কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

পুষ্টি নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য দূরীকরণে সবজি চাষ

খাদ্য গ্রহণের দুটি প্রধান উদ্দেশ্য রয়েছে। এক আমাদের ক্ষুধা নিবৃত্ত করা, দুই দেহের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির সরবরাহ নিশ্চিত করা। অর্থাৎ সুস্থ সবল দেহের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান গ্রহণের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পুষ্টির জোগান নিশ্চিত করা খাদ্য গ্রহণের অন্যতম লক্ষ্য। খাদ্য হিসেবে সবজির ব্যবহার আমাদের ছয়টি খাদ্য উপাদানের মধ্যে মূল্যবান দুটি উপাদান ভিটামিন ও খনিজ লবণ সরবরাহ করে থাকে। পরিমাণে কম লাগলেও দেহের নানা রকম জৈবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, দেহের বৃদ্ধি ও বিকাশ এবং বুদ্ধি বিকাশে এ দুটি উপাদান অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রঙিন শাকসবজিতে রয়েছে এন্টি অক্সিডেন্ট, তাছাড়া সবজির খাদ্য আঁশও দেহের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেহের ওজনের সাথে মিল রেখে খাদ্যে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সবজি গ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে নানা রকম সবজি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করার প্রয়োজন রয়েছে। আর সেজন্য প্রয়োজন রয়েছে সারা বছর ধরে বৈচিত্র্যময় সব সবজি উৎপাদন নিশ্চিত করা। সবজি উৎপাদন পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়ন এক দিকে যেমন আমাদের পুষ্টি নিরাপত্তা বিধানে ভূমিকা রাখতে পারে অন্যদিকে তা আমাদের দারিদ্র্য দূরীকরণেও সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।


সবজি চাষের চালচিত্র
বড় উর্বর আমাদের মাটি। সুস্থ সবল বীজ আর একটুখানি যত্ন পেলে এদেশের প্রায় সব ধরনের মাটিতেই নানা রকম সবজি ফলানো যায়। এদেশে মোট আবাদি জমির পরিমাণ মোট ৮.৫ মিলিয়ন হেক্টর। সবজি আবাদের জন্য ব্যবহৃত জমির পরিমাণ ২০১৪-১৫ সনের হিসেব অনুযায়ী ০.৭৯৮ মিলিয়ন হেক্টর আর এ সময় কালে সবজির উৎপাদন হয়েছে ১৪.২৩ মিলিয়ন মে.টন। আমরা সবজি চাষের ব্যবহার করছি দেশের মাত্র শতকরা ৯.৩৮ ভাগ জমি আর এতে আমাদের মাথাপিছু সবজি সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে মাত্র ৭০ গ্রাম। যদিও একজন সুস্থ সবল মানুষের জন্য প্রতিদিন ২২০ গ্রাম সবজি গ্রহণ করা প্রয়োজন। সবজির এ বিশাল ঘাটতি পূরণ করতে হলে আমাদের সবজির চাষ বাড়াতে হবে এবং বছরব্যাপী কী কী ধরনের সবজি কখন লাগানো যায় সেটি জানতে হবে। জানতে হবে সবজি চাষের নিয়ম কানুন আর নিশ্চিত করতে হবে সবজি চাষের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রাপ্তিও।


সবজি চাষের জমি
মাথাপিছু আমাদের আবাদি জমির পরিমাণ কমতে কমতে ০.০৪ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। সহজ হিসেবে এটি মাথা পিছু মাত্র ৪০০ বর্গমিটার। এর মধ্য থেকেই আমাদের চাল, ডাল, তেল, ফলমূল, শাকসবজিসহ নানা রকম ফসল ফলাতে হয়। ফলে কোন ফসলের জন্য কতটুকু জমি আমরা ছাড়তে পারি তার একটি জটিল হিসেব রয়েছে বটে। তবে অল্প দিনে বৈচিত্র্যময় সবজি উৎপাদন করে অধিক লাভবান হওয়ার যে সুযোগ রয়েছে সেটি আমাদের বুঝতে হবে। বৈচিত্র্যময় সবজির জোগান বৃদ্ধি করতে হলে বাড়াতে হবে সবজির চাষ। এর জন্য আমাদের চারপাশে বিদ্যমান জমি বা ফাঁকা স্থানকে সবজি চাষে ব্যবহার করতে হবে। মাঠে মৌসুমভিত্তিক সবজি চাষের পাশাপাশি সবজি চাষের জন্য নানা রকম স্থান বাছাই করে নিতে হবে। এগুলো হলো-


