কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ফসলধারা অনুসরণ

বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস করে ১১০০ জন। প্রতি বছর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৪২% (বিবিএস ২০১২)। পরিসংখ্যান অনুযায়ী মোট আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ৮৫.২ লাখ হেক্টর। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রতি বছর জমির পরিমাণ কমছে প্রায় ১% হারে। এক ফসলি জমির পরিমাণ ২৪.২ লাখ হেক্টর, দুই ফসলি জমির পরিমাণ ৩৮.৪১ লাখ হেক্টর, তিন ফসলি জমির পরিমাণ ১৬.৪২ লাখ হেক্টর এবং শস্যের নিবিড়তা হলো ১৯১% (বিবিএস-২০১২)। বর্ধিত জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা অতীব জরুরি। আর এ বর্ধিত খাদ্য উৎপাদন করার জন্য প্রয়োজন উচ্চফলনশীল জাত, উন্নত ফসল ব্যবস্থাপনা এবং একক জমিতে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা। ফসলের নিবিড়তা ১৯১% থেকে ৪০০% পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব একমাত্র উন্নত ফসল ধারার প্রবর্তনের মাধ্যমে। ধান ভিত্তিক ফসল ধারায় স্বল্পমেয়াদি অন্য ফসল সমন্বয় করে ফসলের নিবিড়তা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব।


একজন মানুষকে সুস্থ জীবন-যাপন করার জন্য প্রয়োজন সুষম খাদ্যের। তাই কার্বহাইড্রেটের পাশাপাশি তেল ও আমিষ জাতীয় খাবারের প্রয়োজন। সরিষা, মসুরি, ছোলা, খেসারি ও আলু খুবই গুরুত্বপূর্ণ ফসল যা শুধু রবি মৌসুমে চাষ করা হয়। সেচ সুবিধা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে যেসব জমিতে সরিষা, ডাল ও আলু চাষ হতো সেসব জমিতে এখন বোরো ধান সম্প্রসারিত হয়েছে। ফলে দিন দিন ডাল, সরিষা ও আলু ফসলের জন্য আবাদ যোগ্য জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। তাই জমির পরিমাণ বাড়িয়ে এসব ফসলের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভাবনা খুবই কম। একমাত্র ফসল বিন্যাসের মাধ্যমে সমন্বয় করে এসব ফসলের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। অতি সম্প্রতি বারি কর্তৃক কিছু স্বল্প মেয়াদি সরিষা, আলু ও ডালের জাত এবং ব্রি ও বিনা কতৃক স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে যা দিয়ে শস্য বিন্যাস উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন ফসল ধারা প্রবর্তন করা সম্ভব।


বিনা কর্তৃক স্বল্পমেয়াদি আগাম কর্তনযোগ্য আমন ধানের জাত বিনা ধান-৭ উদ্ভাবিত হয়েছে যার জীবনকাল মাত্র ১২০ দিন। বারি মুগ-৬ স্বল্পমেয়াদি জাত যা ডাল গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক উদ্ভাবন হয়েছে যার জীবনকাল ৬০-৬৫ দিন। রোপা আউশের স্থানীয় জাত পারিজা যার জীবন কাল ৯০ দিন। রোপা আউশের একটি জাত পারিজা যা চারা রোপণের ৭০-৭৫ দিনের মধ্যে কর্তন করা সম্ভব।


আমন ধান (নাবি)- আলু (নাবি)- বোরো ধান (নাবি) শস্য ধারায় বোরো ধান চাষে প্রচুর পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করতে হয়। উত্তরাঞ্চলের আটটি জেলায় ২০১২ এবং ২০১৩ সনে বোরো ধানের জন্য পানির উত্তোলন লক্ষ করলে দেখা যায় যে, কৃষকরা গড়ে হেক্টরপ্রতি ১৩.৯০ মিলিয়ন লিটার পানি উত্তোলন করে থাকে। পক্ষান্তরে, বিকল্প শস্য হিসেবে স্বল্প পানি নির্ভরশীল মুগডাল চাষ করলে ভবিষ্যতের জন্য অনেক পানি (হেক্টরপ্রতি ১২.৬৯ মিলিয়ন লিটার ) সংরক্ষিত থাকবে।


বাংলাদেশে মুগডাল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমিষ সমৃদ্ধ সুস্বাদু সুপ্রাপ্য খাদ্য উপাদান। চাহিদার তুলনায় দেশে ডালের উৎপাদন অনেক কম। দেশে খাদ্য চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে কিন্তু জমির পরিমাণ বাড়ছে না। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুুষ্টি স্বল্পতা দূর করতে, মাটির হারানো উর্বরা শক্তি ফিরে পেতে, মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে, সর্বোপরি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে ডালের আবাদ বৃদ্ধি অপরিহার্য। ডাল চাষে ব্যবহৃত জমির পরিমাণ ৭.৩ লাখ হেক্টর যা মোট জমির শতকরা মাত্র ৫.৩ ভাগ এবং উৎপাদিত ডালের পরিমাণ ৫.৩৫ লাখ মেট্রিক টন। একই হারে বাড়তি জনগোষ্ঠীর ডালের চাহিদা মেটাতে উৎপাদন বাড়াতে হবে ১.১৬ মেট্রিক টন। ডালের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য ডাল চাষের আওতায় অতিরিক্ত জমি বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। তবে উচ্চফলনশীল সরিষা কর্তনের পর মুগডালের চাষ করার সুযোগ রয়েছে। সে উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ডাল গবেষণা কেন্দ্র বারি মুগ-৬ নামে স্বল্পমেয়াদি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে যার জীবনকাল ৫৫-৬০ দিন। উচ্চফলনশীল জাতের ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নত ফসলধারা এবং একই জমিতে বছরে চার ফসল চাষ করে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শস্যের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা সম্ভব। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট রোপাআমন ধান-সরিষা-মুগডাল-রোপা আউশ ধান চার ফসলের শস্য বিন্যাসটি সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছে। এ ফসল ধারা দ্বারা অনেক মৌসুমে পতিত জমি চাষের আওতায় আনা সম্ভব।


