কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য

আমাদের দেহটাকে একটি ইঞ্জিনের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। ইঞ্জিন জ্বালানি পুড়িয়ে শক্তি উৎপাদন করে। সেই শক্তি দিয়েই চলে। আমাদের দেহের সব ধরনের কাজের জন্যই শক্তি দরকার হয়, আর এ শক্তি আসে আমাদের খাওয়া খাদ্য থেকে। আমাদের দেহের সব অঙ্গ-প্রতঙ্গ  যেসব উপাদান দ্বারা গঠিত, ওই উপাদানগুলো প্রতিনিয়িত কিছু না কিছু পরিবর্তিত হয়। একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে- হাড়ে যে ক্যালসিয়াম আছে তা থেকে প্রতিদিন ৭০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম বের হয়ে আসে এবং খাবার থেকে ঐ ক্যালসিয়াম হাড়ে যায়। এভাবে অন্যান্য অনেক উপাদান দেহ থেকে বেরিয়ে যায় এবং খাবার থেকে ওইসব উপাদান এসে সে স্থান দখল করে। তাহলে সহজেই বোঝা যাচ্ছে যে, খাবারের এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যাবতীয় কাজকর্মের জন্যই খাদ্য প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের শরীরের জন্য যে খাবার দরকার তা আমরা খাচ্ছি কি-না? না কি রাসায়নিক দ্রব্য মিশানো বিষ খাচ্ছি?


পৃথিবীতে বহুরোগ সৃষ্টির জন্য খাদ্য উপাদান দায়ী। বাংলাদেশে অধিকাংশ খাদ্যসামগ্রী অনিরাপদ বা বিভিন্ন মাত্রায় ভেজালযুক্ত। এ সমস্যা খাদ্য প্রস্তুত করা থেকে ভক্ষণ পূর্ব পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে বিদ্যমান। খাদ্য প্রস্তুতকারক, প্রক্রিয়াজাতকারক, রেস্তোরাঁ, ফাস্ট ফুডের দোকান প্রত্যেকেই এ ভেজালীকরণ প্রক্রিয়ায় জড়িত। এ প্রক্রিয়া জনস্বার্থের জন্য মারাত্মক হুমকি, যা নানাবিধ রোগব্যাধীর জন্য দায়ী। বিগত কয়েক দশকে এদেশে অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণ জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। ১৯৮০ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য ইনস্টিটিউটের একটি জরিপে দেখা যায় বাংলাদেশের শতকরা ৬৩ ভাগ অপুষ্টির জন্য অপার্যপ্ত খাদ্যাভ্যাস ও ভেজাল খাদ্য গ্রহণ দায়ী। ২০০৩ সনে একটি গবেষণায় দেখা যায় পূর্ববতী দশকের প্রায় ৫০% খাদ্য সামগ্রীই ভেজালপূর্ণ যা ঢাকার জনস্বাস্থ্য বিভাগ (IPH) দ্বারা পরিচালিত ছিল। একইভাবে সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, ২০০১-২০০৯ সন পর্যন্ত গৃহীত প্রায় অর্ধেকের বেশি খাদ্যসামগ্রীই ভেজালপূর্ণ। এ সরকারি পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, বিগত ১০ বছরে এদেশে খাদ্যে ভেজাল দেয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ভেজাল খাদ্যে নানাবিধ প্রাণঘাতী প্রভাব রয়েছে। জাতীয় টাস্কফোর্স NTFS-এর মতে, ভেজাল খাদ্যসামগ্রী প্রতি বছর বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগসহ ডায়রিয়া ও অপুষ্টির জন্য দায়ী। এক্ষেত্রে বয়স্কদের তুলনায় শিশুরা বেশি আক্রান্ত, যা শিশু মৃত্যুর জন্য দায়ী। বেশিরভাগ ভেজাল খাদ্য কঠিন ও জটিল রোগের জন্য দায়ী। সম্প্রতি সময়ে এই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার শিশু মৃত্যুর এক ভয়ানক চিত্র তুলে ধরেছে যাতে প্রতি ১৯ জন শিশুর অন্তত ১ জন শিশু ৫ বছরের পূবেই মৃত্যুবরণ করে। এ অবস্থায় নিয়ন্ত্রক সংস্থ্যা সমূহকে যে কোনো মূল্যে আরো শক্তিশালী ও বেগবান হতে হবে।


বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান প্রধান আলোচ্য বিষয় ও জনস্বাস্থ্যে তাদের প্রভাব
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করে এদেশে বিভিন্ন জটিল ও কঠিন রোগসহ ডায়রিয়া, ক্যান্সার, হৃদরোগ, বিভিন্ন জন্মগত সমস্যার জন্য ভেজাল খাদ্য গ্রহণই দায়ী। নিম্নোক্ত আলোচনায় খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব সংক্রান্ত বিষয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-


১. অস্বাস্থ্যকর উপায়ে খাদ্য সামগ্রী আনা নেয়া
বাংলাদেশে খাদ্য শিল্পে অস্বাস্থ্যকর উপায়ে খাদ্যসামগ্রী আনা নেয়া একটি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অগনিত রেস্তোরাঁ, কনফেকশনারি, প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিদ্যমান। অস্বাস্থ্যকর খাবারই মূলত ডায়রিয়া ও অপুষ্টির জন্য দায়ী। ICDDRB এর তথ্যানুসারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) তাদের সমীক্ষায় প্রমাণ পেয়েছে প্রায় প্রতিদিন ৫০১ জন মানুষ ডায়রিয়াজনিত রোগাক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসে যার পেছনে ভেজাল খাদ্য গ্রহণ দায়ী। এ সংস্থার তথ্যানুসারে NTFS প্রমাণ পেয়েছে শুধুমাত্র ১৯৯৮ সালেই একমাত্র বাংলাদেশেই ১,৬৫৭৩৮১ জন ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর ২০৬৪ জন মারা যায় ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে। অস্বাস্থ্যকর খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাদ্য রপ্তানি শিল্পের গুরুতর প্রভাব ফেলে যেমন ১৯৯৭ সালে EU এদেশ থেকে চিংড়ি রপ্তানি নিষিদ্ধ করে অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়াজাতকরণের কারণে।


২. খাদ্যে ফরমালিন ও DDT-এর ব্যবহার
ফরমালিনের ব্যবহার

ফরমালিন একটি বর্ণহীন তীব্র গন্ধযুক্ত রাসায়নিক পদার্থ যা টেক্সটাইল, কাগজ, রঞ্জক, অবকাঠামো শিল্প এবং মানুষের মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য সুপরিচিত। এটি পানিতে দ্রবীভূত ফরমালডিহাইড ও গ্যাস থেকে সৃষ্টি। এটা মাছ, ফল, বিভিন্ন খাদ্য দ্রব্য সংরক্ষণে ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হয় যা জনস্বাস্থের জন্য চরম হুমকি। পানিতে মিশ্রিত ফরমালিন মাছ এবং ফল সতেজ রাখতে ব্যবহৃত হয়। এটা সাধারণত মৃত জিনিস পচাতে বাধা দেয় যা বর্তমানে বিভিন্ন খাদ্য দ্রব্য সংরক্ষণের ব্যবহৃত হচ্ছে। ফরমালিনের ব্যবহার নাক ও শ্বাসনালির জ্বালাপোড়ার জন্য দায়ী। এছাড়া সর্দি, গলার ঘা, স্বরযন্ত্রের প্রদাহ, ব্রংকাইটিস, ও নিউমোনিয়া রোগের জন্য দায়ী। তাছাড়া এটা ত্বকে প্রভাব ফেলে এবং বিভিন্ন চর্মরোগ যেমন ডার্মাটাইটিস, চুলকানি, সৃষ্টি করে। মাত্রারিরিক্ত ফরমালিন গ্রহণে তীব্র ব্যথা ও পেটের জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে। আবার আলসার, মিউকাস পর্দার ক্ষয়সহ, অভ্যন্তরীণ অন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করে। এটি মাথাঘুরা রক্তবমি, রক্তসহ ডায়রিয়া, রক্তসহ প্রস্রাব, অম্লতা, ঝিমঝিমভাব, রক্ত প্রবাহে সমস্যা এমনকি মৃত্যুর জন্যও দায়ী হতে পারে।


