কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

ছাতরা পোকার আক্রমণ ও দমন ব্যবস্থাপনা

ইদানীংকালে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, হোম ইকনোমিক্স কলেজসহ কিছু স্থানে ছাতরা পোকা বা জায়েন্ট মিলিবাগের ব্যাপকভিত্তিক আক্রমণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, ছাতরা পোকা যা ইংরেজিতে গবধষু ইঁম নামে পরিচিত, আকৃতিতে অনেক বড় বলে এদের Giant mealy bug বলে অভিহিত করা হয়।  Giant mealy bug এর বৈজ্ঞানিক নাম Labioproctus polei (Green), এরা Hemiptera বর্গের  Cocciedae পরিবারভুক্ত। এ পোকাটি বাংলাদেশে নতুন নয়। বাংলাদেশে এ পোকার উপস্থিতি এবং আক্রমণের বিষয়ে ড. এম জহুরুল আলম তার Insect and mite pests of fruits and fruit trees in Bangladesh (East Pakistan) and their control শীর্ষক বইতে ৫২ বছর আগে লিপিবদ্ধ করেছেন (প্রথম প্রকাশ ১৯৬২, পুনঃপ্রকাশ ১৯৭৪)।  জায়েন্ট মিলিবাগের বিস্তৃতি কেবল বাংলাদেশে নয়, এদের ভারতের সুদূর পাঞ্জাব থেকে আসাম অঞ্চল পর্যন্ত পাওয়া যায়। এ পোকা কাঁঠাল, কড়ই, আম, পেয়ারা, বট, লেবু ও পেঁপেসহ ৬২ প্রজাতির গাছে আক্রমণ করে থাকে। বাংলাদেশে এদের আক্রমণ সবচেয়ে বেশি কাঁঠাল, কড়ই ও আমগাছে পরিলক্ষিত হয়। সাধারণত এ পোকার আক্রমণ মাত্রা ব্যাপক পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছায় না আবার প্রতি বছর দেখাও যায় না। তবে অনুকূল আবহাওয়া (শুকনা, উষ্ণ এবং বেশ কিছু দিন বৃষ্টিপাতবিহীন আবহাওয়া) পেলে এদের ব্যাপকভিত্তিক আক্রমণ হতে পারে। ২০০৭ সনে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, ২০১০-১১ সনে বাঁশেরহাট, দিনাজপুর এবং ২০১৩-১৪ সনে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টসহ ঢাকার বেশ কয়েকটি স্থানে এদের ব্যাপকভিত্তিক আক্রমণ পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের কীটতত্ত্ব বিভাগ বিভিন্ন স্থানে এ পোকার ব্যাপকভিত্তিক আক্রমণ পরিলক্ষিত হওয়া মাত্র পোকাগুলো শনাক্তকরণসহ প্রয়োজনীয় দমন ব্যবস্থাপনার ওপর গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করাসহ করণীয় বিষয়াদির ওপর ব্যবস্থা নিয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে এ সংক্রান্ত কার্যক্রম বর্তমানে চলমানও রয়েছে।


জায়েন্ট মিলিবাগের জীবন চক্রের অপ্রাপ্তবয়স্ক (নিম্ফ দশা) অবস্থায় স্ত্রী পোকা ক্ষতি করে থাকে। স্ত্রী নিম্ফ দেখতে ডিম্বাকার, চেপ্টা এবং এদের শরীর সাদা পাউডার জাতীয় পদার্থ দ্বারা আবৃত থাকে। পুরুষ পোকা একজোড়া কালো পাখাযুক্ত। এ পোকার জীবনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এরা কেবলমাত্র ডিম অবস্থায় অধিকসময় (৫-৭ মাস) পর্যন্ত কাটায় এবং বাকি সময় (সাধারণত নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত) সক্রিয় থাকে (নিম্ফ ও পূর্ণাঙ্গ অবস্থায়)।


