কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

বাংলাদেশের আম শিল্প : সমস্যা ও সম্ভাবনা

আম মিষ্টি ও টক স্বাদের মিশ্রণযুক্ত একটি রসালো ফল, যা উদ্ভিদতত্ত্বে ড্রুপ (Drupe) নামে পরিচিত। আম বাংলাদেশ তথা বিশ্বের অন্যতম প্রধান সুমিষ্ট ও জনপ্রিয় ফল। পাক-ভারত উপমহাদেশে আমকে ফলের রাজা বলা হয়। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অনেক আগে থেকেই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বিভিন্ন জাতের আম চাষ হয়ে আসছে। বৃটিশ ভারতের বাঙালা প্রদেশে তথা বর্তমান বাংলাদেশে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদন হতো।  সে গৌরব বর্তমানে অতীত, আম আমাদের দেশে মৌসুমি অর্থকরী ফল হিসেবে গুরুত্ব পেলেও একে শিল্পজাত পণ্য হিসেবে প্রক্রিয়াজাতকরণের কার্যকর গবেষণা অদ্যাবধি নেয়া হয়নি। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে যেমন আমকে বিভিন্ন স্বাদে ভোগ করা যাচ্ছে না, ঠিক তেমনি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে এই ফলের অনুকূল সম্ভাবনাকে আমরা কাজে লাগাতে অব্যাহতভাবে ব্যর্থ হচ্ছি। আমের জমির পরিমাণ ও উৎপাদনের মধ্যে তারতম্যের কারণ মূলত কার্যকর গবেষণার অভাব এবং জলবায়ু ও পরিবেশের ভারসাম্যহীনতার কুফল। ভারতের ফারাক্কা বাঁধের অভিশপ্ত প্রভাব বাংলাদেশে উত্তরাঞ্চলে মরুকরণের যে প্রভাব ফেলেছে, আমাদের আম ফলও কম বেশি তার কুপ্রভাবের শিকার। জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে পুষ্টির অভাব মেটানো, কর্মসংস্থান তথা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাজারজাতকরণ এবং গুদামজাত করে দীর্ঘমেয়াদি বিপণন প্রক্রিয়া গ্রহণ, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক, বেসরকারি ব্যাংক, অর্থলগ্নী প্রতিষ্ঠানসহ শিল্পোউদ্যোক্তারা এগিয়ে এলে আম শিল্পের বিকাশ ঘটবে।


তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ অধিক জনসংখ্যার ভারে আক্রান্ত। সাধারণ জনগণের অপুষ্টি দূরীকরণে, বেকারত্ব দূরীকরণ তথা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে আম শিল্পের বিকাশ পুরোপুরি ঘটিয়ে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে আমদানি ও রপ্তানির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নার্সারি পর্যায়ে আম চারা উৎপাদন একটি ব্যবসায়, কৃষক পর্যায়ে আম চাষ লাভজনক কৃষি পণ্য, ব্যবসায়ী পর্যায়ে মৌসুমি ব্যবসায় হিসেবে বিবেচিত হলেও আমকে শিল্পের পর্যায়ে ভাবা হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে যে পরিমাণ কোমল পানীয়, বিদেশি জুস, জ্যাম, জেলি ইত্যাদি আমদানি করা হয়; আমকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে তা পণ্যে রূপান্তর করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও সম্ভব। যদি দেশে এ জাতীয় পণ্য রপ্তানি করতে না হয় তাহলেই তো দেশের হাজার হাজার  কোটি টাকা দেশেই থাকবে; তদুপরি বিদেশে রপ্তানি করতে পারলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ফলে দেশের আর্থসামাজিক পরিবর্তন ঘটতো; একথা নির্দ্ধিধায় বলা যেতে পারে। ১৯৮৫ সন হতে আমের উৎপাদন বৃদ্ধিতে করণীয়, পরিকল্পনা গ্রহণ ও বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেয়া হলেও আম শিল্পের বিকাশ অথবা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে আম শিল্প হিসেবে বা ‘শিল্পজাত পণ্য’ হিসেবে কী ভূমিকা রাখতে পারে তা বিবেচিত হয়নি, আম উৎপাদনে প্রাকৃতিক নিয়মানুযায়ী অন ইয়ারে বাম্পার ফলন, অফ ইয়ারে কম উৎপাদন, দুটোই সমস্যা তৈরি করে। কেননা, বেশি উৎপাদনের ফলে আমের ক্রেতা থাকে না, আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েন আবার কম উৎপাদন হলে আমচাষিরা দাম বেশি পেলেও আমি উৎপাদনের ফলে লাভবান হন না; অপর দিকে ব্যাবসায়ীরা লাভবান হন। বাজারে ক্রেতা না থাকায় আম পানির দরে বিক্রি করতে দেখা যায়। আম পচনশীল হওয়ার কারণে তা ধরে রাখাও সম্ভব হয় না। কিন্তু হিমাগারে আম রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে পারলে অথবা আম দিয়ে পাল্প তৈরি করে পরবর্র্তীতে বিভিন্ন রকম পণ্য উৎপাদিত হলে আম ‘শিল্প’ হিসেবেই বিবেচিত হতো।


আমকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার কথা আমরা যখন ভাবছি, তখন ভারত, পাকিস্তান এমনকি সৌদি আরবও আমজাত পণ্যের অগ্রগতি ঘটিয়েছে। বাংলাদেশের বাজার ওইসব দেশের আমজাত পণ্যে সয়লাব। শিল্প পণ্য হিসেবে আম দিয়ে নিম্নোক্ত খাদ্যদ্রব্য তৈরি করা সম্ভব।
১. আমের রস।
২. আমের মোরব্বা।
৩. আমের স্কোয়াশ।
৪. আমের জেলি।
৫. আমের পাল্প।
৬. আমের টফি।
৭. আমের মধু।
৮. আমস্বত্ত্ব।
৯. আমের বরফি।
১০. আমের আচার।
১১. আমের জ্যাম।
১২. আমের পাউডার।
এসব শিল্পের জন্য যেসব উপাদান অপরিহার্য আম শিল্পের সম্ভাবনা হিসেবে সেগুলো আলোচনা করা হলো।

 

ক. মূলধন প্রাপ্যতা
শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু আম শিল্পের বিকাশের জন্য খুব বেশি মূলধনের প্রয়োজন নেই। বাণিজ্যিক ব্যাংক অথবা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় এই শিল্পকে দাঁড় করাতে পারেন, উন্মোচন করতে পারে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত।

 

খ. কাঁচামাল প্রাপ্যতা
যে কোনো শিল্পই কাঁচামালের সহজ প্রাপ্যতার ওপর টিকে থাকে। আম শিল্পের কাঁচামাল হিসাব খুব ভালোজাতের আমের প্রয়োজন নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, গুটি আমের ম্যাঙ্গো জুস বেশি ভালো হয়। আর ভালো জাতের আমের চেয়ে গুটি আম অনেক বেশি ফলে। তাছাড়াও ঝড়ে বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঝরে যাওয়া আম কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। তাই বলা যায় যে, আম শিল্পের বিকাশে কাঁচামাল প্রাপ্যতা নিয়ে দুশ্চিন্তার অবকাশ নেই।

 

গ. জনশক্তির প্রাচুর্য
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে সুলভে জনশক্তি পাওয়া যায়। শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারলে দক্ষ শ্রমিক/কর্মীর সমস্যা হবে না। তাই বলা যায়, আম শিল্পের বিকাশ ঘটাতে পারলে আম চাষি ব্যবসায়ীরা যেমন লাভবান হবেন, তেমনি দেশে কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হবে। দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে।

 