DDT-এর ব্যবহার
পৃথিবীতে ৪৯টি দেশে DDT-এর ব্যবহার নিষিদ্ধ এবং ২৩টি দেশে সীমাবদ্ধ পরিসীমায় DDT ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশেও DDT-এর ব্যবহার নিষিদ্ধ কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটির যথেচ্ছ ব্যবহার এখনও বিদ্যমান রয়েছে, বিশেষ করে শুঁটকি শিল্পে। DDT-এর ব্যবহার বিভিন্ন ক্যান্সার যেমন- স্তন ক্যান্সার, যকৃৎ ক্যান্সার, অগ্নাশয়ের ক্যান্সার প্রভৃতির জন্য দায়ী। DDT-এর ব্যবহার প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে যেমন- যৌন অক্ষমতা, গর্ভপাত, অগ্রিম মেনোপেজ, জন্মত্রুটি, কম ওজনবিশিষ্ট শিশু জন্ম ইত্যাদি।


৩. খাদ্যে ক্ষতিকর রঙ ব্যবহার
বাংলাদেশে শিল্প রঞ্জক যেমন টেক্সটাইল শিল্পে ব্যবহৃত রঙ খাদ্যে ব্যবহৃত হয় যেমন মিষ্টি বিপণিতে মিষ্টির রঙ উজ্জ্বল করতে কৃত্রিম রঙ ব্যবহার করা হয়। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের মানুষ মিষ্টি খেতে ভালোবাসে এবং বিভিন্ন উৎসবে মিষ্টি একটি অপরিহার্য উপাদান। এছাড়াও বেগুনি, পেঁয়াজু প্রভৃতি ইফতারসামগ্রীতে কৃত্রিম রঙ ব্যবহার করা হয়।


শিল্প রঞ্জক ও রঙ সমৃদ্ধ খাদ্য সামগ্রি চুলকানি, জন্ডিস প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। তাছাড়া শ্বাসক্রিয়া হাঁপানি যকৃত, বৃক্ক, অস্থি প্রভৃতির ওপর ক্ষতিসাধন করে থাকে।
ক্ষতিকারক রঞ্জক মিশ্রিত ফল হাঁপানির জন্য দায়ী
কানাডিয়ান ফুড ইন্সপেকশন এজেন্সি (CFIA) ‘হেরিটে ব্রান্ড পাম তেল’ খেতে জনসাধারণকে সতর্ক করে দিয়েছে কারণ এতে অভক্ষণযোগ্য রঙ ব্যবহার করা হয়। এটা ল্যাবরেটরি পশুদের ক্যান্সার তৈরি করে এবং মানব স্বাস্থ্যে বিশেষ করে মানসিক সমস্যা, মাথা ব্যাথা, অ্যালার্জি প্রভৃতির জন্য দায়ী। গবেষণায় দেখা যায় কৃত্রিম রঙ বদহজম, অ্যালার্জি, এমনকি ক্যান্সারও সৃষ্টির জন্য দায়ী। এছাড়া অনিদ্রা, বমিবমিভাব, ডায়রিয়া, হৃদরোগ ও বিভিন্ন রকমের স্নায়ুরোগের জন্য কৃত্রিম রঙ দায়ী।


