কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

পরিবেশবান্ধব জৈব কৃষি : সময়ের আবশ্যকীয় দাবি

জলবায়ুর পরিবর্তনে বিশ্ব পরিবেশ বিপর্যস্ত। আর সে কারণে পরিবেশ এখন সবার দুশ্চিন্তার খোরাক। প্রয়োজনীয় দুইমুঠো খাবারের জন্য পুরো বিশ্বে পরিবেশবান্ধব কৃষি এখন সময়ের জ্বলন্ত ইস্যু, পরিবেশবান্ধব কার্যক্রমের উল্লেখযোগ্য এক অংশ জৈব কৃষি। জৈব কৃষি এমন এক কৃষি ব্যবস্থা যেখানে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ব্যবহার না করে জৈব পদার্থের পুনঃচক্রায়ন যেমন কম্পোস্ট ও শস্যের অবশিষ্টাংশ, ফসল আবর্তন ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জমি চাষাবাদের মাধ্যমে মাটি ও ফসলের উত্তম অবস্থা বজায় রেখে সুস্থ সবল বিষমুক্ত উৎপাদন নিশ্চিত করা হয়। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনায় উৎপাদন বেড়েছে অথচ মাটির উর্বরতা ও উৎপাদিকা শক্তি কমছে, উচ্চমাত্রায় রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে মাটিতে ও কৃষিপণ্যের কুপ্রভাব পড়েছে। এ কারণে মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতা ঠিক রাখতে, বালাইনাশকের প্রভাবে যাবতীয় স্বাস্থ্যহানী কমাতে, পরিবেশকে সংরক্ষণ করে পরবর্তী বংশধরদের জন্য উপযোগী করতে, বালাইনাশকের মাধ্যমে পরিবেশ দূষিত হওয়া রোধ করতে, পৃথিবীর বুকে নিরাপদ জীবনযাপন পরিবেশ সংরক্ষণ ও মাটির গুণাগুণ বজায় রাখার জন্য জৈব কৃষি ব্যবস্থার একান্ত প্রয়োজন। মোট কথা আমাদের নির্মল পৃথিবীতে সুন্দরভাবে বাঁচার জন্য পরিবেশবান্ধব কৃষি আবশ্যকীয়ভাবে দরকার। আর এ জৈব কৃষির মূলনীতি হলো উদ্ভিদ ও প্রাণী পুষ্টির পুনঃচক্রায়ন, বিষমুক্ত উর্বর ও উৎপাদিকা শক্তি সম্পন্ন মাটি তৈরি করা, প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ ও সুষ্ঠু ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি অনুসরণ করে বালাই ব্যবস্থাপনায়, ব্যাপকহারে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উৎপাদন ও উন্নয়ন। জৈব কৃষিতে বিভিন্ন ব্যবস্থা অনুসরণ করে ফসল উৎপাদনের প্রয়োজনীয় জৈব পদার্থ খাদ্য উৎপাদন ও পানি ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়। বংশানুগতভাবে সমন্বিত ও সুষ্ঠু হয় এমন গাছপালা ফসল নির্বাচন করা। এ ধরনের কিছু পদ্ধতি হলোÑ সারিবদ্ধ ফসল, বেড়া ফসল, মিশ্র বা আন্তঃফসল, সাথী ফসল, শস্য পর্যায়, আচ্ছাদন ফসল, সবুজ সার, মালচিং বা আচ্ছাদন, কৌশলী ফসল, প্রতিরোধী ফসল, সহায়ক ফসল এসব।

 

