কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

ব্রি উদ্ভাবিত নতুন জাত ও প্রযুক্তি

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এবং মৌসুমের উপযোগী চারটি হাইব্রিডসহ ৭২টি উচ্চফলনশীল ধানের জাত এবং মাটি, পানি, সার, পোকা ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, কৃষি যন্ত্র ও ধানভিত্তিক শস্য বিন্যাস বিষয়ে শতাধিক উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। দেশের শতকরা ৮০ ভাগ ধানি জমিতে ব্রি  ধানের চাষ হয় এবং এর থেকে আসছে দেশের মোট ধান উৎপাদনের শতকরা ৯১ ভাগ ।


 অতীতের খাদ্য ঘাটতির দেশ এখন চাল রপ্তানির সক্ষমতা অর্জন করেছে। এর পেছনে ব্রি উদ্ভাবিত উফশী ধানের জাতগুলোর একটা বড় অবদান রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্রি গত চার দশকের বেশি সময়ে অবিরাম কাজ করে যাওয়ার ফলে এদেশে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের ক্ষেত্রে একটা নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। এখন এর মূল্যায়ন হওয়াটা খুব জরুরি।


ব্রির মহাপরিচালক ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, অতিরিক্ত জনসংখ্যার একটা ছোট্ট দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুর্ভিক্ষের মতো  বিপর্যয় এড়ানোর মাধ্যমে যে সফলতা অর্জিত হয়েছে তার যথাযথ মূল্যায়ন যদি কখনও হয় তাহলে প্রতিষ্ঠানটি নোবেল পুরস্কার বা সমমানের স্বীকৃতি পেতে পারে। এর চেয়েও বড় কথা, ধান গবেষণার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দেশের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের সঙ্গে সহযোগিতার টেকসই সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত  যে কোনো এলাকার কৃষক এর উদ্ভাবিত ধানের জাতগুলো সম্পর্কে জানেন। এগুলোর চাষাবাদ করেন। বছরের পর বছর ধরে তারা পরম যতেœ এসব বীজ সংরক্ষণ করেন। দেশের সব স্তরের ভোক্তারা ব্রি উদ্ভাবিত চালের ভাত নিয়মিত খান। ব্রি তার কাজের জন্য এ পর্যন্ত মোট ১৭টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছে যার মধ্যে স্বাধীনতা দিবস ও বঙ্গবন্ধু পুরস্কারও রয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক পুরস্কার বা প্রতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির চেয়ে গণমানুষের ঘনিষ্ট সান্নিধ্যে পৌঁছাতে পারাটাও নিঃসন্দেহে একটা বড় প্রাপ্তি।

 
খাদ্য নিরাপত্তা টেকসই করার লক্ষ্যে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত সহনশীল প্রযুক্তি উদ্ভাবন, শস্য নিবিড়তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শস্যবিন্যাসে ধানের আগাম জাতের সংযোজন, লবণাক্ত, অলবণাক্ত জোয়ার-ভাটা এলাকা ও বন্যাপরবর্তী সময়ের উপযোগী ধানের জাত ছাড়াও বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধী ও সহনশীল জাতের উদ্ভাবনে এ প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ব্রি উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ধানের জাতের মধ্যে রয়েছে লবণাক্ততা সহনশীল সাতটি, আকস্মকি বন্যা মোকাবিলার দুটি, খরা সহনশীল তিনটি, জিঙ্কসমৃদ্ধ দুটি, সর্বাধিক ফলনের চারটি এবং সুগন্ধি ও রপ্তানি উপযোগী তিনটি জাত। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানটি আধুনিক ধান চাষের জন্য মাটি, পানি ও সার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ৫০টির বেশি উন্নত প্রযুক্তি, ৩৯টি লাভজনক ধানভিত্তিক শস্যক্রম, ৩২টি কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন ও উন্নয়নসহ ধানের ৩২টি রোগ ও ২৬৬টি ক্ষতিকর পোকা শনাক্তকরণ প্রধান প্রধান রোগ-বালাই ব্যবস্থাপনা উদ্ভাবন করেছে।


এ প্রতিষ্ঠান মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান, সেমিনার, কর্মশালা, মাঠ দিবস আয়োজনের মাধ্যমে এসব প্রযুক্তি সারা দেশে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থায় সহায়তা করেছে।


সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে  ব্রি ক্রমাগত তার উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ ঘটিয়ে চলছে। বোরো মৌসুমের উফশী জাত ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান২৯ এবং আমন মৌসুমের বিআর১১ দেশজুড়ে কৃষক মহলে ব্যাপক জনপ্রিয়। অতীতের এ অর্জনের নবায়ন করে  বিগত বছরগুলোতে ব্রি ধান২৯ এর চেয়ে তুলনামূলক ভালো ব্রি ধান৫৮ এবং বিআর১১ এর চেয়ে তুলনামূলক ভালো ব্রি ধান৪৯ উদ্ভাবন করা হয়েছে। ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধির জন্য জলমগ্নতা সহনশীল ব্রি ধান৫১ ও ব্রি ধান৫২, খরা সহনশীল ব্রি ধান৫৬ ও ব্রি ধান৫৭ বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশ যেমন খরা, বন্যা, লবণাক্ততা সহনশীল জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে।  জনগণের পুষ্টি নিশ্চিত করতে সম্প্রতি জিঙ্ক সমৃদ্ধ ব্রি ধান৬২ এবং ব্রি ধান৬৪ উদ্ভাবন করা হয়েছে।


গত ২০১৩-১৪ সনে ব্রির গবেষণা কার্যক্রমে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য পাওয়া গেছে। এ বছর সাতটি উন্নত ধানের জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে বোরো মৌসুমের জন্য পাঁচটি এবং আউশ ও আমনের মৌসুমের জন্য একটি করে জাত।


বোরোর জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে, উন্নত প্রিমিয়াম কোয়ালিটি জাত ব্রি ধান৬৩, জিঙ্ক সমৃদ্ধজাত ব্রি ধান৬৪, লবণসহিষ্ণু জাত ব্রি ধান৬৭ এবং অনুকূল পরিবেশের জন্য ব্রি ধান৬৮ ও ব্রি ধান৬৯। আউশ মৌসুমের জন্য উদ্ভাবন করা হয়েছে খরাসহিষ্ণু আগাম জাত ব্রি ধান৬৫ যা সরাসরি বপনযোগ্য এবং আমন মৌসুমের জন্য উদ্ভাবন করা হয়েছে খরাসহিষ্ণু জাত ব্রি ধান৬৬।


দেশের ঐতিহ্যবাহী বালাম ধানের অনুরূপ গুণ সম্পন্ন  ব্রি ধান৬৩ জাতটিকে সরু বালাম নামে অভিহিত করা যায়। বাসমতি টাইপ এ জাতের জীবনকাল ১৪৮ দিন এবং ফলন হেক্টরে ৬.৫-৭.০ টন। ব্রি ধান৬৪ এর চালে ২৪ মিলিগ্রাম/কেজি জিঙ্ক আছে। এর জীবনকাল ১৫২ দিন এবং হেক্টরপ্রতি ফলন ৬.০-৬.৫ টন। বোনা আউশের নতুন জাত ব্রি ধান৬৫ এর জীবনকাল ৯৯ দিন এবং হেক্টরপ্রতি ফলন ৩.৫-৪.০ টন। ব্রি ধান৬৬ জাতটির জীবনকাল ১১০-১১৩ দিন। এর অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, আমন মৌসুমে ফুল আসার সময় যদি মাটির আর্দ্রতা শতকরা ২০ ভাগের নিচে বিশ দিন পর্যন্ত থাকে তবু এটি হেক্টরপ্রতি ফলন ৪.০-৪.৫ টন ফলন দিতে সক্ষম। ব্রি ধান৬৭ এর জীবনকাল ১৪০-১৪৩ দিন এবং লবণাক্ততাভেদে এর হেক্টরপ্রতি ফলন ৩.৮-৬.০ টন। এটি ব্রি ধান৪৭ এর মতো লবণসহিষ্ণু কিন্তু চাল মাঝারি চিকন ও ভাত সাদা এবং ঝরঝরে। ব্রি ধান৬৮ অনুকূল পরিবেশে ১৪৯ দিনে ৭.৩ টন/হেক্টর ফলন দিতে সক্ষম। ব্রি ধান৬৯ জাতে শতকরা ২০ ভাগ কম ইউরিয়া সার প্রয়োজন হয়। নতুন এ জাতের জীবনকাল ১৪৫-১৫৩ দিন এবং হেক্টরে ফলন ৭.৩ টন।