- সমভূমি চাষের জমিতে সবজি চাষ
- বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ
- বাড়ির ছাদে সবজি চাষ
- পানিতে মাচায় সবজি চাষ
- ঘরের চালে সবজি চাষ
- চর ভূমিতে সবজি চাষ
- উপকূলীয় অঞ্চলে সবজি চাষ
- ভাসমান সবজি চাষ
- হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে সবজি চাষ।

 

মৌসুমভিত্তিক সবজি চাষ
সাধারণভাবে আমাদের দেশে তিনটি মৌসুমে ফসল উৎপাদন করা হয়। সে হিসেবে সবজির মৌসুমকেও তিন ভাগে ভাগ করা যায়-
১. শীতকালীন সবজি চাষ
২. গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষ
৩. সারা বছর আবাদযোগ্য সবজি চাষ

 

সারণি-১ : বিভিন্ন মৌসুমে চাষ উপযোগী হরেক রকম সবজির তালিকা

প্রকার    

                                        মৌসুমভিত্তিক আবাদ উপযোগী

 শীতকালীন    

গ্রীষ্মকালীন    

সারাবছর

শাক/পাতা জাতীয়  

 

 

 

পালং, ধনেপাতা, বথুয়া, লাফা, চায়না বাঁধাকপি, লেটুস,      টক পালং, মটরশুটিশাক, ছোলাশাক, খেশারি শাক, বাঁধাকপি, পেঁয়াজ পাতা     

গিমাকলমি, পুঁই, কচুশাক, মিষ্টি আলুশাক, হেলেঞ্চা, চুকুর, পাটশাক, মেস্তাশাক, বিলাতি ধনে        

লালশাক, ডাঁটাশাক, থানকুনি, পুদিনা, মুলাশাক, লাউ-কুমড়াশাক    

 

ফুল ও ফল জাতীয়    

 

ফুলকপি, ব্রোকলি, বকফুল, টমেটো, ক্যাপসিকাম, শিম, ঝাড় শিম, মটরশুটি      

কচুফুল, বারোমাসি সজিনা, ঝিঙ্গা, ধুন্দল, কাঁঠাল, পটোল, কাঁকরোল  

বেগুন, লাউ-কুমড়া ফুল, বরবটি, পেঁপে, বেবিকর্ন/ভুট্টা, কাঁচকলা

মূল/কাণ্ড জাতীয়

 

 

   

গাজর, মুলা, আলু, শালগম, ওলকপি, বিট

 

 

            

গাছ আলু, পেস্তা আলু, ক্যাসাবা, কচুলতি, পানিকচু, কালোকচু, মৌলবি কচু, লাউ, মুখিকচু, মিষ্টিআলু, মাদ্রাজি ওল, শাপলা

ডাটা, মুলা

 

 

 

 

আগের দিনে কেবল মৌসুমভিত্তিক সবজি চাষ করা হতো। এখন নতুন নতুন সবজি জাত উদ্ভাবন ও সবজি জাত প্রবর্তনের ফলে প্রায় সারা বছরই সবজি চাষ করা সম্ভব হচ্ছে।


বছরব্যাপী সবজি চাষ
আমাদের সবজির প্রজাতি ও জাত বৈচিত্র্য একেবারে কম নয়। তাছাড়া প্রতি বছর সরকারি ও বেসরকারিভাবে বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণ বিভিন্ন রকম সবজির জাত, সবজির ব্রিডিং লাইন এবং নানা রকম সবজি জিন সম্পদ দেশে প্রবর্তন করা হচ্ছে। ফলে সারা বছরব্যাপী সবজি চাষ করার মতো দেশি বিদেশি জাত আমাদের হাতে রয়েছে। এমনকি বছরব্যাপী কী ধরনের সবজি কোন মাসে জন্মানো যায় তার নানা প্রস্তাবনাও সবজি বিশেষজ্ঞগণ দিয়েছেন (সারণি-১)। তবে বছরব্যাপী সবজি উৎপাদন করার জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো স্থানাভাব। কৃষক সাধারণত এক  জমিতে বছরে নানা রকম ফসল করে থাকেন। সেটি মাঠে ফসলাবর্তন করার স্বার্থেই তাঁকে করতে হয়। ফলে বাড়ির আঙিনার জমি পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হলেই কেবল বছরব্যাপী সবজি উৎপাদন করা সম্ভব হতে পারে। তাছাড়া সারা দেশে সবজি উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে বাড়ির আঙিনার পাশাপাশি বাড়ির ছাদে, উপকূলীয় অঞ্চলে, চরভূমিতে, পানিতে ভাসমান বেডে, পানিতে মাচা করে, হাইড্রোপোনিক কৌশল অবলম্বন করে সবজি চাষকে বিস্তৃত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন হবে সারা বছর নানা রকম সবজির বীজ সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। প্রয়োজন হবে সবজির জাত উদ্ভাবন ও বাছাই কার্যক্রম জোরদার করা এবং কৃষককে প্রযুক্তি বিষয়ক পরামর্শ প্রদান ও সবজি চাষে উৎসাহিত করা।