জৈব কৃষিতে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈবসার ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের জৈবসারের উৎস হচ্ছে খামারজাত সার, কম্পোস্ট সার, আবর্জনা সার, জৈবিক নাইট্রোজেন সংযোগকারী বা বিএনএফ উদ্ভিদ ও জৈব উৎস হতে পাওয়া অন্যান্য বর্জ্য পদার্থসমূহ, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা, শুকনো রক্ত, হাড়ের গুঁড়া, সবুজ সার, অ্যাজোলা, ছাই। তাছাড়া পচানো তরল গোবর ও কিছু পচা সবজি জমিতে প্রয়োগ করা হয়। জৈব কৃষিতে কিছু কিছু পাতা, কা-, ডাল, মূল বা বাকলের রস কীটনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ ধরনের কিছু গাছ হলো ধুতরা, ভেন্নার তেল, রেড়ি, বন্যতামাক, পেঁপে, শিয়ালমুথা, আফ্রিকান ধৈঞ্চা, বিশকাটালি, নিম, নিশিন্দা, অড়হর, তুলসীপাতা, ডোলকলমি, টমেটো-গাছপাতা, ল্যান্টানা, মেক্সিকানগাঁদা, পাটের বীজ, নিম, মেহগনি এসব। ভেষজ গাছপালার আছে বহুবিধ ব্যবহার। অনেক প্রকার গাছ-গাছড়া আছে যেগুলো পশুপাখির নানা চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। যেমন পশুর চর্মরোগে বন্য তামাকের পাতা ঘষে দেয়া, গ্লিরিসিজিয়া পাতা পানিতে সিদ্ধ করে সে পানি গরুর উকুন ও আঠালি দমনে ব্যবহার করা যায়। তুলসীপাতা দিয়ে আমের পোকা দমন করা যায়।

 

অধিক ফসল ফলন পেতে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে। বালাইনাশন তথা কীটনাশক ব্যবহার ছাড়া ভালো ফলন পাওয়া যায় না বলে চাষিরাও এসবের ওপর একান্তভাবে নির্ভরশীল এবং প্রায় সব মৌসুমে ব্যবহার করে। যথেষ্ট বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, মাটির গুণগতমান নষ্ট হচ্ছে, উদ্ভিদ-ফসলে ব্যাপকভাবে প্রভাব পড়ছে, বাদ যাচ্ছে না জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্যহীনতা। বালাইনাশকের মধ্যে কীটনাশক আবার বেশি ব্যবহৃত হয় কেননা এর প্রাপ্যতা আর পোকার পরিচিতি অনেক বেশি এবং দীর্ঘদিনের।

 

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে টোটাল কৃষি ব্যবস্থাই পাল্টে গেছে। এ পরিবর্তিত পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশে অঞ্চলভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্প ও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে চাষাবাদ পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। অঞ্চলভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষাবাদ প্রযুক্তি কৌশল বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হচ্ছে। কিন্তু এটাতো ঠিক স্থানীয় ও উন্নত চাষাবাদ প্রযুক্তি ও ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা তাপমাত্রার তারতম্য, বৃষ্টিপাতের ধারার পরিবর্তন, দিনের দৈর্ঘ্য মোটকথা প্রকৃতির হেয়ালিপনা। আবহাওয়া জলবায়ুর তারতম্যের ফলে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর পোকা, পোকা বহনকারী রোগ বিভিন্ন ফসলে আক্রমণ করছে, যার ফলে ফলন কমে যাচ্ছে। চাষিরা ভালো ফলন না পেয়ে অভিযোজন বা খাপ খাওয়ানোর কৌশলসমূহ স্থায়ীভাবে ব্যবহার করছে না। কিছু কিছু এলাকায় বিভিন্ন ধরনের ফসল, ফল, শাকসবজিসহ অন্যান্য ফসল ভালো ফলন দেয়া শুরু করলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে আর তা সম্ভব হচ্ছে না। যার ফলে চাষিরাও প্রচলিত অভিযোজন কৌশল পরিবর্তন করছে।

 