৪. খাদ্যে অন্যান্য ভেজালসমূহ
উপরোল্লিখিত বিষয় ছাড়াও নিত্যনৈমিত্তিক অন্যান্য খাদ্যে ভেজাল প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে-
মুড়িতে ইউরিয়া মেশানো যা মুড়িকে সাদা ও বড় আকারের করে। ইউরিয়া মানব স্বাস্থ্যের জন্য
 ক্ষতিকর। এটি আলসার সৃষ্টি করে।
সাম্প্রতিককালে একটি চিকিৎসা জরিপে দেখা যায় যে, মুড়িতে ক্যাডমিয়ামের পরিমাণ সাধারণত চালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ, যা ইউরিয়া ব্যবহারের কারণে বলে প্রতীয়মান হয়। চিকিৎসকরা বৃক্ক বা কিডনি রোগের জন্য ক্যাডমিয়াম দায়ী বলে সর্তক করেন।
বাংলাদেশীদের খাদ্য তালিকায় বিশেষ করে শিশুদের জন্য একটি অতি প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান যা খাঁটি দুধ থেকে তৈরি করা হয়। কিন্তু বর্তমানে নানাভাবে ভেজালপূর্ণ যা আলুর পেস্ট, পামতেল, সয়াবিন তেল, পশু বা উদ্ভিজ্জ চর্বি প্রভৃতির সাথে কৃত্রিম ফ্লেভার মিশায়ে তৈরি করা হয়।


৫. আইনগত অবকাঠামো
বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা বিদ্যমান, যারা প্রচলিত আইনের বাইরে শুধু খাদ্য নিরাপত্তায় বিশুদ্ধ আইন প্রণয়ন ও কার্যকর করে থাকে।
পেনাল কোড-১৮৬০
নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য আইন-১৯৫৭, ১৯৫৮, ১৯৬৪
খাদ্য বা বিশেষ আদালত আইন-১৯৬৫
ভেজালমুক্ত খাদ্য অধ্যাদেশ-১৯৫৯ এবং ভেজালমুক্ত খাদ্য নীতিমালা-১৯৬৭
বালাইনাশক অধ্যাদেশ-১৯৭১ এবং বালাইনাশক নীতিমালা-১৯৮৫
বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪
বি.এস.টি.আই অধ্যাদেশ-১৯৮৫ যা BSTI আইন-২০০৩ হিসেবে সংশোধিত
আয়োডিন স্বল্পতা রোধ আইন-১৯৮৯
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন-২০০৯
ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন-২০০৯
পশু জবাই (নিষেধাজ্ঞা) ও মাংস নিয়ন্ত্রণ (সংশোধনী) অধ্যাদেশ-১৯৮৩
কৃষি পণ্য বাজার আইন-১৯৬৪ (সংশোধন- ১৯৮৫)
মাৎস্য নিরাপত্তা এবং সংরক্ষণ আইন-১৯৫০ (সর্বশেষ সংশোধন-১৯৯৫)
সামুদ্রিক মাৎস অধ্যাদেশ-১৯৮৩ এবং নীতিমালা- ১৯৮৩
 মাছ ও মাংস দ্রব্যাদি (পরীক্ষা ও মান নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ-১৯৮৩) মাৎস ও মাংস দ্রব্যাদি পরীক্ষা ও মান নিয়ন্ত্রণ     নীতিমালা- ১৯৯৭
দানাদার খাদ্য সরবরাহ (কুসংস্কার নিরোধ) অধ্যাদেশ-১৯৫৬
উল্লিখিত আইনগুলো সাধারণত সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রভৃতি দ্বারা কার্যকর করা হয়।

 

৫. খাদ্যে ভেজালরোধে আইন কাঠামোর দুর্বলতা
বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল প্রয়োগ একটি সাধারণ ব্যাপার। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অবহেলা এজন্য অনেকখানি দায়ী। অন্যদিকে, আইনের ব্যর্থতা, খাদ্য মূল্য, তথ্য অপ্রতুলতা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রভাব প্রভৃতি বাংলাদেশ খাদ্যে ভেজাল প্রক্রিয়ায় সমভাবে দায়ী। এ পরিপ্রেক্ষিতে নিচে কিছু বিষয় আলোচনা করা হলো-

 