বিগত ২০১৩-১৪ সালের গবেষণায় অনেকগুলো প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। জোয়ার-ভাটা অঞ্চলের জন্য লম্বা চারার জাতের কৌলিক সারি উদ্ভাবন, অধিকতর জিঙ্ক সমৃদ্ধ জাতের কৌলিক সারি উদ্ভাবন, ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান৪৪ ও ব্রি ধান৪৯ জাতে সাব-১ জিনের অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছে। এছাড়া  এনথার কালচারের মাধ্যমে ব্রি ধান২৮ জাতের উন্নয়ন এবং ব্রি ধান২৯ জাতের লবণাক্ততা সহনশীল ট্রানজেনিক কৌলিক সারি উদ্ভাবন করা হয়েছে।


গত বছর ১৫১ টন ব্রিডার বীজ উৎপাদন করা হয়েছে। ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান২৯ জাত দুটিকে উচ্চতাপমাত্রাসহিষ্ণু করার জন্য গবেষণা এগিয়ে নেয়া হয়েছে। উদ্ভিদ শারীরতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, দুটি নেরিকা জাতের ধানের ফলন ব্রি ধান৫৬ এর চেয়ে বেশি। জলমগ্নতা সহনশীল হাইব্রিড ধানের নতুন জাত উদ্ভাবনের গবেষণায় অধিকতর অগ্রগতি হয়েছে। আগামী ২/১ বছরের মধ্যে চমকপ্রদ হাইব্রিড ধানের নতুন জাত আলোর মুখ দেখতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা আশা করছেন। ব্রি জিন ব্যাংক সংশ্লিষ্ট  বিজ্ঞানীরা পাহাড়ি ও সমুদ্র উপকূল এলাকা  থেকে আরো ৫১টি দেশি ধানের জাত সংগ্রহ করতে পেরেছেন।


গাজীপুরের মাটিতে ব্রি ধান২৯ জানুয়ারির মাঝামাঝিতে ১২ দিনের চারা ৩০ দ্ধ ২৫ সেন্টিমিটার দূরত্বে রোপণ করে এবং উপযুক্ত সার-গোবর ও সেচ প্রয়োগ করে হেক্টর প্রতি ৯.৮৩ টন ফলন পাওয়া যায়। বিভিন্ন কৃষিতাত্ত্বিক গবেষণায় ব্রির বিজ্ঞানীরা এটি প্রমাণ করেছেন। জোয়ার-ভাটা এলাকায় দেশি আমন (লাল মোটা, সাদা মোটা, প্রভৃতি) ধানে অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রতি চারগোছার মাঝে একটি করে ১.৮ গ্রাম পরিমাণ গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করে হেক্টরপ্রতি ১ টন ধানের ফলন বৃদ্ধি করা যায়। জাতভেদে আমন মৌসুমে হেক্টরপ্রতি ৬০-৭৫ কেজি নাইট্রোজেন (১৩৩-১৬৭ কেজি ইউরিয়া) এবং বোরো মৌসুমে ১৪৪-১৬৩ কেজি নাইট্রোজেন (৩২০-৩৬২ কেজি ইউরিয়া) প্রয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। ব্রির বিজ্ঞানীরা ঠা-া আবহাওয়ায় চারা উৎপাদনের জন্য একটি যন্ত্র ‘অঙ্কুুরি’ উদ্ভাবন করেছেন। অঙ্কুরিতে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এতে বীজ কিছুটা তাড়াড়াড়ি গজায় এবং মেশিনে রোপণ উপযোগী করে চারা উৎপাদন করা যায়। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় যথোপযুক্ত ব্যবস্থাপনা এবং ধানক্ষেত  থেকে পরিবেশ দূষণকারী গ্যাসগুলোর নির্গমণ রোধের জন্য ব্রির মৃত্তিকা বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে যাচ্ছেন। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় তারা দেখিয়েছেন, যুগ যুগ ধরে সুষম মাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে রোপা ধানের মাটিতে কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় না।


 সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগের বিজ্ঞানীরা সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাম্প নিয়ে গবেষণা শুরু করেছেন। তারা স্বল্পমূল্যের পিভিসি সেচ পাইপের ব্যবহার উদ্ভাবন করেছেন। পিভিসি সেচ পাইপ ব্যবহারের ফলে হেক্টরপ্রতি সেচ খরচ প্রায় ৩০০০ টাকা কমে যায়। অন্য গবেষণায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অগভীর নলকূপের নাগালের ৫-১৫ ফুট নিচে নেমে যাওয়ার চিত্র ফুটে উঠেছে। গাজীপুরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১৯৯৮ সনের ১১.৬৮ মিটার থেকে ২০১৪ সালে ৩৩.৬১ মিটার গভীরে চলে গেছে। এ চিত্র খুবই উদ্বেগজনক। ব্রি আঞ্চলিক কার্যালয় ভাঙ্গা, বরিশাল ও সাতক্ষীরার ভূ-গর্ভস্থ পানিতে মাত্রারিক্ত বোরন ও সোডিয়াম দেখা গেছে।


ধানভিত্তিক শস্য বিন্যাস গবেষণায় দেখা গেছে, নিচু এলাকার জমিতে যেখানে গম-পেঁয়াজ-পাট-পতিত বিন্যাসের পরিবর্তে গম-পেঁয়াজ-পাট-রিলে আমন ধান চাষ করা ২৫-৫২% লাভজনক। লবণাক্ত জমিতে যেখানে শুধু আমন ধান চাষ করা হয় সেখানে আমনের পর সূর্যমুখীর চাষ করলে কৃষকরা হেক্টরে ৫৭,০০০-৫৯,০০০ টাকা বাড়তি লাভ করতে পারেন।


উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব গবেষণাগারে বিজ্ঞানীরা ধানের ব্লাস্টরোগ প্রতিরোধী পাঁচটি জিনের সন্ধান পেয়েছেন যা অদূর ভবিষ্যতে ব্লাস্টরোগ প্রতিরোধী ধানের জাত উদ্ভাবনে সহায়ক হবে। বাকানি রোগের কারণ ও প্রতিকার গবেষণা আনেকটা এগিয়ে গেছে। ধানের লক্ষ্মীরগু রোগ বিষয়ক গবেষণায় বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। কীটতত্ত্ব বিভাগের বিজ্ঞানীরা ধানক্ষেতের আলে গাঁদাজাতীয় ফুল গাছ রোপণ করে বোরো ধানের পোকা দমনের এক অভিনব কৌশলের বিবরণ দিয়েছেন। গাঁদাজাতীয় ফুলে যে পোকা আসে সেগুলো ধানের পোকার শত্রু হিসেবে কাজ করে। ফলে কীটনাশক ছাড়াই বোরো ধানের পোকা দমন সম্ভব। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সুপারিশ দু’এক বছরের মধ্যে আশা করা হচ্ছে। শত শত ধানের কৌলিকসারি নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা ২৭টি সারি বাদামি গাছ ফড়িং প্রতিরোধী, আটটি সাদা-পিঠ গাছ ফড়িং প্রতিরোধী এবং পাঁচটি গলমাছি প্রতিরোধী বলে সনাক্ত করেছেন।


ব্রির কৃষি প্রকৌশলীরা এয়ার ব্লো টাইপ এঙ্গেলবার্গ চাল কলের পরিবর্তন সাধন করে এর কার্যকারিতা বাড়িয়েছেন। পরিবর্তিত এয়ার ব্লো টাইপ এঙ্গেলবার্গ চাল কলে ঘণ্টায় ২৫০-৩০০ কেজি বেশি চাল উৎপাদন করা যায় এবং ১-১.৫% অপচয় কম হয়। রোপা ধানের ক্ষেতে মাটির গভীরে সাধারণ ইউরিয়া প্রয়োগ কৌশল ব্রির কৃষি প্রকৌশলীরা উদ্ভাবন করেছেন। এ যন্ত্রের মাধ্যমে সাধারণ ইউরিয়া প্রয়োগ করে গুটি ইউরিয়ার মতো ফলাফল পাওয়া গেছে। এছাড়া স্ব-চালিত ধান কাটা যন্ত্র, কৃষি কাজে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার ও ধান ঝাড়াই কাজে পাওয়ার টিলার ইঞ্জিন ব্যবহারের উপায় তারা উদ্ভাবন করেছেন।