স্ত্রী ছাতরা পোকা                      
জীবন চক্র

এদের জীবন চক্রে ৩টি ধাপ দেখা যায়। ধাপগুলো হলো ডিম, নিম্ফ ও পূর্ণাঙ্গ। পুরুষ পোকা একজোড়া পাখাযুক্ত হলেও স্ত্রী পোকা পাখাবিহীন। স্ত্রী পোকা ১৫ মিমি. লম্বা, এদের শরীর নরম, রসালো ও চেপ্টা প্রকৃতির। এদের রঙ কিছুটা লালচে হলেও বহিরাবরণ সাদা পাউডার জাতীয় পদার্থ দ্বারা আবৃত থাকায় সাদা মনে হয়। মার্চ-মে মাসে মিলনের পর স্ত্রী  পোকা গাছ থেকে নেমে আসে এবং এপ্রিল-মে মাসে মাটির ৫-১৫ সেমি. গভীরতায় গুচ্ছাকারে ৩০০-৫০০টি ডিম পাড়ে। রেশমি থলেতে
 (silken purses) ডিমগুলো আবৃত থাকে। ডিমগুলো সাধারণত ১.০ মিমি লম্বা এবং ০.৭ মিমি চওড়া হয়ে থাকে। সদ্য পাড়া ডিম দেখতে ডিম্বাকার ও উজ্জ্বল গোলাপি রঙের, সময়ের সাথে সাথে তা ধূসর বর্ণ ধারণ করে।


ডিম পাড়ার বিশেষত্ব হলো এরা ১-২ সপ্তাহ যাবত বিভিন্ন ধাপে গুচ্ছাকারে ডিম পাড়ে অতঃপর স্ত্রী পোকা মারা যায় এবং মৃত পোকার শরীরে ডিম লেগে থাকতে দেখা যায়। এরা জুন মাস পর্যন্ত ডিম দেয় এবং নভেম্বর-জানুয়ারি মাসে ডিম ফুটে নিম্ফ বের হয়। সদ্য ফোটা নিম্ফের ৭০-৮০% গাছ বেয়ে উপরে উঠে এবং বাকি ২০-৩০% গাছের নিচে ইতঃস্তত ঘোরাফেরা করে এবং ঘাস বা বাগানের ছোট ছোট গাছে অবস্থান করে। কাঁঠাল বা আমের ফুল ফোটা শুরু হওয়ার পর হতে (সাধারণত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে) এরা গাছ বেয়ে উপরে উঠে যায়। এ সময় এরা দলবদ্ধভাবে গাছে উঠে পরবর্তীকালে মুকুল ও কচি ডগার রস খেয়ে ৩টি নিম্ফ দশা সম্পন্ন করে। স্ত্রী পোকা সাধারণত ১৫-৩৫ দিনে পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়।


ক্ষতির প্রকৃতি ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য
এ পোকা আক্রান্ত গাছের বাড়ন্ত ডগা এবং মুকুল থেকে রস চুষে খায় এতে কচি ডগা ও মুকুল শুকিয়ে যায় এবং ফল ধারন বিঘœ সৃষ্টি করে। ফল ধারণ করলেও খুবই দুর্বল হয়, সামান্য বাতাসেই কচি ফল ঝড়ে পড়ে। সাধারণত এরা দলবদ্ধভাবে থাকে এবং ডগা ও মুকুলের বোঁটায় এমনভাবে গাদাগাদি করে থাকে যে আক্রান্ত ডগাটিই আর দেখতে পাওয়া যায় না। আক্রমণ মারাত্মক হলে এদের নিঃসৃত মধুরসে শু্যঁটিমোল্ড রোগ হয় ফলে পাতা কালো হয়ে যায় বলে ঠিকমতো খাদ্য তৈরি হয় না এবং আক্রান্ত গাছ অত্যন্ত দুর্বল প্রকৃতির হয় এবং গাছে ফলন অত্যন্ত কমে যায়।


