কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

বায়ো-পল্লী এবং সমবায়

বায়ো-পল্লীর (Bio-Village) ধারণাটা অতি সম্প্রতি মানুষের মাথায় এসেছে। কাজও হচ্ছে। এ প্রযুক্তির মধ্য দিয়ে উন্নত কৃষি প্রযুক্তির নামে রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহারের কারণে পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর যে বিরূপ প্রভাব বা প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে তার থেকে পরিত্রাণ পাওয়া ও মানব স্বাস্থ্যের জন্য কল্যাণকর হিসেবে প্রমাণিত হয়ে গেছে। এ ধারণার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব কৃষি উৎপাদন প্রযুক্তিগুলোর সন্ধান ও ব্যবহার নিশ্চিত করে থাকে। ভারতের সিকিম রাজ্যসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কিছু দেশ বায়ো-ভিলেজ ধারণার মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় একটি সুন্দর পরিবেশবান্ধব টেকসই জীবিকা নির্বাহ এবং স্বাস্থ্যবান্ধব খাদ্য নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টিতে ভালো ফল পেয়েছে।

 

কুমিল্লা মডেল এবং কৃষি উৎপাদন প্রযুক্তি

কুমিল্লা পল্লী উন্নয়ন মডেলের মূল বিষয়টা ছিল শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি পাবে এবং আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটবে। ফলে গ্রামীণ জনগণের মাঝেও মানবিক মৌলিক অধিকারগুলোর চাহিদা বেড়ে যাবে। অর্থাৎ স্বাস্থ্য সেবা চাহিদা বাড়বে, ছেলেমেয়েদের শিক্ষার চাহিদা বাড়বে, সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য চহিদাগুলোও বেড়ে যাবে। অপরদিকে আয় বৃদ্ধির ফলে এগুলো ব্যবহারের সামর্থ্যও বৃদ্ধি পাবে। ফলাফল শিল্পায়নসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি ব্যবস্থার প্রসার ও উন্নয়ন ঘটবে।

পরিবর্তন হয়েছে। অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ১৯৭২ সনে জনসংখ্যা ছিল ৭.৫০ কোটি। তখন খাদ্য ঘাটতি ছিল ৩০ লাখ টন। বর্তমানে জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে এখন বাংলাদেশ পাশের দেশগুলোতে চাল রপ্তানি করছে। এ অবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু রাসায়নিক প্রযুক্তিগুলো ব্যবহার করতে যেয়ে বাংলাদেশে বর্তমানে অধিক Land Degradation হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। প্রায় ১৬ কোটি লোকের খাদ্য সংস্থান করতে গিয়ে ব্যাপকভাবে রাসায়নিক সার, মাটির নিচ থেকে অধিক হারে পানি উত্তোলন ইত্যাদি ব্যবহারের ফলে জমির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার প্রভাবে দেশটা মরুকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

আবার সময়ের ব্যবধানে মানুষের সচেতনতা বেড়েছে। ষাট দশকে দেশ রাসায়নিক কৃষির প্রয়োজনীয়তা মেনে নিয়েছিল। একদিকে খাদ্য ঘাটতি মোকাবিলা, কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে খাদ্য আমদানি এবং সর্বোপরি বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য ভবিষ্যৎ খাদ্য চাহিদা নিশ্চিত করার প্রয়োজন থেকেই রাসায়নিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল।

লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। সাড়ে সাত কোটি জনসংখ্যা থেকে বেড়ে যাওয়া ১৬ কোটি জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়েছে। দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তিনটি চেতনা মানুষের মাঝে প্রাধান্য পেয়েছে-

ক. মানব শরীরে ফসল উৎপাদনে ব্যবহৃত রাসায়নিক প্রযুক্তির বিরূপ প্রতিক্রিয়া।

খ. পরিবেশের ওপর এগুলোর বিরূপ প্রতিক্রিয়া

গ. জলবায়ু পরিবর্তনে অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটি কারণ হিসেবেও প্রমাণিত।