ঘ. দেশীয় উৎপাদন প্রযুক্তি
বাংলাদেশে আম শিল্পের সম্ভাবনার একটি বড় দিক হলো দেশীয় প্রযুক্তিতে এমনকি ঘরে বসেও আমজাত পণ্য তৈরি করা যায়। ‘পণ্য’ কোম্পানিতে দেশীয় প্রযুক্তিতে উৎপাদন করছে। ‘পণ্য’ এর মতো দেশি উৎপাদন প্রযুক্তি ব্যবহার করেই আম শিল্পের বিকাশে পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব।

 

ঙ. ক্রমবর্ধমান চাহিদা
চাহিদার ওপরই সাধারণত কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রম নির্ভর করে। আশার কথা, বাংলাদেশে আমজাত পণ্যের চাহিদা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ম্যাঙ্গো জুস এখন কোমল পানির চাইতে অনেক বেশি জনপ্রিয়। আম শিল্পের বিকাশ ঘটলে বাজারজাতকরণের সমস্যা তো হবেই না, উপরন্তু বাংলাদেশ এর মাধ্যমে গার্মেন্ট শিল্পের মতো প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়।


বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে আম শিল্পের সমস্যাসমূহ সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো-
আমকে শিল্প মাধ্যমে নিয়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিপণন করতে পারলে অদূর ভবিষ্যতে এটা লাভজনক শিল্প হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া এমনকি মরুভূমির দেশ সৌদি আরবও আমকে শিল্পজাত পণ্যে রূপান্তরিত করেছে।

 

কাঁচামাল হিসেবে উৎপাদন হ্রাস : একটি শিল্পের সুষ্ঠু বিকাশে সঠিক মানের ও সঠিক পরিমাণে কাঁচামাল অতিব জরুরি। এদিক থেকে আমের ফলন সন্তোষজনক নয়। সাধারণভাবে রাজশাহী অঞ্চলকে আম উৎপাদনের জোন মনে করা হয় এবং তা গোটা দেশের মোট উৎপাদনে ৮০-৯০% এর মতো। এই উৎপাদন জোনেই উৎপাদনের মাত্রা হতাশাজনক। অবশ্য আশার কথা এই যে, বৃহত্তর রাজশাহী জেলায় বিশেষত চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী নওগাঁ জেলায় ধানি জমিতে আম চাষ অনবরত বৃদ্ধি পাচ্ছে, আম উৎপাদনের দিক থেকে এটি আশার কথা হলেও খাদ্য নিরাপত্তা প্রশ্নে তা বিরাট প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।


হিমাগার সমস্যা : পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে যে, কাঁচামাল দীর্ঘদিন রাখার জন্য হিমাগার অত্যাবশ্যক। আমাদের দেশে আম সংরক্ষণের জন্য কোন হিমাগার গড়ে ওঠেনি। অন ইয়ারে আমের বাম্পার ফলন এবং এর ফলে আম সংরক্ষণের অভাবে এবং পরিবহনের অনিয়মের জন্য প্রচুর আম নষ্ট হয় এবং কমদামে তা বিক্রি করা ছাড়া উপায় থাকে না। এ অবস্থার আমি চাষি ও ব্যবসায়ীদের নিকট হিমাগারের প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভূত হয়।


হিমাগার পরিবহনের অভাব : সাধারণ পরিবহন ও হিমাগার পরিবহন এক কথা নয়। সাধারণভাবে পরিবহনের ক্ষেত্রে আমাদের যোগাযোগের অসুবিধার জন্য প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে আম নষ্ট হয়ে যায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আম ও আমজাত পণ্য পরিবহনের জন্য হিমাগার পরিবহনের ব্যবস্থা রয়েছে।
 