এ ধরনের ছাতরা পোকার অপ্রাপ্ত বয়স্ক নিম্ফ বেশ কয়েকটি পরজীবী পোকা দ্বারা আক্রান্ত  হতে পারে। এদের মধ্যেPhygadeuon sp. (Ichneuminidae), Getonides perspicax Knal Ges Rodolia fumida এর কীড়া অন্যতম। পরজীবী পোকার ব্যাপক আক্রমণের ফলে প্রতি বছর এর আক্রমণের হার কমবেশি হতে দেখা যায়। এমনকি এক বছর এর ব্যাপক আক্রমণ পরিলক্ষিত হলেও পরবর্তী বছর কোনো ধরনের আক্রমণ নাও হতে পারে।  


দমন ব্যবস্থাপনা
১.  বাগানে জন্মানো আগাছা ও অন্যান্য পোষক উদ্ভিদ তুলে বাগান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।


২. গ্রীষ্মকালে (বিশেষত সেপ্টেম্বর-অক্টেবর মাসে)  বাগান ভালো করে চাষ দিতে হবে বা পূর্ববর্তী বছরে আক্রান্ত গাছসমূহের গোড়ার মাটি কোদাল দিয়ে আলগা ও এপিঠ-ওপিঠ করে দিতে হবে যাতে মাটির নিচে থাকা ডিম উপরে উঠে আসে এবং পাখি ও অন্যান্য শিকারী পোকার কাছে তা উন্মুক্ত হয়, তাছাড়া রোদে পোকার ডিম নষ্ট হয়ে যায়।


৩. যেহেতু নিম্ফগুলো গাছ বেয়ে ওপরে উঠে তাই নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ হতেই গাছের গোড়ায় মাটি থেকে ১ মিটার উঁচুতে ৮-১০ ইঞ্চি চওড়া প্লাস্টিকের পিচ্ছিল  ব্যান্ড গাছের চতুর্দিকে আবৃত করে দিলে এরা বার বার ওঠার ব্যর্থ চেষ্টা করে পরিশ্রান্ত হয়ে মারা যায়। অনেক সময় প্লাস্টিকের পিচ্ছিল ব্যান্ডের নিচের অংশে নিম্ফগুলো জমা হয়। এ অবস্থায় এদের সহজেই পিটিয়ে বা একসাথে করে আগুনে পুড়িয়ে মারা সম্ভব অথবা জমাকৃত পোকার উপর কীটনাশক ¯েপ্র করে দমন করা যায়। এসময় নিম্ফগুলোকে গাছে উঠা হতে নিবৃত করতে পারলে এ পোকার আক্রমণ পুরোপুরিভাবে দমন করা সম্ভব।


৪. যদি কোনো কারণে নিম্ফগুলো গাছ বেয়ে উপরে উঠে যায় তবে শুধুমাত্র গাছের আক্রান্ত অংশে (Spot application) সংস্পর্শ ও পাকস্থলী (Contact and stomach) কীটনাশক বিধি মোতাবেক প্রয়োগ করা প্রয়োজন। তবে প্রাথমিকভাবে অল্প কিছু পরিমাণ নিম্ফ গাছ বেয়ে উপরে উঠে গেলে কেবলমাত্র গুঁড়া সাবান মিশ্রিত পানি (প্রতি লিটার পানিতে ৫ গ্রাম হারে) স্প্রে করে এ পোকার আক্রমণ রোধ করা সম্ভব। তবে ব্যাপকভাবে আক্রমণের ক্ষেত্রে কীটনাশক প্রয়োগের বিকল্প নেই। যেহেতু এ পোকাটির বহিরাবরণ ওয়াক্সি পাউডার জাতীয় পদার্থ দিয়ে সুরক্ষিত থাকে সেহেতু পরীক্ষিত কীটনাশক ছাড়া এটি দমন করা দুরূহ।  এ ক্ষেত্রে প্রথমে ক্লোরপাইরিফস (ডারসবান ২০ ইসি বা এ জাতীয় কীটনাশক প্রতি লিটার পানিতে ৩ মিলি. হারে) এবং তার ৩-৪ দিন পর কার্বারাইল (সেভিন ৮৫ এসপি বা এ জাতীয় কীটনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে) আক্রান্ত অংশে ¯েপ্র করতে হবে। প্রতি ১৫ দিন অন্তর ২-৩ বার এভাবে স্প্রে করলে এ পোকা সম্পূর্ণভাবে দমন করা সম্ভব।