পরিবেশসম্মত বা পরিবেশবান্ধব কৃষি বাস্তবায়ন করতে হলে জৈব কৃষির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। জৈব কৃষিতে জৈবসার, জৈব বালানাশক, জৈব ব্যবস্থাপনা প্রধান। জৈবিক বালাইব্যবস্থাপনার প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে বিভিন্ন পোকামাকড় ও রোগ দমনের জন্য সমন্বিত বালাই দমনব্যবস্থা, উপকারী বন্ধু পোকার ব্যবহার, পোকার সেক্স ফেরোমন ব্যবহার করা। আইসিএম-আইপিএম পদ্ধতির মাধ্যমে কীটনাশকের ব্যবহারে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেকখানি কমে যাবে এবং পরিবেশ সুরক্ষায় ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশে সমন্বিত বালাইদমন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে ফসলে বালাই দমন দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত আছে। জৈবিকভাবে ফসলের বালাই দমন আইপিএমের একটি লাগসই প্রযুক্তি যা সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। জৈবিক পদ্ধতিতে বালাই দমন ব্যবস্থাপনায় যে সব উপাদান-পণ্য রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো উপকারী বন্ধু পোকার লালন ও পোকার সেক্স ফেরোমন ব্যবহার করা।

 

উপকারী বন্ধু পোকা এবং ফেরোমন তৈরি এতদিন বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে গবেষণা পর্যায়ে ছিল কিন্তু ২০০৫ সনের গোড়ার দিকে উজবেকিস্তান সায়েন্টিফিক রিসার্চ ইনস্টিটিটিউটের কৃষি বিজ্ঞানীরা বাংলাদেশের কয়েকজন কৃষিবিদদের নিকট উপকারী বন্ধু পোকার বাণিজ্যিক উৎপাদন কৌশল হস্তান্তর করেন। একই সময়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহায়তায় একজন বৃটিশ বিজ্ঞানী কিছু পোকার সেক্স ফেরোমন উৎপাদন কৌশল হাতে কলমে শিখিয়ে দেন। তখন থেকেই যাত্রা শুরু হলো বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে উপকারী বন্ধু পোকা ব্রাকন, ট্রাইকোগ্রামা, লেডিবার্ড বিটল ও গ্রিনলেস উইং ও পোকার সেক্স ফেরোমন উৎপাদন। গত দশক থেকে বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রম এর মাধ্যমে উপকারী বন্ধু পোকা এবং ফেরোমন ফাঁদ এর সমন্বয়ে যে বালাই দমন প্যাকেজ তা মাঠ পর্যায়ে কতটুকু সফল ও কার্যকরী পদ্ধতি তা যাচাই করাই ছিল সে গবেষণার মূল লক্ষ্য। সফল গবেষণার পর উপকারী বন্ধু পোকা ও ফেরোমন ব্যাপকভাবে কৃষকের হাতে পৌঁছে দেয়ার কাজ শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আইপিএম পদ্ধতি দেশের বিভিন্ন ফসল উৎপাদন এলাকায় উপকারী বন্ধু পোকা ব্রাকন, ট্রাইকোগ্রামা, লেডিবার্ড বিটল ও গ্রিনলেস উইং ও পোকার সেক্স ফেরোমন কৃষকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। আস্তে আস্তে এগুলো গ্রহণ করেছে এবং এর সুফল বিস্তৃত হতে থাকে।

 