ঋণের অপ্রতুলতা : আম শিল্পতো দূরের কথা, আম চাষেও ব্যাংকসমূহ বা অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ ঋণ কার্যক্রম চালু করেনি। ফিলিপাইনে বছরের অধিকাংশ সময় আম ফলানো হচ্ছে এবং প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার আম রপ্তানি করা হচ্ছে। The Development Bank of Philippines (DBP) সে দেশে আম শিল্পে বিভিন্ন মেয়াদে নিয়মিত ঋণ সরবরাহ করে থাকে। যার পরিমাণ প্রতি হেক্টরে ৫০০ ফিলিপাইন মুদ্রা। এই ঋণ সাত বছর ও পনের বছর মেয়াদি। ‘সুদের হার ১২%’।
 

পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা : বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন, বিশেষত ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে উত্তরাঞ্চলে গ্রীষ্মকালে ৪০-৪২ ডিগ্রি তাপমাত্রা এবং শীতকালে ৪-৫ ডিগ্র্রি সে. তাপমাত্রা পরিলক্ষিত হচ্ছে। উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর ৩৭% উর্বরা জমি মরুভূমি প্রায়। আমের মুকুল ধরার সময় কুয়াশা ভীষণ ক্ষতি করে এবং গরমে ছোট ছোট গুটি ঝরে যায়। আগে যে অফ ইয়ার এবং অন ইয়ার প্রচলিত কথা আমাদের জানা ছিল তা বর্তমানে নিশ্চিহ্ন প্রায়।
সরকারি উদ্যোগের অভাব : দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগ, আনুকূল্য ও কার্যকর পৃষ্টপোষকতা অপরিহার্য বরং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সরকারি আনুকূল্যই মুখ্য হয়ে উঠে। যেমন সম্ভাবনাময় আম ফলকে শিল্প হিসাবে গ্রহণ না করার ফলে একদিকে যেমন বহুমুখী উপযোগিতা হারাচ্ছে তেমনি স্বাভাবিকভাবে আমের উৎপাদনও কমে আসছে। আর এদিকে সুযোগ বুঝে বিদেশি ফল আমদানিতে হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। এক সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে যে, বিদেশ থেকে বৈধভাবে যে পরিমাণ ফল আমদানি করা হয়, রপ্তানি করা হয় তার ৬২ ভাগের ১ ভাগ। আমদানি করা আপেল, কমলা, আঙুর, বেদানা, নাশপাতি, মাল্টা কোনো ফলই আমের চেয়ে গুণে, মানে বেশি নয়। সরকার চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেও আমকে শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেনি। তাই বলা যায় যে, আম উৎপাদন ও শিল্পায়নে সরকারি উদ্যোগ অতীব জরুরি।


জ্বালানি সংকট : শুধু উত্তরবঙ্গে দুই কোটি লোক কাঠের জ্বালানি ব্যবহার করে থাকেন। যার মধ্যে আম গাছ অন্যতম। তাছাড়াও ইট ভাটা, আসবাবপত্র তৈরিতে আম গাছের যথেচ্ছ ব্যবহার আম গাছের সংখ্যা ও উৎপাদনের জন্য হুমকিস্বরূপ।


ক. বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে আম শিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনা : আম ও কর্মসংস্থান
আম ফলের রাজা। একটি উৎকৃষ্ট সুস্বাদু ফল হিসেবে আমের বাণিজ্যিক গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশের প্রায় সব কটি জেলাতেই কমবেশি আম উৎপাদন হয়। সারা দেশে উল্লিখিত পরিমাণ আম উৎপন্ন হয় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার একর জমিতে। সুতরাং এত বিপুল পরিমাণ জমিতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জনশক্তি সম্পৃক্ত থাকে। বাগান চাষ ও পরিচর্যার জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমিক ছাড়াও শুধু ফলনের মৌসুমেই অর্থাৎ বছরের প্রায় ৪/৫ মাস প্রচুর লোক সারা দেশে আম সংক্রান্ত কর্মকা-ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকে। নিম্নোক্তভাবে এক্ষেত্রে জনশক্তির কর্মসংস্থান হতে পারে।
১. আম চাষ ও পরিচর্যার মাধ্যমে
২. সংগ্রহ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে
৩. আম ও আমজাত দ্রব্যাদি পরিবহনের মাধ্যমে
৪. আম ও আমজাত দ্রব্যাদি বাজারজাতকরণের মাধ্যমে
৫. আম শিল্প

