কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কবিতা ১৪২৩ মাঘ

স্ট্রবেরি
মো. আবদুস সবুর মণ্ডল*

যদি চাষ করেন স্ট্রবেরি ভাগ্য ফেরাতে হবে না দেরি
নিজের সংসার চলবে বেশ সমৃদ্ধও হবে আমার দেশ।
গাছ লাগানোর দুই মাসে সব গাছে ফুল আসে
এরপরেও ৩০ দিন গুণে ফল তুলে নিন।
এইভাবে তুলুন ফল সাড়ে তিন মাসকাল।
পাকা ফল খান নিজে বাড়তি ফল রাখুন ফ্রিজে।
মূল্য যার আকাশ ছোঁয়া ২৫০ টাকা প্রতি পোয়া।
সুযোগমতো বাজারে দেন নগদ টাকা বুঝে নেন।
এগিয়ে আসুন সাধক চাষা এবার পুরাবো মনের আশা।
আমরা দেশের গর্ব দেশের সেবা করব
চেষ্টা করলে শেষটা উন্নত হবে দেশটা।
. . . . . . . . .
কর চাষ স্ট্রবেরি তাড়াতাড়ি সবাই মিলে
দেশটা গড়ি কর চাষ স্ট্রবেরি।
এসে মা জননী সোনামণি সবাই মিলে দেব পানি
এসো ভাই সবাই মিলে এটা আমার দাবি।
তাড়াতাড়ি নাওগো মেনে
স্ট্রবেরি চাষ করলে ভাগ্য ফিরবে রাখ জেনে।
কর চাষ স্ট্রবেরি তাড়াতাড়ি
সবাই মিলে দেশটা গড়ি কর চাষ স্ট্রবেরি।
ওরে একটি বাড়ি একটি খামার
হয়ে যাবে তোমার আমার।
টাকায় ভরবে পকেট মোদের
আল্লাহ তায়ালা ফসল দিলে
কর চাষ স্ট্রবেরি তাড়াতাড়ি।
সবাই মিলে দেশটা গড়ি কর চাষ স্ট্রবেরি।
কেজি ৬০০ নয়কো পাকা
অধম চাষি সবুর বলে স্ট্রবেরি চাষ করলে
টাকার অভাব যাবে চলে
কর চাষ স্ট্রবেরি তাড়াতাড়ি
সবাই মিলে দেশটা গড়ে কর চাষ স্ট্রবেরি।
. . . . . . . . . .
রসাল ফল স্ট্রবেরি চাষ কর তাড়াতাড়ি ওরে চাষি ভাই
চাহিদা তার বিশ্বব্যাপী তুলনা যার নাই।
পুষ্টিগুণে ভরপুর রোগবালাই হবে দূর
ফল খেলেও রোগবালাই যাবে ভাই।
কৃষকবান্ধব আমাদের সরকার
ঘটাতে চাষের প্রসার হয়েছে বদ্ধ পরিকর
প্রতি কেজি ৬০০ টাকা একথাটি নয়কো ফাঁকা
প্রতি গাছে ৪শ’র মতো ফল পাওয়া যায়
সাড়ে চার হাজার গাছে বিঘাপ্রতি কত আসে
হিসাব করলে পাবে রায়।
জিরো থেকে হিরো হতে বেশি পুঁজি লাগে না
চাষের কাজ করতে শুরু ধরতে কিন্তু হবে গুরু।
শুনতে যত সহজ কাজে তত সহজ নয়
বীজ হয় না এ গাছে তবে আবার মজা আছে
লতি কচুর মতো করে বাড়ে এ গাছ
গাছগুলো বাঁচিয়ে রাখতে আছে অনেক কাজ
প্রতিকূল আবহাওয়ায় গাছগুলো যায় মরে
মরে যাওয়ার আগে কিন্তু নোটিশ দেয় না
যেতে হবে নিয়ম ধরে ধৈর্যের সাথে কাজ করে
তবে ফল পাওয়া যাবে মিছে কথা না।
বাড়ি আঙিনায় ঘরের ছাদে স্ট্রবেরি লাগানো যাবে
নিজের লাগানো ফল খাবে বেড়ে যাবে আয়
তাই আর না করে দেরি চাষ করুন স্ট্রবেরি
লেগে যান সবাই মিলে দেশের সেবায়।


*গোপালপুর ২নং ওয়ার্ড, পুরাইকালী, পাইকগাছা পৌরসভা, খুলনা ০১৯৪৪৮৪১৪২১

 

অগ্রহায়ণ মাসের কৃষি

কার্তিক ও অগ্রহায়ণ এই দুই মাস হেমন্তকাল।  হেমন্ত বাংলার বিখ্যাত নবান্ন উৎসবের সময়। নবান্ন উৎসবের সমান্তরালে উৎসবমুখর থাকে বৃহত্তর কৃষি ভুবন। সুখ্যাত আমন ও আউশসহ নানা নতুন ধান কেটে এই সময়ে ঘরে তোলা হয়। কেননা এ মৌসুমই কৃষির জন্য তুলনামূলক নিশ্চিত একটি মৌসুম। তাহলে আসুন আমরা জেনে নেই অগ্রহায়ণ মাসের কৃষিতে আমাদের করণীয় কাজগুলো।

আমন ধান
এ মাসে অনেকের আমন ধান পেকে যাবে তাই রোদেলা দিন দেখে ধান কাটতে হবে। ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় আমন ধান শতকরা ৮০ ভাগ পাকলে কেটে ফেলতে হবে। আমন ধান কাটার পরপরই জমি চাষ দিয়ে রাখতে হবে, এতে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে মাটির রস কম শুকাবে। উপকূলীয় এলাকায় রোপা আমন কাটার আগে রিলে ফসল হিসেবে খেসারি আবাদ করতে পারেন। আগামী মৌসুমের জন্য বীজ রাখতে চাইলে প্রথমেই সুস্থ সবল ভালো ফলন দেখে ফসল নির্বাচন করতে হবে। এরপর কেটে, মাড়াই-ঝাড়াই করার পর রোদে ভালোমতো শুকাতে হবে। শুকানো গরম ধান আবার ঝেড়ে পরিষ্কার করতে হবে এবং ছায়ায় রেখে ঠা-া করতে হবে। পরিষ্কার ঠা-া ধান বায়ুরোধী পাত্রে সংরক্ষণ করতে হবে। বীজ রাখার পাত্রটিকে মাটি বা মেঝের ওপর না রেখে পাটাতনের ওপর রাখতে হবে। পোকার উপদ্রব থেকে রেহাই পেতে হলে ধানের সাথে নিম, নিসিন্দা, ল্যান্টানার পাতা শুকিয়ে গুঁড় করে মিশিয়ে দিতে হবে।
বোরো ধান
আগ্রহায়ণ মাস বোরো ধানের বীজতলা তৈরির উপযুক্ত সময়। রোদ পড়ে এমন উর্বর ও সেচ সুবিধাযুক্ত জমি বীজতলার জন্য নির্বাচন করতে হবে। চাষের আগে প্রতি বর্গমিটার জায়গার জন্য ২-৩ কেজি জৈব সার দিয়ে ভালোভাবে জমি তৈরি করতে হবে। পানি দিয়ে জমি থকথকে কাদা করে এক মিটার চওড়া এবং জমির দৈর্ঘ্য অনুসারে লম্বা করে ভেজা বীজতলা তৈরি করতে হবে। যেসব এলাকায় ঠা-ার প্রকোপ বেশি সেখানে শুকনো বীজতলা তৈরি করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে প্রতি দুই প্লটের মাঝে ২৫-৩০ সেমি. নালা রাখতে হবে। বোরো মৌসুমের পানি সাশ্রয়ী ব্রি ধান৯২ এ ছাড়া যেসব এলাকায় সেচের পানির ঘাটতি থাকে সেখানে আগাম জাত হিসেবে ব্রি ধান৪৫ এবং ব্রি ধান৫৫, ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৮১, ব্রি ধান ৮৪ ও ব্রি ধান৮৬, ব্রি ধান৮৮, উর্বর জমি ও পানি ঘাটতি নেই এমন এলাকায় ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৫৯, ব্রি ধান৬০, ব্রি ধান৬৩, ব্রি ধান ৬৪, ব্রি ধান৬৮, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮৯, ব্রি ধান৯২ ব্রি হাইব্রিড ধান১, ব্রি হাইব্রিড ধান২ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৩, ঠা-া প্রকোপ এলাকায় ব্রি ধান৩৬, হাওর এলাকায় বিআর১৭, বিআর১৮, বিআর১৯, লবণাক্ত এলাকায় ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৫৫, ব্রি ধান৬১ চাষ করতে পারেন। বীজ বপন করার আগে ৬০-৭০ ঘণ্টা জাগ দিয়ে রাখতে হবে। এ সময় ধানের অঙ্কুর গজাবে। অঙ্কুরিত বীজ বীজতলায় ছিটিয়ে বপন করতে হবে। প্রতি বর্গমিটার বীজতলার জন্য ৮০-১০০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়।
গম
অগ্রহায়ণের শুরু থেকে মধ্য অগ্রহায়ণ পর্যন্ত গম বোনার উপযুক্ত সময়। এরপর গম যত দেরিতে বপন করা হবে ফলনও সে হারে কমে যাবে। দো-আঁশ মাটিতে গম ভালো হয়। অধিক ফলনের জন্য গমের আধুনিক জাত যেমন- বারি গম-২৫, বারি গম-২৮, বারি গম-২৯, বারি গম-৩০, বারি গম-৩১, বারি গম-৩২, বারি গম-৩৩ এবং লবণাক্ততাসহিষ্ণু বিনা গম-১ এসব বপন করতে হবে। বীজ বপনের আগে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক দ্বারা বীজ শোধন করে নিতে হবে। গজানোর ক্ষমতা শতকরা ৮০ ভাগ বা তার বেশি হলে বিঘাপ্রতি ১৬ কেজি বীজ বপন করতে হবে। সেচসহ চাষের ক্ষেত্রে শেষ চাষের সময় প্রতি শতক জমিতে ৩০-৪০ কেজি জৈবসার,  ৬০০-৭০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৫৫০-৬০০ গ্রাম টিএসপি,        ৪০০-৪৫০ গ্রাম এমওপি, ৪৫০-৫০০ গ্রাম জিপসাম প্রয়োগ করতে হবে। তিন পাতা বয়সে প্রথম সেচের পর দুপুর বেলা মাটি ভেজা থাকা অবস্থায় প্রতি শতাংশে ৩০০-৪০০ গ্রাম ইউরিয়া উপরি প্রয়োগ করতে হবে। উল্লেখ্য, সেচ ছাড়া চাষের ক্ষেত্রে সমস্ত ইউরিয়া শেষ চাষের সময় অন্যান্য সারের সাথে প্রয়োগ করতে হবে। গমে তিনবার সেচ দিলে ফলন বেশি পাওয়া যায়। বীজ বপনের ১৭-২১ দিনের মধ্যে প্রথম সেচ, ৫০-৫৫ দিনে দ্বিতীয় সেচ এবং ৭৫-৮০ দিনে ৩য় সেচ দিতে হবে।
ভুট্টা
ভুট্টা গত মাসে আবাদ না করে থাকলে এ মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে জমি তৈরি করে বীজ বপন করতে হবে। ভুট্টার উন্নত জাতগুলো হলো খই ভুট্টা, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৯, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৪, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৫, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৬, বারি মিষ্টি ভুট্টা-১, বারি বেবি কর্ন-১ এসব। খরা প্রধান এলাকা ও সাদা দানার ক্ষেত্রে বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১২ ও বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৩ এসব। এক শতাংশ জমিতে হাইব্রিড বীজ বপনের জন্য ৮০-৯০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়। ভালো ফলনের জন্য সারিতে বীজ বপন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সারি থেকে সারির দূরত্ব ৬০ সেমি. এবং বীজ থেকে বীজের দূরত্ব ২৫ সেমি. রাখতে হবে। মাটি পরীক্ষা করে জমিতে সার প্রয়োগ করলে কম খরচে ভালো ফলন পাওয়া যায়। তবে সাধারণভাবে হাইব্রিড ভুট্টা চাষের জন্য প্রতি শতাংশ জমিতে ইউরিয়া       ২-২.২৫ কেজি, টিএসপি ৯৫০-১০০০ গ্রাম, এমওপি    ৭০০-৯০০ গ্রাম, জিপসাম ৯৫০-১০০০ গ্রাম, দস্তা ৪০-৬০ গ্রাম, বরিক এসিড ২০-৩০ গ্রাম এবং ১৬-২০ কেজি জৈবসার প্রয়োগ করতে হবে।
সরিষা ও অন্যান্য তেল ফসল
তেল ফসলের মধ্যে সরিষা অন্যতম। তাছাড়া বাদাম, সূর্যমুখী এসব আবাদ করতে পারেন। সরিষা গাছে ফুল আসার সময় শতাংশপ্রতি ৫০০ গ্রাম ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। উপরি সার প্রয়োগের পর হালকা একটি সেচ দিতে হবে। মাটিতে রস কমে গেলে ২০-২৫ দিন পর আবারো একটি সেচ দিতে হবে।
আলু
উপকূলীয় অঞ্চলে এ মাসেও আলু আবাদ শুরু করা যায়। অন্যান্য স্থানে রোপণকৃত আলু ফসলের যতœ নিতে হবে। মাটির কেইল বেঁধে দিতে হবে এবং কেইলে মাটি তুলে দিতে হবে। সারের উপরিপ্রয়োগসহ প্রয়োজনীয় সেচ দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করতে হবে।
শাকসবজি
মাঠে এখন অনেক সবজি বাড়ন্ত পর্যায়ে আছে। ফুলকপি,             বাঁধাকপি, ওলকপি, শালগম, মুলা এসব বড় হওয়ার সাথে সাথে চারার গোড়ায় মাটি তুলে দিতে হবে। চারার বয়স ২-৩ সপ্তাহ হলে সারের উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। সবজি ক্ষেতের আগাছা, রোগ ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সেক্স ফেরোমেন ফাঁদ ব্যবহার করতে পারেন। এতে পোকা দমনের সাথে সাথে পরিবেশও ভালো থাকবে। জমিতে প্রয়োজনে সেচ প্রদান করতে হবে। টমেটো গাছের অতিরিক্ত ডাল ভেঙে দিয়ে খুঁটির সাথে বেঁধে দিতে হবে। ঘেরের বেড়িবাঁধে টমেটো, মিষ্টিকুমড়া চাষ করতে পারেন। মিষ্টিআলু, চীনা, কাউন, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচসহ অনেক অত্যাবশ্যকীয় ফসলের প্রাথমিক বৃদ্ধি পর্যায়। এসব ফসলের কোনটি এখনো না লাগিয়ে থাকলে দেরি না করে চারা লাগাতে হবে। এ মাসের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত খরা সহনশীল ছোলা, মুগ, তিসি, যব এসব বপন করা যায়।
গাছপালা
এবারের বর্ষায় রোপণ করা ফল, ঔষধি বা বনজ গাছের যতœ নিতে হবে। গাছের গোড়ায় মাটি আলগা করে দিতে হবে এবং আগাছা পরিষ্কার করে দিতে হবে। প্রয়োজনে গাছকে খুঁটির সাথে বেঁধে দিতে হবে। গাছের গোড়ায় জাবরা প্রয়োগ করলে তা পানি ধরে রাখবে। মাটিতে রসের পরিমাণ কমে গেলে গাছের গোড়ায় সেচ প্রদান করতে হবে। এ সময় গাছের   বাড়বাড়তি কম হয় তাই পারতপক্ষে এখন গাছের ডালপালা কাটা ঠিক হবে না।
প্রাণিসম্পদ
হাঁস-মুরগির ডিম থেকে বাচ্চা ফুটানোর ভালো সময় এখন। তাছাড়া সামনে শীতকাল আসছে। শীতকালে পোলট্রিতে রোগবালাইয়ের আক্রমণ বেড়ে যায় এবং রানীক্ষেত, মাইকোপ্লাজমোসিস, ফাউল টাইফয়েড,  বসন্ত রোগ, কলেরা এসব রোগ মহামারি আকারে দেখা দিতে পারে। এসব রোগ থেকে হাঁস-মুরগিকে বাঁচাতে হলে এ মাসেই টিকা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এ মাসে পশুখাদ্যের কোনো অভাব থাকে না। বিশেষ করে কাঁচা ঘাসের। তাই আমন ধানের খরসহ অন্যান্য খাদ্য যেমন ভুট্টা, ডাল, ঘাস দিয়ে সাইলেজ তৈরি করে ভবিষ্যতের জন্য রেখে দিতে পারেন। এ সময় গবাদিপশুর খুরা রোগ, তড়কা, গলাফুলা দেখা দিতে পারে। গবাদিপশুতে রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে প্রাণী চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
মৎস্যসম্পদ
মাছের খাবার হিসেবে রাসায়নিক সার এ সময় বেশি উপযোগী। জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে। প্রয়োজনে মৎস্যবিদদের সাথে পরামর্শ করে চুন বা তুঁতে প্রয়োগ করতে পারেন। পুকুরে রোদ পড়া নিশ্চিত করতে পুকুর পাড়ের গাছের ডালপালা কেটে পরিষ্কার করতে হবে। পুকুরের ঢালে প্যারা, নেপিয়ার বা অন্যান্য ঘাসের চাষ করলে অতিরিক্ত ফসল পাওয়া যায় এবং কার্পজাতীয় মাছের খাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। এ ছাড়া মাছ সংক্রান্ত যে কোনো পরামর্শের জন্য উপজেলা মৎস্য অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।
সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, সংক্ষেপে আগামী তথা অগ্রহায়ণ মাসের কৃষিকথা উপস্থাপন করা হলো। বিস্তারিত কৌশল জানার জন্য স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বা উপজেলা   কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করতে হবে। এ ছাড়া কৃষি সম্পর্কিত যে কেনো সমস্যার সমাধানের জন্য যে কোনো মোবাইল থেকে ১৬১২৩ নম্বরে কল করতে পারেন। মনে রাখবেন আমাদের সম্মিলিত অংশগ্রহণই নিয়ে আসবে কৃষির কাক্সিক্ষত সাফল্য।

 

কৃষিবিদ ফেরদৌসী বেগম

সম্পাদক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা, টেলিফোন:০২৫৫০২৮৪০৪, মেইল: fardousi30@gmail.com

 

 

লাউ উৎপাদনের আধুনিক কলাকৌশল

লাউয়ের পাতা সবুজ ও নরম। পুরুষ ও স্ত্রী ফুল যথাক্রমে রোপণের ৪২-৪৫ দিন এবং ৫৭-৬০ দিনের মধ্যে ফুটে। হালকা সবুজ রঙয়ের ফলের আকৃতি লম্বা (৪০-৪৫) এবং বেড় প্রায় ৩০-৩৫ সেমি.। প্রতি ফলের ওজন ১.৫-২ কেজি। প্রতি গাছে গড়ে ১০-১২টি ফল ধরে। চারা রোপণের ৬০-৭০ দিনের মধ্যে প্রথম ফল তোলা যায়। লাউ প্রধানত শীত মৌসুমের। শীতকালে ফলন বেশি। এটি উচ্চতাপ ও অতিবৃষ্টি সহিষ্ণু ফলে সারা বছরও জন্মানো যায়। বাংলাদেশের সব এলাকায় সারা বছরই এর চাষ করা যায়। শীতকালীন চাষের জন্য ভাদ্রের প্রথমে আগাম ফসল হিসেবে চাষ করা যাবে।

রোপণ : ভাদ্র-আশ্বিন।

জীবনকাল : ১২০-১৪০ দিন

ফলন : শীতকালে ৪৫-৫০ টন/হেক্টর (৬-৭ টন/বিঘা) এবং গ্রীষ্মকালে ১৮-২২ টন/হেক্টর (২.৫.৩ টন/বিঘা)

লাউয়ের পুষ্টিমান
লাউয়ে ১৭ ধরনের এ্যামাইনো এসিড, ভিটামিন সি, রাইবোফ্লাভিন, জিঙ্ক, থায়ামিন, লৌহ, ম্যাগনেসিয়াম ও ম্যাঙ্গানিজ এবং ৯৬% পানি রয়েছে। এতে ফ্যাট ও কোলস্টেরল নেই বললেই চলে।

উৎপাদন প্রযুক্তি
মাটি ও জলবায়ু
মাটি
জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ দো-আঁশ এঁটেল দো-আঁশ মাটি লাউ চাষের জন্য উত্তম।

জলবায়ু
বেশি শীতও না আবার বেশি গরমও না এমন আবহাওয়া লাউ চাষের জন্য উত্তম। বাংলাদেশের শীতকালটা লাউ চাষের জন্য বেশি উপযোগী। তবে বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলের তাপমাত্রা শীতকালে কখনো কখনো ১০০ সে. এর নিচে নেমে যায়, যা লাউ চাষের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। দিন ও রাতে তাপমাত্রার পার্থক্য ৮-৯০ হলে ভালো। লাউয়ের ফলন উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়।

জীবনকাল
লাউয়ের জীবনকাল গড়ে ১৬৫-১৮৫ দিন।

বীজ বপনের সময় ও বীজের হার

আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বীজ বোনার উপযুক্ত সময়। তবে বীজ উৎপাদনের জন্য অক্টোবরের শেষ দিকে বীজ বোনা উত্তম। বিঘাপ্রতি ৭০০-৮০০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়।

বীজ শোধন
বীজবাহিত রোগ প্রতিরোধ এবং সবল সতেজ চারা উৎপাদনের জন্য বীজ শোধন জরুরি। কেজিপ্রতি ২ ভিটাভেক্স/ক্যাপটান ব্যবহার করে বীজ শোধন করা যায়।

চারা উৎপাদন
বীজতলা তৈরি
লাউ চাষের জন্য নার্সারিতে পলিব্যাগে চারা উৎপাদন করে নিতে হবে। এজন্য আলো বাতাস স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায় এমন জায়গায় ২০-২৫ সেমি উঁচু বেড করে নিতে হবে। বেড়ের ওপর ৪-৫.২ মিটার আকৃতির ঘর তৈরি করে নিতে হবে। ঘরের কিনারা বরাবর মাটি হতে ঘরের উচ্চতা হবে ০.৬ মিটার এবং মাটি হতে ঘরের মধ্যভাগের উচ্চতা হবে ১.৭ মিটার। এ ঘর তৈরির জন্য বাঁশ, বাঁশের কঞ্চি, ছাউনির জন্য প্লাস্টিক এবং এগুলো বাঁধার জন্য সুতলি বা দড়ি দরকার হবে

বীজ বপন
বীজ বপনের জন্য ৮x ১০ সেমি. বা তার থেকে কিছুটা বড় আকারের পলিব্যাগ ব্যবহার করা যায়। প্রথমে অর্থেক মাটি ও অর্ধেক গোবর মিশিয়ে মাটি তৈরি করে নিতে হবে। মাটিতে বীজ গজানোর জন্য জো নিশ্চিত করে (মাটি জো না থাকলে পানি দিয়ে জো করে নিতে হবে) তা পলিব্যাগে ভরতে হবে। অতপর প্রতি ব্যাগে দুটি করে বীজ বুনতে হবে। বীজের আকারের দ্বিগুণ মাটির গভীরে বীজ পুঁতে দিতে হবে।

বীজতলায় চারা পরিচর্যা
নার্সারিতে চারার প্রয়োজনীয় পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে। বেশি শীতে বীজ গজানোর সমস্যা হয়। এজন্য শীতকালে চারা উৎপাদনের ক্ষেত্রে বীজ গজানোর পূর্ব পর্যন্ত প্রতি রাতে প্লাস্টিক দিয়ে পলিব্যাগ ঢেকে রাখতে হবে এবং দিনে খোলা রাখতে হবে। চারায় প্রয়োজন অনুসারে পানি দিতে হবে তবে খেয়াল রাখতে হবে যাতে চারার গায়ে পানি না পড়ে। পলিব্যাগ এর মাটি চটা বাঁধলে তা ভেঙে দিতে হবে।

বীজের সহজ অংকুরোদগম
লাউয়ের বীজের খোসা কিছুটা শক্ত। তাই সহজ অংকুরোদগমের জন্য শুধু পরিষ্কার পানিতে ১৫-২০ ঘণ্টা অথবা শতকরা ১% পটাশিয়াম নাইট্রেট দ্রবণে এক রাত ভিজিয়ে অতপর পলিব্যাগে বুনতে হবে।

জমি তৈরি
জমি নির্বাচন ও জমি তৈরি
এসব ফসল চাষে সেচ ও নিকাশের উত্তম সুবিধাযুক্ত এবং পর্যাপ্ত সূর্যালোক পায় এমন জমি নির্বাচন করতে হবে। একই জমিতে বার বার একই ফসলের চাষ পরিহার করতে পারলে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের উপদ্রব কমানো যাবে। ব্যাপক শিকড় বৃদ্ধির জন্য জমি এবং গর্ত উত্তমরূপে তৈরি করতে হবে।

বেড তৈরি ও বেড থেকে বেডের দূরত্ব
বেডের উচ্চতা হবে ১৫-২০ সেমি.। বেডের প্রস্থ হবে ২.৫ মিটার এবং লম্বা জমির দৈর্ঘ্য অনুসারে নিতে হবে। এভাবে পরপর বেড তৈরি করতে হবে। এরূপ পাশাপাশি ২টি বেড়ের মাঝখানে ৬০ সেমি. ব্যাসের সেচ নালা থাকবে এবং প্রতি ২ বেড অন্তর ৩০ সেমি প্রশস্ত শুধু নিকাশ নালা থাকবে।

মাদা তৈরি এবং বেডে মাদা হতে মাদার দূরত্ব
মাদার আকার হবে ব্যাস ৫০-৫৫ সেমি. গভীরতা ৫০-৫৫ সেমি. এবং তলদেশ ৪৫-৫০ সেমি.। বেডের যে দিকে ৬০ সেমি. প্রশস্ত সেচ ও নিকাশ নালা থাকবে সেদিকে বেডের কিনারা হতে ৬০ সেমি. বাদ দিয়ে মাদার কেন্দ্র ধরে ২ মিটর অন্তর এক সারিতে মাদা তৈরি করতে হবে। একটি বেরের যে কিনারা হতে ৬০ সেমি. বাদ দেয়া হবে, তার পার্শ্ববর্তী বেডের ঠিক একই কিনার থেকে ৬০ সেমি. বাদ দিয়ে মাদার কেন্দ্র ধরে অনুরূপ নিয়মে মাদা করতে হবে

সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি
এসব ফসল দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে এবং অনেক লম্বা সময়ব্যাপী ফল দিয়ে থাকে। কাজেই এসব ফসলের সফল চাষ করতে হলে গাছের জন্য পর্যাপ্ত খাবার সরবরাহ নিশ্চির করতে হবে। এরা পর্যাপ্ত খাবার সংগ্রহের জন্য এর শিকড় অঞ্চল অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত করে। বাংলাদেশের সব অঞ্চলের মাটি পরীক্ষাসাপেক্ষে সারের মাত্রা সুপারিশ করা হয়নি। কাজেই যেসব অঞ্চল এর জন্য সারের মাত্রা নির্দিষ্ট নেই সেসব অঞ্চল এর জন্য পরীক্ষামূলক প্রমাণের ভিত্তিতে নিম্নোক্ত হারে সারের মাত্রা সুপারিশ করা হলো।

লাউ ফসলের সারের মাত্রা ও প্রয়োগ পদ্ধতি
জমি তৈরির সময় সারের যে মাত্রা সুপারিশ করা হয়েছে, তার মধ্যে গোবর চাষের পর এবং টিএসপি, এমপি, জিপসাম ও বোরক্স সার শেষ চাষের সময় প্রয়োগ করতে হবে। মাদায় চারা রোপণের যে সারের মাত্রা সুপারিশ করা হয়েছে তা দেওয়ার পর পানি দিয়ে মাদার মাটি ভালোভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে। তারপর ‘জো’ এলে ৭-১০ দিন পর চারা লাগাতে হবে।

চারার বয়স : বীজ গজানোর পর ১৬-১৭ দিন বয়সের চারা মাঠে লাগানোর জন্য উত্তম।

চারা রোপণ
চারাগুলো রোপণের আগের দিন বিকালে পানি দিয়ে ভালোবাবে ভিজিয়ে দিতে হবে। পরের দিন বিকালে চারা রোপণ করতে হবে। চারাগুলো নার্সারি থেকে ট্রলি বা টুকরি করে মাঠে নিয়ে যেতে হবে। মাঠে প্রস্তুত মাদাগুলোর মাটি ভালোভাবে ওলটপালট করে, এক কোপ দিয়ে চারা লাগানোর জন্য জায়গা করে নিতে হবে। অতপর পলিব্যাগের ভাঁজ বরাবর ব্লেড দিয়ে কেটে পলিব্যাগ সরিয়ে মাটির দলাসহ চারাটি নির্দিষ্ট জায়গায় লাগিয়ে চারপাশে মাটি দিয়ে ভরাট করে দিতে হবে। চারা লাগানোর পর গর্তে পানি দিতে হবে। পলিব্যাগ সরানোর সময় এবং চারা রোপণের সময় সাবধান থাকতে হবে যাতে চারার শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হলে গাছের বৃদ্ধি দেরিতে শুরু হবে।

পরবর্তী পরিচর্যা
সেচ দেয়া
লাউ ফসল পানির প্রতি খুবই সংবেদনশীল। প্রয়োজনীয় পানির অভার হলে ফল ধারণ ব্যাহত হবে এবং ফল আস্তে আস্তে ঝরে যাবে। কাজেই সেচনালা দিয়ে প্রয়োজন অনুসারে নিয়মিত সেচ দিতে হবে। লাউয়ের জমিতে কখনো সব জমি ভিজিয়ে প্লাবন সেচ দেয়া যাবে না। শুধুমাত্র সেচ নালায় পানি দিয়ে আটকে রাখলে গাছ পানি টেনে নেবে। শুষ্ক মৌসুমে লাউ ফসলে ৪/৫ দিন অন্তর সেজ দেয়ার প্রয়োজন পড়ে।

বাউনি দেয়া
লাউয়ের কাক্সিক্ষত ফলন পেতে হলে অবশ্যই মাচায় চাষ করতে হবে। লাউ মাটিতে চাষ করলে ফলের একদিক বিবর্ণ হয়ে বাজারমূল্য কমে যায়, ফলে পচন ধরে এবং প্রাকৃতিক পরাগায়ন কমে যায়। ফলে ফলনও কমে যায়।

মালচিং
সেচের পর জমিতে চটা বাঁধে। চটা বাঁধলে গাছের শিকড় অঞ্চলে বাতাস চলাচল ব্যাহত হয়। কাজেই প্রত্যেক সেচের জর হালকা মালচ, করে গাছের গোড়ার মাটির চটা ভেঙে দিতে হবে।

আগাছা দমন
কিছু নির্দিষ্ট প্রজাতির ঘাস লাউতে বোটল গোর্ড মোজাইক ভাইরাস নামে যে রোগ হয় তার হোস্ট। কাজেই চারা লাগানো থেকে শুরু করে ফল সংগ্রহ পর্যন্ত জমি সব সময়ই আগাছামুক্ত রাখতে হবে। এ ছাড়াও গাছের গোড়ায় আগাছা থাকলে তা খাদ্যোপাদান ও রস শোষণ করে নেয়।
সার উপরিপ্রেয়োগ
চারা রোপণের পর গাছপ্রতি সার উপরিপ্রয়োগের যে মাত্রা সারণিতে উল্লেখ করা আছে তা প্রয়োগ করতে হবে।

সারের নাম  মোট পরিমাণ(হেক্টরপ্রতি) প্রতি গর্তে  জমি তৈরির সময়
পচা গোবর      ১০০০ কেজি                   ১০ কেজি   সমুদয় গোবর, টিএসপি, এমওপি, বোরন
ইউরিয়া           ৫০০ কেজি                   ৫০০ গ্রাম   এবং ১/৫ অংশ ইউরিয়া পিট বা গর্ত
টিএসপি           ৪০০ কেজি                   ৪০০ গ্রাম    তৈরির সময় প্রয়োগ করতে হবে। বাাকি এমওপি
এমওপি           ৩০০ কেজি                  ৩০০ গ্রাম   ও ইউরিয়া ৪ কিস্তিতে বছরে উপরিপ্রয়োগ করতে হবে।
বোরন              ২ কেজি                     ০২ গ্রাম

                                                                           
বিশেষ পরিচর্যা
শোষক শাখা অপসারণ
গাছের গোড়ার দিকে ছোট ছোট ডালপালা হয়। সেগুলোকে শোষক শাখা বলা হয়। এগুলো গাছের ফলনে এবং যথাযথ শারীরিক বৃদ্ধিতে ব্যাঘাত ঘটায়। কাজেই গাছের গোড়ার দিকে ৪০-৪৫ সেমি. পর্যন্ত ডালপালাগুলো ধারালো ব্লেড দিয়ে কেটে অপসারণ করতে হবে।

ফল ধারণ বৃদ্ধিতে কৃত্রিম পরাগায়ন
লাউয়ের পরাগায়ন প্রধানত মৌমাছির দ্বারা সম্পন্ন হয়। প্রাকৃতিক পরাগায়নের মাধ্যমে বেশি ফল ধরার জন্য হেক্টর প্রতি দুটি মৌমাছির কলোনি স্থাপন করা প্রয়োজন। নানা কারণে লাউয়ের সব ফুলে প্রাকৃতিক পরাগায়ন ঘটে না এবং এতে ফলন কমে যায়। হাত দিয়ে কৃত্রিম পরাগায়ন করে লাউয়ের ফলন শতকরা ৩০-৩৫ ভাগ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভর। লাউয়ের ফুল ঠিকমতো রোদ পেলে দুপুরের পর থেকে ফোটা শুরু হয়ে রাত ৭-৮টা পর্যন্ত ফোটে। কৃত্রিম পরাগায়ন ফুল ফোটার দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত এবং পরদিন সকাল পর্যন্ত করা যায়। তবে পরদিন সকালে পরাগায়ন করলে ফল কম ধরে কিন্তু ফুল ফোটার দিন সন্ধ্যাপর্যন্ত যে কয়টা ফুলে পরাগায়ন করা হয় তার সবটিতেই ফল ধরবে। কৃত্রিম পরাগায়নের নিয়ম হলো ফুল ফোটার পর পুরুষ ফুল ছিঁড়ে ফুলের পাপড়ি অপসারণ করা হয় এবং ফুলের পরাগধানী (যার মধ্যে পরাগরেণু থাকে) আস্তে করে স্ত্রী ফুলের গর্ভমুণ্ডে (যেটি গর্ভাশয়ের পেছনে পাপড়ির মাজখানে থাকে) ঘষে দেয়া হয়। একটি পুরুষ ফুল দিয়ে ২-৪টি স্ত্রী ফুলে পরাগায়ন করা যায়।

ফসল তোলা (পরিপক্বতা শনাক্তকরণ)
ফলের ভক্ষণযোগ্য পরিপক্বতা নিম্নোক্তভাবে শনাক্ত করা যায়।
১. ফলের গায়ে প্রচুর শুং এর উপস্থিতি থাকবে।
২. ফলের গায়ে নোখ দিয়ে চাপ দিলে খুব সহয়েই নোখ ডেবে যাবে।
৩. পরাগায়নের ১২-১৫ দিন পর ফল সংগ্রহের উপযোগী হয়।

লাউয়ের ফলের লম্বা বোঁটা রেখে ধারালো ছুরি দ্বারা ফল কাটতে হবে। ফল কাটার সময় যাতে গাছের কোনো ক্ষতি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। লাউ যত বেশি সংগ্রহ করা যাবে ফলন তত বেশি হবে।

ফলন : বারি লাউ-১ এবং বারি লাউ-২ যথাযথভাবে চাষ করলে হেক্টরপ্রতি ৩৫-৪০ টন এবং বিঘাপ্রতি প্রায় ৪.৫-৫.০টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়।

বীজ উৎপাদন
বীজের জন্য ফল সংগ্রহ
বীজের জন্য অবশ্যই ভালোভাবে পরিপক্ব ফল সংগ্রহ করতে হবে। দুটি উপায়ে ফলের পরিপক্বতা বুঝা যাবে। যেমন-
১. ফল নাড়ালে ভেতরে বীজের শব্দ পাওয়া যাবে,
২. ফলের খোসা শুকিয়ে যাবে এবং শক্ত হয়ে যাবে কিন্তু ফলের ভেতর শুকাবে না। এই অবস্থায় বীজের সংগ্রহোত্তর পরিপক্বতার জন্য ফল ২-৩ সপ্তাহ রেখে দিতে হবে। বীজ উৎপাদনের জন্য জমির সবগুলো গাছের মধ্যে গাছের সতেজতা, ফলন ক্ষমতা এবং সুস্থতা দেখে কয়েকটি নির্দিষ্ট গাছ নির্বাচন করে তাতে নিয়ন্ত্রিত পরাগায়ন করতে হবে। অর্থাৎ নির্বাচিত গাছগুলোর মধ্যে একই গাছের পুরুষ ফুল দিয়ে একই গাছের স্ত্রী ফুল অথবা একই জাতের এক গাছে পুরুষ ফুল দিয়ে অন্য গাছের স্ত্রী ফুল পরাগায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল ফোটার আগেই বাটার পেপার ব্যাগ দ্বারা বেঁধে রাখতে হবে যাতে অন্য জাতের পুরুষ ফুলের রেণু দ্বারা পরাগায়িত হতে না পারে এবং ফুল ফোটলে স্ত্রী ফুল পরাগায়িত করে আবার ব্যাগ দ্বারা স্ত্রী ফুল বেঁধে দিতে হবে। এই ব্যাগ দ্বারা ফল ৩-৪ দিন বেঁধে রাখতে হবে।

বীজের ফলন : হেক্টরপ্রতি ৫০০ কেজি।

ক্ষতিকর পোকামাকড়
লাউয়ের মাছি পোকা
এ পোকা লাউয়ের ফলের মধ্যে প্রথমে ডিম পাড়ে, পরবর্তীতে ডিম থেকে কীড়া বের হয়ে ফলের ভেতরে খেয়ে নষ্ট করে ফেলে।

দমন ব্যবস্থা
পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ : মাছি পোকর কীড়া আক্রান্ত ফল দ্রুত পচে যায় এবং গাছ হবে মাটিতে ঝরে পড়ে। পোকা আক্রান্ত ফল কোনোক্রমেই জমির আশেপাশে ফেলে রাখা উচিত নয়। পোকা আক্রান্ত ফল সংগ্রহ করে ধ্বংস করে ফেললে মাছি পোকার বংশবৃদ্ধি অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব।

সেক্স ফেরোমন ও বিষটোপ ফাঁদের যৌথ ব্যবহার
কিউলিওর নামক সেক্স ফেরোমন ব্যবহার করে প্রচুর পরিমাণে মাছিপোকর পুরুষ পোকা আকৃষ্ট করা সম্ভব। পানি ফাঁদের মাধ্যমে ওই ফেরোমন ব্যবহার করে আকৃষ্ট মাছি পোকাগুলোকে মেরে ফেলা যায়। বিষটোপ ফাঁদে পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী ও পুরুষ মাছি পোকা আকৃষ্ট হয় এবং ফাঁদে পড়ে মারা যায়। ১০০ গ্রাম পাকা মিষ্টি কুমড়া কুচি কুচি করে কেটে তা থেঁতলিয়ে ০.২৫ গ্রাম মিপসিন ৭৫ পাউডার অথবা সেভিন ৮৫ পাউডার এবং ১০০ মিলি পানি মিশিয়ে ছোট একটি মাটির পাত্রে রেখে তিনটি খুঁটির সাহায্যে এমনভাবে স্থাপন করতে হবে যাতে বিষটোপের পাত্রটি মাটি থেকে ০.৫ মিটার উঁচুতে থাকে। বিষটোপ তৈরির পর ৩-৪ দিন পর্যন্ত ব্যবহার করে তা ফেলে দিয়ে আবার নতুন করে তৈরি বিষটোপ ব্যবহার করতে হয়। সেক্স ফেরোমন ও বিষটোপ ফাঁদ কুমড়া জাতীয় ফসলের জমিতে ক্রমানুসারে ১২ মি. দূরে দূরে স্থাপন করতে হবে।

পামকিন বিটল : পামকিন বিটলের পূর্ণ বয়স্ক পোকা চারাগাছের পাতায় ফুটো করে এবং পাতার কিনারা থেকে খেতে খেতে সম্পূর্ণ পাতা খেয়ে ফেলে এবং বয়স্ক গাছের পাতার শিরা উপশিরা গুলো রেখে সম্পূর্ণ সবুজ অংশ খেয়ে ফেলে। এ পোকা ফুল ও কচি ফলেও আক্রমণ করে। এদের কীড়া শিকড় বা মাটির নিচে থাকা কা- ছিদ্র করে ফলে গাছ ঢলে পড়ে এবং পরিশেষে শুকিয়ে মারা যায়।

দমন ব্যবস্থা
১. চারা অবস্থায আক্রান্ত হলে হাত দিয়ে পূর্ণবয়স্ক পোকা ধরে মেরে ফেলতে হবে।
২. ক্ষেত সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা।
৩. চারা বের হওয়ার পর থেকে ২০-২৫ দিন পর্যন্ত মশারির জাল দিয়ে চারাগুলো ঢেকে রাখলে এ পোকার আক্রমণ থেকে চারাগুলো বেঁচে যায়।
৪. আক্রমণের হার বেশি হলে চারা গজানোর পর প্রতি মাদার চারদিকে মাটির সঙ্গে চারাপ্রতি ২-৫ গ্রাম অনুমোদিত দানাদার কীটনাশক (কার্বফুরান জাতীয় কীটনাশক) মিশিয়ে গোড়ায় পানি সেচ দেয়।

রোগবালাই
মোজাইক
চারা অবস্থায় বীজ গজানোর পর বীজপত্র হলুদ হয়ে যায় এবং পরে চারা নেতিয়ে পড়ে। বযস্ক গাছের পাতায় হলুদ-সবুজ ছোপ ছোপ মোজাইকের মতো দাগ দেখা যায়। দাগগুলো অসম আকারের। দ্রুত বড় হয়। আক্রান্ত পাতা ছোট, বিকৃত ও নিচের দিকে কোকড়ানো, বিবর্ণ হয়ে যায়। শিরা-উপশিরাও হলুদ হয়ে যায়। ফুল কম আসে এবং অধিক আক্রমণে পাতা ও গাছ মরে যায়। আক্রান্ত ফল বেঁকে যায় ও গাছের কচি ডগা জটলার মতো দেখায়। ফলের উপরি অংশ এবড়ো-খেবড়ো দেখা যায়।

প্রতিকার ব্যবস্থা
১. আক্রান্ত গাছ দেখলেই প্রাথমিকভাবে তা তুলে ধ্বংস করা। ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার রাখা।
২. ক্ষেতে বাহক পোকা উপস্থিতি দেখা দিলে অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগ করে তা দমন করা।
৩. রোগাক্রান্ত গাছ থেকে কোনো বীজ সংগ্রহ ও ব্যবহার না করা।
 
কৃষিবিদ মো. মাহমুদুল হাসান খান*
*বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (উদ্ভিদ প্রজনন), বিএআরআই, গাজীপুর। ই-মেইল : mhasan.bari12@gmail.com

বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাংশের মোট ১১ জেলায় ৭ লাখ হেক্টর জমিজুড়ে রয়েছে বরেন্দ্র এলাকা। এর মধ্যে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং নওগাঁ জেলায় ১,৬০,০০০ হেক্টর জমি উঁচু বরেন্দ্র অঞ্চল। তবে রাজশাহীর গোদাগাড়ী, তানোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর, নাচোল, গোমস্তাপুর এবং নওগাঁ জেলার পোরশা ও সাপাহারের আবহাওয়া বেশি রুক্ষ্ম, এগুলোকে ‘ঠা ঠা বরেন্দ্র’ বলা হয়। ‘বরেন্দ্র’ শব্দের সরল ও ব্যাকরণ সম্মত অর্থ হচ্ছে দেবরাজ ইন্দ্রের বরে (বর+ইন্দ্র) অর্থাৎ অনুগ্রহ বা আশীর্বাদপ্রাপ্ত দেশ। বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ খুব কম। পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, এ মাটিতে শতকরা মাত্র ০.৮ থেকে ১.৫ ভাগ জৈব পদার্থ রয়েছে। এ মাটিতে নাইট্রোজেন কম, ফসফরাস কম-মধ্যম, পটাশ, গন্ধক ও দস্তা কম-মধ্যম মানের রয়েছে। এ মাটি অম্লধর্মী, এর পিএইচ ৫.২-৬.২। বরেন্দ্র অঞ্চলে বেলে বা বেলে দো-আঁশ জাতীয় মাটি নেই। এখানে লাল মাটি রয়েছে। পলি অঞ্চলে লাল মাটি দেখা যায় না। বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটি শুকনো অবস্থায় খুব শক্ত হয়। মাটির রস ধারণক্ষমতা কম।
সংক্ষেপে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষির অতীত এবং বর্তমান অবস্থা
বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষির ইতিহাস ব্যাপক। অতি সংক্ষেপে বলতে গেলে, ব্রিটিশ কর্মচারী রেনেলা তার ১৭৭১ সালের বর্ণনায় বরেন্দ্র অঞ্চলের অনেক বন জঙ্গলে আচ্ছাদিত ধ্বংসস্তূপের বর্ণনা দিয়েছেন। পরবর্তীতে কার্টারের রিপোর্টেও বরেন্দ্র অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বহু পাকা দালানের ধ্বংসাবশেষ এবং ভরাট হয়ে যাওয়া বড় বড় দীঘির উল্লেখ প্রমাণ করে এককালে এ এলাকায় সমৃদ্ধ বসতি এবং সুগঠিত কৃষি ব্যবস্থা ছিল। তবে ব্রিটিশ কর্মচারী সাইমন ১৮৮৬ সালের বর্ণনায় বরেন্দ্র অঞ্চলকে প্রধানত কৃষি বহির্ভূত, খরাপীড়িত, উঁচুনিচু কাঁটাবন হিসেবে দেখিয়েছেন। এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ সম্পর্কে কার্টারের ১৯২৮ সালের সেটেলমেন্ট রিপোর্টে উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি বরেন্দ্র অঞ্চলকে উঁচু, উন্মুক্ত এবং বন্ধুর ভূমি, উপত্যকার মাঝ দিয়ে সরুনালা প্রবাহিত গ্রীষ্মকালে শুধু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রাম ও বনের ভগ্নাংশ ব্যতীত সমগ্র বরেন্দ্র ছায়াহীন ধু-ধু প্রান্তর হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এ অঞ্চলে শুধু বৃষ্টিনির্ভর আমন ধান ব্যতীত তেমন কোনো ফসল চাষ হতো না। এ কারণে বছরে প্রায় ৭-৮ মাস জমি পড়ে থাকত। বর্তমানে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সেচ সুবিধা প্রবর্তন করায় রোপা আমন ছাড়াও উফশি বোরো ধান এবং শাকসবজি ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে। ফলে কৃষকের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটছে। কিন্তু অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের ফলে পানির স্তর দিন দিন নিচে নেমে যাচ্ছে। নলকূপগুলো  থেকে আজ আর সেভাবে পনি পাওয়া যাচ্ছে না। বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রচুর খাড়ি (খাল) এবং পুকুর ছিল কিন্তু বর্তমানে এগুলো বেশিরভাগ মাছ চাষে লিজ দেয়া হয়েছে। এর কারণে সেখান থেকে পানি নিয়ে সেচকাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া ফারাক্কা বাঁধের জন্য নদীর পানি শুকিয়ে সেচ কাজে বিঘœ হচ্ছে। তবে আশার কথা এ অঞ্চলে বর্তমানে প্রচুর ফল বাগান তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে প্রধান প্রধান ফল হচ্ছে আম, লিচু, কলা, কুল, পেয়ারা উল্লেখযোগ্য। তবে কয়েক বছর ধরে স্ট্রবেরির চাষ এ অঞ্চলে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবজি চাষে এরই মধ্যে এ অঞ্চল অনেক অগগ্রতি লাভ করেছে। এর মধ্যে আগাম শিম, লাউ, চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, বেগুন, পেঁপে, বাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটো, আলু, করলা, শসা উল্লেখযোগ্য। অতি সম্প্রতি বরেন্দ্র অঞ্চলের গোদাগাড়ী উপজেলায় লতিরাজ কচু, মাচায় তরমুজ চাষ, ফুল চাষ শুরু হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল ও গোমস্তাপুর উপজেলায় পলিব্যাগ দ্বারা পেয়ারা উৎপাদন, পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন, মাল্টা, ড্রাগনফল, মুগডাল ব্যাপকভাবে আবাদ শুরু হয়েছে।
মাটির গুণাবলি উন্নয়নে করণীয়
বরেন্দ্র্র অঞ্চলের মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ খুব কম এ কারণে ফসল বিন্যাসে সবুজ সারের চাষ সংস্থান করা প্রয়োজন। তাছাড়া মাটি শুকনো অবস্থায় খুব শক্ত হয় এবং মাটির রস ধারণক্ষমতা কম। সেজন্য অধিক জৈব পদার্থ যোগ করলে এসব ধর্মের কাক্সিক্ষত পরিবর্তন হয়। বছরে তিন বার ধান না করা ভালো এ ক্ষেত্রে একবার ডাল চাষ করতে হবে, যাতে মাটিতে জৈব পদার্থ যোগ হয় এবং মাটিতে পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তবে আমন ধানের পর জাবড়া বা মালচ ব্যবহার করে আলু চাষ করা যেতে পারে। বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য মুগডালের আবাদ একটি আশীর্বাদ। মুগডালের পড বা ফল তুলে গাছগুলো মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিলে জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং আমন ধানে কম ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয়। তবে মুগডালের গাছ মাটির সঙ্গে মিশানোর ৪-৫ দিন পর আমন ধানের চারা লাগালে বেশি লাভ হয়। আর মুগডাল চাষে পানির তেমন প্রয়োজন হয় না এবং উৎপাদন খরচ কম হয়। বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটিতে কম জৈবপদার্থ থাকার কারণে ধৈঞ্চা ফসলকে শস্য বিন্যাসে আনতে হবে। এজন্য গম, ছোলা, মসুর, সরিষার মতো রবি ফসল করে ধৈঞ্চা চাষ করলেও বছরে তিনটি ফসল করা যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে ধৈঞ্চা বপনের ৪-৫ সপ্তাহ পর মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে।
ভূগর্ভস্থ পানি অধিক হারে ব্যবহার না করে খাল, খাস পুকুর পুনঃখনন করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করতে হবে, যা হতে শুষ্ক মৌসুমে বা খরায় আমন ধানে এবং গম চাষে সম্পূরক সেচ প্রদান করা যাবে। কারণ যেভাবে বোরো আবাদের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা হচ্ছে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো আবাদ করাই কঠিন হয়ে পড়বে। তবে বিল এলাকায় কূপ খনন করা যেতে পারে। কারণ বিল এলাকায় কূপ খননের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির রিচার্জ হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এছাড়া জমির পাশে মিনি পুকুর খনন করে আমন চাষাবাদ করতে হবে এতে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমবে এবং মাটিতে পানির স্তর বৃদ্ধি পাবে। আর সেচ কাজে যদি নদীর পানি ব্যবহার করা যায় তবে সবচেয়ে ভালো, প্রয়োজনে পাম্প ব্যবহার করে নদীর পানি খাল, পুকুরে সরবরাহ করতে হবে। আর খরা খেকে ফসলকে রক্ষার জন্য চাষিদের সম্পূরক সেচের পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।
বোরো ধান আবাদ কমিয়ে গম, আলু, টমেটো, ছোলা, মসুর, তিসি, খেসারি, সরিষার আবাদ বৃদ্ধি করা। গমের জন্য বারি গম-২৬ এবং বারি গম-২৮ বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। আর সরিয়ার জন্য বারি সরিষা-১৪ ব্যবহার করা যেতে পারে। কারণ এগুলো অধিক ফলনশীল এবং জীবনকাল স্বল্প।
বোরো চাষ করলে আউশ আবাদ কম হয় সেহেতু  বোরো ধান না করে, গম, আলু অথবা স্বল্প জীবনকালীন রবি ফসলের আবাদ করে আউশ ধান করতে হবে। আউশের জন্য ব্রিধান ৪৮ (জীবনকাল- ১১০ দিন এবং ফলন-৫.৫ টন/হেক্টর), ব্রিধান ৫৫ (জীবনকাল-১০৫ দিন এবং ফলন-৫.০ টন/হেক্টর) চাষ করলে সঠিক সময়ে আমন চাষ করা যাবে, এ ক্ষেত্রে আমনের জন্য বিনা-৭ (জীবনকাল-১১০-১১৫ দিন এবং ফলন-৫.০ টন/হেক্টর) বা ব্রিধান ৫৬ (জীবনকাল-১১০ দিন এবং ফলন-৫.০ টন/হেক্টর), ব্রিধান ৫৭ (জীবনকাল- ১০৫ দিন এবং ফলন-৪.৫ টন/হেক্টর) চাষ করা যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে আউশের চারা ২০-২৫ দিন এবং আমনের চারা ২৫-৩০ দিন বয়সের হতে হবে।
স্বল্প জীবনকাল বিশিষ্ট নেরিকা ধানের লাইন এনে আরও গবেষণা এবং মাঠপর্যায়ে এর সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করতে হবে।
রাজশাহী অঞ্চলের জন্য আরও পানি কম ব্যবহার হয় এমন শস্য বিন্যাস উদ্ভাবন করতে হবে। তবে নিম্নলিখিত শস্য বিন্যাস এ অঞ্চলের জন্য উপযোগী হবে।
বরেন্দ্র অঞ্চলকে নিয়ে আলাদা ফল উৎপাদন প্রকল্প এবং আলাদা ফ্রুট জোনিং সিস্টেমের আওতায় এনে উন্নত চাষাবাদ কৌশলের জন্য গবেষণা করতে হবে।
এ অঞ্চলে বর্তমানে প্রচুর ফল বাগান তৈরি হচ্ছে এর মধ্যে প্রধান প্রধান হচ্ছে আম, লিচু, কুল, পেয়ারা উল্লেখযোগ্য। তবে আমের বাগান সবচেয়ে বেশি। বিবিএস ২০১৪ এর তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রায় ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে আমের চাষাবাদ হয় এবং উৎপাদন প্রায় ৯.৫ লাখ মেট্রিক টন। এর বেশির ভাগ আম বাগানের অবস্থান এ অঞ্চলেই। তাই উন্নত জাত রোপণ, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে রোগ ও পোকামাকড় দমন করলে আম চাষাবাদে বিপ্লব আসতে পারে এবং ব্যাপকভাবে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে।
বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটি যেহেতু শুষ্ক এবং পানির প্রাপ্যতা কম সেজন্য কুল একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ফল। কিছু দিন আগেও বসতবাড়ির আশপাশেই কুল চাষ হতো। তবে এখন আপেলকুল, বাউকুল, বারিকুল-১, বারিকুল-২, বারিকুল-৩ এর মতো উন্নত জাত উদ্ভাবিত হওয়ায় এটি বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে এবং এর চাষাবাদের ব্যাপকতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পেয়ারা গুণাগুণে আপেলের থেকে কোনো অংশেই কম নয়। সেজন্য একে ‘গরিবের আপেল’ বলা হয়। থাই পেয়ারা একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ফসল হিসেবে এ অঞ্চলের জন্য দেখা যাচ্ছে। তাই পুষ্টি নিরাপত্তার জন্য এর আবাদ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। তবে নেতিয়ে পড়া বা উইল্টিং রোগের কারণে পেয়ারা চাষে প্রতিবন্ধকতা দেখা দিচ্ছে। এজন্য নেতিয়ে পড়া প্রতিরোধী জাত (পলি পেয়ারা এবং স্টবেরি পেয়ারা) দ্বারা জোড় কলমের মাধ্যমে নেতিয়ে পড়া প্রতিরোধী পেয়ারা গাছ উৎপাদনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
‘পুষ্টির ডিনামাইট’ খ্যাত বারো মাসি সজিনা গ্রামের রাস্তার ধারে এবং বসতবাড়ির আঙিনায় যতœ ছাড়াই বেড়ে ওঠে। তবে আবহাওয়া এবং জলবায়ুর কারণে বারো মাসি সজিনা এ এলাকাতে ব্যাপকভাবে চাষাবাদ করা সম্ভব। এরই মধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে সুনির্দিষ্টভাবে দেশব্যাপী সজিনা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকদের জন্য আলাদা কমিউনিটি রেডিও স্থাপন করা যেতে পারে। যেখান এ অঞ্চলের কৃষকরা স্বল্প সময়ে স্বল্প খরচে প্রয়োজনীয় তথ্য সময়মতো পেতে পারে।
বরেন্দ্র অঞ্চলে আম একটি অন্যতম অর্থকরী ফসল। বাংলাদেশ ফল গবেষণা কেন্দ্র, চাঁপাইনবাবগঞ্জের তথ্য মতে, রাজশাহী অঞ্চলে উন্নত এবং রপ্তানিযোগ্য আমের উৎপাদন বৃদ্ধিতে করণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে-
কৃষি গবেষণার সঙ্গে সমন্বয় করে চাষি প্রশিক্ষণ। আম বাজারজাতকরণ এবং প্রশিক্ষণের জন্য হর্টেক্স ফাউন্ডেশনের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করা।
গুটি আমের গাছ না কেটে টপ ওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে ভালো জাতে পরিবর্তন করা। এছাড়া হটওয়াটার ট্রিটমেন্টের (গরম পানিতে শোধন ৫৫ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড তাপমাত্রায় আম শোধন) সুবিধা সৃষ্টি করা। যাতে আম আরও উজ্জ্বল, বেশি দিন স্থায়ী হওয়া এবং ফ্রুট ফ্লাই রোধ করা যায়।
উন্নত পদ্ধতিতে আম উৎপাদনকারী চাষিদের তালিকা করা, নিবন্ধন করা এবং সমিতির আওতায় এনে সমন্বয় সাধন করা।
আম সংরক্ষণের জন্য কোল্ডস্টোর তৈরি, হিমায়িত পরিবহনের ব্যবস্থা, দ্রুত স্থানান্তরকরণ, প্যাকেজিং এবং গুণগতমান পরীক্ষা করার পরীক্ষাগার তৈরি করা।
সমবায়ভিত্তিক আম সংরক্ষণের স্থাপনা তৈরির ব্যবস্থা করা এবং বিদেশিদের চাহিদামাফিক আমের জাত উদ্ভাবন করা।
জৈব প্রযুক্তি নির্ভর আম উৎপাদনে উৎসাহিত করা। এক্ষেত্রে ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে আমবাগানে আলো বাতাসের অভাবে বা অন্য কারণে আমগুলো কালো বিবর্ণ এবং মাছি পোকার আক্রমণ হয় সেসব আম বাগানে এ পদ্ধতি খুব লাভজনক। এ পদ্ধতিতে ১০০% রোগ এবং পোকামুক্ত আম উৎপাদন সম্ভব। সঙ্গে সঙ্গে এ আমগুলো ১০-১৪ দিন ঘরে রেখে খাওয়া যায়। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাণিজ্যিকভাবে আম উৎপাদনে ১৫-৬২ বার স্প্রে করা হয়। অথচ ব্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে ৭০-৮০ ভাগ স্প্রে খরচ কমানো যায়।
পরিশেষে জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রভাবে বাংলাদেশের কৃষি আজ হুমকির মুখে পড়েছে। এর থেকে উত্তোরণের জন্য বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। সেজন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা, টেকসই প্রশিক্ষণ, সঠিক সময়ে সঠিক উপকরণ সরবরাহ, ভূমি ব্যবহারের সঠিক দিকনির্দেশনামূলক গবেষণা এবং কৃষিতে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারসহ নানামুখী উদ্যোগ। তবেই বরেন্দ্র অঞ্চল হবে আমাদের ‘সোনার বাংলার’ অন্যতম শস্যভাণ্ডার।

কৃষিবিদ মো. আবদুল্লাহ-হিল-কাফি*
*আঞ্চলিক কৃষি তথ্য অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, রাজশাহী

 

বঙ্গবন্ধুর দর্শনে সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা

ড. জগৎ চাঁদ মালাকার

ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলায় তিনি দেখতে চেয়েছিলেন দেশের কৃষি ও কৃষকের সর্বাঙ্গীণ উন্নয়ন এবং স্বনিভর্রতা। তাই তো বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত কৃষি ক্ষেত্রে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।
১৯৭৩ সালে ১৩ ফেব্রæয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহে বঙ্গবন্ধু বিশেষ ভাষণ দিয়েছিলেন। সে ভাষণে তিনি কৃষি বিপ্লবের কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন গ্রামের দিকে নজর দিতে হবে। কেননা গ্রামই সব উন্নয়নের মূল কেন্দ্র। গ্রামের উন্নয়ন আর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি যখন বেগবান হবে তখন গোটা বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে সম্মুখপানে। মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের কৃষি শিক্ষায় আকৃষ্ট করে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার মানসে জাতির পিতা এসময় কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদা প্রদান করেন। তাঁর অদম্য ইচ্ছা ছিল যে কোনো উপায়ে কৃষকের স্বার্থরক্ষা করা। কেননা কৃষকই এ দেশের আসল নায়ক যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আমাদের সবার অন্ন জোগায়। কৃষকের চলমান, চাহিদা যথোপযুক্তভাবে নিশ্চিত করতে পারলে কৃষক অনেক আগ্রহে স্বতঃস্ফূর্ততায় কৃষিতে নিজেকে বিনিয়োগ করতে পারবে, উন্নয়নের জোয়ার বইবে।  
আরেকটি কথা বলেছেন বঙ্গবন্ধু, গ্রামের কৃষক অনেক অভিজ্ঞ অনেক দক্ষ। তাদের সাথে শেয়ার করে সমন্বয় করে আধুনিক কৃষিতে এগোতে হবে। মানুষের ওপর জোর করে কিছুই চাপিয়ে দেয়া যাবে না এটি খুব ভালো করে জানতেন বঙ্গবন্ধু। তাই তো তিনি বলেছেন করে দেখাতে হবে, এতে  কৃষক নিজে নিজে শিখে নিজের আঙিনায় বাস্তবায়ন করবে। এক গ্রামের ২০ জনকে একসাথে ক্ষেতখামারে হাতেকলমে কাজ দেখালে পাশের অন্য কৃষক দেখে দেখে নিজের জমিতে বাস্তবায়ন করলে উৎপাদন বেড়ে যাবে। তখন সারা বাংলার অন্যরা এগিয়ে আসবে সম্পৃক্ত হবে উন্নয়নের মূলধারায়। কেননা আমাদের কৃষক দেখে বিশ্বাস করতে অভ্যস্ত।
সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা  হলো খামারের উপাদানসমূহে (ধান চাষ, রবিশস্য চাষ, বসতবাড়ীতে ফল মূল ও শাকসবজির চাষ, হাঁস- মুরগি পালন, গরু পালন, ছাগল/ভেড়া পালন এবং মাছ চাষ) উন্নত কলাকৌশলের সমন্বয়ের মাধ্যমে এবং এদের আন্তঃ সম্পর্ক বিবেচনায় রেখে সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করে কাক্সিক্ষত ফলন লাভ করাই হলো সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন যদি সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তোলা না যায় তাহলে আমাদের কৃষি উন্নয়ন ব্যাহত হবে, আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারব না। আমরা অনেক পিছিয়ে পড়ব। কোঅপারেটিভ সোসাইটির মাধ্যমে আগাতে পারলে আমাদের কৃষির উৎপাদন এবং সার্বিক উন্নয়ন দুটিই মাত্রা পাবে। অধিক শস্য উৎপাদনের জন্য আমাদের সবার সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। মাঠের ফসল, গবাদিপশু, মাছ পরিবেশ সব কিছুর মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয় করেত হবে। তা না হলে আমরা কাক্সিক্ষতভাবে এগোতে পারব না। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, খাদ্য শুধু চাউল, আটা, নয়; মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, তরকারিও আছে। সুতরাং কৃষির উন্নতি করতে হলে এসব খাদ্যশস্যের উৎপাদন উন্নতি করতে হবে।
বঙ্গবন্ধুর দর্শনেই আজ বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনার (আইএফএম) মাধ্যমে কৃষক তার খামারের সম্পদসমূহ চিহ্নিত করে এদের আন্তঃসম্পর্ক বিবেচনায় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করেন। এতে খামারের মোট উৎপাদন বৃদ্ধি করে অধিক লাভবান হওয়া যায়। খামারের সমস্যা সমাধানে খামারের নিজস্ব সম্পদ কি কি আছে তা দেখবেন। খামারের উপাদানের উপজাত যেমন গোবর, খড়, ছাই, কুড়া, মুরগির বিষ্ঠা, চাল ভাঙা ইত্যাদি খামারি ব্যবহার করবেন এবং খামারে নতুন কোন উপাদান যোগ করার সুযোগ আছে কি না তা দেখবেন এবং তা ব্যবহার করে খামারের মোট উৎপাদন বৃদ্ধি করে অধিক লাভবান হবেন।
খামারের সকল উপাদানসমূহে (ধান চাষ, রবিশস্য চাষ, বসতবাড়িতে ফলমূল ও শাকসবজি চাষ, হাঁস- মুরগি পালন, গরু পালন, ছাগল/ভেড়া পালন এবং মাছ চাষ) ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং খামারের মোট উৎপাদন বৃদ্ধি করে অধিক লাভবান হবে।
নিরাপদ খাদ্যকে সমধিক গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন দেশ কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, দূষণকারী বস্তু, অণুজীব, রোগ ও পোকা ইত্যাদির পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে কঠোর বিধি নিষেধ আরোপ করছে। উত্তম কৃষি পদ্ধতি সামগ্রিক কৃষি কার্যক্রম যা অনুসরণে নিরাপদ এবং মানসম্পন্ন খাদ্য ও খাদ্য বহির্ভূত কৃষিজাত পণ্য সহজলভ্য, পরিবেশ সুরক্ষা, অর্থনীতি এবং সমাজ সুসংহত হবে। নিজের বসতবাড়িতে উৎপাদিত কৃষি পণ্য নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় দারুণ ভ‚মিকা রাখবে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সমন্বিত কৃষি খামারের ধারণাটি কৃষকের বাড়িতে করা যায়। দেশের নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার অপার সুযোগ হবে বলে আমার বিশ্বাস। য়

উপপরিচালক (এল.আর.), ডিএই, মোবাইল-০১৭১৬০০৪৪০০, ই-মেইল : Jagot_mala@yahoo.com

 