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রচলিত পদ্ধতির চাষাবাদে উচ্চমাত্রায় রাসায়নিক সার ও বালাইাশক বিশেষ করে কীটনাশকের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলছে। এতে করে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কমছে মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতা অন্য দিকে এসব রাসায়নিক পদার্থের ক্ষতিকর প্রভাব মাটিতে ও কৃষি পণ্যে পড়ছে। বিশেষ করে মাটি, পানি বায়ুসহ আমাদের পরিবেশ প্রতিবেশ দারুণভাবে দূষিত হচ্ছে। এমনি পরিস্থিতিতে জীববৈচিত্র্য রক্ষা, পরিবেশবান্ধব কৃষি, নিরাপদ খাদ্যের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে জীবনযাপন সর্বোচ্চ গুরুত্বের মধ্যে পড়ছে। পরিবেশ সুসম্মত রেখে মাটির গুণাগুণ বজায় রাখার জন্য বাংলাদেশের কৃষি এখন একটি পরিবর্তনশীল ব্যবস্থার দিকে নেয়া একান্ত আবশ্যক। এ চাহিদাকে সামনে রেখে জৈব পদ্ধতিতে নিরাপদ ও দূষণমুক্ত পরিবেশে সব ফসল উৎপাদনের জন্য আইপিএম-আইসিএম এ কর্মসূচি জরুরি। কেননা এগুলো পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে Sir Albert Howard জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব থিম মাথায় রেখে ভারতে জৈব বিষয়ে কাজ করেন। এ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে জৈব কৃষির জনক নামে অভিহিত করা হয়। জৈবিক বালাইব্যবস্থাপনা কর্মসূচি নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সম্মিলিতভাবে মাঠে সফল গবেষণা চালায়। ফলে জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব কৃষির জন্য জৈবিক বালাই ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কৃষকগণ বালাই ব্যবস্থাপনায় শুধু বালাইনাশকের ওপর নির্ভর করেন। অপরিকল্পিত মাত্রা ও কৌশলে রাসায়নিক ব্যবহারে পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে এবং মানব স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে তা কৃষককে জানানো হচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও মানব স্বাস্থ্যহানী থেকে রক্ষাকল্পে জৈব কৃষি ও জৈবিক বালাইব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প এ মুহূর্তে নেই।

 

পোকার সেক্স ফেরোমন হলো এক ধরনের জৈব রাসায়নিক বা সেমিকেমিক্যাল পদার্থ যা কোনো প্রজাতির স্ত্রী পোকা কর্তৃক নিসৃত হয় একই প্রজাতির পুরুষ পোকাকে প্রজনন কাজে আকৃষ্ট করার জন্য। সেক্স ফেরোমনের সবচেয়ে বড় দিক হলো এটি প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত জৈব পদার্থ যা জীব ও পরিবেশের কোনোরূপ ক্ষতি করে না। ইদানীং দেশের কিছু কিছু অঞ্চলের কৃষকরা সেক্স ফেরোমেন ব্যবহার করে রাসায়নিকমুক্ত শাকসবজি উৎপাদন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। শুধু তাই না তারা প্রমাণ করেছেন সারা বাংলায় এ প্রযুক্তি অনায়াসে চালু করা যাবে আমাদের সবার জন্য ভবিষ্যতের জন্য বিশেষ করে বিদেশে শাকসবজি ফলমূল রফতানির জন্য।

 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ধানের পাশাপাশি সবজি উৎপাদন সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কেননা রাসায়নিক বিহীন শাকসবজি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশের বাজারে রপ্তানির কার্যক্রম আমাদের কৃষিকে আরও সমৃদ্ধি করতে পারে, নিজেদের লাভ করে বয়ে আনতে পারে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশে চলছে সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনা- সহযোগিতামূলক গবেষণা সহায়তাকারী কার্যক্রম। বাংলাদেশের বিএআরসি, বারি, ব্রি, বিজেআরআই, বিএসআরআই, বিভিন্ন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন এ প্রকল্পের আওতাভুক্ত। আমরাতো জানি সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনা বা আইপিএম মূল উদ্দেশ্য হলো-

 

০ বালাইয়ের আক্রমণ থেকে ফসলের ক্ষতি কমিয়ে উৎপাদন বাড়ানো;

০ ফসল চাষে কৃষকের আর্থিক উপার্জন বাড়নো;

০ বিভিন্ন ধরনের ফসলে বিষাক্ত বালাইনাশকের অহেতুক ব্যবহার কমানো বা রোধ করা;

০ ফসল, মাছ ও হাঁস-মুরগিসহ বিভিন্ন রপ্তানিযোগ্য কৃষি ফসল ও পণ্যের ওপর বালাইনাশকের সম্ভাব্য বিষাক্ততা রোধ করা;

০ কৃষি ক্ষেত্রে সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনার গবেষণা, উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তি সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করা;

