কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

গ্রীষ্মকালীন সবজির গুরুত্ব ও চাষাবাদ কৌশল

আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় দামি বা সস্তা যে ধরনের খাবারই খাই না কেন, তার মধ্যে শাকসবজির গুরুত্ব অনেক বেশি। আমরা প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি খেয়ে থাকি। কেননা শাকসবজিতে সব ধরনের খাদ্য উপাদানই রয়েছে। তার মধ্যে ভিটামিন ও খনিজ লবণ উল্লেখযোগ্য যা আমাদের শরীরের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেহে ভিটামিন ও খনিজ লবণের যে চাহিদা তার সবটুকুই প্রায় শাকসবজি থেকেই পূরণ হয়। আজকাল হৃদরোগ, চর্মরোগ ও বহুমূত্র রোগের মতো নানা ধরনের রোগীকে ওষুধের পরিবর্তে পথ্য হিসেবে বেশি করে শাকসবজি খাবার পরামর্শ দিচ্ছেন ডাক্তাররা। আবার চোখের সমস্যার জন্য সবুজ বা রঙিন শাকসবজি অত্যন্ত উপকারী। তাহলে শুধু খাবার হিসেবেই নয়, ওষুধ, পথ্য, পুষ্টি ও সুষম খাদ্যের জন্য আমাদের প্রতিদিনই হরেক রকম শাকসবজি খেতে হলে কিছু না কিছু শাকসবজি উৎপাদন করা একান্ত প্রয়োজন। আমাদের দৈহিক চাহিদা পূরণের জন্য বেশি করে শাকসবজি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে অপুষ্টির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার পাশপাশি দানা জাতীয় খাদ্যের ওপর বাড়তি চাপও কিছুটা কমে যাবে। এজন্য আমরা যদি আমাদের যার যতটুকু সুযোগ আছে সে অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদন করতে পারি, তাহলে আমাদের পারিবারিক চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কিছু অর্থ উপার্জন করতে পারব।
কৃষক ভাইয়েরা, আজকাল শাকসবজি চাষ করা বেশ লাভজনক। শাকসবজি চাষের সুবিধে হলো ফসলি জমিতে যেমন উন্নত পদ্ধতিতে শাকসবজি চাষ করা যায়, তেমনি আইল বা রাস্তার ধারে, বসতবাড়ির আনাচে-কানাচে, পুকুর পাড়ে এমনকি বাড়ির আঙিনায়, রান্নাঘরের চালে, দালানের ছাদে, বারান্দার টবে, টিন বা মাটির পাত্রেও অনেক রকমের সবজি  ফলানো সম্ভব। বাড়ির ছোট ছোট ছেলেমেয়ে এবং গৃহিনীরা বসতবাড়ির সবজি বাগানের সামান্য যতœ নিলে পরিবারের চাহিদা মিটিয়েও বাজারে বিক্রি করলে বাড়তি করলে বাড়তি আয় আসতে পারে। এভাবে ব্যক্তিগত চাহিদাই শুধু পূরণ হবে না বরঞ্চ দেশের সার্বিক চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব হবে।
সামনে আসছে গ্রীষ্মকাল। এ সময়ে বাজারে কিছুটা শাকসবজির ঘাটতি দেখা যায়। তাই আমরা যদি একটু পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন ধরনের গ্রীষ্মকালীন সবজির চাষ করি তাহলে সবজির ঘাটতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।


শীতকাল বিভিন্ন শাকসবজি চাষের জন্য বেশ উপযোগী। এ সময় নানা ধরনের শাক সবজির চাষ হয়। আর এর উৎপাদন অনেক বেশি হয়ে থাকে। কিন্তু গ্রীষ্মকালীন সয়ে শাকসবজির চাষ করা একটু কষ্টসাধ্য। কারণ এ সময় রোদ, বৃষ্টি, খরা, শিলাবৃষ্টিসহ নানান ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই থাকে। সেজন্য একটু সতর্কতার সাথে এ সময় বিভিন্ন সবজির চাষ করতে হয়।