আমগাছের রিজুভেনাইজেশন বা উজ্জ্বীবিতকরণ

প্রফেসর ড. এম. এ. রহিম১, ড. মো. শামছুল আলম২

রিজুভেনাইজেশন বা উজ্জ্বীবিতকরণ হচ্ছে এমন একটি  পদ্ধতি যার মাধ্যমে বয়স্ক বা ঘন করে লাগানো গাছ/বাগান, যে গাছে/বাগানে আদৌ ফল ধরে না বা  খুবই কম ফল দেয় সে ধরণের ফল গাছ/বাগানকে ফল উৎপাদনক্ষম করে তোলার পদ্ধতি। সাধারণত ১৫-২০ বছর বয়সী বাগানে আগের চেয়ে ফল উৎপাদন কমে যায়, গাছ দূর্বল হয়ে পড়ে, গাছ বা বাগান ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সম্পাদন করা জটিল হয়ে উঠে এবং রোগ ও পোকা-মাকড় দ্বারা গাছ বেশী আক্রান্ত হয়। পোকা-মাকড় সহজে দমন করা যায় না। এমতাবস্থায় নিম্নলিখিত জটিলতা দেখা যায়।
* ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায় অথবা হয়-ই না।
* ডালে শর্করা ও নাইট্রোজেনের প্রয়োজনীয় অনুপাতের (ঈ:ঘ) ব্যাঘাত ঘটে। আমের ডালে মুকুল আসতে হলে, ফুল আসার আগে ডালটিতে পর্যাপ্ত পরিমানে অধিক শর্করা ও কম নাইট্রোজেন দুই-ই থাকতে হবে। শুধু তাই নয়, শর্করার ভাগ নাইট্রোজোনের ভাগের চেয়ে যথেষ্ট বেশী থাকতে হবে। আর যদি দু’টির ভাগ সমান হয় বা বিশেষ করে ডালটির নাইট্রোজেনের মাত্রা শর্করার চেয়ে বেশি হয়, তাহলে ঐ ডালের ডগায় মুকুল আসার বদলে পাতা  এসে যায়।
* ঘন করে লাগানো বাগানের ক্ষেত্রে, গাছের মধ্যে খাদ্যের জন্য প্রতিযোগিতা চলে। ফলে গাছ পরিমিত খাদ্য পায় না।
* ঘন ডালপালা থাকার কারণে আলো ও বায়ু চলাচল ঠিকমত হয় না বলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যহত হয়।
বয়স্ক/ঘন বাগানে মরা, রোগাক্রান্ত এবং পোকাক্রান্ত ডালপালা বেশি থাকে। উক্ত ডালপালা গুলো খাবার নেয় কিন্তু কোন ফলও ধরে না, ফলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যহত হয়।
* গাছের নীচের দিকের ডালপালায় রোদ কম পড়ে, ফলে ফলন হয় না বললেই চলে। তাছাড়া ঐ সমস্ত ডালগুলো রোগ ও পোকার আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। ফলে গাছের বৃদ্ধি ব্যহত হয়।
রিজুভিনাইজেশন পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা: রিজুভেনাইজেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বয়স্ক, অনুৎপাদনশীল/ঘন আম বাগান বা গাছকে উজ্জ্বীবিত করা যেতে পারে যা নি¤েœ বর্ণনা করা হলো-
* বয়স্ক, অধিক ঘন এবং ফল হয় না এমন বাগান/গাছ আগষ্ট-সেপ্টেম্বর মাসে মাটি থেকে ২.৭৫ মি- ৩.০০ মিটার উচ্চতায় গাছের সমস্ত ডাল কেটে ফেলতে হবে।
* কর্তিত অংশে আলকাতরা/রং এর প্রলেপ দিতে হবে।
* সার, সেচ ও নিকাশ ব্যবস্থা করতে হবে।
* ডাল কাটার পর ৩-৪ মাসের মধ্যে নতুন কুশি বের হবে।
* ডাল কাটার পর ৬-৭ মাসের মধ্যে ঘন শাখা প্রশাখা বের হবে।
* প্রতিটি শাখায় সুস্থ-সবল, মোটা-তাজা ৫-৭টি ডাল রেখে, রোগাক্রান্ত, মরা, কীটাক্রান্ত, দূর্বল ডালসহ বাকীডালগুলো কেটে ফেলতে হবে।
* ডাল কাটার পর মূলগাছে ও নতুন গজানো পাতায় রোগ ও পোকামাকড়েরর উপদ্রব বেশি হয়। এজন্য গাছের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করতে হবে।
* কর্তিত গাছে প্রথম বছরে কোন ফল পাওয়া যায় না।
* দ্বিতীয় বছর পর্যন্ত কর্তিত গাছের নতুন গজানো ডাল পাতলাকরণের কাজ চলতে থাকবে।
* দ্বিতীয় বছরে জানুয়ারি- ফেব্রæয়ারি মাসে কর্তিত গাছের গজানো শাখায় ফুল আসবে।
* দ্বিতীয় বছরে কর্তিত গাছের নুতন গজানো শাখায় ফল ধরে।
যথাযথ ব্যবস্থাপনায় তৃতীয় বছরে কর্তিত গাছটি একটি পূর্ণাঙ্গ ফলবান বৃক্ষে পরিণত হবে।
সার প্রয়োগ : কর্তিত গাছে নতুন ডালপালা গজানো ও সতেজ করার লক্ষ্যে আম বাগানে চাষ দিয়ে বা গাছের গোড়া আগাছা মুক্ত করে জৈবসার প্রয়োগের পাশাপাশি বিভিন্ন রকমের রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা অত্যাবশ্যক। গাছের গোড়ায় সার প্রয়োগের ক্ষেত্রে গোড়া থেকে ১.০-১.৫ মিটার দূরে নালা পদ্ধতিতে সার দেয়া যেতে পারে।  এ ক্ষেত্রে যে সমস্ত সার প্রয়োগ করতে হবে তা সারণি-১ দ্রষ্টব্য।
উল্লেখিত সারগুলোর অর্ধেক পরিমাণ সার গাছের ডাল কাটার পর পরই প্রথম ধাপে প্রয়োগ করতে হবে এবং দ্বিতীয় ধাপে বাকি অর্ধেক সার  আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে প্রয়োগ করতে হবে।
সেচ ও নিকাশ: সার প্রয়োগের পর উক্ত সার যাতে গাছ গ্রহণ করতে পারে সে জন্যে আম বাগানে প্রথমে একটি সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। এর পর মাঝে মাঝে গাছের প্রয়োজন অনুসারে এমন ভাবে সেচ দিতে হবে যেন মাটিতে রস থাকে। লক্ষ রাখতে হবে যেন আম বাগানে বা গাছের গোড়ায় যেন কোন অবস্থায় দীর্ঘ সময় পানি জমে না থাকে।
পোকামাকড় ও ব্যবস্থাপনা
পাতাখেকো শুঁয়োপোকা
এ পোকার কীড়া (বাচ্চা) চারাগাছ ও বড় আমগাছের পাতায় আক্রমণ করে। স্ত্রী মথ আমপাতার ওপরের পিঠের কিনারায় লাইন করে মুক্তার দানার মতো সাদা ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে কীড়া বের হলে, কীড়াগুলো প্রথমে  ঐ পাতার ওপর গুচ্ছাকারে থাকে, পরে গাছে ছড়িয়ে যায় এবং পাতার মধ্যশিরা রেখে পুরো পাতা খেয়ে ফেলে  আক্রান্ত গাছ সম্পূর্ণ বা আংশিক পাতাশূন্য হয়ে পড়ে। এতে গাছের খাবার তৈরি বাধা পায় এবং গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। আক্রমণ খুব বেশি হলে গাছে ফুল ও ফল হয় না।
দমনব্যবস্থা
ডিমসহ পাতা দেখামাত্রই সংগ্রহ করে পুড়িয়ে মারতে হবে। গুচ্ছাকারে বা ছড়ানো অবস্থায় থাকা শুঁয়োপোকাগুলো সংগ্রহ করে পা-দিয়ে পিষে বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। পা-দিয়ে পিষে মারার সময় অবশ্যই পায়ে স্যান্ডেল বা জুতা থাকতে হবে। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২০ মিলিলিটার ডাইমেক্রন/ ডায়াজিনন ৬০ ইসি (৪ কর্ক) বা সুমিথিয়ন ৫০ ইসি (৪ কর্ক) মিশিয়ে পাতা ও           ডাল-পালাসহ গাছের গোড়ার মাটি ভিজিয়ে ¯েপ্র করতে হবে।
পাতাকাটা উইভিল ক্ষতির ধরন: এ পোকা কচি আমপাতার নিচের পিঠে ছোটছোট গর্ত করে ডিম পাড়ে। এরপর ডিমসহ কচিপাতাটি (লাল পাতা) রাতের বেলা বোঁটা থেকে একটু দূরে কাঁচি দিয়ে কাটার  মতো করে কেটে ফেলে দেয়। এতে গাছের নুতন পাতা ধ্বংস হয় এবং খাবার তৈরি কমে যায়। ফলে চারা বা গাছ দুর্বল হয়ে যায়।
দমনব্যবস্থা
আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে গাছে কচিপাতা দেখার সাথে সাথে প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২০ মিলিলিটার সুমিথিয়ন ৬০ ইসি (৪ কর্ক) মিশিয়ে গাছসহ গাছের গোড়ার মাটি ভিজিয়ে ¯েপ্র করতে হবে। এ পোকা দিনের বেলায় গাছের নিচে পড়ে থাকা পাতার নিচে ও আগাছার মধ্যে লুকিয়ে থাকে। তাই গাছের নিচে পড়ে থাকা কচিপাতা দেখামাত্র সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
ফল ধারণ: আম গাছকে উজ্জীবিতকরণ করার প্রথম বছরের পর ঐ গাছে সাধারণত কোন ফল ধরে না তবে ঠিকমত ব্যবস্থাপনা দিলে দ্বিতীয় বছর থেকে গাছে ফল ধরা শুরু হয়। য়

১পরিচালক, বাউ-জার্মপ্লাজম সেন্টার, বা.কৃ.বি., ময়মনসিংহ। ২এসএসও, উদ্যানতত্ত¡ বিভাগ, বিনা, মোবা : ০১৭১১১২৪৭২২ ই-মেইল : mithuhort@yahoo.com

প্রশ্নোত্তর (নিয়মিত বিভাগ, চৈত্র ১৪২৪)

মো. আবু হানিফ, গ্রাম : ঘোলদাড়ি, উপজেলা : আলমডাঙ্গা, জেলা : চুয়াডাঙ্গা
প্রশ্ন :  লাউয়ের বয়স্ক পাতায়-বাদামি-হলুদ দাগ হয়, ধীরে ধীরে পাতা পুড়ে যায়, কী করলে সমাধান পাব?  

উত্তর : লাউ গাছের এ ধরনের সমস্যা সারকোস্পোরা নামক ছত্রাকের আক্রমণে হয়ে থাকে। এ রোগে পাতায় পানি ভেজা দাগের মতো ছোট ছোট ক্ষতের সৃষ্টি হয়। দাগগুলো একত্রে বড় হয়ে বাদামি রঙ ধারণ করে। পরে আক্রান্ত পাতাগুলো শুকিয়ে যায়। এ রোগ প্রতিকারে কার্বেনডাজিম গ্রুপের ১ গ্রাম ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ভালোভাবে মিশিয়ে লাউ গাছে সঠিক নিয়মে স্প্রে করতে হবে। তবেই আপনি এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাবেন।  

মো. হেলাল উদ্দীন, গ্রাম :  গৌরাঙ্গপুর, উপজেলা : মোহনপুর, জেলা : রাজশাহী
প্রশ্ন : পানের পাতায় কালো পানি ভেজা দাগ হয়ে আস্তে আস্তে পচে যায়। কী করলে উপকার পাব?
উত্তর : সাধারণত বর্ষা মৌসুমে এ রোগ বেশি হয়ে থাকে। এ রোগের আক্রমণে নিচের পাতার আগায় বা কিনারায় প্রথমে হলুদ বাদামি রঙের দাগ দেখা যায়। দাগ আস্তে আস্তে ভেতরের দিকে যেতে থাকে। আবার তাপমাত্রা বেশি হলেও এ রোগ বেড়ে যায়। এ ধরনের সমস্যায় কপার অক্সিক্লোরাইড গ্রুপের অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ব্যবহার করলে সুফল পাবেন।  

 

মো. জয়নাল উদ্দীন, গ্রাম : লক্ষীরপাড়, উপজেলা :  বিশ্বম্বরপুর, জেলা : সুনামগঞ্জ
প্রশ্ন :  স্ট্রবেরির পাতায় প্রথমে বাদামি, পরে কালো দাগ পড়ে, এর প্রতিকার কী?
উত্তর : স্ট্রবেরির এ সমস্যাটিকে পাতায় দাগ পড়া রোগ বলে। ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে। এ রোগ প্রতিকারে ফেনামিডন ও মেনকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ১০ থেকে ১৫ দিন পর ২ থেকে ৩ বার স্প্রে করলে আপনি সুফল পাবেন।

 

মো.  গোলাম মোস্তফা, গ্রাম : পিরোজপুর, উপজেলা : মেহেরপুর সদর, জেলা : মেহেরপুর
প্রশ্ন : আমার আম্রপালি ও হিমসাগর আমগাছে সাদা ছত্রাকের মতো দেখা যাচ্ছে । বর্তমানে গাছের কাণ্ড ও পাতায় ছড়িয়ে পড়ছে । আমি কিভাবে এ সমস্যা  থেকে মুক্তি পেতে পারি?
উত্তর : আক্রমণের বর্ণনা অনুযায়ী মনে হচ্ছে আপনার আম গাছে মিলি বাগ নামক পোকার আক্রমণ হয়েছে। ব্রাশ দ্বারা সাদা বস্তু/ পোকা সরিয়ে ফেলে কিংবা আক্রান্ত পাতা ও ডগা সংগ্রহ করে মাটিতে পুঁতে  ফেলতে হবে। গুঁড়া সাবান (হুইল/জেট পাউডার) পানিতে (৫ গ্রাম/লি) মিশিয়ে  স্প্রে করেও এ পোকা দমন করা যায়। আক্রমণের মাত্রা  বেশি হলে ডাইমেথয়েট জাতীয় কীটনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি হারে মিশিয়ে ১৫ দিন পরপর ২ থেকে ৩ বার আক্রান্ত গাছে স্প্রে করতে হবে। তাহলেই আপনি উপকার পাবেন।


মো. শরিফ উদ্দীন, গ্রাম : পুরনাপাইল, উপজেলা : ক্ষেতলাল, জেলা : জয়পুরহাট
প্রশ্ন : এক বছর আগে আমি একটি আনারের কলমের চারা কিনে রোপণ করি এবং গাছে প্রচুর ফুল আসে। কিন্তু ফুল টিকে না এবং ফলও হয় না। এ অবস্থায় আমার করণীয় কী?
উত্তর : বাংলাদেশে ডালিমের কোনো অনুমোদিত জাত নেই। ডালিমের ক্ষেত্রে কলমের চারা ভালো। তবে পর্যাপ্ত পরিমাণ সার, পানি ও পরিচর্যা প্রয়োজন। চারা কলম লাগানোর পর প্রথম ৩ বছর গাছে কোন ফুল ও ফল ধরতে দেয়া যাবে না। বরং  ফুল এলে তা অপসারণ করতে হবে। গাছের বয়স অনুযায়ী সারের মাত্রা প্রয়োগ করতে হবে। মাটিতে রস না থাকলে সার প্রয়োগের পর অবশ্যই  সেচ দিতে হবে। ১ম কিস্তি বর্ষার শুরুতে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে ইউরিয়া ও এমওপি অর্ধেক করে। ২য় কিস্তি ভাদ্র-আশ্বিন মাসে ইউরিয়া ও এমওপির বাকি অর্ধেকসহ সব সার। ৩য় কিস্তি শীতের শেষে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে প্রয়োগ করতে হবে। এভাবে আনারের চাষ করলে আশা করা যায় আপনি আপনার কাক্সিক্ষত ফল পাবেন।


মুক্তা আকতার, গ্রাম : দক্ষিণভাদারতিল, উপজেলা : কালীগঞ্জ, জেলা : গাজীপুর
প্রশ্ন : লাউ গাছের পাতায় সাদা সাদা গুঁড়া দেখা যাচ্ছে।  কী ব্যবস্থা নিলে উপকার পাব?  
উত্তর : লাউ গাছের এ সমস্যাটিকে পাউডারি মিলডিউ বলে। এ রোগে পাতা ও গাছের গায়ে সাদা পাউডারের আবরণ দেখা যায়। আক্রমণ বেশি হলে পাতা হলুদ বা কালো হয়ে যায়। এ সমস্যা সমাধানে প্রপিকোনাজল গ্রুপের ১ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে সঠিক নিয়মে স্প্রে করলে উপকার পাবেন। এছাড়া পরবর্তীতে আগাম বীজ বপন, রোগ প্রতিরোধী জাত ব্যবহার এবং সুষম সার ব্যবহার করলে এ সমস্যা থেকে আপনি সুরক্ষা পাবেন।  

মো. মিনহাজুল ইসলাম, গ্রাম : ফলিয়ামারি, উপজেলা : ময়মনসিংহ সদর, জেলা : ময়মনসিংহ
প্রশ্ন : আমার গরু ৮ মাসের গর্ভবতী। নড়াচড়া করতে চায় না। বসে থাকলে উঠতে পারে না। কিছু খেতে চায় না। এ অবস্থায় করণীয় কী?
উত্তর : গাভীর মিল্ক ফিভার বা দুগ্ধ জ্বর হয়েছে। গাভীকে শিরার মাধ্যমে ক্যালসিয়াম বোরোগ্লুকোনেট প্রয়োগ করতে হবে। গর্ভাবস্থায় গাভীকে ক্যালসিয়াম প্রিপারেশন (ক্যালপ্লেক্স) খাওয়াতে হবে। দুগ্ধ জ্বর হলে গাভী যাতে কাত হয়ে না শোয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ একপাশে ভর করে শুয়ে থাকলে নিউমোনিয়া হতে পারে।   

 

শফিকুল ইসলাম, গ্রাম : বাকতা, উপজেলা : ফুলবাড়ীয়া, জেলা : ময়মনসিংহ
প্রশ্ন : আমার গাভীকে বীজ দেয়া হয়। কিন্তু বীজ দেয়ার ২১ দিন পর আবার গরম হয়। এভাবে দুইবার বীজ দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় আমার করণীয় কী?
উত্তর : যদি দেখা যায় বীজ দেয়ার ২১ দিন পর আবার গরম হচ্ছে তাহলে বীজ দেয়ার ২ ঘণ্টা আগে ২.৫ সিসি ওভুরেলিন ইনজেকশন ঘাড়ের মাংসে প্রয়োগ করতে হবে। আর বকনার ক্ষেত্রে ২.৫ সিসি ওভুপ্রোস্ট ইনজেকশন মাংসে প্রয়োগ করতে হবে। আশা করি আপনার সমস্যাটি দূর হয়ে যাবে।

 

মো. কাশেম, গ্রাম : বিষ্ণুগ্রাম,  উপজেলা : পাইকগাছা, জেলা : খুলনা
প্রশ্ন :  আমি এ মৌসুমে পুকুরে মাছ ছাড়তে চাই। তবে আমি কি মাছ চাষ করলে লাভবান হব?
উত্তর : আপনি স্বল্প সময়ে লাভবান হতে চাইলে থাই কই, মনোসেক্স তেলাপিয়া, থাই সরপুঁটি এবং গিফট তেলাপিয়া চাষ করতে পারেন। এক্ষেত্রে আপনার কাছের উপজেলা মৎস্য অফিসে যোগাযোগ করে হাতে কলমে আরো বেশি প্রশিক্ষণও নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে আপনি অনেক লাভবান হবেন।

নাজমুল করিম, গ্রাম : বালাগ্রাম  উপজেলা : জলঢাকা, জেলা : নীলফামারী

প্রশ্ন :  পুকুরে শোল মাছ চাষ করতে চাই। এ ব্যাপারে পরামর্শ দিলে উপকৃত হব?
উত্তর : পুকুরে শতকপ্রতি ১ কেজি করে চুন প্রয়োগ করে তারপর পুকুরে পানি ঢুকাতে হবে। পানি ঢুকানোর ১ সপ্তাহ পর পুকুরে সার প্রয়োগ করতে হবে। শোল মাছের রেণু পোনা আমরা সাধারণত হ্যাচারি থেকে পাই না। শোল মাছের প্রজনন সাধারণত পুকুরেই হয়ে থাকে। একক চাষের জন্য শতকপ্রতি ১০টি মাছ এবং মিশ্র চাষের জন্য শতকপ্রতি ৪টি করে দেয়া যেতে পারে। খৈল বা চালের কুড়া দিয়ে বানানো খাবার সাধারণত শোল মাছ খায় না। ছোট মাছই এর প্রধান খাবার। পোনা মাছের প্রিয় খাবার শুঁটকির গুঁড়া ভালোভাবে পিষে দিতে হয়। আর বড় মাছের জন্য ছোট ছোট মাছ যেমন পুঁটি, চান্দা এগুলো দেয়া যেতে পারে। তবে মরা টাটকা মাছ খেতে দিলে এরা খায়। কিন্তু পচা মাছ এরা খায় না। এছাড়াও এরা খাবার হিসেবে কেঁচো ও ব্যাঙ খায়। বাগদা চিংড়ির মাথাও শোল মাছের প্রিয় খাবার। যে পুকুরে শোল মাছ চাষ করবেন সেই পুকুরে কচুরিপানা অথবা কলমিলতা থাকলে ভালো কারণ শোল মাছ আড়ালে আবডালে থাকতে পছন্দ করে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন কচুরিপানায় পুকুর ভরে না যায়। পুকুরের চারদিকে কমপক্ষে ৫ ফুট উচ্চতায় জাল দিয়ে বেড় দিতে হবে। অন্যথায় বর্ষাকালে মাছ বের হয়ে যাবে। এভাবে শোল মাছ চাষ করলে আপনি অবশ্যই লাভবান হবেন।


কৃষির যে কোনো প্রশ্নের উত্তর বা সমাধান পেতে বাংলাদেশের যে  কোনো জায়গা থেকে যে কোনো মোবাইল থেকে কল করতে পারেন আমাদের কৃষি কল সেন্টারের ১৬১২৩ এ নাম্বারে। শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত যে কোনো দিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত এ সময়ের মধ্যে। তাছাড়া কৃষিকথার গ্রাহক হতে বার্ষিক ডাক মাশুলসহ ৫০ টাকা মানি অর্ডারের মাধ্যমে পরিচালক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫ এ ঠিকানায় পাঠিয়ে ১ বছরের জন্য গ্রাহক হতে পারেন। প্রতি বাংলা মাসের প্রথম দিকে কৃষিকথা পৌঁছে যাবে আপনার ঠিকানায়।

 

কৃষিবিদ মো. তৌফিক আরেফীন*
*উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এল আর, সংযুক্ত কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫ suman_arefin@yahoo.com

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কৃষি ও কৃষকের আলোর দিশারী

মোতাহার হোসেন

গোপালগঞ্জে জন্ম নেয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন মুক্তিকামী,স্বাধীনতাকামী মানুষের এবং সকল প্রকার অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে চির প্রতিবাদ কণ্ঠস্বর। শুধু তাই নয় তিনি ছিলেন,বিশ্বের নিপীড়িত মানুষেরও মুক্তির পথপ্রদর্শক। তিনি মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে বাংলার আনাচে কানাছে ঘুরেছেন, কৃষক, শ্রমিক, চাষাভুসা, কামার কুমার, জেলে, তাঁতিসহ সর্বস্তরের মানুষের সাথে মিশেছেন, তাদের অভাব, অভিযোগ, সমস্যার কথা শুনেছেন, সমাধানে তাদের নিয়েই রাজপথে আন্দোলন করেছেন। ফলে বাংলার কৃষক শ্রমিক, ছাত্র, মজুর সকলের সমস্যা, অভাব তিনি জানতেন। তাই তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার পর পরই কৃষক, শ্রমিক, মজুর, ছাত্রসহ সকল স্তরের মানুষের কল্যাণে নিয়েছিলেন পৃথক পৃথক কর্মসূচি। তিনি একাদ্বারে কৃষক, শ্রমিক মুজুর, ছাত্র, শিক্ষকের, খেটে খাওয়া মানুষের নেতা। এমন এক মহীরুহ ছিলেন জাতির পিতা ১৯৭৫ সালে আগস্টের ১৫ তারিখ একদল ক্ষমতা লিপ্সু রাতের অন্ধকারে সপরিবারে হত্যা করেছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে।
তিনি শোষণহীন সমাজ গঠনের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। তিনি বাংলার প্রত্যেক মানুষের জীবনের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজন আহার, কাপড়, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কাজের সুযোগ সৃষ্টির জন্য নিজেকে বিসর্জন দিয়েছেন। বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি ছিলেন আপসহীন। বিপন্ন জীবনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি জনগণের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন। এ জন্য সারা জীবন জেল-জুলুম, অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছেন, এমনকি ফাঁসির দড়িও তাঁকে লক্ষ্য থেকে একচুল নড়াতে পারেনি। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করলেও বঙ্গবন্ধু বিজয়ীর বেশে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ফিরে আসেন স্বাধীন বাংলাদেশে। ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় জনগণের মাঝে। নিজেকে সঁপে দেন দেশ গড়ার কাজে। শুরু হয় জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তিলাভের সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধু আজীবন সংগ্রাম করেছেন এ দেশের শোষিত, বঞ্চিত, অবহেলিত কৃষকদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। তাই তিনি সব সময় কৃষির প্রতি শ্রদ্ধা ও অগ্রাধিকার প্রদান করেছিলেন। দার্শনিক রুশোর একটি উক্তি এখানে প্রাসঙ্গিক, তিনি বলেছিলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও গৌরবমÐিত শিল্প হচ্ছে কৃষি। শতাব্দীর মহানায়ক বঙ্গবন্ধু ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী ও বিজ্ঞানমনস্ক। চির আধুনিক রাজনৈতিক নেতা। তিনি দার্শনিক রুশোর বাণীকে লালন করেছিলেন।
বঙ্গবন্ধু মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, অর্থনৈতিকভাবে উন্নত ও সমৃদ্ধ একটি সোনার বাংলা গড়তে কৃষিশিল্পের উন্নয়ন অপরিহার্য। তিনি উপলব্ধি করতেন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্ন হতে না পারলে, মানুষের অন্ন সংস্থান করতে না পারলে সকল অর্জন ব্যর্থ হবে। তিনি বুঝেছিলেন কৃষি একটি জ্ঞাননির্ভর শিল্প। তাই শিক্ষিত জনগৌষ্ঠীকে দেশ গঠনে কৃষি কাজে মনোনিবেশ করার উপর গুরত্ব দিয়েছেলন। কারণ তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, গতানুগতিক কৃষিব্যবস্থা দ্বারা দ্রæত ক্রমবর্ধমান বাঙালি জাতির খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য চাই কৃষির ব্যাপক আধুনিকীকরণ, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ। আর কৃষিশিল্পের আধুনিকীকরণ ও লাগসই উন্নয়নের একমাত্র কারিগর হচ্ছেন কৃষি শিক্ষায় শিক্ষিত গ্র্যাজুয়েটরা। এ জন্য বঙ্গবন্ধু ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলনের ১১ দফায় কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণির মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেন। সব প্রতিক‚লতা সত্তে¡ও আত্মমর্যাদাশীল কৃষিবিদরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে দেশের বর্ধিষ্ণু জনগোষ্ঠীর খাদ্য জোগানে নিয়োজিত রয়েছেন। কৃষিবিদদের চিন্তাচেতনা, প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা, আধুনিক প্রযুক্তিগত ধারণা ও প্রগতিশীল কর্মকাÐের মাধ্যমে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের পরিবর্তন করে বঙ্গবন্ধুর ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ উপহার দিতে সক্ষম।
কৃষির সার্বিক উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু যে মমত্ববোধ ও আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন তা ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রæয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর প্রদত্ত ভাষণটি একটি ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে আজও সাক্ষ্য দেয়। ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রæয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে একটি গৌরবময় দিন। বঙ্গবন্ধু শত ব্যস্ততার মধ্যেও কৃষি ও কৃষকের টানে ছুটে এসেছিলেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ শ্যামল আঙিনায়। এ দেশের কৃষি, কৃষক ও কৃষিবিদদের সঙ্গে যে তাঁর আত্মার সম্পর্ক ছিল তা প্রদত্ত ভাষণে তিনি স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘‘কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি। সবুজ বিপ্লবের কথা আমরা বলছি। যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের যে অবস্থা, সত্য কথা বলতে কী বাংলার মাটি, এ উর্বর জমি বারবার দেশ-বিদেশ থেকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে ও শোষকদের টেনে এনেছে এই বাংলার মাটিতে। এই উর্বর এত সোনার দেশ যদি বাংলাদেশ না হতো, তবে এতকাল আমাদের থাকতে হতো না। যেখানে মধু থাকে, সেখানে মক্ষিকা উড়ে আসে। সোনার বাংলা নাম আজকের সোনার বাংলা নয়। বহু দিনের সোনার বাংলা। বাংলার মাটির মতো মাটি দুনিয়ায় দেখা যায় না। বাংলার মানুষের মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। বাংলার সম্পদের মতো সম্পদ দুনিয়ায় পাওয়া যায় না। তিনি কৃষির গুরুত্ব উপলব্ধি করে বলেন, যেভাবে মানুষ বাড়ছে যদি সেভাবে আমাদের বংশ বৃদ্ধি হতে থাকে, তবে ২০ বছরের মধ্যে বাংলার মানুষ বাংলার মানুষের মাংস খাবে। সে কারণেই আমাদের কৃষির দিকে নজর দিতে হবে এবং কৃষিবিদদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনাদের কোট-প্যান্ট খুলে একটু গ্রামে নামতে হবে। কেমন করে হালে চাষ করতে হয়, এ জমিতে কত ফসল হয়, এ জমিতে কেমন করে লাঙল চষে, কেমন করে বীজ ফলন করতে হয়। আগাছা কখন পরিষ্কার করতে হবে। ধানের কোন সময় নিড়ানি দিতে হয়। কোন সময় আগাছা ফেলতে হয়। পরে ফেললে আমার ধান নষ্ট হয়ে যায়। এগুলো বই পড়লে হবে না। গ্রামে যেয়ে আমার চাষি ভাইদের সঙ্গে প্রাকটিক্যাল কাজ করে শিখতে হবে। তাহলে আপনারা অনেক শিখতে পারবেন। বঙ্গবন্ধু কৃষি ও কৃষক তথা আপামর জনগণের মুক্তির জন্য আজীবন প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। তাঁর প্রদত্ত ভাষণ থেকে তা সহজেই অনুমেয়। তিনি ছিলেন আবহমান বাংলার একজন পথচারী। বংলার মাটির সাধারণ মানুষ। বঙ্গবন্ধুকে নির্মম ভাবে হত্যার মধ্যদিয়ে দেশের স্বাধীনতা,মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির সব পথ রুদ্ধ করে দেয় ঘাতক চক্র। সেই সঙ্গে কৃষের স্বপ্নও ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়। বরং সার, বীজসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অলিখিত ভাবে দেশের কৃষকের উপর চালানেরা হয় এক প্রকারের স্টিম রোলার।
এই বৈশ্বিক দুর্যোগে বঙ্গবন্ধুর এবারের শাহাদতবার্ষিকী নতুন রূপে, নতুন আঙ্গিকে বিশেষ করে তাঁর জš§শতবার্র্ষিকীর এই শুভ লগ্নে তাঁকে নতুন করে , নব রূপে আবিষ্কার, তাঁর চেতনায়, তাঁর আদর্শের মশাল ভবিষ্যত প্রজšে§র কাছে পৌঁছে দেয়ার একটি বিরাট সুযোগ। বঙ্গবন্ধুকে, তাঁর প্রতিষ্ঠিত দলকে ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ, দুলক্ষ মা বোনের সম্ভ্রম হানি আর বিপুল বিশাল সম্পদ ক্ষতির স্বীকার করে অর্জিত মহান স্বাধীনতাকে হৃদয়ে ধারণ করে সামনের দিকে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন শোষণ মুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়েই মূলত তাঁকে স্মরণ এবং সম্মান দেয়া সম্ভব হবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই তাঁকে স্বরণ, অনুকরণ, অনুপ্রেরণাই হবে আজকের প্রজšে§র সামনে শিক্ষণীয়।
বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতি বাংলাদেশের এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় কবির ভাষায় বলা প্রাসঙ্গিক যে, ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত/বঙ্গবন্ধু মরে নাই/যদি রাজপথে আবার মিছিল হতো/ বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চাই/তবে বিশ্ব পেত এক মহান নেতা/আমরা পেতাম ফিরে জাতির পিতা/যে মানুষ ভীরু কাপুরুষের মতো/ করেনি কো কখনো মাথা নত/এনেছিল হায়েনার ছোবল থেকে/ আমাদের প্রিয় স্বাধীনতা/কে আছে বাঙালি তার সমতুল্য/ ইতিহাস একদিন দেবে তার মুল্য...।’
বঙ্গবন্ধুর আদর্শের মাশাল এখন বহন করছেন তাঁরই সুযোগ্য কন্যা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বঙ্গবন্ধুর লালিত স্বপ্ন সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে কৃষি খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেছিলেন। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পুষ্টি উন্নয়ন, মহিলাদের কৃষিতে অংশগ্রহণ ও দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে কয়েকটি বছর আবার কৃষি খাতের উন্নয়ন থমকে ছিল। ২০০৮ সালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত শক্তি আবার ক্ষমতায় এলে কৃষি উন্নয়নের ক্ষেত্রে সম্ভাবনার আরো এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। কৃষি খাতে আবার ভর্তুকি, সার বিতরণ ব্যবস্থা, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, শস্য বহুমুখীকরণসহ অনেক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ১৯৭২ সালে অর্থাৎ স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে যেখানে খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিল প্রায় এক কোটি টন সেখানে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে খাদ্যশস্যের উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি ৩২ লাখ টন। একই সময়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদেরও উৎপাদন কয়েক গুণ বেড়েছে। কৃষি ক্ষেত্রে এ যুগান্তকারী সাফল্য, বঙ্গবন্ধুর অবদান বাঙালি জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ রাখবে।
বর্তমানে জনসংখ্যার ক্রমাগত বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব, শিল্পায়ন নগরায়ণ, কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার, রাসায়নিক সার ও কল-কারখানার দূষিত বর্জ্যে          কৃষিসম্পদ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য এ দেশের কৃষি, কৃষক, কৃষিবিদ ও কৃষিবান্ধব সরকারের যৌথ উদ্যোগে কাজ করে চলছে। এই দিনে তাঁর বিদেহী আতœার মাগফেরাত কামনা করছি। একই সঙ্গে এ দিনে তাঁর পরিবারের অপরাপর শহীদ সদস্যদের রূহের মাগফেরাত কামনা করছি। য়

সাংবাদিক, সাধারণ সম্পাদক-বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জা জার্নালিস্ট ফোরাম। মোবাইল ০১৮৪১৮১২৭৫ motaherbd123@gmail.com

পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে মিষ্টি ফসলের গুরুত্ব

পুষ্টিকর খাদ্যের মাধ্যমে ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়তে জাতিসংঘ ঘোষিত ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রথম এবং প্রধান উপজীব্য। যা প্রথম শুরু করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তারই ফলশ্রুতিতে তিনি কৃষিকে ঢেলে সাজানোর প্রয়াস নিয়েছিলেন। কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি গড়ে তুলেছিলেন এদেশের মিষ্টি ফসলের ভিত্তি। কারণ  মিষ্টি ফসলের সব উদ্ভিদ উৎসই পুষ্টিক এবং এগুলো স্বাভাবিকভাবেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহ্য করে টিকে থাকতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অল্প জমিতে অধিক পুষ্টিকর খাবার উৎপাদন করতে মিষ্টি ফসলই হচ্ছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় মিষ্টি ফসল আখ। আখ থেকে হয় রস, গুড়, চিনি। আখের পাশাপাশি রয়েছে তাল, খেজুর, গোলপাতা, স্টেভিয়া, সুগারবিট, মধু, যষ্টিমধু প্রভৃতি। তাল থেকে হয় রস, গুড়, তালমিছরি প্রভৃতি। খেজুর ও গোলপাতা থেকেও হয় রস, গুড়। সুগারবিট থেকে হয় গুড়, চিনি, মাছের খাবার, গবাদি পশুর খাবার প্রভৃতি। স্টেভিয়া, যষ্টিমধু এবং মধুর পুষ্টিগুণ ও ঔষধিগুণ সর্বজনবিদিত। আর বড় কথা হলো এসব খাবারের পাশাপাশি ওইসব ফসলভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের খাদ্য শিল্প গড়ে তোলা যেতে পারে। তাতে রয়েছে দারিদ্র্য মোচনেরও অপার সম্ভাবনা। এসব ছাড়াও তাল থেকে তৈরি বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি তাল গাছ বজ্রপাতের বিপদ থেকে রক্ষা করে। এখানে আলোচিত ফসলগুলোর মধ্যে আখ সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় এবং সবচেয়ে বেশি প্রতিকূল পরিবেশসহিষ্ণু। তবে তাল ও খেজুর গাছও প্রতিকূল পরিবেশ সহ্য করতে পারে। বিশেষ করে বজ্রপাত নিরোধে তালগাছের ভূমিকা অপরিসীম।
পরিবারের আয় এবং পুষ্টির চাহিদা মেটাতে আখ চাষ
আখ মিষ্টি ফসল এবং পুষ্টিকর ফসল। আজকাল সারা দেশে সারা বছর উপজেলা শহর থেকে গ্রামগঞ্জ পর্যন্ত প্রতিটি বাজারের কোণায় কোণায় চিবিয়ে খাওয়া আখ ব্যাপক হারে বিক্রি হয়। যার বাজারদর এলাকা ভেদে ২০ টাকা থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। দেশের উত্তরাঞ্চলে প্রতিটি আখের দাম অপেক্ষাকৃত কম হলেও মধ্য, দক্ষিণ ও পাহাড়ি অঞ্চলে দাম ও চাহিদা খুবই বেশি। এক বিঘা জমিতে ৩০০০টি চিবিয়ে খাওয়া আখের চারা রোপণ করা যায়। এক্ষেত্রে লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ১ মিটার এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব হবে ৪৫ সেমি.। এক বিঘা অর্থাৎ ১৩৪৯ বর্গমিটার জমিতে ওই মাপে লাগানো হলে ২৯৯৮ বা ৩০০০টি চারা লাগানো যাবে। সঠিক সময়ে, সঠিক পদ্ধতিতে এটা রোপণ করে, সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে গাছ প্রতি কমপক্ষে ৫টি কুশি পাওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে ঝাড় প্রতি ১টি মাতৃগাছ এবং ৫টি কুশি অর্থাৎ ৬টি আখ পাওয়া যাবে। সুতরাং ৩০০০টি ঝাড়ে ৩০০০ী ৬=১৮০০০টি আখ পাওয়া যাবে) তা থেকে ১৮০০০টি সুস্থ ও সবল আখ উৎপাদন করা সম্ভব। সর্বনিম্ন বাজারদরে (১০টাকা) তা বিক্রি করেও এ থেকে ১,৮০,০০০/-টাকা আসবে যার চাষাবাদ থেকে বিক্রি পর্যন্ত মোট খরচ হয় প্রায় ২৫০০০ থেকে ৩০০০০ টাকা। অর্থাৎ নিট লাভ হয় ১,৫০,০০০ টাকা। এটা গেল আখের হিসাব। আখ ছাড়াও ওই জমিতে সাথী ফসল চাষ করে প্রায় ১০,০০০-১৫০০০ টাকা নিট লাভ হবে। এ টাকা দিয়ে চাষি তার আখ চাষের ওই খরচ মিটাতে পারবে। যদিও বলা হয় আখ ১২-১৪ মাস মাঠে থাকে কিন্তু এর পরিপক্বতার জন্য  ১০-১২ মাসই যথেষ্ট। তদুপরি যদি চিবিয়ে খাওয়ার আখ হয় তাহলে তা ৭-৮ মাসেই বিক্রির উপযোগী হয়। সে কারণেই সঠিক জাত ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আখ চাষ করে জমির সুষ্ঠু ব্যবহার করা যেমন সম্ভব তেমনি সম্ভব অধিক উপার্জন এর মাধ্যমে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান করা এবং এভাবেই সম্ভব দেশের দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকার পুষ্টি চাহিদা মিটিয়ে দারিদ্র্যবিমোচনে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা।
বিভিন্ন মিষ্টি ফসলের পুষ্টিমান
আমেরিকান ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশনের (অর্গানিক লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন) মতে আখের রসের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ৪৩। অর্থাৎ এটি নি¤œমাত্রার গ্লাইসেমিক খাবার। তাই ডায়াবেটিক রোগীরাও আখের রস নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় নির্ভয়ে খেতে পারেন। বিভিন্ন ফসলের গুড় ও চিনির পুষ্টিমান    সারণি-১ দেয়া হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন প্রতিকূল এলাকায় যেখানে অন্য কোনো ফসল উৎপাদন করা যায় না কিংবা করেও তা লাভজনকভাবে ধরে রাখা যায় না সেখানেও পুষ্টিকর এসব   মিষ্টি ফসল আবাদের মাধ্যমে দেশের খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ করা যেতে পারে।
ক) খরাপীড়িত এলাকা
উত্তরাঞ্চলের খরাপীড়িত এলাকায় আখ ফসল সবচেয়ে বেশি টিকে থাকতে পারে। শুধু তাই নয় যেখানে অন্য সব  ফসল পানির অভাবে মারা যায় সেখানেও আখ ফসল বেঁচে থাকতে পারে এবং পানি পেলে তা আবার পত্র-পল্লবে সুশোভিত হয়ে ওঠে। সেজন্যই উত্তরাঞ্চলের খরাপীড়িত এলাকায় আখ চাষের ব্যাপকতা বেশি। শুধু আখই নয়, খরাপীড়িত এলাকার জন্যও আখের সঙ্গে সাথী ফসল চাষের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। আখের পাশাপাশি তাল, খেজুরেরও রয়েছে এই খরাসহিষ্ণু ক্ষমতা।
খ) চরাঞ্চলের বালুময় পতিত জমি
চরের বালিময় পতিত জমিতে আখ চাষ করে, আখের সাথে সাথী ফসল করে এবং গুড় তৈরি করে যথেষ্ট লাভ করার সুযোগ রয়েছে। এর কারণ আখের শিকড় অনেক দূর পর্যন্ত গভীরে চলে যেতে পারে। তাছাড়া চরে অন্যান্য ফসল চাষ করে চাষিরা ঝুঁকিতে থাকেন। কারণ বন্যায় তা ডুবিয়ে নিয়ে যেতে পারে। অথচ আখ এমন একটি ফসল যা ১২ -১৫ ফুট লম্বা হয় এবং বন্যায় এর নিম্নাংশ ডুবে থাকলেও কোনো ক্ষতি হয় না। আবার চরে যেসব স্বল্পমেয়াদি ফসল হয় সেগুলো সাথী ফসল হিসেবে আখের সাথে চাষ করা যায়।
গ) দক্ষিণাঞ্চলের  লবণাক্ত এলাকা
লবণাক্ততার কারণে যেখানে অন্য কোনো ফসল উৎপাদন করা যায় না সেখানেও আখ ফসল বেড়ে উঠতে পারে। একমাত্র আখ ফসল তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়েই প্রতি মিটারে ১৫ ডিএস মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। তাই লবণাক্ত এলাকারও লাভজনক ফসল আখ। আখ ছাড়া সুগারবিটও লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে।
ঘ) পাহাড়ি এলাকা
পাহাড়ি এলাকায় আখের বাজার দর অপেক্ষাকৃত বেশি। অল্প জমি ব্যবহার করে সঠিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আখ ও সাথী ফসল চাষ করে এত বেশি আয় করা শুধু আখ চাষের মাধ্যমেই সম্ভব। একইভাবে পাহাড়ি এলাকায় গুড়ের দামও বেশি। তাই ওখানকার মানুষ গুড় করেও বেশি লাভ করতে পারেন। পাহাড়ি এলাকায় তাল ও খেজুর ফসল চাষের সম্ভাবনাও যথেষ্ট।
ঙ) পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকা
হাওর এলাকার অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে অল্প কিছুদিন পরেই পানি নেমে যায়। এসব জায়গাগুলো নির্বাচন করে সেখানে জলাবদ্ধতাসহিষ্ণু আখের জাত রোপণ করা যেতে পারে। যেমন ঈশ্বরদী ৩৭, ঈশ্বরদী ৩৪, ঈশ্বরদী ২০, ঈশ্বরদী ২১ প্রভৃতি। তাছাড়া হাওরে প্রতি বছর বজ্রপাতের কারণে অনেক সংখ্যক মানুষ মারা যায়। তাই এই এলাকায় অধিক তালগাছ রোপণের মাধ্যমে একদিকে যেমন তালের রস, গুড়, তালমিছরি প্রভৃতি বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার পাওয়া যায় তেমনি এরই পাশাপাশি বজ্রপাত প্রতিরোধেরও ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
চ) দুর্যোগের ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকা
সমুদ্র তীরবর্তী উপকূলীয় এলাকা যেখানে প্রায় প্রতি বছরই মারাত্মক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় হানা দিয়ে ক্ষেতের সব ফসল ল-ভ- করে দেয়, সেখানে আখ ফসল থাকলে তা ওই এলাকার জীবন রক্ষাকারী ফসলে পরিণত হয়। কারণ ঘূর্ণিঝড়ে ল-ভ- সবকিছুতে রান্না করার উপকরণও চলে যায়, ঘরের শুকনা  খাবারও (যদি থাকে) শেষ হয়ে যায়, আর সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় পানীয় জলের। ওই এলাকায় বাড়িতে বাড়িতে চিবিয়ে খাওয়া আখ থাকলে ঝড়ে তা যত ক্ষতিগ্রস্তই হোক না কেন তা থেকে পানি ও পুষ্টি উভয়ই পাওয়া যেতে পারে। সংকটকালীন ওই সময়ে বাড়ির শিশুদের জন্য তা হয় জীবন রক্ষাকারী খাদ্য। সেকারণেই সমুদ্র তীরবর্তী উপকূলীয় এলাকার প্রতিটি বাড়িতেই চিবিয়ে খাওয়া আখের আবাদ করতে হবে। এছাড়া সেখানে তাল গাছের প্রতিরক্ষা বেষ্টনীও গড়ে তোলা যেতে পারে।
অর্থাৎ সারা দেশেই পুষ্টিকর খাদ্যের জন্য মিষ্টি ফসল চাষ করা প্রয়োজন। বরং উল্টা করে বলা যায় আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে যখন বিজ্ঞানীরা খুঁজে বেড়াচ্ছেন পরিবর্তনসহিষ্ণু ফসল, সেখানে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনসহিষ্ণু ফসল হচ্ছে আখ এবং অন্যান্য মিষ্টি ফসল। আখের রস যেমন  পুষ্টিকর, আখের চাষও তেমনি লাভজনক। এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় হচ্ছে এলাকাভিত্তিক আখের জাত নির্বাচন করে তার ভালো বীজের সরবরাহ বৃদ্ধি করা। মনে রাখতে হবে যে আখ চাষের উপকরণ, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি-জ্ঞান এবং উৎপাদিত কাঁচামালের বাজার সবই আমাদের দেশেই যথেষ্ট ভালো রয়েছে। তাই দেশের যেকোনো এলাকায় আখচাষে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা তেমন কোনো কঠিন কাজ নয়। আর এটা করতে পারলেই দেশের চিনি ও গুড় এর জোগান নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলা এবং দারিদ্র্যবিমোচনেও যথেষ্ঠ ভূমিকা রাখা সম্ভব।

 

ড. মো. আমজাদ হোসেন১  ড. সমজিৎ কুমার পাল২
১মহাপরিচালক, ২পরিচালক (গবেষণা), বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঈশ্বরদী, পাবনা, ফোন : ০৭৩২৬৬৬৬২৮, ই-মেইল : bsridg123 @gmail.com

বসতবাড়িতে নিরাপদ সবজি ও ফল চাষ মডেল

নিরাপদ খাদ্যকে সমধিক গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন দেশ কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, দূষণকারী বস্তু, অণুজীব, রোগ ও পোকা ইত্যাদির পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে কঠোর বিধি নিষেধ আরোপ করছে। বিধায় আমাদের গ্রামের বেশির ভাগ বাড়িতে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, অপরিকল্পিতভাবে নানা গাছ গাছড়া দিয়ে ভরে রাখা হয়েছে। এতে করে বাড়িতে তেমন আলো বাতাস পড়ে না কোথাও কোথাও ফাঁকা পতিত পড়ে আছে যেখানটা সহজেই আবাদের আওতায় আনা যায়। এতে করে আমাদের বসতবাড়ির উৎপাদন ভীষণভাবে ব্যাহত হয়। এই অসুবিধা দূর করে বসতবাড়ির বিভিন্ন স্থানসমূহের সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সহজেই উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। বসতবাড়ির বিভিন্ন অব্যবহৃত স্থানসমূহের ব্যবহার পরিকল্পনায় পরিকল্পিতভাবে কোন স্থানে কী কী সবজি ও ফল আবাদ করা সম্ভব সেগুলো চাষে উদ্বুদ্ধ হবেন।


বসতবাড়ির কোন স্থানে কোন সবজি ও ফল চাষ করা যায় তার বিবরণ
রৌদ্রজ্জ্বল স্থান/ খোলা জায়গা : বিভিন্ন প্রকার পাতা জাতীয় সবজি পুঁইশাক, লালশাক, পালংশাক, কলমিশাক, বাটিশাক, বেগুন, টমেটো  ইত্যাদির বেড করে আবাদ করা সম্ভব।
ছায়াযুক্ত/অর্ধছায়াযুক্ত স্থান/ মাচার নিচে : আদা, হলুদ, বিলাতি ধনিয়া ইত্যাদি।
স্যাঁতসেঁতে স্থান : বিভিন্ন প্রকার কচু।
মাচায়/পুকুর পাড়ে মাচায় : বিভিন্ন প্রকার কুমড়াজাতীয় সবজি,  পুঁইশাক, শিম, বরবটি ইত্যাদি।
ঘরের চালে : চালকুমড়া,  মিষ্টি কুমড়া, লাউ, দেশি শিম,  পুঁইশাক ইত্যাদি।
বেড়া/প্রাচীর : কুমড়া জাতীয় সবজি, পুঁইশাক, শিম, বরবটি ইত্যাদি।
ঘরের পীড়ায় : পেয়ারা, ডালিম, সজিনা, পেঁপে, বেগুন, বারোমাসি মরিচ, মানকচু, ফেনকচু, দুধকচু ইত্যাদি।
বাড়ির সীমানায় : সজিনা, পেঁপে ইত্যাদি।
গর্তে নিচু জায়গায় : পানিকচু, হেলেঞ্চা ইত্যাদি।
অফলা গাছে : মেটে আলু, মৌসুমি, ছুই, ধুন্ধল, গাছ আলু ইত্যাদি।
পতিত জায়গা : লেবু, কুল ইত্যাদি।
পুকুর পাড়ে : লেবু, পেয়ারা ইত্যাদি।
এতে বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি ও ফল পাওয়াসহ খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। উত্তম কৃষি পদ্ধতি সামগ্রিক কৃষি কার্যক্রম যা অনুসরণে নিরাপদ এবং মানসম্পন্ন খাদ্য ও খাদ্য বহির্ভূত কৃষিজাত পণ্য সহজলভ্য, পরিবেশ সুরক্ষা, অর্থনীতি এবং সমাজ সুসংহত হবে। য়

 

ড. জগৎ চাঁদ মালাকার

উপপরিচালক(এল.আর.), ডিএই, মোবাইল : ০১৭১৬০০৪৪০০, ই-মেইল : Jagot_mala @yahoo.com

 

 

পরিবর্তিত জলবায়ুতে মসুর ডাল উৎপাদন প্রযুক্তি

মানুষের সুষম খাদ্য চাহিদা পূরণে ডাল একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল। ডালে পর্যাপ্ত পরিমাণে হজমযোগ্য আমিষ থাকে অথচ মাংস অপেক্ষা দাম কম। তাই ডালকে গরিবের মাংস বলা হয়। শুধু মানুষের খাদ্যই নয় পশুর খাদ্য ও মাটির খাদ্য হিসেবে পরিবেশবান্ধব কৃষি ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে ডাল এদেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। FAO এর রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতিদিন জনপ্রতি ৪৫ গ্রাম করে ডাল খাওয়ার কথা থাকলেও আমরা খাচ্ছি মাত্র ১২-১৩ গ্রাম করে। বর্তমানে ৭.০৭ লাখ হেক্টর জমিতে প্রায় ৭.৬৯ লাখ মেট্রিক টন ডাল উৎপাদন হচ্ছে। ডালের ঘাটতি দূর করতে জমির পারিমাণ ও ফলন উভয়ই বাড়াতে হবে। মসুর বাংলাদেশের ডাল ফসলের মধ্যে অন্যতম প্রধান ডাল ফসল। প্রতিদিন খাবার টেবিলে মসুর ডালের উপস্থিতিই প্রমাণ করে এর জনপ্রিয়তা এবং চাহিদা। কিন্তু বর্তমানে মসুর উৎপাদন নিম্নমুখী। এর কারণ আমন ধান কেটে জমি তৈরি করতে মসুর বপনের উপযুক্ত সময় (Optimum sowing time) চলে যায়, যার কারণে মসুর দেরিতে বপন করতে হয়। এতে মসুরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এছাড়া ফুল ধারণের সময়েই (Flowering stage) ব্যাপকভাবে স্টেম ফাইলিয়াম ব্লাইট রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং ফলন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। তাছাড়া ইদানীং চাষকৃত জমিতে ব্যাপকভাবে মসুরের গোড়া পচা (Foot rot) রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। তাই চাষ করে মসুর আবাদের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত ৩টি কারণে কাঙ্খিত ফলন পাওয়া যাচ্ছে না-
 

ক. উপযুক্ত সময়ের পরে বপন (Late planting) করার জন্য শারীরবৃত্তীয় কারণে ফলন কম হচ্ছে।
খ. গোড়া পচা
(Foot rot) রোগের কারণে ব্যাপকভাবে গাছের সংখ্যা (Plant population) কমে যাচ্ছে।
গ. স্টেম ফাইলিয়াম ব্লাইট
(Stemphylium Blight) দ্বারা ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হচ্ছে।
 

এসব সমস্যাগুলো থেকে মসুরকে রক্ষা করে কাঙ্খিত ফলন অর্জনে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা কয়েক বছর ধরে গবেষণা করে পরিবর্তিত জলবায়ুতেও মসুর উৎপাদনের লাগসই ও টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। আর তা হল বিনা চাষে রিলে পদ্ধতিতে (সাথী ফসল হিসেবে) মসুর চাষ। প্রচলিত চাষের মাধ্যমে মসুরের আবাদ ও রিলে পদ্ধতিতে বিনা চাষে মসুরের আবাদের একটি গবেষণালব্ধ তুলনামূলক ফলাফল নিম্নে উল্লেখ করা হলো-


টেবিল-১ : প্রচলিত ও রিলে ফসল হিসেবে মসুরের ফলন ও ফলনে সাহায্যকারী বৈশিষ্ট্যের তুলনামূলক ছক, আটঘড়িয়া, পাবনা, ২০১৬-১৭

ট্রিটমেন্ট

গাছের উচ্চতা  (সে.মি.)

প্রতি গাছে ফলের সংখ্যা

প্রতি ফলে বীজের সংখ্যা

এক হাজার বীজের ওজন(গ্রাম)

হেক্টর প্রতি ফলন (কেজি)

হেক্টরপ্রতি খড়ের ফলন  (কেজি)

বিনা চাষে রিলে পদ্ধতিতে মসুর আবাদ ৪৫.৫৫ ৫৪.২৫ ২.০০ ১৮.৫৬ ১৬১৩ ১৩৮৮
প্রচলিত চাষের মাধ্যমে মসুর আবাদ ৩৯.৫০ ৪৪.৭৫ ১.৮৫ ১৮.১১ ১৩৬২ ১২৬৮

উৎস : বার্ষিক গবেষণা প্রতিবেদন, সরেজমিন গবেষণা বিভাগ, বারি, গাজীপুর, ২০১৬-১৭

 

টেবিল-২ : মসুর উৎপাদনে প্রচলিত চাষ পদ্ধতি ও বিনা চাষে রিলে পদ্ধতির খরচ ও লাভের তুলনামূলক হিসাব, আটঘড়িয়া, পাবনা, ২০১৬-১৭

ট্রিটমেন্ট

প্রতি হেক্টরে বীজ থেকে প্রাপ্ত অর্থ (টাকা)

প্রতি হেক্টরে খড় থেকে প্রাপ্ত অর্থ (টাকা) প্রতি হেক্টররে মোট প্রাপ্ত অর্থ (টাকা) প্রতি হেক্টরে মোট খরচ (টাকা)

প্রতি হেক্টরে লাভ (টাকা)

বিনা চাষে রিলে পদ্ধতিতে মসুরআবাদ ১,২০,৯৭৫.০০ ১৩,৮৮০.০০ ১,৩৪,৮৫৫.০০ ২৮,০২০.০০ ১,০৬,৮৩৫.০০
প্রচলিত চাষের মাধ্যমে মসুর আবাদ ১,০২,১৫০.০০ ১২,৬৮০.০০ ১,১৪,৮৩০.০০ ৩২,৫২০.০০ ৮২,৩১০.০০


ফলাফল থেকে দেখা যাচ্ছে, মসুরের ফলনে সাহায্যকারী বৈশিষ্ট্য ও ফলন প্রচলিত চাষের চেয়ে বিনা চাষে রিলে পদ্ধতিতে বেশি এবং রিলে পদ্ধতিতে ফলন প্রায় শতকরা ১৮ ভাগ বেশি। বিনিয়োগ ও লাভের হিসাবেও দেখা যাচ্ছে কম খরচ করে বেশি লাভ পাওয়া যাচ্ছে রিলে পদ্ধতিতে প্রচলিত চাষ পদ্ধতির চেয়ে এবং তা প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ। তাই উল্লিখিত গবেষণার ফল থেকে দৃঢ়ভাবে বলা যায় প্রচলিত চাষ পদ্ধতির চেয়ে বিনা চাষে রিলে পদ্ধতিতে মসুর উৎপাদন একটি লাভজনক প্রযুক্তি যা বর্তমানে পরিবর্তিত জলবায়ুতে মাঠ পর্যায়ে সফলভাবে বাস্তবায়নের অপার সম্ভাবনা রয়েছে।


বিনা চাষে রিলে ফসল হিসেবে মসুর উৎপাদনের কলাকৌশল
এ পদ্ধতিতে আমন ধান কাটার ১০-১৫ দিন আগে (অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ) জমি থেকে পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথেই কাদার মধ্যে মসুর বীজ ছিটিয়ে বপন করতে হয়। যদি জমিতে রসের অভাব থাকে তাহলে বীজ বপনের ১ দিন আগে একটি হালকা সেচ দিয়ে নিতে হবে। সাধারণত মাঝারি উঁচু জমির ক্ষেত্রে আমন ধানের শেষ সেচের পরই মসুরের বীজ বপন করা যেতে পারে। রিলে পদ্ধতিতে একটু বেশি বীজের প্রয়োজন হয় এবং তা হেক্টরপ্রতি ৪৫-৫০ কেজি। বপনের আগে বীজ মোটামুটি  ৬-৮ ঘণ্টা ভিজিয়ে (প্রাইমিং) রাখলে ভালো হয়। যদিও এ পদ্ধতিতে গোড়া পচা রোগের প্রাদুর্ভাব কম তারপরও বপনের আগে বীজ কেজি প্রতি ৩ গ্রাম হারে প্রোভ্যাক্স অথবা কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক দ্বারা শোধন করে বপন করলে এ রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।


সার ব্যবস্থাপনা পরিমাণ : ইউরিয়া ৪৫ কেজি/হেক্টর; টিএসপি ৯০ কেজি/হেক্টর; এমপি  ৪৫ কেজি/হেক্টর। সমুদয় সার বীজ বপনের আগের দিন অথবা একই দিনে বীজ বপনের আগে প্রয়োগ করা যাবে।


আন্তঃপরিচর্যা এ পদ্ধতিতে মসুরের জমিতে সাধারণত আগাছা দমন ও সেচের তেমন প্রয়োজন হয় না। তবে মাটিতে যদি রসের অভাব হয় এবং রসের অভাবে যদি গাছের বৃদ্ধি কম হয় সেক্ষেত্রে চারা গজানোর ২৫-৩০ দিন পর একবার হালকা সেচ দিতে হয়। জমিতে পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা থাকতে হবে। কারণ মসুর জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। আগাছার প্রকোপ বেশি হলে বীজ গজানোর ৩০-৩৫ দিন পর একবার আগাছা পরিষ্কার করতে হয়।


রোগ দমন মসুরের প্রধান রোগ হলো স্টেমফাইলিয়াম ব্লাইট যা Stemphylium প্রজাতির ছত্রাক দ্বারা সৃষ্টি হয়। আক্রান্ত গাছের পাতায় ছত্রাকের সাদা জালিকা (মাইসেলিয়াম) দেখা যায়। দূর থেকে আক্রান্ত ফসল আগুনে ঝলসানো মনে হয়। আক্রমণের শেষ পর্যায়ে গাছ লালচে বাদামি রঙ ধারণ করে। বীজ, বিকল্প পোষক, বায়ু প্রভৃতির মাধ্যমে এ রোগ বিস্তার লাভ করে। রিলে পদ্ধতি যেহেতু সঠিক সময়ে মসুর বপন করা হয় সেহেতু সাধারণত দানা গঠন পর্যায়ে এ রোগের আক্রমণ দেখা যায়। এ রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে ফুল আসা শুরু করলেই (Flowering stage) রোভরাল-৫০ ডব্লিউপি নামক ছত্রাকনাশক ১০ দিন অন্তর অন্তর ২-৩ বার স্প্রে করলে এ রোগ থেকে সম্পূর্ণভাবে ফসলকে রক্ষা করা যায় এবং ফলনের ওপর কোনো প্রভাব পড়ে না।


ফলন এ পদ্ধতিতে মসুরের ফলন হেক্টরপ্রতি ১৫০০-২০০০ কেজি।


বাজারদর : বীজ- প্রতি কেজি ৭৫ টাকা, খড়- প্রতি কেজি ১০ টাকা।

 

ড. মো. জাহেরুল ইসলাম* ড. মো. রবিউল আলম**

*সরেজমিন গবেষণা বিভাগ, কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, পাবনা # ০১৭১৫-৫২৪১২৬

 

আউশ ধানের উৎপাদন ও পরিচর্যা

বাংলাদেশে তিন মৌসুমে ধানের চাষ করা হয়- আউশ, আমন ও বোরো মৌসুম, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৯-১০ লক্ষ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের উৎপাদন করা হয়। যেহেতু আউশ ধানের আবাদ বৃষ্টি নির্ভর, সেহেতু এ ধান উৎপাদনের সেচ খরচ সাশ্রয় হয়। তাছাড়া উচ্চফলনশীল (উফশী) জাতের ধান চাষ করলে অধিক ফলন পাওয়া যায়। এ বছর কৃষি মন্ত্রণালয় আউশ ধানের চাষাবাদ বৃদ্ধির জন্য কৃষকদের বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা ও ভর্তুকি প্রদান করছে। এতে অধিক সংখ্যক কৃষক আউশ ধান চাষে উৎসাহী হবেন বলে আশা করা যায়।
 

মৌসুম ও জাত
আউশ ধানের বীজ বপনের উপযুক্ত সময় ১৫-৩০ চৈত্র (৩০মার্চ-১৫ এপ্রিল)। রোপা আউশের উফশী জাত হিসেবে বিআর২৬, ব্রি ধান২৭, ব্রি ধান৪৮, ব্রি ধান৫৫, ব্রি ধান৮২ ও ব্রি ধান৮৫ এবং বোনা আউশের উফশী জাত হিসেবে বিআর২০, বিআর২১, বিআর২৪, ব্রি ধান৪২, ব্রি ধান৪৩, ব্রি ধান৮৩ আবাদ করা যায়।

 

বীজতলা
দোঁ-আশ ও এঁটেল মাটি বীজতলার জন্য ভালো। বীজতলার জমি উর্বর হওয়া প্রয়োজন। যদি অনুর্বর হয় তাহলে প্রতি বর্গমিটার জমিতে ১.০০-১.৫ কেজি  হারে জৈবসার ছড়িয়ে দিতে হবে এর পর ৫-৬ সেমি. পানি দিয়ে ২-৩টি চাষ ও মই দিয়ে ৭-১০ দিন রেখে দিতে হবে এবং পানি ভালোভাবে আটকিয়ে রাখতে হবে। আগাছা, খড় পচে গেলে আবার চাষ ও মই দিয়ে কাদা করে জমি তৈরি করতে হবে। এবার জমির দৈর্ঘ্য বরাবর ১ মিটার চওড়া বেড তৈরি করতে হবে।  দুই বেডের মাঝখানে ৪০-৫০ সেমি. জায়গা ফাঁকা রাখতে হবে। বীজতলায় প্রতি বর্গমিটার বেডে ৮০-১০০ গ্রাম অঙ্কুরিত বীজ সমানভাবে বুনে দিতে হবে। জাতভেদে বীজের হার ৪০-৫০ কেজি/হেক্টর।

 

জমি তৈরি  ও সার প্রয়োগ
জমিতে প্রয়োজন মতো পানি দিয়ে মাটির প্রকারভেদে ২-৩টি চাষ ও মই দিতে হবে, যেন মাটি থকথকে কাদাময় হয়। জমি উঁচু-নিচু থাকলে সমান করে দিতে হবে। অধিক ফলন পাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত জৈবসারসহ সুষম মাত্রায় রাসায়নিক সার প্রয়োগ করুন। রোপা আউশে  হেক্টরপ্রতি ১৩০ কেজি ইউরিয়া,  ৫৫ কেজি টিএসপি, ৬ কেজি এমওপি এবং বোনা আউশে  ১২০ কেজি ইউরিয়া, ৫০ কেজি টিএসপি, ৫৫ কেজি এমওপি সার ব্যবহার করুন। টিএসপি সারের পরিবর্তে ডিএপি সার ব্যবহার করা হলে টিএসপি সারের সমপরিমাণ ডিএপি সার ব্যবহার করে প্রতি কেজি ডিএপি সার ব্যবহারের জন্য ৪০০ গ্রাম হারে ইউরিয়া কম ব্যবহার করতে হবে। মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে সার ব্যবহার করা উত্তম। ইউরিয়া সার তিন কিস্তিতে (প্রথম কিস্তি জমি শেষ চাষের সময়, দ্বিতীয় কিস্তি চারা রোপণের ১৫ দিন পর, তৃতীয় কিস্তি কাইচথোড় আসার ৫-৭ দিন আগে) এবং অন্যান্য সার জমি শেষ চাষের সময় প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়ার পরিবর্তে গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করলে ফলন বাড়ে এবং সারের কার্যকারিতা ২০-২৫ ভাগ বৃদ্ধি পায়। গুটি ইউরিয়া প্রতি চার গোছার মাঝখানে একটি করে প্রয়োগ করতে হয়। আউশ ধানের ১.৮ গ্রাম ওজনের গুটি ব্যবহার করুন। গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করলে আউশ মৌসুমে প্রতি হেক্টরে ৬৫ কেজি ইউরিয়া সাশ্রয় হয়।