০ সামগ্রী জীববৈচিত্র্য এবং মানবস্বাস্থ্য সংরক্ষণ করা;

০ সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণ এবং সিদ্ধান্ত প্রদানে উৎসাহ প্রদান করা।

 

সবজি চাষের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় দেশ। গত এক দশকে সবজি চাষের জমির পরিমাণ এবং উৎপাদন অনেক বেড়েছে। কিন্তু পোকামাকড় ও রোগবালাই থেকে ফসলকে রক্ষার জন্য সবজি চাষিরা জেনে বা না জেনে যত্রতত্র কীটনাশক ব্যবহার করেন। যশোর জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাঠ পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে, বেগুনের পোকা বা অন্যান্য বালাই দমনের জন্য বেগুন চাষিরা প্রতি মৌসুমে প্রায় ১৫০ বার বা প্রতিদিন কীটনাশক প্রয়োগ করছেন। অন্যান্য সবজি ফসলেও তাঁরা প্রচুর পরিমাণে কীটনাশক ব্যবহার করেন। এর ফলে পোকার মধ্যে কীটনাশকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শক্তি গড়ে উঠেছে, যে কারণে বারবার কীটনাশক ব্যবহার করেও পোকা দমন হচ্ছে না এবং সবজি চাষের খরচ উত্তরোত্তর বেড়ে যাওয়ার কারণে সবজি চাষিদের আয় কমে যাচ্ছে। এছাড়া কীটনাশকের বিষাক্ততার জন্য চাষির স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে এবং যারা এসব কীটনাশক প্রয়োজনকৃত সবজি খাচ্ছেন তাদের দেহের মধ্যে কীটনাশকের বিষক্রিয়া প্রবাহিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া আরও গুরুত্বপূর্ণ যে প্রচুর পরিমাণে কীটনাশক ব্যবহার করার দরুন বাংলাদেশ থেকে বিদেশে সবজি রপ্তানি করার ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

 

এ যাবৎ যেসব সবজি ফসলের জন্য আইপিএমের মাধ্যমে সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনার কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে সেগুলো হচ্ছেÑ বেগুন, টমেটো, বাঁধাকপি, ঢেঁড়স, শিম ও বিভিন্ন কুমড়া জাতীয় সবজি। বর্তমানে পুরো বাংলাদেশে আইপিএমের কার্যক্রম চলছে। গত ৩/৪ বছরে আইপিএমের কার্যক্রমের মাধ্যমে সবজি ফসলে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার জন্য যেসব প্রযুক্তি সফলতা অর্জন করেছে এবং বিভিন্ন এলাকার চাষিরা সেসব প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তা হলো-কলম/চারা ব্যবহারের মাধ্যমে বেগুন ও টমেটোর ব্যাকটেরিয়াল উইল্ট রোগ দমন। ব্যাকটেরিয়াল উইল্ট, বেগুন ও টমেটোর একটি অত্যন্ত ক্ষতিকর রোগ, যা সহজে দমন করা যায় না। ফলে চাষিদের বেগুন ও টমেটো ক্ষেতের প্রায় ৫০ ভাগ গাছ এ রোগের আক্রমণে মারা যায় ফলে আর্থিকভাবে খুব ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ রোগ প্রতিরোধী বেগুন ও টমেটোর কলমের চারা ব্যবহার করলে বেগুন ও টমেটোর গাছ এ রোগে খুব কম আক্রান্ত হয় বা মোটেই আক্রান্ত হয় না। গাজীপুর ও যশোর এলাকায় কৃষকের মাঠে বেগুনের চারা কলম ব্যবহার করে চাষিরা প্রায় ২ থেকে ৪ গুণ বেশি ফলন পেয়েছেন এবং প্রায় ৩ গুণ বেশি অর্থ আয় করেছেন। টমেটোর চারা কলম ব্যবাহর করে গাজীপুর এলাকার চাষিরা প্রায় দেড় গুণ বেশি ফলন ও অর্থ আয় করেছেন।