ক. আইনের বহুমুখিতা
খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ বাংলাদেশে প্রায় ২০-৩০টি আইন বিদ্যমান। একটি বিষয়ে এতগুলো আইন অপ্রয়োজনীয়। নিচে দুটি উদাহরণ দেয়া হলো-
পেনাল কোন ১৯৬০ এর ২৭২ ও ২৭৩নং অনুচ্ছেদ মোতাবেক খাদ্যে ভেজাল দেয়া একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আবার PFO-১৯৫৯ এর অনুচ্ছেদ ৬(১) (ক) অনুসারে অনুচ্ছেদ ১৬ অনুসারে SPA-১৯৭৪ এর অনুচ্ছেদ ২৫ (গ) অনুসারেও এটি একটি অপরাধ। একইভাবে সরকার CRRP-২০০৯ এর অনুচ্ছেদ ৮১ একই ধরনের অপরাধ ও শাস্তির কথা উল্লেখ করেছে।
অন্যদিকে DDT-এর ব্যবহার PO–১৯৭১ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কিন্তু DDT-এর ব্যবহারে অপরাধীকে PC-১৯৬০। PFO-১৯৫৯, SPA-১৯৭৪ এবং CRRP-২০০৯ মোতাবেক শাস্তি প্রদান করা যাবে।
আইনে এ ধরনের বহুমুখিতা, খাদ্যসামাগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহকে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে দেয়। কোন অপরাধে কোন আইন প্রযোজ্য হবে। যুক্তরাষ্ট্রের হম্পিটর রিভিউ-২০০৯ একটি গবেষণায় দেখে যে, প্রায় ৬২ ভাগ খাদ্য সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। খাদ্যে ভেজালরোধে এসব আইন বোঝে না। এতে দেখা যায় অনেক খাদ্য বিক্রেতা না জেনেই আইন অমান্য করে। এজন্য খাদ্য নিরাপত্তা বা ভেজাল প্রতিরোধ আইন সংশোধন করে একটি মাত্র আইন প্রনয়ন করা জরুরি।


খ. আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহের মাঝে সমন্বয়হীনতা
যদিও খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে অনেক আইন বিদ্যমান যা ইতঃপূর্বে আলোচিত হয়েছে কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহের মাঝে কিন্তু সমন্বয়হীনতা বিদ্যমান আছে। এজন্য সরকার ২০০৫ সালে PFO-১৯৫৯ এর সংশোধন করে এতে ৪(ক) অনুচ্ছেদ সংযোজন করে, যার মাধ্যমে জাতীয় খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ উপদেষ্টা পরিষদ (NFSAC) গঠন করা হয়, যা সমন্বয়কারী সংস্থা হিসেবে কার্যকর আছে। কিন্তু NFSAC-এর অনেক দুর্বলতা আছে যেমন- এতে জনবলের অভাব রয়েছে তাছাড়া এটি কোনো স্বাধীন সংস্থা নয়। এছাড়া সরকারে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় খাদ্যে ভেজাল সংক্রান্ত বিষয়ে তদারকি করে যা সংশ্লিষ্টদের মাঝে দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। এ প্রেক্ষিতে একটি উচ্চ পর্যায়ের স্বাধীন সংস্থা তৈরি করা দরকার যেমন-UK, USA & Australia-তে বিদ্যমান আছে।


গ. স্বচ্ছতা, স্বায়ত্তশাসন ও আমলাতান্ত্রিকতা
এটা সর্বজনগ্রাহ্য যে, খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ একটি কার্যকর আইন অবকাঠামো থাকা দরকার যা হবে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ এবং জবাবদিহিতামূলক। কারণ এসবই সামগ্রিক সরকারি অবকাঠামোতে অত্যন্ত জরুরি। একটি নিয়ামক সংস্থাকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে স্বচ্ছ হওয়া জরুরি। পরিতাপের বিষয় যে, এসব নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সরকারি আমলা, মন্ত্রী প্রভৃতি ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে গঠিত, যেমন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের NFSAC অনুচ্ছেদ ৪ (ক) (১) অনুসারে ১৫ জন সদস্য দ্বারা গঠিত যার ১২ জনই সরকারি উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও মন্ত্রীবর্গ। উন্নত বিশ্বে যেমন কানাডায় একটি বাহ্যিক এবং দক্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিদ্যমান যারা স্বচ্ছতার সঙ্গে এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি তদারকি করে। অধিকন্তু, PFO-১৯৫৯ এর সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো স্বাধীনতা রাখা হয়নি যার কারণে এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব প্রকটভাবে বিদ্যমান যা বিগত দশকে বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল ইস্যুটি জটিল আকার ধারণ করেছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো স্বাধীন বা স্বায়ত্তশাসিত নয়। মারাত্মকভাবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাপূর্ণ। যেমন- CRRP-২০০৯ এর ১৮ অনুচ্ছেদ গঠিত হয়েছে CNDRP প্রশাসনের তদারকিতে। কিন্তু অনুচ্ছেদ ৭১-এ বলা হয়েছে ভুক্তভোগী অপরাধী শাস্তি প্রদানে মামলা করতে পারবে CNDRP-এর অনুমতি সাপেক্ষে। এ ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনকে অকার্যকর করে ফেলে।