 

১. আম চাষ ও পরিচর্যার মাধ্যমে
ভালো ফলনের জন্য আম গাছে পরিকল্পনা- মাফিক পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। আমের মুকুল আসা থেকে শুরু করে পূর্ণতা অর্থাৎ আম গাছের সঠিক পরিচর্যা ঠিকমতো না হলে ফলনের ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয় না। মুকুল আসার আগে ও পরে সার প্রয়োগ, সেচ এবং ‘স্মার্জিং স্প্রে’ আমের ফলনের জন্য নার্সারি পরিচর্যা হিসেবে পরিগণিত। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় প্রতি বছর কমপক্ষে ৪/৫ মাস আম বাগান পরিচর্যার জন্য প্রতি তিন একর আয়তন বিশিষ্ট আম বাগানে ৫ জন শ্রমিক কর্মরত থাকেন। সেই হিসাবে বর্তমানে দেশে ১,২০,০০০ একর জমিতে ৪/৫ মাসের জন্য ১.৬ লাখ থেকে ২ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়। তবে এখানে উল্লেখ্য যে, বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আম চাষের ক্ষেত্রেই কেবল এটি ঘটে থাকে।

 

২. সংগ্রহ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে
আম শিল্পে সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য বিপুল লোক কর্মরত আছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আম বাগানগুলোতে প্রতি দশ একর জমিতে আমের পূর্ণতা প্রাপ্তির পর অর্থাৎ পাকার সময় গড়ে ৬/৭ জন লোক একমাস শ্রম দিয়ে থাকেন। এই হিসাবে প্রতিবছর ৭২-৮৪ হাজার লোকের এক মাসের কর্মসংস্থান হয়। সংরক্ষণের জন্য আমের হিমাগার নির্মাণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হলে আলুর হিমাগারের মতো অনেক লোকের কর্মসংস্থান ঘটবে।

 

৩. আম ও আমজাত দ্রব্যাদি পরিবহনের মাধ্যমে
সত্যিকার অর্থে, যে কোনো কাঁচামালের উপযুক্ত দাম এবং উপযোগ পেতে হলে পরিবহনের বিষয়টি সর্বাগ্রে গুরুত্বের দাবি রাখে। আম ফলের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটে না। সুতরাং কিছুসংখ্যক লোককে পরিবহনের কাজে সবসময়ই ব্যস্ত থাকতে হয়। আম উৎপাদন ক্ষেত্র থেকে সারা দেশে তা বাজারজাতকরণের লক্ষ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে পরিবহন করতে হয়। যেমন- সড়ক পথে ট্রাক, রেল, ভ্যান গাড়ি, গরুর গাড়ি, ঘোড়া গাড়ি ইত্যাদি। পানি পথে নৌকা, স্টিমার, ফেরি, লঞ্চ ইত্যাদি এবং রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিমান। এসব মাধ্যমে পরিবহনের জন্য উল্লেখযোগ্য জনশক্তি কর্মরত থাকে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে আমের মৌসুমে (জুন-জুলাই) দুই মাস প্রতিদিন শত শত ট্রাকে হাজার হাজার টন আম রপ্তানি করা হয়ে থাকে। এভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে যে পরিমাণ আম পরিবাহিত হয়, তাতে সব মিলিয়ে সারাদেশে শুধু পরিবহনের জন্য কয়েক হাজার লোককে লাগাতার শ্রম দিতে হয়।
এখানে উল্লেখ্য যে, ক্ষুদ্র পরিসরেও আমজাত পণ্য পরিবহনে কিছু লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে।

 