আমাদের বিভিন্ন রকম ফসল চাষের জন্য জমির প্রাপ্যতার একটি প্রতিযোগিতা রয়েছে। ফলে খুব বেশি নতুন জমি সবজি চাষের আওতায় আনা সহজ কাজ নয়। সারা দেশের মানুষের বছরব্যাপী সবজি চাহিদা মেটাতে হলে আমাদের সবজি আবাদের যেমন খানিকটা বিস্তৃতি ঘটাতে হবে তেমনি নির্দিষ্ট জমিতে পরিকল্পনা মাফিক নিবিড় সবজি চাষ করতে হবে।


বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ
প্রতিটি চাষির বাড়িতে পরিকল্পিত সবজি বাগান তৈরি করে পুষ্টি ও আয় বৃদ্ধি করা সম্ভব। এখনও বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনাতে নানা রকম শাকসবজি আবাদ করা হচ্ছে বটে, তবে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ততটা পরিকল্পিত নয়। বিএআরআই বিজ্ঞানীগণ অঞ্চল ভিত্তিক সবজি চাষের আটটি মডেল সুপারিশ করছেন যা নিম্নরূপ- 

ক. গয়েশপুর মডেল, পাবনা (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-১১, ১২)
খ. সৈয়দপুর মডেল, রংপুর (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-২, ৩ ও ২৭)
গ. আটকপালিয়া মডেল, টাঙ্গাইল (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-৮, ৯)
ঘ. পালিমা মডেল, টাঙ্গাইল (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-৮, ৯)
ঙ. নারিকেল মডেল (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-৯)
চ. লেবুখালী মডেল (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-১৩)
ছ. ঈশান গোপালপুর মডেল, ফরিদপুর (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-১১, ১২)
জ. বরেন্দ্র মডেল, রাজশাহী  (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-৫, ৬  ও   ২৬)
ঝ. গোপালপুর মডেল (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-২০)
ঞ. খাগড়াছড়ি মডেল (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-২৯)
এসব মডেলের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়ে থাকলে প্রযুক্তি আকারে দেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে এদের বিস্তার ঘটানো উচিত। এ বিষয়ে বিএআরআই এবং কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ একযোগে কাজ করতে পারে।


দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকায় সবজি চাষের বিস্তার
দিন দিন লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় অঞ্চলে সবজি চাষ বিঘ্নিত হচ্ছে। ফলে এ অঞ্চলের মানুষের সবজি গ্রহণের মাত্রা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে এবং পুষ্টি ঘাটতিও বাড়ছে। একদিকে সবজির চাহিদা থাকায় দাম বাড়ছে আর অন্যদিকে দূর থেকে সবজি সে এলাকায় সরবরাহ করতে হয় বলে এদের গুণগতমান রক্ষা করাও কঠিন হচ্ছে। তাছাড়া এ এলাকার অধিকাংশ জনগণকে লবণমুক্ত পানি পান করতে হয় বলে এদের খনিজ লবণের ঘাটতিও রয়েছে। কয়রাতে একদল কৃষক পাটের বস্তায়, কনক্রিটের পাত্রে বা কর্কের বাক্সে মাটি ও জৈবসার মিশিয়ে খানিকটা লবণাক্ততাসহিষ্ণু সবজি জাতের আবাদ করে সাফল্য লাভ করেছেন। এভাবে গ্রীষ্মকালে লাউ, চালকুমড়া, ঢেঁড়শ, ধুন্দল, কলমিশাক, পুঁইশাক চাষ করতে সক্ষম হয়েছেন। শীতকালে মরিচ, করলা, টমেটো, ডাটা, ওলকপি, বীট, ধনে এসব শাকসবজি আবাদ করা যায়।