মানুষের সচেতনতা ও চিহ্নিত বিরূপ প্রতিক্রিয়াগুলোর বিবেচনায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও জৈব কৃষি পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি হচ্ছে। বিশ্ববাজারে জৈব কৃষি পণ্যের চাহিদা ইতোমধ্যে বিরাট আকার ধারণ করেছে। সচেতন ভোক্তা সমাজ রাসায়নিক উপায়ে উৎপাদিত পণ্যের চেয়ে জৈবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদিত কৃষি পণ্যের মূল্য বেশি দিতে প্রস্তুত রয়েছে। তবে উৎপাদিত কৃষি পণ্যটি যে জৈব তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। এর জন্য বাজারজাতকরণ ব্যবস্থায় জড়িত ব্যক্তিবর্গের সততার প্রশ্নটি জড়িত। কারণ জৈবিক প্রযুক্তি অনুসরণ করে কৃষি পণ্যটি উৎপাদন করা হলো ঠিকই। কিন্তু অধিক মুনাফার লোভে বাজারজাতকরণ ব্যবস্থায় জড়িত ব্যক্তিবর্গ যদি পণ্যগুলো সংরক্ষণের জন্য রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে তবে পুরো উদ্যোগই নিশ্চিতভাবে নষ্ট হয়ে যাবে। অর্থাৎ সেখানেও জৈব প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সুতরাং পল্লী উন্নয়নের পদক্ষেপে এ পরিবর্তন-সমন্বয় আনতে হবে।

বায়ো-পল্লী : উদ্দেশ্য কী হবে?

এ লক্ষ্যে প্রথমে একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নেয়া যেতে পারে। যে ইস্যুগুলো নিয়ে কাজ করা হবে সেগুলো চিহ্নিত করে কাজে হাত দেয়া যেতে পারে। এটি হতে পারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিআরডিবি এবং পল্লী উন্নয়ন একাডেমির একটি সমন্বিত বায়ো-পল্লী স্থাপন প্রকল্প।

ক. বায়ো-পল্লী স্থাপনের লক্ষ্যে প্রাথমিক অবকাঠামো সৃষ্টি ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ;

খ. দেশের প্রতিটি গ্রামকে সমবায়ের মাধ্যমে বায়ো-পল্লীতে রূপান্তরের উদ্যোগ নিতে হবে;

গ. রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের স্থানে জৈবসার ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং পাশাপাশি জৈবিক পদ্ধতিতে পোকামাকড় ও   রোগবালাই দমন করা;

ঘ. সমবায় বাজারজাতকরণের মাধ্যমে জৈবিক উপায়ে উৎপাদিত পণ্যের জন্য কৃষকরা যাতে ন্যায্যমূল্য পায় তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। এর জন্য সমবায় মার্কেটিংয়ের ওপর জোর দিতে হবে এবং সমবায়ের মাধ্যমে কৃষি পণ্য মার্কেটিংয়ের জন্য সমবায় সমিতিগুলোকে সহায়তা প্রদান সম্প্রসারিত করতে হবে;

ঙ. সমবায়ের মাধ্যমে বায়ো-পল্লী সৃষ্টির জন্য একটি জাতীয় জৈব-কৃষিনীতি প্রণয়ন করতে হবে।

 

কার্যক্রম গ্রহণ

ক. রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের বিরূপ প্রভাবগুলো নিয়ে কৃষকদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। এর জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ আয়োজন করতে হবে। পাশাপশি জৈবসার তৈরি ও ব্যবহার পদ্ধতি এবং জৈব উপায়ে বালাইনাশক ব্যবহার উৎসাহিত করার লক্ষ্যে এগুলোর উপকারিতা নিয়েও প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হবে।

খ. জৈব কৃষি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মৌলিক অবকাঠামো সৃষ্টি ও জাতীয় জৈব খামার বা বায়ো-পল্লী নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি উৎপাদিত জৈব কৃষি পণ্যের যথাযথ মূল্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা থাকতে হবে। বায়ো-পল্লী স্থাপনের লক্ষ্যে গ্রামাঞ্চলে বায়ো খামার স্থাপন এবং পারিবারিকভাবে পরিচালিত কৃষি ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে।

গ. স্থানীয়ভাবে জৈবসার উৎপাদন, জৈবিক উপায়ে রোগবালাই দমন কৌশল ইত্যাদি উৎপাদনের কৌশল ও রসদের উৎসগুলো চিহ্নিত করে কৃষকদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।