৪. আম ও আমজাত পণ্য বাজারজাতকরণের মাধ্যমে
মৌসুমি ফল হিসেবে আমাদের দেশে যে পরিমাণ আম উৎপাদিত হয়, তা বাজারজাতকরণে যে পরিমাণ লোকের কর্মসংস্থান হয় সেটা নেহায়েত কম নয়। তবে বছরের সীমিত সময় দুই থেকে আড়াই মাস আমের বিপণন প্রক্রিয়া চলে বলে এতে খুব বেশি সংখ্যক জনশক্তি কমংসংস্থানের সুযোগ থাকে না। এক্ষেত্রে আমের প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে যদি সঠিকভাবে উচ্চমানের বাজারজাত করা সম্ভব হয় তাহলে প্রচুর লোকের কর্মসংস্থান হতে পারে।

 

৫. আম শিল্প
আম কৃষি পণ্য হলেও একে শিল্প পণ্যে রূপান্তরের মাধ্যমে তথা আম শিল্প গড়ে তোলার জন্য যেসব উপকরণের দরকার, তা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনো সমস্যা নয়, বরং সমস্যা হলো উদ্যোগের। প্রাণ কোম্পানির মতো আমজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করতে পারলে বিপুল সংখ্যক লোকের কর্মসংস্থান ঘটবে এই শিল্পে- তাতে সন্দেহ নেই।

 

খ. অর্থনৈতিক উন্নয়নে আমের অবদান
অর্থনৈতিক দিক থেকে আমের অবদান কোনো অংশে কম নয়, আন্তর্জাতিক মানের এই ফলটি শুধু পুষ্টি ও স্বাদের জন্যই বিখ্যাত নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইতোমধ্যে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে ফিলিপাইন ও ভারতে। ফিলিপাইন ‘স্পার্জিং’ পদ্ধতিতে বছরের অধিকাংশ সময় আম উৎপাদন করে এবং নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে থাকে। ভারতও একইভাবে আমি রপ্তানি করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশের অবস্থা উল্টো। এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত আমরা আমকে অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে পারিনি। আম ও আমজাত সামগ্রী বিভিন্নভাবে বাণিজ্যিক পণ্য হতে পারে।


১. রপ্তানি পণ্য হিসেবে আম বিদেশে রপ্তানি করার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।
 

২. আমকে প্রক্রিয়াজাত করে শিল্প পণ্যে রূপান্তরের মাধ্যমে বড় ধরনের বাজার সৃষ্টি করা যায়। দেশে-বিদেশে এসব পণ্যের চাহিদা সৃষ্টির মাধ্যমে বাজারজাত ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে পারলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে।
 

৩. আম গাছের কাঠ বড় ধরনের অর্থকরী সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। জ্বালানির ওপর উত্তরাঞ্চলের প্রায় দুই কোটি লোক নির্ভরশীল, বর্তমানে আম কাঠের জ্বালানি বিপুলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সাথে সাথে দেশের জনগোষ্ঠীর আসবাবপত্রের চাহিদা পূরণে আম কাঠ বিরাট ভূমিকা রাখছে।
 

৪. আম অধিকাংশ ফলের চেয়ে অধিক মূল্যবান। প্রতিষ্ঠিত আম বাগান এক ধরনের স্থাবর  সম্পত্তির মতো। এ সম্পত্তি থেকে বছরে নিয়মিত আয় হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় এক একর আম গাছ থেকে প্রতি বছর কমপক্ষে এক লাখ টাকা উপার্জন করা সম্ভব। ফলের  রাজা ‘আম’ এবং আবাল বৃদ্ধ বনিতা সবার প্রিয় ফল ‘আম’ এর অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করে অন্যান্য শিল্পের মতো অগ্রাধিকার প্রদান করে সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে আম শিল্পের বিকাশে এখনই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এই শিল্পে নানাবিধ সমস্যা ও সম্ভাবনাকে গবেষণার মাধ্যমে তুলে ধরে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
 

মো. আবদুল মানিক*

* ব্যবস্থাপক, সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, সমাজসেবা অধিদপ্তর, বারপুর, ডাক ও জেলা-বগুড়া


Share with :

Facebook Facebook