বাড়ির ছাদে সবজি চাষের বিস্তৃতি ঘটানো

ঢাকা শহরের জনসংখ্যা ১ কোটিরও বেশি। আর এখানকার মানুষের আয়ও সারাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ করার মতো সচেতন লোকও ঢাকা শহরেই বেশি। তাছাড়া এখানে জন বসতির ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি বলে শাকসবজির চাহিদাও এখানেই সবচেয়ে বেশি। এখন অবশ্য দূষণমুক্ত তাজা শাকসবজি লাভের আশায়  বেশ কিছু বাড়ির ছাদে শাকসবজি চাষ একটু একটু করে শুরু হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, ছাদে বাগান করার উপযোগী পাত্র, প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং ছাদে বাগান করার উপযোগী নানা রকম সবজি বীজ সরবরাহ করা গেলে বাড়ির ছাদে সবজি বাগানের বিস্তৃতি ঘটানোর সুযোগ কিন্তু রয়েছে (সারণি-৩)। এতে তাজা শাকসবজি গ্রহণ করা সম্ভব হবে, বাড়তি আয় হবে, কর্মসংস্থান হবে, অবসর সময় কাটানো যাবে এবং শহরের পরিবেশেরও উন্নতি ঘটবে।

 

শীতকালীন 

   বর্ষাকালীন

টমেটো, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাল বাঁধাকপি, দেশি শিম, ওলকপি, ব্রোকলি, লেটুস, শালগম, গাজর, লাউ, মরিচ, বাংলা ধনিয়া, বিলাতি ধনিয়া, স্কোয়াশ, লালশাক, পালংশাক, মূলাশাক, পুদিনা ইত্যাদি    

শসা, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, কাঁকরোল, চালকুমড়া, বেগুন, বরবটি, ঢেঁড়শ, পুঁইশাক, লালশাক, ডাঁটা, পাটশাক, গিমা কলমি, করলা ইত্যাদি।

 

 

ভাসমান বেডে সবজি চাষের বিস্তৃতি
বাংলাদেশে ভাসমান বেডে শাকসবজি চাষের ঐতিহ্য কয়েকশ বছরের পুরনো। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের বৃহত্তর বরিশাল-ফরিদপুর জেলার মানুষ স্থায়ী জলাভূমি বা বিস্তীর্ণ বিল অঞ্চলে ভাসমান বেডে সবজি চাষ কৌশল অবলম্বন করে আসছেন দীর্ঘ সময় ধরে। সে কারণেই এই কৌশলটি এখন বেশ লাভজনক ও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ চাষ পদ্ধতির বিস্তৃতি ঘটানোর সুযোগ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের জলাশয়ে রয়েছে। এ বিষয়ে সম্প্রসারণ কর্মকা- জোরদার করে সবজি চাষ খানিকটা বাড়ানো যায়।


চরভূমিতে সবজি চাষ
বাংলাদেশে চরভূমির পরিমাণ প্রায় ০.৮২ মিলিয়ন হেক্টর। বিশাল এ চরভূমিতে সবজি চাষের  বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। কোন কোন এনজিও-এর সহায়তায় চরভূমিতে কোন কোন স্থানে এখন মিষ্টিকুমড়া, স্কোয়াশ, গাজর, মূলা, ওলকপি ইত্যাদি সবজি চাষ করা শুরু হয়েছে। এসব স্থানে নানা রকম পাতা জাতীয় সবজিরও আবাদ শুরু হয়েছে। প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রণোদনা এবং সম্প্রসারণ কর্ম চালিয়ে গেলে চরভূমিতে একই জমিতে একাধিক সবজি চাষ করাও সম্ভব। সে ক্ষেত্রে একটি দ্রুতবর্ধনশীল পাতা সবজির সাথে একটি মধ্যমেয়াদি সবজির আবর্তনের প্রয়োজন হবে। চরভূমির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে একানকার ফসলাবর্তন নিয়েও আমাদের গবেষণা চালিয়ে যেতে হবে।