ঘ. উৎপাদিত জৈব কৃষি পণ্যের মার্কেটিংয়ের জন্য পৃথক সমবায় সমিতিভিত্তিক কৃষি বাজারজাতকরণ কর্মসূচি হাতে নিয়ে সমবায় সমিতিগুলোকে আর্থিকসহ বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামোগত সুবিধা দিতে হবে। এর মধ্যে প্রাকৃতিক উপায়ে কৃষি পণ্য সংরক্ষণের কৌশল রপ্ত করানোর জন্য প্রশিক্ষণ অবশ্যই থাকতে হবে।

 

যেভাবে পদক্ষেপগুলো নেয়া যেতে পারে

ক. জৈবসার বা জৈবিক উপায়ে রোগবালাই দমন কৌশলের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ যে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকগুলোর চেয়ে কম হবে তা প্রায়োগিক গবেষণার মাধ্যমে কৃষকদের দেখিয়ে দিতে হবে। পাশাপাশি রাসায়নিক পদ্ধতিতে উৎপাদনের পরিমাণ ও বায়ো পদ্ধতিতে উৎপাদনের পরিমাণ যে কোনোক্রমেই কম হবে না, প্রায়োগিক গবেষণার মাধ্যমে তাও দেখিয়ে দিতে হবে। সমবায় সমিতিগুলোর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ও সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে প্রতিটি কৃষককে বায়ো-কৃষক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

খ. স্থানীয়ভাবে যেসব উপকরণ রয়েছে সেগুলো চিহ্নিত করে কিভাবে জৈবসার প্রস্তুত, কিভাবে জৈবিক উপায়ে রোগবালাই দমন করা যায় এবং উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্যাকেজ তৈরি করে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে কৃষকদেরকে প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে।

গ. সচেতনতা ও ধারণার ঘাটতি চিহ্নিত করে প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে বায়ো-কৃষক তৈরি করতে হবে।

ঘ. স্কুল-কলেজের কৃষি বিষয়ক পাঠ্য পুস্তকগুলোতে বায়ো-কৃষির ধারণা দিতে হবে। যাতে লেখাপড়া করার সময় থেকেই ছাত্ররা বায়ো-কৃষির ধারণা নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারে।

ঙ. জৈব সার তৈরি বা অন্যান্য বায়ো প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য সহজ শর্তে ক্ষুদ্র বিনিয়োগ কার্যক্রম নিতে হবে এবং কাঁচামাল সংগ্রহের ওপর ভর্তুকি দেয়ার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।

 

যা করা প্রয়োজন

ক. জৈব উপায়ে উৎপাদিত কৃষি পণ্যের যথাযথ মূল্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিতে হবে।

খ. রাসায়নিক সারের ওপর ভর্তুকি প্রত্যাহার করে সমবায় সমিতিগুলোর মাধ্যমে ক্ষুদ্র বিনিয়োগ কার্যক্রম হাতে নিয়ে জৈবসার উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থাৎ সমবায়ের মাধ্যমে বায়ো-সার উৎপাদন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করত এগুলোতে বিনিয়োগ করা। উপজেলা পর্যায়ে ইতোমধ্যে স্থাপিত কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতিগুলোর মাধ্যমে এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।

গ. ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্রগুলোকে গ্রামওয়ারি Data Base তৈরির দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে।

ঘ. বিআরডিবি-জাইকা কর্তৃক পরিক্ষীত Link Model কে সম্প্রসারিত এবং আরও Component Include করে ব্যবহার করা যেতে পারে।

ওপরে বর্ণিত পদ্ধতি অনুসরণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি ‘সম্পূর্ণ জৈব কৃষি রাষ্ট্র’ অর্থাৎ ‘বায়ো-বাংলাদেশ’ এ রূপান্তরের ভিশন অর্জনে অবশ্যই সক্ষম হবে। য়

 

কৃষিবিদ খুরশীদ আলম*

* প্রাক্তন যুগ্ম পরিচালক (আরইএম), বিআরডিবি, ঢাকা

 


Share with :

Facebook Facebook