 

চারা রোপণ
সাধারণভাবে ২০-২৫ দিনের চারা রোপণ করা উচিত। রোপণের সময় জমিতে ছিপছিপে পানি থাকলেই চলে। ১ হেক্টর জমিতে ৮-১০ কেজি বীজের চারা লাগে। সারিতে চারা রোপণ করতে হবে। সারি থেকে সারির দূরত্ব ২০-২৫ সেমি. এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ১৫-২০ সেমি. হবে।

 

পরিচর্যা
আউশের জমি আগাছা মুক্ত রাখতে হবে প্রয়োজনে নিড়ানি যন্ত্র ব্যবহার করে ২-৩টি নিড়ানি দিতে হবে। অনুমোদিত  আগাছানাশক ব্যবহার করেও আগাছা দমন করা যায়। জমিতে রসের অভাব হলে বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা সম্পূরক সেচের ব্যবস্থা নিতে হবে। ধানের চারা রোপণের পর জমিতে ১০-১২ দিন ছিপছিপে পানি রাখতে হবে, যাতে নতুন শিকড় গজাতে পারে, এর পর কম পানি রাখলেও চলবে। সম্পূরক সেচযুক্ত ধানের ফলন হেক্টরে প্রায় ১ টন বেশি হয়।

 

পোকামাকড়  ও রোগবালাই
পোকামাকড় ও রোগবালাই দমনের জন্য নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ করতে এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করতে হবে। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে রোপা আউশের জমিতে  ৮-১০ ফুট দূরে দূরে ধৈঞ্চার চারা রোপণ করতে হবে অথবা কয়েকটি বাঁশের কঞ্চি/গাছের ডাল পুঁতে দিতে হবে। বাদামি গাছফড়িং দমনে সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে। ধানের নিবিড় চাষাবাদের কারণে ফসলের পেকার প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলেছে। এসব পোকার মধ্যে রয়েছে- মাজরা পোকা, পামরি পোকা, বাদামি গাছ ফড়িং, গান্ধী পোকা, লেদা পোকা, চুঙ্গি পোকা, ঘাসফড়িং, ছাত্রা পোকা, থ্রিপস্ ইত্যাদি। দশটি প্রধান রোগ ধানের ক্ষতি করে। এগুলো হচ্ছেÑ টুংরো ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়াজনিত পোড়া, উফরা, ব্লাস্ট, খোলপোড়া, বাকানি, বাদামি রোগ ইত্যাদি। এসব পোকামাকড় ও রোগবালাই দমনে সময়োচিত ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ধানের ফলন বৃদ্ধি হবে এবং প্রয়োজনে স্থানীয় কৃষি বিভাগে যোগাযোগ করতে হবে।

 

ফসল কর্তন
শতকরা আশি ভাগ ধান পাকার সঙ্গে সঙ্গে কাটার ব্যবস্থা করতে হবে। কাটা ধান স্তূপ না করে দ্রুত মাড়াইয়ের ব্যবস্থা নিতে হবে। খাবার ধান যথাসম্ভব শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে। বীজ ধান ৩-৪ দিন রোদে শুকিয়ে ১২% আর্দ্রতায় বায়ুরোধক পাত্রে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে। আউশ ধান কাটার উপযুক্ত সময় ১৫ শ্রাবণ-২০ ভাদ্র (৩০জুলাই- ৪ সেপ্টেম্বর)।

 

ধানের বীজ সংরক্ষণ
ভালো ফলন পেতে হলে ভালো বীজের প্রয়োজন। এজন্য যে জমির ধান ভালোভাবে পেকেছে, রোগ ও পোকা-মাকড়ের আক্রমণ হয়নি এবং আগাছামুক্ত সেসব জমির ধান বীজ হিসেবে রাখা। ধান কাটার আগেই বিজাতীয় (ড়ভভ-ঃুঢ়ব) গাছ সরিয়ে ফেলতে হবে। যেসব গাছের আকার-আকৃতি, শিষের ধরন, ধানের আকার-আকৃতি, রঙ ও শুঙ এবং ধান পাকার সময় জমির আিধকাংশ গাছ থেকে একটু আলাদা সেগুলোই বিজাতীয় গাছ। সব রোগাক্রান্ত গাছও অপসারণ করতে হবে। এরপর ফসল কেটে মাঠে শুকনো স্থানে রাখতে হবে এবং আলাদা মাড়াই, ঝাড়াই করে ভালোভাবে রোদে শুকিয়ে মজুদ করতে হবে। বীজ ধান মজুদের সময় যেসব পদক্ষেপ নেয়া উচিত সেগুলো হলো-
* রোদে ৫-৬ দিন ভালোভাবে শুকানো যাতে বীজের আর্দ্রতা শতকরা ১২ ভাগের নিচে থাকে। দাঁত দিয়ে বীজ কাটলে যদি কটকট শব্দ হয় তাহলে বুঝতে হবে বীজ ঠিকমতো শুকিয়েছে। পুষ্ট ধান বাছাই করতে কুলা দিয়ে কমপক্ষে দুইবার ঝেড়ে নেওয়া যেতে পারে।
* বায়ুরোধী পাত্রে বীজ রাখতে হবে। বীজ রাখার জন্য প্লাস্টিকের ড্রাম উত্তম তবে বায়ুরোধী মাটি বা টিনের পাত্রে রাখা যায়। মাটি মটকা বা কলসে বীজ রাখলে গায়ে দুইবার আলকাতরার প্রলেপ দিয়ে শুকানো। আর্দ্রতা রোধক মোটা পলিথিনেরও বীজ মজুদ করা যেতে পারে।
* রোদে শুকানো বীজ ঠা-া করে পাত্রে ভরা। পুরো পাত্রটি বীজ দিয়ে ভরে রাখা। যদি বীজে পাত্র না ভরে তাহলে বীজের ওপর কাগজ বিছিয়ে তার ওপর শুকনো বালি দিয়ে পাত্র পরিপূর্ণ করা।
* পাত্রের মুখ ভালোভাবে বন্ধ করতে হবে যেন বাতাস ঢুকতে না পারে। এবার এমন জায়গায় রাখা যেন পাত্রের তলা মাটির সংস্পর্শে না আসে।
* টনপ্রতি ধানে ৩.২৫ কেজি নিম, নিশিন্দা বা বিষকাালি পাতার গুঁড়া মিশিয়ে গোলাজাত করলে পোকার আক্রমণ হয় না। বীজের ক্ষেত্রে ন্যাপথলিন বল ব্যবহার করা যায় তবে অবশ্যই বীজ ধান প্লাস্টিক ড্রামে সংরক্ষণ করতে হবে।

 

মাহমুদ হোসেন

সাবেক মহাব্যবস্থাপক (অব.) বিএডিসি; মোবাইল : ০১৮৩৭৩৫৩৯৭০ ই-মেইল : mahmood1945bd@gmail.com

 

প্রশ্নোত্তর নিয়মিত (বিভাগ)

মো. শরিফুল ইসলাম
গ্রাম-পানচুর
উপজেলা-লোহাগড়া
জেলা-নড়াইল
প্রশ্ন : আদা গাছের গোড়া পচে যাচ্ছে, কী করব?
উত্তর : আক্রান্ত অংশ সংগ্রহ করে পুড়িয়ে বা নষ্ট করে ফেলতে হবে। রোগমুক্ত গাছ থেকে কন্দ সংগ্রহ করতে হবে। কাঁচা গোবর পানিতে গুলে কন্দ শোধন করে ছায়ায় শুকিয়ে ব্যবহার করতে হবে। রোগ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম কম্প্যানিয়ন বা নোইন বা রিডোমিল গল্ড বা ডাইথেন এম-৪৫ বা ৪ গ্রাম কুপ্রাভিট বা ১% বর্দোমিশ্রণ মিশিয়ে গাছের গোড়ায় স্প্রে করতে হবে।
দীপঙ্কর সরকার
গ্রাম-লতাখামার
উপজেলা-দৌলতপুর
জেলা-খুলনা
প্রশ্ন : করলা গাছের পাতা গুচ্ছ হয়ে যাচ্ছে এবং গাছ বাড়ছে না, কী করব?
উত্তর : আক্রান্ত গাছ দেখা মাত্র তুলে নষ্ট বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। রোগমুক্ত গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। ক্ষেতের আশপাশের আগাছা  পরিষ্কার করতে হবে। বাহক পোকা ধ্বংস করার জন্য বালাইনাশক যেমন- এসাটাফ, টিডো, এডমায়ার প্রয়োগ করতে হবে। টেট্টাসাইক্লিন বা লেডার মাইসিন (৫০০ পিপিএম বা ০.৫ গ্রাম/ লিটার পানি) ছিটিয়ে রোগ দমনে ভালো ফল পাওয়া যায়।
সফিকুল ইসলাম
জেলা-পঞ্চগড়
উপজেলা-দেবীগঞ্জ
গ্রাম-শালডাঙ্গা
প্রশ্ন : মাছ চাষ পানির পিএইচ কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে?
উত্তর : পুকুর বা খামার তৈরির সময়  কেজি/প্রতি শতকে ১ কেজি হারে চুন ৩-৫ ফুট পানির গভীরতায় প্রয়োগ করতে হবে। মজুদ পরবর্তীতে প্রতি শতকে ২৫০-৫০০ গ্রাম/প্রতি শতকে হারে প্রয়োগ করতে হবে। পানির পিএইচ পরীক্ষা করে যদি ৬ এর নিচে থাকে প্রতি শতাংশে ১ কেজি হারে পাথুরে চুন প্রয়োগ করতে হবে।
চুনের পরিবর্তে জিওটক্স/জিওলাইট শতাংশে ২৫০ গ্রাম/ প্রয়োগ করা যেতে পারে।
এছাড়াও বায়োকেয়ার প্রতি ৭ দিন অন্তর ৮০-১২০ মিলি./প্রতি শতকে হারে দিতে হবে প্রতিষেধক হিসেবে। আর নিরাময়ের জন্য পর পর ২ দিন ১২০-১৬০ মিলি./প্রতি শতকে হারে প্রয়োগ করতে হবে।
আবদুর রহিম
জেলা-চাঁদপুর
উপজেলা-ফরিদগঞ্জ
গ্রাম-কড়ইতলী
প্রশ্ন : পুকুরের পানি ঘোলা হলে কী কী করণীয়?
উত্তর : পোড়া চুন ১-২ কেজি/প্রতি শতকে বা জিপসাম ১.৫-২ কেজি/ শতক হারে প্রয়োগ করতে হবে। ফিটকিরি ২৪০-২৪৫ গ্রাম/ প্রতি শতকে  ৩০ সেমি. গভীরতায় প্রয়োগ করতে হবে। পানি পরিবর্তন করা বা খাদ্য কমিয়ে দিতে হবে। পুকুর তৈরির সময় জৈবসার বেশি ব্যবহার করতে হবে। পানি পরিবর্তন বা নতুন পানি সংযোগ করতে হবে।
আবদুল রফিক
গ্রাম-পূর্ব তিমিরপুর
উপজেলা-নবীগঞ্জ
জেলা-হবিগঞ্জ
প্রশ্ন : পটোল গাছের কা- থেকে আঠা ঝরছে, এবং বাকল ফেটে কষ পড়ছে। কী করণীয়?
উত্তর : এটি পটোলের ছত্রাকজনিত রোগ        এজন্য-
-  আক্রান্ত গাছ তুলে নষ্ট করতে হবে।
- আক্রান্ত কাণ্ডে বর্দোমিশ্রণ (১%) বা কুপ্রাভিট (০.৪%) স্প্রে করতে হবে;
-  রোগমুক্ত গাছ থেকে কাটিং সংগ্রহ করতে হবে।
কানাইলাল বিশ্বাস
গ্রাম-করগাদি
উপজেলা-মধুখালি
জেলা-ফরিদপুর
প্রশ্ন : ধানের গুদামে ইঁদুরের আক্রমণে ধানের ক্ষতি হচ্ছে। ইঁদুর দমনে কী করণীয়?
উত্তর :
- ঘরবাড়ি, গুদাম পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা;
- সম্ভব হলে শস্য টিনের পাত্রে সংরক্ষণ করা;
- ড্রাম বা গোলা মাচার ওপর সংরক্ষণ করা;
- বিভিন্ন প্রকার ফাঁদ ব্যবহার করা;
- গ্লুবোর্ড (আঠা বোর্ড) ব্যবহার করা;
- তীব্র বিষ হিসেবে জিংক ফসফাইড (২%) বিষটোপ হিসেবে ব্যবহার করা।
মমতাজ বেগম
গ্রাম-শালগাড়িয়া
উপজেলা-পাবনা সদর
জেলা-পাবনা
প্রশ্ন : আম গাছের বয়স ২/৩ বছর। হঠাৎ করে চারা গাছের আগা শুকিয়ে আসছে। কী করলে উপকার পাবো।
উত্তর : এ রোগটি আম গাছের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকারক ও অধিকাংশ জাতে কমবেশি দেখা যায়। গাছের যে কোনো বয়সে এ রোগটি হতে পারে। আক্রান্ত গাছের আগা মরে যায় যাকে ডাইব্যাক বলে। কচি পাতা শাখা-প্রশাখা, কা-, মুকুল ও ফল আক্রান্ত হয়।
রোগাক্রান্ত ডালপালা কেটে পুড়ে ফেলতে হবে। আক্রান্ত পাতা দেখলেই ব্যাভিস্টিন বা নোইন ২০ গ্রাম ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ৩-৪ বার স্প্রে করতে হবে।
লিটন রায়
গ্রাম-বেলাই
উপজেলা-দিনাজপুর সদর
জেলা-দিনাজপুর

প্রশ্ন : পেঁপে গাছের ফল পচে ঝরে যাচ্ছে। করণীয় কী?
উত্তর : এটা পেঁপের ফল পচা বা পেঁপের অ্যানথ্রাক্সনোজ রোগ। পাতা, বোঁটা, ফলে বাদামি দাগ দেখা যায়। পাকা ফলে কালো দাগ হয়। আক্রান্ত অংশগুলো সংগ্রহ করে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে বা পুড়ে ফেলতে হবে। গাছে সুষম সার প্রয়োগ করতে হবে। রোগ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম কার্বেনন্ডাজিম (ব্যাভিস্টিন বা নোইন) জাতীয় ছত্রাকনাশক মিশিয়ে ১০-১২ দিন পরপর স্প্রে করতে হবে। ফল সংগ্রহের অন্তত ২০ দিন আগে স্প্রে বন্ধ করতে হবে।
সুমন
গ্রাম-নকীপুর
উপজেলা-শ্যামনগর
জেলা-সাতক্ষীরা
প্রশ্ন : গরুকে পাগলা কুকুর কামড় দিয়েছে। কী করব?
উত্তর : কামড়ানো জায়গা পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দ্রবণ দিয়ে ধুয়ে দিতে হবে। রেবিসিন ১০ সিসি ১০০ কেজি ওজনের জন্য ১ম দিন ৪ সিসি, ৭ম দিন ৩ সিসি এবং ২১তম দিন  ৩ সিসি ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করতে হবে।
আরিফ
গ্রাম-লেবুখালী
উপজেলা-দুমকী
জেলা-পটুয়াখালী
প্রশ্ন : আর্থ্রাইটিস/ গিরা ফোলা রোগে কী করব?
উত্তর : এ রোগের আক্রমণে : পায়ের গিরা ফুলে যায়, পানি জমে থাকে, ব্যথা হয়, খুঁড়িয়ে হাঁটে।
- অ্যাসিটাইল স্যালিসাইলিক এসিড প্রতিবার ১ গ্রাম করে দিনে ২-৩ বার খাওয়ানো যেতে পারে।
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম, নিয়মিত হালকা ব্যায়াম, পর্যাপ্ত সুষম খাদ্য এবং ওষুধ প্রয়োগ করে এ রোগের চিকিৎসা করা যায়।
- ডিসপিরিন ট্যাবলেট ০.৩ গ্রাম হিসেবে দিনে ৩ বার খাওয়ার পর দেয়া যেতে পারে।

কৃষিবিদ মোহাম্মদ মারুফ*
*সহকারী তথ্য অফিসার (শস্য উৎপাদন), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫  ধরড়পঢ়@ধরং.মড়া.নফ

হাইড্রোপনিক ফার্মিং : এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ

ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান পানিতে যোগ করে সে পানিতে ফসল উৎপাদন করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় হাইড্রোপনিক ফার্মিং। গাছের জন্য সরবরাহকৃত পানিতে প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান বিদ্যমান থাকলে মাটি ছাড়াও গাছ উৎপাদন করা যায়। হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদনের জন্য এ ধারণাকে কাজে লাগিয়ে মাটির পরিবর্তে পানিতে ফসল উৎপাদন করা হয়ে থাকে। এ প্রক্রিয়ায় ফসলের সব খাদ্য উপাদান দ্রবণে মিশিয়ে সেখানে গাছ রোপণ করা হয়। আবার কখনও কখনও মাটি ছাড়া অন্য কোনো মাধ্যমে চারা রোপণ করে তাতে খাদ্য উপাদান স্প্রে করেও হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদন করা হয়ে থাকে। এটি একটি অত্যাধুনিক ফসল চাষ পদ্ধতি। ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, তাইওয়ান, চীন, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো অনেক আগে থেকেই বাণিজ্যিকভাবে হাইড্রোপনিক পদ্ধতির মাধ্যমে সবজি ও ফল উৎপাদন করা হচ্ছে। বাংলাদেশও এ পদ্ধতি ব্যবহারে ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।
 

বাংলাদেশে হাইড্রোপনিক ফার্মিংয়ের প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে দিন দিন আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। পক্ষান্তরে বর্ধিত মুখের চাহিদা পূরণ করতে প্রয়োজন হচ্ছে অতিরিক্ত খাদ্য। হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে মাটি ছাড়া ভিন্ন মাধ্যমে ফসল উৎপাদন করে সে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। এ পদ্ধতিতে একদিকে যেমন অনুর্বর এবং উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকার জায়গা ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ফসল উৎপাদন করা যাবে তেমনি শহরেও বদ্ধ জায়গায় উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন করে লাভবান হওয়া সম্ভব হবে। হাইড্রোপনিক পদ্ধতি পরিবেশবান্ধব এবং এ চাষে কীটপতঙ্গের আক্রমণ কম বিধায় ফসলে কোনো পেস্টিসাইড প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না। ফলে উৎপাদিত ফসলে কোনো বিষাক্ত প্রভাব থাকে না। এ পদ্ধতিকে অবশ্য বাংলাদেশের জন্য একেবারে নতুন বলা যাবে না। এ দেশে কৃষক পর্যায়ে মনের অজান্তে অনেক আগ থেকেই কিছু হাইড্রোপনিক কালচার হয়ে আসছে। বর্তমানে সেখানে প্রযুক্তির ব্যবহার হয়ে আরও উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের যেসব অঞ্চলে দীর্ঘদিন পানি জমে থাকে সেখানে ভাসমান জৈব বেডে এ পদ্ধতিতে সীমিত পরিসরে ফসল উৎপাদিত হয়ে আসছে। এ প্রাকৃতিক হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতেও অব্যবহৃত সম্পদ ব্যবহার করে সারা বছর ফসল চাষ করার সুযোগ রয়েছে। এসব প্রচলিত পদ্ধতির উন্নয়নের জন্যও আধুনিক হাইড্রোপনিক পদ্ধতি সম্পর্কে জানার আবশ্যকতা রয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে ভাসমান চাষ পদ্ধতি বর্তমান প্রযুক্তি নির্ভর হাইড্রোপনিক পদ্ধতি থেকে অবশ্যই আলাদা। আমরা হাইড্রোপনিক কালচার বা ফার্মিং বলতে আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর হাইড্রোপনিক ফসল চাষ ব্যবস্থাপনাকেই বুঝাতে চাচ্ছি। এ পদ্ধতির প্রসারে বাংলাদেশ নিবিষ্টভাবে কাজ করছে এবং দ্রুতগতিতে সফলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

 

বাংলাদেশে হাইড্রোপনিক কৃষির ইতিহাস
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে ভাসমান বেডে যে সবজি আবাদ হয়ে আসছে তা হাইড্রোপনিক পদ্ধতিরই একটি সাধারণ রূপ বলা যেতে পারে। আমাদের শহরাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে লতানো গাছ বোতলে পানির মধ্যে রেখে বারান্দায় গ্রিলে উঠিয়ে দেয়ার যে রীতি তাও হাইড্রোপনিক ব্যবস্থাপনারই মূলমন্ত্র। অনেক সময় পাতাবাহার জাতীয় গাছের ডাল কেটে বোতলের পানিতে রেখে মূল গজিয়ে তারপর মাটিতে লাগানো হতো সেটাও একই ধারণা প্রসূত। বর্তমানে এ পুরনো ধারণার সাথে যোগ হয়েছে পানিতে গাছের খাদ্য উপাদান মিশিয়ে এবং পরিবেশের অন্যান্য প্রভাবগুলো নিয়ন্ত্রণ করে বাণিজ্যিকভাবে ফসল উৎপাদন সম্পর্কিত ব্যবস্থাপনা। পৃথিবীর অন্যান্য দেশ অনেক আগে থেকেই আধুনিক হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে ফসল চাষ শুরু করে। বাংলাদেশ হাইড্রোপনিক পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা শুরু করে মাত্র কয়েক বছর আগে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা ১৯৯৮ সালে প্রথম এ পদ্ধতি নিয়ে চিন্তা ভাবনা শুরু করেন। বিষয়টি সম্পর্কে সম্যক ধারণা, সার্বিক পর্যালোচনা এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করতে লেগে যায় ২০০৫ সাল পর্যন্ত। অতপর ২০০৬ সালে এসে শুরু হয় হাইড্রোপনিক কালচারের ওপর প্রকৃত গবেষণা। বছরান্তে ২০০৭ সালে বাংলাদেশের জলবায়ুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হাইড্রোপনিক পদ্ধতির গবেষণা শুরু হয় টমেটো, ক্যাপসিকাম, লেটুস ও স্ট্রবেরি নিয়ে। আরও এক বছর পরে ২০০৮ সালে তার সাথে যোগ হয় ক্ষিরা, শসা, গাঁদা ফুল ও বেগুন। এভাবে ২০০৯ সালে বামন শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রোকলি এবং চন্দ্রমল্লিকাকেও গবেষণার তালিকায় আনা হয়। অতঃপর ২০১১-১২ অর্থবছরে এ প্রতিষ্ঠান হাইড্রোপনিক কালচার পদ্ধতিতে বারোটি অর্থনৈতিক ফসল উৎপন্ন করতে সক্ষম হয় যা বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ষোলোতে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন আঞ্চলিক কেন্দ্রেও এগিয়ে চলেছে হাইড্রোপনিক কালচারের জন্য গবেষণা। গবেষণা শুরু করেছে বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়। গবেষণার পাশাপাশি হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে ফসল চাষ সম্প্রসারণ কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এগিয়ে আসছেন আগ্রহী কৃষকগণ।

 

বাংলাদেশে বর্তমান হাইড্রোপনিক চাষের অবস্থা
বাংলাদেশে হাইড্রোপনিক কালচারের গবেষণা অনেকটা এগিয়ে গেছে। হাইড্রোপনিক ফার্মিং ব্যবস্থাপনাও এগিয়ে যাচ্ছে। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এ পদ্ধতির প্রয়োগ নিয়ে কাজ করছে। হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে স্বাভাবিক চাষের তুলনায় দুই থেকে তিনগুণ ফলন বেশি পাওয়া যায়। সেজন্য এ চাষ পদ্ধতির সুবিধার দিকগুলো বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদনে বেশ কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছে। বারির পটুয়াখালী উপকেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে সারা বছর তরমুজ উৎপাদনের প্রযুক্তি কৃষক পর্যায়ে প্রদান করেছেন। বারির হাইড্রোপনিক প্রযুক্তি বিএআরসি ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সরবরাহ করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে ফসল চাষের জন্য ঢাকার মহাখালীতে শহর পর্যায়ে প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়ে অনেক সম্প্রসারণ কর্মীকেও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ^বিদ্যালয় এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ে এ চাষ ব্যবস্থাপনার ওপর গবেষণা বেশ এগিয়ে গেছে। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও কাজ চলমান আছে।  

 

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ একুয়াপনিক কালচার পদ্ধতির ওপর গবেষণা করছে। এ পদ্ধতিতে পানির ট্যাংকে পিলেট খাদ্য দিয়ে মাছ চাষ করা হচ্ছে। পানির ওপর ককশিট দিয়ে সবজির চাষ চলছে। আলাদা জায়গায় চারা তৈরি করে সারা বছর এ পদ্ধতিতে সবজি চাষ করা যাচ্ছে। একই সাথে পানিতে মাছের পোনা মজুদ করা হয়। শীতকালে টমেটো, লেটুস, পুদিনা এবং গ্রীষ্মকালে ঢেঁড়স, পুঁইশাক ও কলমি চাষ করা যায়। শীত কালে গিফট তেলাপিয়া ও মনোসেক্স তেলাপিয়া এবং গ্রীষ্মকালে এর সাথে থাই কই, ভিয়েতনামি কই, সরপুঁটি ও লাল তেলাপিয়া চাষ করা যাচ্ছে। আশা করা যায় এ পদ্ধতি কৃষকদের মাঝে জনপ্রিয়তা পাবে।
 

বাংলাদেশের হাইড্রোপনিক ফসল
হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে বাংলাদেশে জন্মানো যাবে পাতা জাতীয় সবজির মধ্যে লেটুস, গিমাকলমি, বিলাতি ধনিয়া ও বাঁধাকপি এসব। ফল জাতীয় সবজির মধ্যে টমেটো, বেগুন, ফুলকপি, শসা, ক্ষিরা, ক্যাপসিকাম, মেলন ও স্কোয়াস উল্লেখযোগ্য। ফলের মধ্যে আছে স্ট্রবেরি এবং ফুলের মধ্যে উৎপাদন করা যাবে অ্যানথরিয়াম, গাঁদা, গোলাপ, অর্কিড ও চন্দ্রমল্লিকা। ভবিষ্যতে যোগ হতে পারে তালিকায় আরও অনেক নতুন ফসলের নাম। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ এ পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে ট্রে, প্লাস্টিক বালতি, পানির বোতল ও মাটির পাতিল ব্যবহার করে বাড়ির ছাদ, বারান্দা এবং খোলা জায়গায় সবজি উৎপাদন করতে পারবেন। গ্রিন হাউস, প্লাস্টিক হাউস, ফিনাইল হাউসে এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা যায়।

 

হাইড্রোপনিক ফার্মিং পদ্ধতি
হাইড্রোপনিক ফার্মিং কেবল চারা উৎপাদনের সময় ছাড়া কোনো উৎপাদন মিডিয়া ব্যবহার করার দরকার হবেনা। এ পদ্ধতিতে পটে পাথর নুড়ি বা স্পঞ্জ দিয়ে পূর্ণ করে তাতে শুধু চারা উৎপাদন করা হয়। পরবর্তিতে নিউট্রিয়েন্ট দ্রবণে এ চারা রোপণ করে ফসল চাষ করা সম্ভব হবে। দ্বিতীয়ত, মিডিয়া পদ্ধতিতে হাইড্রোপনিক ফার্মিং করতে গাছের চারা দ্রবণে রোপণ না করে মাটি ছাড়া অন্য কোনো মাধ্যমে রোপণ করে সেখানে নিউট্রিয়েন্ট দ্রবণ প্রয়োগ করতে হবে। মাধ্যম হিসেবে অজৈব ও জৈব উভয় প্রকার মাধ্যমই ব্যবহার করা যাবে। বালি কণা, গ্রাভেল, বা কৃত্রিম কাদা অজৈব মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হয়। এক্ষেত্রে তিন মিলিমিটার ব্যাসার্ধের চেয়ে কম আকারের বালি কণা ব্যবহৃত হয়। গ্রাভেল কালচারে নির্দিষ্ট সময় পরপর নিউট্রিয়েন্ট সরবরাহ করা হয়। কৃত্রিম কাদাতে সাধারণত শোভাবর্ধনকারী গাছ লাগানো হয়। জৈব উপাদানের মধ্যে কাঠের গুড়া এবং ধানের তুষ বা তার ছাই ব্যবহার করা হয়। এতেও ড্রিপিং পদ্ধতিতে নিউট্রিয়েন্ট সরবরাহ করতে হবে। তৃতীয়ত, এরোপনিক্স পদ্ধতিতে সার্বক্ষণিক অথবা সময় সময় ফসলের মূলে নিউট্রিয়েন্ট স্প্রে করা লাগে। এখানেও কোনো উৎপাদন মিডিয়া ব্যবহার করা হয়না বলেই একেও হাইড্রোপনিক কালচার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ বিষয়গুলো সম্পর্কে জেনে শুনেই আগ্রহী কৃষকদের কাজ শুরু করতে হবে। প্রযুক্তিকে সামর্থের সাথে মিলিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আগ্রহীদের সহায়তার জন্য সরকারি পর্যায়েও প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা দেয়ার ব্যবস্থা গড়ে উঠতে হবে।

 

হাইড্রোপনিক দ্রবণ সংগ্রহ
সব ধরনের হাইড্রোপনিক ফার্মিংয়ের ক্ষেত্রে নিউট্রিয়েন্ট দ্রবণ গুরুত্বপূর্ণ বিধায় এখন বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি কোম্পানি প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে হাইড্রোপনিক কালচারের জন্য উৎপাদিত নিউট্রিয়েন্ট সরবরাহ করছে। হাইড্রোপনিক সার তরল আকারে বা পাউডার আকারে থাকে যাকে দ্রবীভূত করে প্রয়োগ করতে হয়। মাটিতে যে সব অর্গানিক উপাদান ব্যবহার করা হয় সেগুলোর সাথে মাটির বিভিন্ন বিক্রিয়ায় উৎপন্ন উপাদানের কথা বিবেচনা করে এ নিউট্রিয়েন্ট তৈরি করা  হয়ে  থাকে। হাইড্রোপনিক বাগানে যদিও গাছ পানিতে জন্মায় তবুও মূল আটকানোর জন্য মাধ্যম প্রয়োজন হয়। মাধ্যম হিসেবে পারলাইট, নারিকেলের ছোবড়া, রকউল এমনকি বালিও ব্যবহার করা যেতে পারে। যাই ব্যবহার করা হোক না কেন তাতে মৃত্তিকা বাহিত রোগের হাত থেকে গাছ রক্ষা পায়। অন্যান্য দেশে অনেকেই হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে ফুলের বাগান করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। এ পদ্ধতিই এখন চিরাচরিত মাটিতে ফুল বাগানের বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রকৃত পক্ষে হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে ফুল বাগান করার বেশ কিছু সুবিধা আছে।

 

পদ্ধতি সম্প্রসারণে উদ্যোগ
সরকারের পক্ষ থেকে হাইড্রোপনিক চাষ মানুষকে উৎসাহিত করার জন্য প্রচেষ্টা চলছে। পাশাপাশি কিছু এনজিও এ প্রযুক্তি সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য এগিয়ে এসেছে। ব্র্যাক ভূমিহীন কৃষকদের হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে চাষের কৌশল শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। গত ২০১২ সালে এ প্রতিষ্ঠান চাঁদপুর, নেত্রকোনা ও মানিকগঞ্জের ১০০ ভূমিহীন কৃষককে প্রশিক্ষণ দেয়। এসব কৃষককে হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে চাষ করার জন্য দশটি করে বাকেট এবং নিউট্রিয়েন্ট সলুশন সরবরাহ করা হয়। তাদের এ উদ্যোগ অব্যাহত আছে। গ্রিন লিফ এগ্রো মহাখালিতে এর সেল সেন্টারে হাইড্রোপনিক ফার্মিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় নিউট্রিয়েন্ট সলুশন বিক্রি করে থাকে। আলফা এগ্রো প্রান্তিকও এ পদ্ধতিতে চাষের কাজ শুরু করেছে। হাইড্রোপনিক কালচার প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ারও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিভিন্ন মিডিয়াতে এর ব্যাপক প্রচার শুরু হয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে বহুতল বিশিষ্ট হাইড্রোপনিক ফার্ম করার পরিকল্পনাও এগিয়ে চলেছে। এখনও এ ধরণের ফার্মিং ব্যবস্থাপনা গড়ে না উঠলেও শিগগিরই গড়ে উঠবে বলে আশা করা যায়। তাহলেই কৃষি আর শুধু মাঠে সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং সম্প্রসারিত হবে নিয়ন্ত্রিত বহুতল বিশিষ্ট হাইড্রোপনিক খামারে। বাংলাদেশের কৃষি পরিগণিত হবে ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে।

 

সুপারিশ
হাইড্রোপনিক পদ্ধতির গবেষণার পাশাপাশি প্রযুক্তি বিস্তারে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রযুক্তি বিস্তারের জন্য যথেষ্ট প্রচারের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সমবায়ের ভিত্তিতে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। ভূমিহীন কৃষকদের এ সংক্রান্তে প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে। তাদের এ চাষ পদ্ধতি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। মানুষ যদি বুঝতে পারে তারা এ পদ্ধতি ব্যবহার করে লাভবান হবে তাহলে অবশ্যই গ্রহণ করবে। সকল পর্যায়ে হাইড্রোপনিক চাষ ও খামার গড়ে তোলার জন্য স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যারা আগ্রহী হবেন তাদের সহায়তা করার জন্য সরকারের কৃষি অধিদপ্তরকে সার্বক্ষণিক তৎপর থাকতে হবে। বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় রেখে গৃহিত পরিকল্পনা অনুসারে এগিয়ে গেলে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ সফল হবে।

 

জলবায়ু পরিবর্তন জনিত পরিস্থিতিতিতে হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে সবজি চাষ বাংলাদেশে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। এ পদ্ধতিতে বাড়ির ছাদে, আঙিনায়, বারান্দায়, পলিটানেল ও নেট হাউস কিংবা চাষের অযোগ্য পতিত জমিতে সহজেই চাষাবাদ করা সম্ভব হবে। বাড়ির আঙিনায় নানা ফুলের চাষ করা যাবে। এতে করে একদিকে যেমন পতিত জমি বা অব্যবহৃত জায়গার সফল ব্যবহার হবে, অন্য দিকে দেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক লাভবান হবে। সেদিন আর হয়ত দূরে নয় যখন বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে মাটি ছাড়া হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে শাক সবজি, ফল ও ফুলের চাষ হবে। আমাদের বিশ^াস আগামী দিনে হাইড্রোপনিক ফার্মিং পাল্টে দিবে বাংলাদেশের সামগ্রিক কৃষি তথা দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা। আমরা সেদিনের প্রত্যাশায় থাকলাম।

ড. পিয়ার মোহাম্মদ*

*পরিচালক (অর্থ), বাংলাদেশ টেলিভিশন, রামপুরা, ঢাকা

ভুট্টা ফসলে ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ ও ব্যবস্থাপনা

ভুট্টা সারা বছর চাষযোগ্য বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী দানাজাতীয় ফসল। ধান ও গমের তুলনায় ভুট্টার পুষ্টিমান বেশি। এতে প্রায় ১১% আমিষজাতীয় উপাদান রয়েছে। উন্নত পুষ্টিমান ও বহুবিধ ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশে ভুট্টার আবাদ দিন দিন বেড়ে চলেছে। ভুট্টার দানা মানুষের খাদ্য হিসেবে, গাছ ও সবুজ পাতা গোখাদ্য হিসেবে এবং হাঁস-মুরগি ও মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে ২০১৬-১৭ সালে ভুট্টার আওতায় জমির পরিমাণ ৩৮৯৭০০ হেক্টর এবং উৎপাদন ৩০২৬০০০ মেট্রিক টন। ভুট্টার গড় ফলন আশানুরূপ নয়। ফলন কম হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে বিভিন্ন প্রকার ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ। এসব ক্ষতিকর পোকা ভুট্টা উৎপাদনে প্রভাব বিস্তার করে এবং এদের আক্রমণে ফসলের উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্ট হয়ে যায়। এ ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তন এবং অন্যান্য কারণে বাংলাদেশে ভুট্টা ফসলে নতুন নতুন পোকার আক্রমণ দেখা যাচ্ছে। এমতাবস্থায় ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ হতে ফসল রক্ষার জন্য এদের আক্রমণের ধরন এবং ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা অত্যন্ত জরুরি। নি¤েœ ভুট্টা ফসলের প্রধান প্রধান ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ এবং ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
কাটুই পোকা (ঈঁঃড়িৎস, অমৎড়ঃরংরঢ়ংরষড়হ)
পোকার লার্ভা মাটি সংলগ্ন চারা গাছের গোড়া কেটে দেয়। একটি লার্ভা একাধিক গাছের গোড়া কেটে দিতে পারে। লার্ভাগুলো দিনের বেলায় মাটির ফাটলে, ঢেলা ও আবর্জনায় লুকিয়ে থাকে এবং রাতের বেলায় ক্ষতিসাধন করে। অতিরিক্ত আক্রমণে জমিতে গাছের সংখ্যা কমে যায় এবং ফলন কম হয়। পূর্ণতাপ্রাপ্ত লার্ভা ৪০-৫০ মিমি লম্বা, কালচে বাদামি বা মেটে বর্ণের।
ব্যবস্থাপনা
*জমি চাষের সময় পোকার লার্ভা এবং পিউপা সংগ্রহ করে মেরে ফেলতে হবে।
*কাটা চারার নিকটে লার্ভাগুলো লুকিয়ে থাকে। এ জন্য সকাল বেলা হাত দ্বারা আশপাশের মাটি খুঁড়ে লার্ভা সংগ্রহ করে মেরে ফেলতে হবে।
*ক্ষেতে সেচ দেওয়া হলে লার্ভাগুলো বের হয়ে আসে। এ সময় কাঠি পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করতে হবে।
*অত্যাধিক আক্রমণে নিম্নলিখিত কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে-
ক্লোরপাইরিফস (ডারসবান ২০ ইসি বা পাইরিফস ২০ ইসি বা ক্লাসিক ২০ ইসি বা অন্য নামের) প্রতিলিটার পানিতে ৫ মিলি অথবা নাইট্রো ৫৫ ইসি (ঈযষড়ৎঢ়ুৎরভড়ং+ঈুঢ়বৎসবঃযৎরহ) প্রতিলিটার পানিতে ২ মিলি অথবা বীজবপনের সময় প্রতি হেক্টরে ২০ কেজি কার্বোফুরান (ফুরাডান ৫জি, ব্রিফার ৫জি বা অন্য নামের) প্রয়োগ করতে হবে।
জাব পোকা (অঢ়যরফং, জড়ঢ়ধষড়ংরঢ়যঁসসধরফরং)
পূর্ণ বয়স্ক পোকা ও নিম্ফ উভয়েই গাছের পাতা, নতুন ডগা, টাসেল ও কচি মোচার সবুজ অংশ থেকে রস চুষে খায়। এরা মধু রস নিঃসৃতকের ফলে আক্রান্ত অংশে শুটিমোল্ড জন্মায় এবং কাল রঙ ধারণ করে। টাসেলে মধু রস জন্মালে পরাগায়নে বিঘœ ঘটে ফলে মোচায় সঠিকভাবে দানা তৈরি হয় না। অতিরিক্ত আত্রমণে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং ফলন কমে যেতে পারে। এরা ভাইরাস রোগের বাহক হিসেবে কাজ করে।
ব্যবস্থাপনা
*পূর্ণ বয়স্ক পোকা ও নিম্ফ প্রাথমিক অবস্থায় ডগা এবং পাতায় দলবদ্ধভাবে অবস্থান করে। এই অবস্থায় এদেরকে হাত দিয়ে পিষে মেরে ফেলতে হবে।
*বিভিন্ন বন্ধু পোকা যেমন লেডি বিটল, সিরফিডফ্লাই এবং জবফ ঝড়ষফরবৎ নববঃষব  জাবপোকা খায়। এ সমস্ত বন্ধু পোকা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
*অত্যধিক আক্রমণে ম্যালাথিয়ন (ফাইফানন ৫৭ ইসি, সাইফানন৫৭ ইসি, ম্যালাটন৫৭ ইসি, ম্যালাটাফ৫৭ ইসি, সুমাডি৫৭ ইসি বা অন্য নামের) প্রতিলিটার পানিতে ১ মিলি কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে।
মাজরা পোকা (ঝঃবস নড়ৎবৎ, ঈযরষড়ঢ়ধৎঃবষষঁং)
লার্ভা কচি কাÐ ছিদ্র করে ভিতরে ঢুকে এবং ডিগ পাতার গোড়া কেটে দেয়। ফলে গাছের বিবর্ণ ডগা (উবধফ যবধৎঃ) লক্ষণ প্রকাশ পায়। আক্রান্ত ডগা শুকিয়ে যায় এবং টান দিলে উঠে আসে। এরা বড় গাছে আক্রমণ করে কাÐে ছিদ্র করে ভেতরের অংশ খায় । ফলে অল্প বাতাসে বড় গাছ ভেঙে পড়ে এরা মধ্যস্থ পাতা ছিদ্র টাসেল আক্রমণ করে, টাসেল কেটে দেয়  (চিত্র-১) ফলে পরাগায়ন ব্যাহত হয়। মোচা ধরার পর এরা মোচায় আক্রমণ করে দানা নষ্ট করে ফেলে। এরা রাতের বেলায় কার্যক্ষম। পূর্ণতাপ্রাপ্ত লার্ভা ২০-২৫ মিমি লম্বা, গায়ে রঙ্গিন ডোরাসহ অনেক ফোটা যুক্ত দাগ দেখা যায়। এরা পূর্ণাঙ্গ লার্ভা হিসাবে ভুট্টার সংগ্রহ পরবর্তী গাছ, ডালপালা ও অসংগ্রহকৃত দানায় অবস্থান করে এবং পরবর্তী মৌসুমে পুনরায় আক্রমণ করে।
ব্যবস্থাপনা
*ফসল সংগ্রহের পর অবশিষ্ট অংশ নষ্ট করে ফেলতে হবে কারণ পোকার লার্ভা এদের মধ্যে অবস্থান করে।
*ডিমের গাদা সংগ্রহ করে নষ্ট করতে হবে।
*অত্যধিক আক্রান্ত এলাকায় বীজবপনের সময় হেক্টরপ্রতি ২০ কেজি কার্বোফুরান (ফুরাডান ৫জি, ব্রিফার ৫জি বা অন্য নামের) প্রয়োগ করতে হবে।
*আক্রান্ত গাছ হতে লার্ভা সংগ্রহ করে নষ্ট করে ফেলতে হবে।
*ভুট্টা গাছের উপর থেকে হেক্টরপ্রতি ২০ কেজি কার্বোফুরান (ফুরাডান ৫জি, ব্রিফার ৫জি বা অন্য নামের) এমনভাবে প্রয়োগ করতে হবে যেন কীটনাশকের দানাগুলো পাতার ভেতরে আটকে যায় (ডযড়ৎষ অঢ়ঢ়ষরপধঃরড়হ)।
*অত্যধিক আক্রমণে ডায়াজিনন (সেবিয়ন ৬০ ইসি, হেজিনন৬০ ইসি, ডায়াজল৬০ ইসি, ডায়াজন৬০ ইসি, ডায়াজিনন৬০ ইসি বা অন্য নামের) অথবা কার্বোসালফান (মার্শাল ২০ ইসি, সানসালফান ২০ ইসি, জেনারেল ২০ ইসি বা অন্য নামের) প্রতিলিটার পানিতে ২ মিলি কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে-
গোলাপীমাজরা পোকা (চরহশ নড়ৎবৎ, ঝবংধসরধরহভবৎবহং)
সদ্য জাত লার্ভা কচি কাÐ ছিদ্র করে ভেতরের নরম অংশ খায় ফলে মধ্য ডগা বা মাইজ মরে যায়। লার্ভা গোলাপী রঙের এর মাথা কালচে কমলা বর্ণের হয়। আক্রান্ত ডগা হাত দিয়ে টান দিলে উপরে উঠে আসে। এরা মধ্যস্থ পাতা ছিদ্র করে টাসেলে আক্রমণ করে, টাসেল কেটে দেয় (চিত্র-২) ফলে পরাগায়ন ব্যাহত হয়।
ব্যবস্থাপনা
*আলোর ফাঁদ ব্যবহার করতে হবে।
*আক্রান্তগাছ হতে লার্ভা সংগ্রহ করে নষ্ট করে ফেলতে হবে।  
অত্যধিক আক্রান্ত এলাকায় বীজবপনের সময় হেক্টরপ্রতি ২০ কেজি কার্বোফুরান (ফুরাডান ৫জি, ব্রিফার ৫জি বা অন্য নামের) প্রয়োগ করতে হবে।
অতিরিক্ত আক্রমণে ডায়াজিনন (সেবিয়ন ৬০ ইসি, হেজিনন৬০ ইসি, ডায়াজল৬০ ইসি, ডায়াজন ৬০ ইসি, ডায়াজিনন৬০ ইসি বা অন্য নামের)   অথবা কার্বোসালফান (মার্শাল ২০ ইসি, সানসালফান ২০ ইসি, জেনারেল ২০ ইসি বা অন্য নামের) প্রতিলিটার পানিতে ২ মিলি কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে।
আর্মিওয়ার্ম (অৎসুড়িৎস, গুঃযরসহধংবঢ়ধঃধঃধ)
পোকার লার্ভা গাছের মধ্যস্থ ভেতরের নরম পাতায় আক্রমণ করে খায়। এরা পাতার কিনারা দিয়ে খাওয়া শুরু করে। পরবর্তীতে লার্ভাগুলো বয়স্ক পাতায় আক্রমণ করে। অতিরিক্ত আক্রমণে গাছ পাতাবিহীন হয়ে যেতে পারে। আক্রান্ত গাছে পোকার মল দেখা যায়। লার্ভাগুলো গাছের টাসেল এবং মোচায়ও আক্রমণ করে। পূর্ণতাপ্রাপ্ত লার্ভামাটির ভেতরে চেম্বার তৈরি করে পিউপা ধাপ সম্পন্ন করে।
ব্যবস্থাপনা
*আক্রান্ত গাছ থেকে লার্ভাগুলো হাত দ্বারা সংগ্রহ করে নষ্ট করে ফেলতে হবে।
*জমি চাষের সময় মাটিতে অবস্থানরত পোকার পিউপা সংগ্রহ করে নষ্ট করে ফেলতে হবে।  
অত্যাধিক আক্রমণে স্পেনোসেড (ট্রেসার ৪৫ এসসি @, ০.৪মিলি/লিটার বা সাকসেস ২.৫ এসসি@ ১.৩ মিলি/লিটার) বা এমামেকটিন বেনজোয়েট (প্রোক্লেম ৫ এসজি, সাহাম৫ এসজি, হেক্লেম৫ এসজি বা অন্য নামের) @১ গ্রাম/লিটার) কীটনাশক প্রয়োগ করা যেতে পারে-
ফল আর্মিওয়ার্ম (ঋধষষ অৎসুড়িৎস, ঝঢ়ড়ফড়ঢ়ঃবৎধভৎঁমরঢ়বৎফধ)
এটি ভুট্টা ফসলের একটি নতুন বিধ্বংসী পোকা। বাংলাদেশে ২০১৮ সালে সর্বপ্রথম পোকাটির আক্রমণ পরিলক্ষিত হয়। এটি একটি সর্বভুক পোকা, এরা ২৬টি পরিবারের ৮০টি ফসলে আক্রমণ করে থাকে, যার মধ্যে ভুট্টা সর্বাধিক আক্রান্ত ফসল।
এরা ভুট্টা গাছে সকল ধাপে (চারা, অঙ্গজ বৃদ্ধি, টাসেল ও মোচায় দানা তৈরি পর্যায়) আক্রমণ করে থাকে। সদ্যজাত লার্ভা পাতায় ছোট ছিদ্র করে এবং শুধুমাত্র পাতার উপরের সবুজ অংশ খায় । পরবর্তীতে এরা ব্যাপকভাবে পাতা খেয়ে ফেলে। ফলে পাতায় বড় বড় ছিদ্র দেখা যায় । লার্ভাগুলো রাতের বেলায় বেশি ক্ষতি করে। অতিরিক্ত আক্রমণে মাঠের প্রায় সম্পূর্ণ গাছ ঝাঝরা হয়ে যায়। লার্ভাগুলো গাছের খোলের (চিত্র-৩) ভেতরে অবস্থান করে কীটনাশক ও প্রাকৃতিক শত্রæ হতে নিজেদের রক্ষা করে। এরা গাছে মল ত্যাগ করে, যা পরবর্তীতে শুকিয়ে করাতের গুঁড়ার মতো দেখায়। এরা মধ্যস্থ পাতা ছিদ্র করে টাসেলে আক্রমণ করে, টাসেল কেটে দেয় ফলে পরাগায়ন ব্যাহত হয়। মোচা হওয়ার পরে এরা মোচা ও কাÐের সংযোগস্থল ছিদ্র করে মোচার ভেতরে ঢুকে এবং ভেতরের নরম দানা খেয়ে ফেলে ।
ব্যবস্থাপনা
*জমি চাষের সময় মাটিতে অবস্থানরত পোকার পিউপা সংগ্রহ করে নষ্ট করে ফেলতে হবে।  
*ডিমের গাদা এবং ডিম থেকে  সদ্য বের হওয়া লার্ভা (যা একত্রে পাতায় অবস্থান করে) হাত দিয়ে নষ্ট করে ফেলতে হবে।
*বপনের পূর্বে বীজ শোধন করে জমিতে লাগাতে হবে (ঈৎঁরংবৎ ৭০ ডঝ@৪ গ্রাম/কেজি বীজ।
*আক্রান্ত গাছ থেকে লার্ভা সংগ্রহ করে মেরে ফেলতে হবে।
*পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ পোকা ধরার জন্য সেক্স ফেরোমন ফাঁদ অত্যন্ত কার্যকরী। ভুট্টা বীজ লাগানোর পর পরই আক্রান্ত এলাকায় ২০-২৫ মিটার দূরে দূরে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ লাগাতে হবে।
*জমিতে উপকারী পোকা ব্রাকন হেবিটর অবমুক্ত করতে হবে। এক হেক্টর জমির জন্য প্রতি সপ্তাহে ১ বাংকার ব্রাকন (৮০০-১০০০টি পোকা) অবমুক্ত করতে হবে।
*আক্রান্ত এলাকায় জৈব বালাইনাশক এসএনপিভি (ঝঘচঠ) @ ০.২ মিলি/লিটার প্রয়োগ করতে হবে।
*পোকাটি অতিদ্রæত কীটনাশক প্রতিরোদ্বিতা গড়ে তুলতে পারে। এ জন্য অধিক আক্রান্ত এলাকায় একান্ত প্রয়োজনে সঠিক নিয়মে স্পেনোসেড (ট্রেসার ৪৫ এসসি @, ০.৪মিলি/লিটার বা সাকসেস ২.৫ এসসি@ ১.৩ মিলি/লিটার) বা এমামেকটিন বেনজোয়েট (প্রোক্লেম ৫ এসজি, সাহাম৫ এসজি, হেক্লেম৫ এসজি বা অন্য নামের @১ গ্রাম/লিটার) বা ঞযরধসবঃযড়ীধস +ঈযষড়ৎধহষৎধহরষরঢ়ৎড়ষব (ভিরতাকো ৪০ ডবিøওজি@০.৬ গ্রাম/লিটার) কীটনাশক প্রয়োগ করা যেতে পারে।
মোচা ছিদ্রকারী পোকা (ঈড়ৎহ বধৎড়িৎস, ঐবষরপড়াবৎঢ়ধধৎসরমবৎধ)
এরা গাছের নরম পাতা ও মোচায় আক্রমণ করে। পোকার লার্ভা গাছের পাতা ছিদ্র করে খায় ফলে পাতায় গোলাকার দাগ দেখা যায়। গাছে মোচা ধরার পর এরা মোচায় আক্রমণ করে সাধারণত মোচার উপরের অংশে এদের দেখা যায়। এরা সিল্ক কেটে মোচা থেকে আলাদা করে (চিত্র-৪) ফলে পরাগায়ন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। মোচায় দানা তৈরি পর্যায়ে এরা নরম দানা খেয়ে ফেলে ফলে ভুট্টার ফলন ব্যাপকভাবে কমে যায়। ফসলের প্রকারভেদে লার্ভার গায়ের রঙ সবুজ, গোলাপী, কমলা, হালকা বাদামি বা কালচে ধূসর রঙের হতে পারে।  
ব্যবস্থাপনা
*জমি উত্তমরূপে চাষ করতে হবে এবং চাষকৃত জমি হতে পোকার পিউপা সংগ্রহ করে নষ্ট করতে হবে।
*জমিতে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ প্রয়োগ করে পুরুষ পোকা ধরার ব্যবস্থা করতে হবে।
* আক্রমণের শুরুতে জেব বালাইনাশক এইচএনপিভি (ঐঘচঠ) প্রতিলিটার পানিতে ০.২ গ্রাম হারে প্রয়োগ করা যেতে পারে।
*অতিরিক্ত আক্রমণে স্পোনোসেড (ট্রেসার ৪৫ এসসি ০.৪ মিলি/লিটার বা সাকসেস ২.৫ এসসি @ ১.৩ মিলি/লিটার) অথবা ঞযরধসবঃযড়ীধস +ঈযষড়ৎধহষৎধহরষরঢ়ৎড়ষব (ভলিয়ামফ্লাক্সি ৩০০ এসসি) @ ০.৫মিলি/লিটার অথবা এমামেকটিন বেনজোয়েট (প্রোক্লেম ৫ এসজি, সাহাম৫ এসজি, হেক্লেম৫ এসজি বা অন্য নামের) @১ গ্রাম/লিটার)। কীটনাশক প্রয়োগ করা যেতে পারে।

ড. মোঃ জুলফিকার হায়দার প্রধান
প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (কীটতত্ত¡), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট সেউজগাড়ী, বগুড়া, মোবা : ০১৭১৬০৭১৭৬৪,  ই-মেইল:  zulfikarhaider@yahoo.com

বিভিন্ন উপাদানের “ইমেজ মুক্তা” উৎপাদন ও চাষ কৌশল

মুক্তা একটি দামি রত্ন। এটি শৌখিনতা এবং আভিজাত্যের প্রতীক। মুক্তার ব্যবহার প্রধানত অলংকার হিসেবে হলেও এর আরও অনেক ব্যবহার রয়েছে, যেমন- মুক্তা চূর্ণ বিভিন্ন ওষুধের দামি কাঁচামাল হিসেবে এবং প্রসাধনসামগ্রী তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। শৌখিন দ্রব্যাদি তৈরিসহ আরও নানা কাজে মুক্তার ব্যবহার রয়েছে। গোলাকার মুক্তার মতো ইমেজ মুক্তাও অলংকার এবং শৌখিন দ্রব্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ইমেজ মুক্তা তৈরিতে স্বল্প সময়ের প্রয়োজন হয় (৭-৮ মাস) এবং তৈরির কৌশলটি সহজ বলে যে কেউ সহজেই তা আয়ত্ব করতে পারে। বাংলাদেশের আবহাওয়া ইমেজ মুক্তা চাষের খুবই অনুকূল। উল্লেখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট “মুক্তা চাষ প্রযুক্তি উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ” প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন উপাদানে তৈরি ইমেজ মুক্তার উপর গবেষণা পরিচালনা করে ব্যপক সফলতা অর্জন করে।


ইমেজ মুক্তা কি?
মুক্তা হচ্ছে জীবন্ত ঝিনুকের দেহের ভিতর জৈবিক প্রক্রিয়ায় তৈরি এক ধরনের রত্ন। এই রত্নটি যখন ছবি বা ইমেজ আকারে তৈরি হয় তখন তাকে ইমেজ মুক্তা বলে। বিভিন্ন ধরনের ছাঁচ বা ইমেজকে ঝিনুকের ম্যান্টল টিস্যুর নিচে প্রতিস্থাপন করা হয়। প্রতিস্থাপিত ইমেজটির চারদিকে ঝিনুকের শরীর থেকে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ (নেকার) নিঃসৃত হয়ে জমা হয় এবং ধীরে ধীরে ইমেজ মুক্তা তৈরি হয়।       
ইমেজ মুক্তার গুরুত্ব : ইমেজ মুক্তা অলংকার হিসেবে ব্যবহার করা যায়;
ডেকরেশন পিস হিসেবে ব্যবহার করা যায়;
ভ্যালু এডেড প্রোডাক্ট (মূল্য সংযোজিত পণ্য) হিসেবে ব্যবহার করা যায়;
স্বল্প সময়ে, স্বল্প পুঁজিতে এবং ক্ষুদ্রাকৃতির জলাশয়ে এ ধরনের মুক্তা চাষ সম্ভব;
মাছের সাথে একত্রে ইমেজ মুক্তা চাষ করে মাছ চাষি বাড়তি আয় করতে পারে;
বেকারত্ব দূরীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন এবং আর্থ সামাজিক উন্নয়নে ইমেজ মুক্তা চাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

বিভিন্ন ধরনের ইমেজ মুক্তা : বিভিন্ন ধরনের উপাদান ইমেজ মুক্তার ইমেজ বা ছাঁচ তৈরিতে ব্যবহার করা যায়, যেমন- মোম, ঝিনুকের খোলস, প্লাস্টিক, স্টিল ইত্যাদি। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুক্তা গবেষণাগারে মোম এবং ঝিনুকের খোলসের তৈরি ইমেজ/ ছাঁচ দিয়ে আকর্ষণীয় ইমেজ মুক্তা উৎপাদন করা হয়েছে। ইমেজ বা ছাঁচ তৈরির সময় লক্ষ্য রাখতে হবে ছাঁচের তলা যেন উত্তল হয় এবং ছাঁচের ডিজাইন যেন স্পষ্ট হয়।


মোমের ইমেজ : মোম দিয়ে ইমেজ তৈরির ক্ষেত্রে প্রথমে একটি মৃত ঝিনুকের পরিষ্কার খোলসের ভেতরের দিক তেল দিয়ে পিচ্ছিল করা হয়। এরপর গলিত মোম ঐ খোলসে ঢেলে মোম জমাট বাঁধার পূর্বে খোলসটি ডানে বামে নেড়ে মোমের একটি পাতলা স্তর তৈরি করা হয়। এরপর একটি সূচের সাহায্যে মোমের স্তরের উপর মৃদুচাপ প্রয়োগ করে পছন্দমাফিক ডিজাইনের ইমেজ তৈরি করা হয়। তৈরিকৃত ইমেজটি এক মিনিট পরিষ্কার পানিতে ডুবিয়ে মোমের খসখসেভাব দূর করা হয়।    

    
খোলসের ইমেজ : খোলসের ইমেজ বা ঝযবষষ ইমেজ তৈরির জন্য প্রথমে কিছু মৃত ঝিনুকের খোলস সংগ্রহ করা হয়। এগুলোকে ভালোভাবে পরিষ্কার করে রোদে শুকিয়ে নেওয়া হয়। এরপর শেলকাটিং মেশিনের সাহায্যে এই খোলসগুলোর বাইরের স্তরটি অর্থাৎ পেরিওস্ট্রাকাম স্তরটি ঘষে পরিষ্কার এবং মসৃণ করা হয়। অতঃপর কাটিং মেশিনের সাহায্যে খোলসটির অবতল অংশ আয়তাকার করে ব্লকাকারে কেটে নেওয়া হয়। এরপর ব্লকটির উপর পেন্সিল দিয়ে নির্দিষ্ট মাপের বিভিন্ন ধরনের ইমেজের চিত্র অঙ্কন করা হয়। অতঃপর মিনি গ্রাইন্ডার মেশিনের সাহায্যে অঙ্কিত ইমেজটি ছাঁচ আকারে কেটে নেওয়া হয়। পরিশেষে একই মেশিনের সাহায্যে ইমেজের ধারগুলো ঘষে মসৃণ করা হয়। এভাবে একটি খোলস ইমেজ বা ঝযবষষ ইমেজ তৈরি করা হয়। যা পরে জীবাণুমুক্ত করে জীবিত ঝিনুকে কাঙ্খিত মুক্তা পাওয়ার জন্য প্রবেশ করানো হয়।    


ইমেজ মুক্তা উৎপাদনকারী ঝিনুক
সকল ঝিনুক মুক্তা উৎপাদন করতে পারে না। বিশেষ কিছু ঝিনুক আছে যেগুলো মুক্তা উৎপাদনে সক্ষম। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক পরিচালিত জরিপে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের স্বাদুপানিতে চার প্রজাতির ঝিনুক রয়েছে যেগুলো মুক্তা উৎপাদনে সক্ষম;
যেমন-

Lamellidens marginalis, L. corrianus,
L. phenchooganjensis, L. jenkinsianus
তন্মধ্যে Lamellidens marginalis এবং খ. L. corrianus ঝিনুকগুলো ইমেজ মুক্তা উৎপাদনে অধিক উপযোগী।
ইমেজ মুক্তা উৎপাদন কৌশল : ইমেজ মুক্তা উৎপাদনের কৌশলকে অপারেশন বলা হয়। নিম্নে ইমেজ মুক্তা উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপগুলো বর্ণনা করা হলো :
প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ঃ ড্রপার বোতল, অপারেশন তাক, ঝিনুক খোলার যন্ত্র, স্ট্যুপল, স্প্যাচুলা, ট্রে, ছিদ্রযুক্ত ট্রে    
প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ঃ ইমেজ (মোমের ও শেল), ৭০% এ্যালকোহল, পটাস, বিশুদ্ধ পানি    
ঝিনুক নির্বাচন ঃ সব আকৃতির ঝিনুক ইমেজ মুক্তা উৎপাদনের জন্য উপযোগী নয়। সাধারণত বড় আকৃতির সুস্থ সবল হলুদাভ ঝিনুক ইমেজ মুক্তা উৎপাদনের জন্য বিশেষ উপযোগী। গোলমুক্তা তৈরির জন্য সাধারণত অল্প বয়স্ক ঝিনুক নির্বাচন করা হয় কারণ এই ঝিনুকগুলোর নেকার নিঃসরণের হার বেশি থাকে। কিন্তু ইমেজ মুক্তা তৈরির জন্য বড় ঝিনুকের প্রয়োজন হয় বলে কিছুটা বয়স্ক ঝিনুক নির্বাচন করতে হয়, কারণ অল্প বয়সের ছোট ঝিনুকে ইমেজ বা ছাঁচের মতো একটা বড় বহিরাগত বস্তু প্রবেশ করালে ঝিনুক তা দেহ থেকে বের করে দেবে।


পুকুরে ঝিনুক ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ
অপারেশনকৃত ঝিনুক পুকুরে ফোল্ডার আকৃতির নেট ব্যাগে মজুদ করা হয়। নেট ফোল্ডার হচ্ছে এক বা একাধিক সারির পকেট বিশিষ্ট ফোল্ডার যা বাঁশ বা লোহার কাঠামো ও জাল দিয়ে তৈরি করা হয়। এই নেট ফোল্ডারগুলো পুকুরে দড়ির সাহায্যে নির্দিষ্ট গভীরতায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। ফোল্ডারের প্রতি পকেটে একটি করে ঝিনুকের অঙ্কীয় দিক ঊর্ধ্বমুখী করে স্থাপন করা হয়। নেট ফোল্ডারে ঝিনুকটির নড়াচড়া করার তেমন সুযোগ না থাকায় ঝিনুকের দেহের ভেতরের ইমেজটি বের হয়ে আসে না।    


পুকুরে ঝিনুক স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ : বাঁশ, দড়ি, ফ্লট (ঋষড়ধঃ)/ভাসা    
 

অপারেশন পূর্ববর্তী পরিচর্যা

প্রকৃতি থেকে ঝিনুক সংগ্রহ করে বাছাই করা হয়। এক্ষেত্রে ঝিনুকগুলো হলুদাভ, সুস্থ-সবল, ক্ষতমুক্ত এবং ৩-৩.৫ বছর বয়সের হতে হবে। বাছাইয়ের পর ঝিনুকগুলো কমপক্ষে একমাস পুকুরের তলদেশে রেখে প্রতিপালন করতে হবে। ঝিনুকগুলো অপারেশন উপযোগী করে তোলার জন্য নিম্নলিখিত মাত্রায় সার, গোবর এবং চুন প্রয়োগ করতে হবে।    
সারণি১ ঃ সার ও চুন প্রয়োগের মাত্রা

 

এক মাস পর লালন পুকুর থেকে গবেষণাগারে এনে ঝিনুকগুলো অপারেশন উপযোগী কিনা তা পরীক্ষা করতে হবে। সুস্থ-সবল ম্যান্টলযুক্ত ঝিনুকগুলো অপারেশনের জন্য নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচিত ঝিনুকগুলো সিস্টার্নের পানিতে ৭ দিন না খাইয়ে রাখতে হবে এবং প্রতিদিন সকালে সিস্টার্নের পানি পরিবর্তন করে নতুন পানি দিতে হবে। এতে করে ঝিনুকের ভেতরের ময়লা এবং পাকস্থলীয় খাবার পরিষ্কার হয়ে বেরিয়ে যাবে। অষ্টম দিন সকালে অপারেশনের কমপক্ষে ২ ঘণ্টা আগে ঝিনুকগুলো সিস্টার্ন থেকে উঠিয়ে গবেষণাগারে এনে ছিদ্রযুক্ত ট্রেতে অঙ্কীয় দিকে নিম্নমুখী করে রাখতে হবে যেন ভেতরে কোনো পানি না থাকে।


অপারেশন পদ্ধতি : অপারেশনের জন্য ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি একটি ট্রেতে ৭০% অ্যালকোহলের সাহায্যে জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে। অপারেশনকারীর হাত পটাশ মিশ্রিত পানি দিয়ে ও মোমের ইমেজগুলো বিশুদ্ধ পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। ট্রে থেকে পর্যায়ক্রমে একটি করে ঝিনুক নিয়ে অপারেশন তাকের উপর স্থাপন করে ঝিনুক খোলার যন্ত্র দিয়ে খোলস দুটি ৮ মি.মি. পরিমাণ খুলে স্ট্যুপল দিয়ে আটকে দিতে হবে। ভেতরে ময়লা থাকলে ড্রপার বোতলের সাহায্যে বিশুদ্ধ পানি দিয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে। পরবর্তীতে সতর্কতার সাথে স্প্যাচুলার সাহায্যে ঝিনুকের একপাশের খোলস থেকে ম্যান্টল পর্দা সামান্য পরিমাণ সরিয়ে ইমেজটি খোলস ও ম্যান্টলের মাঝ বরাবর প্রবেশ করিয়ে খোলসের অবতল অংশে প্রতিস্থাপন করতে হবে। এরপর স্প্যাচুলার সাহায্যে হালকা চাপ দিয়ে ম্যান্টলের ভেতরের বাতাস বের করে ইমেজটি সঠিক ভাবে সন্নিবেশ করতে হবে। অতঃপর সাবধানে স্ট্যুপল খুলে ঝিনুকটি ট্রেতে অঙ্কীয় দিক ঊর্ধ্বমুখী করে রাখতে হবে। অপারেশন শেষে ঝিনুকের খোলসের উপর নির্দিষ্ট সংখ্যা লিখে চিহ্নিত করে দিতে হবে।     