ঘ. দণ্ড বিধানে অপর্যাপ্ততা
অপরাধ নিরোধকল্পে দ- বিধানে যথেষ্ট ঘাটতি বিরাজমান, যার ফলে প্রশ্ন উঠেছে প্রচলিত দ-বিধি কি যথেষ্ট? উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে-পেনাল কোড-১৮৬০ এর ২৭২ অনুচ্ছেদ মোতাবেক খাদ্যে ও পানীয়তে ভেজাল দিলে সর্বোচ্চ শাস্তি ৬ মাসের কারাদ- অথবা সর্বোচ্চ জরিমানা ১০০০ টাকা মাত্র, যা এই শতকে শাস্তি হিসেবে অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশ PFO ১৯৫৯ একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন কিন্তু এতে পর্যাপ্ত শাস্তি ব্যবস্থা নেই। এ আইনটি ২০০৫ সালে সংশোধন করা হয় যা এখন অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এখানে প্রথমবার খাদ্য দ্রব্যে ভেজাল মেশানোর জন্য শাস্তির বিধান সর্বোচ্চ ১ বছরের জেল অথবা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা। পুনরায় একই ধরনের অপরাধ করলে এই আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি ৩ বছরের জেল অথবা ২ লাখ টাকা জরিমানা। সংশোধিত আইন মোতাবেক খাদ্য দ্রব্যে প্রথমবার কোনো শিল্পকারখানা ফরমালিন, কৃত্রিম রঙ প্রভৃতি মেশানো অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ১ বছরের জেল অথবা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং পুনরায় একই ধরনের অপরাধ করলে এ আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি ৩ বছরের জেল অথবা ২ লাখ টাকা জরিমানা। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ পরিমাণ শাস্তি যথেষ্ট নয় যেখানে খাদ্যের বিষক্রিয়া বা ভেজালের কারণে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে। অপরদিকে CRRP-২০০৯ এর দণ্ডবিধি কিছুটা উচ্চ পর্যায়ের কিন্তু তবুও পর্যাপ্ত নয়। উক্ত আইনে ৩৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে কোনো ব্যক্তি খাবার দ্রব্যে মোড়কজাত না রাখলে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান ১ বছরের জেল অথবা ৫০ হাজার টাকা আর্থিক জরিমানা। এ আইনে কোনো ব্যক্তি খাদ্য দ্রব্যে নিষিদ্ধ রাসায়নিক মেশালে সর্বোচ্চ শাস্তি বিধান হলো ৩ বছরের জেল অথবা ২ লাখ টাকা আর্থিক জরিমানা শাস্তি দ্বিগুণ হয়ে যাবে যদি কোনো ব্যক্তি একাধিকবার বা বারবার এই ধরনের অপরাধ করে থাকে।


উপরোল্লিখিত আইনগুলোর তুলনায় SPA-১৯৭৪ আইন যথেষ্ট কঠিন যেখানে খাদ্যে ভেজাল প্রদানের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এমনকি মৃত্যুদণ্ড। তবে এ ধরনের দণ্ডবিধি অমানবিক ও অনাকাক্ষিত।