 

উদহারণস্বরূপ বলা যায়, কুমড়া জাতীয় বিভিন্ন ফসলের মাছি পোকা একটি অত্যন্ত ক্ষতিকর পোকা। এ পোকা কুমড়া জাতীয় ফসলের যেমন-মিষ্টিকুমড়া, করলা, শসা এসবের মধ্যে প্রথমে ডিম পাড়ে এবং ডিম থেকে কীড়া বের হয়ে ফসলের ভেতরে খেয়ে ফল নষ্ট করে ফেলে। পোকার আক্রমণের কারণে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ ভাগ ফল নষ্ট হয়ে যায়, যা কীটনাশক ব্যবহার করেও ভালোভাবে দমন করা যায় না এবং এজন্য চাষিরা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফেরোমন এবং মিষ্টিকুমড়ার ফাঁদ ব্যবহার করলে মাছি পোকা আকৃষ্ট হয়ে ফাঁদের মধ্যে পড়ে এবং মারা যায়। ফলে ফসল এ পোকার আক্রমণ থেকে ব্যাপকভাবে রক্ষা পায়, পরিবেশসম্মত উপায়ে কৃষি উৎপাদন ত্বরান্বিত করা যায়। অনেক এলাকায় মিষ্টিকুমড়া, শসা ও করলা ফসলে এ ফাঁদ ব্যবহার করে চাষিরা ১ থেকে ৩ গুণ বেশি ফলন পেয়েছেন। চাষিরা সেক্স ফেরোমনকে জাদুর ফাঁদ নামে অভিহিত করেন।

 

জৈব কৃষির আওতায় মুরগির পচনকৃত বিষ্ঠা ও সরিষার খৈল ব্যবহারে মাধ্যমে বিভিন্ন সবজি ফসলের মাটিবাহিত রোগ দমন করা যায়। সবজি ক্ষেতের মাটিতে বিভিন্ন রোগের জীবাণু ও কৃমি বাস করে, যারা সবজির গাছ নষ্ট করে বা মেরে ফেলে। মুরগির বিষ্ঠা ও সরিসার খৈলের মধ্যে এমন কিছু রাসায়নিক উপাদান আছে, যা বিভিন্ন রোগ জীবাণু ও কৃমিকে মেরে ফেলে এবং সাথে সাথে মাটির উর্বরতা শক্তি বাড়ায়। গাজীপুর, লালমনিরহাট ও কুমিল্লা এলাকায় বিভিন্ন সবজি যেমন বাঁধাকপি, শসা, বেগুন, টমেটো এসব ফসলে এ পদ্ধতি ব্যবহার করে ফসলের ক্ষেতে বিভিন্ন রোগ ও কৃমির আক্রমণ ৫০ থেকে ৯০ ভাগ কমে গেছে এবং ফসলের সার্বিক উন্নতিসহ দেড় থেকে ২ গুণ বেশি ফলন হচ্ছে।

 

সঠিক সময়ে আগাছা দমন পদ্ধতির মাধ্যমে বেশি লাভ কার যায়। চাষিরা সব সময় তাদের সবজি ক্ষেত আগাছামুক্ত রাখতে গিয়ে ৫ থেকে ৬ বার আগাছা পরিষ্কার করেন। এর ফলে সবজি চাষের খরচ অনেক বেড়ে যায়। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এতবার আগাছা পরিষ্কার না করে ফসলের বাড়বাড়তি ও আগাছা জন্মানোর সময় বিবেচনা করে মাত্র দুইবার আগাছা পরিষ্কার করা হলে যেমন সঠিকভাবে আগাছা দমন করা যায় তেমনি ফসলের ফলনও ভালো পাওয়া যায়। মোট কথা বীজ বপন আর চারা রোপণের পর অন্তত ৩০ থেকে ৪০ দিন পর্যন্ত জমি বা ফসল আগাছামুক্ত রাখতে পারলেই যথেষ্ট। গাজীপুর এলাকায় এ পদ্ধতির মাধ্যমে চাষিরা তাদের বাঁধাকপি, বেগুন, ঢেঁড়স ও টমেটো ক্ষেতে আগাছা দমনের খরচ ৩০ থেকে ৩৫ ভাগ কমাতে পেরেছেন এবং আর্থিকভাবে প্রায় দেড় গুণ বেশি লাভবান হয়েছেন।