   
অপারেশন পরবর্তী পরিচর্যা : অপারেশনের পর ঝিনুকগুলো সিস্টার্নে প্রথম ৭ দিন খাবার না দিয়ে নেট ফোল্ডারে ঝুলিয়ে রাখতে হবে। প্রতি ফোল্ডারে ৪টি করে ঝিনুক দিতে হবে। পরবর্তী ১৪ দিন বিকাল বেলা পুকুর থেকে প্লাংকটন সংগ্রহ করে সিস্টার্নে দিতে হবে। প্রতিদিন সকালবেলা সিস্টার্নের পানি পরিবর্তন করে দিতে হবে। সিস্টার্নে ২১ দিন পরিচর্যা করার পর অপারেশনকৃত ইমেজগুলো নেট ফোল্ডারসহ পুকুরের পানিতে রশিতে করে ঝুলিয়ে দিতে হবে। ১৫ দিন পর পর ঝিনুকগুলো চেক করতে হবে। ঝিনুকের গায়ে এবং নেট ফোল্ডারে ময়লা থাকলে পরিষ্কার করে দিতে হবে এবং পুকুরে পর্যাপ্ত প্লাংকটন আছে কিনা খেয়াল রাখতে হবে। প্রতি মাসে প্রয়োজনীয় মাত্রায় সার প্রয়োগ করতে হবে।


ইমেজ মুক্তার চাষ ব্যবস্থাপনা : অপারেশনকৃত ঝিনুক থেকে মুক্তা পাওয়ার জন্য ঝিনুকগুলোকে জলাশয়ে চাষ করতে হবে। মুক্তা উৎপাদন ও গুণগত মানের জন্য চাষ ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিম্নে মুক্তার চাষ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করা হলোঃ


পুকুর প্রস্তুতি :  মুক্তা চাষের পুকুরে পর্যাপ্ত সূর্যালোক থাকা বাঞ্ছনীয়। সূর্যালোকের উপস্থিতিতে মুক্তার রং ভালো হয় এবং ঝিনুকের জন্য পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি হয়। পুকুরের আকার ৫০-৮০ শতাংশ বা এর চেয়ে বড় হলে ভালো, তবে এর চেয়ে ছোট পুকুরেও ইমেজ মুক্তা চাষ করা যাবে। পুকুরের গভীরতা ১.৫-২.০ মিটার হলে ভালো। নির্বাচিত পুকুরের পানি সরিয়ে তলদেশ ভালোভাবে রৌদ্রে শুকাতে হবে। এরপর শতকে এক কেজি হারে চুন ভালোভাবে পুকুরের মাটিতে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। পুকুরে ঝিনুকের প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রতি শতকে ১০০ গ্রাম ইউরিয়া, ১২৫ গ্রাম টিএসপি, এবং ৫ কেজি গোবর পানিতে ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে।


প্রাকৃতিক খাদ্য ঃ ঝিনুকের খাদ্য গ্রহণ মূলত পরোক্ষ। ফুলকার মাধ্যমে এরা পানিতে বিদ্যমান এলজি, ক্ষুদ্রাকার ফাইটোপ্লাংকটন, জুপ্লাংকটন, জৈব পদার্থ ইত্যাদি ছেঁকে খায়। তাই পুকুরে যথেষ্ঠ পরিমাণ প্রাকৃতিক খাদ্যের উপস্থিতির জন্য নিয়মমাফিক সার প্রয়োগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তা চাষের জন্য পানির উপযুক্ত রং হলো হলুদাভ সবুজ এবং স্বচ্ছতা ৩০-৩২ সে.মি.। জলাশয়ে ঝিনুকের প্রাকৃতিক খাদ্য প্রস্তুতির জন্য নিম্নক্তো ছক(সারণি-২) অনুযায়ী পাক্ষিক চুন ও সার প্রয়োগ করা উচিত।


ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে সাপ্তাহিক বা পাক্ষিকভাবেও সার প্রয়োগ করা যায়। সূর্যালোকিত দিনে সকালে পানিতে গুলানো সার পুকুরের চারদিকে সমানভাবে ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। বৃষ্টির সময় বা মেঘলা দিনে এবং শীতকালে পানির তাপমাত্রা খুব কমে গেলে সার প্রয়োগ করা উচিত নয়।
 

পুকুরে মাছ মজুদকরণ ঃ একজন মাছচাষি খুব সহজেই মাছের পুকুরে ইমেজ মুক্তা চাষ করে বাড়তি আয় করতে পারে। এক্ষেত্রে, তৃণভোজী মাছ যেমন, গ্রাস কার্প, বিগহেড কার্প, এশিয়ান কার্প ইত্যাদি ইমেজ মুক্তা চাষের পুকুরে চাষ করা যেতে পারে। যে সকল মাছ ঝিনুকের সাথে খাদ্যে প্রতিযোগিতা করবে যেমন-সিলভার কার্প, সেসব মাছ মুক্তা চাষের পুকুরে মজুদ না করাই ভালো। যদি একান্ত করতেই হয় তবে তা অল্প পরিমাণে। এছাড়া মধ্যস্তরে কিংবা নিচের স্তরে যে সব মাছ বিচরণ করে খাবার খায় যেমন- রুই, মৃগেল, কালিবাউস ইত্যাদি মাছও ইমেজ মুক্তার পুকুরে চাষ করা যেতে পারে। কিন্তু মাংসাশী মাছ যেমন- ব্ল্যাক কার্প, ইত্যাদি মুক্তা চাষের পুকুরে চাষ করা যাবে না।


পানি প্রবাহ ঃ পুকুরের পানিতে সামান্য প্রবাহ সৃষ্টি করা গেলে ঝিনুকের বৃদ্ধিসাধনে এবং মুক্তা উৎপাদনে সহায়ক হয়। তাই সম্ভব হলে প্যাডল হুইল বা হোস পাইপ ব্যবহার করে সামান্য প্রবাহের ব্যবস্থা করা যায়। মাসে একবার পুকুরের  কিছু পরিমাণ পানি পরিবর্তন করলে ভালো হয়।


অপারেশনকৃত ঝিনুক মজুদকরণ ঃ ইমেজ প্রতিস্থাপনের ৩-৪ ঘণ্টার মধ্যে অপারেশনকৃত ঝিনুকগুলো অপারেশন পরবর্তী পরিচর্যার জন্য দ্রুত সিস্টার্নে স্থানান্তর করতে হবে। এতে ঝিনুকের বেঁচে থাকার হার, বৃদ্ধি, মুক্তাস্তর তৈরি দ্রুত হয়। অপারেশন পরবর্তী পরিচর্যা শেষে ঝিনুক পুকুরে মজুদ করতে হবে। সিস্টার্ন ও পুকুরে ঝিনুক সমূহের জন্য ঝিনুকের আকৃতির চেয়ে ছোট ফাসের নাইলন নেট দিয়ে প্রতিটি ৪০দ্ধ৩৫ বর্গ সে.মি. সাইজের নেট ফোল্ডার তৈরি করতে হবে। প্রতি ফোল্ডারে ৪ টি ঝিনুক রেখে ফোল্ডারগুলো রশির সাহায্যে পুকুরের পানিতে ঝুলিয়ে দিতে হবে। এভাবে প্রতি শতাংশে ৮০-১০০ টি ঝিনুক মজুদ করা যেতে পারে। প্রতি রশিতে দুটি ব্যাগের দূরত্ব ৪০-৪৫ সে.মি. এবং দুটি রশির দূরত্ব ১২০-১৫০ সে.মি. হলে ভালো হয়।


ঝিনুক মজুদ পরবর্তী পুকুর ব্যবস্থাপনা ঃ ইমেজ মুক্তা চাষের জন্য পানির সঠিক গুণাগুণ বাজার রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঝিনুকের খাদ্য গ্রহণ, বৃদ্ধি এবং নেকার নিঃসরণের ক্ষেত্রে পানির তাপমাত্রা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পানির অনুকূল তাপমাত্রায় ঝিনুক দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং নেকার দ্রুত নিঃসৃত হয়ে মুক্তা গঠিত হয়। মুক্তা চাষের জন্য পানির উপযুক্ত তাপমাত্রা ১৫ক্ক-৩০ক্ক সে.। তাই অপারেশনকৃত ঝিনুকগুলোকে এই তাপমাত্রার ভেতর রাখার জন্য বিভিন্ন ঋতুতে পানির তাপমাত্রার সাথে সামঞ্জস্য রেখে নেট ফোল্ডার ঝুলানোর গভীরতা কমাতে বা বাড়াতে হবে। শীতকালে ফোল্ডারগুলোকে ২০ সে.মি. গভীরতায় ঝুলাতে হবে। গ্রীষ্মকালে উপরিস্তরের পানির তাপমাত্রা বেশি থাকে বলে ৪০-৪৫ সে.মি. গভীরতায় ঝুলাতে হবে। পানির তাপমাত্রা খুব বেশি (৩২ক্ক সে. এর বেশি) বেড়ে গেলে পুকুরে ঝর্ণার মাধ্যমে অথবা নতুন পানি সরবরাহ করে পানির তাপমাত্রা সহনীয় করতে হবে। এছাড়া এই সংকটময় সময়ে ফোল্ডারগুলোকে তলদেশ থেকে মাত্র ১০ সে.মি. উপরে ঝুলিয়ে ঠাণ্ডা পরিবেশের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ঝিনুক জলাশয়ের উদ্ভিদকণা, ক্ষুদ্রপ্রাণিকণা ইত্যাদি ফুলকার সাহায্যে ছেঁকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। ইমেজ মুক্তা চাষের পুকুরে প্রয়োজনীয় পরিমাণ প্রাকৃতিক খাদ্য থাকা প্রয়োজন। পুকুরে পরিমাণমতো প্রাকৃতিক খাদ্য জন্মালে পানির রঙ হলুদাভ সবুজ এবং স্বচ্ছতা ৩০-৩২ সে.মি. হবে। পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্যের স্বল্পতা দেখা দিলে স্বচ্ছতা বেশি হয়। সেক্ষেত্রে দ্রুত পানিতে সার প্রয়োগ করতে হবে। পূর্বে ব্যবহৃত সারের পরিমাণের অর্ধেক হারে সার প্রয়োগ করতে হবে। অন্যদিকে স্বচ্ছতা ২৫ সে.মি. এর কম হলে বুঝতে হবে পুকুরটিতে প্রাকৃতিক খাদ্যের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় অত্যাধিক। সেক্ষেত্রে নতুন স্বচ্ছ পানি সরবরাহ করতে হবে। প্রয়োজনে পুকুরের কিছু পরিমাণ পানি স্বচ্ছ পানি দিয়ে পরিবর্তন করতে হবে। এছাড়া পুকুরে প্রতি মাসে শতক প্রতি এক কেজি হারে চুন প্রয়োগ করতে হবে। ঝিনুক বর্ধনের জন্য ৭-৮ হচ্ছে উপযুক্ত pH, অম্লীয় (pH<6.5) এবং ক্ষারীয় (pH>8.5) উভয় ধরনের পানিই ঝিনুকের বর্ধন এবং মুক্তা তৈরির জন্য অনুকূল নয়।    

 
পুকুরে অপারেশনকৃত ঝিনুক পর্যবেক্ষণ ঃ ইমেজ প্রতিস্থাপনের প্রথম মাসে অপারেশনকৃত ঝিনুকগুলো সাধারণত দুর্বল থাকে। তাই প্রতিস্থাপনের পর প্রথম মাসে নিয়মিত ঝিনুকগুলো পর্যবেক্ষণ করতে হবে। মৃত ঝিনুক কিংবা ইমেজ বের করে দেওয়া ঝিুনক সরিয়ে ফেলতে হবে। এছাড়া নিয়ম করে প্রতি মাসে একবার ঝিনুকগুলো পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এ সময় ঝিনুকগুলোকে পরিষ্কার করে দিতে হবে এবং খোলসের মুখে আটকে থাকা শ্যাওলা দূর করে দিতে হবে।


ইমেজ মুক্তা আহরণ ঃ হেমন্তের শেষে বা শীতের শুরুতে ইমেজ মুক্তা আহরণের উপযুক্ত সময়। আহরণের এক মাস পূর্বে ঝিনুকগুলোকে পানির উপরিতলের কাছাকাছি (১০ সে.মি. গভীরতায়) ঝুলিয়ে দিতে হবে। এতে করে ঝিনুকের দ্যুতি এবং রঙ উজ্জ্বল হয়। ব্যবহার উপযোগী ইমেজ মুক্তা তৈরি হতে ৭-৮ মাস সময় লাগে। আহরণের সময় ঝিনুকটির সংযোজনী পেশি ছুরি দিয়ে কেটে ঝিনুকটির দুটি খোলস খুলে ফেলতে হবে। এরপর ম্যান্টল পর্দাটি সরিয়ে ফেললে ইমেজ মুক্তাটি দেখা যাবে। খোলসসহ মুক্তাটি প্রথমে সামান্য লবণ পানি দিয়ে ধুয়ে এরপর স্বাভাবিক পানি দিয়ে ধুতে হবে। সবশেষে বাতাসে ইমেজ মুক্তা শুকিয়ে নিতে হবে।


ইমেজ মুক্তা আমাদের দেশে একটি নতুন সংযোজন। চমৎকার অলংকার তৈরি ছাড়াও শৌখিন দ্রব্য তৈরি, গৃহসজ্জায় এবং আরও নানাবিধভাবে ইমেজ মুক্তা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ইমেজ ম্ক্তুার উৎপাদান কৌশল সহজ এবং উৎপাদনে সময় কম লাগে। এছাড়া উৎপাদন ব্যয়ও কম। এই প্রযুক্তিটি বাংলাদেশের আবহাওয়া উপযোগী। এটি একটি পরিবেশবান্ধব এবং নারীবান্ধব প্রযুক্তি। নারীরা সহজেই এই প্রযুক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে। এসব দিক বিবেচনা করে দেখা যায় যে, আমাদের দেশে ইমেজ মুক্তার এক বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।

 

ড. মোহসেনা বেগম তনু১ অরুণ চন্দ্র বর্মন২ মোহাম্মদ ফেরদৌস সিদ্দিকী৩ সোনিয়া স্কু৪ মো: নাজমুল হোসেন৫


১প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মোবা : ০১৭১১১১৫৩৩৩, ইমেইল :tanu@yahoo.com, ২,৩ ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা৪,৫বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বামগই, ময়মনসিংহ-২২০১

ইলিশের অব্যাহত উৎপাদনে অনুসরণীয় কার্যক্রম

বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে লোনা ও স্বাদু পানিতে বিচরিত মাছের বাস্তুসংস্থানের পরিবর্তন হয়। যার সাথে মাছের প্রজননচক্র, মাছের দেশান্তর গতিবেগ, বাঁচা ও মরার হার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। ফলে মাছের মোট উৎপাদনের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। অনুরূপভাবে জলবায়ু পরিবর্তন ও জলজ দূষণের ফলে ইলিশ মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন, নতুন ইলিশের সংযোজন (Recruitment) পদ্ধতি এবং দেশান্তর প্রকৃতির স্বাভাবিক আচরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ।


জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে নিম্নে বর্ণিত ইলিশের মজুদের সম্ভাব্য পরিবর্তন হতে পারে-


ক. ইলিশের ঝাঁক মোহনার নিম্নাঞ্চলে স্থানান্তরের সম্ভাবনা;
খ. সাধারণ জেলেদের ইলিশ আহরণ নাগালের বাইরে চলে যাবে;
গ. অস্বভাবিক জলবায়ু এর পরিবর্তনের সাথে সাথে বঙ্গোপসাগরে সাইক্লোনের তীব্রতা বাড়তে থাকবে যার ফলে সাধারণ জেলেদের ইলিশ আহরণ প্রক্রিয়া প্রায় অসম্ভব হবে;
ঘ. গঙ্গা, ব্রক্ষ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর অববাহিকার পানি প্রবাহ হ্রাস পেলে ইলিশের প্রজননে ব্যহত হতে পারে;
ঙ. পানি দূষণের (শিল্পবর্জ্য ও কীটনাশক) ফলে অদূর ভবিষ্যতে ইলিশের প্রজনন ধারাবাহিকতা ব্যাহত হবে।
নিম্নে ইলিশের স্বাদু ও লোনা পানির বার্ষিক আহরণ থেকে বলা যেতে পারে যে, ইলিশের আহরণ দিনে দিনে লোনা পানিতে বাড়ছে (চিত্র-১)। এতে প্রতীয়মান হয় যে, ইলিশের প্রজনন মোহনার নিম্নাঞ্চলে সরে যাচ্ছে ।


ইলিশ আমাদের দেশের মাছ যা ভৌগোলিক নির্দেশক (Geographical Indicator) হিসাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। ইলিশ মাছ প্রাকৃতিকভাবে দ্রুত দেশান্তর প্রকৃতির তবে নদীগুলোর পানির দূষণ ও জলবায়ু ক্রমাগত পরিবর্তন হতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে ইলিশের দেশান্তর প্রকৃতির গতি (Migration Route) পরিবর্তন হতে পারে । ইলিশ ডিম পাড়ে স্বাদু পানিতে এবং পরে লবণাক্ত পানিতে ফিরে যায় । অতএব দ্রুত স্থান পরিবর্তনশীল এ প্রজাতির মাছের (ইলিশ) ওপর বাংলাদেশে আরও ফলপ্রসূ গবেষণার প্রয়োজন আছে যেমন-


-ইলিশের প্রকৃত প্রজনন ক্ষেত্র চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়ায় চলমান গবেষণার প্রয়োজন;
 

-শুধু ২২ দিনব্যাপী ইলিশ ধরা ও বিক্রি বন্ধ রাখলেই সন্তোষজনক উৎপাদন সম্ভব নাও হতে পারে যে কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে কৃত্রিম প্রজননও অত্যাবশ্যক;
 

-মোহনার নিম্নাঞ্চলে কৃত্রিম হ্যাচারি ও গবেষণাগার স্থাপন;
 

-দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার জন্য দক্ষ বৈজ্ঞানিকদের কাজ করা;
 

-প্রত্যেক বছর জাতীয় সেমিনারের মাধ্যমে গবেষণার দিকনির্দেশনা প্রদান;
 

-ঞধংশ ঋড়ৎপব গঠন করে ইলিশ মাছের গবেষণার ওপর জোরদার করা ।
 

ইলিশ মাছের ডিমধারণ ক্ষমতা (Fecundity) :
ইলিশ মাছের ডিমধারণ ক্ষমতা ১.৫-২০ লাখ। তবে জলবায়ু পরিবর্তন এর সাথে সাথে ইলিশের ডিম ধারণ ক্ষমতা দিনে দিনে কমে যাচ্ছে যা গড়ে ১২ লাখে দাঁড়িয়েছে যা ইলিশের মোট উৎপাদন দীর্ঘমেয়াদে উল্লেখ যোগ্যহারে ব্যাহত করবে (Akter, et, ২০০৭)। উল্লেখ্য যে, উভয় প্রকার (স্বাদু ও লবণাক্ত) পানিতে ইলিশের ঝাঁকের ডিম ধারণ ক্ষমতা কমছে ।


জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে ইলিশের লিঙ্গ বৈষম্য (Sex Ratio) :
ইলিশের মজুদ ব্যবস্থপনায় লিঙ্গ বৈষম্য একটি অন্যতম বিশেষ দিক। নিম্নে সময়ের সাথে ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্রের লিঙ্গ বৈষম্যের একটি চিত্র বিভিন্ন গবেষকের গবেষণার ফল (টেবিল-১) দেখানো হলো-

ক্রমিক নং এলাকার নাম পুরুষের ও মহিলা ইলিশের অনুপাত Reference
প্রজনন ক্ষেত্র (নিম্নাঞ্চল) ১:১.৬০ Shohidullah et al.., 1999
প্রজনন ক্ষেত্র (নিম্নাঞ্চল) ১:১.৮৬ Anisur Rahman et al., 2015
প্রজনন ক্ষেত্র (নিম্নাঞ্চল) ১:১.৯৪ Anisur Rahman et al., 2017
প্রজনন ক্ষেত্র (নিম্নাঞ্চল) ১:২:০০ Anisur Rahman et al., 2017


টেবিল-১ : জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্রের লিঙ্গের অনুপাত
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে ইলিশের ঝাঁকের প্রজনন ক্ষেত্র মোহনায় নিম্নাঞ্চলে সরে যাচ্ছে । ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্রে (নিম্নাঞ্চল) ইলিশের লিঙ্গ বৈষম্য ক্রমান্বয়ে  বাড়ছে (টেবিল-১)। বিভিন্ন গবেষকের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে পুরুষ ইলিশের সংখ্যার চেয়ে স্ত্রী ইলিশের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় পুরুষ ও স্ত্রী মাছের সংখ্যার অসংগতিপূর্ণ বৈষম্য হয়ে দীর্ঘমেয়াদে প্রজনন হার কমে যাবে যার ফলে ইলিশের মোট উৎপাদন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বলা যেতে পারে ইলিশের অব্যাহত উৎপাদনের লক্ষ্যে ২২ দিনব্যাপী ইলিশ ধরা ও বিক্রি বন্ধই  যথেষ্ট নয়, তবে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে ইলিশের কৃত্রিম প্রজননের যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক ।
 

ইলিশের প্রজনন চক্র (Breeding Cycle) :  
ইলিশ মাছ প্রাকৃতিকভাবে বাংলাদেশের ঋতু বৈচিত্র্য মোতাবেক সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে মোহনা অঞ্চলে ডিম পাড়ে। বর্তমানে ইলিশের Breeding Frequency, প্রজননক্ষম ইলিশ সংরক্ষণ ও মজুদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ২২ দিনব্যাপী ইলিশ ধরা ও বিক্রি বন্ধ করেছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির প্রধান সহায়ক হিসাবে তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে হয় না। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে ইলিশের ডিম ধারণ ক্ষমতা ও অসম লিঙ্গ বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে, যা দীর্ঘয়োদে ইলিশের উৎপাদন ব্যাহত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে । এ অবস্থায়, কৃত্রিম প্রজনন বাস্তবায়ন এবং ক্ষেত্র তৈরির মতো বিকল্প ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা অতিব জরুরি।


ইলিশ মাছের কৃত্রিম প্রজনন (Artificial Breeding) :
বর্তমানে বাংলাদেশে এখনও ইলিশের কৃত্রিম প্রজনন এর জন্য কোনো হ্যাচারি স্থাপনাসহ অন্য কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট একটি গতিশীল গবেষণালব্দ ইনস্টিটিউট যেখানে এ ব্যাপারে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। বর্তমানে মৎস্য অধিদপ্তর ইলিশের গবেষণালব্দ ফল সরকারি পর্যায়ে বাস্তবায়ন করছে তা নিঃসন্দেহে  প্রসংশার যোগ্য। প্রবন্ধকার  ড. মো. শহীদুল্লাহ মিয়া ১৯৮৭-১৯৯৯ সাল পর্যন্ত পুকুরে ইলিশ মাছ চাষসহ ইলিশ মাছের মজুদ নিরূপণসহ ইলিশের গতিবিদ্যা গবেষণায় সরাসরি জড়িত ছিলেন।


ইলিশের দেশান্তর প্রকৃতি ও প্রজনন বৈশিষ্ট্য Atlantic Salmon প্রজাতি মাছের অনুরূপ। উন্নত দেশে স্যামন মাছের প্রজনন প্রক্রিয়ার উন্নয়ন ঘটেছে। উন্নত বিশ্বে (ইউরোপিয়ান দেশ, ডেনমার্ক, নরওয়ে ও আমেরিকাতে) স্যামন মাছের কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রমে সফল হয়েছে যদিও স্যামন মাছ ইলিশ প্রজাতির মতোই দেশান্তর প্রকৃতির Anadromous । এ মাছটিও স্বাদু ও লবণাক্ত পানিতে বিচরণ করে প্রাকৃতিকভাবে স্বাদু পানিতে ডিম পাড়ে। স্যামন মাছের কৃত্রিম প্রজননের ফলে এ মাছের উৎপাদনে ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। স্যামন মাছে দ্বিতীয় বছরে পরিপক্বতা আসে এবং এরা সমুদ্র থেকে বিপরীত স্রোতে নদীতে আসে। স্যামন মাছের কৃত্রিম প্রজনন কৃত্রিম উপায়ে স্রোতের মাধ্যমে করা সম্ভব হয়েছে। সে ক্ষেত্রে ইলিশ মাছের বেলায় কৃত্রিম প্রজনন সম্ভব হবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।


এসব বিষয় বিবেচনা করে ইলিশ মাছের কৃত্রিম প্রজননের জন্য বাস্তবমুখী গবেষণা কার্যক্রম, পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এখন অতিব জরুরি এবং এটি সময়ের দাবি।

 

অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল্লাহ মিয়া*
*পরিচালক, কলেজ অব এগ্রিকালচারাল সাইন্সেস, আইইউবিএটি বিশ্ববিদ্যালয়, drshohidullah@iubat.edu # ০১৭৪৮১৯০৪৭৪

শ্রাবণ মাসের কৃষি

সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, শ্রাবণের অথৈ পানিতে খালবিল, নদীনাল, পুকুর ডোবা ভরে যায়, ভাসিয়ে দেয় মাঠঘাট, প্রান্তর এমনকি আমাদের বসতবাড়ির আঙিনা। তিল তিল করে বিনিয়োগ করা কষ্টের কৃষি তলিয়ে যেতে পারে সর্বনাশা পানির নিচে। প্রকৃতি সদয় থাকলে ভাটির টানে এ পানির সিংহভাগ চলে যায় সমুদ্রে। কৃষি কাজে ফিরে আসে ব্যস্ততা। আর এ প্রসঙ্গে জেনে নেবো কৃষির বৃহত্তর ভুবনে কোন কোন কাজগুলো করতে হবে আমাদের।
আউশ  
এ সময় আউশ ধান পাকে। রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে পাকা আউশ ধান কেটে মাড়াইঝাড়াই করে শুকিয়ে নিতে হবে।
বায়ুরোধী পাত্রে সংরক্ষণ করতে হবে।
বীজ ধান হিসেবে সংরক্ষণ করতে হলে লাগসই প্রযুক্তিগুলো ব্যবহার করলে ভবিষ্যৎ ভালো বীজ পাওয়া যাবে।
আমন ধান
শ্রাবণ মাস আমন ধানের চারা রোপণের ভরা মৌসুম। চারার বয়স ৩০ থেকে ৪০ দিন হলে জমিতে রোপণ করতে হবে।
রোপা আমনের আধুনিক এবং উন্নত জাতগুলো হলো বিআর৩, বিআর৮, বিআর৫, বিআর১০, বিআর২২, বিআর২৩, বিআর২৫, ব্রি ধান৩০, ব্রি ধান৩১, ব্রি ধান৩২, ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৭, ব্রি ধান৩৮, ব্রি ধান৩৯, বিনাশাইল, নাইজারশাইল, বিনাধান৪ এসব।
উপকূলীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য ক্ষেত্রে উপযোগী উফশী জাতের (ব্রি ধান৪০, ব্রি ধান৪১, ব্রি ধান৪৪, ব্রি ধান৫৩, ব্রি ধান৫৪, ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬২ এসব) চাষ করতে পারেন।
খরা প্রকোপ এলাকায় নাবি রোপা আমনের পরিবর্তে যথাসম্ভব আগাম রোপা আমন (ব্রি ধান৫৩, ব্রি ধান৫৪) চাষ করতে পারেন। সে সঙ্গে জমির এক কোণে গর্ত করে পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে পারেন। আমন ধানের ক্ষেতে সুষম সার প্রয়োগ করতে হবে। এজন্য জমির উর্বরতা অনুসারে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হবে।
ইউরিয়া ছাড়া অন্যান্য সার শেষ চাষের সময় জমিতে প্রয়োগ করতে হবে।
চারা রোপণের ১২ থেকে ১৫ দিন পর প্রথমবার ইউরিয়া সার ক্ষেতে উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। প্রথম উপরিপ্রয়োগের ১৫ থেকে ২০ দিন পর দ্বিতীয়বার এবং তার ১৫ থেকে ২০ দিন পর তৃতীয়বার ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে।
গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করলে চারা লাগানোর ১০ দিনের মধ্যে প্রতি চার গুছির জন্য ১৮ গ্রামের ১টি গুটি ব্যবহার করতে হবে। এজন্য চারা লাইনে রোপণ করতে হবে।
পোকা নিয়ন্ত্রণের জন্য ধানের ক্ষেতে বাঁশের কঞ্চি বা ডাল পুঁতে দিতে পারেন যাতে পাখি বসতে পারে এবং এসব পাখি পোকা ধরে খেতে পারে।
পাট
ক্ষেতের অর্ধেকের বেশি পাট গাছে ফুল আসলে পাট কাটতে হবে। এতে আঁশের মান ভালো হয় এবং ফলনও ভালো পাওয়া যায়।
পাট পচানোর জন্য আঁটি বেঁধে পাতা ঝড়ানোর ব্যবস্থা নিতে হবে তারপর জাগ দিতে হবে।
ইতোমধ্যে পাট পচে গেলে তা আঁশ ছাড়ানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাটের আঁশ ছাড়িয়ে ভালো করে ধোয়ার পর ৪০ লিটার পানিতে এককেজি তেঁতুল গুলে তাতে আঁশ ৫-১০ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে, এতে উজ্জ্বল বর্ণের পাট পাওয়া যায়।
যেসব জায়গায় জাগ দেয়ার পানির অভাব সেখানে রিবন রেটিং পদ্ধতিতে পাট পচাতে পারেন। এতে আঁশের মান ভালো হয় এবং পচন সময় কমে যায়। তবে মনে রাখতে হবে পাট কাটার সঙ্গে সঙ্গে ছালকরণ করতে হবে, তা না হলে পরবর্তীতে রৌদ্রে পাটগাছ শুকিয়ে গেলে ছালকরণে সমস্যা হবে।
বন্যার কারণে অনেক সময় সরাসরি পাটগাছ থেকে বীজ উৎপাদন সম্ভব হয় না। তাই পাটের ডগা বা কা- কেটে উঁচু জায়গায় লাগিয়ে তা থেকে খুব সহজেই বীজ উৎপাদন করার ব্যবস্থা নিতে হবে।
তুলা
রংপুর, দিনাজপুর অঞ্চলে আগাম শীত আসে, সে জন্য এসব অঞ্চলে এ মাসের মধ্যে তুলার বীজ বপন করতে হবে।
শাকসবজি
বর্ষাকালে শুকনো জায়গার অভাব হলে টব, মাটির চাড়ি, কাঠের বাক্স এমনকি পলিথিন ব্যাগে সবজির চারা উৎপাদনের ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ মাসে সবজি বাগানে করণীয় কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে মাদায় মাটি দেয়া, আগাছা পরিষ্কার, গাছের গোড়ায় পানি জমতে না দেয়া, মরা বা হলুদ পাতা কেটে ফেলা, প্রয়োজনে সারের উপরিপ্রয়োগ করা।
লতানো সবজির দৈহিক বৃদ্ধি যত বেশি হবে তার ফুল ফল ধারণক্ষমতা তত কমে যায়। সেজন্য বেশি বৃদ্ধি সমৃদ্ধ লতা গাছের ১৫ থেকে ২০ শতাংশের পাতা লতা কেটে দিলে তাড়াতাড়ি ফুল ও ফল ধরবে।
কুমড়া জাতীয় সব সবজিতে হাত পরাগায়ন বা কৃত্রিম পরাগায়ন অধিক ফলনে দারুণভাবে সহায়তা করবে। গাছে ফুল ধরা শুরু হলে প্রতিদিন ভোরবেলা হাতপরাগায়ন নিশ্চিত করলে ফলন অনেক বেড়ে যাবে। গত মাসে শিম ও লাউয়ের চারা রোপণের ব্যবস্থা না নিয়ে থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। আগাম জাতের শিম এবং লাউয়ের জন্য প্রায় ৩ ফুট দূরে দূরে ১ ফুট চওড়া ও ১ ফুট গভীর করে মাদা তৈরি করতে হবে। বর্ষায় পানি যেন মাদার কোনো ক্ষতি করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সম্ভব হলে মাঁচার ব্যবস্থা করতে হবে।
গাছপালা
এখন সারা দেশে গাছ রোপণের কাজ চলছে। ফলদ, বনজ এবং ঔষধি বৃক্ষজাতীয় গাছের চারা বা কলম রোপণের ব্যবস্থা নিতে হবে।
উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করে একহাত চওড়া এবং একহাত গভীর গর্ত করে অর্ধেক মাটি এবং অর্ধেক জৈবসারের সঙ্গে ১০০ গ্রাম টিএসপি এবং ১০০ গ্রাম এমওপি ভালো করে মিশিয়ে নিতে হবে। সার ও মাটির এ মিশ্রণ গর্ত ভরাট করে রেখে দিতে হবে। দিন দশেক পরে গর্তে চারা বা কলম রোপণ করতে হবে।
ভালো জাতের সুস্থ্য স্বাস্থ্যবান চারা রোপণ করতে হবে। চারা রোপণের পর গোড়ার মাটি তুলে দিতে হবে এবং খুঁটির সাথে সোজা করে বেঁধে দিতে হবে।
গরু ছাগলের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য রোপণ করা চারার চারপাশে বেড়া দিতে হবে।
প্রাণিসম্পদ
আর্দ্র আবহাওয়ায় পোলট্রির রোগবালাই বেড়ে যায়। তাই সতর্ক থাকতে হবে এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে খামার জীবাণুমুক্তকরণ, ভ্যাকসিন প্রয়োগ, বায়োসিকিউরিটি এসব কাজগুলো সঠিকভাবে করতে হবে। বায়োসিকিউরিটির জন্য খামারকর্মীদের জীবাণুমুক্ত জুতা ও এপ্রোন পরে খামারে ঢোকা, কমবয়সী বাচ্চার বেশি যতœ নেয়া, শেডে জীবাণুনাশক পানি স্প্রে করা, মুরগির বিষ্ঠা ও মৃত মুরগি খামার থেকে দূরে মাটিতে পুঁতে ফেলা, পোলট্রি শেডের ঘরের মেঝে কস্টিক সোডার পানির দ্রবণ দিয়ে ভিজিয়ে পরিষ্কার করা। আর্দ্র আবহাওয়ায় পোলট্রি ফিডগুলো অনেক সময়ই জমাট বেঁধে যায়। সেজন্য পোলট্রি ফিডগুলো মাঝে মাঝে রোদ দিতে হবে।
বর্ষাকালে হাঁস মুরগিতে আফলাটক্সিন এর প্রকোপ বাড়ে। এতে হাঁস মুরগির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এজন্য সূর্যমুখীর খৈল, সয়াবিন মিল, মেইজ গ্লুটেন মিল, সরিষার খৈল, চালের কুঁড়া এসব ব্যবহার করা ভালো। গবাদিপশুকে পানি খাওয়ানোর ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ দূষিত পানি খাওয়ালে নানা রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
ক্ষুরা, বাদলা, তড়কা, গলাফুলা রোগের প্রতিষেধক দিতে হবে। গোখাদ্যের জন্য রাস্তার পাশে, পুকুর পাড়ে বা পতিত জায়গায় ডালজাতীয় শস্যের আবাদ করতে হবে। গরু, মহিষ ও ছাগল ভেড়াকে যতটা সম্ভব উঁচু জায়গায় রাখতে হবে।
গর্ভবর্তী গাভী ও বাছুরের বিশেষ যতœ নিতে হবে। বাছুরের পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। এজন্য নিয়মিত দুধ ও মিল্ক রিপ্লেসার খাওয়ানোর পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি খাওয়াতে হবে।
মৎস্যসম্পদ
চারা পুকুরের মাছ ৫ থেকে ৭ সেন্টিমিটার পরিমাণ বড় হলে মজুদ পুকুরে ছাড়ার ব্যবস্থা নিতে হবে।
সঙ্গে সঙ্গে গত বছর মজুদ পুকুরে ছাড়া মাছ বিক্রি করে দিতে হবে।
পানি বৃদ্ধির কারণে পুকুর থেকে মাছ যাতে বেরিয়ে না যেতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এজন্য পুকুরের পাড় বেঁধে উঁচু করে দিতে হবে অথবা জাল দিয়ে মাছ আটকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
পানি বেড়ে গেলে মাছের খাদ্যের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ সময় পুকুরে প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ করতে হবে।
জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে।
সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, আষাঢ়-শ্রাবণ মাস আমাদের কৃষির জন্য হুমকির মাস। এ কথা যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমাদের সবার সম্মিলিত, আন্তরিক ও কার্যকরী সতর্কতা এবং যথোপযুক্ত কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে এ সমস্যাগুলো মোকাবেলা করা সম্ভব। কৃষিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে আধুনিক কৃষি কৌশল যেমন অবলম্বন করতে হবে তেমনি সব কাজ করতে হবে সম্মিলিতভাবে। আর কৃষির যে কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য আপনার নিকটস্থ উপজেলা কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন অথবা ১৬১২৩ এ নম্বরে যে কোনো মোবাইল অপারেটর থেকে কল করে নিতে পারেন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ। আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা কৃষিকে নিয়ে যাবে উন্নতির শিখরে।

কৃষিবিদ মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন*
*তথ্য অফিসার (কৃষি), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫

মধুবৃক্ষ খেজুর গাছ

খেজুর পরিবেশবান্ধব, স্থানসাশ্রয়ী একটি বৃক্ষ প্রজাতি। এ প্রজাতি দুর্যোগ প্রতিরোধী বিরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে।  খেজুর রস ও গুড় বিক্রি করে খামারির আর্থিক লাভ ও স্বাবলম্বী হওয়ার দৃষ্টান্ত বেশ সুপ্রাচীন। গ্রামীণ অর্থনীতি এবং  মৌসুমি কর্মসংস্থানে খেজুর গাছের অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে শীতকালে বাংলাদেশের সর্বত্রই খেজুর রস, খেজুর গুড় দারিদ্র্য বিমোচনসহ বাঙালি সাংস্কৃতিতে রসঘন আমেজ লক্ষ করা যায়।
১. বৃক্ষ পরিবেশ প্রকৃতি : বাংলাদেশের মাটি ও কোমল প্রকৃতি খেজুর গাছ বেড়ে ওঠার জন্য বেশ উপযোগী।  রাস্তা, বাঁধ, পুকুর পাড়, খেতের আইল এবং আবাদি জমিতে এ বৃক্ষ বেশ ভালো জন্মে। তবে নদীর তীর, আংশিক লবণাক্ত এলাকা, বরেন্দ্র এলাকাসহ চরাঞ্চলেও জন্মে। বাংলাদেশের সব জেলা বিশেষ করে বৃহত্তর যশোর, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও নাটোর অঞ্চলে খেজুর গাছ বিজ্ঞানভিত্তিক চাষ করা হয়। যশোর ও ফরিদপুর দেশের সর্বাধিক খেজুর রস ও খেজুর গুড় উৎপন্ন অঞ্চল।
২. বৈজ্ঞানিক পরিচয় ও বিস্তৃৃতি : খেজুর বৃক্ষ একবীজপত্রী আবৃতবীজী উদ্ভিদ। ইংরেজি নাম
Wild Date Palm, Silver Date Palm, Indian Wild Palm আঞ্চলিক নাম খাজুর, খেজুর ও খাইজুর। উদ্ভিদ তাত্ত্বিক পরিচয়Phoenix sylvestris (Roxb.) এবং অ্যারাসি (Arecaceae) বা তালগোত্রের সদস্য। এ পরিবারের একটি গণ phoenix । এই গণের অন্য কয়েকটি চেনা গাছ খুদি খেজুর (Phoenix acaulis) ও হেতাল (Phoenix paludosa) ।
৩. খেজুর বৃক্ষস্বরূপ : শাখা-প্রশাখাবিহীন একক কা-যুক্ত ব্যতিক্রমধর্মী খেজুর গাছ। কাণ্ডটি সরল ও গোলাকার। একটি কাণ্ডই একাকি বেড়ে ওঠে এমন দৃশ্য বৃক্ষের ক্ষেত্রে খুব কম দেখা যায়। গাছের ট্রাংক বেশ মজবুত ও গোলগাল। কা-ের শীর্ষভাগ যা সদা পত্র শোভিত লাবনি মাথি বেশ দৃষ্টিনন্দন। রস আহরণের জন্য খেজুর গাছ বছরে ন্যূনতম একবার কাটা হয় এবং গোলগাল রাখা প্রয়োজন হয়। শীত ঋতুতে উদ্ভিদ জগতে এ নেমে আসে এক প্রাণহীন রসহীন বিবর্ণতার ছায়া তখন খেজুর গাছ রসের বারতা নিয়ে আসে। ফাগুনে প্রকৃতিতে খেজুর ফুল ফোটে। প্রকৃতির দান এর ফুল বিন্যাস যা মানুষকে আকৃষ্ট করে। কুয়াশার চাদরে ঢাকা শীতঋতুতে খেজুুরমাথিতে মুচি (পুষ্পমঞ্জরি) আসে। খেজুর ফুল ভিন্নবাসী, পুষ্পমঞ্জরি দেখে পুরুষ ও স্ত্রী গাছ চিহ্নিত করা যায়। শুধু স্ত্রী গাছে ফুল ও ফল ধরে পুং গাছে নয়। পুং পুষ্পমঞ্জরি খাটো, স্ত্রী পুষ্পমঞ্জরি লম্বা ও ফুলের বর্ণ সাদা। খেজুর ফুল শক্ত মোচা থেকে বের হয়।  মোচা থেকে ফুল ফোটা এক অপার মহিমা, মনে হয় কোথা থেকে কোন ফুলপরি কণ্টাকীর্ণ গাছের মাথিতে মন্ত্র দিয়ে ফুল ফুটিয়েছে। খেজুরের মুচিতে এক ধরনের সাদা উপাদান, যা পরাগরেণুর সুবাস।  
৪. বহু গুণে গুণী খেজুর বৃক্ষ : খেজুরের বহুল ব্যবহার নিয়ে বর্ণনার শেষ নেই। রস দিয়ে নানা রকম পিঠা, পায়েস, গুড়, কুটির শিল্প, আয় ও কর্মসংস্থান হয়। সার্বিক বিবেচনায় খেজুর সমধিক গুরুত্ববহ একটি প্রজাতি।
খেজুর ফলের পুষ্টি উপাদান :  এই উদ্ভিদ মানবদেহের জন্য উপকারী বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান সমৃদ্ধ। খেজুর ফল ফাইবার ও ভিটামিন সমৃদ্ধ। খাদ্যোপযোগী প্রতি ১০০ গ্রাম শুকনা  খেজুর ফলের মধ্যে ১৮.০ গ্রাম জলীয় অংশ, মোট খনিজ পদার্থ ১.৭ গ্রাম, ৩.৯ গ্রাম আঁশ, ৩২৪ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি, ২.২ গ্রাম আমিষ, ০.৬ গ্রাম চর্বি, ৭৭.৫ গ্রাম শর্করা, ৬৩ মি. গ্রাম ক্যালসিয়াম, ৭.৩ মিলিগ্রাম লৌহ, ০.১০ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-১, ০.০৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-২ এবং অল্প পরিমাণ ভিটামিন সি বিদ্যমান থাকে। প্রচলিত খাদ্য হিসেবে খেজুর রস বেশ সস্তা, পুষ্টিকর এবং উপাদেয়। খেজুর রসে অ্যাসপারটিক এসিড, নাইট্রিক এসিড এবং থায়ামিন বিদ্যমান।
খেজুর রস : শীত ঋতু এলেই গ্রামীণ সংস্কৃতিতে খেজুর রসের কথা মনে পড়ে। ফোঁটা ফোঁটা সঞ্চিত রস নির্গত হবে চোং দিয়ে। হাঁড়িতে জমে রসের ফোঁটা। এভাবে একটি গাছ দৈনিক গড়ে ৫-৬ লিটার রস দিয়ে থাক। কথিত আছে ‘খালি কলসি রেখে দিলে ভরে যায় রসে, সেই রসে দিয়ে জ্বাল মন ভরে সুবাসে’। আবার গাভীর সাথে তুলনায় বলা হয় ‘মাইট্যা গোয়াল কাঠের গাই-বাছুর ছাড়া দুধ পাই’। কাকডাকা ভোরে খেজুরের রস, মন মাতানো ঘ্রাণ শহরে বিরল। শীতের সাকালে খেজুর রস, মিষ্টি রোদ, কৃষক-কৃষাণির হাসি দারুণ প্রাণশক্তি। কবির ভাষায়, ‘এমন শীতলমিষ্টি কোথা আছে নীর? পান মাত্র তৃষিতের জুড়ায় শরীর’। তাই এ গাছকে অনেকে শখের বসে ‘মধুবৃক্ষ’ বলে থাকে।
খেজুর রসের পায়েশ :  খেজুর রস দিয়ে  তৈরি নানা রকমের পায়েশ, ক্ষির খেতে খুবই মজা। খেজুরের রস ও পিঠার সাস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। রস দিয়ে হরেক রকম পিঠার ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। খেজুর পিঠা ও রসের নানা রেসিপি শিরনি-পায়েস, ঘনরসে চিতৈ পিঠা, খেজুর গুড়-নারকেল মিশ্রণে বেশ সুখ্যাতি রয়েছে।
খেজুর রস থেকে গুড় : খেজুরের গুড় তৈরি করতে হলে এক ধরনের বিশেষ জ্ঞান থাকা চাই। খেজুরের রস থেকে গুড় তৈরি করা একটি শিল্প।  রসের সাথে জ্বাল দেয়ার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। খেজুরের ঝোলা গুড়, পাটালি গুড়, নলেন গুড়,  ভেলি গুড়, বালুয়া গুড়, মিছরি গুড়, বেশ সুস্বাদু ও সুপরিচিত। গাছে নলি দেয়ার প্রথম দিকের রস থেকে তৈরি গুড়কে নলেন গুড় বলে। পাটালি গুড়ের কদর এখনও বিদ্যমান। গুড় বিক্রির অর্থনৈতিক উপযোগিতা রয়েছে। পরিকল্পিত উপায়ে দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে খেজুর গুড় রপ্তানির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। পাটালি গুড় ও কোচড় ভরা মুড়ি প্রচলিত ও পরিচিত দৃশ্য, খেতে ভারি মজা। দুপুরে খেজুরের ভিড় গুড় আজকালের প্রজন্মের কাছে অচেনা এ মধুর স্মৃতি। খেজুরের গুড়ের চিনি সুমিষ্ট ও সুস্বাদু। খেজুরের গুড় থেকে তৈরি বাদামি-চিনির স্বাদ ও ঘ্রাণ বেশ স¦াতন্ত্র্যম-িত।
খেজুর বৃক্ষ ও কুটির শিল্প : কুটির শিল্পে খেজুরের পাতার ব্যাপক ব্যবহার ও কদর রয়েছে। খেজুর পাতা দ্বারা তৈরি করা রকমারি হাত পাখা, লছমি, ঝাড়–, ঝুড়ি, থলে, ছিকা ও নানা রকম খেলনা এখনও অতি সমাদৃত। খেজুর পাতার পাটির কদর ঘরে ঘরে। খেজুর পাতা দিয়ে নকশি পিঠা করা হয়। কুমোড়দের শীত মৌসুমে খেজুরের রস ধারণ করার হাঁড়ি তৈরির হিড়িক বাড়ায়।
খেজুর বৃক্ষ ও ভেষজ গুণাগুণ : সর্দি-কাশি নিরাময়ে খেজুর ফল উপাদেয়। খেজুরের পাতা রোগ নিরাময়ে ব্যবহার হয়ে থাকে। হৃদরোগ, জ্বর ও উদরের সমস্যা সমাধানে বেশ কার্যকর। গাছের শিকড় দাঁত ও মাড়ির প্রদাহ নিবারণে ব্যবহৃত হয়। রস মুখে রুচি আনে।
খেজুর বৃক্ষ ও জ্বালানি কাঠ :  খেজুর গাছ গ্রামীণ পরিবারের জ্বালানি দেয়। গৃহের নানা কাজে যেমন তক্তা, আড়া, খুঁটি তৈরি ইত্যাদি কাজে ব্যবহৃত হয়। খেজুর কাঠ আঁশযুক্ত বলে এর দাহ্য ক্ষমতা অনেক বেশি। তাই গ্রামগঞ্জে খেজুর লাকড়ির সমাদর রয়েছে।
খেজুর বৃক্ষ ও উপজাতি সম্প্রদায় : খেজুর রস বাংলাদেশের উপজাতি সম্প্রদায়ের প্রিয় পানীয়, বাড়তি শক্তির জোগান দেয়। শীতকাল তাদের কাছে বেশ স্মৃতিঘন। নতুন চাল আর গাঁজনকৃত খেজুর রস বিশেষ এক ধরনের আনন্দের আয়োজন, মানসিক তৃপ্তি। খেজুর গাছ খরা সহ্য করে বিধায় বরেন্দ্র অঞ্চলে খেজুর গাছের চাষ প্রচলন বেশ লক্ষণীয়।  
খেজুর বৃক্ষ ও গাছি সম্প্রদায় : ঠিলে ধুয়ে দে বউ গাছ কাটিতে যাবো, এই হলো খেজুর বৃক্ষকে কেন্দ্র করে তৈরি গাছি সম্প্রদায়ের বুলি। তাদের শিউলিও বলা হয়। এরা গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য। তাই শীতকালে গাছিদের কদর বেড়ে যায়, তারা দিনভর মহাব্যস্ত থাকেন। গাছিরা খেজুর গাছ তোলা-চাছার জন্য দা, চোং বা নলি, কাঠি, দড়ি, ভাঁড় ইত্যাদি  জোগাড় করার জন্য ব্যস্ত থাকেন। শীতকালে গাছিদের কর্মসংস্থান হয়। একজন গাছি দৈনিক ৫০টি গাছ কাটতে পারেন।  
খেজুর রস ও সামাজিক সম্পর্ক : এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে বেড়াতে গেলেও সাথে রস বা গুড় নিয়ে যেতে দেখা যায়। খেজুরের মুচিতে এক ধরনের সাদা পাউডার জাতীয় পদার্থ থাকে, যা মুখে মাখে, শিশুরা নানা খেলায় মেতে ওঠে।
৫. খেজুর কবিতা ও প্রবচনের ফল : বৃক্ষ প্রেমিক জীবনানন্দের ভাষায় সহসাই মূর্ত হয়েছে, বসেছে বালিকা খর্জ্জুরছায়ে নীল দরিয়ার কূলে। বাংলার রূপ কবিতায় সফিনাজ নূরুন্নাহারের ভাষায় মায়ের হাতের রসের পিঠা, মধুর মতো খেজুর মিঠা। তাই মনে পড়ে মায়ের কথা, মনে পড়ে মামা বাড়ি বেড়ানোর স্মৃতিকথা। আবার খেজুর গাছ নিয়ে নানা ধরনের প্রবচন, কবিতা গাঁথা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। একটি খেজুর গাছ পাইয়া, লোভে কাটে বাঙালে আগা থুইয়া গোড়া কাটে রস নাহি মিলে। ও তার আগডালেতে থাকে রস রসিক বিনে কে জানে। নিত্যনতুন বেরোয় রস খেলে তা ফুরায় না, প্রেমের গাছের রসের হাঁড়ি পাতল যে জনা। সাধারণ গিরস্থ চাষা জ্বাল দেতে না পায় দিশা, হাইলাদের পাইলে তারে করে মিঠাই ম-া খানা। টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের কথামালা, অলি-গাঁও বলি-গাঁও জলী ধান চষে, করে গুড় পাটালি খাজুরের রসে। মামুয়ে পাড়ৈন চিরল পাতা মামীয়ে রান্ধেন ভাত, কান্দিও না গো সোনামামী মামু তোমার বাপ। খেজুর গাছ নিয়ে ঘুমপাড়ানি ছড়া, ছুট ছুট (ছোট) খাজুর গাছ, এই নিয়ে খেজুরার বার দ্যাশ  (দেশ), এই খাজুর পাকিব, খেজুরার মা কাটিব, ও রসুন খালা গো, খেজুরার মায়েক বুজাও (বোঝাও) গো না কাটে না যেন। রাজশাহী অঞ্চলের লোকজ কথা, আমি ভাই একলা খেজুর গাছের বাকলা। খেজুর গাছ নড়ে চড়ে তীর ধনুকে বাড়ি পড়ে।
লোকজ জ্ঞান ও অপ্রচলিত ব্যবহার : কাঁচা খেজুরের বীজ পানের উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গ্রামে নারীরা অপরিপক্ব খেজুর বিচি পানের সাথে সুপারির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করে।  খেজুরের আঁটি দিয়ে শৈশবের গর্তখেলার কথা আজও মনে পড়ে। খেজুরতলায় ঝরে পড়া পাকা খেজুর কুড়াতে গিয়েছি শৈশবে কত গদ গদ। খেজুর কাঁটা বন্যপ্রাণীর হাত থেকে ফসল রক্ষায় ব্যবহৃত হয়। নতুন বেয়াইর সাথে খেজুর কাঁটার ব্যবহার সম্পর্কিত ছড়া বেশ মজার হাসি তামাশার খোরাক দিত। বেয়াইরে বসতে দেবো কি? খেজুর কাঁটার মরা বুনাইছি, বেয়াইর বসতে লজ্জা কি? অমন মরায় বেয়াই বসেনি? খেজুরের মাথি খাওয়া একটি গ্রামীণ সংস্কৃতি, নরম ও কোমল সুমিষ্ট খেজুর মাথি পুষ্টিজ্ঞান।
খেজুর ও সেরা স্থান : খেজুর গাছকে কেন্দ্র করে অনেক নান্দনিক নাম শহর-বন্দরে প্রচলিত যেমন খেজুরতলা, খেজুরবাগান, খেজুুরবাড়িয়া, শিবচরের খাজুর গ্রাম। ঢাকার খেজুরবাগান একটি প্রতিষ্ঠিত নাম।
খেজুর ও পাখির খাদ্যাবাস : শীতের সময় খেজুর গাছে পাখির কিচিরমিচির শব্দে প্রকৃতি প্রাণ পায়। খেজুর গাছ পাখির প্রিয় আবাস। পাখিরা এখানে বাসা বাঁধে, ডিম পাড়ে ও নিরাপদ আশ্রয় বলে মনে করে। খেজুর গাছে বাবুই ও চড়–ই বাসা বানায়, বাচ্চা তুলে।  কাঠঠোকরা, ঘুঘু ও চড়–ই খেজুর গাছে গাছে ঘুরে বেড়ায়, সাদা গলা মুনিয়া খেজুর গাছের মাথায় বাসা করে। শালিক, ঘুঘু, কাক, কোকিল, ময়না, মৌটুসি নরম ফল খায়।
খেজুর গাছ কৃষি বন ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি : সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য এ গাছ রেললাইন ও বসতবাড়ির ফটকে বেশ দৃষ্টিনন্দন। বরেন্দ্র অঞ্চলে খেজুর গাছ বেশ লক্ষণীয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। গ্রাম বাংলার মেঠো পথের দুইপাশে তাকালে চোখে পড়বে সারি সারি খেজুর গাছ। রাস্তার দুই ধারে, আবাদি জমিতে, ক্ষেতের আইলে সারিবদ্ধভাবে খেজুর গাছ জন্মেœ যা কৃষি বন বলে পরিচিত। দেশের উত্তরাঞ্চলে কৃষি জমিতে বাণিজ্যিক খেজুর গাছ আবাদ একটি উত্তম পেশা বলে প্রমাণিত হয়েছে। মাদারীপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, রাজশাহীতে কৃষি জমিতে খেজুর গাছ সফলতার দ্বার উন্মুক্ত করছে। এ গাছের সাথে সখ্য রয়েছে এমন সবজি প্রজাতি গাছআলু, লাউ, ধুন্দুল, লালশাক, সরিষা, বেগুন ইত্যাদি। একটি খেজুর গাছ ১০-১৫ বছরে ফল দেয়। প্রাকৃতিক অথবা চারা বা বীজ বপনের মাধ্যমে খেজুর গাছ জন্মে। বীজ থেকে চারা উৎপন্ন হয় এবং ১০-১৫ দিনে বীজ অংকুরিত হয়। প্রতি কেজিতে ১৩০০-১৫০০টি বীজ পাওয়া যায়। রস আহরণের জন্য গাছ ব্যবস্থাপনা গোছ-গাছ রাখা প্রয়োজন হয়। তাই কথায় বলা হয় খেজুর বাড়ে কোপে। খেজুর গাছের পাতা ও মাথি মাঝে মধ্যে কেটে-ছেঁটে গাছের গোল-গাল গড়ন ও বৃদ্ধি নিশ্চিত করা হয়। গাছ বছরে ন্যূনতম একবার কাটা হয়, শোভিত ও বেশ দৃষ্টিনন্দন রূপ দেয়া হয়।
৬.  উৎপাদন, বাজার ও কর্মসংস্থান : প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ২০১২-২০১৩ অর্থবছরের বাংলাদেশে ১২০০৬ হেক্টর জমিতে মোট ৮১৫৮৩ মে. টন খেজুর উৎপাদিত হয়েছে। খেজুর উৎপাদনের শীর্ষ জেলাগুলো হলোÑ যশোর, ফরিদপুর, রাজশাহী ও নাটোর। প্রচলিত খাদ্য হিসেবে খেজুর রস বেশ সস্তা ও পুষ্টিকর। একটি গাছ দৈনিক গড়ে ৫-৬ লিটার রস দেয়। একটি গাছ থেকে প্রতি মৌসুমে গড়ে ২৫-৩০ কেজি গুড় তৈরি হয়। প্রতি কেজি গুড়ের মূল্য ৫০-৬০ টাকা। ২০০  খেজুর গাছ আছে এমন পরিবার পুরো বছরের সংসারের ব্যয়ভার বহন করতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী একবিঘা জমিতে প্রায় ১ থেকে ১৫০ গাছ রোপণ করা সম্ভব। ১টি প্রতিবেদনে দেখা যায় বাঘা উপজেলায় চাষিরা প্রতি বছর ৮-১০ কোটি টাকা আয় করেন খেজুরের রস ও গুড় বিক্রি করে। খেজুর ফল বিক্রি করেও আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যায়।
খেজুর গুড়ের বাজার : শীত মৌসুমে গুড় তৈরি বেশ বড় পেশা। সারা দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গুড় ব্যবসায়ী গুড় বিপণন ও পরিবহনের সাথে যুক্ত থাকে। এ সময় গুড় বিপণন নিয়ে রব-রব পরিস্থিতি তৈরি হয়। গ্রামীণ হাটবাজারে প্রান্তিক মানুষ নগদ কিছু অর্থ কামিয়ে নেয়। বাংলাদেশে যশোর ও ফরিদপুর অঞ্চলে সর্বাধিক খেজুর রস ও গুড় উৎপন্ন হয়। বৃহত্তর যশোর, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, খুলনা, বরিশাল ও রাজশাহী অঞ্চল গুড় ও পাটালি করা হয়। বেনাপোল-শার্শা খেজুর গুড়ের জন্য বিখ্যাত। মাদারীপুরেও বৃহৎ বাজার বসে। কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার গাড়াবাড়িয়া গ্রামে বেশ রস উৎপন্ন হয়।
আরবের খেজুর : আরবের প্রধান ফল খেজুর। এ বৃক্ষ মহিমা নিয়ে সূরা আন্’আ-ম্, আয়াত-৯৯-১০০ নাজিল হয়েছে। যার অর্থÑ ‘এবং তিনি খেজুরের মোচা হতে ফলের থোকা থোকা বানাইয়াছেন, যাহা বোঝার ভরে নুইয়া পড়ে। এই গাছগুলো যখন ফলধারণ করে তখন উহাদের ফল বাহির হওয়া ও উহার পাকিয়া যাওয়ার আবস্থাটা একটু সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকাইয়া দেখিও। এই সব জিনিসের সুস্পষ্ট নিদর্শন সমূহ নিহীত রহিয়াছে তাহাদের জন্য যাহারা ঈমান আনে’। তাই আরবি খেজুরের প্রতি আমাদের দুর্বলতা প্রবল।
তবে আমাদের দেশের খেজুর এবং আরবের খেজুর ফলের মধ্যে বেশ তারতম্য রয়েছে। আমাদের খেজুর গাছ রস উৎপাদননির্ভর আর সৌদি আরবের খেজুর ফল উৎপাদননির্ভর। তাই আমাদের দেশে আরবি খেজুর তথা বেহেশতি ফল চাষের কথা বলা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে  মোতালেব মিয়ার সৌদি খেজুর চাষের সাফল্যের কথা বলা যায়। তিনি সৌদি খেজুর চাষে একটা অসম্ভবকে সম্ভবে পরিণত করেছেন কঠিন সাধনা ও পরিশ্রমের বিনিময়ে। দেশবাসীর জন্য মোতালেব মিয়া তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছেন।
৭. খেজুুর ও হারানো সংস্কৃতি : কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ ও মাঘ মাস রসের মাস। রস আহরণে গাছ তৈরি করার ধুম পড়ে এসময়। গাছিদের গ্রামীণ জনপদে এখন কম দেখা যায়, পেশা ছাড়ছেন অনেক গাছি সম্প্রদায়। খেজুর রস বিক্রির চিত্র এখন আর দেখা যায় না। গাছিদের স্বার্থ ও আগ্রহ ধরে রাখা দরকার। এই উদ্ভিদের উৎকর্ষ সাধন এবং সংরক্ষণের জন্য নানা ধরনের  মৌলিক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

 

উপসংহার :  বৈরী জলবায়ু ও বৈশ্বিক তাপমাত্রা পরিবর্তনের ফলে এসব প্রজাতির ওপর প্রভাব পড়ছে। ভাটির দেশে এ উদ্ভিদ প্রজাতি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।  তবে এই উদ্ভিদ অত্যধিক লবণ পরিবেশে ও দীর্ঘ খরা পরিবেশে আশানুরূপ রস দিতে পারে না। নদীর পাড়, রাস্তার প্রান্তে প্রজাতি দেখা যায় না। বসতবাড়িতে খেজুর গাছের আধিক্য ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে খেজুর গাছ ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে আশার কথা, বন বিভাগ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খেজুর গাছ রোপণ করার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে, এই উদ্ভিদের উৎকর্ষ সাধন এবং সংরক্ষণের জন্য নানা ধরনের মৌলিক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। বেশি রস দেয় এ রকম প্রজাতি শনাক্তকরণ ও তা কৃষকের মধ্যে বিতরণ করা দরকার। বারি জার্মপ্লাজম সেন্টার এ বিষয়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। নার্সারিতে  খেজুর চারা উৎপাদন অত্যাবশ্যকীয় বলে মনে করি। দেশব্যাপী প্রতিষ্ঠিত নার্সারিতে খেজুর চারা উৎপাদন করে চাষ বৃদ্ধি করা যায়। বাঁধ, গ্রামীণ বন, পাকা সড়ক, রেললাইনের ধারে, সরকারি-বেসরকারি অফিস আদালতের ধারে খেজুর চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা আছে। নান্দনিক গাছের সমন্বয়ে ব্যাণিজ্যিকভিত্তিক উদ্ভিদ উদ্যান তৈরি হতে পারে, যা মানুষকে আকর্ষণ করবে। পরিকল্পিত উপায়ে পতিত ও প্রান্তিক জমিতে গাছ রোপণ করলে দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে গুড় রপ্তানির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

ড. এস এম আতিকুল্লাহ*
*এগ্রিকালচার স্পেশালিস্ট, জাতীয় ভূমি জোনিং প্রকল্প, ৩/১ এ নীলক্ষেত, বাবুপুরা, ঢাকা-১২০৫, মোবাইল : ০১৭১২৮৮৯৯২৭

 

আম বাগানে রোগ ও পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা

আম এদেশে চাষযোগ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। বর্তমানে দেশের ২২টি জেলায় বাণিজ্যিকভাবে শুরু হয়েছে আমের চাষাবাদ। তবে জনপ্রিয় এই ফলটি দেশের সব জেলাতেই জন্মাতে ও ফলন দিতে পারে। বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যবহার, পুষ্টিমান এবং স্বাদ- গন্ধে আম একটি অতুলনীয় ফল। জলবায়ুগত পরিবর্তনের ফলে আম বাগানে দেখা যাচ্ছে নতুন নতুন রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ। বর্তমান সময়ে আম বাগানে বালাইনাশকের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আম চাষি নিজের অজান্তে বিভিন্ন ধরনের বালাইনাশক বহুবার ব্যবহার করছেন। কীটনাশক স্প্রের বিষয়ে এখনই সচেতনতা সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে এটি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। আম বাগানে রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ অল্প থেকে শুরু করে ব্যাপকও হতে পারে। সঠিক সময়ে রোগ ও পোকামাকড় দমন করতে ব্যর্থ হলে আমের ফলন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। ছোট আকারের ফসলের ক্ষেত্রে অন্যান্য দমন পদ্ধতি যেমন-আক্রান্ত পাতা বা গাছের অংশ ছিঁড়ে ফেলা, পোকার ডিম বা কীড়া সংগ্রহ করে ধ্বংস করা, জাল দিয়ে পোকা সংগ্রহ করে নষ্ট করা সম্ভব কিন্তু আমের মতো বৃহৎ গাছে রোগ বা পোকামাকড় দমনের জন্য বালাইনাশক স্প্রে করা একান্ত জরুরি হয়ে পড়ে। আমের ফলন মূলত নির্ভর করে আম গাছে মুকুল বা পুষ্পমঞ্জুরির সংখ্যার ওপর। তাই আমের মুকুলে পোকা বা রোগের আক্রমণ হলে মুকুল বা ফুল নষ্ট হয়ে যেতে পারে ফলে ফলধারণ ব্যাহত হতে পারে। সুতরাং মুকুলে রোগ বা পোকার আক্রমণ দেখা দেয়া মাত্রই বালাইনাশকের স্প্রে করার বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।


স্প্রের মূলনীতি : যে কোনো বালাইনাশক স্প্রে করতে ৪টি মূলনীতি অবশ্যই মেনে চলা উচিত। এগুলো হলো সঠিক বালাইনাশক নির্বাচন, সঠিক ডোজ বা মাত্রা নির্ধারণ, সঠিক সময় নির্বাচন এবং সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ।                                                               

 