এ মৌসুমে আমরা কী কী সবজির চাষ করতে পারবো সে বিষয়ে আলোচনা করছি। এ সময় গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি, গ্রীষ্মকালীন টমেটো, বরবটি, পটোল, শসা, ঝিঙ্গা, করলা, কাঁকরোল, চিচিংগা, গীমাকলমি, পুঁইশাক, মুখিকচু, মানকচু, মৌলভীকচু, পানিকচু, সজিনা, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া এসবের চাষ করা যায়।
গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি ফাল্গুন-চৈত্র মাস থেকে শুরু করে আশ্বিন মাস পর্যন্ত চাষ করা যায়। তবে আগাম চাষ করতে পারলে বাজারমূল্য বেশি পাওয়া যায়।
শাকসবজি চাষে প্রধান কাজটি হলো জমি নির্বাচন ও জমি তৈরি তা জেনে নিই-
আলো বাতাস চলাচলের সুবিধা, সেচের সুবিধা, অতি বৃষ্টির সময় জমি থেকে পানি বের করার সুবিধে আছে এরকম উর্বর দো-আঁশ মাটি সবজি চাষের জন্য অত্যন্ত ভালো।
শাকসবজি অত্যন্ত লাজুক প্রকৃতির ফসল। সেজন্য একটু যতেœর সাথে এর চাষ করতে হয়। সবজির জমি খুব মিহি ও ঝুরঝুরেভাবে তৈরি করতে হয়। জমি সমতলভাবে তৈরি করবেন। এজন্য প্রতিটা চাষের পর পরই ভালোভাবে মই দিলে জমিতে বড় কোনো ঢেলা থাকবে না। বেড় করে শাকসবজি চাষের ব্যবস্থা নিলে সেচ ও পরিচর্যার সুবিধা হয়, আর ফলনও বেশি হয়। জমি তৈরির সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে জৈব বা আবর্জনা পচা সার দিতে হবে। জমিতে রসের অভাব থাকলে  সেচ দিয়ে ‘জো’ এলে তারপর চাষ মই দিয়ে জমি তৈরি করে বীজ বুনবেন। আবার অনেক রকমের সবজি মাদাতে লাগাতে হয় যেমন- শসা, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, কাঁকরোল, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া এসব। এগুলোর প্যাকেটে চারা তৈরি করে নির্দিষ্ট দূরত্বে মাদা তৈরি করে চারা লাগাতে হয়। চারা লাগানোর পর গাছগুলো বড় হতে থাকলে বাউনি বা মাচা তৈরি করে দিতে হয়। আর হ্যাঁ, মাদাতে চারা লাগানোর আগে পরিমাণমতো সুষম হারে রাসায়নিক সারও দিতে হবে।
শাকসবজি চাষে সারের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে আসুন এবার আমরা সার প্রয়োগ সম্বন্ধে জেনে নেই-
পরিমাণমতো গোবর, টিএসপি, এমপি সার শেষ চাষের সময় ভালোভাবে জমিতে মিশিয়ে দিতে হয়। ইউরিয়া সার চারা রোপণের ১৫-২০ দিন পর প্রথম উপরিপ্রয়োগ করতে হয়। দ্বিতীয় বার উপরিপ্রয়োগ করতে হয় আরও ১৫ দিন পর। লাউ বা কুমড়া জাতীয় অন্যান্য সবজির বেলায় মাদা তৈরি করে প্রতি মাদায় গোবর ১৫ কেজি, সরিষার খেল ৫০০ গ্রাম, ইউরিয়া ২৫০ গ্রাম, টিএপি ২৫০ গ্রাম এবং এমপি ২৫০ গ্রাম প্রয়োগ করতে হয়।
শুধু জৈব সার ব্যবহার করেও ভালো ফলন পাওয়া যায়। তবে জৈব সার সঠিকভাবে তৈরি করতে হবে। গোবর বা কম্পোস্ট জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
শাকসবজি চাষে যে বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো বীজ বপন/চারা রোপণ-
