুল ছিল, অনুষ্ঠানটি চমৎকার লেগেছে, তাই তোমার ওপর যত রাগ সব এখন পানি হয়ে গেল। তার পরেও বললেন- আচ্ছা তোমার বাড়ি কী চাঁপাইনবাবগঞ্জ?


আর একবার হয়েছে কী, কাজী নজরুল সরকারি কলেজের এক ছাত্র অফিসে এসে হাজির। এসেই বলল ওর বাড়ি কসবা উপজেলায়। বাড়িতে কৃষিকথায় আমার একটি লেখা পড়েছে, লেখাটি ভালো লেগেছে, তাই দেখা করতে এসেছে। আমি তাকে ধন্যবাদ জানালাম। সে বলল, শুধু ধন্যবাদে হবে না, একটা উপকার করতে হবে। জানতে চাইলাম কী উপকার? সে বলল পারিবারিক শত্রুপক্ষ রাতের বেলায় তাদের জমির ধান কেটে নিয়ে গেছে এবং ধান যেহেতু কৃষি ফসল, তাই থানা পুলিশ যা করতে হবে, তা কৃষি বিভাগেরই করা উচিত। সুতরাং এ ব্যাপারে আমার হেলপ দরকার। অনেক বুঝিয়ে তারপর তাকে বিদায় করেছিলাম।


অন্য একদিনের ঘটনা। বিকেল ৩টা হবে হয়তো। লেখা এডিট করছি। মানজুমুল ইপসাতে। একজন তরুণী রুমে এসে বসল। তাকাতেই বলল- আমি শিল্পী, শামসুন্নাহার হলে থাকি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে মার্স্টাস করছি। বললাম, কী হেলপ করতে পাড়ি তোমাকে? আচ্ছা, কৃষি গ্রাজুয়েট যারা বিসিএস করে উপজেলা কৃষি অফিসে চাকরিতে ঢুকে, তাদের পদমর্যাদা কী? সরাসরি প্রশ্ন তার। জবাবে বললাম, অন্য বিসিএস ক্যাডার অফিসারদের মতোই প্রথম শ্রেণির গেজেটেড অফিসার। তরুণীটি একটু ভাবলো। আমি জানতে চাইলাম বিয়ের ব্যাপার কী? বললো- হ্যাঁ। জিজ্ঞাসা করলাম- পাত্রীটি কে? আমি নিজেই, এবারও সরাসরি জবাব তার। ভালোভাবে তাকালাম তার দিকে। সে বলতে শুরু করলো- কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম নামে একজন বিসিএস (কৃষি) ক্যাডার অফিসারের সঙ্গে পারিবারিকভাবে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। সাইফুল এসএমও হিসেবে একটি উপজেলায় জয়েন্ট করেছে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেপুটেশনে পোস্টগ্রাজুয়েশন করছে। কাল বাদে পরশু তাদের বিয়ে। সুতরাং পাত্র হিসেবে সাইফুল কেমন, তা আজকের মধ্যেই তাকে জানতে হবে এবং বিয়ের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পৌঁছাতে হবে। এ ব্যাপারে সাহায্য দরকার। ওর কথা শুনে প্রশ্ন করলাম তো, এখানে কেন? জবাবে বলল- এটাতো কৃষি তথ্য সার্ভিস এবং আপনি তথ্য অফিসার (কৃষি) তাই। আমি বললাম সাইফুল নামে তো কাউকে চিনি না, তবে বিকেল ৫টার পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা টিম, যারা ডেপুটেশনে পড়াশোনা করছে, তারা এখানে আসবে। তাদের কাছ থেকে যদি জানতে পারি তবে অবশ্যই তোমাকে জানাবো, বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে ফোন করতে পার, এ বলে তাকে বিদায় দিলাম। ৫টায় মিয়া আবদুর রশিদ এলো, ও হর্টিকালচারে এমএস করছে। ওর কাছ থেকে জানলাম সাইফুল সম্পর্কে। রশিদের মতে, সাইফুল পাত্র হিসেবে যেমন ভালো, তেমনি একাডেমিক ক্যারিয়ারও ভালো। বিকেল ঠিক সাড়ে পাঁচটায় টেলিফোন এলো। হ্যালো বলতেই শিল্পী বলল- তথ্য পেয়েছেন? জবাবে শুধু বললামÑ তথ্য পজেটিভ, ঝুলে পড়তে পারো। এখানে এ প্রসঙ্গটি শেষ হলে ভালো হতো। কিন্তু হয়নি। বেশ কিছু দিন পরে কৃষিকথার কাজ করছি। রুমে ঢুকল একজন তরুণ, বলল- স্যার আমি সাইফুল, বিয়ের পর সস্ত্রীক এসেছিলাম আপনার সঙ্গে দেখা করতে, কিন্তু আপনি ছিলেন না। আমার স্ত্রীর পীড়াপীড়িতে আজ একাই এসেছি। আমার স্ত্রীর নাম শিল্পী। পরে অবশ্য ওদের দু’জনের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল।


যার প্রসঙ্গ টেনে শেষ করব বলে ভেবে রেখেছিলাম, এবার তার কথা বলি। তিনি কৃষিবিদ ফজলুল হক রিকাবদার। আমি কৃষিকথা টিমের সঙ্গে কাজ করেছি ১৯৯৩ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত। সেসময় কৃষি তথ্য সার্ভিসে পরিচালক হিসেবে পেয়েছিলাম কৃষিবিদ এমএ করিম, কৃষিবিদ দিলীপ চক্রবর্তী, কৃষিবিদ ফজলুল হক রিকাবদার এবং ড. শহিদুল ইসলামকে। এদের মধ্যে কৃষিবিদ রিকাবদারের সময়কালটা আমার চাকরি জীবনের একটা মাইলস্টোন। সেসময় কৃষিকথার সার্কুলেশন যেমন বেড়েছিল, তেমনি কৃষিকথার আঙ্গিকেও আনা হয়েছিল অনেক পরিবর্তন। কৃষিকথার লেখকদের লেখার মান উন্নয়নের জন্য ডেভেলপমেন্ট কমিউনিকেশন নামে একটি প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করেছিলাম, চারুকলার ছেলেমেয়েদের দিয়ে কৃষিকথায় কার্টুন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি, এ ধরনের আরো অনেক কিছু কাজ চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। তখন চাকরি করিনি, কাজ করেছি এবং কাজকে এনজয় করেছি। আর এসব সম্ভব হয়েছিল কৃষিবিদ রিকাবদারের আন্তরিক সহযোগিতার জন্য। সুতরাং রিকাবদার স্যারকে কৃতজ্ঞতা না জানিয়ে অকৃতজ্ঞ থাকা কী ঠিক হবে?

 

লেখক:

কৃষিবিদ মঈন উদ্দিন আহমেদ*
* এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, ইনফোটেইনমেন্ট, বাড়ি-৫৫ (তিনতলা), রোড-৬, ব্লক-সি, বনানী, ঢাকা-১২১৩


Share with :

Facebook Facebook