সঠিক বালাইনাশক নির্বাচন : আমের রোগ বা ক্ষতিকর পোকা লাভজনকভাবে ও কম খরচে দমন করতে সঠিক ওষুধ নির্বাচন করা একটি অতীব গুরুত্বপূর্র্ণ পদক্ষেপ। ওষুধ নির্বাচনে কোনো ভুল হয়ে থাকলে স্প্রে কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে ভেস্তে যায়। এতে শ্রম, সময় ও অর্থের অপচয় ঘটে উপরন্ত আসল উদ্দেশ্য সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হয়। তখন কৃষক কীটনাশক ডিলারদের জিজ্ঞাসা করেন কি ওষুধ স্প্রে করতে হবে, এটা মোটেই ঠিক নয়। এ ব্যাপারে সঠিক পরামর্শের জন্য স্থানীয় কৃষিকর্মী, কৃষি অফিস বা আম গবেষণা কেন্দ্রে যোগাযোগ করা উচিত। একই গ্রুপের কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক  বার বার স্প্রে না করে মাঝে মাঝে পরিবর্তন করা উচিত কারণ একই ওষুধ বার বার স্প্রে করলে পোকা বা রোগের জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যেতে পারে।


সঠিক মাত্রা নির্ধারণ : সঠিক বালাইনাশক সঠিক মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে। বালাইনাশকের মাত্রা কম বা বেশি না হওয়াই উত্তম। উপযুক্ত মাত্রা না হলে রোগ বা পোকামাকড় ভালোভাবে দমন করা সম্ভব হয় না। উপরন্ত রোগের জীবাণু বা পোকার মধ্যে বালাইনাশক প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়। আবার অধিক মাত্রায় বালাইনাশকের ব্যবহার অর্থের অপচয় হয় এবং ফলগাছের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তাই বালাইনাশকের মাত্রার ব্যাপারে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এজন্য বোতল বা প্যাকেটের গায়ে লিখিত নির্দেশনা, কৃষি বিজ্ঞানীদের এবং কৃষিকর্মীর পরামর্শমতো কাজ করা উচিত।


সঠিক সময় নির্বাচন : কথায় বলে, সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়। এ কথা সত্য যে কোনো কাজ সঠিক সময়ে সমাধা করতে পারলে বাড়তি শ্রম ও বাড়তি খরচের অপচয় থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। আম গাছে মুকুল আসার পর থেকে ফলধারণ পর্যন্ত সময়টুকু বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে রোগ বা পোকার আক্রমণ হলে গাফিলতি করা মোটেই ঠিক নয়। এ সময়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হলে আমগাছে ফলধারণ নাও হতে পারে। আম বাগানে মুকুল আসার আনুমানিক ১০-১৫ দিন আগে আমগাছে প্রথম স্প্রে দিতে হবে। আমের মুকুল ১০-১২ সেমি. হলেই দ্বিতীয় স্প্রে দেয়া উচিত। মুকুলের ফুল ফোটার পর কোনো অবস্থাতেই স্প্রে করা যাবে না। আমের পরাগায়ন প্রধানত বিভিন্ন প্রজাতির মাছির দ্বারা হয়ে থাকে। তাই ফুল ফোটার সময় কীটনাশক স্প্রে করলে মাছি মারা যেতে পারে এবং আমের পরাগায়ন ও ফলধারণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। গাছ থেকে ফল পাড়ার কমপক্ষে দুই সপ্তাহ আগে গাছে কোনো বালাইনাশক স্প্রে করা উচিত নয়। গাছে মুকুল বের হওয়ার আগেই অর্থাৎ জানুয়ারি মাসে প্রয়োজনীয় অর্থ, শ্রমিক, স্প্রে যন্ত্রপাতি, ওষুধ ইত্যাদি মজুদ রাখতে হবে।


সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ : সঠিক ওষুধ, সঠিক মাত্রা, সঠিক সময় ইত্যাদি নির্ধারণের পর সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ একান্ত প্রয়োজন। স্প্রে কার্যক্রম থেকে পরিপূর্ণ ফল লাভ করতে হলে অবশ্যই সঠিক পদ্ধতিতে স্প্রে করতে হবে। ফলের মধ্যে বা ডালের মধ্যে ছিদ্রকারী পোকা অবস্থান করলে বাইরে কীটনাশক স্প্রে করলে কোনো লাভ হয় না। আমের হপার পোকা সুষ্ঠুভাবে দমন করতে হলে পাতায় স্প্রে করার সাথে সাথে গাছের গুঁড়িতেও স্প্রে করা প্রয়োজন। তাই সুষ্ঠুভাবে রোগ বা পোকা দমনের জন্য স্থানীয় কৃষি অফিস বা আম গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীদের সাথে আলাপ করে পরামর্শ নেওয়া উচিত।


যে কোনো রোগ বা ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ দমন করার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে একটি জিনিস চিন্তা করা দরকার তা হলো রোগ বা পোকা দমন করে কতটুকু লাভবান হওয়া যাবে। রোগ বা পোকার আক্রমণে যে পরিমাণ অর্থের ক্ষতি করবে দমনের খরচ যদি তার চেয়ে বেশি হয় তবে সে রোগ বা পোকা দমনের জন্য স্প্রে করা যুক্তিসঙ্গত হবে না। রোগ বা পোকার আক্রমণ কম হলে এবং তা মারাত্মক হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলে সে ক্ষেত্রে স্প্রে করা যুক্তিসঙ্গত নয়। অহেতুক স্প্রে করলে অর্র্থ ও শ্রমের অপচয় হয়। তবে আমের মুকুলে অ্যানথ্রাকনোজ বা পাউডারি মিলডিউ রোগের আক্রমণ দেখা না গেলেও আবহাওয়া যদি রোগের আক্রমণের জন্য অনুকূল হয় তবে প্রতিষেধক ব্যবস্থা হিসাবে ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে। অনুরূপভাবে আমের মুকুলে হপার বা শোষক পোকার উপস্থিতি কম হলেও প্রতিষেধক ব্যবস্থা হিসাবে কীটনাশক স্প্রে  করতে হবে। কেননা এ পোকা অনুকূল আবহাওয়ায় অতি অল্প সময়ে অনেক বংশ বৃদ্ধি করতে ও মারাত্মক ক্ষতি করতে সক্ষম।   


সতর্কতা : কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক মাত্রই বিষ। তাই এদের ব্যবহারে সব সময় সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। সতর্কতা অবলম্বনে কোনো প্রকার গাফিলতি দেখালে যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তাই কীটনাশক ডিলার ভাইদের উচিত কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক বিক্রির সময় সেগুলো ব্যবহারে কী কী সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে তা আমচাষি ভাইদের স্মরণ করে দেয়া। যে কোনো বালাইনাশক স্প্রে করার সময় নিম্নলিখিত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে-


কোনো বালাইনাশক সরাসরি হাত দিয়ে স্পর্শ করা উচিত নয়। প্রয়োজনে হাতে গ্লাবস ব্যবহার করতে হবে। যিনি বালাইনাশক স্প্রে  করবেন তার সমস্ত শরীর ঢেকে রাখার জন্য এপ্রোন পরিধান করতে হবে। চোখে চশমা ও মাথায় ক্যাপ বা হেলমেট পরতে হবে। পায়ে জুতা থাকা ভালো।


কোনো বালাইনাশক মুখে দেয়া বা গন্ধ নেয়া যাবে না। স্প্রেকালীন কোনো প্রকার খাওয়া-দাওয়া বা ধূমপান করা যাবে না। স্প্রে সময়ে পুকুর বা অন্য কোনো পানির উৎস যাতে দূষিত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। স্প্রে শেষ হলে শরীর ও জামাকাপড় সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। খাদ্যদ্রব্য ও পশুখাদ্য স্প্রে এলাকা থেকে দূরে রাখতে হবে। স্প্রে করার ২ দিনের মধ্যে গাছের নিচে গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি ইত্যাদি চরতে দেয়া অনুচিত কারণ তারা ঘাস বা মৃত পোকামাকড় খেয়ে বিপদে পড়তে পারে। বাতাসের অনুকূলে স্প্রে করতে হবে অর্থাৎ পূর্ব দিক থেকে বাতাস পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হলে গাছের পূর্ব দিকে দাঁড়ায়ে স্প্রে করতে হবে। বালাইনাশকের খালি প্যাকেট বা বোতল অন্য কোনো কাজে ব্যবহার না করে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে।
ব্যবহারের পর স্প্রে যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করে রাখতে হবে।
স্প্রে করার ১৫-২০ দিনের মধ্যে গাছের আম খাওয়া যাবেনা তাই আম পাড়ার ১৫-২০ দিন আগেই আম গাছে স্প্রে বন্ধ করতে হবে। সব বালাইনাশক শুষ্ক ও ঠাণ্ডা জায়গায় তালাবদ্ধ অবস্থায় এবং শিশুদের নাগালের বাইরে সংরক্ষণ করতে হবে।


আম বাগানের রোগ ও পোকামাকড় ব্যবস্থাপনায় প্রতিষেধকের চেয়ে প্রতিরোধক ব্যবস্থায় বেশি কার্যকরী। উল্লি­খিত বিষয়গুলোর ওপর নজর দিলে খুব সহজেই এবং কম খরচে আম বাগানের রোগ-পোকামাকড় দমন করে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব হবে। পরিশেষে আমচাষির জন্য একটি পরামর্শ হলো সম্ভব হলে একই এলাকার সব আম বাগানে একই সময়ে স্প্রে করা, এটি পোকামাকড় দমনে খুবই কার্যকর ও ফলপ্রসূ।


* ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

 

করোনাভাইরাস মোকাবেলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ৩১ দফা নির্দেশনা

০১. করোনাভাইরাস সর্ম্পকে চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ভাইরাস সম্পর্কিত সচেতনতা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে।
০২. লুকোচুরির দরকার নেই, করোনাভাইরাসের উপসর্গ দেখা দিলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন।
০৩. পিপিই সাধারণভাবে সকলের পরার দরকার নেই। চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য পিপিই নিশ্চিত করতে হবে। এই রোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত পিপিই, মাক্সসহ সব চিকিৎসা সরঞ্জাম জীবাণুুমুক্ত রাখা এবং বর্জ্য অপসারণের ক্ষেত্রে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।
০৪. কোভিড-১৯ রোগের চিকিৎসায় নিয়োজিত সকল চিকিৎসক, নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ান, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, এ্যাম্বুলেন্স চালকসহ সংশ্লিষ্ট সকলের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে।
০৫. যারা হোম কোয়ারেন্টাইনে বা আইসোলেশনে আছেন তাদের প্রতি মানবিক আচরণ করতে হবে।
০৬. নিয়মিত হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহার ও সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখাসহ এক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন।
০৭. নদীবেষ্টিত জেলাসমূহে নৌ-এ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে হবে।
০৮. অন্যান্য রোগে আক্রান্তদের যথাযথ স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখতে হবে।
০৯. পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা। সারাদেশের সকল সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদকে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে।
১০. আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ে দৃষ্টি দিতে হবে। জাতীয় এ দুর্যোগে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগসহ সকল সরকারি কর্মকর্তাগণ যথাযথ ও সুষ্ঠু সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছেন-এ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে।
১১. ত্রাণ কাজে কোনো ধরনের দুর্নীতি সহ্য করা হবে না।
১২. দিনমজুর, শ্রমিক, কৃষক যেন অভুক্ত না থাকে। তাদের সাহায্য করতে হবে। খেটে খাওয়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য অতিরিক্ত তালিকা তৈরি করতে হবে।
১৩. সোশ্যাল সেফটিনেট কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
১৪. অর্থনৈতিক কর্মকাÐ যেন স্থবির না হয়, সে বিষয়ে যথাযথ নজর দিতে হবে।
১৫. খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে, অধিক প্রকার ফসল উৎপাদন করতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য যা যা করা দরকার করতে হবে। কোনো জমি যেন পতিত না থাকে।
১৬. সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় রাখতে হবে। যাতে বাজার চালু থাকে।
১৭. সাধারণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
১৮. জনস্বার্থে বাংলা নববর্ষের সকল অনুষ্ঠান বন্ধ রাখতে হবে যাতে জনসমাগম না হয়। ঘরে বসে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নববর্ষ উদযাপন করতে হবে।
১৯. স্থানীয় জনপ্রতিনিধিগণ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সমাজের সকল স্তরের জনগণকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি। প্রশাসন সকলকে নিয়ে কাজ করবে।
২০. সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানসমূহ জেলা প্রশাসক ও উপজেলা অফিসারের সাথে সমন্বয় করে ত্রাণ ও স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
২১. জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা প্রশাসন ওয়ার্ডভিত্তিক তালিকা প্রণয়ন করে দুঃস্থদের মাঝে খাবার বিতরণ করবেন।
২২. সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী যেমন : কৃষি শ্রমিক, দিনমজুর, রিক্সা/ভ্যান চালক, পরিবহন শ্রমিক, ভিক্ষুক, প্রতিবন্ধী, পথশিশু, স্বামী পরিত্যক্তা/বিধবা নারী এবং হিজরা সম্প্রদায়ের প্রতি বিশেষ নজর রাখাসহ ত্রাণ সহায়তা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।
২৩. প্রবীণ নাগরিক ও শিশুদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
২৪. দুর্যোগ বিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলী (এসওডি) যথাযথভাবে প্রতিপালনের জন্য সকল সরকারি কর্মচারী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতি আহŸান জানাচ্ছি।
২৫. নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের উৎপাদন, সরবরাহ ও নিয়মিত বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া মনিটরিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
২৬. আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত পণ্য ক্রয় করবেন না। খাদ্যশস্যসহ প্রয়োজনীয় সব পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।
২৭. কৃষকগণ নিয়মিত চাষাবাদ চালিয়ে যাবেন। এক্ষত্রে সরকারি প্রণোদনা অব্যাহত থাকবে।
২৮. সকল শিল্প মালিক, ব্যবসায়ী ও ব্যক্তি পর্যায়ে নিজ নিজ শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বাড়ি-ঘর পরিস্কার রাখবেন।
২৯. শিল্প মালিকগণ শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে উৎপাদন অব্যাহত রাখবেন।
 ৩০. গণমাধ্যম কর্মীরা জনসচেতনতা সৃষ্টিতে যথাযথ ভ‚মিকা পালন করে চলেছেন। এক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরণের গুজব ও অসত্য তথ্য যাতে বিভ্রান্তি ছড়াতে না পারে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
৩১. গুজব রটানো বন্ধ করতে হবে। ডিজিটাল প্লাটফর্মে নানা গুজব রটানো হচ্ছে। গুজবে কান দিবেন না এবং গুজবে বিচলিত হবেন না।

 

 

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC)

(সাত বছরের সাফল্য)
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেমভুক্ত প্রতিষ্ঠান ও সহযোগী সংস্থাগুলোকে জাতীয় নীতিমালার ভিত্তিতে গবেষণা পরিকল্পনা প্রণয়ন ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ, গবেষণা কর্মকা- পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন, কর্মসূচি সমন্বয় এবং কৃষি গবেষণার মান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করে থাকে। দেশের সামগ্রিক কৃষি গবেষণাকে অধিকতর গতিশীল, যুগোপযোগী ও কার্যকর করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের কার্যপরিধি বর্ধিত, সুসংহত ও জোরদার করে কাউন্সিলকে অধিকতর দায়িত্ব প্রদান করা হয়। কাউন্সিল খাদ্য উৎপাদন ও দারিদ্র্য নিরসনে বিভিন্ন সময়ে সরকার কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ ও অগ্রাধিকারের আলোকে সরকারকে পরামর্শ প্রদান করে আসছে। এছাড়া কাউন্সিল কৃষি গবেষণা সিস্টেমের গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের মানবসম্পদ উন্নয়নের কাজ সম্পাদন করে থাকে।
কোর গবেষণা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন
এ সময়ে কৃষি গবেষণাসহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে ৭০টি কোর গবেষণা ও প্রযুক্তি হস্তান্তর কার্যক্রমে সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় ফসল, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের ১৫টি জাতসহ দক্ষিণাঞ্চল ও পাহাড়ি অঞ্চলে চাষাবাদের উপযোগী প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে। এ ছাড়া ৪৩ জন বিজ্ঞানীকে দেশের অভ্যন্তরে পিএইচডি অধ্যয়নের সুযোগ দেয়া হয়েছে। তদুপরি দেশীয় প্রশিক্ষণ, কর্মশালা আয়োজনের মাধ্যমে মোট ১ হাজার বিজ্ঞানী/সম্প্রসারণবিদ/ কৃষককে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।
ধান ও ডাল ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন কর্মসূচি
এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ধান ও ডাল ফসলের উন্নত প্রযুক্তি, সমন্বিত শস্য উৎপাদন ও বালাইব্যবস্থাপনা, মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন ও বিতরণ এবং ডালের সাথে উন্নত শস্যবিন্যাস প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ধান ও ডাল ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে ওই ফসলগুলোর উৎপাদন যথাক্রমে  ১৭.৫% ও ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে।
এগ্রিকালচারাল বায়োটেকনোলজি সাপোর্ট প্রজেক্ট (Agriculter Biotechnology Support Project)
কাউন্সিল ২০০৫ সাল থেকে এ প্রকল্পের বাংলাদেশ অংশের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছে। এ প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক সরকারের অনুমোদনক্রমে ৪টি বিটি বেগুনের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে ও এগুলো সম্প্রসারণের কার্যক্রম চলছে।
এশিয়ান ফুড সিকিউরিটি প্রকল্প
এশিয়ান ফুড সিকিউরিটি (আফাসি) শীর্ষক প্রকল্পটি ২০১০ সাল থেকে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত ধান ও গমের প্রতিকূল আবহাওয়ার জাত উন্নয়নসহ পরিচর্যা কলাকৌশল নির্ধারণপূর্বক বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকের মাঝে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক ধান ও গমের মাঠ প্রদর্শনী এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন সংস্থা কর্তৃক ধান ও গমের বীজ উৎপাদন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে তাপসহিষ্ণু গমের জাত (বারিগম-২৫, ২৬) এবং ধানের জাতসহ (ব্রিধান-৪৭, ব্রিধান-৫৫ এবং বিনাধান-৮) বেশ কিছু উন্নত প্রযুক্তি দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকায় সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
জাতীয় কৃষি প্রযুক্তি প্রকল্প-১
জাতীয় কৃষি প্রযুক্তি প্রকল্প (National Agriculter Technology Project (NATP) শীর্ষক প্রকল্পটির আওতায় দেশের প্রথিতযশা বিজ্ঞানী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দ্বারা ১০৮টি গবেষণা কার্যক্রম (শস্য, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, খাদ্য পুষ্টি, আর্থসামাজিক ও বাজার ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি) মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন হয়েছে। এনএটিপি-১ প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়ার মাধ্যমে ৫০টিরও অধিক সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় ২৯ জন বিজ্ঞানীকে বিদেশে পিএইচডি, ১০ জনকে বিদেশে পোস্ট-ডক্টোরাল এবং ৭৯ জনকে দেশে পিএইচডি অধ্যয়নের সুযোগ প্রদান করা হয়েছে।
প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা কার্যক্রম
কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কোম্পানি আইনের আওতায় কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন (KGF) গঠন করা হয়। বিএআরসি কর্তৃক কৃষি গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারিত হওয়ার পর কেজিএফ বোর্ড ২০০৯ সাল থেকে দুই পর্যায়ে অদ্যাবধি ১০১টি প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করে। এ কার্যক্রমের আওতায় এ পর্যন্ত মসুর ও রসুনের ৩টি নতুন জাত উদ্ভাবনসহ লবণাক্ত, খরা ও পাহাড়ি অঞ্চলের জন্য উপযুক্ত প্রযুক্তি নির্বাচন করা হয়েছে।
কৃষি প্রযুক্তি হস্তান্তর প্রকল্প
এ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রযুক্তি বিশোধন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের আওতায় শস্য, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য সম্পদ ও কৃষি বনায়ন কার্যক্রমে মোট ৫৫টি প্রযুক্তি ৪৩টি উপজেলায় বাস্তবায়ন করা হয়েছে। উপযুক্ত প্রযুক্তির ওপর ১৬,৭৪৪ জন  কৃষককে প্রশিক্ষণ, ১১,৮৪০টি মাঠ দিবস আয়োজন এবং ৭৬৭টি প্রদর্শনী বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
নীতিনির্ধারণী ডকুমেন্ট, আইন ও গাইডলাইন প্রণয়ন
কাউন্সিল বিভিন্ন সহযোগী সংস্থা ও বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে কমিটি গঠনের মাধ্যমে জাতীয় কৃষিনীতি, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল আইন ২০১২, মানবসম্পদ উন্নয়ন পরিকল্পনা ২০২৫, কৃষি গবেষণা অগ্রাধিকার ও ভিশন ডকুমেন্ট ২০৩০, নার্সারি আইন/গাইডলাইন-২০০৭, Intellectual Property Rights (IPR) Rules এবং Biotechnology and Biosafety Regulation & Act, Crop Zoning ম্যাপসহ বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নীতিনির্ধারণী ডকুমেন্ট প্রণয়নসহ তথ্য ও পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে সরকারকে সক্রিয় সহায়তা করছে।
জমির উপযোগিতাভিত্তিক ক্রপ জোনিং ম্যাপ প্রণয়ন
মাটি, জলবায়ু ও এলাকা উপযোগী ফসল নির্বাচন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মাননীয় কৃষিমন্ত্রীর নির্দেশে ক্রপ জোনিং ম্যাপ প্রণয়ন করা হয়েছে। এনএআরএস প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে এসআরডিআই, বিএআরআই এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় বিএআরসি কর্তৃক এ ম্যাপ তৈরির কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। এ ম্যাপ অনুসরণ করে এলাকাভিত্তিক উপযোগী ফসল উৎপাদনের জন্য কৃষকদের উৎসাহিত করার কার্যক্রম অব্যাহত আছে।
সার এবং সারজাতীয় দ্রব্যের মান নির্ধারণ
বিগত ২০০৭ সালে থেকে হাল নাগাদ বিএআরসি কর্তৃক জৈবসার ৭০টি; রাসায়নিক সার ২টি ও চএজ: ৮টি মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং জাতীয় সার প্রমিতকরণ কমিটি কর্তৃক  অনুমোদিত ও দেশে ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত  করা হয়েছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কার্যক্রম
কাউন্সিল জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেমভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের কৃষি গবেষণা সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের তথ্য/উপাত্ত যেমন- গবেষণালব্ধ ফলাফল/প্রযুক্তি, অর্থ ব্যবস্থাপনা, ক্রয়, মানবসম্পদ, প্রকাশনা ইত্যাদি ডাটাবেজ স্থাপনের মাধ্যমে সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা এবং তা সরবরাহ সেবা প্রদান করে থাকে। তথ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম কার্যকরীভাবে পরিচালনা করার মাধ্যমে ICTকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য ইতোমধ্যে কাউন্সিলসহ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহে ICT এবং MIS Cell গঠন করা হয়েছে এবং এর বাস্তবায়নের জন্য কাউন্সিলে ডাটা সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কাউন্সিলে জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সিস্টেমের (GIS) কাজ অব্যাহত আছে।
ডিজিটাল  ডিসপ্লে কেন্দ্র স্থাপন   
কৃষির ইতিহাস-ঐতিহ্য, সাফল্যগাথা, কৃষি উপকরণ, ফসলের জাত, উৎপাদন কলাকৌশল ইত্যাদি সম্পর্কে ছাত্র-শিক্ষক, বিজ্ঞানী, সম্প্রসারণবিদ, কৃষকসহ দেশি-বিদেশি পরিদর্শকদের মাঝে বাস্তব ধারণা দেয়ার মাধ্যমে কৃষি বিষয়ে আগ্রহ তৈরি এবং উদ্বুদ্ধকরণে বিএআরসির চত্বরে জাতীয় কৃষি প্রদর্শনী কেন্দ্র (NADC) স্থাপন করা হয়েছে, যা কৃষি বিপ্লবে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।
ফসলের জাত ছাড়করণ, বীজ উৎপাদন ও মান নিশ্চিতকরণ
বিগত ৭ বছরে এই কমিটির মাধ্যমে বিভিন্ন কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক উদ্ভাবিত ১৭০টিরও বেশি জাত ছাড়করণের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।

বৃহত্তর বরিশাল ও সিলেট জেলার পতিত জমির পরিমাণ নির্ধারণ ও ফসল উৎপাদন পরিকল্পনা
দেশের খাদ্য ঘাটতি পূরণকল্পে কিছু এলাকার পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় এনে উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। লাগসই কৃষি প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় এনে উৎপাদন বৃদ্ধি করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের জীবন ও জীবিকার মান উন্নয়ন করাই এ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য।
গবেষণা-সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর কার্যক্রম সমন্বয়
গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম সমন্বয় সাধনের লক্ষ্যে কাউন্সিলের নেতৃত্বে একটি জাতীয় কৃষি কারিগরি সমন্বয় কমিটি (National Agricultural Technical Coordination Committee-NATCC গঠিত আছে। এই কমিটি বিভিন্ন কৃষি কারিগরি কমিটির (Agricultural Technical Committee) কার্যক্রম পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করছে।
আন্তর্জাতিক ও দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা
কৃষি গবেষণা ও উন্নয়নে সম্প্রতি আমেরিকা, মেক্সিকো, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, ভুটান, ভিয়েতনামের সাথে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়েছে।  তাছাড়া আন্তর্জাতিক কৃষি গবেষণা সংস্থাসমূহ যেমন- (IRRI, CIMMYT, World Fish ইত্যাদির সাথে সহযোগিতামূলক কর্মকা- জোরদার করা হয়েছে। এ সহযোগিতার মাধ্যমে জার্মপ্লাজম এবং দক্ষতা উন্নয়ন ও কারিগরি জ্ঞান বিনিময়ে প্রতিটি দেশ উপকৃত হচ্ছে।
নিরাপদ ও সুষম খাবার গ্রহণে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ‘ফুড প্লেট’ তৈরি
পুষ্টি জ্ঞানের প্রচার, প্রসার ও নিরাপদ খাদ্য গ্রহণে জন সচেতনতা সৃষ্টিতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের  পুষ্টি ইউনিট একটি সচিত্র ‘ফুড প্লেট’ তৈরি করেছে। সুস্থ, সবল থাকতে ও অসুখ-বিসুখ হতে রক্ষা পেতে সুষম খাবার গ্রহণের অত্যাবশ্যকতা ও নিরাপদ খাদ্য গ্রহণে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ইতোমধ্যে এ ‘ফুড প্লেট’ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মশালার মাধ্যমে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারসহ প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বিতরণ ও প্রচারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং যা ইতোমধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
অন্যান্য  প্রকাশনা
গবেষণা ও সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য জমির স্থানীয় তথ্যের ভিত্তিতে সার সুপারিশমালা (Fertilizer Recommendation Guide-2012) প্রণীত হয়েছে। দারিদ্র্যবিমোচনে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ পুস্তক প্রকাশ করা হয়েছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ফসল নিবিড়তা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য ‘দক্ষিণাঞ্চলের উপযোগী কৃষি প্রযুক্তি’ শীর্ষক একটি পুস্তক প্রকাশ করা হয়েছে।
বিভিন্ন ফসলের উন্নত জাত এবং এগুলোর পরিচিতি ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনা সমন্বয়ে  ‘Plant vatieties developed by NARS institutes and Agrictural universities’ শীর্ষক একটি সংকলন প্রকাশ করা হয়েছে। বিভিন্ন কৃষি প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে প্রসারের লক্ষ্যে ‘Hand book of Agricultural Technology’ শীর্ষক একটি পুস্তক প্রকাশ করা হয়েছে। পতিত জমির ব্যবহারের লক্ষ্যে বৃহত্তর বরিশাল ও সিলেট জেলার পতিত জমির পরিমাণ নির্ধারণ ও ফসল উৎপাদন পরিকল্পনা বিষয়ে ডকুমেন্ট প্রকাশ করা হয়েছে। ২০১৪ সালে বিএআরসি কর্তৃক Mature Technologies of the NARS Institutes শীর্ষক একটি বই প্রকাশিত হয়েছে।

*সংকলিত, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫; www.barc.gov.bd

আলুর তৈরি রকমারি খাবার

একই পণ্য থেকে ভিন্ন স্বাদ ও গন্ধ পেতে কার না ভালো লাগে! আগেকার দিনে পণ্যের বহু ব্যবহারের কৌশল জানা ছিল না। পুষ্টি এবং মুখরোচক খাবারের কথা ভেবে আজকাল বিলাসী গৃহিণীদের মধ্যে এ নিয়ে প্রতিযোগিতার অন্ত নেই। এর পেছনে মিডিয়া প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোর অবদান সবচেয়ে বেশি। এখন শহরের পাশাপাশি গ্রামেও তা ছড়িয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে যে পণ্যগুলোর নাম উচ্চারিত হয়; এর মধ্যে আলু শীর্ষস্থানে। কেউ কেউ মনে করেন, আলুর পুষ্টিমান কম। আসলে এ ধারণা ভুল। কারণ পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, আলুতে ক্যারোটিন এবং ভিটামিন সি রয়েছে। অথচ চালে মোটেও নেই। এছাড়া ভিটামিন বি, শর্করা, আমিষ, জিংক, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম এবং আয়রন তো আছেই। সে সাথে আছে মূল্যবান উপাদান ওমেগা-৩ এবং অ্যামিনো এসিড। অপরদিকে চর্বির পরিমাণ চালের তুলনায় অনেক কম এবং গমের পাঁচ ভাগে এক ভাগ। কিডনি রোগীর জন্য এর প্রোটিন বেশ উপকারী। আলু স্কার্ভি ও রিউমেটিক প্রতিরোধী। ডায়রিয়ার ক্ষয় পূরণে কাজ করে। পাশাপাশি শরীরের ওজন বাড়াতে সহায়তা করে। ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক চাপ কমাতে ভূমিকা রাখে। আলু একমাত্র সবজি, যা সব ধরনের মাছ ও মাংস রান্নার সাথে তরকারি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। তাই হাতে কাছে পাওয়া এ সবজির তৈরি খাবারগুলোর পরিচয় জেনে নেয়া দরকার।  


আলুর পাকোরা উপকরণ : আলু ১টি,  চালের গুঁড়া ২ টেবিল চামচ,  বেসন ১ কাপ,  তেল  ৪ টেবিল চামচ, জিরা গুঁড়া ১ চা চামচ,  ধনেপাতার কুচি ২ চা চামচ, পানি আড়াই কাপ আর লবঙ্গ ও লবণ পরিমাণমতো।


প্রস্তুত প্রণালি : প্রথমেই খোসা ছাড়িয়ে আলু ছোট ফালি করে কেটে নিতে হয়। এরপর একটি পাত্রে চালের গুঁড়া এবং বেসন রেখে এর সাথে জিরা গুঁড়া ধনেপাতার কুচি, লবঙ্গ ও লবণ ভালোভাবে মিশাতে হবে। এবার ফ্রাইপ্যানে তেল দিয়ে চুলায় গরম করে তা মিশ্রিত উপকরণগুলোর সাথে মিশিয়ে অল্প পানি দিয়ে ঘনমিশ্রণ তৈরি করতে হবে। এরপর কেটে রাখা আলুর একটি ফালি মিশ্রণে ডুবিয়ে ডুবোতেলে উল্টেপাল্টে ভাজতে হয়। ভাজার কাজ ততোক্ষণ পর্যন্ত করতে হবে যখন বাদামি রঙ ধারণ হবে। এভাবেই হয়ে যাবে আলু পাকোরা।


আলুর চিপস উপকরণ : আলু ৩০০ গ্রাম এবং তেল  ৩০০ মিলিলিটার।


প্রস্তুত প্রণালি : আলু পরিষ্কার করে ধুয়ে পাতলা করে কেটে কিছুক্ষণ পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। পরে চালুনিতে রেখে পানি ঝরিয়ে ডুবোতেলে বাদামি রঙ করে ভাজতে হবে। ভাজা শেষ হলে একটি পাত্রে রেখে পরিমাণমতো লবণ ছিটিয়ে পরিবেশন করা যাবে।


আলুর কাটলেট উপকরণ : আলু ৫০০ গ্রাম, ডিম ১টি, পাউরুটির স্লাইস ১টি, পাউরুটির গুঁড়া ১ কাপ, পেঁয়াজ বাটা ১ কাপ, ময়দা ১ টেবিল চামচ,  কাঁচামরিচ ১টি এবং ধনেপাতা, তেল ও লবণ পরিমাণমতো।


প্রস্তুত প্রণালি :  আলুগুলো সিদ্ধ করার পর খোসা ছাড়িয়ে  ভালোভাবে পিষে নিতে হয়। এবার একটি পাত্রে  ময়দা,  পেঁয়াজ, মরিচ কুচি, ধনেপাতা কুচি এবং লবণ দিয়ে আলু মাখিয়ে নিতে হবে। এরপর কাটলেটের পিস তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি ডিম বিট করে নিতে হবে। কাটলেটের পিস ডিমে ডুবিয়ে এবং পাউরুটির গুঁড়ায় মেখে ফ্রাইপ্যানে গরম তেলে ভাজতে হবে। এরপর পরিবেশন।


আলুর লুচি উপকরণ : আলু ৬ টি, গমের আটা ২ কাপ, গরম মশলা ২ চা চামচ, এবং লবঙ্গ গুঁড়া, তেল ও লবণ পরিমাণমতো।


প্রস্তুত প্রণালি :  আলু সিদ্ধ করে আটার সাথে ভালো করে মিশিয়ে নিতে হয়। এরপর লুচির মতো তৈরি করে সুজির মধ্যে গড়াগড়ি দিয়ে ডুবোতেলে ভাজতে হয়। এভাবেই হয়ে যাবে আলুর লুচি।
 

আলুর সিঙ্গাড়া উপকরণ : আলু ২৫০ গ্রাম, মাংসের কিমা ১৫০ গ্রাম, আদা ২টি (ছোট টুকরো), পাঁচফোড়ন ১ গ্রাম, পেঁয়াজ ৩০ গ্রাম, মরিচ ৩টি, ময়দা ৬০০ গ্রাম, লবণ ১০ গ্রাম, তেল ৫০ মিলিলিটার, পানি ৭০ মিলিলিটার, সেইসাথে কয়েকটি তেজপাতা।


প্রস্তুত প্রণালি : আলু ছোট করে চারকোনা আকারে কেটে নিতে হয়। এরপর পেঁয়াজ কুচি, আদা, মাংসের কিমা, লবণ ও তেজপাতা সিদ্ধ করে ফ্রাইপ্যানে তেল গরম করে পাঁচফোড়ন দিয়ে আলুসহ ভালোভাবে ভাজতে হবে। আলু পুরোপুরি সিদ্ধ না হলে পানি দিয়ে আরো কিছুক্ষণ ভেজে নিতে হবে। ময়দার সাথে লবণ ও তেল মেখে আধাঘণ্টা রাখতে হবে। পরে ময়দার কাই ছোট টুকরো করে লুচির আকারে বানিয়ে ছুরি দিয়ে দুই ভাগ করতে হয়। প্রতি ভাগ লুচিপানের খিলির মতো ভাঁজ করে ভেতরে আলু ও মাংসের তরকারি ভরে নিয়ে খোলামুখে পানি লাগিয়ে মুখ বন্ধ করতে হবে। এরপর ডুবোতেলে ভেজে নিলেই মুখরোচক সিঙ্গাড়ার স্বাদ নেয়া  যাবে।
আলুর পুরি উপকরণ : আলু ৩০০ গ্রাম, ময়দা ৩০০ গ্রাম, ঘি অথবা ডালডা কিংবা সয়াবিন তেল ১৫ মিলিলিটার, লবণ ৩ গ্রাম।


প্রস্তুত প্রণালি : প্রথমে আলু সিদ্ধ করে খোসা ছাড়িয়ে ভালোভাবে চটকিয়ে নিতে হয়। এরপর ময়দা, লবণ ও সয়াবিন তেল একসাথে মিশিয়ে নিতে হবে। এ মিশ্রণের কিছু অংশ নিয়ে বলের মতো করে প্রতিটি কেন্দ্রে চটকানো আলু ঢুকিয়ে দিতে হবে। পরে বলগুলোকে রুটির মতো বেলে চ্যাপ্টা গোলাকার পুরি তৈরি করে ডুবোতেলে ভাজতে হবে। এরপর অতিরিক্ত তেল ঝরিয়ে নিয়ে পরিবেশন করা যাবে।


আলুর চপ উপকরণ : আলু ৬০০ গ্রাম, টোস্টের গুঁড়া ৩০ গ্রাম, লবণ ৫ গ্রাম, আদা ৫ গ্রাম, রসুন ১০ গ্রাম, কাঁচামরিচ ২০ গ্রাম, গোলমরিচের গুঁড়া ৫ গ্রাম, মাংসের কিমা ১০০ গ্রাম, পেঁয়াজ ৬০ গ্রাম, পুঁদিনাপাতা ২ গ্রাম, ফেটানো ডিম ১০০ গ্রাম, লবণ ৫ গ্রাম এবং পরিমাণমতো তেল।


প্রস্তুত প্রণালি : আলু সিদ্ধ করে খোসা ছাড়িয়ে ভালোভাবে চটকে নিতে হবে। মাংসের কিমার সাথে এক কাপ পানি ও তেজপাতা দিয়ে সিদ্ধ করতে হবে। ফ্রাইপ্যানে সামান্য তেল দিয়ে পেঁয়াজ ও মরিচের কুচি ভেজে, এর সাথে সিদ্ধ কিমা দিয়ে দিতে হয়। এরপর আদা বাটা ও পুঁদিনাপাতা দিয়ে কিমাকে শুকনো করে ভাজতে হবে। পরে টোস্টের গুঁড়া, ডিম ও লবণ ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হয়। চটকানো সিদ্ধআলু চপের আকারে তৈরি করে, এর ভেতরে কিমা ঢুকিয়ে দিতে হবে। পরে ফেটানো ডিমে ডুবিয়ে টোস্টের গুঁড়াতে গড়াগড়ি দিয়ে ডুবোতেলে এমনভাবে ভাজতে হবে যেন বাদামি রঙ ধারণ করে। এরপর চুলা থেকে উঠিয়ে হালকা গরম অবস্থায় খেলে বেশ লাগবে।
 

আলুর চটপটি উপকরণ : আলু ৬০০ গ্রাম, মটরশুঁটি ৬০০ গ্রাম, তেঁতুল ১০০ গ্রাম, ডিম ২টি, শসা ১০০ গ্রাম, খাবার সোডা ১ চা চামচ আর জিরা, শুকনো মরিচ, পেঁয়াজ এবং ধনেপাতা পরিমাণমতো।


প্রস্তুত প্রণালি : মটরশুঁটি ধুয়ে ১০-১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হয়। ভেজানো মটরশুঁটি ভালোকরে সোডার পানিতে সিদ্ধ করে নিতে হবে। আলু ও ডিম সিদ্ধ করে আলাদাভাবে ছোট করে কেটে নিতে হয়।  জিরা ও মরিচ ভেজে গুঁড়া করে নেয়ার পাশাপাশি পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ ও ধনেপাতা  কুুচি করার কাজ সেরে ফেরতে হবে। এছাড়া তেঁতুল ধুয়ে, পরে পানিতে ভিজিয়ে রস বের করে নিতে হবে। এবার উপকরণগুলো একসাথে মিশিয়ে চুলার আগুনে রাখতে হবে। কিছুক্ষণ পরেই  হয়ে যাবে চটপটি। এবার তেঁতুলের রস, কাঁচামরিচ, আলুসহ অন্য মসলা দিয়ে রুচিমতো নিজে খাওয়া এবং অপরকে পরিবেশন করা।


আলুর মোগলাইপরোটা উপকরণ : আলু ৫০০ গ্রাম, আটা ৫০০ গ্রাম, সয়াবিন তেল ২৫০ মিলিলিটার, ডিম ৩টি আর পেঁয়াজ, লবণ, কাঁচামরিচ এবং ধনেপাতা পরিমাণমতো।


প্রস্তুত প্রণালি : আলু সিদ্ধ করে খোসা ছাড়িয়ে, এরপর চটকিয়ে নিতে হয়। চটকানো আলুর সাথে আটা ও লবণ ভালোভাবে মিশাতে হবে। দরকার হলে পানি ব্যবহার করা প্রয়োজন। এবার ডিম, পেঁয়াজ কুচি ও ধনেপাতা দিয়ে মামলেট বানিয়ে তা ভেঙে ঝুরঝুরে করে, সেইসাথে চটকানো আলু ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হয়। এ মিশ্রণ থেকে পরিমাণমতো নিয়ে রুটি তৈরি করে ফ্রাইপ্যানে গরম তেলে ভাজতে হবে। তাহলেই হয়ে যাবে আলুর মোগলাই পরোটা।
আলুর সবজিখিচুরি উপকরণ : আলু ৫০০ গ্রাম, চাল ১০০ গ্রাম, ডাল ১০০ গ্রাম, গাজর অথবা মিষ্টিকুমড়া ৫০০ গ্রাম, আদাবাটা ১ চা চামচ, ডিম ১টি, তেল ৩০ মিলিলিটার, লবণ ও হলুদের গুঁড়া পরিমাণমতো।


প্রস্তুত প্রণালি : আলু এবং গাজর ধুয়ে কুচি করে কেটে নিতে হয়। এর সাথে চাল ভালোভাবে ধুয়ে মিশিয়ে নিতে হবে। চুলায় হাঁড়ি বসিয়ে গরম তেলে পেঁয়াজ কুচি ও মরিচের ফালি ভেজে নেয়ার কাজ সেরে ফেলতে হবে।  পেঁয়াজ ও মরিচ বাদামি রঙ ধারণ করলে আলু, চাল, ডাল এবং গাজর সবগুলো তেলের মধ্যে ঢেলে, সেইসাথে আদা, হলুদ, লবণ দিয়ে কিছুক্ষণ নাড়তে হবে। এতে পরিমাণমতো গরম পানি দিতে হয়, যেন সবটুকু সিদ্ধ হয়ে যায়। সিদ্ধ হলে ডিম ভেঙে ফেটে দিতে হবে। কিছুক্ষণ রেখে দিলেই হয়ে যাবে আলুর সবজি খিচুরি।


এছাড়া আলুভাজি, আলুর দম, আলুর ঝোল, ভর্তা, চাটনি, লাবড়াও নিরামিষ সবার পরিচিত। এর পাশাপাশি আধুনিক রেসিপিও আছে; যেমনÑ আলুর পোস্ত, আলুর চাট, কাঠি কাবাব, দোপেঁয়াজো, টোস্ট, বার্গার, টিক্কি এবং দোলমা। আবার মিষ্টি জাতীয় খাবার যেমন- আলুর পায়েশ, আলুর দই, বুন্দিয়া, রসমালাই, জিলাপি, বরফি, হালুয়া, কালোজাম, পিঠা, মোরব্বা, জর্দাসহ আরো অনেক।


এক খাবার বার বার খেতে মন চায় না তবে স্বাদ পরিবর্তন করে খেলে ভালো লাগে। আর তা যদি হয় কম খরচের তাহলে তো কথাই নেই। তাই আসুন, আলুর তৈরি এসব রকমারি খাবার খেয়ে দেহে পুষ্টি বাড়াই। সে সাথে ভাতের  চাপ কমাই।

নাহিদ বিন রফিক*

*টেকনিক্যাল পার্টিসিপেন্ট, কৃষি তথ্য সার্ভিস, বরিশাল; মোবাইল নম্বর : ০১৭১৫৪৫২০২৬; ই-মেইল :tpnahid@gmail.com

 

কবিতা (পৌষ ১৪২৩)

শীতের কৃষি
গাজী মাজহারুল ইসলাম অপু*

শীতকাল নিশ্চিত মৌসুম অনেক ফসলের জন্য
অধিক ফসল ফলিয়ে আমার দেশকে করবো ধন্য।
ফুলকপি বাঁধাকপি লাউ মুলা গাজর আছে কত
টমেটো বেগুন শালগম ওলকপি শাকসবজি শিম শত শত।
শুকনা ভাব আছে বলে এ মৌসুমে সেচ দিতে হয়
সেচ না পেলে ভালো ফলন তাতে হওয়ার নয়।
জৈবসার রাসায়নিক সার সুষম মাত্রায় দেবে
সময় মতো যত্নআত্তিতে অধিক ফলন নেবে।
শাকজাতীয় ফসল আবাদ একের অধিক ভাই
একই জমিতে তিন-চারবার আবাদ করলে পাই।
স্বাদে গন্ধে পুষ্টিতে ভরা শীত মৌসুমের ফসল
গোলা ভরে নাও তোমরা খাটিয়ে বিশেষ কৌশল
ডাল ফসল তেল ফসল আরও কত আছে
শ্রম দিয়ে ঘাম বিনিয়োগে পাবে হাতের কাছে।
গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করো বোরো ধানে ভাই
কম খরচে বেশি লাভ এর তুলনা নাই।
আইপিএম আইসিএম প্রয়োগ করো ক্ষেতে
পরিবেশবান্ধব কৃষি দিয়ে উঠব সবাই মেতে।
অপকারি পোকামাকড় ধ্বংস কর তবে
বন্ধু পোকা বাঁচিয়ে রাখলে বেশি ফলন হবে
হাত পরাগায়ন পরিচর্যা আগাছা বাছাই করে
নিশ্চিত ফলন তুলে নাও গোলা কিংবা ঘরে
মোটেও কর না হেলাফেলা শীতের মৌসুম এলে
যত পার ফলিয়ে নাও অলস সময় ফেলে।
কৃষি দিয়ে সমৃদ্ধ করব আমাদেরই দেশ
সুখে শান্তিতে টইটুম্বুর সোনার বাংলাদেশ॥

 

কৃষিতে স্বাধীনতা

মো. জুন্নুন আলী প্রামাণিক**
স্বাধীনতা কৃষককে দিয়েছে মুক্ত কর্ম শক্তি,
পরাধীন নির্যাতনে নীরব কষ্ট থেকে মুক্তি।
চারিদিকে বিকশিত ফসল মাঠ স্নিগ্ধ রূপে,
আধুনিক চাষাবাদ নির্বিঘ্নে চলে নানা ধাপে।
নির্বিচার অত্যাচার মিটিয়ে গেছে আর নেই,
ঘাতকেরা পরাজয়বরণ করে জব্দ তাই।
অনাহূত অন্যায়ের ছোবল মেরে ক্ষতি করে,
হিংসার লেলিহান শিখায় শান্তি পায় পুড়ে।
উদ্ভিদের ছায়াময় শাখায় আজ পাতা নড়ে,
নির্মলতা বিস্তরণে স্বাধীন বায়ু ছোটে উড়ে।
সমৃদ্ধির জোয়ারের চলন্ত স্রোতে নব সাড়া,
ফুলফল নির্দ্বিধায় রূপের মাঝে হয় সেরা।
খাদ্যশস্য ফলানোর সোনালি আশা মনে ফোটে,
সারা দিন উৎসাহে চঞ্চল চাষি মাঠে খাটে।
স্বাধীনতা সুপথের সন্ধান দিয়ে ডাকে জোরে,
সারেসিক্ত মৃত্তিকার সবুজ বুক শস্যে ভরে।
গাছগুলো বাড়ার প্রেরণা পেয়ে শুধু বাড়ে,
বণ্যপ্রাণী বনানীর আড়ালে ভীতিশূন্য ঘরে।
বৃহত্তর ক্ষুদ্রতর খামার গড়ে মুগ্ধ চাষি,
কৃষি ক্ষেত্র উন্নয়ন সান্নিধ্যে ফল দেয় বেশি।
অনাহার অভাবের দুর্দিনগুলো গেছে সরে,
মাছে ভাতে বাঙালির সান্ত¡না জোটে স্বস্তি ফেরে।
স্বাধীনতা কৃষকের সহায় শক্তি ফিরে দেয়,
প্রযুক্তির প্রগতির ধারায় চাষি ধন্য হয়।
মৌসুম যখন শান্ত
মৌসুম যখন সহজ সরল শান্ত মেজাজে থাকে,
আকাশে বাতাসে জমিনে তখন মিষ্টি পাখিরা ডাকে।
বিচিত্র ফসলে মাঠের বুকটি শক্তি সান্ত¡না পায়,
কৃষান-কৃষানি সার্থক শ্রমের প্রাপ্তি দু’হাতে লয়।
সময় মতন বৃষ্টির জোগানে জমি সজাগ হয়,
সমস্যা থাকে না চাহিদা পূরণে সব ফসলে জয়।
শীতল বাতাস সোহাগে উড়িয়ে দিগি¦দিক ছোটে,
সবুজ হাসির শখের আবাদ পূর্ণ সকল মাঠে।
সুযোগ সুবিধা এগিয়ে চলার পথ ধরিয়ে আসে,
ফলন অধিক নিয়ম মানায় কৃষি বারটি মাসে।
চাঁদনি আকাশ রাতেরবেলায় জ্বলে আলোর মতো,
স্বচ্ছতা প্রকাশে সুনীল শূন্যের রূপ লহরী শত।
তারকাগুলোর ছড়ানো আলোক রশ্মি মাটিতে পড়ে,
অনন্ত অসীম সীমানা তখন দৃষ্টিসীমার ধারে।
স্বাগত জানার ঘাটতি থাকে না চাষি নিমগ্ন ক্ষেতে,
ওষুধ সারের অভাব হয় না সুষ্ঠু উপায়ে দিতে।
অনেক প্রকার সবজি জমিতে নিজ গতিতে বাড়ে,
দায়িত্বে বিশুদ্ধ রাখলে সেসব পুষ্টি জোগায় জোরে।
বন্যার কবলে খরার প্রকোপে বাধা বিপত্তি হলে,
উপায় পাবার অনেক সুযোগ আছে কৃষি অফিসে গেলে।
সহায় জোগাড় মৌসুমি বায়ুর সেবা যখন ভালো,
উন্নত জাতের ফসল তখন ছড়ায় সোনালি আলো॥

*গ্রাম-পূর্ব ধুপতি, ডাকঘর-ধুপতি, সদর, বরগুনা। **গ্রাম-বিদ্যাবাগিশ, ফুলবাড়ী, জেলা-কুড়িগ্রাম লঁহহঁহ১৯৬২@মসধরষ.পড়স

দেশি ফলের জাত উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ (কৃষিকথা আষাঢ়-১৪২৪)

ফল হলো নিষিক্ত ও পরিপক্ব ডিম্বাধার। অন্য কথায় ফল বলতে আমরা বুঝি আম, জাম, পেয়ারা, কলা, পেঁপে, কাঁঠাল, আনারস, আপেল, আঙুর আর লেবু এবং কমলালেবুকে। কেননা, চোখের সামনে এদের প্রায় সব সময় দেখি, হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়। এসব ফল দেশের প্রায় সব এলাকাতে জন্মে। এসব ফলকে তাই আমরা বলি প্রচলিত ফল। এসব ফলের বাইরেও অনেক ফল পাওয়া যায়। এসব ফলকে বলা হয় অপ্রচলিত বা স্বল্প পরিচিত ফল। অর্থাৎ এসব ফলের অস্তিত্ব আছে, খুঁজলে পাওয়া যায় কিন্তু যখন তখন চোখে পড়ে না, দেশের সব এলাকায় জন্মে না, গাছের দেখা মেলে খুব অল্প। চাহিদা কম, প্রাপ্যতা কম, এদের অনেকে বনেবাদাড়ে নিতান্ত অনাদরে অবহেলায় বেড়ে ওঠে। প্রগতির ধারায় কেউ এদের পরিকল্পনায় আনে না। চাষাবাদ দূরে থাক প্রয়োজনীয় খাবার কিংবা পানিও অনেকের ভাগ্যে জোটে না। কোনো কোনোটার ঔষধিগুণ ও মানুষের জন্য উপকারী নিরামক, ধাতব ও অত্যন্ত প্রাণ রাসায়নিক দ্রব্যাদিতে সমৃদ্ধ হলেও মানুষের রসনাকে তৃপ্ত করতে পারছে না। অতীতে ফলের সংখ্যা হয়তো আরও বেশি ছিল। নানা কারণে এবং আমাদের অসচেতনতায় সেসব ফলের অনেকই দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এরা দিন দিন বিলুপ্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে।
অনাদিকাল ধরে যেসব ফল এদেশে চাষ হয়ে আসছে সেগুলোই আমাদের দেশি ফল। এ পর্যন্ত এ দেশে মোট ১৩০টি দেশি ফলের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৬০টি বুনো ফল। তবে সেসব ফলও  যথেষ্ট পুষ্টিসমৃদ্ধ ও সুস্বাদু। বাকি ৭০টি ফলের মধ্যে আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, নারিকেল, লিচু, কুল, লেবু, আনারাস, কলা ও পেঁপে এ ১০টি  এ দেশের প্রধান দেশি ফল।
 

দেশি ফল কোনোগুলো? এটা একটি বিতর্কিত প্রশ্ন বটে। সহজে উত্তর হলো যেসব ফলের উৎপত্তি ও চাষ এ দেশের ভূখণ্ডে বা এ অঞ্চলে সেসব ফলকে আমরা দেশি ফল বলতে পারি। তর্কটা সেখানেই, ফল তো দেশ চেনে না। তার উপযুক্ত জলবায়ু ও মাটি যেখানে সেখানে সে জন্মে থাকে। সে অর্থে যেসব ফলের উৎপত্তি  আমাদের অঞ্চলে সেসব ফলের সংখ্যা খুবই কম। অধিকাংশ ফলই হাজার হাজার বছর আগে অন্যান্য দেশ থেকে এ দেশে এসে খাপ খাইয়ে নিয়েছে এবং কালক্রমে সেগুলো আমাদের ফলে পরিণত হয়েছে। সব বিদেশি ফল আবার এ দেশে ভালো ফল দেয় না। যেসব ফল অনায়াসে এ দেশে জন্মে ও ভালো ফলন দেয় সেসব ফলকে এখন আমরা দেশি ফল হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। দেশীয় এসব ফলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এসব ফল একরকম বিনা যত্নেই এ দেশের মাটিতে ভালো ফলে। সাধারণত এসব ফলের গাছের তেমন কোনো সার সেচ দেয়া হয় না। এ দেশের মাটি ও জলবায়ুতে খুব ভালোভাবে এসব ফলের গাছ মানিয়ে গেছে। ঝড়-বাতাস কিংবা বন্যা খরাও অনেক দেশি ফলের গাছকে সহজে মারতে পারে না। এ যে দেশি ফলের ব্যাপকভাবে খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা বা ওয়াইড অ্যাডাপ্টিবিলিটি, তা কিন্তু অনেক বিদেশি ফলেরই নেই।
দেশি ফলের আর একটা সুবিধা হলো, বিদেশি ফলের বা উন্নত জাতের ফল গাছের মতো এসব ফল বা ফল গাছে অত বেশি রোগ পোকার আক্রমণ হয় না। তবে দেশি ফলে সবচেয়ে বেশি মেলে পুষ্টি। দেশি ফলের মতো এত বেশি পুষ্টি কখনও বিদেশি ফলে মেলে না। একটা ছোট্ট আমলকীতে যে পরিমাণ ভিটামিন সি আছে তা পাঁচটা বড় কমলাতে পাওয়া যাবে না। তাছাড়া আমাদের দেশে কলা, কুল, নারিকেল ছাড়া প্রায় সব ফলই জন্মে গ্রীষ্ম বর্ষার। কিন্তু দেশি অনেক ফল আছে যেগুলো অন্য মৌসুমেও জন্মে। তাই সারা বছর ধরেই বলতে গেলে ফল খাওয়ার একটা সুবিধা মেলে। শুধু পুষ্টি বা প্রাপ্যতার দিক দিয়ে নয়, এখন অনেক দেশি ফলের দাম বিদেশি ফলের চেয়ে কম নয়।
 

আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, লিচু, কলা, আনারস, পেঁপে, নারিকেল ও কুল এ ৯টি আমাদের দেশের প্রধান ও প্রচলিত দেশি ফল; এগুলোকে আমরা সবাই চিনি। অনেকেই হয়ত চিনি আরও কিছু অপ্রধান ও স্বল্প আকারে চাষকৃত ফল সফেদা, কামরাঙা, লটকন, আমড়া, বাতাবিলেবু, কদবেল, বেল, জলপাই, তাল, খেজুর, তেতুঁল, জাম, জামরুল, আমলকী, বাঙি, তরমুজ, পেয়ারা ফলকে। কিন্তু অনেকেই চিনি না লুকলুকি, ডেউয়া, ডেফল, করমচা, জংলিবাদাম, কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, গোলাপজাম, তুঁত, তিনকরা, সাতকরা, আদা জামির, জামির, মনফল, অরবরই, আঁশফল, তারকা ফল, গাব, বিলাতি গাব, আতা, শরিফা, কাউফল, তৈকর, ডালিম, চালতা, ডুমুর, বৈঁচি, টকআতা, পানিফল, সিঙ্গাড়াফল, জিলাপিফল, পদ্মফল, মাখনা, রুটিফল, বকুল, ফলসা, চুকুর, পাদফল, চিকান, পানকি চুনকি, টুকটুকি বা টাকিটাকি, বিলিম্বি, ডালিম,  ক্ষুদিজাম ফলকে। এ ফলগুলোর অধিকাংশই এখন বিপন্ন। বসতবাড়িতে দু-একটি গাছ রয়েছে, বনে জঙ্গলেও কিছু আছে। অথচ পুষ্টি মানে এমনকি স্বাদ বৈচিত্র্যে এসব ফলের কোনো তুলনা হয় না। কেননা এক এক ফলের স্বাদ ও পুষ্টিগুণ এবং ভেষজ মূল্য এক এক রকম। অথচ এক রকম অবহেলা করেই আমরা আমাদের এসব ফলকে হারাতে বসেছি। তবে আমাদের সৌভাগ্য যে, এখনও অল্প স্বল্প হলেও এর অনেক ফলই দেশের মাটিতে টিকে আছে। এরই মধ্যে অনেক দেশি ফলকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি। তাই চাষের উদ্যোগ না নিলে বন থেকে বুনো ফল হিসেবেই হয়ত তা এদেশ থেকে অচিরেই হারিয়ে যাবে।
 

তবে এখন যেটা জরুরি এসব জার্মপ্লাজমকে দেশের মধ্যে টিকিয়ে রাখা। বিলুপ্ত হওয়ার আগেই পদক্ষেপ নেয়া দরকার। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্যানতত্ত্ব বিভাগে একটি ফলের জার্মপ্লাজম সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছে, গবেষণাও চলছে সেখানে। ১৯৯১ সাল থেকে তরুণ মেধাবী ও বুদ্ধিদীপ্ত গবেষকদের নিরলস গবেষণার  ফলে বিভিন্ন প্রজাতির ফলের জাত বের করা সম্ভব হয়েছে। এ জাতগুলোর মধ্যে আমের ২৫টি, পেয়ারার ১০টি, কুলের ৩টি, লেবুর ৪টি, জাম্বুরার ৫টি, লিচুর ৪টি, তেঁতুল ৩টি, কামরাঙা ৩টি, জলপাই, লটকন, আমলকী, ডুমুর, অরবরই, কদবেল, কাঁঠাল ও আমড়ার ১টি করে জাত, জামরুলের ৩টি ও সফেদার ৩টি জাত রয়েছে। এ জার্মপ্লাজম সেন্টার থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার চারা  ১৯৯১ সাল থেকে VFFP CARE-SHABGE এর মাধ্যমে উত্তরবঙ্গে ৯৯৭টি মাতৃগাছের বাগান তৈরি করে দিয়েছে এবং ২০০২ সাল থেকে World Vision Bangladesh এর মাধ্যমে ৭৯৫টি মিশ্রফলের বাগান স্থাপন করেছে। এছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশেষ করে  YRFPProject-DAE, BRAC, PROSHIKA, CARITAS, BADC, DAE, CDCS, IDEA, CHEVRON, PARI, fh Bangldesh, NEElachol, Paragon group, MATI, CARE, FAO,UNDP I World Vision Bangladesh এর মাধ্যমে অসংখ্য বংশানুক্রমিক (PEDIGREE) মাতৃগাছ কৃষকের দোরগোড়ায় সম্প্রসারণ করে যাচ্ছে। বংশীয় মাতৃগাছের ক্ষেত্রে এ সেন্টারটি এদেশের মানুষের কাছে অতি পরিচিত, অনন্য।
 

বাউ-জার্মপ্লাজম সেন্টার, বাকৃবি, ময়মনসিংহ বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে অতিরিক্ত লবণাক্ত মাটি, পাহাড়ি এলাকায় অম্লীয় মাটি, মঙ্গা এলাকায় বেলে মাটি ও বন্যা কবলিত উর্বর বেলে দো-আঁশ মাটিতে জার্মপ্লাজম সেন্টার কর্তৃক মুক্তায়িত ফলের অভিযোজন যাচাইয়ের ওপর গবেষণা করেছে। এ গবেষণাটি ড্যানিডার অর্থায়নে বাউ-জার্মপ্লাজম সেন্টার কর্তৃক উদ্ভাবিত ১৬টি জাতের দেশের দক্ষিণাঞ্চলে, উত্তরাঞ্চলে এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ৮টি জেলার ১৫টি উপজেলার প্রত্যেকটিতে ৩০ শতাংশ জমির ওপর ১২৯৬০টি চারার সমন্বয়ে ৬০টি মিশ্রফল বাগান তৈরি ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এডাপটেশন ট্রায়াল করা হয়, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটেও গবেষণা চলছে। এ ইনস্টিটিউটেও ফলের বিভিন্ন প্রজাতির ফলের জাত নিবন্ধন করেছে। এ জাতগুলোর মধ্যে আমের ১৫টি, কাঁঠাল ৩টি, কলা ৪টি, পেঁপে ১টি, পেয়ারা ২টি, বাতাবিলেবু ৩টি, লেবু ২টি, নারিকেল ২টি, আমড়া ১টি, আমলকী ১টি, বিলাতি গাব ১টি, সফেদা ৩টি, কুলের ৪টি, কামরাঙা ২টি, তেঁতুল ১টি, লিচু ৫টি, জামরুল ২টি,  জলপাই, কদবেল, বেলের ১টি করে জাত। এসব জাতগুলো  বিভিন্ন বেসরকারি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্প্রসারণ হয়ে আসছে।
 

সরকারও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব ফলকে জনপ্রিয় ও সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর জাতীয় পর্যায়ে ফল প্রদর্শনীর আয়োজন করছেন। দেশের প্রতিটি বাড়িতে এ বৃক্ষরোপণ মৌসুমে বিলুপ্ত প্রায় অপ্রচলিত ফলের অন্তত একটি চারা রোপণ করা উচিত বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। তা হলে হয়তো খুব অল্প সময়েই জেগে উঠতে পারে হারানো ফলের হারানো রাজ্য, বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে অনেক ফল প্রজাতি। তবে তার আগে যেটা দরকার সেটা হল বিলুপ্ত প্রায় ফলগুলো চিহ্নিত করা এবং এগুলোর ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করা, যেগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার পথে সেগুলো রক্ষা করার চেষ্টা করা। আর যেগুলো অবাঞ্ছিত হয়ে পড়ে আছে তাদের উপড়ে তোলার পথ খোঁজা।
 

শুধু সরকার দেশি ফল প্রসারের ক্ষেত্রে ভূমিকা নিলে তা পরিপূর্ণ হবে না, এজন্যই দরকার দেশের সব জনগণের সম্মিলিত কার্যকর অংশগ্রহণ। প্রয়োজন ও প্রাপ্তির ব্যবধানের কারণ একদিকে যেমন সচেতনতার অভাব অন্যদিকে রয়েছে উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা। তাই দেশের খাদ্যপুষ্টির চাহিদা পূরণসহ আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে দেশি ফলের উৎপাদন ও ব্যবহার অনস্বীকার্য। সুতরাং স্বাদে, গন্ধে, পুষ্টিতে শ্রেয়তর আমাদের বর্ণিল দেশীয় ফলগুলোর উৎপাদন দেশব্যাপী সারা বছর বাড়িয়ে তুলতে হবে। উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রয়োজন উপযুক্ত সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থাপনা। এতে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ পরিসরে গড়ে উঠবে আরও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প। ফলে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি হবে আরও মজবুত ও গতিশীল, দেশবাসী পাবে খাদ্যে পুষ্টিমানসম্পন্ন একটি ভবিষ্যৎ।

 

প্রফেসর ড. এম. এ. রহিম*
ড. মো. শামছুল আলম (মিঠু)**

*উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ ও পরিচালক, জার্মপ্লাজম সেন্টার, বাকৃবি; **সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার, উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ, বিনা, ময়মনসিংহ

 

খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে পারিবারিক খামার

১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে পারিবারিক কৃষি : প্রকৃতি সুরক্ষা, সবার জন্য খাদ্য (Family Farming: Feeding the world, caring for the earth.) অর্থাৎ পৃথিবীকে যত্নে রেখে পারিবারিক খামারের মাধ্যমে বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন। এ প্রতিপাদ্যের উদ্দেশ্য হচ্ছে পারিবারিক খামারে শাকসবজি, ফলমূল, ফসল, গৃহপালিত পাখি, গৃহপালিত পশু, মাছ ইত্যাদি কৃষি পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন করা। তবে শর্ত হচ্ছে পৃথিবীর পরিবেশ যেমন- মাটি, পানি, বায়ু ইত্যাদি সুস্থ রাখতে হবে। মূল বিষয় হচ্ছে- পারিবারিক অর্গানিক ফার্মিংয়ের মাধ্যমে মানুষের পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন করা। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) ২০১৪ সনকে পারিবারিক খামার বর্ষ ঘোষণা করেছে। ক্ষুধামুক্ত ও সুস্থ মানুষ দিয়ে বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যে (FAO) এর জন্মকাল ১৯৪৫ সন থেকে ১৬ অক্টোবরকে স্মরণ করে বিশ্ব খাদ্য দিবস পালন করছে। বিশ্বের সব মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সচেতনতার  মাধ্যমে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো প্রতি বছর বিশ্ব খাদ্য দিবস পালন করে। বাংলাদেশেও কৃষি মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিশ্ব খাদ্য দিবস পালন করে।
 