পানিতে মাচায় সবজি
বাংলাদেশে অনেক এলাকায় পুকুর, নদীনালা, বিল বা খালের পাড়ে মাচা তৈরি করে সবজির চারা রোপণ করে পানিতে মাচার ওপর লতানো সবজি গাছ তুলে দিয়েও সবজির চাষ করা হচ্ছে। এ ধরনের মাচায় লাউ, কুমড়া, চিচিঙ্গা, শিম, বরবটি ইত্যাদি লতানো সবজি জন্মানো যায়। এদেশে এরকম পানিতে মাচায় সবজি চাষের সুযোগ অনেক রয়েছে।


হাইড্রোপোনিক পদ্ধতি অবলম্বন
বাংলাদেশে হাউড্রোপোনিক পদ্ধতি নতুন হলেও পৃথিবীর বেশ কিছু দেশে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করে সবজি উৎপাদন করা হচ্ছে। আমাদের দেশেও বিএআরআইতে এ কৌশল নিয়ে নানামুখী গবেষণা হচ্ছে। মাটিবিহীন বড় স্টিলের বা প্লাস্টিকের ট্রেতে পানির মধ্যে অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য উপাদান সরবরাহ করে কোনো কোনো সবজি (সারণি-৪) চাষ করা যায়। এ পদ্ধতি অবলম্বন করে বাড়ির ছাদে, আঙিনায়, বারান্দায় কিংবা চাষের অযোগ্য পতিত জমিতে সবজি চাষ করা সম্ভব।

সারণি-৪ : হাইড্রোপোনিক পদ্ধতিতে উৎপাদনযোগ্য সবজি

ফসলের ধরন                   ফসলের নাম
পাতা জাতীয় সবজি         লেটুস, গীমাকলমি, বিলাতি ধনিয়া, বাঁধাকপি
ফল জাতীয় সবজি           টমেটো, বেগুন, ক্যাপসিকাম, ফুলকপি, শসা, খিরা, স্কোয়াস প্রভৃতি

 

নিরাপদ সবজি উৎপাদন
কোনো খাদ্যই খাদ্য বলে বিবেচিত হয় না যদি তা নিরাপদ না হয়। সবজি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সবজি চাষে রাসায়নিক সারসহ সবজিকে পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য নান রকম বালাইনাশকের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। তদুপরি এখন যুক্ত হয়েছে সবজি চাষে নানা রকম হরমোন প্রয়োগের কর্মকা-। সঠিক মাত্রা না মেনে এবং সঠিক বালাইনাশক না ব্যবহার করার কারণে সবজি যে অধিক মাত্রায় বিষাক্ত হয়ে পড়ছে সাম্প্রতিক দৈনিক পত্রিকার প্রতিবেদন সে সাক্ষ্যই বহন করে। তাছাড়া এসব বিষাক্ত সবজি একদিকে যেমন পুষ্টির বদলে নানা রকম রোগের সৃষ্টি করছে অন্যদিকে এসব সবজি বিদেশে রপ্তানি করার ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। সবজি উৎপাদনের ক্ষেত্রে তাই আইপিএম বা জৈব কৃষিকে উৎসাহিত করে এবং প্রয়োজনে সঠিক মাত্রায় সঠিক বালাইনাশক সঠিক সময়ে প্রয়োগ করার বিষয়ে জোর দিতে হবে।

 

সবজি বিপণন
বাংলাদেশে সবজি বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা খুব একটা আধুনিক নয় এবং এটি খুব কার্যকরও নয়। বিদ্যমান ব্যবস্থায় সবজি উৎপাদনকারী তিন চার মাসের জন্য ১০০ টাকা বিনিয়োগ করে ৩০-৪০ টাকা মুনাফা করতে পারে। অথচ আড়তদার ও বেপারীগণ অতি অল্প সময়ে ১০০ টাকা বিনিয়োগ করে ১৪-১৭ টাকা মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হয়। সবজি দ্রুতপচনশীল বলে বাজার মূল্য খারাপ হলেও তা কৃষক বিক্রয় করতে বাধ্য হন। সারা বছর সবজির আবাদ উৎসাহিত করতে হলে সবজি চাষের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার বিষয়টিকেও আমলে নিতে হবে। তাছাড়া উৎপাদিত সবজির বাজার মূল্য খারাপ হলে তা এক দুই দিনের জন্য সংরক্ষণ করার ব্যবস্থাও আমাদের নেই। সবজির উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সবজি বিপণনের বিষয়টিকে সবজি চাষিদের অনুকূলে নেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করাও একান্ত  আবশ্যক।