আর্থসামাজিক সমীক্ষায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, দেশের ধান উৎপাদনের শতকরা প্রায় ৯১ ভাগ ধান আসে ব্রি উদ্ভাবিত জাত থেকে। বোরো ধান চাষে হেক্টরপ্রতি প্রায় ৯৪৯ কেজি ধানের সমমূল্য খরচ হয় সার, বালাইনাশক ও চারা উৎপাদনে; ২,২৫৭ কেজি ধানের সমমূল্য খরচ হয় শ্রমিক বাবদ; ৪৫৯ কেজি ধানের সমমূল্য খরচ হয় জমি তৈরিতে; ১,১৬৩ কেজি ধানের সমমূল্য খরচ হয় জমির ভাড়া বাবদ এবং ৯৬৮ কেজি ধান কৃষকের লাভ থাকে। কৃষকের লাভের পরিমাণ আমনে কিঞ্চিত কম এবং আউশে কৃষক হেক্টরপ্রতি প্রায় ৩৩৩ কেজি ধানের সমমূল্য ক্ষতির সম্মুখীন হন।


ফলিত গবেষণা বিভাগের বিজ্ঞানীরা গত অর্থবছরে ২১৯ জন কৃষকের মাঠে উন্নত জাত প্রদর্শন করেছেন। তারা ৬১ জন কৃষকের মাঠ পর্যায়ে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ প্রদর্শন করেছেন। তাছাড়া ৮৩টি মাঠ দিবস ও ৬১টি কৃষক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা হয়েছে। এ বিভাগের কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায় ৪০,৩৩৬ কৃষক-কৃষাণি ব্রির বিভিন্ন প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হয়েছেন। ব্রির প্রশিক্ষণ বিভাগ গত বছর ১৪,৬৩৭ জন প্রশিক্ষণার্থীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। এর মধ্যে ১২,৩৯০ জন কৃষক, ২,০৩০ জন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, ১৮০ জন বিজ্ঞানী ও ৩৭ জন এনজিওর কৃষি কর্মকর্তা ছিলেন।


এই ধারাবাহিক সফলতার নবায়নের জন্য এখন যা আরও জরুরি ভিত্তিতে করা প্রয়োজন তাহলো, ব্রি প্রযুক্তি দ্রততম সময়ের মধ্যে কৃষক পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া। একইসঙ্গে ব্রির কাছে গণমানুষের প্রত্যাশা হলো, তারা যেন হেক্টরে ১২ থেকে ১৪ টন ফলনের হাইব্রিড ধানের জাত এবং ১০ থেকে ১২ টন ফলনের উফশী জাত উদ্ভাবন করার জন্য তাদের গবেষণা কর্যক্রমকে আরও জোরদার করেন। লবণাক্ত এলাকাসহ প্রতিকূল পরিবেশে ধানের আবাদ বাড়িয়ে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবার আরও সচেষ্ট হওয়াটাও সমান জরুরি। এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সবার এ কথাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এককভাবে কখনও সাফল্যের শীর্ষে চলে যেতে পারে না।


খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বর্তমানে আমরা যে স্বস্তিকর অবস্থানে আছি তার নেপথ্যে আরও অনেকে কাজ করছেন । এদিক থেকে সর্বাগ্রে আসে আমাদের কৃষকভাইদের কথা যারা হাজারো প্রতিকূলতার মধ্যেও রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কষ্টকর ফসল ফলানোর কাজটা অব্যাহত রেখেছেন। আর সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকসহ অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যারা ভালো বীজসহ অন্যান্য লাগসই প্রযুক্তি যথাসময়ে কৃষকের দোরগোরায় পৌঁছে দেয়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেন তাদের অবদানও এখানে প্রণিধানযোগ্য।

 

লেখক:
এম এ কাসেম*

* প্রযুক্তি সম্পাদক ও প্রধান, প্রকাশনা ও জনসংযোগ বিভাগ, ব্রি, গাজীপুর-১৭০১,  ই-মেইল: mkashem1@yahoo.com  মোবাইল : ০১৭১২৮৪১৯৭০


Share with :

Facebook Facebook