খাদ্য নিরাপত্তা
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (১৯৯৬) মতে, খাদ্য নিরাপত্তা হচ্ছে- সব মানুষের কর্মক্ষম ও সুস্থ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য চাহিদার বিপরীতে পছন্দমতো পর্যাপ্ত নিরাপদ এবং পুষ্টিকর খাদ্য প্রাপ্তির বাস্তব ও আর্থিক ক্ষমতা থাকা। খাদ্য নিরাপত্তা অর্জিত হয়েছে কি না বোঝার উপায় হচ্ছে- জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ থাকবে, সময় ও অঞ্চলভেদে সরবরাহ স্থিতিশীল থাকবে, সবাই খাদ্য ক্রয় বা সংগ্রহ করতে পারবে, পুষ্টিকর ও নিরাপদ স্বাস্থ্যকর খাদ্য সহজলভ্য থাকবে। অর্থাৎ খাদ্য নিরাপত্তার মূল বিষয় তিনটি ১. খাদ্যের সহজ প্রাপ্যতা।  ২. খাদ্যের লভ্যতা।  ৩. স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাদ্য। (FAO) এর খাদ্য নিরাপত্তার সংজ্ঞানুসারে বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা থেকে দূরে রয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা দ্রুত নিশ্চিত করাও সম্ভব নয়। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় ১৭টি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের জন্য করণীয় হচ্ছে ১. ফসলের উৎপাদন খরচ কমানো। ২. খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি। ৩. আবাদি জমি বাড়ানো। ৪.প্রাকৃতিক দুর্যোগসহনশীল জাত উদ্ভাবন। ৫. জলবায়ু পরিবর্তন উপযোগী প্রযুক্তি উদ্ভাবন। ৬. আন্তঃফসল, মিশ্র ফসল, রিলেফসল, রেটুন ফসল চাষ করা। ৭. সেচের জমি বৃদ্ধি করা। ৮. উফশী ও হাইব্রিড ফসল চাষ করা। ৯. শস্য বহুমুখীকরণ করা। ১০. জৈব প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত ও প্রচুর চারা উৎপাদন করা। ১১. রোগবালাই দমন করা। ১২. প্রতি ইঞ্চি জমি চাষ করা। ১৩. ধানক্ষেতে মাছ চাষ, পুকুরে মাছ-মুরগি-হাঁসের সমন্বিত চাষ করা। ১৪. রোগ ও পোকা দমনে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা। ১৫. সহজশর্তে ঋণ দেয়া। ১৬. পশুপাখির জন্য জৈব নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ১৭. ভর্তুকি বাড়ানো। ১৮. সংরক্ষণাগার বাড়ানো। ১৯. কৃষি উপকরণ সরবরাহ। ২০. শস্যবীমা চালু করা। ২১. পতিত জলাশয়ে মাছ চাষ করা ইত্যাদি। খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন করা কঠিন কাজ, কারও একার পক্ষে সম্ভব না। কৃষক, শ্রমিক, কৃষিবিদ, কৃষিবিজ্ঞানী, কৃষি বিশেষজ্ঞ, কৃষিকর্মী, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সবাই একত্রে কৃষি সমবায় গঠন করে কাজ করলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।

বিশ্ব খাদ্য পরিস্থিতি
বিগত ১৫০ বছরের মধ্যে পৃথিবী এখন সবচেয়ে ভয়াবহ খাদ্য সংকটে আছে। কারণ পৃথিবীর জনসংখ্যা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে, খাদ্য উৎপাদন বাড়ছে গাণিতিক হারে। অপরদিকে, আবাদি জমি কমছে, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কৃষি উপকরণ সংকটসহ হাজারো সমস্যার জন্য কৃষি উৎপাদন কাক্ষিত পর্যায়ে বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। ঋঅঙ এর হিসাবে পৃথিবীতে বর্তমানে ২২টি দেশ বেশি খাদ্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির সূচকের তালিকায় ১৯৬টি দেশ রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ২৭, পাকিস্তানের ২২, ভারতের ৫১ ও চীন ১২৫তম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। বিশ্বে ক্ষুধা নামক নীরব ঘাতকের হাতে প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজার লোক মারা যাচ্ছে। ৮৫২ মিলিয়ন লোক ক্ষুধার্ত থাকে। ৮৮টি উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৭০তম। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী দেশের ৫০ শতাংশ পরিবার বছরের কোনো না কোনো সময় খাদ্য সংকটে থাকে, ২৫ শতাংশ নিয়মিতভাবে সারা বছর খাদ্য পায় না, ১৫ শতাংশ পরিবার সবসময় পরের বেলা খাবার নিয়ে চিন্তিত থাকে এবং ৭ শতাংশ মানুষ কখনোই তিন বেলা খেতে পায় না। বর্তমানে দেশের ৪০% মানুষ অতিদরিদ্র। প্রায় ২৮% মানুষ এক ডলারের কম আয়ে জীবনযাপন করছে। বিশ্বে প্রতিদিন না খেয়ে থাকে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ। উন্নত বিশ্বে প্রতি বছর খাদ্য অপচয় হয় ২২ কোটি টন।

দেশের খাদ্য উৎপাদন
দেশে প্রায় ১.৪৭% হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর ২ থেকে ২.৫% হারে (৩.৫ লাখ টন) খাদ্যশস্যের চাহিদা বাড়ছে। বর্তমানে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৩ কোটি ৬২ লাখ টন চাল প্রয়োজন। বর্তমান সরকার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ তথা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যথেষ্ট সচেতনতার সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। যেমন- কৃষকদের উপকরণ সহায়তা কার্ড প্রদান; আউশ ধান নেরিকা ও ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল চাষে প্রণোদনা; বিনামূল্যে ফসলের বীজ ও সার প্রদান; প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে সহায়তা প্রদান; বিএডিসি এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে মানসম্মত বীজ উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধিকরণ; জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া মোকাবেলায় কৃষিক্ষেত্রে লাগসই প্রযুক্তি উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ; ই-কৃষি বা ডিজিটাল কৃষি প্রযুক্তির প্রসার; মানসম্মত বীজের সরবরাহ; প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা; বাজার ব্যবস্থাপনা ও সেচের পরিধি বৃদ্ধিকরণ; ইলিশের উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধিকল্পে ডিম ছাড়ার মৌসুমে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধকরণ এবং জেলেদের খাদ্য সহায়তা প্রদান; কৃষি ও কৃষকের স্বার্থে খাদ্য নিরাপত্তা বিধানে ইউনিয়ন ও ব্লকপর্যায়ে কৃষি তথ্যসেবা কেন্দ্র চালু উল্লেখযোগ্য। ইতোমধ্যেই এসব কর্মসূচির সুফল পাওয়ায় দেশের খাদ্যভাণ্ডার যথেষ্ট সমৃদ্ধ হয়েছে।

পারিবারিক খামারের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন
যে স্থানে কৃষিপণ্য উৎপাদন করা হয় সে স্থানকে খামার বলে। প্রতিটি পরিবারেই খামার করার সুযোগ রয়েছে। কারণ যার জায়গা জমি কিছুই নেই শুধু একটি ঘর আছে। সেও ঘরের চালে লাউ, মিষ্টিকুমড়া, পুঁইশাক, ধুন্দুল, চিচিঙ্গাসহ বিভিন্ন লতালো শাকসবজি চাষ করতে পারে। বাংলাদেশে মোট পরিবারের সংখ্যা ২ কোটি ৮৬ লাখ ৯৫ হাজার ৭৬৩টি। এর মধ্যে কৃষি পরিবার হচ্ছে ১ কোটি ৫১ লাখ ৮৩ হাজার ১৮৩টি। এসব প্রতিটি পরিবারেই একটি করে খামার গড়ে তুলতে পারে। এ পরিবারগুলো অকৃষি খাতে জীবন নির্বাহ করা ১ কোটি ৩৫ লাখ ১২ হাজার ৫৮০টি পরিবারের খাদ্যের জোগান দেয়। প্রতিটি কৃষি পরিবারের বাড়ির আঙিনায় শীতকালে পালংশাক, লালশাক, ডাঁটাশাক, শিম, লাউ, বরবটি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, গাজর, লেটুস, ধনিয়া ইত্যাদি চাষ করা যায়। গ্রীষ্মকালে- চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, শসা, ধুন্দুল, চিচিঙ্গা, ঝিঙা, কলমিশাক এবং বর্ষাকালে- কচু, ডাঁটাশাক, লালশাক, কলমিশাক ইত্যাদি চাষ করা যায়। প্রতিটি কৃষি পরিবারের আনাচে কানাচে- লেবু, পেয়ারা, বরই, পেঁপে, ডালিম ইত্যাদি ফল চাষ করা যায়। এছাড়াও প্রতিটি কৃষি পরিবারেই হাঁস, মুরগি, কবুতর, কোয়েল, গরু, ছাগল, ভেড়া পালন করার সুযোগ রয়েছে। বাড়ির কাছে ডোবা বা পুকুর থাকলে মাছ চাষ করা যায়। বাড়ির ও গোয়াল ঘরের ময়লা আবর্জনা, গোবর ইত্যাদি পচিয়ে জৈবসার তৈরি করে গাছে দেয়া যায়। এগুলো উৎপাদনের মাধ্যমে পরিবারের খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ হবে এবং অতিরিক্ত কৃষিপণ্য বিক্রি করে আয়-রোজগার করা যায়। এতে দেশের প্রতি ইঞ্চি জমি উৎপাদনে কাজে লাগবে।
দেশে আবাদি জমি ১% হারে কমছে, জনসংখ্যা বাড়ছে ১.৪৭% হারে। ক্রমহ্রাসমান জমি থেকে পারিবারিক খামারের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে হবে। দেশে বর্তমানে ১ কোটি ১৮ লাখ বসতভিটা আছে। পরিবারের খাদ্যশস্য, শাকসবজি ও ফলমূলের চাহিদা মিটানোর জন্য প্রতিটি বসতবাড়িকে খামারে রূপান্তর করতে হবে। বর্তমান সরকারের কৃষিক্ষেত্রে একটি বড় কর্মসূচি হচ্ছে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’। এজন্য এবার বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্যটি বাংলাদেশের জন্য বেশি প্রযোজ্য। এ কর্মসূচিতে প্রতিটি পরিবারেই খাদ্যশস্য, শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, ডিম, গোশত, দুধ ইত্যাদি খাদ্য উৎপাদনের সুযোগ থাকবে।

পৃথিবীর পরিবেশ সুস্থ রেখে খাদ্য উৎপাদন
পৃথিবীর  মাটি, বায়ু ও পানি বিশুদ্ধ রেখে খাদ্য উৎপাদনের জন্য জৈব পদ্ধতিতে অর্থাৎ অর্গানিক ফার্মিং পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। অর্গানিক ফুড বা জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত খাদ্যের প্রতি সারা পৃথিবীর মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। অর্গানিক ফার্মিং থেকেই অর্গানিক ফুড বা জৈব খাদ্য তৈরি হয়। রাসায়নিক সার, রাসায়নিক কীটনাশক, গ্রোথ হরমোনসহ যে কোনো রাসায়নিক পদ্ধতি ছাড়া জৈবসার ও জৈব কীটনাশক দিয়ে পরিবেশবান্ধব উপায়ে ফসল উৎপাদন করাই হচ্ছে অর্গানিক ফার্মিং বা জৈব কৃষি। রাসায়নিক সার দিয়ে ফসল চাষাবাদ পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ফসল উৎপাদন খরচও বেশি হয়। জৈবসার দিয়ে ফসল চাষাবাদ পরিবেশসম্মত ও উৎপাদন খরচ কম হয়। উৎপাদিত খাদ্য স্বাস্থ্যসম্মত। বাংলাদেশে শাকসবজি উৎপাদনে প্রচুর রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করায় ইউরোপের দেশগুলো এদেশ থেকে শাকসবজি ক্রয়ে অনীহা প্রকাশ করেছে। জৈব উপায়ে খাদ্যশস্য ও শাকসবজি উৎপাদন করচ কম অথচ বেশি দামে দেশে ও বিদেশে বিক্রির যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে।

রাসায়নিক সার পরিমাণে কম লাগে, সহজলভ্য ও দ্রুত কাজ করে। মাটির উর্বরতা সাময়িক বাড়লেও পরে ক্ষতি করে। রাসায়নিক সারে খরচ বেশি, মাটি, পানি ও বাতাস দূষিত করে এবং মাটির জীবাণু ও কেঁচো মারা যায়। মাটিতে জটিল যৌগ সৃষ্টি করে যা গাছ গ্রহণ করতে পারে না। গাছে  বিষাক্ততা সৃষ্টি করে। একটু বেশি হলে গাছ মারা যায়। ঝুঁকি বেশি। প্রয়োগ পদ্ধতি সঠিক না হলে কার্যকারিতা নষ্ট হয়। একটি সারে ২ থেকে ৩টি পুষ্টি উপাদান থাকে। একটি জৈবসারে ৮ থেকে ১০টি পুষ্টি উপাদান থাকে। রাসায়নিক সার জমিতে অল্প কিছু দিন স্থায়ী  হয় এবং প্রয়োগের পর অপচয় বেশি হয়। দেশে প্রতি বছর গড়ে ৩০ থেকে ৩২ লাখ টন রাসায়নিক সার ব্যবহার হচ্ছে। যা পরিবেশকে দূষণ করছে। রাসায়নিক সার উৎপাদনে গ্যাস, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান লাগছে, যা পরিবেশ দূষণ করছে। কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে পরিবেশ দূূষণের কথা চিন্তা করে রাসায়নিক সার উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। অথচ দেশে প্রতি বছর শতকরা ২০ভাগ রাসায়নিক সারের ব্যবহার রাড়ছে।

জৈবসার মাটিতে পানি ও পুষ্টি ধারণক্ষমতা বাড়ায়, মাটিকে উর্বর করে, মাটির কণাগুলো ফসলের উপযোগী করে, মাটির ছিদ্র বাড়ায় ফলে বায়ু ও পানি চলাচলে সুবিধা হয়। জৈবসার মাটির তাপমাত্রা ও অম্লত্ব-ক্ষারত্ব নিয়ন্ত্রণ করে। জৈবসার গাছে পুষ্টি পরিশোষণে সহায়তা করে, মাটির লবণাক্ততা হ্রাস করে। বেলেমাটিকে দো-আঁশ মাটিতে রূপান্তরিত করে। মাটিতে অনুজীব ও কেঁচোর সংখ্যা বাড়ায়। জটিল যৌগকে সরল দ্রব্যে পরিণত করে। পারিবারিক খামারে বিষমুক্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উৎপাদন করে বিশ্বের সব মানুষের ক্ষুধা নিবারণ ও খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের প্রচেষ্টা বিশ্ব খাদ্য দিবসের মাধ্যমে বাস্তবায়ন সফল হোক এটাই আমাদের কাম্য।
 
কৃষিবিদ মো. ফরহাদ হোসেন
* সহকারী অধ্যাপক, শহীদ জিয়া মহিলা কলেজ, ভুঞাপুর, টাঙ্গাইল। মোবাইল : ০১৭১১-৯৫৪১৪৩

পাট ফসলে আগাম ফুল : কারণ ও প্রতিকার

পাট বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল। পাটের ব্যবহারিক উপযোগিতা, অর্থনৈতিক গুরুত্ব ইত্যাদি বিবেচনা করে পাটকে ‘সোনালী আঁশ’ বলে অভিহিত করা হয়। পাট ও পাট জাতীয় আঁশ ফসল সারা বিশ্বে তুলার পর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক আঁশ ফসল হিসেবে অবস্থান করছে। আট থেকে ১০ মিলিয়ন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাট ও এ জাতীয় আঁশ ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ৫-৬% আসে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে। এ ফসল নিজেই মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।  বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৭.৫-৮.০ লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হয় যা থেকে প্রায় ৮০ লাখ বেল পাট আঁশ উৎপন্ন হয়ে থাকে। বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় শতকরা ১০-১২ ভাগ পাট চাষ এবং পাটশিল্প যেমন প্রক্রিয়াকরণ, আঁশ বাঁধাই, গুদামজাতকরণ, স্থানান্তর ও বিপণন ইত্যাদি কাজের সাথে জড়িত।

বাংলাদেশে প্রধানত দুই প্রকার পাট ফসল চাষ হয়। একটি তোষা ও অন্যটি দেশি বা সাদা পাট। দেশি পাটের পাতার স্বাদ তিতো এবং ফলগুলো গোলাকার এবং খাঁজকাটা। এ পাট নিচু জমিতে উৎপাদন করা যায় এবং পরিপক্ব অবস্থায় কয়েক ফুট পানির নিচে থাকতে পারে। তবে তোষা পাটের পাতার স্বাদ তিতো হয় না এবং এর ফল লম্বা ক্যাপসুলের মতো হয়, আগা চোখা। এ পাট কোনো অবস্থাতেই গোড়ায় পানি জমা সহ্য করতে পারে না তাই নিচু জমিতে এ পাট চাষ করা য়ায় না ।
সাধারণত দেশি পাট ১৫ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত এবং তোষা পাট ১৫ এপ্রিল থেকে ১৫ মে পর্যন্ত বপন করার উপযুক্ত সময়। তবে জাতভেদে এ সময়ের কিছু পার্থক্য দেখা যায়। যদি কোনো পাটের জাত তার উপযুক্ত সময় এর চেয়ে আগাম বপন করা হয় তবে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয় এবং শেষ পর্যন্ত ফলন কমে যায়। যখন পাটের জাত সময় মতো বপন করা হয়, তখন সাধারণত ফুল আসে আগস্ট মাস, অর্থাৎ তখন দিনের আলোর দৈর্ঘ্য কমতে শুরু করে। পাট হলো একটি খাটো দিন দৈর্ঘ্য ফসল। তাই পাট ফসলও অন্যান্য স্বল্প দৈর্ঘ্য দিনের ফসলের ন্যায় ফটো পিরিয়ড (আলোক দৈর্ঘ্য) সংবেদনশীল।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, খরা বা অন্য কোনো বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয় এমন কোনো পরিবেশে পাট চাষ করলে, সেই পাট ফসলে আগাম বা অপরিপক্ব অবস্থায় ফুল চলে আসে। নিচু জমিতে বপন করা পাটে অথবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আগাম বৃষ্টি/বন্যার সময় যখন চাষিরা আগাম পাট বপন করে অর্থাৎ উপযুক্ত সময়ের আগেই, তখন ওই পাট ফসলের জমিতে ১-২ ফুট উচ্চতাসম্পন্ন গাছেই ফুল দেখা দেয়। বিশেষ করে এ আগাম ফুল দিনের স্বল্প আলোক দৈর্ঘ্যরে তারতম্যের জন্যই হয়ে থাকে।
আগাম ফুল আসার মূল কারণগুলো হলো-
১. পাট জাতের উপযুক্ত সময়ের পূর্বে বপন করা ।
২. লম্বা খরা, শুষ্ক বায়ু প্রবাহ, কোনো কারণে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, মাটির দুর্বল উর্বরতাশক্তি, জলাবদ্ধতা, মেঘাচ্ছন্ন-আবহাওয়া, দিনরাতের তাপমাত্রার পার্থক্য খুবই কমে যাওয়া ইত্যাদি।
আগাম ফুল পাট ফসলের ওপর প্রভাব-
১. পাটের গাছের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়।
২. শাখা-প্রশাখা জন্মানো শুরু হয়।
৩. খুবই দ্রুততার সাথে ফলন ও আঁশের মান খারাপ হয়।

 

বাংলাদেশে মার্চের শেষে দিনের দৈর্ঘ্য হয় প্রায় ১২ ঘণ্টা এবং এপ্রিলের মাঝা মাঝি অর্থাৎ ১৫ এপ্রিল এ দৈর্ঘ্য হয় ১২.৫ ঘণ্টার ওপরে। মার্চের শেষে দেশি এবং মধ্য সময়ে তোষা পাট জাত বপন করলে অপরিপক্ব অবস্থায় ফুল আসার ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। অনেক সময় মাঠের মধ্যে কিছু গাছে  এদিক সেদিক আগাম ফুল দেয়া যায়। এটা আঁশ উৎপাদনের জন্য তেমন প্রভাব ফেলে না। কারণ আগাছা পরিষ্কার বা গাছ পাতলাকরণের সময় সেগুলো তুলে ফেলা হয় অথবা এ অবস্থাতেই বাড়তে দেয়া যায় মধ্য আগস্ট পর্যন্ত ফসল প্রয়োজনীয় ফুল আসা শুরু হয়। এ সময় দিনের দৈর্ঘ্য কমতে শুরু করে এবং কমতে কমতে ১২.৫ থেকে ১২ ঘণ্টায় পৌঁছায়। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত দেশি ও তোষা (আঁশ উৎপাদনের জন্য) পাটের জাত ও প্রকৃত বপন সময় ছক-১ এ দেখান হলো।    
পাটের দেশি তোষা উভয় জাতই স্বল্প দিন দৈর্ঘ্যরে ফসল। দিন দৈর্ঘ্য ১২.৫ ঘণ্টা বা তার নিচে হলেই পাট ফসলে আগাম ফুল আসবে। লম্বা দিন দৈর্ঘ্য যেমন ১২.৫ ঘণ্টা বা তার বেশি হলে ফুল আসা বিলম্বিত হয়। দিন দৈর্ঘ্য ১০-১২ ঘণ্টা হলে ৩০-৩৫ দিন বয়সের যে কোনো পাট গাছে ফুল চলে আসে। এরূপ দিন দৈর্ঘ্যর প্রভাব দেশি পাটের চেয়ে তোষা পাটে বেশি পরিলক্ষিত হয়।
পূর্বে দেখা গেছে, দেশি জাত সি-৬ এবং ডি-১৫৪ যদি মধ্য বা শেষ মার্চের পূর্বে বপন করা হতো তবে আগাম ফুল দেখা দিত এবং তোষার জাত ও-৪ যদি মধ্য এপ্রিলের পূর্বে বপন করা হতো তবে অপরিপক্ব ফুল দেখ দিত (আহমেদ, ১৯৮৯)। বাংলাদেশে মার্চের শেষ পর্যন্ত দিনের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ ঘণ্টা থাকে এবং এটা মধ্য এপ্রিলের সময়েই বৃদ্ধি পেয়ে ১২.৫ ঘণ্টার ওপরে চলে যায়। তাই দেশি পাট মার্চের শেষ সময় থেকে এবং তোষা পাট মধ্য এপ্রিল থেকে বপন শুরু করলে এ অপরিপক্ব আগাম ফুল এর প্রভাব থাকে না। যদিও ফসলের মাঠে এদিক-সেদিক কিছু গাছে ফুল দেখা দিলেও তা আঁশ উৎপাদনে তেমন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে না।

 

অপরিপক্ব বয়সের ফুলের জন্য দায়ী বিষয়গুলো
১. যেহেতু পাট স্বল্প দিবা দৈর্ঘ্য সহিষ্ণু ফসল, তাই দেশি পাটের কিছু জাত মধ্য-মার্চের পূর্বে এবং কিছু জাত শেষ মার্চের পূর্বে বপন করলে আগাম ফুল দেয়। তেমনি তোষার ও-৪ জাতটি যদি মধ্য এপ্রিলের পূর্বে বপন করা হয় তবে গাছে ফুল আসে।
২. তোষা জাতের পাটের ফসলের শতকরা কিছু গাছ অপরিপক্ব অবস্থায় ফুল দেখা দিয়ে থাকে। তবে সেগুলো জাতের সাথে কৌলিক বিশুদ্ধতায় ভিন্ন হয়, সেগুলো পাতার চেহারা দেখে চেনা যায় আবার অনেক সময় পার্থক্য করাও কঠিন হয়। এগুলো সাধারণত লোকাল জাতের সাথে বা বীজ উৎপাদনের সময় স্বল্প দূরত্বে থাকায় ক্রস পলিনেশনের ফলে তৈরি হয়ে থাকে। এ রকম অনেক সময় প্রজনন বীজের মধ্যেও পাওয়া যায়।
৩. উচ্চ উর্বরতা ও আর্দ্রতা থাকা, মাটিতে পাট বীজ বপন করলে স্বাস্থ্যগত কারণেই গাছের জন্ম ও বৃদ্ধি দ্রুত হয় এবং সাথে সাথে আগাম ফুলও দেখা দেয়, যা ক্রিটিক্যাল ফটোপিরিয়ডে পরে বপন করলে দেখা যায় না।
বোর্স (১৯৭৪-৭৬) এক প্রতিবেদনে লিখেছেন, দেশি ও তোষা উভয় পাটের ফুলই দিবারাত্রির তাপমাত্রার পার্থক্যের জন্য তাপমাত্রাগুলো যেমন ৩২/২৭, ২৭/২৭, ২৪/২৪ ডি.সে. এর সাথে রাতের তাপমাত্রাখান ১৭ ডি.সে. পার্থক্য বিবেচনা করা হয়। এ অবস্থায় প্রায় ২০ দিন আগেই ফুল চলে আসে। অথচ ৯ ঘণ্টা ফটোপিড়িয়ড এ ফুল চলে আসে যা বাংলাদেশর সাধারণ স্বল্প দৈর্ঘ্য দিন ১০ ঘণ্টার চেয়ে অনেক কম।
ওয়াসেক  (১৯৮২) প্রতিবেদন করেছেন যে, পানির স্বল্পতার প্রভাব পাটের বেশি ফুল আসাকে বিলম্বিত করে, যেখানে খরা আরো বেশি প্রভাব ফেলে। আবার গোট্রিজ (১৯৬৯) বলেছেন পানির স্বল্পতা পাটে দ্রুত ফুল আসাকে প্রভাবিত করে। জোহানসেন (১৯৮৫) বলেন পাটের আঁশের ফলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হলো পাট ফসলের ফুল ধরার সময়টি। কারণ ফুল আসার সাথে সাথে পাট গাছের কাণ্ডের উপরি অংশে শাখা প্রশাখার বিস্তার ঘটে এবং প্রধান কাণ্ডের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। পাটের স্বল্প দিবা দৈর্ঘ্যর ফুল আসা সাধারণত নির্ভর করে দেশি পাটের জন্য প্রায় ১২ ঘণ্টা এবং তোষা পাটের জন্য ১২.৫ ঘণ্টা। তিনি আরও বলেন তাপমাত্রার বৃদ্ধি বিশেষ করে রাত্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে পাট ফসলে দ্রুত ফুল আসে। বিশেষ করে রাতের তাপমাত্রা যদি ২০ ডি. সে. এর কম হয় তবে মাটি থেকে চারা গজানো এবং ছোট বয়সের পাট গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, ফলে অল্প বয়সেই ফুল আসার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

 

অনেকের মতে, বীজের বয়স পাট ফসলে ফুল আসার জন্য দায়ী। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, ১-২ বছরের পুরাতন বীজ অথবা নতুন বীজ, যে কোনো বীজ যদি তার অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা ভালো থাকে (৮০% এর উপরে) তবে কোনো ফুল আসে না এবং সমান বৃদ্ধি ও ফলন হয়। বিজেআরআই এর উদ্ভাবিত অনেক জাত আছে যেমন বিজেআরআই দেশি পাট-৫, ও-৯৮৯৭, বিজেআরআই তোষা পাট-৪, বিজেআরআই তোষা পাট-৫ ইত্যাদি মাঠে বপন করার পর কিছু আগাম ফুল হলেও তা আঁশের ফলনে বা গাছের বৃদ্ধিতে বা আঁশের গুণগতমানে তেমন কোনো ব্যঘাত ঘটায় না।
শুধু পাট নয় অন্য যে কোনো ফসলের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, গাছের বৃদ্ধির সময় যে কোনো কারণে যদি বৃদ্ধিতে বাধার প্রভাব পরে তবে গাছ দ্রুততার সাথে প্রজনন পর্যায়ে চলে যায় এবং গাছে ফুল দেখা দেয়।
অপরিপক্ব বয়সের ফুলের প্রভাব থেকে প্রতিকার পাওয়ার উপায়  
পাট ফসলের আঁশ উৎপাদনের সময় আগাম/অপরিপক্ব বয়সে ফুল আসা খুবই বিপদজ্জনক। কখনো কখনো এ কারণে পাটের ফলন ও আঁশের মান খারাপ হয় এবং কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক কথায় বলতে গেলে পাটের আগাম ফুলের প্রভাব দূর করতে হলে উপযুক্ত সময়ে বীজ বপন করতে হবে। তাছাড়া  জমির দুর্বল উর্বরতা, জলাবদ্ধতা, খরা, শুষ্ক বায়ু প্রবাহ, দিবা রাত্রির তাপমাত্রার পার্থক্যের পরিমাণ বেশি হওয়া, মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়া ইত্যাদি। এমনকি যদি দিনের আলোক দৈর্ঘ্য তার পরিমিত মাত্রা ছাড়িয়ে য়ায়, তখনও ফুল দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এটা সাধারণত মে, জুন এমন কি জুলাই মাসেও হতে পারে। অতএব, প্রকৃত অর্থে পাট ফসল কে আগাম বা অপরিপক্ব বয়সের ফুল থেকে রক্ষা করতে হলে বিশুদ্ধ পাট জাতের বীজ ব্যবহার করতে হবে এবং উপযুক্ত সময় বীজ বপন করতে হবে। বৃষ্টি না হলে বা কমে হলে, বীজ বপনের পর অন্তত এক বার জমিতে সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। অতিরিক্ত উর্বর না হলেও মোটামুটি উর্বরতা সমৃদ্ধ জমিতে পাট ফসল চাষ করতে হবে। তবেই আমাদের দেশের পাটচাষিদের মানের আশা পূরণ হবে। উচ্চফলন ও ভালোমানের আঁশে কৃষকের মাচা ভরে উঠবে, কৃষক ভাইয়েরা অর্থিকভাবে লাভবান হবেন।

কৃষিবিদ ড. মো. মাহবুবুল ইসলাম*
*মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রধান, কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা-১২০৭। মোবাইল : +৮৮০১৫৫২৪১৬৫৩৭

 

বোরো ধানে চিটা হওয়ার কারণ ও প্রতিকার ১৪২৪

প্রকৃতির সাথে কৃষির রয়েছে সুনিবিড় সম্পর্ক। ফসল উৎপাদনে আবহাওয়ার প্রভাব ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা যতই সমৃদ্ধ হোক না কেন প্রকৃতির কাছে এখনও আমরা নিদারুণ অসহায়। অবশ্য প্রকৃতির সাথে সেতুবন্ধনেই আমাদের কৃষক এগিয়ে যাচ্ছে। ধান ফসলও আবহাওয়ার প্রভাবে দারুণ প্রভাবিত। বাংলাদেশে আউশ, আমন ও বোরো এ হলো ধান আবাদের বিন্যাস। শুধু আবহাওয়াজনিত কারণে এ বিন্যাসগুলোর রয়েছে স্বাতন্ত্র্যিক বৈশিষ্ট্য। বোরো মৌসুম ঠাণ্ডা হিম শীতলের সমন্বয়ে নভেম্বর (কার্তিক-অগ্রহায়ণ) মাসে শুরু হয়। আর শেষটা হয় চরম গরমের এপ্রিল-মে (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ) মাসে। বোরো মৌসুমের প্রতিটা দিনেই রয়েছে দারুণ বৈচিত্র্যতা। গবেষণায় দেখা গেছে, ধান গাছ তার জীবনচক্রের মধ্যে কাইচ থোড় থেকে ফুল ফোটা  পর্যন্ত সময়ে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা ও গরম সহ্য করতে পারে না। ওই সময় বাতাসের তাপমাত্রা যদি ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে অথবা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে যায়, তাহলে ধানে ব্যাপকভাবে চিটা দেখা দেয়। তাছাড়া এ সময়ে খরা, ঝড়, পোকামাকড় বা রোগবালায়ের আক্রমণ হলেও চিটা হয়ে থাকে।

আমাদের দেশে ধানের জীবনচক্রের বিভিন্ন স্তরে ক্রিটিক্যাল (নিম্ন) তাপমাত্রা
গবেষণা মোতাবেক ধান গাছের জীবন চক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে ক্রিটিক্যাল (নিম্ন) তাপমাত্রার একটি স্কেল নির্ধারণ করা হয়েছে। ধানের জীবন চক্রের অঙ্কুরোদগম অবস্থায় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, চারা অবস্থায় ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, কুশি অবস্থায় ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, থোড় অবস্থায় ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ফুল ফোটা অবস্থায় ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে তাপমাত্রা চলে গেলে ফলনে মারাত্মক প্রভাব পড়ে। এতে ফলন অনেক কমে যায়।

ধানে চিটা হওয়ার মূল কারণ
স্বাভাবিকভাবে ধানে শতকরা ১৫ থেকে ২০ ভাগ চিটা হয়। চিটার পরিমাণ এর চেয়ে বেশি হলে ধরে নিতে হবে থোড় থেকে ফুল ফোটা এবং ধান পাকার আগ পর্যন্ত ফসল কোনো না কোনো প্রতিকূলতার শিকার হয়েছে, যেমন অসহনীয় ঠাণ্ডা বা গরম, খরা বা অতিবৃষ্টি, ঝড়-ঝঞ্ঝা, পোকা ও রোগবালাই। একটু বিস্তারিত বলতে গেলে
ঠাণ্ডা :  রাতের তাপমাত্রা ১২-১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং দিনের তাপমাত্রা ২৮-২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস (কাইচ থোড় থেকে থোড় অবস্থা অবধি) ধান চিটা হওয়ার জন্য মোটামুটি সংকট তাপমাত্রা। তবে এ অবস্থা পাঁচ/ছয় দিন শৈত্যপ্রবাহ চলতে থাকলেই কেবল অতিরিক্ত চিটা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। রাতের তাপমাত্রা সংকট মাত্রায় নেমে এলেও যদি দিনের তাপমাত্রা ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকে তবে চিটা হওয়ার আশংকা কমে যায়।
গরম : ধানের জন্য অসহনীয় তাপমাত্রা হলো ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি। ফুল ফোটার সময় ১-২ ঘণ্টা ওই তাপমাত্রা বিরাজ করলে মাত্রাতিরিক্ত চিটা হয়ে যায়।
ঝড়ো বাতাস : প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাসের কারণে গাছ থেকে পানি প্রস্বেদন প্রক্রিয়ায় বেরিয়ে যায়। এতে ফুলের অঙ্গগুলো গঠন বাধাগ্রস্ত হয়। আবার ঝড়ো বাতাস পরাগায়ন, গর্ভধারণ ও ধানের মধ্যে চালের বৃদ্ধি ব্যাহত করে। এতে ধানের সবুজ খোসা  খয়েরি বা কালো রঙ ধারণ করে। ফলে ধান চিটা হয়ে যেতে পারে।
খরা : খরার কারণে শিষের শাখা বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং বিকৃত ও বন্ধ্যা ধানের জন্ম দেয়ায় চিটা হয়ে যায়।
শৈত্যপ্রবাহ বা ঠাণ্ডা জনিত কারণের লক্ষণ
চারা অবস্থায় শৈত্যপ্রবাহ থাকলে চারা মারা যায়। কুশি অবস্থায় বাড় বাড়তি কমে যায়, গাছ হলুদ হয়ে যায়, থোড় অবস্থায় শিষ পুরোপুরি বের হতে পারে না, শিষের অগ্রভাগের ধান মরে যায় বা সম্পূর্ণ চিটা হয়ে যায়।
প্রতিরোধের উপায়
ফসল চক্রে নেমে আসা প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিহত করা কঠিন। কিন্তু বোরো ধান অগ্রহায়ণের শুরুতে বীজ বপন করলে ধানের থোড় এবং ফুল ফোটা অসহনীয় নিম্ন বা উচ্চ তাপমাত্রায় পড়ে না, ফলে ঠাণ্ডা ও গরম এমনকি ঝড়ো বাতাসজনিত ক্ষতি থেকেও রেহাই পাওয়া সম্ভব। চিটা ব্যবস্থাপনা করার প্রয়োজনীয় পরামর্শ হলো-


ব্রি ধান২৮ এর ক্ষেত্রে ১৫-৩০ নভেম্বরের মধ্যে এবং ব্রিধান ২৯ এর ক্ষেত্রে ৫-২৫ নভেম্বরের মধ্যে বীজতলায় বীজ বপন সম্পন্ন করতে হবে।  অর্থাৎ দীর্ঘ জীবনকাল সম্পন্ন (১৫০ দিনের ওপর) ধানের জাতগুলো নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে এবং স্বল্প জীবনকালের (১৫০ দিনের নিচে) জাতগুলো ১৫ নভেম্বর থেকে বীজতলায় বপন করতে হবে।
বোরো মৌসুমে কেবল ব্রি ধান২৮ চাষ না করে বিআর ১, ব্রি ধান৩৫ ও ব্রি ধান৩৬ এর আবাদ করতে হবে।


বীজতলায় চারা থাকা অবস্থায় শৈত্যপ্রবাহ চললে চারার উচ্চতা ভেদে ৫-১০ সেন্টিমিটার পানি রাখতে হবে। তাছাড়া স্বচ্ছ এবং পাতলা পলিথিনের ছাউনি দিয়ে শৈত্যপ্রবাহ কালে দিনে ও রাতে আচ্ছাদিত রাখতে হবে।


চারা রোপণের জন্য ৩৫ থেকে ৪৫ দিন বয়সের চারা রোপণ করতে হবে। কুশি অবস্থায় শৈত্যপ্রবাহ চললে জমিতে ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার পানি রাখতে হবে। তাছাড়া থোড় ও ফুল ফোটা স্তরে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা থাকলেও ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার পানি রাখলে চিটার পরিমাণ হ্রাস করা যায়।
অতি আক্রমণকাতর জাতের আবাদ পরিহার করা বা অবস্থার প্রেক্ষাপটে কৃষক আবাদ অব্যাহত রাখলে ছত্রাকনাশক প্রয়োগের পাশাপাশি পরিমিত ইউরিয়া ও পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণের ব্যবস্থা নিতে হবে।
ব্রি ধান২৮ এর গড় জীবনকাল ১৪০ দিন। মনে করি, একজন কৃষক ২৫ নভেম্বর বীজতলায় বীজ বপন করল। ৪০ দিন বয়সের চারা মাঠে রোপণ করেন (০৪ জানুয়ারি)। মূল জমিতে চারা লাগানোর পর থেকে সর্বোচ্চ কুশি স্তর পর্যন্ত সময় লাগে প্রায় ৪০ দিন (১৫ ফেব্রুয়ারি)। অতঃপর ধান গাছের প্রজনন পর্যায়ের কাইচ থোড় স্তর শুরু হয়। ধান গাছে কাইচ থোড় থেকে ফুল ফোটা স্তর পর্যন্ত সময় লাগে প্রায় ৩০ দিন (১৫ মার্চ)। পরবর্তীতে ধান পাকা পর্যায়ের দুধ স্তর শুরু হয়ে পরিপক্বতায় পৌঁছাতে প্রায় ৩০ দিন সময় লাগে (১৫ এপ্রিল)। এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায় জানুয়ারি মাস সবচেষে শীতল মাস। তাছাড়া এপ্রিল মাসে সবচেয়ে বেশি গরম থাকে। হাওর অঞ্চলে আগাম বোরো ধান আবাদ করলে অর্থাৎ অক্টোবর মাসের শেষ দিকে বীজতলা এবং ডিসেম্বর মাসের প্রথমার্ধে মূল জমিতে রোপণ করলে নিশ্চিত অতিরিক্ত ঠাণ্ডাকালীন (১৫ জানুয়ারি) প্রজনন পর্যায়ের কাইচ থোড় স্তর আক্রান্ত হয় ফলে চিটা হয়। ঠাণ্ডাজনিত কারণে চিটা হলে আমরা এটাকে কোল্ড ইনজুরি বলে থাকি। আবার অনেক কৃষক ভাইরা যদি একটু দেরিতে বোরো আবাদ করেন অর্থাৎ জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে বা ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিকে তাহলে প্রজনন পর্যায়ের কাইচ থোড় স্তরটি অতি গরমকালীন (১৫ মার্চ) গরমে আক্রান্ত হতে পারে। ফলে ধানে চিটা হতে পারে।
এক কথায় বলতে গেলে, ব্রি ধান২৮, ৩০ ডিসেম্বর থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে ৪৫ দিনের চারা রোপণ করলে সবচেয়ে বেশি ফলন পাওয়া যায়। ব্রি ধান২৯, ২০ ডিসেম্বর হতে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে ৪৫ দিনের চারা রোপণ করলে চিটার পরিমাণ কম হয় এবং ফলন বেশি হয়। তাই ব্রি ধান২৯ এর বীজ বপনের উপযুক্ত সময় হলো ০৫ থেকে ২৫ নভেম্বর এবং ব্রি ধান২৮ এর বীজ বপনের উপযুক্ত সময় হলো ১৫ থেকে ২৫ নভেম্বর। তাই উফশী নাবি জাতগুলো ৫ নভেম্বর এবং আগাম জাতগুলো ১৫ নভেম্বর থেকে বীজ বপন শুরু করলে ফসলের থোড়/গর্ভাবস্থা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা অতিক্রম করতে পারে, ফলে ঠাণ্ডা বা গরমের কারণে ধান চিটা মুক্ত হবে এবং ফলন বেশি হবে।
মোদ্দাকথা হলো ধানের কাইচ থোড় থেকে ফুল স্তর পর্যন্ত সময়টুকু অতিরিক্ত ঠাণ্ডা (জানুয়ারি থেকে মধ্য ফেব্রয়ারি) এবং অসহনীয় গরম (মার্চ থেকে মধ্য এপ্রিল) এ সময়ে ফ্রেমে যেন না পড়ে সেদিকে একটু বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের স্বাভাবিক কৃষি কাজ ও অগ্রগতিকে লণ্ডভণ্ড করে দেয়। ফসল উৎপাদনে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। শৈত্যপ্রবাহ, অসহনীয় উত্তাপ, ঝড়, বন্যা, পোকামাকড়, রোগবালাইয়ের প্রাদুভাব সমূলে নির্মুল করা সম্ভব নয় তবে উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব। তাই কৃষকদেরই এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। জয় হোক কৃষকের।

কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ*

*আঞ্চলিক বেতার কৃষি অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, সিলেট

 

দেশীয় ফলের জাত উন্নয়ন ও গবেষণা (আষাঢ় ১৪২৫)

বাংলাদেশে হরেক রকম ফলের আবাদ করা হচ্ছে এখন। এর মধ্যে যেমন দেশীয় ফল রয়েছে তেমনি আবার বিদেশী ফলও রয়েছে। দেশীয় ফলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফল হলো আম, কাঁঠাল, আনারস, কলা, কুল, পেয়ারা, বেল, জলপাই, তাল, লুকলুকি, আমলকী, জাম আর নানা রকম লেবু। আমাদের দেশে উৎপাদিত ফলের বেশিরভাগ আসে কয়টি ফল থেকে। এদের মধ্যে কলা আর পেয়ারা ছাড়া কোনো ফলই সারা বছর পাওয়া যায় না। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়কালের মধ্যে এসব ফলের প্রাপ্তি। বিশেষ করে বৈশাখ থেকে বড় জোর শ্রাবণ মাস পর্যন্ত আমাদের এসব ফলের উৎপাদন হয়ে থাকে। যে কারণে প্রায় সারা বছরই বিদেশ থেকে প্রচুর ফল আমাদের আমদানি করতে হয়। এসব ফল আবার চড়া দামে কিনতে হয়। আমাদের দেশীয় ফলের নতুন নতুন উদ্ভাবন করতে পারলে একদিকে যেমন উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে পারে অন্যদিকে কেবল মৌসুমে নয় অমৌসুমেও এর কোনো কোনোটা আবাদ উপযোগী হতে পারে।


সত্যি কথা বলতে গেলে আমাদের ফল গবেষণা অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বেশ কিছু ফলের জাত অবশ্য গত দশ বছরে অবমুক্ত করা হয়েছে যার বেশির ভাগই দেশ বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা উত্তম জাত। ফলের বিভিন্ন জাতের মধ্যে সঙ্করায়ন করা কিংবা ফলে মিউটেশন ঘটিয়ে নতুন জাত উদ্ভাবন করার ঘটনা এ দেশে বেশ বিরল। কেবলমাত্র আমের দু’চারটি জাত উদ্ভাবন ছাড়া অন্যান্য ফলের ক্ষেত্রে আমাদের জাত উন্নয়ন গবেষণা বড় দুর্বল।


ফল গবেষণার কিছু বাড়তি অসুবিধা রয়েছে। এক, ফল গাছ আধিকাংশ ক্ষেত্রে দীর্ঘ দেহী হওয়ায় এদের মধ্যে সঙ্করায়ন করার কাজটি খানিকটা কঠিন। দুই, অধিকাংশ ফল গাছে ফল ধরতে সময় লাগে বলে ফলের জাত উদ্ভাবন করার জন্য সঙ্করায়ন পদ্ধতির দিকে গবেষকগণ কম আগ্রহী হন। আমাদের দেশে ফলের জাত উন্নয়ন গবেষণার আরো কিছু বাড়তি অসুবিধা রয়েছে। এক, ফল গবেষণার সাথে জড়িত গবেষকদের উদ্ভিদ প্রজনন ও আনুষঙ্গিক বিষয় সম্পর্কিত জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। দুই, যাদের এ বিষয়ক জ্ঞান বেশি রয়েছে পেশাগত প্রতিযোগিতার নেতিবাচক মনোভাবের কারণে তাদের এ বিষয়ক গবেষণা থেকে বিরত রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সজাগ হলে এবং গোষ্ঠীগত পেশার চেয়ে জাতীয় উন্নয়নকে গুরুত্ব দিলে শেষোক্ত সমস্যা ঘটিয়ে ওঠা সম্ভব। আর তা পারলে ফল গবেষণার ক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য অর্জনের দ্বারও উন্মোচিত হতে পারে। আম আমাদের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ফল ফসল। স্বাদে, গন্ধে, বর্ণে আমের বৈচিত্র্যও আমাদের কম নয়। তাছাড়া আমের নানান আকৃতি ও পাকার সময় কালেও বেশ বৈচিত্র্য রয়েছে। এসব বৈচিত্র্যকে বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন আম জাতে বিদ্যমান উত্তম বৈশিষ্ট্য দেওয়া নেওয়া করার জন্য আমে সঙ্করায়ন করার পদ্ধতি ইতোমধ্যে আমাদের দেশে চালু হয়েছে। আম অঙ্গজ জনমক্ষম একটি ফসল বলে সঠিক দু’টি পেরেন্ট জাতের মধ্যে সঙ্করায়ন করে পাওয়া হাইব্রিড গাছের মধ্য থেকে উত্তম হাইব্রিড জাত উদ্ভাবন খুব কঠিন কাজ নয়। আর একটি- দু’টি উত্তম হাইব্রিড জাত পেলে অঙ্গজ বংশ বিস্তার করে এর গুণাগুণ ধরে রাখা সম্ভব দিনের পর দিন।


হাইব্রিড আম যে উত্তম হতে পারে তার  প্রমাণ আম্রপালি, আম জাতটি। এটি ভারতে উদ্ভাবিত একটি হাইব্রিড আম। এই আম জাতটির আমাদের দেশেও বিস্তার ঘটানো হয়েছে। হাইব্রিড হলেও একেও পেরেন্ট হিসেবে ব্যবহার করে আমাদের একাধিক জাতের সাথে সঙ্করায়ন করে নেয়া যেতে পারে। অতপর তা থেকে সৃষ্ট ভিন্ন রকম আম গাছের মধ্য থেকে উত্তম গাছকে অঙ্গজ বংশ বিস্তার করে রক্ষা করা সম্ভব। আর এর মধ্যেও পাওয়া যেতে পারে  উত্তম আম জাত। এভাবে পাওয়া সম্ভব নানা আকার আকৃতি, বর্ণ, গন্ধ ও স্বাদের আম। কাঁঠাল নিয়ে আমাদের বহুমাত্রিক গবেষণার সুযোগ রয়েছে। কাঁঠালের বিভিন্ন জাতের মধ্যে গুণগত মানের দিক থেকে নানা রকম বৈচিত্র্য রয়েছে।  কাঁঠালের আকার আকৃতি, এর বর্ণ এবং দেহের কাঁটার আকার আকৃতি এদের তীক্ষèতায় বেশ পার্থক্য রয়েছে। কোয়ার আকার আকৃতি, এর পেলবতা, স্বাদ, গন্ধ, মিষ্টতার দিক থেকেও কাঁঠালে বিশাল বৈচিত্র্য রয়েছে।
এসব ছাড়া পরিপক্বতার দিক থেকে আগাম, মাঝারি ও নাবি বৈশিষ্ট্যের জন্যও এদের মধ্যে বৈচিত্র্য রয়েছে। ফলে এই বিশাল বৈচিত্র্য থেকে মানুষের চাহিদামাফিক গুণগত মানসম্পন্ন কয়েক রকমের কাঁঠালের জাত বাছাই করে এর চাষ বৃদ্ধি করার দিকে মনোযোগ দেয়ার সুযোগ ও প্রয়োজন দুটোই রয়েছে। এর জন্য উত্তম জাত বাছাই এবং এর বংশ বিস্তারের জন্য চারা উৎপাদন করার বিষয়ে আমাদের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
কাঁঠালের টিস্যু কালচার করে চারা উৎপাদনকে আরো সহজতর করতে হবে। কাঁঠাল পর পরাগী ফসল। আশপাশের গাছের পরাগ রেণু উড়ে এসে ফুলের গর্ভমু-ে পতিত হয় বলে এর বীজ থেকে উৎপাদিত কাঁঠাল গাছের কাঁঠালের গুণাগুণ অক্ষত রাখা সম্ভব হয় না। সে কারণে টিস্যু কালচার থেকে কাঁঠালের চারা উৎপাদন সম্ভব হলেও এর উৎপাদন কৌশলকে আরো সহজতর করার গবেষণা চালিয়ে যায়ার প্রয়োজন রয়েছে।
পেয়ারারও বেশ কিছু বৈচিত্র্যময় জাত রয়েছে আমাদের। পেয়ারার আকার আকৃতি এর বহিরাবরণ, এর ভেতরকার বীজের পরিমাণ, এর পেলবতা, স্বাদ, গন্ধ ও বর্ণের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। আমাদের বাজারে দু-তিন রকম জাতের পেয়ারার আধিক্য রয়েছে। তবে দিন দিন বর্ণিল মাংসল পেয়ারা কেবল হ্রাস পাচ্ছে বললে ভুল হবে বরং বিলুপ্তির মুখে পড়েছে বললে সঠিক হবে। বর্ণিল পেয়ারা এন্টি অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ এবং এদের যবনিক বাড়তি আয়রনও রয়েছে। ফলে এসব পেয়ারার জাত সংগ্রহ করে ফিল্ড জিন ব্যাংকে সংরক্ষণ করা অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। তা ছাড়া এখন আমরা পুষ্টির বিষয় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি বলে বর্ণিল মাংসল পেয়ারার উৎপাদন কৌশল এবং এদের ব্যাপক বংশ বিস্তার  ঘটানোর কাজটি করা খুব প্রয়োজন। তাছাড়া বর্ণিল পেয়ারার সাথে আমাদের বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ করা সাধারণ পেয়ারার সঙ্করায়ন করা যেতে পারে। এতে ভিন্ন বর্ণেরও মানের পেয়ারার জাত উদ্ভাবনের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।


কলা ফসলের জাত উদ্ভাবনে আমাদের গবেষণা হয়েছে সবচেয়ে কম। এর জেনোমিক গবেষণা হয়নি বললেই চলে। পৃথিবীর বেশ কিছু দেশে নানা রকম পরিপ্লয়েড কলার জাত উদ্ভাবন করা হচ্ছে আন্তঃজাত সঙ্কয়ায়নের মাধ্যমে। এর ফলে কেবল যে নানা আকৃতির ও গুণমান বিশিষ্ট ফল উৎপাদিত হচ্ছে তাই নয় বরং রোগসহিষ্ণু জাতও পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। আমাদের পাহাড়ের কোনো কোনো কলা প্রজাতি ভষণ রকম রোগ ও কীটপতঙ্গ সহনশীল। এর অন্য বৈশিষ্ট্য উত্তম না হলেও এসব বৈশিষ্ট্য আমাদের আবাদি কলা জাতে স্থানান্তর করা যেতে পারে। সারা বছর ভিন্নতর স্বাদ বিশিষ্ট কলার জাত পেতে হলে কলার প্রজনন বিষয়ক গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। এক বছর দু’বছরেই ফল ধরে বলে কলা প্রজনন করাই যেতে পারে।


লেবুর ভালো বৈচিত্র্য রয়েছে আমাদের। নরসিংদী এলাকায় কলম্বো লেবু তো বিদেশেও রপ্তানি হয়। উত্তম চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারলে এর উৎপাদন বৃদ্ধি করা যেতে পারে। লেবুতে আমাদের পাহাড়ে দু-একটি বীজহীন লেবুর সন্ধান পাওয়া গেছে। দু’ভাবে এই লেবুকে কাজে লাগানো যায়। এক, অঙ্গজ বংশবিস্তারক্ষম এই লেবু জাতের অঙ্গজ উপায়ে চারা উৎপাদনকে উৎসাহিত করে বীজহীন লেবুর উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায় যেমন পাহাড়ে তেমনি সমতল ভূমিতেও। দুই, বীজহীন লেবুর এই বৈশিষ্ট্যটি আমাদের অন্য লেবুতে স্থানান্তর করায় গবেষণা চালানো যায় অবশ্যই। এর জন্য অবশ্যই প্রজননবিদের কাজ করার সুযোগ করে দিতে হবে ফল গবেষণা কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টির মাধ্যমে। প্রকৃত প্রজনন বিদদেরকে কাজ করার পরিবেশ দিতে পারলে বাংলাদেশেও তৈরি হতে পারে বৈচিত্র্যময় সব লেবুর জাত। তাছাড়া লেবুর কিছু রোগ বালাই বা কীট পতঙ্গ ব্যবস্থাপনা কৌশল উদ্ভাবনের জন্যও গবেষণা চলতে পারে।


বেল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফল। গুণেমানে এর তুলনা হয় না। বেল ফসলের জাতের মধ্যেও আমাদের বেল যানিক জীববৈচিত্র্য এখনো অবশিষ্ট রয়েছে। গাজীপুরের বেল তো এ দেশের এক বিখ্যাত সম্পদ। বিশালকৃতি, কম বীজ ও চমৎকার স্বাদ গন্ধসমৃদ্ধ এই বেলজাত আমাদের বেল উন্নয়নের পেরেন্ট স্টক হিসেবে ব্যবহার করা যায়। আমাদের দেশে অনেক ছোট বেল জাতও রয়েছে যাদের আঁশ কম আবার স্বাদ ও গন্ধও উত্তম। যদিও অধিকাংশ স্থানীয় বেল জাতগুলোর মান সন্তোষজনক নয়। বেলের বংশ বিস্তারের জন্য টিস্যু কালচার প্রণিত প্রটোকল উদ্ভাবন করা গেলে দেশে এ বেলের ব্যাপক প্রসার ঘটানো সম্ভব। এর টিস্যু কালচার কঠিন হবে তবে গবেষণা চালিয়ে গেলে তা অসম্ভব হওয়ার কোনো কারণ নেই।


আমাদের পানি ফলেরও যানিক বৈচিত্র্য রয়েছে। ফলের আকারে এরা ছোট, বড় ও মাঝারি তিন রকম রয়েছে। রয়েছে এদের ফলে বীজ ঘনত্বের তারতম্যও। কোনো কোনো জাতের বীজের গন্ধ এবং স্বাদ বেশ মন কাড়ে। ভীষণ আয়রন সমৃদ্ধ এই ফল। সরাসরি বড় জাতের বংশ বিস্তার করে এবং বড় জাতের বৈশিষ্ট্য অন্য জাতে স্থানান্তর করে পানিফলের চাষ বৃদ্ধি করা সম্ভব। তালের ক্ষেত্রে আমাদের কোন গবেষণাই বাস্তবে হয়নি। তালেরও স্বাদে গন্ধে বেশ পার্থক্য রয়েছে। তাল এক লম্বা সময়ের ফলন। তালগাছ পুরুষ না স্ত্রী হবে এটি জানতেও অপেক্ষা করতে হয় কত বছর। আনবিক কৌশল ব্যবহার করে আগাম তালগাছের লিঙ্গ নির্ধারণ করার গবেষণা চালানো দরকার। তাহলে স্ত্রী লিঙ্গিক চারা লাগিয়ে লাভবান হওয়ার বিস্তর সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।


ফল ফসলের জাত উদ্ভাবন গবেষণার পাশাপাশি উদ্ভাবিত জাতসমূহের আবাদ প্রযুক্তি সম্পর্কিত গবেষণাও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন উদ্ভাবিত জাতের চাষাবাদ পদ্ধতি, এদের রোগ ও পোকামাকড় দমনসহ ফলের সংগ্রহ পরবর্তী ব্যবস্থাপনাজনিত গবেষণা নতুন জাতের সফলতা অর্জন করার জন্যই আবশ্যক। তাছাড়া ফল ফসলের চারা উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবনও এক জরুরি বিষয়। কম দামে অল্প স্থানে উত্তম চারা উৎপাদন ফলের জাত প্রসারের জন্য এক আবশ্যক বিষয়। ফলের উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবন ও এদের আধুনিকায়নের গবেষণা দেশে চলছে। অধিকাংশ ফল যেহেতু কোনো রকম প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়াই সরাসরি বপন করা হয় বলে রাসায়নিক বালাইনাশকের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতিতে ফল চাষকে উৎসাহিত করার জন্যও গবেষণা প্রয়োজন। বিশেষ করে সমন্বিত বালাইনাশক এবং বীজ বালাইনাশক ব্যবহার উৎসাহিত করার জন্য  গবেষণা কর্মকাণ্ডে জোর দেয়া দরকার।

ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া*

*প্রফেসর জেনিটিকস অ্যান্ড প্লান্ট ব্রিডিং বিভাগ,  শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলানগর, ঢাকা

পিপুলকথা

এ দেশের বনে জঙ্গলে, ঝোপ ঝাড়ে, রাস্তার ধারে পান পাতার মতো পাতাবিশিষ্ট লতানো পিপুল গাছ মাঝে মধ্যে দেখা যায়। পিপুল ফলের স্বাদ ঝাল। পিপুল ফল খাওয়া যায়।
গাছটি এদেশে দুষ্প্রাপ্য নয় কিন্তু এর ব্যবহার সম্পর্কে আমাদের ধারণা কম। ওষুধার্থে পিপুল গাছের পাতা কখনও ব্যবহৃত হয় না, এর মূল ও অপক্ব ফল ব্যবহার করা হয়। পিপুলের বীজ পপি বীজের মতো সূক্ষ্ম কণাবিশিষ্ট। আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য তাঁর চিরঞ্জীব বনৌষধি বইয়ে বেদে পিপুলের নাম কন বা কণা বলে উল্লেখ করেছেন। কারণ হিসেবে তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন, পিপুল খুব সূক্ষ্ম হয়ে দেহে প্রবেশ করতে পারে বলেই এর এরূপ নাম। দ্রব্যটি সূক্ষ্ম হয়ে দেহে প্রবেশ করে রসধাতু পান করে নেয় আবার সূক্ষ্ম হয়ে বেরিয়ে যায়। তার এই পান বা শোষণ করার ধর্ম থেকে নাম রাখা হয়েছে পিপ্পল, এ থেকে পিপ্পলি, পিপলি বা পিপুল। তামিল শব্দ পিপ্পলি থেকে পিপুল নামের উদ্ভব। বৈদিক যুগে পিপুল ছিল সর্বাধিক ব্যবহৃত ভেষজ গাছ। বেদশাস্ত্রে প্রথম পিপুলের উল্লেখ পাওয়া যায়। বেদে পিপুলকে উঁচু স্থানও দেয়া হয়েছে ও পিপুলের ভেষজ গুণ বর্ণিত হয়েছে। চরকসংহিতার যুগে পিপুল ছিল সর্বাধিক ব্যবহৃত ভেষজ উদ্ভিদ। এর ইংরেজি নাম Long pepper পিপুলের ফল লম্বা ও ঝাল বলে হয়তো এর ইংরেজি নাম হয়েছে লং পিপার।


উৎপত্তি ও বিস্তার : পিপুলের জন্মভূমি প্রাচীন ভারতবর্ষের মগধদেশ বলে দাবি করেছেন শিবকালী ভট্টাচার্য। মগধ দেশ ছিল বর্তমান বিহার প্রদেশের দক্ষিণাংশ। কোশল বা উত্তর প্রদেশও ছিল মগধের অঙ্গভূমি। এজন্য পিপুলের আর একটি নাম মাগধী। খৃস্টপূর্ব ৫ম ও ৬ষ্ঠ শতকে ভারতবর্ষ থেকে পিপুল গ্রিসে প্রবেশ করে এবং হিপোক্রেটাস পিপুলকে মশলার চেয়ে ভেষজ হিসেবেই বেশি আলোচনা করেন। বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও আসাম, নেপাল, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, তিমুর প্রভৃতি দেশে পিপুল বেশি জন্মে।


উদ্ভিদতাত্ত্বিক বর্ণনা : পিপুলের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Piper longum L.ও পরিবার Piperaceae. চার রকমের পিপুল দেখা যায়- ১. পিপলি- এর আর এক নাম মাগধী। মগধ প্রদেশে এক সময় এ পিপুল গাছ জন্মাত বলে এর এরূপ নাম। ভারতবর্ষের প্রায় সব স্থানে এই গাছ দেখা যায়। ছোট ও বড় পিপুল এ শ্রেণীর অন্তর্গত। ২. গজপিপুল- এটি আসলে প্রকৃত পিপুল নয়, চুইঝাল গাছের ফলকে বলে গজপিপুল। ৩. সিংহলী পিপুল- সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার প্রভৃতি দেশে এই পিপুল জন্মে। একে জাহাজী পিপুলও বলে। ৪. বনপিপুল- অযত্ন এই পিপুল বনে আপনা আপনি জন্মে। এর গাছ আকারে ছোট, ফলও ছোট, ঝাঁঝ কম, সরু। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে যেখানে সেখানে বনে জঙ্গলে এ পিপুল গাছ দেখা যায়। পিপুল পানের মতো একটি লতানো স্বভাবের গাছ। অবলম্বন না পেলে গাছ মাটিতেই পড়ে থাকে। অবলম্বন পেলে তা বেয়ে ওপরে ওঠে। লতায় গিঁট আছে। লতার আগা কোমল, পাতা পানপাতার মতো হৃৎপিণ্ডকার। পাতার রঙ গাঢ় সবুজ, নিচের পিঠ হালকা সবুজ। পত্রকক্ষ থেকে পুষ্পমঞ্জরি বের হয় ও ফল ধরে। পুরুষ ও স্ত্রী ফুল পৃথক গাছে আলাদাভাবে ফোটে। ফুল লম্বা দণ্ডের মতো মঞ্জরিতে ফোটে। বর্ষাকালে ফুল হয়, শরৎকালে ফল ধরে। ফল ডিম্বাকার। পিপুল ফল দেখতে অনেকটা মরিচের মতো, তবে ফল অমসৃণ ও কুঁচকানো। ফল হালকা সবুজ, কমলা ও হলুদ রঙের হয়। পাকলে ফলের রঙ লাল হয়ে যায়। শিকড় ধূসর বাদামি ও লম্বালম্বিভাবে কুঁচকানো।


মাটি ও জলবায়ু : পিপুল সাধারণত সুনিষ্কাশিত লাল, দো-আঁশ ও জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ মাটিতে ভালো জন্মে। উর্বর মাটিতে শুধু জৈব সার দিয়ে পিপুল চাষ করা যায়। বেলে দো-আঁশ মাটি চাষের জন্য ভালো। যেসব অঞ্চলে উচ্চ আর্দ্রতা ও উষ্ণতা বিরাজ করে সেসব অঞ্চলে পিপুল ভালো হয়। পিপুলের জন্য ৩০-৩২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা, ৬০% আপেক্ষিক আর্দ্রতা ও বার্ষিক ১৫০ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত উত্তম। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাধারণত ১০০ থেকে ১০০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে পিপুল জন্মে থাকে। অধিক উচ্চতা ও উঁচু পাহাড়ে ফলন ভালো হয় না। গাছের ভালো বৃদ্ধির জন্য আংশিক ছায়া (২০-২৫%) উত্তম।


ব্যবহার : পিপুলের বাণিজ্যিক ব্যবহার এখনও প্রধানত মশলা হিসেবে। ভেষজের চেয়ে মশলা ফসল হিসেবেই বেশি চাষ করা হয়। আচার ও চাটনি তৈরিতে পিপুল চূর্ণ মশলা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। উত্তর আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় কোনো কোনো খাদ্য সামগ্রী রান্নায় পিপুল ব্যবহার করা হয়। ভারতের বাজারে মুদি দোকানে পিপুল চূর্ণ পাওয়া যায়। পাকিস্তানে নিহারি বা নেহারি রাঁধতে পিপুল চূর্ণ এক আবশ্যকীয় মশলা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মশলা ছাড়া এর যথেষ্ট ভেষজ গুরুত্ব রয়েছে।


ভেষজ গুণ : চরকসংহিতার সূত্র স্থানে ৯টি বিশিষ্ট রোগে পিপুলকে প্রয়োগ করার ব্যবস্থা দেয়া হয়েছে। এ ৯টি রোগ হলো- কণ্ঠ রোগ, তৃষ্ণা রোগ, শিরো রোগ, হিক্কা, কাশি, শূলরোগ, শীত বা ঠাণ্ডা লাগা প্রশমন ও দীপনীয়। সে যুগে পিপুল এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে যেন কৃমিরোগ ও অন্ত্ররোগ চিকিৎসায় দেবতারাই তা গ্রহণ করতেন। দেহের বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় পিপুল কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। ফুসফুসের ক্যান্সার, ব্রেস্ট ক্যান্সার, আন্ত্রিক ক্যান্সার, লিউকোমিয়া, মস্তিষ্কেও টিউমার, গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সার প্রভৃতি রোগের বিরুদ্ধে পিপুল কার্যকর। পিপুলের মধ্যে পিপারলংগুমিনাইন নামক রাসায়নিক যৌগ থাকায় তা এসব ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে। এছাড়াও আরও যেসব রাসায়নিক উপাদান পিপুলে রয়েছে সেগুলো হলো পিপারিন, পিপলারটাইন, পিপারনোলিন, লং এমাইড, পিপারলংগিন, পিপারসাইড, পেল্লিটোরিন, বিভিন্ন এসেনশিয়াল অয়েল ইত্যাদি। শিকড়ে রয়েছে পিপারিন, স্টেরয়েডস, গ্লুকোসাইডস, পিপেলারটিন ও পিপারলংগুমিনাইন নামক রাসায়নিক উপাদান। ওষুধার্থে পিপুলের শিকড় ও ফল ব্যবহৃত হয়। সাধারণ পিপুল ফলের গুঁড়া আধা থেকে ১ গ্রাম পরিমাণ এক মাত্রা হিসেবে রোজ সেবন করা হয়। নিচে পিপুলের উল্লেখযোগ্য ভেষজ গুণ ও ব্যবহার সম্পর্কে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো-


নিদ্রাহীনতা দূর করে : রাত গভীর হচ্ছে অথচ কিছুতেই ঘুম আসছে না। এ অবস্থাটা আসলে অসহ্য। একে বলে নিদ্রহীনতা। এ অবস্থা হলে পিপুলের শরণাপন্ন হতে হবে। পিপুলের ১-৩ গ্রাম শিকড় সামান্য চিনি সহকারে ছেঁচে বা বেঁটে সেই রস ছেঁকে দিনে দুবার সকাল বিকেলে খেতে হবে। বয়স্ক লোকদের এই রস সেবনে বিশেষ উপকার হয়। চিনির বদলে আখের গুড়ও ব্যবহার করা যায়। এতে হজমও ভালো হয়।  


কাশি সারে : খুসখুসে কাশি আর ঘুষঘুষে জ্বর। এটা যক্ষ্মা রোগের পূর্ব লক্ষণ। এরূপ অবস্থা হলে তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে ও পরীক্ষা করাতে হবে। তবে তার আগে পিপুলচূর্ণ ২৫০ মিলিলিটার সামান্য গরম জলে গুলে সকাল-বিকেল অর্থাৎ দিনে দুইবার খেতে হবে। এভাবে ৪-৫ দিন খাওয়ার পর সেটা চলে যেতে পারে। যদি না যায়, তখন অবশ্যই যক্ষ্মা রোগের পরীক্ষা করাতে হবে।