 

সবজি বীজের চাহিদা ও মূল্য
বাংলাদেশে সবজি বীজের চাহিদা ৪৫০০ টন যার সিংহ ভাগই প্রাইভেট বীজ কোম্পানি সরবরাহ করে থাকে। এসব বীজের মধ্যে রয়েছে হাইব্রিড জাতের বীজ, ইনব্রেড ও মুক্ত পরাগী জাতের বীজ। বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় হাইব্রিড সবজির অধিকাংশ বীজই। প্লান্ট কোয়ারেন্টাইন উইংয়ের হিসেব মতে,  জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর ২০১৪ পর্যন্ত আমাদের সবজি বীজ আমদানি করা হয় ৫১৮ টন। তবে বাস্তবে বাংলাদেশে এর চেয়ে বেশি পরিমাণ সবজি বীজ প্রতি বছর বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। বিএডিসি এবং বিএআরআই সবজি গবেষণা কেন্দ্র থেকেও কিছু পরিমাণ ওপি বীজ সরবরাহ করা হয়।

 

বাংলাদেশে সবজি গবেষণা ও নতুন জাত উদ্ভাব
বাংলাদেশে সবজি গবেষণা শুরু হয় ১৯৮০ সনে বিএআরআই এবং এশিয়ান ভেজিটেবল রিসার্চ ডেভেলপম্যান্ট সেন্টারের (যা এখন ওয়ার্ল্ড ভেজিটেবল সেন্টার) পারস্পরিক সহযোগিতায়। AVRDC বিএআরআইসহ এদেশে বেশ কটি সরকারি ও প্রাইভেট বীজ কোম্পানিকে ৫৯টি ফসলের ৩৪৫৪টি বিভিন্ন প্রকার জাত সরবরাহ করেছে। এসব জাত যাচাই বাছাই করে এদেশে বেশ কিছু সবজি জাত অবমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।


বাংলাদেশে ৮০ রকমের সবজি রয়েছে। এদের মধ্যে প্রধান প্রধান সবজির সংখ্যা ২০-২৫টি, অপ্রধান  সবজির সংখ্যা ৩০-৩৫টি আর বাকিগুলো স্বল্প পরিচিত সবজি। আর ২০১৫ পর্যন্ত এদেশে সরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক অবমুক্ত সবজি জাতের সংখ্যা ১১৮টি। এর মধ্যে বিএআরআই অবমুক্ত করেছে ১০০টি জাত, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অবমুক্ত করেছে ৮টি সবজি জাত আর বিআইএনএ করেছে ১০টি টমেটোর জাত। বাংলাদেশে বিদ্যমান সবজি জাত উদ্ভাবনের কর্মকাণ্ড নিম্নরূপ-
১. দেশের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সবজি জাত সংগ্রহ করে মূল্যায়ন করতে তা নতুন জাত হিসেবে অবমুক্তকরণ।
২. বিদেশ থেকে ব্রিডিং লাইন প্রবর্তন করে তা থেকে যাচাই বাছাই করত জাত অবমুক্তকরণ।
৩.  সবজি জার্মপ্লাজমকে কাজে লাগিয়ে সংকরায় করা এবং তা থেকে উত্তম জাত বাছাই করা।
৪. সবজিতে মিউটেশন ঘটিয়ে সবজি জাত  উন্নয়ন।
৫.  ট্রান্সজেনিক সবজি জাত অবমুক্তকরণ।

 

দেশে বিদ্যমান সবজির জাত সংগ্রহ ও তা সংরক্ষণ করার কাজ খুব সন্তোষজনক নয়। তাছাড়া ঐজঈ তে সংগৃহীত জার্মপ্লাজম চএজঈ তে সংরক্ষিত নয় বলে এসব মূল্যবান সম্পদ হারানোর ভয়ও প্রচুর। বলাবাহুল্য শেষোক্ত তিনটি কৌশল এদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে খুব ভালোভাবে এখনও শুরুই হয়নি। দেশে সবজি গবেষণায় প্রাইভেট বীজ কোম্পানিগুলো ভালোই এগোচ্ছে। বীজ কোম্পানিতে দক্ষ প্রজননবিদ থাকায় এ কাজে তারা সফল হচ্ছে।
দেশে সবজি গবেষণার বিস্তার ঘটানোর কোন বিকল্প নেই। এর জন্য সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই গবেষণা ও উন্নয়নের ওপর জোর দিতে হবে।