ঙ. আইন প্রয়োগজনিত সমস্যা
বাংলাদেশে আইনের শাসনের ঘাটতি রয়েছে। আবার ট্রেনিং সতর্কীকরণ নোটিশ, উন্নয়ন নোটিশ প্রচলিত নেই বললেই চলে। আবার প্রশাসনিক আইনি প্রক্রিয়া সংগঠিত নয়। এতে কোনো সুষ্ঠু তদারকি ব্যবস্থা নেই। এজন্য আইন প্রয়োগের প্রক্রিয়া দ্রুতও স্বচ্ছ করা জরুরি। প্রকৃতপক্ষে আইন প্রয়োগে কোনো নির্দিষ্ট সংস্থা নেই বা কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নেই। সাধারণত বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। যেখানে একজন স্যানিটারি পরিদর্শক অধিকাংশ সময় নানা কাজে ব্যস্ত থাকে যার জন্য খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ গঠন গৌন হয়ে পড়ে। অপরপক্ষে নিযুক্ত কর্মকর্তা আবার নির্বাহী ম্যাজিট্রেটের অনুমতি ছাড়া বাস্তবায়ন করতে পারেন না। এজন্য সমগ্র প্রক্রিয়া মন্থরভাবে চলে।


খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচিতে কিছু পরামর্শ
আঞ্চলিক স্বদেশ বিধানে আইন সংশোধন, অবকাঠামো বিনির্মাণ এবং কর্মকৌশল নির্ধারণ যা খাদ্য নিরাপত্তায় সাদৃশ্য প্রয়াগিক সহায়তা প্রদানে সক্ষম।
আন্তর্জাতিক মান অর্জনে প্রচলিত মানদ- ও নিবন্ধীকরণ প্রক্রিয়া সংশোধন।
প্রযুক্তিজাত সহায়তার জন্য ১০ বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণ-সচেতনতা মূলক কার্যক্রম হাতে নেওয়া।
ঝুঁকি নিরূপণ অবকাঠামো নিমার্ণে সহায়তা প্রদান এবং ভেজাল ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ।
খাদ্য নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক প্রকাশনা প্রকাশ করা যেখানে খাদ্য নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট তথ্য, উপাত্ত ঘটনা প্রভৃতি ঠাঁই পাবে।
SAARC সচিবালয়গুলোর মাঝে খাদ্য নিরাপত্তা বলয়, কমিশন বা কাউন্সিল গঠনে সহায়তা প্রদান।
খাদ্যবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে এশিয়ার দেশ সমূহের অগ্রাধিকার প্রদান।
SAARC দেশসমূহের মাঝে আঞ্চলিক এপিডেমিওলজিক নেটওয়ার্ক স্থাপন যাতে খাদ্যবাহিত রোগ সংক্রমণ বিশেষ করে সম্ভাব্য দূষণ ঝুঁকি এড়ানো যাবে।
দীর্ঘ ও স্থায়ী পরিকল্পনা প্রণয়ন- যাতে সম্পদ, প্রক্রিয়া ও পথ বাতলানো থাকবে, যার মাধ্যমে খাদ্যবাহিত অসুস্থতার সাথে সংশ্লিষ্ট দেশসমূহ প্রতিযোগিতা করতে পারবে।


উপসংহার
খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ একটি যুগোপযোগী নিয়ন্ত্রক সংস্থা একান্ত জরুরি। বাংলাদেশে এরকম সংস্থার অভাব জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকির মুখে পতিত। যাহোক উদ্ভূত পরিস্থিতিতে FSRRB-এ একটি একক উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন মতো খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে স্বয়ংসম্পন্ন থাকবে। ওই ধরনে প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকতে হবে এবং সব ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা মুক্ত হতে হবে। বিদ্যমান আইনসমূহকে সংশোধন করে যুগোপযোগী করতে হবে।

* উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ। মোবাইল: ০১৭১১-৮৫৪৪৭১। ** সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, বাউ-জার্মপ্লাজম সেন্টার, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ। মোবাইল: ০১৭১১-১২৪৭২২

 

প্রফেসর ড. এম. এ রহিম*
ড. মো. শামছুল আলম (মিঠু)**


Share with :

Facebook Facebook