জ্বর সারায় : যে জ্বরে রক্তের বল কমে যাচ্ছে, শরীর ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে, চামড়া শুষ্ক হয়ে পড়ছে, চোখ ফ্যাকাসে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চলছে, অথচ জ্বর সারছে না। সেক্ষেত্রে ২৫০ মিলিগ্রাম পিপুল চূর্ণ ৫/১০ ফোঁটা ঘি মিশিয়ে রোজ খেলে কয়েক দিনের মধ্যে এই জীর্ণ জ্বর সেরে যাবে।


মেদ কমায় : যারা মোটা ও মেদস্বী তারা মেদ কমাতে চাইলে রোজ খাওয়ার ১০-১৫ মিনিট পর ১ কাপ হালকা গরম জলে ২৫০ মিলিগ্রাম পিপুল চূর্ণ গুলে তাতে আধা চা-চামচ মধু মিশিয়ে খাবেন। দিনে দুইবার খাওয়া যায়। এভাবে ১০-১৫ দিন খেলে মেদ কমবে। এ সময় কোনো চিনি বা মিষ্টি খাওয়া চলবে না ও একবেলা ভাত ও দুইবেলা রুটি খেতে হবে। এটা খাওয়ার ১ ঘণ্টার মধ্যে কোনো শক্ত খাবার খাওয়া যাবে না, তবে তরল খাবার খাওয়া যেতে পারে।


হাঁপানির উপশম হয় : অল্প পরিশ্রমে যাদের শ্বাসকষ্ট হয়, হাঁপ ধরে তারা পিপুলচূর্ণ ২৫০ মিলিলিটার সামান্য ১ কাপ জলে গুলে খাবার গ্রহণের কিছু পরে খেতে পারেন। তা না হলে ২ গ্রাম পিপুল ফল একটু থেঁতো করে ৪ কাপ জলে সিদ্ধ করে ১ কাপ থাকতে নামিয়ে ২-৩ ঘণ্টা পর পর তা ৩-৪ বারে খেতে পারেন। এতে শ্বাসের কষ্ট কমবে।


কৃমি কমায় : শিশু বৃদ্ধ যারই গুঁড়া বা ঝুড়ো কৃমি হোক তাদের উচিত রোজ সকাল-বিকেল ১ কাপ বাসি জলে ২৫০ মিলিগ্রাম পিপুল চূর্ণ গুলে খাওয়া। এতে কৃমির উপদ্রব কমবে।
মাথাব্যথা কমায় : মাথা ব্যথা হলে তা সারানোর সবচেয়ে সহজ ওষুধ হলো পিপুল ফল বেঁটে মলমের মতো করে কপালে লেপে দেয়া। এতে দ্রুত মাথাব্যথা কমে। এছাড়া পিপুল, গোলমরিচ ও আদা একসাথে জলের সাথে বেঁটে ছেঁকে সেই রস রোগীকে খাওয়ানো। এতেও মাথাব্যথার উপশম হয়।


দাঁত ব্যথা সারায় : দাঁতে যন্ত্রণা হলে ১-২ গ্রাম পিপুল চূর্ণ লবণ, হলুদের গুঁড়া ও সরিষার তেলে মিশিয়ে দাঁতের ব্যথা স্থানে লাগালে তা কমে যায়।


হৃদরোগে : সমপরিমাণ পিপুল মূল ও দারচিনি একসাথে বেঁটে মিহি গুঁড়া করতে হবে। তারপর তা ঘিয়ের সাথে মিশিয়ে রোজ দুইবার খেতে হবে। এতে কোষ্ঠকাঠিন্য ও হৃদরোগের উপশম হয়। সমপরিমাণ শুকনো পিপুল মূল ও লেবুর গাছের শিকড়ের বাকল একসাথে বেঁটে গুঁড়া বানাতে হবে। রাতে ১ কাপ জলে অর্জুনের ছাল ভিজিয়ে রাখতে হবে। সকালে সেই অর্জুনের ক্বাথের সাথে এই চূর্ণ মিশিয়ে খালি পেটে খেতে হবে। এতে হৃৎপিণ্ডের ব্যথা থাকলে তাও সেরে যায়।


অর্শ নিরাময় করে : অর্শ হলে আধা চা-চামচ পিপুল চূর্ণ, ভাজা জিরার গুঁড়া সামান্য লবণ ১ গ্লাস ঘোলে মিশিয়ে খালি পেটে খেতে হবে। এতে অর্শ রোগ কমে যাবে। ঘোল পাওয়া না গেলে ছাগলের দুধে মিশিয়ে খাওয়া যেতে পারে। এমনকি এই মিশ্রণ জ্বাল দিয়ে ঘন করে মলমের মতো অর্শের বুটিতে লাগিয়ে দেয়া যায়।


কীট দংশনের ব্যথা কমায় : পিপুলের শিকড় বেঁটে পোকামাকড়ের কামড়ানো স্থানে লেপে দিলে দ্রুত ব্যথা কমে যায়।


সতর্কতা : দুধের শিশু, গর্ভবতী ও প্রসূতিদের পিপুল খাওয়ানো চলবে না। মাত্রারিক্ত সেবনে অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে, অন্ত্র ফুলে যেতে পারে ও দেহের তাপ বেড়ে যেতে পারে।
 

চাষাবাদ : সাধারণত এ দেশে কেউ পিপুল চাষ করে না। নাটোরে কোনো কোনো চাষি স্বল্প আকারে চাষ করেন।  শিকড় গজানো কাণ্ডের কাটিং দ্বারা সহজে পিপুলের চারা তৈরি ও চাষ করা যায়। বীজ থেকেও পিপুলের চারা হয়। লতা মাটির সাথে শুইয়ে দাবাকলম করে গিঁট থেকে শিকড় গজিয়ে নেয়া যায়। এক বছর বয়সী লতার আগার দিকের অংশ  যেখানে ৫-৭টি গিঁট থাকে তা কাটিং করার জন্য ভালো। পলিব্যাগ বা বেডে চারা তৈরি করা যায়। সাধারণত লতা থেকে পিপুলের চারা তৈরি করা হয়। মার্চ-এপ্রিল মাস চারা তৈরির উপযুক্ত সময়। নতুন শিকড় ও লতায় ছাতরা পোকার আক্রমণ যাতে না হয় বা কম হয় ও প্রথম বর্ষার পরপরই যাতে চারা লাগানো যায় সেজন্য এ সময় চারা তৈরি করা যেতে পারে। পিপুল চাষ করতে চাইলে জমি ভালো করে চাষ দিয়ে ২.৫ মিটার চওড়া করে বেড বানাতে হবে। দুই বেডের মাঝে ৩০ সেন্টিমিটার নালা রাখতে হবে। বেড জমির দৈর্ঘ্য অনুসারে লম্বা হতে পারে। পিপুল চাষের জন্য ৩ মিটার লম্বা ও ২.৫ মিটার চওড়া আকারের বেড উত্তম। বেডের মাঝে ৬০ সেন্টিমিটার পর পর সারিতে ৬০ সেন্টিমিটার দূরে দূরে কাটিং লাগাতে হবে। পাহাড়ের ঢালে ২ মিটার পর পর পিপুলের কাটিং লাগাতে হবে। কাটিং লাগানোর আগে রোপণ স্থানে গর্ত করে তার মাটির সাথে জৈব সার মিশিয়ে ভরতে হবে। প্রতি গর্তের মাটির সাথে ১০০ গ্রাম জৈব সার মিশিয়ে দিতে হবে। হেক্টরে ১০-১৫ টন জৈব সার দিলে ভালো হয়। গর্ত ১৫ সেন্টিমিটার গভীর হলেই চলবে। গর্তের ঠিক মাঝখানে কাটিং লাগাতে হবে। প্রতি গর্তে দুটি কাটিং লাগাতে হবে।

তীব্র রোদে পিপুল গাছের ক্ষতি হয়। তাই পিপুল ক্ষেতের মধ্যে কিছু কলাগাছ লাগিয়ে ছায়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আন্তঃফসল হিসেবে কলা থেকে বাড়তি আয় হতে পারে। ইউক্যালিপটাস গাছ লাগিয়েও পিপুল ক্ষেতে ছায়ার ব্যবস্থা করা যায়। নারিকেল বা সুপারি বাগানের মধ্যে আন্তঃফসল হিসেবে পিপুল চাষ করা যায়। পিপুল গাছ এসব গাছ বেয়ে উঠতে পারে। মে মাসের শেষে কাটিং লাগানো সবচেয়ে ভালো যদি এক পশলা বৃষ্টি হয়ে যায়। তা না হলে জুন-জুলাই কাটিং লাগানোর উত্তম সময়। লাগানোর সময় বৃষ্টি থাকলে সেচের দরকার নেই, না হলে রোপণের পরই সেচ দিতে হবে। বর্ষার পর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসেও কাটিং রোপণ করা যায়। আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাতের অবস্থা বুঝে পরবর্তীতে সেচ ব্যবস্থাপনা চালিয়ে যেতে হবে। দরকার হলে সপ্তাহে একবার সেচ দিতে হবে।  রোপণের পর ৩ মাস পর্যন্ত আগাছা পরিষ্কার করে চারার গোড়ায় মাটি তুলে দিতে হবে। খরার সময় বা গ্রীষ্মকালে গাছের গোড়ার মাটি খড় দিয়ে ঢেকে দিলে বা মালচিং করলে উপকার হয়। এ সময় সেচ দিতে পারলে অসময়েও ফুল-ফল ধরে। বর্ষাকালে পাতায় দাগ রোগ বেশি হতে পারে। সেক্ষেত্রে ডায়থেন এম ৪৫ বা নাটিভো ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে।


ফসল সংগ্রহ ও ফলন : চারা রোপণের ৬ মাস পর থেকে গাছে ফুল আসতে শুরু করে। ফুল আসার ২ মাস পর সেসব ফল সংগ্রহের উপযুক্ত হয়। যখন ফলগুলো পূর্ণতা পায় অথচ পাকে না ঠিক সে অবস্থায় পিপুলের ফল সংগ্রহ করা উচিত। এ অবস্থায় ফল না তুলে রেখে দিলে দ্রুত তা পেকে যায় ও ঝাঁঝ অনেক কমে যায়। এছাড়া পিপুলের ফল পেকে গেলে সেসব ফল শুকানোর পর সহজে ভাঙা বা গুঁড়া করা যায় না। সেজন্য পাকা পিপুল ফল তোলা হয় না। একবার লাগালে সেসব গাছ থেকে ৩ বছর পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। ফলের রঙ গাঢ় সবুজ হলে তা সংগ্রহ করা উচিত। প্রথম বছর প্রতি হেক্টরে গড় ফলন পাওয়া যায় ৭৫০ কেজি শুষ্ক ফল, দ্বিতীয় বছরে ১৫০০ কেজি ও তৃতীয় বছরে ১০০০ কেজি। তবে ব্যবস্থাপনার কারণে ফলনের কম-বেশি হতে পারে। তিন বছরের পর আর গাছ রাখা উচিত নয়। এরপর নতুন করে আবার কাটিং লাগাতে হবে।গাছের গোড়ায় মোটা কা- বা শিকড় কেটে তোলা হয়। একে বলে ‘পিপুলমূল’। ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনম জেলায় পিপুল শুধু মূলের জন্য চাষ করা হয়। সেখানে পিপুল গাছ লাগিয়ে ১৮ মাস বয়স হলে তা থেকে শিকড় সংগ্রহ শুরু করা হয়। গাছ ১০-৩০ বছর পর্যন্ত রেখে দেয়া হয়  এবং তা থেকে প্রতি বছর শিকড় সংগ্রহ করা হয়। সাধারণত গাছের বয়স ১৮ মাস হলে সেসব গাছ থেকে মূল সংগ্রহ শুরু হয়। মূল ২.৫ থেকে ৫ সেন্টিমিটার টুকরো করে কাটা হয়। প্রতি হেক্টরে গড়ে ৫০০ কেজি শুষ্ক মূল পাওয়া যায়।


ফল শুষ্ককরণ : ফল তোলার পর তা উল্টে পাল্টে রোদে ৪-৫ দিন শুকাতে হয়। ভালো করে না শুকানো পর্যন্ত তা ঘরে রাখা উচিত নয়। সাধারণত ১০ কেজি কাঁচা ফল শুকালে ১.৫ কেজি শুষ্ক ফল পাওয়া যায়। ওষুধ তৈরির কাজে ব্যবহারের জন্য শুষ্ক ফল বায়ুবদ্ধ পাত্রে মজুদ করে রাখা যায় বা বস্তা ভরে বাজারে বিক্রির জন্য পাঠানো যায়। পিপুল ফল শুকানো সহজ হলেও শুকানোর প্রক্রিয়াগত কারণে অনেক সময় ফল নষ্ট হয় ও অপচয়ের পরিমাণ বাড়ে। পিপুল ফল শুকানোর জন্য ৫০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা উত্তম। এতে রাসায়নিক উপাদান সর্ব্বোচ্চ থাকে। পাতলা স্তরে বিছিয়ে পিপুল ফল শুকানো উত্তম।

 

মৃত্যুঞ্জয় রায়*

* প্রকল্প পরিচালক, আইএফএমসি প্রকল্প, খামারবাড়ি, ঢাকা

বাহারি রঙিন শাকসবজি ও অ্যান্থোসায়ানিন

জীবন বাঁচাতে আমরা অনেক ধরনের খাদ্য খাই। আমাদের খাদ্য তালিকার বিরাট অংশ জুড়ে আছে হরেক রকমের বাহারি রঙিন শাকসবজি। এ শাকসবজি মানব দেহের অপরিহার্য ভিটামিন, খনিজ ও সেকেন্ডারি মেটাবোলাইটসের অন্যতম উৎস ও জোগানদাতা। বিশ্বে চীন ও ভারতের পরেই বাংলাদেশ এখন তৃতীয় সবজি উৎপাদনকারী দেশ। প্রতি বছর বিশ্বের ৫০টি দেশে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার সবজি রপ্তানি হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষিনির্ভর উদ্যোক্তার সংখ্যাও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা একদিকে বেকারত্ব হ্রাসে ভূমিকা রাখছে, অন্যদিকে অর্থনীতির চাকাকেও সচল রাখতে সাহায্য করছে। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের কৃষিতে সবজি উৎপাদন একটি বড় অর্জন। কৃষি পণ্য রপ্তানি থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৬৭৩.৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে। এর মধ্যে ২০১৭-১৮ বছরে (জুলাই-মে) সবজি রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৭১.২৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।


রাজধানী ঢাকায় গত ২৪-২৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো ৪র্থ ‘জাতীয় সবজি মেলা-১৯’। মেলায় প্রায় ১১২ জাতের সবজি নিয়ে ৭১টি স্টল ও ৫টি প্যাভিলিয়ন ছিল। মানুষের মধ্যেও সবজি মেলা নিয়ে এত সাড়া দেখা যায়নি কখনো। দেশে সবজি উৎপাদনে যে বিপ্লব ঘটেছে এবারের সবজি মেলা তারই স্বাক্ষর বহন করছে। এখানেই শেষ নয়, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রতিবেদন অনুয়ায়ী, গত ৪০ বছরে বাংলাদেশে সবজির উৎপাদন আগের তুলনায় পাঁচগুণ বেড়েছে। হাতে গোনা কয়েকটি মৌসুমি সবজি ছাড়া প্রায় সারা বছরই সব ধরনের সবজি উৎপাদন হচ্ছে, যা আগে কখনো কল্পনাই করা যায়নি। বাংলাদেশের সার্বিক কৃষি ব্যবস্থা, প্রযুক্তির ব্যাপকতা, কৃষকের নিরলস শ্রম ও অদম্য আগ্রহ এ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।


জীবনের প্রয়োজনে সবজি আমাদের বেশি করে খেতে হবে। বাহারি সবজি বলতে এখানে রঙিন সবজিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। রঙিন শাকসবজি হচ্ছে অ্যান্থোসায়ানিনের প্রাকৃতিক উৎস। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে অ্যান্থোসায়ানিন কি? অ্যান্থোসায়ানিন মানব স্বাস্থ্যের কি উপকার করে? নি¤েœ ধারাবাহিকভাবে এ বিষয়ে সংক্ষিপ্তভাবে আলোকপাত করা হচ্ছে।


অ্যান্থোসায়ানিন :
উদ্ভিদ দেহে ক্লোরোফিল ছাড়া অন্যান্য প্রধান উদ্ভিজ্জ রঞ্জকগুলো হলো ক্যারোটিনয়েড, ফ্লাভোনয়েড এবং বেটালিন। ফ্লাভোনয়েড হচ্ছে উদ্ভিজ্জ সেকেন্ডারি মেটাবোলাইটগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ গ্রুপ। বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত প্রায় ৬০০০প্রকার ফ্লাভোনয়েড শনাক্ত করেছেন। আর অ্যান্থোসায়ানিন হলো ‘ফ্লাভোনয়েড’ গ্রুপের এক ধরনের উদ্ভিজ্জ বায়োঅ্যাক্টিভ যৌগ, যা উদ্ভিদের পাতা, ফুল, ফল ও মূলের বর্ণের প্রধান নিয়ামক।
 

১৮৩৫ সালে জার্মান উদ্ভিদ বিজ্ঞানী লুড উইং মার্কাট অ্যান্থোসায়ানিনের নামকরণ করেন। এটি মূলত দুটি গ্রিক শব্দ অ্যান্থোস অর্থ ফুল এবং ক্যানস অর্থ নীল থেকে এসেছে। অ্যান্থোসায়ানিন সাধারণত কোষের সাইটোপ্লাজমে তৈরি হয়। এটি পানিতে দ্রবণীয় এবং কোষ গহ্বরে গিয়ে সঞ্চিত হয়। এটি উদ্ভিদের বিভিন্ন বর্ণ যেমন- কমলা, লাল, গোলাপি এবং নীল বর্ণের জন্য দায়ী। দৃশ্যমান উদ্ভিজ্জ রঞ্জকগুলোর মধ্যে ক্লোরোফিলের পরেই অ্যান্থোসায়ানিনের অবস্থান।


মানব দেহে অ্যান্থোসায়ানিনের প্রভাব : অ্যান্থোসায়ানিন নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অনেক গবেষণা হয়েছে এবং বর্তমানেও চলছে। গত দুইদশক ধরে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ ফলাফলে অ্যান্থোসায়ানিনের নিম্নের বর্ণিত প্রভাব/উপকারিতা পরিলক্ষিত হয়েছে-
(১) অ্যান্থোসায়ানিন একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা মানব দেহে রোগ প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।
(২) অ্যান্থোসায়ানিন মানব দেহে ক্যান্সার, হৃদরোগ, নিউরোডি জেনারেটিভ ব্যাধি, বার্ধক্যজনিত রোগের ঝুঁকি কমায়।
(৩) সিরামে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের মাত্রা বৃদ্ধি, কোলস্টেরল বণ্টন, স্থূলতা হ্রাস, দৃষ্টি রোগ পুনঃস্থাপন ও লোহিত কণিকাকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।

 

প্রকৃতিতে অ্যান্থোসায়ানিনের প্রভাব :
(১) অ্যান্থোসায়ানিন উদ্ভিদের পাতা, ফুল, ফলকে বর্ণিল করে বিভিন্ন কীটপতঙ্গ এবং প্রাণীকে আকৃষ্ট করার মাধ্যমে পরাগায়ন ও প্রাকৃতিকভাবে বীজ বিস্তারে সাহায্য করে।
(২) অ্যান্থোসায়ানিন আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে উদ্ভিদ কুলকে রক্ষা করে।
যে সবজিগুলোতে অ্যান্থোসায়ানিন পাওয়া যাবে : অ্যান্থোসায়ানিনের প্রাকৃতিক উৎস হচ্ছে রঙিন শাকসবজি। যেমন- লালশাক, লালমুলা, লালবরবটি, লাল মিষ্টিআলু, লাল গোলআলু, লালশিম ও শিমের বীজ, লাল লেটুস, লাল বাঁধাকপি, লাল ফুলকপি, কালো বেগুন এবং লাল ও হলুদ রঙের ক্যাপসিকাম ইত্যাদি।


উন্নত বিশ্বে অ্যান্থোসায়ানিনের ব্যবহার : বিশ্বে চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড ও আমেরিকায় বহুপূর্ব থেকেই অ্যান্থোসায়ানিনের ব্যবহার শুরু করেছে। অ্যান্থোসায়ানিনের স্বাস্থ্য গুণাগুণ বিবেচনা করে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী উচ্চ মাত্রায় অ্যান্থোসায়ানিন সমৃদ্ধ ট্রান্সজেনিক আপেল উদ্ভাবন করেছেন। এ ফলগুলোর গায়ে ও ভেতরে সাধারণ আপেলের তুলনায় অনেকগুণ বেশি অ্যান্থোসায়ানিন তৈরি হওয়ায় এদের বর্ণ লাল। বর্তমানে এটি ক্যাপসুল আকারে বাজারজাতকরণ শুরু হয়েছে। সর্বপ্রথম ২০০১ সালে নরওয়েভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘বায়োলিংক গ্রুপ’ অ্যান্থোসায়ানিন ক্যাপসুল ‘ম্যাডক্স’ প্রস্তুত করেন এবং প্রাথমিকভাবে নরওয়েতে বাজারজাতকরণ করা হয়। পরে ২০০৭ এর প্রথম দিকে আমেরিকায় বাজারজাত করণের জন্য ‘ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ কর্তৃক অনুমোদন লাভ করে।


বাংলাদেশের কৃষি সেক্টরে অ্যান্থোসায়ানিন নিয়ে করণীয় :
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সবজি বিভাগ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার সেন্টার ও বিএডিসির বীজ উৎপাদন খামারগুলো এ বিষয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিতে পারেন। এর মধ্যে দেশের কিছু এলাকায় অগ্রসর শিক্ষিত চাষিরা স্বল্প পরিসরে হলে  ও লালমুলা, লালবরবটি, লাল বাঁধাকপি ও ফুলকপি, লাল ও হলুদ রঙের ক্যাপসিকাম, কালো বেগুন ইত্যাদি উৎপাদন করে অভিজাত এলাকায় বিক্রি ও হোটেলে সরবরাহ করছে। উৎপাদনের বিরাট একটি অংশ বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন।


সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো রঙিন সবজির অঞ্চলভিত্তিক উৎপাদন উপযোগিতা যাচাই করার কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারেন। সাথে সাথে রঙিন সবজির উন্নত ও অধিক উৎপাদনশীল জাত উদ্ভাবন করার ব্রিডিং কর্মসূচি প্রণয়ন করতে পারেন। অ্যান্থোসায়ানিনের উপকারিতা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে প্রচলিত সবজির পরিবর্তে রঙিন সবজির আবাদ ও খাদ্য তালিকায় রঙিন সবজির অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে জোর প্রচেষ্টা শুরু করা যেতে পারে।


গবেষণা ও সম্প্রসারণ বিভাগের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অ্যান্থোসায়ানিনের উপকারিতা বিষয়ে কৃষকদের হাতে কলমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ইলেকট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ার সহায়তা কাজে লাগানো যেতে পারে। অন্যান্য সবজি খাওয়ার সাথে সামান্য পরিমাণ হলেও রঙিন সবজি গ্রহণে ভোক্তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এলাকাভিত্তিক চাহিদার আলোকে রঙিন সবজি উৎপাদন উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও বাজারজাতকরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।


পূর্বে বলা হয়েছে, সবজি উৎপাদন ৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। রপ্তানি বৃদ্ধির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটানোর প্রয়োজনে সবজির উৎপাদন আরো বাড়াতে হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, সবজির উৎপাদন হতে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতেই প্রতি বছর প্রায় শতকরা ৪০ ভাগ সবজি নষ্ট হয়ে যায়। এটা কিভাবে কমিয়ে আনা যায় সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।


পুষ্টিবিদদের মতে, একজন মানুষের প্রতিদিন ২২০-২২৫ গ্রাম সবজি খাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশের লোকজনের খাদ্য তালিকায় এখনো সবজির পরিমাণ মাত্র ১২৫ গ্রাম (সূত্র : এফএও, ডিএই)। অর্থনৈতিক বিবেচনায় প্রচলিত সবজির চেয়ে রঙিন সবজির দাম ২-৩ গুণ বেশি। কাজেই রঙিন সবজি চাষাবাদ করে কৃষকদের আর্থিক সমৃদ্ধি অর্জন এবং অ্যান্থোসায়ানিনের উপকারিতা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা করা সম্ভব।

 

ড. মুহাম্মদ মহীউদ্দীন চৌধুরী
প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, সগবি, বিএআরআই, নোয়াখালী, মোবাইল-০১৮২৭-৮৬৫৮৬০, ই-মেইল -psoofrdbari@gmail.com

 

 

বাংলাদেশ থেকে আলু রপ্তানি

আলু এখন আমাদের দেশে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় একটি ফসল। স্বল্পমেয়াদি এ ফসলটির উৎপাদন আয় অন্যান্য ফসলের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। সাম্প্রতিক কয়েক বছরের আলু আবাদের অবস্থা তথা আলুর ফলন ও উৎপাদন এলাকা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে আনুপাতিক হারে উভয়টিই উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী দেশে ৪০ লাখ টন আলুর চাহিদার বিপরীতে গড়ে প্রায় ৮০ লাখ টন আলু উৎপাদিত হচ্ছে। অবশ্যই এটা শুভ লক্ষণ কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে আমাদের দরিদ্র আলু চাষিরা এর সুফল তেমন একটা পাচ্ছে না, পাচ্ছে কোল্ডস্টোর মালিক, খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা। উৎপাদন মৌসুমে আলুর ন্যায্যমূল্য না পাওয়া কিংবা ন্যায্যমূল্যের আশায় বিকল্প হিসেবে কোল্ডস্টোরে সংরক্ষণ করতে না পেরে আলুর চাষিরা অনেক সময় তা পানির দরে বিক্রি করে দেয় ফলে অনিশ্চিত লাভের কারণে অনেক আলু চাষি সম্ভাবনাময় এ ফসলটির চাষের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। পত্রিকায় দেখা গেছে, হিমাগারের সামনে আলুবহনকারী ট্রাকের দীর্ঘলাইন এবং এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণীর হিমাগার মালিকদের অসাধু রমরমা ব্যবসা। বর্তমান সরকার একটি কৃষিবান্ধব সরকার তাই সরকারের উচিত আলু চাষিদের তথা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে উদ্বৃত্ত আলু বিদেশে রপ্তানির ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তাছাড়া আলুর নানাবিদ ব্যবহার ও শিল্পের প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে এর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যেগী হতে হবে।


বাংলাদেশ থেকে আলু রপ্তানি : ১৯৯৮ সনে এটিডিপি (এ্যাগ্রোবেজ্ড টেকনোলজি ডেভেলপমেন্টের প্রোগ্রাম) একটি মার্কেটিং মিশন বাংলাদেশ থেকে সিংঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে ফ্রেশ আলু রপ্তানির সম্ভাব্যতা যাচাই করে এবং ১৯৯৯ সনে এটিডিপির উদ্যোগে প্রথম ১২৬ টন আলু উল্লিখিত দেশে রপ্তানি করা হয়। ২০০৫, ২০০৬ সনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আলু রপ্তানি করা হয়। ২০০৭ সনে রপ্তানির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার টনে। ২০১১ সনে বাংলাদেশ থেকে ৭টি প্রাইভেট কোম্পানির মাধ্যমে প্রায় ২০ হাজার টন আলু রপ্তানি করা হয়েছে (বাসস, ঢাকা)। সাম্প্রতিককালে থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়াও বাংলাদেশ থেকে আলু আমদানি শুরু করেছে। শুধুমাত্র মালয়েশিয়ায় আলুর চাহিদা রয়েছে ১০ লাখ টন, সিঙ্গাপুর ও শ্রীলংকায় প্রতিটিতে চাহিদা রয়েছে ৩ লাখ টন করে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (EPB) হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে ২০১৪-১৫ সনে ২৭২ কোটি টাকার আলু বিদেশে রপ্তানি করা হয়েছে যার মধ্যে শুধু মালয়েশিয়ায় রপ্তানি করা হয়েছে ১০৪ কোটি টাকার আলু এবং রাশিয়ায় ৭২ কোটি টাকার আলু। বিএডিসির অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ড. শেখ আব্দুল কাদেরের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ পটোটো এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন’। যা বিদেশে আলু রপ্তানির ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে।


আলু সংরক্ষণের অবস্থা : গত দুই বছরে আলুর উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৮৫ লাখ টনে পৌঁছে। উৎপাদিত এ আলুর সর্বোচ্চ ২২-২৫ লাখ টন ৩২৫টি হিমাগারে সংরক্ষণ করা যায়। প্রতি মাসে ৩.৫ লাখ টন আলুর ব্যবহার হিসাব করলে বছরে প্রায় ৪০ লাখ টন আলুর প্রয়োজন হয়। বাকি ৩০-৪০ লাখ টন চাষির ঘরেই থেকে যায়।


রপ্তানিযোগ্য আলুর বৈশিষ্ট্য : আমাদের দেশে উৎপাদিত সব জাতের এবং সব আকারের আলুই আমদানিকারক দেশের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং শ্রীলংকায় গ্রানুলা জাতের আলুর কদর বেশি। সাম্প্রতিককালে মালয়েশিয়ায় ডায়মন্ট ও কার্ডিনাল জাতের আলু রপ্তানি করা হয়েছে। ১০০ গ্রাম থেকে ১৫০ গ্রাম ওজন এবং ৪০-৬০ মি.মি আকারের উজ্জ্বল রঙ ও ভাসাভাসা চোখ (shallow eyed tuber) ও অধিক সুপ্তকাল (Longer dormancy) বিশিষ্ট মসৃণ ত্বকের আলু রপ্তানির জন্য বেশি উপযোগী। আলু রপ্তানির সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হচ্ছে ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাস কারণ আমদানিকারকরা হিমাগারে সংরক্ষিত আলুর চেয়ে ফ্রেশ আলু বেশি পছন্দ করে। আলু সংগ্রহের পর হতে কিছু দিনের মধ্যে আলুর আকারের মধ্যে কিছু অস্বাভাবিক অবস্থা (deformations) দেখা যায়, বিশেষ করে হিমায়িত আলু নির্দিষ্ট তাপমাত্রার নিচে রাখলে রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে মিষ্টতা (Sweetness) বৃদ্ধি পায় ও অন্যান্য গুণগতমানের অবনতি ঘটে। সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন সংগ্রহের সাথে সাথে (Harvest Period) আলু যাতে করে বিদেশে রপ্তানি করা যায় এ ব্যাপারে সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।


রপ্তানিযোগ্য আলুর আবাদ : আগাম রপ্তানির জন্য এমনভাবে আলু রোপণ করা দরকার যাতে করে ফেব্রুয়ারির ১ম সপ্তাহ হতে আলু সংগ্রহ করা যায়। নভেম্বরের ১ম সপ্তাহ হতে শুরু করে শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত কয়েক ধাপে রোপণ করলে ফেব্রুয়ারির ১ম সপ্তাহ হতে সংগ্রহ শুরু করে মার্চের ২য় সপ্তাহ পর্যন্ত আলু উঠানো যায়। এরূপ রোপণের ফলে দীর্ঘ সময় কাঁচা আলু সংরক্ষণ না করেও ফ্রেশ অবস্থায় রপ্তানি করা যায়।


আলু রপ্তানি বৃদ্ধিতে করণীয়
▪ আলু রপ্তানির জন্য নির্দিষ্ট চুক্তিবদ্ধ চাষি জোন (
Contract growing zone) গঠন করা।
▪ রপ্তানি ও প্রক্রিয়াজাত উপযোগী আলুর জাত ছাড়করণ ও কৃষক পর্যায়ে জনপ্রিয় করা।
▪ কাঁচা আলু রপ্তানির ক্ষেত্রে ইনসেনটিভ বোনাস বাড়িয়ে ১০-৩০% করা।
▪ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (
Expert Promotion Bureau), হরর্টেক্স ফাউন্ডেশন (Hortex Foundation) ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনকে (BADC) কাঁচা আলু রপ্তানির ক্ষেত্রে কারিগরি সহায়তা প্রদান।
▪ নতুন নতুন কোম্পানি যাতে আলু রপ্তানিতে উদ্যোগী হয় এজন্য সরকারকে উদ্যোগ গ্রহণ করা।

 

ড. মো. শাফায়েত হোসেন*

* উপব্যবস্থাপক (বীপ্রস), বিএডিসি, ঢাকা

চরাঞ্চলে নিরাপদ স্কোয়াশ উৎপাদন

স্কোয়াশ একটি সুস্বাদু ও জনপ্রিয় সবজি হিসেবে বিদেশিদের কাছে অনেক আগে থেকেই পরিচিত। এ দেশে স্কোয়াশ একটি উচ্চমূল্যের সবজি ফসল। কয়েক বছর ধরে এটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাষাবাদের খবর পাওয়া যাচ্ছে। তুলনামূলকভাবে কম উর্বর জমিতে এবং চরাঞ্চলে স্কোয়াশের চাষাবাদ সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিশেষ করে তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র নদীর অববাহিকায় স্কোয়াশের চাষাবাদ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন     লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও মাদারীপুর জেলার চাষিরা। দেশের অন্য অঞ্চলে রয়েছে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের সম্ভাবনা। গবেষকরাও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট হতে বারি স্কোয়াশ-১ নামে একটি জাত রবি মৌসুমে চাষাবাদের জন্য মুক্তায়ন করা হয়েছে। বারি স্কোয়াশ-১ একটি উচ্চফলনশীল জাত। পরাগায়নের পর থেকে মাত্র ১৫-১৬ দিনেই ফল সংগ্রহ করা যায়। নলাকার গাঢ় সবুজ বর্ণের ফল। গড় ফলের ওজন ১.০৫ কেজি। প্রতি হেক্টরে গড় ফলন ৪৫ টন।
উৎপাদন প্রযুক্তি
মাটি ও আবহাওয়া
স্কোয়াশের জন্য উষ্ণ, প্রচুর সূর্যালোক এবং নি¤œ আর্দ্রতা উত্তম। চাষকালীন অনুক‚ল তাপমাত্রা হলো ২০-২৫ ডিগ্রি  সেলসিয়াস। চাষকালীন উচ্চতাপমাত্রা ও লম্বা দিন হলে পুরুষ ফুলের সংখ্যা বেড়ে যায় এবং স্ত্রী ফুলের সংখ্যা কমে যায়। জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ দো-আঁশ বা এঁটেল দো-আঁশ মাটি এর চাষাবাদের জন্য উত্তম তবে চরাঞ্চলে পলিমাটিতে স্কোয়াশের ভালো ফলন হয়।  
বীজের হার
প্রতি হেক্টরে ২-৪ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়।
বীজ বপন ও চারা উৎপাদন
শীতকালে চাষের জন্য অক্টোবর-ডিসেম্বর মাসে বীজ বপন করা যায়। চারা নার্সারিতে পলিব্যাগে উৎপাদন করে নিলে ভালো হয়। বীজ বপনের জন্য ৮ ী ১০ সেমি. বা তার থেকে কিছুটা বড় আকারের পলিব্যাগ ব্যবহার করা যায়। প্রথমে অর্ধেক মাটি ও অর্ধেক গোবর মিশিয়ে মাটি তৈরি করে পলিব্যাগে ভরতে হবে। সহজ অঙ্কুরোদগমের জন্য পরিষ্কার পানিতে ১৫-২০ ঘণ্টা অথবা শতকরা এক ভাগ পটাশিয়াম নাইট্রেট দ্রবণে বীজ এক রাত ভিজিয়ে অতঃপর পলিব্যাগে বপন করতে হবে। প্রতি ব্যাগে দুটি করে বীজ বপন করতে হবে। বীজের আকারের দ্বিগুণ  মাটির গভীরে বীজ পুঁতে দিতে হবে। বীজ সরাসরি মাদায়ও বপন করা হয়। সেক্ষেত্রে সার প্রয়োগ ও মাদা তৈরির ৪-৫ দিন পর প্রতি মাদায় ২-৩টি করে বীজ বপন করা যেতে পারে। চারা গজানোর ১০-১২ দিন পর ১টি সুস্থ ও সবল চার রেখে  বাকিগুলো উঠিয়ে ফেলতে হবে। চারার বয়স ১৬-১৭ দিন হলে তা মাঠে প্রস্তুত মাদায় লাগাতে হবে।
বেড তৈরি
বেডের উচচতা ১৫-২০ সেমি. ও প্রস্থ ১-১.২৫ মি. এবং লম্বা জমির দৈর্ঘ্য অনুসারে সুবিধামতো নিতে হবে। এভাবে পরপর বেড তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি দুইটি বেডের মাঝখানে ৭০ সেমি. প্রশস্ত সেচ ও নিকাশ নালা থাকবে।
মাদা তৈরি
মাদার ব্যাস ৫০-৫৫ সেমি. গভীরতা ৫০-৫৫ সেমি. এবং তলদেশ ৪৫-৫০ সেমি. প্রশস্ত হবে। ৬০ সেমি. প্রশস্ত সেচ ও নিকাশ নালা সংলগ্ন বেডের কিনারা থেকে ৫০ সেমি. বাদ দিয়ে মাদার কেন্দ্র ধরে ২ মিটার অন্তর অন্তর এক সারিতে মাদা  তৈরি করতে হবে। প্রতি বেডে এক সারিতে চারা লাগাতে হবে।
সারের মাত্রা ও প্রয়োগ পদ্ধতি
ভালো ফলন পেতে মাটিতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের সরবরাহ করতে হবে। তবে মাটির অবস্থা বুঝে সারের পরিমাণ কম/বেশিও  হতে পারে।
সমস্ত গোবর সার, ফসফরাস সার ও পটাশ সারের ৩ ভাগের  দুইভাগ শেষ জমি প্রস্তুতের সময় জমিতে মিশিয়ে দিতে হবে। অবশিষ্ট এক ভাগ পটাশ সার বীজ বপনের ৩০ দিন পর প্রয়োগ করতে হবে। তবে নাইট্রোজেন সার তিনটি সমান ভাগে বীজ বপনের ২৫, ৪০ ও ৬০ দিন পর উপরিপ্রয়োগ করতে হবে।
চারার বয়স ও চারা রোপণ
বীজ গজানোর পর ১৬-১৭ দিন বয়সের চারা মাঠে লাগানোর জন্য উত্তম। মাঠে প্রস্তুত মাদাগুলোর মাটি ভালোভাবে ওলটপালট করে এক কোপ দিয়ে চারা লাগানোর জন্য জায়গা করে নিতে হবে। অতঃপর পলিব্যাগের ভাঁজ বরাবর বেøড দিয়ে কোটি পলিব্যাগ সরিয়ে মাটির দলাসহ চারাটি ওই জায়গায় লাগিয়ে চারপাশে মাটি দিয়ে ভরাট করে দিতে হবে। চারা লাগানোর পর গর্তে পানি দিতে হবে।
পরবর্তী পরিচর্যা
সেচ দেওয়া : স্কোয়াস ফসল পানির প্রতি খুবই সংবেদনশীল। সেচ নালা দিয়ে প্রয়োজন অনুসারে নিয়মিত সেচ দিতে হবে। জমিতে কখনও সব জমি ভেজানো বা প্লাবন সেচ দেয়া যাবে না। শুধু সেচ নালায় পানি দিয়ে আটকে রাখলে গাছ পানি টেনে নেবে। প্রয়োজনে সেচনালা হতে ছোট কোনো পাত্র দিয়ে কিছু পানি গাছের গোড়ায় দেয়া যাবো। শুষ্ক মৌসুমে ৫-৭ দিন অন্তর সেচ দেয়ার প্রয়োজন পড়ে।
মালচিং : প্রত্যেক সেচের পর হালকা খড়ের মালচ করে গাছের গোড়ার মাটির চটা ভেঙে দিতে হবে। আগাছা অনেক রোগের আবাসস্থল। এ ছাড়াও আগাছা খাদ্যোপাদান ও রস শোষণ করে নেয়। কাজেই চারা লাগানো থেকে শুরু করে ফল সংগ্রহ পর্যন্ত জমি সবসময় আগাছামুক্ত রাখতে হবে।
পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ : ফলে মাছি পোকার আক্রমণ হতে পারে। এটি থেকে ফসলকে রক্ষা করার জন্য সেক্স ফেরোমন ফাঁদ এবং পরাগায়নের পর ফ্রুট ব্যাগ ব্যবহার করে মাছি পোকা দমন করা যায়। এ ছাড়াও ইমিডাক্লোপ্রিড গ্রæপের কীটনাশক নির্দেশিত মাত্রায় ১০-১২ দিন পরপর ব্যবহার করে এই পোকার আক্রমণ কমানো যায়। রোগবালাইয়ের আক্রমণ তেমনটি চোখে পড়ে না।
বিশেষ পরিচর্যা : সাধারণত স্কোয়াশ উৎপাদনের জন্য ১৬-২৫ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রা ও শুষ্ক পরিবেশ সবচেয়ে উপযোগী। রাতের তাপমাত্রা ১৭-২১ ডিগ্রি সে. এর কম বা বেশি হলে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, ফুল ঝরে পড়ে ও ফলন কমে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একবারেই ফলন হয় না। অক্টোবর মাসে বীজ  বপন করে নভেম্বরে লাগালে দেখা যায় যে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ হতে জানুয়ারি পর্যন্ত রাতের তাপমাত্রা অনেক কমে যায়, ফলে গাছের দৈহিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এজন্য গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য পলিথিন ছাউনি বা গøাস হাউসে গাছ লাগালে রাতে ভেতরের তাপমাত্রা বাইরে অপেক্ষা বেশি থাকে।
ফসল সংগ্রহ : ফল পরাগায়নের ১০-১৫ দিনের মধ্যে সংগ্রহ করতে হবে। তখনও ফলে সবুজ রঙ থাকবে এবং ফল মসৃণ ও উজ্জ্বল দেখাবে। নখ দিয়ে ফলের গায়ে চাপ দিলে নখ সহজেই ভেতরে ঢুকে যাবে।
এ দেশে সবজির উৎপাদন বাড়াতে নতুন এই সুস্বাদু সবজি ফসলটি গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখতে পারে এমনটিই প্রত্যাশা সবার।

 

কৃষিবিদ ড. মো. শরফ উদ্দিন

ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, আকবরপুর, মৌলভীবাজার, মোবা : ০১৭১২১৫৭৯৮৯, ই-মেইল : Sorofu@yahoo.com

যখন কৃষকরা অংশীদার : কেনিয়া সফরের অভিজ্ঞতা

যখন যাত্রীবাহী বিমানটি নাইরোবির কেনিয়ার প্রধান বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করলে তখন  ১৩ জন বাংলাদেশী যাত্রী যাদের মধ্যে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, পরিকল্পনা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছিলেন বোধগম্য কারণেই তাদের মধ্যে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস পরিলক্ষিত হয়েছে। তারা পূর্ব আফ্রিকার এ দেশটিতে সপ্তাহব্যাপী অভিজ্ঞতা বিনিময় সফরে এসেছেন জানতে কিভাবে কৃষক সংগঠন ও কেনিয়ার সরকার জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে যূথবদ্ধ হয়ে কাজ করছে।
যৌথভাবে নির্ণিত কাক্সিক্ষত উন্নয়ন
শুধু একই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক অতীত অভিজ্ঞতা ছাড়া কেনিয়া ও বাংলাদেশ কি ভূমি গঠনে (ভূ-দৃশ্য), কি সংস্কৃতিতে, কি ভাষায় এবং ইতিহাস ঐতিহ্যে সুস্পষ্টভাবে আলাদা। তবুও দুই দেশই উন্নয়ন তালিকায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টিকে রেখেছে এবং উভয় দেশই স্বাধীনতার পর কৃষিতে বিরাট অগ্রগতি ঘটিয়েছে। কেনিয়ার খাদ্য ও কৃষি খাত এখন বিকাশমান, যা চা, কফি, ফল, সবজি ও ফুলের বদৌলতে অর্থনীতিতে প্রায় ৫০ ভাগ অবদান রেখে চলেছে। পক্ষান্তরে কেনিয়ার আয়তনের এক-চতুর্থাংশের সমান ভূখণ্ডে ঘনবদ্ধ হয়ে থাকা চারগুণ বেশি জনসংখ্যা নিয়েও বাংলাদেশের ১৬০ মিলিয়ন মানুষের গ্রাসাচ্ছাদনে ধানের উৎপাদন তিনগুণ বৃদ্ধি করেছে।
বিনিয়োগ দক্ষতা শক্তিশালীকরণ
অভিজ্ঞতা বিনিময় সফরটি ছিল গ্লোবাল এগ্রিকালচার অ্যান্ড ফুড সিকিউরিটি প্রোগ্রাম (জিএএফএসপি) বা বিশ্ব কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থায়নে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) কর্তৃক বাস্তবায়িত ইন্টিগ্রেটেড এগ্রিকালচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (আইএপিপি) কারিগরি সহায়তা অঙ্গের দক্ষতা উন্নয়নের অংশবিশেষ। এফএওর কারিগরি সহায়তা অঙ্গের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পুষ্টি ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি উভয়ের আরও ফলপ্রসূ বিনিয়োগ দক্ষতা বৃদ্ধি।
নিম্ন ও মধ্যআয়ের দেশগুলোতে কৃষকরা নিজেরাই হচ্ছেন প্রধান বেসরকারি বিনিয়োগকারী। অবশ্য বাংলাদেশে পারিবারিক খামার খুবই ছোট যে কোনোরূপ কৃষক সংগঠনে সংঘবদ্ধ হয়ে শক্তি সঞ্চয় ব্যতিরেকে তাদের পক্ষে বাজারে, ঋণ সুবিধায় বা অধিকতর বাণিজ্যিক উৎপাদনে অংশগ্রহণ করতে যে জ্ঞানের প্রয়োজন তাতে প্রবেশাধিকার অত্যন্ত ক্ষীণ। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের কৃষক সংগঠন এখনও অনেক দুর্বল; বাংলাদেশী সহকর্মীরা তাদের কেনিয়ার সহকর্মীদের কাছ থেকে আরও জানতে আগ্রহী ছিল।
কৃষি ব্যবসায় কৃষক সংগঠন
কেনিয়ার কৃষক সমবায়ের দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য/ইতিহাস আছে যার শুরু স্বাধীনতার পূর্বে সেই ১৯৪০ সালে। শক্তিশালী ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা, সদস্যদের ব্যবসায়িক পরামর্শ, লটে বা একসঙ্গে কেনাবেচার সুযোগ সৃষ্টি এবং চাহিদার সঙ্গে খাপখাইয়ে চলার মতো প্রায়োগিক কৌশলসহ একটি সুসংগঠিত এবং পেশাদার স্বত্তা হিসেবে আবির্ভূত হতে কেনিয়ার কৃষক সংগঠনকে কয়েক দশক জুড়ে অনেক বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করতে হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি মূল্য সংযোজন ধারার কুশীলব (private value chain actor) কৃষকের স্বার্থ এবং অধিকারও সমবায় সমিতি সংরক্ষণ করে।
কেনিয়ায় সফরকালীন বাংলাদেশী সহকর্মীরা কফি, চা, কলা এবং বিভিন্ন মূল্য সংযোজন ধারায় কাজ করে এমন কতগুলো সক্রিয় সমবায় সমিতি পরিদর্শন করে- উদ্দেশ্য ছিল সমবায়গুলো কিভাবে কাজ করে, পণ্যগুলো একত্র করে,  বাজার খুঁজে নেয়, ভালো দামের জন্য লড়াই করে, মূল্য সংযোজন করে, মানসম্পন্ন উপকরণ সরবরাহ করে ইত্যাদি। এছাড়া কেনিয়ার কৃষকদের ব্যবসামুখী বাংলাদেশ দলের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে।
‘কৃষক সংগঠনের উদ্যোক্তাসুলভ মানসিক প্রস্তুতি থাকতে হবে’- বললেন সফরে অংশগ্রহণকারী একজন। তিনি আরও বললেন, কৃষক সংগঠনের স্থায়িত্বের জন্য এর কোনো বিকল্প নেই।
সরকারের সঙ্গে অংশীদারি
সফরকারী বাংলাদেশ দল জানতে পেরেছে কিভাবে কেনিয়ার কৃষকগণ কাউন্টি থেকে জাতীয় পর্যায়ে সংঘবদ্ধ হয়েছে ফলে এখন তাদের কথা সবাই শুনছে, সম্মান  করছে এবং তারা যথেষ্ট শক্তিশালী, তারা লাখ লাখ কৃষকের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে সহায়তা করছে যা ছিল সরকার ও কৃষক সংগঠনের যৌথ অংশগ্রহণে স্থিরকৃত লক্ষ্য। তারা কৃষক সংগঠনের সঙ্গে সংসদসহ সরকারের বিভিন্ন স্তরের নিবিড় মিথস্ক্রিয়ায় অভিভূত। অভিজ্ঞতা বিনিময় সফরকালে কেনিয়ার সংসদ সদস্যরা এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, কেনিয়ার কৃষি খাতকে এগিয়ে নিতে কেনিয়ার কৃষক সংগঠন হচ্ছে সরকারের প্রকৃত মিত্র যেখানে  সরকার ও কৃষক সংগঠন সমস্বার্থে হাত ধরাধরি করে কেনিয়ার কৃষি খাতের অগ্রগতিতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের একজন অংশগ্রহণকারী বললেন, বাংলাদেশ থেকে কেনিয়ার তফাৎটা হলো কেনিয়ায় সরকার ও কৃষক সংগঠনের সঙ্গে মৈত্রী সম্পর্কের কারণে নীতির সঠিক বাস্তবায়নে সরকার সক্ষম হতে পেরেছে। তিনি বলেন, এ জায়গাটায় আমাদের কাজ করা উচিত এবং দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার উজ্জীবিত মন্ত্রের আলোকে বলা যায় সফরের শিক্ষাটা ছিল দ্বিমুখী কারণ কেনিয়ার সহকর্মীরা বাংলাদেশের উৎপাদন পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে খুব আগ্রহী ছিল।
দেশে ফিরে কৃষক সংগঠন শক্তিশালীকরণ
বাংলাদেশ সফরকারী দলে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুইজন এফএওর সহকর্মী ছিলেন যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার জন্য এবং ছিল দুইজন কৃষক সংগঠনের নেতা যারা উদীয়মান কৃষক সংগঠনগেুলোকে সহায়তা দিতে গত বছর একটি জাতীয় মঞ্চ গঠন করেছেন।
সপ্তাহ শেষে সফরকারী দল বাংলাদেশে কৃষক সংগঠন গড়ে তুলতে কিভাবে অনুকূল পরিবেশ  তৈরি করা যায় সে সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা করেছেন। একজন অংশগ্রহণকারী বললেন, এর জন্য প্রয়োজন সুশাসন, হিসাব-সংরক্ষণ, মানব ও সাংগঠনিক উন্নয়ন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও ক্রয়ের ওপর দক্ষতার স্ফুরণ।
অন্য আরেকজন বললেন, ‘আমাদের দেশে প্রয়োজন নীতি ও বিধিবিধানের কাঠামো তৈরি করা। একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সংগঠন নিশ্চিত করতে সম্প্রসারণ পদ্ধতি অবশ্যই হতে হবে গ্রুপকে লক্ষ্য করে ব্যক্তিকে নয়। কেনিয়ার জাতীয় কৃষক ফেডারেশন সংক্ষেপে KENAFF এ শিক্ষা সফরটি সংগঠিত করতে সহায়তা দিয়েছে। ক্ষুদ্র দল থেকে শুরু করে সমবায় এবং সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের সবার জন্য দরজা খুলে দিয়ে তারা অবিস্মরণীয় কাজ করে চলেছেন। কেনাফ (KENAFF) প্রমাণ করেছে পারিবারিক খামারিদের সঙ্গে রাজধানীর সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের সংযোগের মধ্যে আসলে নিহিত আছে সবার মঙ্গল।

বেনোয়া ভিলেরিত্তে (অনুবাদ : মাহমুদ হোসেন)*
* ন্যাশনাল টিম লিডার, আইএপিপি-টিএ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা

বৈশাখ মাসের কৃষি

সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। বৈশাখ বাংলা বছরের প্রথম মাস অর্থাৎ আর একটি নতুন বছরের সূচনা। গত বছরের দুঃখ, বেদনা, যন্ত্রণা, কষ্ট, অসফলতা সব দূর করে আমাদের প্রত্যাশা নতুন বছরটি যেন সবার জীবনে হাসি, আনন্দ, সফলতা, উচ্ছ্বাস আর সমৃদ্ধি বয়ে আনে। এ মাসে চলতে থাকে আমাদের ঐতিহ্যবাহী মেলা, পার্বণ, উৎসব, আদর, আপ্যায়ন। নতুন আবাহান আর প্রত্যাশার মাঝে সুজন কৃষক ফিরে তাকায় দিগন্তের মাঠে। প্রিয় পাঠক আসুন এক পলকে জেনে নেই বৈশাখে কৃষির করণীয় দিকগুলো।
 
বোরো ধান
যারা এবার দেরিতে বোরো ধানের চারা রোপণ করেছেন তাদের জমিতে চারার বয়স ৫০ থেকে ৫৫ দিন হলে ইউরিয়া সারের শেষ কিস্তি উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। তবে কেউ যদি দানাদার ইউরিয়ার পরিবর্তে গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করে থাকেন তবে ইউরিয়ার উপরিপ্রয়োগের প্রয়োজন নেই।  জমিতে আগাছা পরিষ্কার করা, সেচ দেয়া, বালাই দমন এসব কাজ সঠিকভাবে করতে হবে। থোড় আসা শুরু হলে জমিতে পানির পরিমাণ দ্বিগুণ বাড়াতে হবে। ধানের দানা শক্ত হলে জমি থেকে পানি বের করে দিতে হবে। এ মাসে বোরো ধানে মাজরা পোকা, বাদামি গাছ ফড়িং, সবুজ পাতা ফড়িং, গান্ধি পোকা, লেদা পোকা, ছাতরা পোকা, শীষকাটা লেদা পোকা, ছাতরা পোকা, পাতা মোড়ানো পোকার আক্রমণ হতে পারে। পোকা দমনের জন্য নিয়মিত ক্ষেত পরিদর্শন করতে হবে এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পোকার আক্রমণ রোধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আলোর ফাঁদ পেতে, পোকা ধরার জাল ব্যবহার করে, ক্ষতিকর পোকার ডিমের গাদা নষ্ট করে, উপকারী পোকা সংরক্ষণ করে, ক্ষেতে ডাল-পালা পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করার মাধ্যমে ধানক্ষেত বালাই মুক্ত করা দরকার। এসব উপায়ে পোকার আক্রমণ প্রতিহত করা না গেলে শেষ উপায় হিসেবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে সঠিক বালাইনাশক, সঠিক সময়ে, সঠিক মাত্রায়, সঠিক নিয়মে প্রয়োগ করতে হবে। এ সময় ধান ক্ষেতে উফরা, বাদামি দাগ রোগ, ব্লাস্ট, পাতাপোড়া ও টুংরো রোগসহ অন্যান্য রোগ হতে পারে। জমিতে উফরা রোগ দেখা দিলে যে কোনো কৃমিনাশক যেমন ফুরাডান ৫জি বা কিউরেটার ৫জি প্রয়োগ করতে হবে। ব্লাস্ট রোগ দেখা দিলে ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগ সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে হেক্টরপ্রতি ৪০০ গ্রাম ট্রুপার বা জিল বা নেটিভ ১০ থেকে ১৫ দিনের ব্যবধানে দুইবার প্রয়োগ করতে হবে। জমিতে পাতাপোড়া রোগ হলে অতিরিক্ত ৫ কেজি-বিঘা হারে পটাশ সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে এবং জমির পানি শুকিয়ে ৭ থেকে ১০ দিন পর আবার সেচ দিতে হবে। আর টুংরো রোগ দমনের জন্য এর বাহক পোকা সবুজ পাতা ফড়িং দমন করতে হবে।

গম ও ভুট্টা (রবি)
মাঠ থেকে কাটার পর এ দুটি দানাদার ফসল এরই মধ্যে বাড়ির আঙিনায় চলে আসার কথা। ভালোভাবে সংরক্ষণ করা না হলে ক্ষতি হয়ে যাবে অনেক। সংরক্ষণ কৌশলে ভালোভাবে বীজ শুকানো, উপযুক্ত পাত্র নির্বাচন, বায়ুরোধী করে সংরক্ষণ, বীজ পাত্রকে মাটি বা মেঝ থেকে আলাদাভাবে রেখে সংরক্ষণ করতে হবে। সংরক্ষণ পাত্রে শুকনো নিমপাতা, বিষকাটালি পাতা রেখে দিলে সহজেই পোকার আক্রমণ রোধ করা যাবে।
 
ভুট্টা (খরিফ)
খরিফ ভুট্টার বয়স ২০ থেকে ২৫ দিন হলে ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। মাটিতে রসের ঘাটতি থাকলে হালকা সেচ দিতে হবে, জমিতে আগাছা পরিস্কার করতে হবে এবং একই সঙ্গে গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দিতে হবে।
 
পাট
বৈশাখ মাস তোষা পাটের বীজ বোনার উপযুক্ত সময়। ও-৪ বা ফাল্গুনী তোষা ভালো জাত। স্থানীয় বীজ ডিলারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জাতগুলো সংগ্রহ করতে পারেন। দো-আঁশ বা বেলে দো-আঁশ মাটিতে তোষা পাট ভালো হয়। বীজ বপনের আগে প্রতি কেজি বীজ ৪ গ্রাম ভিটাভেক্স বা ১৫০ গ্রাম রসুন পিষে বীজের সঙ্গে মিশিয়ে শুকিয়ে নিয়ে জমিতে সারিতে বা ছিটিয়ে বুনতে হবে। সারিতে বুনলে প্রতি শতাংশে ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়। তবে ছিটিয়ে বুনলে আরেকটু বেশি অর্থাৎ ৩৫ থেকে ৪০ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়। ভালো ফলনের জন্য  শতাংশপ্রতি ৮০০ গ্রাম ইউরিয়া, ২০০ গ্রাম টিএসপি, ২৫০ গ্রাম এমওপি সার শেষ চাষের সময় মাটিতে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। জমিতে সালফার ও জিংকের অভাব থাকলে জমিতে সার দেয়ার সময়  শতাংশপ্রতি ৪০০ গ্রাম জিপসাম ও ৫০  কেজি দস্তা সার দিতে হবে। শতাংশপ্রতি ২০ কেজি গোবর সার ব্যবহার করলে রাসায়নিক সারের পরিমাণ অনেক কম লাগে।
 
আগে বোনা পাটের জমিতে আগাছা পরিষ্কার, ঘন চারা তুলে পাতলা করা, সেচ এসব কাজগুলো যথাযথভাবে করতে হবে। এ সময় পাটের জমিতে উড়চুঙ্গা ও চেলা পোকার আক্রমণ হতে পারে। সেচ দিয়ে মাটির উপযোগী কীটনাশক দিয়ে উড়চুঙ্গা দমন করতে হবে। চেলা পোকা আক্রান্ত গাছগুলো তুলে ফেলে দিতে হবে এবং জমি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। পোকা ছাড়াও পাটের জমিতে কা- পচা, কালপট্টি, নরম পচা, শিকড় গিট, হলদে সবুজ পাতা এসব রোগ দেখা দিতে পারে। নিড়ানি, আক্রান্ত গাছ বাছাই, বালাইনাশকের যৌক্তিক ব্যবহার করলে এসব রোগ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়।
 
শাকসবজি
এ মাসে বসতবাড়ির বাগানে জমি তৈরি করে ডাঁটা, কমলিশাক, পুঁইশাক, করলা, ঢেঁড়স, বেগুন, পটোল চাষের উদ্যোগ নিতে হবে। তাছাড়া মাদা তৈরি করে চিচিঙা, ঝিঙা, ধুন্দুল, শসা, মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়ার বীজ বুনে দিতে পারেন। আগের তৈরি করা চারা থাকলে ৩০ থেকে ৩৫ দিনের সুস্থ সবল চারাও রোপণ করতে পারেন। এ সময়ের অধিকাংশ সবজিই লতানো, তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মাচা তৈরি করে নিতে হবে। লতানো সবজির দৈহিক বৃদ্ধি যত বেশি হবে তার ফুল ফল ধারণ ক্ষমতা তত কমে যায়। সেজন্য গাছের বাড়বাড়তি বেশি হলে লতার-গাছের ১৫ থেকে ২০ শতাংশের পাতা লতা কেটে দিতে হবে। এতে গাছে তাড়াতাড়ি ফুল ও ফল ধরবে। কুমড়া জাতীয় সব সবজিতে হাত পরাগায়ন বা কৃত্রিম পরাগায়ন অধিক ফলনে দারুণভাবে সহায়তা করবে। গাছে ফুল ধরা শুরু হলে প্রতিদিন ভোর বেলা সদ্য ফোটা পুরুষ ফুল সংগ্রহ করে পাপড়িগুলো ফেলে দিয়ে পরাগমু-টি স্ত্রী ফুলের গর্ভমু-ে ঘষে হাতপরাগায়ন নিশ্চিত করলে ফলন অনেক বেড়ে যাবে। এ মাসে কুমড়া জাতীয় ফসলে মাছি পোকা দারুণভাবে ক্ষতি করে থাকে। এক্ষেত্রে জমিতে খুঁটি বসিয়ে খুঁটির মাথায় বিষটোপ ফাঁদ দিলে বেশ উপকার হয়। এছাড়া সেক্স ফেরোমন ব্যবহার করেও এ পোকার আক্রমণ রোধ করা যায়। গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ করতে চাইলে বারি টমেটো ৪, বারি টমেটো ৫, বারি টমেটো ৬, বারি টমেটো ১০, বারি টমেটো ১১, বারি হাইব্রিড টমেটো ৪, বারি হাইব্রিড টমেটো ৫, বা বিনা টমেটো ১, বিনা টমেটো ২-এর চাষ করতে পারেন। গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ করতে হলে পলিথিনের ছাওনির ব্যবস্থা করতে হবে সে সঙ্গে এ ফসলটি সফলভাবে চাষের জন্য টমেটোটোন নামক হরমোন প্রয়োগ করতে হবে। স্প্রেয়ারের সাহায্যে প্রতি লিটার পানিতে ২০ মিলি টমেটোটোন মিশিয়ে ফুল আসার পর ফুলের গায়ে ৫ থেকে ৭ দিন পরপর ২ থেকে ৩ বার স্প্রে করতে হবে। একটু বেশি যতœ এবং পরিচর্যা করলে অভাবনীয় ফলাফল পাওয়া যায়।

গাছপালা
এ মাসে আমের মাছি পোকাসহ অন্যান্য পোকার জন্য সতর্ক থাকতে হবে। মাছি পোকা দমনের জন্য সবজি খেতে যে রকম বিষটোপ ব্যবহার করা হয় সে ধরনের বিষটোপ বেশ কার্যকর। ডিপটরেক্স, ডারসবান, ডেনকাভেপন সামান্য পরিমাণ দিলে উপকার পাওয়া যায়। এ সময় কাঁঠালের  নরম পঁচা রোগ দেখা দেয়। এলাকায় এ রোগের প্রাদুর্ভাব থাকলে ফলে রোগ দেখা দেয়ার আগেই ফলিকুল ০.০৫% হারে বা ইন্ডোফিল এম-৪৫ বা রিডোমিল এম জেড-৭৫ প্রতি লিটার পানিতে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৩ বার স্প্রে করতে হবে। নারিকেলের চারা এখন লাগাতে পারেন। ভালো জাতের সুস্থ সবল চারা ৬ থেকে ৮ মিটার দূরে লাগানো যায়। গর্ত হতে হবে দৈর্ঘে ১ ফুট, প্রস্থে ১ ফুট এবং গভীরতায় ১ ফুট। নারিকেলের চারা রোপণের ৫ থেকে ৭ দিন আগে প্রতি গর্তে জৈবসার ১০ কেজি, টিএসপি ৭৫০ গ্রাম, এমওপি ৫৫০ গ্রাম এবং জিপসাম ৫০০ গ্রাম ভালোভাবে গর্তের মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। বীজতলা থেকে যেদিন চারা উঠানো হবে সেদিনই জমিতে চারা রোপণ করা সবচেয়ে ভালো। অন্যথায় যতদ্রুত সম্ভব চারা রোপন করতে হবে। চারা রোপণের সময় চারাটিকে এমনভাবে গর্তে বসিয়ে মাটি চাপা দিতে হবে যাতে নারিকেলের পিঠের কেবল ইঞ্চিখানেক মাটির উপরে ভেসে থাকে এবং বাকিটা মাটির নিচে থাকে। গ্রামের রাস্তার পাশে পরিকল্পিতভাবে খেজুর ও তালের চারা এখন লাগাতে পারেন। যত্ন, পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পারলে ২ থেকে ৩ বছরেই গাছগুলো অনেক বড় হয়ে যাবে। ভালো ফলনের জন্য এ সময় বৃক্ষ জাতীয় গাছের বিশেষ করে ফল গাছের প্রয়োজনীয় যত্ন নিতে হবে। মাতৃগাছের পরিচর্যা, আগাছা দমন, প্রয়োজনীয় সেচ দিলে ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে। বৃষ্টি হয়ে গেলে পুরাতন বাঁশ ঝাড় পরিষ্কার করে কম্পোস্ট সার দিতে হবে এবং এখনই নতুন বাঁশ ঝাড় তৈরি করার কাজ হাতে নিতে হবে। যারা সামনের মৌসুমে গাছ লাগাতে চান তাদের এখনই জমি নির্বাচন, বাগানের নকশা প্রস্তুত এবং অন্যান্য প্রাথমিক কাজগুলো সেরে রাখতে হবে।
 
প্রাণিসম্পদ
গরমকালে মুরগি পালনে যেসব সমস্যা দেখা দেয় তাহলো খাদ্য গ্রহণ, ব্রয়লারের দৈহিক ওজন বৃদ্ধির হার, লেয়ার ও ব্রিডারের ডিম উৎপাদনসহ ডিমের খোসার গুণগতমান কমে যায় এবং খামারে মুরগি মারা যাওয়ার হার বেড়ে যায়। সে কারণে ব্রুডার হাউসের শেডে বাচ্চা তোলার সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি ও গ্লুকোজ খাওয়াতে হবে। আর লেয়ার হাউস ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে শেডের চাল বা ছাদে তাপ বিকিরণ করতে পারে এমন সাদা, অ্যালুমিনিয়িাম রঙ দেয়া প্রয়োজন। অতিরিক্ত গরমে পাইপ বা ঝরনার মাধ্যমে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ক্ষুদ্র খামারের ক্ষেত্রে চালের ওপরে পাটের চট দিয়ে পানি ছিটাতে হবে। প্রচ- গরমে খাবারের পানির সঙ্গে বরফ মেশানো দরকার।
 