 

সবজি চাষের মাধ্যমে পুষ্টি নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য দূরীকরণ                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                        

দানা শস্যে আমরা এখন স্বনির্ভর হতে পেরেছি। এখন খাদ্যের গুণগতমান বৃদ্ধি তথা পুষ্টিমান সমৃদ্ধ খাদ্যের প্রতি আমাদের মনযোগ দিতে হবে। এবারকার প্রথম সবজি মেলা পুষ্টির বিষয়ে সরকারের অধিক গুরুত্ব আরোপের একটি প্রমাণ। অল্প পয়সায় অল্প শ্রমে অল্প সময়ে একদিকে যেমন সবজি ফলানো যায় তেমনি অন্যদিকে আমাদের পুষ্টির ঘাটতি নিরসনে সবজি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভাবলে অবাক হতে হয় মাত্র ১০০ গ্রাম ফুলকপি পাতা, কালো কচুশাক, ডাঁটা, কচি শিম গ্রহণ করে যথাক্রমে  ৬২৬, ৪৬০, ২৬০ ও ২১০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম পাওয়া সম্ভব। কচু, ডাঁটাশাক, কাঁচাকলায় যথেষ্ট পরিমাণ আয়রন রয়েছে। সব ধরনের শাকজাতীয় সবজিতে প্রচুর ক্যারোটিন রয়েছে। অন্যান্য ভিটামিন সবজিতে মন্দ নয়। ফলে অল্প পয়সায় প্রতিদিন বৈচিত্র্যময় সবজি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে পুষ্টি নিরাপত্তা বিধানে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।


পুষ্টির বিবেচনায় এদেশের কৃষক সবজি চাষ করেন বিষয়টি এখনও সে পর্যায়ে যায়নি। তবে সারা বছর সবজি চাষ করতে হলে আমাদের বছরব্যাপী সবজি চাষের পরিকল্পনায় বৈচিত্র্যময় সবজির সমাবেশ ঘটাতেই হবে। অর্থাৎ সবজি চাষের জন্য নানা রকম সবজি প্রজাতি ও সবজির জাত ব্যবহার করতেই হবে। এর ফলে কৃষকের হাতে নানা রকম সবজি থাকবে বলে তাঁদের খাদ্যে নানা রকম সবজি গ্রহণের সুযোগ নিঃসন্দেহে বাড়বে। তদুপরি এর মাধ্যমে বাজারে বৈচিত্র্যময় সবজির সরবরাহও বৃদ্ধি পাবে বলে ভোক্তাগণও বৈচিত্র্যময় সবজি সারা বছর ধরে পাবে এবং এতে সবজি জাত পুষ্টি গ্রহণের সুযোগও বৃদ্ধি পাবে এবং আমরা ক্রমশ প্রতিদিন সবজি গ্রহণের অনুমোদিত মাত্রার দিকে ধাবিত হতে থাকব।


বছরব্যাপী সবজি চাষ যে চাষিদের দারিদ্র্য দূরীকরণে সহায়ক হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কৃষক সাশ্রয়ী মূল্যে সবজি বীজ ও সবজি চাষের জন্য আনুষঙ্গিক পরামর্শ ও উপকরণ পেলে আর বছরব্যাপী সবজি চাষে চাষিকে উৎসাহিত করা গেলে এটি একদিকে যেমন তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে তেমনি তাদের হাতে বাড়তি আয়ের সুযোগও এনে দেবে। মোট কথা বছরব্যাপী হরেক রকম সবজি চাষ করে কৃষক ও ভোক্তাগণ পুষ্টি গ্রহণের সুযোগ লাভ করতে পারবেন এবং এর মাধ্যমে দরিদ্র চাষিদের দরিদ্রতারও খানিক লাঘব হবে।


[এ নিবন্ধটি জাতীয় সবজি মেলা ২০১৬ উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে লেখক কর্তৃক উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধের সংক্ষিপ্ত রূপ।]

 

ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া*

* প্রফেসর, কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ ও প্রো ভাইস-চ্যান্সেলর, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা-১২০৭

 


Share with :

Facebook Facebook