ছাতরা পোকার ব্যাপকভিত্তিক আক্রমণের ফলে সৃষ্ট অন্যান্য অসুবিধাগুলো
যেহেতু এ পোকাটি লোকালয়ে অবস্থিত বিভিন্ন কাঁঠাল, কড়ই বা আমগাছে আক্রমণ করে থাকে সেহেতু এদের ব্যাপকভিত্তিক আক্রমণের ফলে জনমনে অনেক সময় ভীতির সৃষ্টি হয়ে থাকে। বিশেষত নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ হতে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত যখন সদ্য ফোটা নিম্ফ গাছ বেয়ে উপরে উঠে অথবা ঘাস বা বাগানের ছোট ছোট গাছে ইতঃস্তত ঘুরাফেরা বা অবস্থান করে এবং পরে এপ্রিল-মে মাসে স্ত্রী  পোকাগুলো  দলবদ্ধভাবে গাছ থেকে মাটিতে নেমে আসে তখন এরা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে এপ্রিল-মে মাসে স্ত্রী পোকাগুলো ডিম পাড়ার জন্য অধির থাকে বলে উপযুক্ত স্থানের সন্ধানে এরা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে এক্ষেত্রে জনমনে ভীতির সঞ্চার হওয়ার কোনো কারণ নেই, কারণ এ পোকাটি অত্যন্ত নিরীহ প্রকৃতির। মানুষের শরীরে ক্ষতিসাধিত হয় এ রকম কোনো উপাদান এ পোকাটির মধ্যে নেই। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্ত্রী পোকাগুলো যেহেতু উড়তে পারে না সেহেতু এদের ঝাঁটা বা অন্য কিছুর সাহায্যে একসাথে করে পুড়িয়ে ফেলা বা একটু গভীর (কমপক্ষে এক-দেড় ফুট) গর্ত করে পুঁতে ফেলা উচিত। যেসব স্থানে এ পোকার আক্রমণ পরিলক্ষিত হয় সে স্থানগুলোতে পরবর্তী নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা দরকার এবং সদ্য ফোটা নিম্ফ গাছ বেয়ে উপরে উঠা শুরু করা মাত্রই উপরে বর্ণিত দমন ব্যবস্থাপনাগুলো প্রয়োগ করা প্রয়োজন। মনে রাখা দরকার প্রথম হতে সাবধানতা অবলম্বন করলে এপোকা দমন করা মোটেই কঠিন নয়। নিম্ফ গাছ বেয়ে উপরে উঠা শুরু করা মাত্রই প্রয়োজনবোধে বিশেষজ্ঞর পরামর্শ নেয়া বা যোগাযোগ করা একান্তভাবে প্রয়োজনীয় (এক্ষেত্রে কীটতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, টেলিফোন নং: ৯২৫৬৪০৪, ৯২৫৭৪০০, মোবাইল: ০১৭১১ ৯০৭৮৮৬ বা উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, টেলিফোন নং ৯১৩১২৯৫ এ যোগাযোগ করা যেতে পারে)।

 

ড. সৈয়দ নূরুল আলম*
* মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রধান, কীটতত্ত্ব বিভাগ, বাকৃগই, গাজীপুর


Share with :

Facebook Facebook