আধুনিক জাতের ফসলের ভালো বীজ জমিতে উপযুক্ত ‘জো’ অবস্থায় বপন করতে হয়। বীজ বপন বা চারা রোপনের কাজ বিকালে করা ভালো।
এখন আমরা জানব বীজতলায় কী ধরনের যতœ নিতে হবে- গাছের গোড়ায় আগাছা হলেই তা সাথে সাথে তুলে পরিষ্কার করে দিতে হবে। রোগ বা পোকার আক্রমণ হলে দমনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। বীজ বপনের পর পরই পিঁপড়া বীজ নিয়ে যেতে না পারে সেজন্য সেভিন পাউডার বীজতলার চারদিকে লাইন করে ছিটিয়ে দিতে হয়।
ফল জাতীয় সবজি যেমন বেগুন, মিষ্টিকুমড়া  এসব গাছে বা থোকায় অতিরিক্ত ফল থাকলে সেগুলো পুষ্টির অভাবে ঠিকমতো বাড়তে পারে না। এতে ফল আকারে ছোট, বিকৃত ও নিম্নমানের হয়। ফল ছোট থাকেই ফল পাতলাকরণের কাজ সম্পন্ন করলে গাছের ফল ধারণ ক্ষমতা বাড়ে।
এখন শুকনো মৌসুম। আমরা জানি বেশিরভাগ সবজির প্রায় ৯০ ভাগই পানি। সেজন্য সবজি ফসলের ভালো বৃদ্ধির জন্যে পানি অপরিহার্য। চারা লাগানোর পর মাঝে মাঝে পানি সেচ দিতে হবে। গ্রীষ্মকালে মাঝে মধ্যেই বৃষ্টি হয়ে থাকে। ফসলে খুব ভোরে অথবা সন্ধ্যায় সেচ দেয়া উচিত। দুপুর বেলা প্রখর রোদে সেচ দিলে গাছ ঝলসে যায়। তাছাড়া এ সময় পানি বাষ্পীয় হয়ে উড়ে যায় বলে পানির অপচয় বেশি হয়। বসতবাড়ির সবজি বাগানে অল্প পরিমাণ পানি ঘন ঘন প্রয়োগ করতে হয় বলে ঝর্ণা দিয়ে পানি সেচ দেয়া ভালো। সবজি ফসল ২-৩ দিনের বেশি সময়ের জন্য জলাবদ্ধতা মোটেই সহ্য করতে পারে না। সেচ দেয়ার পর জমিতে পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাাখবেন। প্রতিবার বৃষ্টিপাত বা সেচের পর মাটি শুকিয়ে গেলে উপরের মাটিতে আস্তরণ পড়ে। ‘জো’ আসার সাথে সাথে হাত আঁচড়া, কোদাল বা নিড়ানির সাহায্যে ১-২ ইঞ্চি গভীর করে মাটির স্তর ভেঙে দিতে হবে।
গাছের গোড়ায় আগাছা হলেই তা সাথে সাথে তুলে পরিষ্কার করে দিতে হবে। রোগ বা পোকার আক্রমণ হলে দমনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সবজি চাষের পর মাঝে মাঝে একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারবেন কোন সবজির কী ধরনের যত্ন পরিচর্যার প্রয়োজন।
ঢলে পড়া ও গোড়া পচা রোগ থেকে চারাকে রক্ষার জন্য আগেই মাটি শোধন করা ভালো। চারা গজানোর পর ‘গোড়া পচা’ রোগ দেখা দিলে বীজতলায় পানির পরিমাণ কমাতে হবে। দ্রুত পানি নিষ্কাশন করে অথবা শুকনো বালি বা ছাই ছিটিয়ে দিয়ে আর্দ্রতা অর্থাৎ পানির পরিমাণ কমানো যেতে পারে। একই সাথে ডাইথেন এম-৪৫ অথবা কপার অক্সিক্লোরাইড প্রয়োগ করে রোগের বৃদ্ধি রোধ করা যায়।
তাই আসুন কৃষক ভাইয়েরা আমরা একটু চিন্তা-ভাবনা করে বুদ্ধি খাটিয়ে হরেক রকম সবজি চাষে মনোযোগী হই। নিজে লাভবান হই। সে সাথে দেশের সার্বিক পুষ্টি ঘাটতি পূরণে সহায়তা করি।

 

মো. সাহারুজ্জামান*

* এআইসিও, কৃষি তথ্য সার্ভিস, আঞ্চলিক অফিস, রাজশাহী

 


Share with :

Facebook Facebook