 

বিভিন্ন এলাকায় কয়েক প্রজাতির পাতা খেকো পোকা বাঁধাকপি ও ফুলকপি ফসল নষ্ট করে ফেলে। এসব ফসলের ফলন ও গুণগতমান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং চাষিরা কীটনাশক ব্যবহার করেও ভালো ফল পান না। এসব পাতা খেকো পোকা আক্রমণের প্রথমাবস্থায় যদি আক্রান্ত পাতার পোকাগুলো হাত দিয়ে ২ থেকে ৩ বার মেরে ফেলা হয় তাহলে পোকার আক্রমণ কম হয় ও কীটনাশক ব্যবহার করার প্রয়োজন হয় না এবং ভালো ফলন পাওয়া যায়। গাজীপুর, যশোর ও কুমিল্লা এলাকায় এ পদ্ধতি ব্যবহার করে চাষিরা সাফল্যজনক ভাবে বাঁধাকপির পাতা খেকো পোকা দমন করতে সক্ষম হয়েছেন এবং কীটনাশক ব্যবহার করার তুলনায় বেশি ফসল ও অর্থ লাভ করেছেন। পোকার আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে এমন জাত ব্যবহার করা একটি অত্যন্ত কার্যকরী ও লাভজনক পদ্ধতি। গত কয়েক বছর মাঠ পরীক্ষার মাধ্যমে এমন কয়েকটি বেগুনের জাত শনাক্ত করা হয়েছে যারা ডগা ও ফলের মাজরা পোকার আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে। বাউ বেগুন এর মধ্যে একটি।

 

ক বছর আগেও আইপিএম কেউ গ্রহণ করতে চাইতো না। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এবং আবশ্যকীয়তার জন্য আইপিএম এখন আমাদের ফসল উৎপাদনে জরুরি বাস্তবায়নযোগ্য বিষয় হয়েছে। সাথে যোগ হয়েছে আইসিএম বা সমন্বিত ফসল ব্যবস্থাপনা। এটি ভালো ও প্রশংসনীয় লক্ষণ। সমন্বিত ফসল ব্যবস্থাপনা আরও বিস্তৃত হয়ে বাংলার কৃষি অনেক এগিয়ে যাবে। আমরা সকলে কৃষিজীবী কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ট এবং অন্য সবাই পরিবেশকে সুসম্মত রাখার সব চেষ্টা বাস্তবায়ন করব এবং জৈব কৃষির আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে সকলে মিলে সকলের তরে হয়ে কাজ করব। তবেই কাজের কাজ অনেক হবে। আমাদের কৃষি সুসংহত হয়ে সমৃদ্ধ হোক এটা আমাদের সবার কামনা। কথায় আছে সমন্বিত বালাই দমন গুণের নাইকো শেষ, কম খরচে অধিক ফলন সুস্থ পরিবেশ। পরিবেশ সুসমুন্নত করে আমরা বেশি উৎপাদন করব গ্রহণ করব কাজে লাগাব এবং দেশকে পরিবশ সম্মত উৎপাদন দিয়ে আরও সমৃদ্ধ করব। কেননা কৃষিই সমৃদ্ধি। কৃষির সমৃদ্ধিতে আমরা সবাই গর্বিত অংশীদার। এ হোক আমাদের সম্মিলিত প্রাণের অঙ্গীকার।

 

কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম*

*উপপরিচালক (গণযোগাযোগ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা। subornoml@yahoo.com/gmail.com

 


Share with :

Facebook Facebook