টেবিল-১ : রোপা আমন-সরিষা-মুগডাল-রোপা আউশ ফসলধারায় ২০১১-১২ থেকে ২০১৩-১৪ তিন বছরের গড় ফলন, আয়, ব্যয় ও লাভ খরচের অনুপাত
ফসল ধারা    ফলন     (টন/হে.)    মোট আয় (টাকা/হে.)    মোট ব্যয় (টাকা/হে.)    প্রান্তিক আয় (টাকা/হে.)
রোপা আমন-সরিষা-মুগডাল-রোপা আউশ    ২১.১৭    ৩,১২,৪৪৪    ১,০৭,৯৯২    ২,০৫,৫২৭    ২.৮৯ঃ১.০
কৃষকের ফসলধারায় ২০১১-১২ থেকে ২০১৩-১৪ তিন বছরের গড় ফলন, আয়, ব্যয় ও লাভ খরচের অনুপাত
রোপা আমন - পতিত - বোরো ধান- পতিত    ১৪.৩০    ১,৯৬,৮৭৫    ১,১০,৬৫৫    ৮৬,২২০    ১.৭৮ঃ১.০
টেবিল-২ : রোপা আমন-সরিষা-মুগ ডাল-রোপা আউশ ধান ফসলধারা

 

ফসলের নাম (ফসলধারা)
ফসল চাষের সময় (বীজতলার সময় ছাড়া)    রোপা আমন    (বিন ধান-৭)     সরিষা     (বারি সরিষা-১৫)
জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে চারা রোপণ- অক্টেবরের ৩য় সপ্তাহে ফসল কর্তন (৯০ দিন)    অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে জানুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহ (৮৫ দিন)    ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহ (৬৫ দিন)    মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহ (৭০ দিন)

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তেলবীজ গবেষণা কেন্দ্রের আওতায় তিন বছরব্যাপী (২০১১-১২ থেকে ২০১৩-১৪) রোপাআমন-সরিষা-মুগডাল-রোপাআউশ ধান পরীক্ষাটি গাজীপুরে কৃতকার্যের সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়। রোপা আমন-সরিষা মুগডাল-রোপাআউশ ফসলধারাটি রোপা আমন-পতিত-বোরো-পতিত ফসল ধারার সঙ্গে তুলনামূলক পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, ২০১১-১২ থেকে ২০১৩-১৪ সনে উন্নত পদ্ধতিতে এ ফসল ধারায় ধানের সাদৃশ্য ফলন (জরপব বয়ঁরাধষবহঃ ুরবষফ) ২১.১৭ টন/হেক্টর এবং কৃষকের ফসল ধারায় সাদৃশ্য ফলন ১৪.৩০ টন/হেক্টর। এ ফসল ধারায় প্রতি হেক্টরপ্রতি বছর মোট আয় ৩,১২,৪৪৪/- টাকা, মোট ব্যয় ১,০৭,৯৯২/-। টাকা। মোট প্রান্তিক আয় ২,০৫,৫২৭/- টাকা এবং মোট লাভ এবং খরচের অনুপাত ১:২.৮৯ । কিন্তু কৃষকের ধারায় প্রতি হেক্টরে আয় ১,৯৬,৮৭৫ টাকা, খরচ ১,১০,৬৫৫ টাকা, প্রান্তিক আয় ৮৬,২২০ টাকা এবং লাভ খরচের অনুপাত ১:১.৭৮। রোপা আমন-সরিষা-মুগডাল-রোপা আউশ ফসল ধারাটি কৃষকের ফসল ধারা (রোপা আমন-পতিত-বোরো ধান-পতিত) থেকে অতিরিক্ত আয় পাওয়া গেছে ১,১৯,৩০৭/-।টাকা।


সুতরাং উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশে যেসব এলাকায় রোপাআমন ধান-পতিত-বোরো ধান- পতিত ফসল ধারা রয়েছে সেই সব এলাকায় রোপা আমন-সরিষা-মুগডাল-রোপা আউশ ফসল ধারা প্রচলন করা সম্ভব অর্থাৎ চার ফসল ভিত্তিক ফসল ধারাসমূহ কৃষিতাত্ত্বিক ভাবে চাষ করা সম্ভব, এতে করে শস্য নিবিড়তা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে। ফলে আমাদের দেশে কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে অর্থাৎ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে। ফলে আগামী দিন ক্রমহ্রাসমান আবাদি জমি থেকে বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য খাদ্য উৎপাদনের একটি অন্যতম প্রযুক্তি হিসেবে কাজ করবে।

 

ড. মো. রফিকুল ইসলাম মল্ডল*
ড. ফেরদৌসী বেগম**
ড. মো. আব্দুল আজিজ***
মো. মাহমুদুল হাসান খান****

*মহাপরিচালক, বিএআরআই, গাজীপুর; **পিএসও, বিএআরআই, গাজীপুর; ***সিএসও, বিএআরআই, গাজীপুর; ****এসও; বিএআরআই, গাজীপুর


Share with :

Facebook Facebook