হাঁস মুরগির রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত ভ্যাকসিন বা টিকা দেয়া জরুরি। সেজন্য মুরগির রানীক্ষেত, ব্রংকাইটিস, ফাউলপক্ষ, ফাউল কলেরা, ম্যারেক্স এবং হাঁসের প্লেগ ও কলেরা রোগের টিকা দেয়ার জন্য উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
 
গোখাদ্যের জন্য নেপিয়ার, বাজরা, প্যারা, ভুট্টা, ইপিল ইপিল এর চাষ করার ভালো সময় এখন। বাড়ির আশপাশে, পুকুর পাড়ে, রাস্তার ধারে, পতিত জায়গায় গোখাদ্যের চাষ করে লাভবান হওয়া যায়। গ্রীষ্মের তাপদাহে গবাদি পশুর জন্য অতিরিক্ত খাবার, বিশ্রাম, ঘরে আলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা, বেশি পানি খাওয়ানোসহ অন্যান্য কার্যক্রম সঠিকভাবে করতে হবে। এ সময় গবাদি পশুর তড়কা ও গলাফুলা রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য টিকা প্রদানসহ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে।
 
মৎস্যসম্পদ
বৈশাখ মাস পুকুরে মাছ ছাড়ার উপযুক্ত সময়। ভালোভাবে পুকুর তৈরি করে অর্থাৎ সেচ, কাদা সরিয়ে, চুন প্রয়োগ করে, আগাছা পরিষ্কার, পানি দেয়া, পানি পরীক্ষা, পুকুর পাড়ে নিত্য পাতা ঝরা গাছ ছাঁটাই বা কেটে ফেলাসহ অন্যান্য কাজগুলো করতে হবে। এরপর প্রতি শতকে মিশ্রচাষের জন্য ৩০ থেকে ৪০টি ৪ থেকে ৫ ইঞ্চি বড় সুস্থ সবল পোনা ছাড়তে হবে। পানির ৩ স্তরের কথা বিবেচনা করে তেলাপিয়া, সরপুটি, নাইলোটিকা, কার্পজাতীয় মাছ, রুই, কাতল, মৃগেল কালো বাউস এবং সম্ভব হলে চিংড়ি পোনাও ছাড়া যাবে। পোনা সংগ্রহের সময় বিশ্বস্ত উৎস থেকে পোনা সংগ্রহ করতে হবে।
 
প্রিয় পাঠক, বৈশাখ আসে আমাদের জন্য নতুন আবাহনের সৌরভ নিয়ে। সঙ্গে আঁচলে বেঁধে নিয়ে আসে কালবৈশাখীকে। কালবৈশাখীর থাবা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে কৃষিতে আগাম বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সুবিবেচিত লাগসই কৌশল আর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সব বাধা ডিঙিয়ে আমরা কৃষিকে নিয়ে যেতে পারব সমৃদ্ধির ভূবনে। আবার কথা হবে আগামী মাসের কৃষিকথায়। আপনাদের সবার জন্য আবারও নতুন বছরের শুভ কামনা। কৃষির সমৃদ্ধিতে আমরা সবাই গর্বিত অংশীদার।
 
লেখক:
কৃষিবিদ মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন
* সহকারী তথ্য অফিসার (শস্য উৎপাদন), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫

পুষ্টি চাহিদা পূরণে বাংলাদেশে অপ্রচলিত ফল

খাদ্য গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য হলো সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম হয়ে বেঁচে থাকা। যে কোনো খাবার খেয়ে পেট ভরানো যায়, কিন্তু তাতে দেহের চাহিদা মিটিয়ে সুস্থ থাকা যায় না। বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন ঘাটতি পূরণ হলেও পুষ্টি সমস্যা অনেক বড় আকারে বিরাজিত রয়েছে। ফলে এ দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ পুষ্টিহীনতার কারণে নানা ধরনের রোগের শিকার হয়ে অহরহ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মা ও শিশুরাই এর শিকার বেশি। পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে ফলের গুরুত্ব অপরিসীম। অধিকাংশ ফলই সুস্বাদু, পুষ্টিকর, মুখরোচক এবং তৃপ্তিদায়ক। অতি জরুরি খাবারের অভাব কেবল দানাদার খাদ্য দিয়ে পূরণ হয় না। পুষ্টিকর খাবারের ওপর নির্ভরও করছে আমাদের জীবনের অস্তিত্ব, কর্মক্ষমতা, মেধাবৃদ্ধি, উন্নতি ও সমৃদ্ধি। পুষ্টি সচেতনতা ও জ্ঞানের অভাবে সুষম খাদ্য গ্রহণের প্রতি আমরা মোটেও সজাগ নই। ফলে যারা পেট ভরে দুইবেলা খেতে পায় না তারাই যে শুধু পুষ্টিহীনতায় ভুগছে তা নয়; সে সঙ্গে ধনীরাও অপুষ্টির শিকার থেকে অব্যাহতি পাচ্ছে না।


ফল বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় ও উপকারী উদ্যানতাত্ত্বিক ফসল। রঙ, গন্ধ, স্বাদ ও পুষ্টির বিবেচনায় আমাদের দেশীয় ফলসমূহ খুবই অর্থবহ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। ফলে সব ধরনের খাদ্যোপাদানই পাওয়া যায়। মানুষের জন্য অত্যাবশ্যকীয় বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন ও খনিজ পদার্থেরও অন্যতম প্রধান উৎস হচ্ছে দেশীয় ফল। বিভিন্ন ধরনের খাবারের মধ্যে ভিটামিন ও মিনারেলকে রোগ প্রতিরোধ খাদ্য উপাদান হিসেবে ধরা হয়। এ ধরনের পুষ্টি উপাদান তথা হরেক রকম ফল ভক্ষণে রোগ প্রতিরোধ ছাড়াও হজম, পরিপাক, বিপাক, রুচি, বৃদ্ধি ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফল আমরা কাঁচা বা পাকা অবস্থায় সরাসরি খেয়ে থাকি। ফল রান্না ব্যতীত সরাসরি খাওয়া সম্ভব বিধায় এতে বিদ্যমান সবটুকু পুষ্টি পাওয়া যায়। বিভিন্ন ফলে ক্যান্সার প্রতিরোধকারী উপাদান অ্যান্থোসায়ানিন, লাইকোপেন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপস্থিত থাকায় মরণনাশক রোগব্যাধি থেকে রক্ষা পেতে সাহায্য করে।
সুষম খাদ্য বিবেচনায় এনে আমরা মূলত ৬ ধরনের খাবার প্রতিদিন আহার করে থাকি। এগুলো হলো (১) শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট (২) আমিষ বা প্রোটিন (৩)
স্নেহ বা তেল/চর্বি এবং (৪) ভিটামিনস (৫) খনিজ লবণ (মিনারেলস) ও পানি। ফলে সব ধরনের খাদ্যোপাদানই পাওয়া যায়। তবে ভিটামিন ও খনিজ লবণের পরিমাণ খুব বেশি। এ ছাড়া ফল থেকে পাওয়া স্বেতসার, প্রোটিন ও স্নেহ জাতীয় উপাদানগুলো সহজেই হজম করা যায়।


ফল বলতে আমরা নিষিক্ত ও পরিপক্ব ডিম্বককেই বুঝি। আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, লিচু, কলা, আনারস, পেঁপে, নারকেল, লেবু ও কুল- এ ১০টি আমাদের দেশের প্রধান ও প্রচলিত ফল; এগুলোকে আমরা সবাই চিনি। কেননা, চোখের সামনে এদের প্রায় সব সময় দেখি, হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়। এসব ফল দেশের প্রায় সব এলাকাতে জন্মে। এসব ফলকে তাই আমরা বলি প্রচলিত ফল। এসব ফলের বাইরেও অনেক ফল পাওয়া যায়। এসব ফলকে বলা হয় অপ্রচলিত বা স্বল্প পরিচিত ফল। অপ্রচলিত শব্দটির অর্থ হচ্ছে যার প্রচলন নেই অর্থাৎ এসব ফলের অস্তিত্ব আছে, খুঁজলে পাওয়া যায় কিন্তু যখন তখন চোখে পড়ে না, দেশের সব এলাকায় জন্মে না, গাছের দেখা মেলে খুব অল্প। চাহিদা কম, প্রাপ্যতা কম, এদের অনেকে বনে-জঙ্গলে নিতান্ত অনাদরে অবহেলায়  বেড়ে ওঠে। প্রগতির ধারায় কেউ এদেরকে পরিকল্পনায় আনে না। চাষাবাদ দূরে থাক-প্রয়োজনীয় খাবার কিংবা পানিও ভাগ্যে জোটে না। কোনো কোনোটার ঔষধিগুণ ও মানুষের জন্য উপকারী নিয়ামক, ধাতব ও অত্যন্ত প্রাণ রাসায়নিক দ্রব্যাদিতে সমৃদ্ধ হলেও মানুষের রসনাকে তৃপ্ত করতে পারছে না বলে এরা অপ্রচলিত।


আবার কিছু কিছু ফল আছে যেগুলোর স্বাদ অনেকের কাছে ভালো লাগে আবার অনেকের কাছে ভালো লাগে নাÑ যেমন ডেউয়া। কলা বা আমের মতো সর্বজনীন আবেদন নিয়ে টেবিলে আসতে পারছে না বলে এরা অচ্ছুত হয়ে পড়েছে। তাই এরা অপ্রচলিত।


প্রাপ্যতার নিরিখে বিচার করেও কিন্তু ফলের প্রচলনের সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়। যদি যথেষ্ট পাওয়া যেত, তা হলে মানুষ হয়তো খেতেও পারত প্রচুর আর তখনই কোন একটা ফল তার অপ্রচলিয়তার গ্ল­ানি মুছে ফেলে প্রচলিত ফলের কোঠায় উঠে এসে কৌলিন্য লাভে সক্ষম হতো। এমনটা হয়েছে কুলে ও পেয়ারার ক্ষেত্রে। এ ফলগুলো ১০ বছর আগেও ব্যাপক হারে আবাদ হতো না। কিন্তু নিকট অতীতে, ভালো কিছু জাত এসেছে বলে (যেমন আপেল কুল, বাউকুল, কাজী পেয়ারা, বাউ-৫ পেয়ারা, থাই পেয়ারা ইত্যাদি। এগুলো কৌলিন্যের বিভা পেতে শুরু করেছে। এখন এদের পরিকল্পিত চাষ হচ্ছে। বাগান হচ্ছে, যত্ন আত্তি করা হচ্ছে-অধিক পরিমাণে বাজারে আসছে, বড় বড় মানুষের রসনা তৃপ্ত করতে সক্ষম  হচ্ছে। আর অপ্রচলিত থেকে প্রচলিত হওয়ার পথ পেয়েছে। লটকন এ ধরনের ফলের একটি উদাহরণ। চালতা, করমচা, লুকলুকি, ফলসা ও তেঁতুলের মতো ফলগুলো কিন্তু সবারই পরিচিত। কিন্তু টক বলেই বোধ হয় এদের চাহিদা বাড়ছে না, আর তাই অপ্রচলিত। এ ছাড়া আরো কিছু অপ্রচলিত ফল যেমন- টাকিটুকি, পানকি, চুনকি, লুকলুকি, উড়িআম, বৈঁচি, চামফল, নোয়াল, রক্তগোটা, মাখনা, আমঝুম, মুড়মুড়ি, তিনকরা, সাতকরা, তৈকর, আদা জামির, ডেফল, কাউফল, বনলেবু, চালতা ইত্যাদি।


অপ্রচলিত ফলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এসব ফল এক রকম বিনা যত্নেই এ দেশের মাটিতে ভালো জন্মে। সাধারণত এসব ফলের গাছে তেমন কোনো সার দেয়া হয় না। এ দেশের মাটি ও জলবায়ুতে খুব ভালোভাবে এসব ফলের গাছ মানিয়ে গেছে। ঝড়-বাতাস কিংবা বন্যা খরাতেও এ ফলের গাছকে মারতে পারে না। এই ফলের ব্যাপকভাবে খাপখাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা বা ওয়াইড অ্যাডাপ্টিবিলিটি, কিন্তু অনেক বিদেশি ফলেরই নেই। এ ফলের আর একটা সুবিধে হলো, বিদেশি ফলের বা উন্নত জাতের ফল গাছের মতো এসব ফল বা ফল গাছে অত বেশি রোগ-পোকারও আক্রমণ হয় না। তবে এ ফলে সবচেয়ে বেশি মেলে পুষ্টি। এ ফলের মতো এত বেশি পুষ্টি কখনো বিদেশি ফলে মেলে না। একটা ছোট্ট আমলকীতে যে পরিমাণ ভিটামিন সি আছে তা পাঁচটা বড় কমলাতে পাওয়া যাবে না। এমনকি কোনো কোনো অপ্রচলিত ফল ফলনের দিক দিয়ে প্রচলিত অনেক ফলের চেয়ে ভালো। ডেউয়া, কদবেল, আমলকী অনেকেই খেতে চায় না। কিন্তু এর মধ্যে যে পরিমাণ ভিটামিন সি আছে তা আপেল, কমলা বা আম, কাঁঠাল থেকে পাওয়া যাবে না। অপ্রচলিত ফলের অধিকাংশই সাধারণত টক স্বাদের। তাই এসব ফলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি। আর এ ভিটামিনটি দেহে জমা রাখার কোনো নিয়ম নেই। তাই প্রতিদিনের ভিটামিন সি প্রতিদিনই কাঁচা ফল খেয়ে সংগ্রহ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে অপ্রচলিত ফল, এর যোগান বেশ ভালোভাবেই দিতে পারে। কাঁঠালের চেয়ে ডেউয়ার মধ্যে আমিষের সাথে মিলছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি। অন্যান্য পুষ্টি তো আছেই। সেই সাথে আছে এসব ফলের বিভিন্ন রোগ সারানোর অদ্ভুত ক্ষমতা। আমলকী, হরীতকী, বহেড়ার মতো কবিরাজি ফল প্রচলিত কোন ফলের মধ্যে কি আছে? তাছাড়া আমাদের দেশে কলা, কুল, নারিকেল ছাড়া প্রায় সব ফলই জন্মে গ্রীষ্ম -বর্ষায়। কিন্তু  অপ্রচলিত অনেক ফল আছে যেগুলো অন্য মৌসুমেও জন্মে। তাই সারা বছর ধরেই বলতে গেলে ফল খাওয়ার একটা সুবিধে মেলে। শুধু পুষ্টি বা প্রাপ্যতার দিক দিয়ে নয়, এখন অনেক অপ্রচলিত ফলের দাম বিদেশি ফলের চেয়ে কম নয়। এজন্য একদিকে প্রধান ফলের চাষ ও উৎপাদন বাড়াতে হবে এ কথা যেমন সত্য তেমনি আমাদের বৈচিত্র্যময় ফলের ভাণ্ডারকেও ধরে রাখতে হবে। এটাও লক্ষ রাখতে হবে, আজকের একটি অপ্রচলিত ফল আবার আগামী দিনের প্রচলিত ফল হিসেবে গণ্য হয়ে উঠতে পারে। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, সুস্বাস্থ্যের জন্য জনপ্রতি প্রতিদিন গড়ে ১১৫ গ্রাম ফল খাওয়া প্রয়োজন হলেও বর্তমানে এ দেশের মানুষ দৈনিক মাত্র ৭৬ গ্রাম ফল খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। প্রয়োজন ও প্রাপ্তির এ ব্যবধানের কারণ একদিকে যেমন সচেতনতার অভাব অন্যদিকে রয়েছে উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা। তাই খাদ্য পুষ্টি চাহিদা পূরণসহ আর্থসামাজিক উন্নয়নে স্বাদে, গন্ধে, পুষ্টিতে শ্রেয়তর আমাদের অপ্রচলিত ফলগুলোর উৎপাদন দেশব্যাপী সারা বছর যৌক্তিকভাবে এবং পরিকল্পিত উপায়ে বাড়িয়ে তুলতে হবে।


এজন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহকে বিবেচনা করা যেতে পারে-


অপ্রচলিত ফলের জার্মপ্ল­াজম সংগ্রহ, সংরক্ষণ, মূল্যায়ন ও সম্প্রসারণ করা।
প্রচলিত চাষব্যবস্থা পরিবর্তন করে পরিকল্পনা মতো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নির্দিষ্ট ফলের জন্য নির্দিষ্ট উৎপাদন এলাকা গড়ে তুলতে হবে। যেমন- বরিশালে আমড়া, সাতক্ষীরায় ক্ষীরনী, সিলেটে লেবু, বাগেরহাটে কাউফল ইত্যাদি। সেসব অঞ্চলেই এসব ফলভিত্তিক শিল্প কারখানা ও প্রক্রিয়াজতকরণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলোর আধুনিকীরণ করতে হবে। অপ্রচলিত ফলের প্রতি গণসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

 

প্রফেসর ড. এম. এ. রহিম* ড. মো: শামছুল আলম মিঠু**

*পরিচালক, বাউ-জার্মপ্লাজম সেন্টার, বাকৃবি, ময়মনসিংহ, মোবাইল : ০১৭১১৮৫৪৪৭১; **ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, উদ্যান তত্ত্ব বিভাগ, বিনা, ময়মনসিংহ। মোবাইল : ০১৭১১১২৪৭২২

মাছ চাষের আধুনিক কৌশল

মাছ হচ্ছে প্রাণিজ আমিষের অন্যতম উৎস। কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন এবং পুষ্টি সরবরাহে মৎস্য সম্পদের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। মাছ চাষের বিভিন্ন পদ্ধতি আছে, যেমন- একই পুকুরে নানা জাতের মাছ চাষ করা যায়, খাল ও ডোবায় মাছ চাষ করা যায়, আবার চৌবাচ্চায়ও মাছের চাষ করা যায়। সাধারণত মাছের জন্য পুকুরে খাবার উৎপাদনই হচ্ছে মাছ চাষ। এটি কৃষির মতোই একটি চাষাবাদ পদ্ধতি। আবার কোনো নির্দিষ্ট জলাশয়ে/জলসীমায় পরিকল্পিত উপায়ে স্বল্প পুঁজি, অল্প সময় ও লাগসই প্রযুক্তির মাধ্যমে মাছের উৎপাদনকে মাছ চাষ বলে। মূলত বিভিন্ন নিয়ম মেনে প্রাকৃতিক উৎপাদনের চেয়ে অধিক মাছ উৎপাদনই মাছ চাষ।
 

চাষ উপযোগী মাছের গুণাগুণ ও উপকারিতা
আমাদের দেশের স্বাদু পানিতে ২৬০টিরও বেশি প্রজাতির মাছ আছে। এছাড়া খাড়ি অঞ্চলে ও লোনা পানিতে কয়েক শত প্রজাতির মাছ আছে। তবে চাষযোগ্য মাছগুলো হলো- রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউস, সিলভারকার্প, মিররকার্প, গ্রাসকার্প, কমনকার্প, বিগহেড, রাজপুঁটি, নাইলোটিকা, বিদেশি মাগুর, থাই পাঙ্গাশ প্রভৃতি। এসব মাছের কিছু গুণাগুণ আছে-

 

এসব মাছ খুব দ্রুত বাড়ে; খাদ্য ও জায়গার জন্য একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে না; পুকুরে বেশি সংখ্যায় চাষ করা যায়; পানির সব স্তর থেকে খাবার গ্রহণ করে, তাই পুকুরের পরিবেশ ভালো থাকে; এসব মাছ খেতে খুব সুস্বাদু; বাজারে এসব মাছের প্রচুর চাহিদা আছে; সহজে রোগাক্রান্ত হয় না।

বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষের জন্য পুকুরকে প্রস্তুত করে নেয়াই ভালো। কারণ একটি পুকুর মাছ চাষের উপযুক্ত না হলে এবং পুকুর প্রস্তুত না করে চাষ শুরু করে দিলে বিনিয়োগ ব্যাপক ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। ঝুঁকি এড়াতে এবং লভ্যাংশ নিশ্চিত করতেই বৈজ্ঞানিক কৌশল অনুসরণ করে পুকুর প্রস্তুত করতে হবে।
 

মাছ চাষের জন্য পুকুর প্রস্তুতি
১. পুকুরের পাড় ও তলা মেরামত করা; ২. পাড়ের ঝোপ জঙ্গল পরিষ্কার করা; ৩. জলজ আগাছা পরিষ্কার করা; ৪. রাক্ষুসে ও অবাঞ্ছিত মাছ দূর করা; ১. পুকুর শুকানো; ২. বার বার জাল টানা; ৩. ওষুধ প্রয়োগ- রোটেনন। পরিমাণ ২৫-৩০ গ্রাম/শতাংশ/ফুট। এর বিষক্রিয়ার মেয়াদ ৭-১০ দিন। প্রয়োগের সময় রোদ্রজ্জ্বল দিনে। ২. ফসটক্সিন/কুইফস/সেলফস ৩ গ্রাম/শতাংশ/ ফুট। মেয়াদ এবং সময় পূর্বের মতো; ৫. চুন প্রয়োগ: কারণ/কাজ/উপকারিতা সাধারণত ১ কেজি চুন/শতাংশ প্রয়োগ করতে যদি ঢ়ঐ এর মান ৭ এর আশেপাশে থাকে। বছরে সাধারণত ২ বার চুন প্রয়োগ করতে হয়। একবার পুকুর তৈরির সময়, দ্বিতীয় বার শীতের শুরুতে কার্র্তিক অগ্রহায়ণ মাসে।

 

চুন প্রয়োগের উপকারিতা ও সাবধানতা
১. পানি পরিষ্কার করা/ঘোলাটে ভাব দূর করা; pH নিয়ন্ত্রণ করে; রোগ জীবাণু ধ্বংস করে; মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়; বিষাক্ত গ্যাস দূর করে; শ্যাওলা নিয়ন্ত্রণ করে। চুন কখনও প্লাস্টিকের কিছুতে গোলানো যাবে না; পুকুরে মাছ থাকা অবস্থায় চুন গোলানোর ২ দিন পর পুকুরে দিতে হয়; গোলানোর সময় এবং দেয়ার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন নাকে মুখে ঢুকে না যায়; পানি নাড়া চাড়া করে দিতে হবে; সার প্রয়োগ : সার প্রয়োগ প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক; জৈব সার/প্রাকৃতিক যা কিনা প্রাণীকণা তৈরি করে। গোবর, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা, কম্পোস্ট; অজৈব বা রাসায়নিক বা কৃত্রিম সার ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি যা উদ্ভিদ কণা তৈরি করে।

 

নতুন পুকুরের ক্ষেত্রে সার প্রয়োগ মাত্রা
১. প্রতি শতাংশে গোবর ৫-৭ কেজি অথবা ২. হাঁস মুরগির বিষ্ঠা ৫-৬ কেজি অথবা ৩. কম্পোস্ট ১০-১২ কেজি এবং ইউরিয়া ১০০-১৫০ গ্রাম টিএসপি ৫০-৭৫ গ্রাম।

 

পুকুর প্রস্তুতির আনুমানিক মোট সময়
* পাড় ও তলা+ঝোপ জঙ্গল পরিষ্কার = ২ দিন; ক্স রাক্ষুসে মাছ পরিষ্কার = ৩ দিন (৭-১০ দিন পর্যন্ত বিষক্রিয়া থাকে)।
* চুন প্রয়োগ = ৩-৫ দিন; * সার প্রয়োগ = ৭ দিন; এরপর পোনা ছাড়া হবে। গড়ে মোট ১৭ দিন (২+৩+৫+৭)।
পুকুরে চাষযোগ্য মাছের বৈশিষ্ট্য- দ্রুতবর্ধনশীল; রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি; বাজার চাহিদা বেশি।

 

পুকুর নির্বাচন
 ১. পুকুরটি খোলামেলা জায়গায় এবং বাড়ির আশপাশে হতে হবে।
২. মাটির গুণাগুণ পুকুরের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত দো-আঁশ, এঁটেল দো-আঁশ ও এঁটেল মাটি পুকুরের জন্য ভালো।
৩. পুকুরের আয়তন কমপক্ষে ১০ শতাংশ হতে হবে। ৩০ শতাংশ থেকে ১ একর আকারের পুকুর মাছ চাষের জন্য বেশি উপযোগী।
৪. পুকুরের গভীরতা ২-৩ মিটার রাখতে হবে।
৫. পুকুর পাড়ে বড় গাছ বা ঝোপ-ঝাড় থাকা যাবে না।
 

পুকুর প্রস্তুত
পোনা মাছ ছাড়ার আগে পুকুর তৈরি করে নিতে হবে। সাধারণত পুরনো পুকুরই তৈরি করে নেয়া হয়। পুকুর প্রস্তুতির কাজটি পর্যায়ক্রমে করতে হবে:
 ১ম ধাপ : জলজ আগাছা-কচুরিপানা, কলমিলতা, হেলেঞ্চা শেকড়সহ তুলে ফেলতে হবে;
 ২য় ধাপ : শোল, গজার, বোয়াল, টাকি রাক্ষুসে মাছ এবং অবাঞ্ছিত মাছ মলা, ঢেলা, চান্দা, পুঁটি সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে ফেলতে হবে;
 ৩য় ধাপ : এরপর প্রতি শতকে ১ কেজি হারে চুন পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে। পুকুরে পানি থাকলে ড্রামে বা বালতিতে গুলে ঠা-া করে পুরো পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে;
৪র্থ ধাপ : মাটি ও পানির গুণাগুণ বিবেচনায় রেখে চুন দেয়ার এক সপ্তাহ পর জৈবসার দিতে হবে;
৫ম ধাপ : পুকুর শুকনা হলে পুকুরে সার, চুন, গোবর সব ছিটিয়ে দিয়ে লাঙল দিয়ে চাষ করে পানি ঢুকাতে হবে;
৬ষ্ঠ ধাপ : পোনা মজুদের আগে পুকুরে ক্ষতিকর পোকামাকড় থাকলে তা মেরে ফেলতে হবে;
৭ম ধাপ : পুকুরে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাদ্য জন্মালে পোনা মজুদ করতে হবে। মৃত্যুর হার যেন কম থাকে সেজন্য পোনার আকার ৮-১২ সেন্টিমিটার হতে হবে।
 ৮ম ধাপ : এর পর নিয়মমতো পুকুরে পোনা ছাড়তে হবে। এক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে, যেমনÑ
 ১. পোনা হাড়িতে বা পলিথিন ব্যাগে আনা হলে, পলিথিন ব্যাগটির মুখ খোলার আগে পুকুরের পানিতে ২০-৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখতে হবে;
২. তারপর ব্যাগের মুখ খুলে অল্প করে ব্যাগের পানি পুকুরে এবং পুকুরের পানি ব্যাগে ভরতে হবে।
৩. ব্যাগের পানি ও পুকুরের পানির তাপমাত্রা যখন সমান হবে তখন পাত্র বা ব্যাগের মুখ আধা পানিতে ডুবিয়ে কাত করে সব পোনা পুকুরে ছেড়ে দিতে হবে। সকাল ও বিকালই পোনা ছাড়ার ভালো সময়।
 ৯ম ধাপ : দিনে দুইবার অর্থাৎ সকাল ১০টায় এবং বিকাল ৩টায় খৈল, কুঁড়া, ভুসি ইত্যাদি সম্পূরক খাদ্য সরবরাহ করতে হবে।
 

সতর্কতা : ১. রোগ প্রতিরোধী মাছের চাষ করতে হবে।
২. সঠিক সংখ্যায় পোনা মজুদ করতে হবে।
৩. পোনা ছাড়ার আগে পোনা রোগে আক্রান্ত কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. পুকুরে পর্যাপ্ত সূর্যের আলোর ব্যবস্থা করতে হবে এবং পুকুরে যাতে আগাছা না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
৫. প্রতি ৩-৪ বছর পরপর পুকুর শুকিয়ে ফেলতে হবে।

 

বাণিজ্যিকভাবে চাষযোগ্য মাছ
দেশি কার্প- রুই, কাতলা, মৃগেল, কালি বাউশ; বিদেশি কার্প- গ্রাস কার্প, সিল্ভার কার্প, কার্পিও, মিরর কার্প, বিগহেড কার্প ছাড়াও পাঙ্গাশ, তেলাপিয়া, সরপুঁটি/রাজপুঁটি, কৈ, চিংড়ি এসব।
বিভিন্ন স্তরের মাছ একসাথে চাষের আনুপাতিক হার
উপরের স্তর ৪০%; মধ্য স্তর ২৫%; নিম্ন স্তর ২৫%; সর্বস্তর ১০% মোট ১০০%। সাধারণত শতাংশ প্রতি ১৫০টি পোনা ছাড়া যায়। এ হিসাবে ৩০ শতাংশের একটি পুকুরে মোট ৪৫০০টি পোনা ছাড়া যাবে। এবং উপরের স্তরের মাছ থাকবে {(৪০ঢ৪৫০০)/১০০}=১৮০০টি পোনা

 

পুকুরে মাছ চাষ
১. সনাতন পদ্ধতির মাছ চাষ : এ পদ্ধতিতে পুকুরের কোনো ব্যবস্থাপনা ছাড়াই মাটি ও পানির উর্বরতায় পানিতে যে প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি হয় মাছ তাই খেয়ে জীবন ধারণ করে। এক্ষেত্রে আলাদা কোনো পরিচর্যা নিতে হয় না।
 ২. আধা-নিবিড় পদ্ধতির মাছ চাষ : এ পদ্ধতিতে নিয়মমতো পুকুর প্রস্তুত করে আংশিক সার ও খাদ্য সরবরাহ করে মাছের খাদ্য উৎপন্ন করতে হয়। পুকুরের বিভিন্ন স্তরে উৎপাদিত খাদ্যের সঠিক ব্যবহারের দিকে লক্ষ্য রেখে মাছের পোনা ছাড়তে হয়।
 ৩. নিবিড় পদ্ধতির মাছ চাষ : অল্প জায়গায়, অল্প সময়ে বেশি উৎপাদনের জন্য সার ব্যবহার করে পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎপাদন বাড়াতে হয়।
 ৪. কার্প জাতীয় মাছের মিশ্র চাষ : পুকুরের বিভিন্ন স্তরে উৎপন্ন খাবার সম্পূর্ণ ব্যবহার করার জন্য রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউস, বিগহেড, সিলভারকার্প, কমনকার্পসহ প্রজাতির মাছ একত্রে চাষ করা যায়।

 

মাছের প্রক্রিয়াজাতকরণ
১. মাছ প্রক্রিয়াজাতের সময় হাত দিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করা যাবে না; মাছ ধরার পর মাছের আকৃতি অনুযায়ী আলাদা করে ফেলতে হবে; বাক্সে বা পাত্রে বরফ দিয়ে স্তরে স্তরে মাছ সাজাতে হবে।

 

পরিচর্যা
১. বর্ষার শেষে পুকুরের পানিতে লাল বা সবুজ সর পরলে তা তুলে ফেলতে হবে; পানির সবুজভাব কমে গেলে অবশ্যই পরিমাণমতো সার দিতে হবে; মাঝে মাঝে জাল টেনে মাছের অবস্থা দেখতে হবে; পুকুরে জাল টেনে মাছের ব্যায়াম করাতে হবে।

 

কৃষিবিদ হাসান রিয়াদুল আলম*

*পান্থনীড়, ফেনী

 

বি পোলেন

পৃথিবীতে প্রায় ৪০,০০০ প্রজাতির গাছে মৌমাছি দ্বারা পরাগায়ন ঘটে। এই পরাগায়নের ফলে গাছের জীববৈচিত্র্য রক্ষা হয়। পরাগায়নে পরাগরেণুর একটি অন্যতম উপাদান, যা বাতাস বা অন্য কোন প্রাণী দ্বারা পুরুষ ফুল থেকে স্ত্রী ফুলে স্থানান্তরিত হয়। যে সকল গাছের পরাগায়ন বায়ু দ্বারা সম্পাদিত হয় সে পরাগরেণুগুলো সাধারণত খুবই ক্ষুদ্র, হালকা এবং শুষ্ক থাকে। কিন্তু যেসব গাছের পরাগায়ন পতঙ্গ দ্বারা সম্পাদিত হয় সেসব গাছের পরাগরেণু সাধারণত অমসৃণ ও আঠালো থাকে। এই অমসৃণ ও আঠালো পরাগরেণু পতঙ্গের দেহের বিভিন্ন অংশ দ্বারা স্ত্রী ফুলে স্থানান্তরিত হয়ে থাকে। কৃষিজ ফসলের শতকরা ৭০ ভাগ শুধুমাত্র মৌমাছি দ্বারা পরাগায়িত হয়।
মৌমাছির দেহ সাধারণত : অতি ক্ষুদ্র লোম দ্বারা আবৃত থাকে। মৌমাছি যখন ফুলে ফুলে বিচরণ করে তখন তাদের শরীরের ক্ষুদ্র লোম পরাগরেণু আটকিয়ে যায়। পরবর্তীতে মৌমাছি এই পরাগরেণুসমূহকে এন্টিনা দ্বারা তাদের একত্র করে বল তৈরি করে তাদের পেছনের জোড়ার পায়ে এক ধরনের বিশেষ থলেতে রাখে, যা ঢ়ড়ষষড়হ ংধপ নামে পরিচিত। এই পোলেন বল তৈরি করার সময় তারা পোলেনের সাথে এনজাইম এবং নেক্টার মিশ্রিত করে থাকে। ১টি ফ্লাইটের একটি মৌমাছি তাদের চড়ষষড়হ ঝধপ এ ১৬ থেকে ২৪ মিলিগ্রাম পোলেন বহন করে যাতে প্রায় ৩০ লক্ষ থেকে ৪০ লক্ষ পরাগরেণু থাকে। আর এই পোলেন বলের ওজন ১টি মৌমাছির শরীরে ওজনের প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ।
একটি মৌকলোনিতে পোলেন মৌমাছির (লার্ভা) বাচ্চাদের খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পোলেন মূলত: প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন, মিনারেল এবং অন্যান্য উপাদানের উৎস হিসাবে ব্যবহৃত হয়, যা মৌমাছির জীবনচত্রæ সম্পন্ন করার জন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। একটি মৌকলোনিতে বছরে ৩০-৫০ কিলোগ্রাম পোলেন এর প্রয়োজন হয়। মৌচাষিরা সাধারণত পোলেন ট্র্যাপ ব্যবহার করে ফ্রেশ পোলেন সংগ্রহ করে। তবে আমাদের দেশে এটির ব্যবহার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন এ বিষয়ে গবেষণা করছে এবং একটি মৌকলোনি থেকে প্রতি বছর প্রায় ৫০০-৭০০ গ্রাম পোলেন উৎপাদন সম্ভব। বাংলাদেশের প্রতিটি মৌকলোনি থেকে পোলেন সংগ্রহ করলে বার্ষিক ২৫ থেকে ৩০ টন পোলেন উৎপাদন সম্ভব।
প্রাচীন গ্রিকে পোলেন বলকে মোম মনে করা হতো এবং প্রাচীন মিসরে একে জীবনদানকারী পাউডার মনে করা হতো, যা অৎরংঃড়ঃষব এর বই ঐরংঃড়ৎরধ ধহরসধষরঁস এ উল্লেখ করা হয়েছে। ঐরঢ়ঢ়ড়পৎধঃবং তার রোগীদের পোলেন খাওয়ার পরামর্শ দিতেন এবং তিনি বিশ্বাস করতেন যে পোলেন এর রোগ সারানোর ক্ষমতা রয়েছে। পোলেনের আরেক নাম হচ্ছে বি ব্রেড এবং প্রাচীনকালে একে ব্রি ব্রেডই বলা হতো। ঔড়যহ জধু তার বই ঐরংঃড়ৎরধ চষধহঃধৎঁস (১৬৮৬) এ প্রথম ঢ়ড়ষষবহ শব্দটি ব্যবহার করেন যার গ্রিক অর্থ ঋরহব চড়ফিবৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে  ঢ়ড়ষষবহ অত্যন্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বি পোলেন মৌমাছির পা থেকে সংগ্রহ করা ছাড়াও মৌমাছির চাক হতে সংগ্রহ করা যায়। বি ব্রেড হিসেবে মৌচাকের মধ্যে যে পোলেন থাকে তা দ্রæত নষ্ট হয় না। কিন্তু মৌমাছির পা থেকে সংগ্রহকৃত পোলেন সঠিকভাবে প্রক্রিয়া না করলে তার গুণগতমান দ্রæত নষ্ট হয়। বিশেষ করে ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত হয়। যেহেতু পোলেন একটি পুষ্টিমান সম্পন্ন দ্রব্য সেহেতু মানুষ এটিকে খাবার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। গাছ ভেদে পোলেন এর রং, স্বাদ এবং গন্ধ বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। পোলেনের রং সাধারণত সাদা থেকে কালো পর্যন্ত হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হলুদ, হলদে কমলা এবং হলদে বাদামি বর্ণের হয় থাকে। স্বাদ কখনো টক, টকমিষ্টি বা তেতো হয়ে থাকে। এটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফুড সাপ্লিমেন্ট হিসাবে ব্যবহার করা হয়। পোলেনকে যত শুকানো হবে এটি ততো বেশি দিন ভালো থাকবে। ফ্রেশ পোলেন শুকানোর প্রক্রিয়া বিলম্ব হলে একে অবশ্যই ফ্রিজ বা রেফ্রিজারেটরে রাখতে হবে। খধপঃড়নধপরষষঁং এবং  ইরভরফড়নধপঃবৎরঁস  জেনেরা ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পোলেন এ লক্ষ্য করা যায় এবং এই ব্যাকটেরিয়া পোলেন ফার্মেন্টেশনে এ সহায়তা করে।
বি পোলেন বিভিন্ন ভাবে খাওয়া যায়। সাধারণত : এটি মধু বা রয়েলজেলির সাথে মিশিয়ে খাওয়া হয়। বেশির ভাগ  ক্ষেত্রে পোলেন মধু ও পানির সাথে মিশিয়ে খাওয়া হয়। পোলেন পানিতে মেশালে ফুলে যায় এবং এটি সহজে হজম হয়। প্রথমবার পোলেন খাওয়ার ক্ষেত্রে আপনাকে পরীক্ষা করে নিতে হবে যে ঐ পোলেন এর প্রতি আপনার কোনো অ্যালার্জি আছে কি না। যদি অ্যালার্জি থাকে তাহলে অন্য ফুলের পোলেন খেতে হবে। যারা পোলেন সেবন করেন তার সাধারণত খাবার আধা ঘণ্টা আগে পোলেন সেবন করবেন এবং এর পরিমাণ ১ টেবিল চামচ যা প্রায় ১৫ গ্রাম এর মতো হয়ে থাকে। যারা নিরামিষভোগী তাদের খাবারে পুষ্টিমান ঠিক রাখতে অবশ্যই পোলেন সেবন করা উচিত। যেহেতু পোলেন এ ফ্লাভেনয়েড এবং ফাইটোস্টেরল থাকে যা এন্টিঅক্সিডেন্ট, এন্টিইনফ্লামেটারি হিসাবে কাজ করে সেহেতু এনেমিয়া, আর্টিওস্কেলেরোসিস, অষ্টিওপসিস এবং অ্যালার্জির চিকিৎসায় ব্যবহার করা যায়। সেক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ  নিয়ে পোলেন সেবন করা উচিত।  বি পোলেন মুরগি, পাখি এবং মৌমাছির ক্রান্তিকালীন খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা যায়। সর্বোপরি এটি বলা যায় যে পোলেন মানবদেহের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ খাবার।
অন্যান্য উপাদান ২৯% এর মধ্যে রয়েছে : ফ্লাভেনয়েড : কমপক্ষে ৮ প্রকার। ক্যারেটিনয়েডস : কমপক্ষে ১১ রকমের। ভিটামিন যেমনÑ ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, পেনটোযিনিক এসিড, নিকোটনিক এসিড, থিয়ামিন, রিভোক্ল্যাবিন (ই২) এবং পাইরিডক্সিন (ই৬) ইত্যাদি বিদ্যমান। খনিজ পদার্থ : প্রধান উপাদান যেমনÑ ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, সালফার, ফসফরাস। গৌন উপাদানগুলো হলোÑ অ্যালুমিনিয়াম, বোরন, ক্লোরিন, কপার, আয়োডিন, আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ, জিংক ইত্যাদি। ফ্রি এমিনো এসিড সব ধরনের, নিউক্লিক এসিড ও নিউক্লিওসাইডস উঘঅ,  জঘঅ এবং অন্যান্য। এনজাইম : একশত এর অধিক। গ্রোথ হরমোনস : অক্সিন, ব্রাসিনস, জিবেরিলন, কাইনিন এবং অন্যান্য গ্রোথ  ইনহিবিটরস)।
বি পেলেন এর উপকারিতা বৈজ্ঞানিকভাবে পরিলক্ষিত হয়
* মানুষের বন্ধ্যাত্ব নিবারণে ব্যবহার করা হয়;
* যকৃতের রোগ নিরাময়ে খুবই কার্যকর;
* উচ্চ রক্তচাপ, স্নায়ু ও হরমোন সংক্রান্ত রোগে উল্লেখযোগ্য ভ‚মিকা রাখে;
* পরাগ অন্ত্রের ক্রিয়াকলাপের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনে;
* জৈবিক উদ্দীপক হিসেবেও কাজ করে;
* কোষ্ঠকাঠিন্যে পরাগ খুবই কার্যকরি;
* ক্ষুধা বৃদ্ধিকরণ হিসেবে কাজ করে;
* রক্তে হিমোগ্লোবিন ও লোহিতকণিকা বৃদ্ধি পায়।

 

ড. মোহাম্মদ সাখাওয়াৎ হোসেন
প্রফেসর, কীটতত্ত¡ বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ^বিদ্যালয়, মোবাইল : ০১৭৭৫৩৫৫৭৮৭, ই-মেইল :sakhawat_sau@yahoo.com

মানসম্মত সারের বৈশিষ্ট্য ও ফসল উৎপাদনে এর প্রভাব

মানসম্পন্ন বা গুণগত সার কী?
গুণগত সার বলতে আমরা সেসব সারকে বুঝি যা সরকার কর্তৃক জারিকৃত নির্দেশের শর্তাবলি পূরণ করে। উদাহরণস্বরূপ, ইউরিয়া সারকে ধরা যাক এ সারে মোট নাইট্রোজেন পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ ৪৬.০% এবং সর্বোচ্চ বাইউরেটের পরিমাণ ১.৫% ও মোট আর্দ্রতা ১.০% নির্ধারণ করা হয়েছে। যদি কোন ইউরিয়া সারের নমুনায় নাইট্রোজেনের পরিমাণ ৪৬% এর কম হয়, বাইউরেটের পরিমাণ ১.৫% এর বেশি হয় এবং আর্দ্রতার পরিমাণ ১.০% এর বেশি থাকে, তাহলে বুঝতে হবে সারটি মানসম্মত নয়।
 
বাংলাদেশের কৃষিতে সাধারণত  ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি, এমওপি, জিপসাম, জিংক সালফেট এবং বরিক এসিড ব্যবহার করা হয়। এ সারগুলোর বৈশিষ্ট্য এবং ফসল উৎপাদনে তাদের প্রভাব নিম্নে বর্ণনা করা হল। পরিশেষে ভৌতিক উপায়ে এসব সারের মান নির্ধারণ করার সহজ উপায়গুলোও বর্ণনা করা হয়েছে।
 
ইউরিয়া সার
ইউরিয়া বহুল ব্যবহৃত নাইট্রোজেন সংবলিত একটি রাসায়নিক সার। এটি  প্রিল্ড, গ্রানুলার, পেলেট, পাউডার এবং ক্ষুদ্র স্ফটিক হিসেবে উৎপাদিত হয়। সহজে পানিতে গলে যায় বা দ্রবীভূত হয়।  দেখতে সাদা ধবধবে বা অনেক ক্ষেত্রেই রঙবিহীন। এ সারের কোনো গন্ধ নেই। এটি অম্লীয় বা ক্ষারীয় নয়।
 
ব্যবহারের সুবিধার্থে  ইউরিয়া প্রিল্ড (ক্ষুদ্র দানা<২মিমি.) এবং দানাদার(২-৫মিমি.) হিসেবে বাজারজাত করা হয়। আইএফডিসি  ক্ষুদ্র  উদ্যোক্তাদের  মাধ্যমে গুটি ইউরিয়া বা ইউএসজি বাজারজাত করার ব্যাপারে উৎসাহ দিয়ে আসছে। বর্তমানে ২২ জেলায় (ময়মনসিংহ, শেরপুর এবং দক্ষিণ অঞ্চলের ২০টি জেলার ১২২টি উপজেলায়) কৃষি উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন ত্বরান্বিতকরণ প্রকল্পের (আপি) মাধ্যমে ১.৮-২.৭ গ্রাম ওজনের গুটি ইউরিয়ার ৬০০০টি প্রদর্শনী স্থাপনের ব্যবস্থা নিয়েছে। আউশ ও আমন ধানে প্রতি চার গোছার কেন্দ্রে ১.৮ গ্রাম ওজনের ১টি এবং বোরো ধানে ২.৭ গ্রাম ওজনের ১টি গুটি ইউরিয়া প্রয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।
 
ইউরিয়া পুষ্টি উপাদানের চাবিকাঠি নাইট্রোজেন সরবরাহ করে থাকে যা শিকড়ের বৃদ্ধি বিস্তার উৎসাহিত করে। শাকসবজির পর্যাপ্ত পাতা উৎপাদনে সহায়তা করে। আমিষ ও নিউক্লিক এসিড উৎপাদনে অংশগ্রহণ করে। ক্লোরোফিল উৎপাদনের মাধ্যমে গাছকে সবুজ বর্ণ দান করে। শর্করা উৎপাদন বাড়ায়। ফলের আকার বড় করতে সাহায্য করে। অন্যান্য সব আবশ্যক উপাদানের পরিশোষণ হার বাড়ায়। কুশি উৎপাদনে সহায়তা করে।
 
মাটিতে নাইট্রোজেন পুষ্টি উপাদানের  ঘাটতি হলে ক্লোরোফিল সংশ্লেষণের হার কমে যায়। ফলে গাছ স্বাভাবিক সবুজ বর্ণ হারিয়ে ফেলে। পাতার আকার ছোট হয় এবং শাখা প্রশাখার বৃদ্ধি হ্রাস পায়, ফলে গাছ খর্বাকার হয়। গাছের পাতা হালকা সবুজ থেকে হলুদাভ বর্ণ ধারণ করে এবং অকালেই ঝরে পড়ে। পাতার অগ্রভাগ হতে বিবর্ণতা শুরু হয়। বৃন্ত এবং শাখা প্রশাখা সরু হয়। গোলাপি অথবা হালকা লাল রঙের অস্বাভাবিক বৃন্ত হয়। পুরাতন পাতার মধ্যশিরার শীর্ষভাগ হলুদাভ-বাদামি বর্ণ ধারণ করে।  ফুল ও ফলের আকার ছোট হয়। ফলন কমে যায়।
 
নাইট্রোজেনের প্রয়োগ মাত্রা বেশি হলে গাছের কাঠামো ও গঠন দুর্বল হয়। ফুল ও ফল উৎপাদনে বিলম্বিত হয়। পোকামাকড় ও রোগ আক্রমণ বেড়ে যায়। পাতার অংশ ভারি হলে গাছ হেলে যায়। অতিরিক্ত নাইট্রোজেনে অনেক ফল পানসে হয়।
 
টিএসপি ও ডিএপি সার
টিএসপি (ট্রিপল সুপার ফসফেট) ও ডিএপি(ডাইএ্যামোনিয়াম ফসফেট)-এ দুটোই ফসফেট সমৃদ্ধ রাসায়নিক সার। বাংলাদেশে এ সার দুটোর ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দানাদার  দ্রব্য হিসেবে এ   সার দুটো বাজারজাত করা হয়। এ সার দুটোতেই  শতকরা ২০ ভাগ ফসফরাস থাকে।  টিএসপিতে  শতকরা ১৩ ভাগ ক্যালসিয়াম এবং ১.৩ ভাগ গন্ধকও বিদ্যমান থাকে। ডিএপিতে ফসফেট ছাড়াও ১৮% নাইট্রোজেন বিদ্যমান থাকে যার কারণে ইহা চুনযুক্ত পলি মাটির জন্য একটি উত্তম সার।
 
রক ফসফেট নামক খনিজ পদার্থের সঙ্গে ফসফরিক এসিডের বিক্রিয়ার মাধ্যেমে টিএসপি সার প্রস্তুত করা হয়। টিএসপি সারের রঙ ধূসর থেকে গাঢ় ধূসর হয়ে থাকে। এ সারে অম্লস্বাদযুক্ত ঝাঁঝালো গন্ধ থাকে। এ সার পানিতে সহজেই গলে যায়।
 
ডিএপি সার এ্যামোনিয়া এবং ফসফরিক  এসিডের  মধ্যে বিক্রিয়া ঘটিয়ে উৎপাদন করা হয় । এ সার সহজেই পানিতে দ্রবণীয়। এ সারের রঙ সাধারণত সাদাটে থেকে গাঢ় ধূসর হয়ে থাকে। ডিএপিতেও  অম্লস্বাদযুক্ত ঝাঁঝালো গন্ধ থাকে।
 
ফসফরাস কোষ বিভাজনে অংশগ্রহণ করে। শর্করা উৎপাদন ও আত্তীকরণে সাহায্য করে। শিকড়ের বৃদ্ধি বিস্তার উৎসাহিত করে। গাছের কাঠামো শক্ত করে এবং নেতিয়ে পড়া থেকে রক্ষা করে। রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ রোধ করে। ফুল, ফল ও বীজে গুণগতমান বাড়ায়।
 
মাটিতে ফসফরাসের ঘাটতি হলে কাণ্ড এবং মূলের বৃদ্ধি হ্রাস পায়। গাছের বৃদ্ধি কু-লিকৃত বা পাকানো হয়। পুরাতন পাতা অকালে ঝরে যায়। পার্শ্বীয় কাণ্ড এবং কুড়ির বৃদ্ধি কমে যায়। ফুলের উৎপাদন কমে যায়। পাতার গোড়া রক্তবর্ণ অথবা ব্রোনজ রঙ ধারণ করে। পাতার পৃষ্ঠভাগ নীলাভ সবুজ বর্ণ ধারণ করে। পাতার কিনারে বাদামি বিবর্ণতা দেখা যায় এবং শুকিয়ে যায়। রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা কমে যায়
 
ফসফরাসের পরিমাণ অধিক হলে ফলন কমে যায়। গাছে অকাল পরিপক্বতা আসে।  গাছের বৃদ্ধি কমে যায়।
 
এমওপি সার
এমওপি বা মিউরেট অব পটাশ সর্বাধিক ব্যবহৃত একটি পটাশ সার। এসারে শতকরা ৫০ ভাগ পটাশ থাকে। এসার সহজে পানিতে গলে যায় বা দ্রবীভূত হয়। এ সারের রঙ সাধারণত সাদা থেকে হালকা বা গাঢ় লালচে রঙের এবং এর আকৃতি ছোট থেকে মাঝারি আকারের স্ফটিকাকৃতির হয়ে থাকে।
 
পটাশিয়াম উদ্ভিদ কোষের ভেদ্যতা রক্ষা করে। উদ্ভিদে শ্বেতসার দ্রব্য স্থানান্তরে বা পরিবহনে সহায়তা করে।  লৌহ ও ম্যাংগানিজের কার্যকারিতা বাড়ায়। আমিষ উৎপাদনে সাহায্য করে। উদ্ভিদে পানি পরিশোষণ, আত্তীকরণ ও চলাচল তথা সার্বিক নিয়ন্ত্রণে অংশগ্রহণ করে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বড়ায়। গাছের কাঠামো শক্ত করে। নাইট্রোজেন ও ফসফরাস পরিশোষণে সমতা বিধান করে।
পটাশের ঘাটতি হলে পুরাতন পাতার কিনরা হতে বিবর্ণতা শুরু হয়। গাঢ় নীল বর্ণের পাতা দেখা যায়। পাতার আন্তঃশিরায় বাদামি বর্ণের টিস্যু হতে দেখা যায়। পাতার উপরিভাগে কুঞ্চিত হতে বা ভাঁজ পড়তে দেখা যায়। গাছ বিকৃত আকার ধারণ করে। ছোট আন্তঃপর্বসহ গাছের বৃদ্ধি কমে যায় এবং প্রধান কা-টি মাটির দিকে নুয়ে পড়ে। অনুপযোগী আবহাওয়ায় গাছ খুব সংবেদনশীল হয়।  পোকামাকড় ও রোগবালাই এর প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়।

 
পটাশের সরবরাহ বেশি হলে ক্যালসিয়াম ও বোরনের শোষণ হার কমে যায়। বোরনের অভাবজনিত লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠে। পানি-নিঃসরণের হার কমে যায়। গাছের বৃদ্ধি অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়।
 
জিপসাম সার
দেশের একমাত্র টিএসপি সারের কারখানায় প্রায় ৬৫ হাজার মে. টন জিপসাম উপজাত হিসেবে পাওয়া যায়। এ সারে শতকরা ১৭ ভাাগ গন্ধক এবং ২৩ ভাগ ক্যালসিয়াম বিদ্যমান থাকে। এ সারের নমুনায় আর্দ্রতা বেশি থাকায় তা বেশি দিন বস্তায় সংরক্ষণ করা যায় না। প্রকৃত জিপসাম সার আলোতে কিছুটা চিক চিক করে এবং এ সারের হস্তানুভূতি কোমল প্রকৃতির। এ সার সাদাটে বা ধূসর বর্ণের পাউডারের  মতো।
 
গন্ধক আমিষ উৎপাদনে অংশগ্রহণ করে। ক্লোরোফিল গঠনে সাহায্য করে। গাছের বর্ণ সবুজ রাখে। বীজ উৎপাদনে সাহায্য করে। ফসলের গুণগতমান বাড়ায়।
 
মাটিতে গন্ধকের অভাব হলে গাছের সবুজ বর্ণ বিনষ্ট হয়, কাণ্ড সবুজ ও চিকণ হয়। পাতা ফ্যাকাশে সবুজ বা হলুদ আকার ধারণ করে। গাছে শর্করা এবং নাইট্রোজেন বৃদ্ধি পায়।
 
জিপসাম প্রয়োগের মাত্রা বেশি হলে শিকড়ের বৃদ্ধি কমে যায়। শারীরিক বৃদ্ধি হ্রাস পায়।
 
জিংক সালফেট সার
বাংলাদেশের জিংক বা দস্তা ঘাটতি মাটিতে দুই ধরনের দন্তা সার ব্যবহার হয়ে আসছে। একটি জিংক সালফেট মনোহাইড্রেট এবং অপরটি জিংক সালফেট হেপটাহাইড্রেট। সামান্য পরিমাণ অন্য একটি দস্তা সার চিলেটেড জিংক প্রে করে সরাসরি গাছে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। জিংক সালফেট মনোহাইড্রেটে শতকরা ৩৬.০ ভাগ দস্তা ও  ১৭.৬ ভাগ গন্ধক থাকে। অপরদিকে জিংক সালফেট হেপটাহাইড্রেটে দস্তা ও গন্ধকের পরিমাণ যথাক্রমে শতকরা  ২১.০ এবং ১০.৫ ভাগ বিদ্যমান থাকে। চিলেটেড জিংকে শতকরা ১০ ভাগ দস্তা বিদ্যমান থাকে।
জিংক সালফেট মনোহাইড্রেট সারটি আসলে ক্ষুদ্রাকার স্ফটিক আকারে উৎপাদিত হয়। ফসলে প্রয়োগের সুবিধার্থে ইহাকে দানাদার করে বাজারজাত করা হয়ে থাকে। এ সার রঙবিহীন থেকে সাদাটে এবং অনেকটা সাগু দানার মতো দেখা যায়। পানিতে সহজে গলে যায়।

 
জিঙ্ক সালফেট (হেপটাহাইড্রেট) সারটি দেখতে স্ফটিকাকৃতি চিনির দানার মতো এবং ঝুরঝুরে। প্রকৃত হেপটাহাইড্রেট দস্তা সার পানিতে সহজেই গলে গিয়ে স্বচ্ছ দ্রবণ তৈরি করে।
 
জিঙ্ক সালফেট (মোনোহাইড্রেট) সার জিঙ্ক সালফেট (হেপটাহাইড্রেট) এর তুলনায় অধিক হারে মাটিতে ব্যবহার করা হয়। স্প্রে করেও কোনো কোনো ফসলে প্রয়োগ করা হয়।
 
দস্তা গাছে বিভিন্ন ধরনের হরমোন তৈরিতে অংশগ্রহণ করে। ক্লোরোফিল উৎপাদনে সহায়তা করে। ফসলের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ফসলের ফসফরাস পুষ্টি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। শিম জাতীয় সবজির উল্লেখযোগ্যভাবে ফলন বাড়ায়।
 
মাটিতে দস্তার ঘাটতি হলে গাছের পাতায় তামাটে অথবা দাগের আকারে বিবর্ণতা দেখা যায়। ক্ষুদে পাতা বা রোজেট  লক্ষণের সৃষ্টি হয়। নতুন পাতার গোড়ার দিক থেকে বিবর্ণতা শুরু হয়। আন্তঃশিরার স্থানে বিবর্ণতা প্রকটভাবে দেখা দেয়।
 
জিংকের পরিমাণ বেশি হলে গাছে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত দস্তা আমিষ উৎপাদন অসুবিধার সৃষ্টি করে।
 
বোরণ সার
বরিক এসিড ও সলুবর সার বোরণ ঘাটতি এলাকায় বহুল ব্যবহৃত বোরণ সার। বরিক এসিডের রঙ সাদা। ইহা অনিয়তিকার এবং স্ফটিকাকৃতির। গরম পানিতে সম্পূর্ণ গলে যায়।
সলুবর সার বোরণ ঘাটতি এলাকায় জন্য একটি উৎকৃষ্ট বোরণ সার। এটি দেখতে ধবধবে সাদা, হালকা, মিশি পাউডারের মতো, ঠাণ্ডা পানিতে সল্যুবর সম্পূর্ণ গলে যায় এবং পাত্রে কোনো ধরনের তলানি পড়ে না। 
বোরণ পুষ্টি উপাদান গাছের কোষ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। পাতা ও ফুলের রঙ আকর্ষণীয় করে। পরাগরেণু সবল ও সুস্থ রাখে। বীজ উৎপাদনে সহায়তা করে এবং চিটা রোধ করে।  

 
বোরণের ঘাটতিতে গাছের অগ্রভাগ মরে যায়, কাণ্ড কালো বর্ণ ধারণ করে।  শিকড় বৃদ্ধি হ্রাস পায়। কোষ প্রাচীর ভেঙে যায়। গাছ মচ মচ ভাব ধারণ করে।
 
বোরণের প্রয়োগ মাত্রা বেশি হলে কচি পাতা এবং ডগা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলন অনেক কমে যায়।
 
মাঠ পর্যায়ে গুণগত সার চেনার উপায়
রাসায়নিক সারের ব্যাপক চাহিদা ধাকার কারণে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী বেশি মুনাফা লাভের  জন্য ভেজাল সার উৎপাদন এবং আমদানিকৃত সারে ভেজাল মিশ্রিত করে তা বাজারজাত করে থাকে। এর ফলে কৃষক ভাইয়েরা প্রতারিত হয়ে আসছেন। সঠিক মাত্রায় সার ব্যবহার করেও কাক্সিক্ষত ফলন পান না। ফলে তারা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে জমির উর্বতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং উৎপাদন ক্ষমতা ক্রমান্নয়ে হ্রাস পাচ্ছে। তাই কৃষক ভাইয়েরা যদি গুণগত সার চেনার বা শনাক্ত করার কৌশল জানতে পারেন, তাহলে ভেজাল সারের প্রতারণা থেকে রক্ষা পেতে পারেন। নিচে ভোজাল সার চেনার কিছু কৌশল বর্ণনা করা হল।
 
ইউরিয়া
দেশে উৎপাদিত এবং আমদানি  করা ইউরিয়া সারে সাধারণত ভেজাল পরিলক্ষিত হয় না। তবে ডোলোমায়িট বা সস্তা রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে ছোট দানা তৈরি করে ইউরিয়ার দানার সঙ্গে ভেজাল হিসেবে মিশ্রিত করলে রঙ দেখে তা শনাক্ত করা যাবে।
 
আসল ইউরিয়া সার কোনো অবস্থাতেই স্ফটিক আকৃতির হবে না। ইহা দানাদার বা প্রিল্ড (ক্ষুদ দানাদার) হিসেবে বাজারজাত করা হয়ে থাকে। ইহা সহজেই পানিতে গলে যায়।
 
এক চা চামুচ ইউরিয়া আধা গ্লাস পানিতে ঢেলে চামিচ দিয়ে নাড়াচাড়া করলে তাৎক্ষণিকভাবে গলে স্বচ্ছ দ্রবণ তৈরি হবে। এ দ্রবণে হাত দিলে বেশ ঠাণ্ডা অনুভূত হবে।
 
আর একটি সহজ পরীক্ষা হলো কিছু ইউরিয়া খোলা পাত্রে রাখলে বাতাস থেকে আর্দ্রতা শোষণ করে কিছুক্ষণের মধ্যে ভিজে উঠবে। এতে প্রমাণিত হবে যে ইউরিয়ার নমুনাটিতে কোনো ভেজাল নেই।
 
টিএসপি
টিএসপিতে অম্লস্বাদযুক্ত ঝাঁঝালো গন্ধ থাকে। এ সার পানিতে সহজেই দ্রবণীয়।  এক চা চামুচ টিএসপি পানিতে মিশালে  তাৎক্ষণিকভাবে গলে ডাবের পানির মতো দ্রবণ তৈরি হবে, পক্ষান্তরে ভেজাল টিএসপি পানিতে মিশালে ঘোলা দ্রবণ তেরি হবে। এফএমপি দানা এবং কাঁদা মাটি, জিপসাম ও ডলোমাইট দিয়ে তৈরি দানা যদি ভেজাল হিসাবে টিএসপিতৈ মিশানে হয় তা তলানি আকারে গ্লাসের নিচে জমা হবে।    
                                                                                       
প্রকৃত টিএসপি অধিক শক্ত বিধায় দুটো বুড়ো নখের মাঝে রেখে চাপ দিলে সহজে ভেঙ্গে যাবে না, কিন্তু ভেজাল  টিএসপি অপেক্ষাকৃত নরম হওয়ায় সহজে ভেঙে যাবে। ভেজাল  টিএসপি সারের ভাঙার ভেতরের অংশের রঙ বিভিন্ন রকমের হতে পারে। এফএমপির দানা যদি ভেজাল হিসেবে মিশ্রিত তা সহজে ভাঙবে না এবং পানিতেও গলবে না।
 
ডিএপি
ডিএপি সারেও টিএসপি সারের মতো অম্লস্বাদযুক্ত ঝাঁঝালো গন্ধ থাকে। এ সারও সহজেই পানিতে গলে যায়।
 
প্রকৃত ডিএপি সারে নাইট্রোজেন বিদ্যমান থাকায় বাহিরে একটি কাগজে খোলা অবস্থায় কিছু দানা রাখলে তা বাতাস থেকে আর্দ্রতা শোষণ করে কিছুক্ষণের মধ্যে ভিজে উঠবে।
 
এক চা চামুচ ডিএপি সারের সঙ্গে খাবার চুন মিশিয়ে কষা দিলে এমোনিয়ার তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ বের হলে বুঝা যাবে সারটি প্রকৃত ডিএপি।
 
আর একটি সহজ পরীক্ষা হলো এক চা চামুচ ডিএপি সার আধা গ্লাস পানিতে মিশালে তাৎক্ষণিকভাবে গলে গিয়ে স্বচ্ছ দ্রবণ তৈয়ার হবে, পক্ষান্তরে গন্ধক জাতীয় কোনো পদার্থ ভেজাল হিসেবে মিশ্রিত থাকলে ঘোলা দ্রবণ তৈরি হবে।
 
এমওপি
এমওপি সারে ঝাঁঝালো গন্ধ নেই, তবে জিবে দিলে ঝাঁঝালো স্বাদ পাওয়া যায়। বর্ষা কালে খোলা অবস্থায় রেখে দিলে বাতাস থেকে আর্দ্রতা শোষণ করে ভিজে উঠবে এবং ক্রমান্বয়ে সারে আর্দ্রতার পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।
আধা চা চামচ এমওপি সার গ্লাসের পানিতে মিশালে তাৎক্ষণিকভাবে গলে পরিষ্কার দ্রবণ তৈরি হবে, পক্ষান্তরে ভেজাল এমওপি পানিতে মিশালে অদ্রবণীয় বস্তু যেমন বালি, কাচের গুঁড়া, ক্ষুদ্র সাধা পাথর, ইটের গুঁড়া ইত্যাদি  তলানি আকারে নিচে জমা হবে। আসল এমওপি সারের ক্ষেত্রে  গ্লাসে হাত দিলে ঠাণ্ডা অনুভূত হবে, নকল সারে কম ঠাণ্ডা অনুভূত হবে। সারে যদি ভেজাল হিসেবে লাল বা অন্য কোনো রঙ মিশ্রিত থাকে, পানির রঙ সেই অনুযায়ী হবে এবং রঙ ভেসে উঠবে। এছাড়া দ্রবণে হাত দিলে রঙ লেগে যাবে।

 
জিপসাম
একটি কাচের বা চীনা মাটির পাত্রে এক চা চামচ জিপসাম সারের উপর ১০ ফোঁটা পাতলা (১০%) হাইড্রোক্লোরিক এসিড মিশালে যদি বুঁদ বুঁদ দেখা যায় তবে ধরে নেয়া যাবে যে জিপসাম সারটি ভেজাল।
কখনও কখনও চুনের গুঁড়া ও মাটির গুঁড়া মিশিয়ে ভেজাল জিপসাম তৈরি করা হয়।
 
জিংক সালফেট সার
প্রকৃত জিংক সালফেট (মনোহাইড্রেট) সার দেখতে রঙবিহীন ক্ষুদ্রাকার স্ফটিক আকৃতির। ইহা দানাদার হিসেবেও বাজারজাত করা হয়।
সহজ পরীক্ষার জন্য এক চা চামচ সার আধা গ্লাস পানিতে দ্রবীভূত করলে তা সম্পূর্ণ গলে যাবে এবং দ্রবণটি ঘোলাটে হবে। যদি নমুনাটি সঠিক জিঙ্ক সালফেট (মোনোহাইড্রেট) হয়, তাহলে গাঢ় ঘোলা দ্রবণটি ধীরে ধীরে গ্লাসের নিচ থেকে উপরের দিকে পরিষ্কার হতে থাকবে। যদি নমুনাটি ভেজাল জিঙ্ক সালফেট (মোনোহাইড্রেট) হয়, তাহলে কিছুক্ষণ পর গাঢ় ঘোলাটে দ্রবণটির উপরের অংশ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে গ্লাসের নিচের দিকে নামতে থাকবে। আসল জিংক সালফেট (হেপটাহাইড্রেট) সার দেখতে সাদা ক্ষুদ্রাকার স্ফটিক আকৃতির । এক চা চামচ জিঙ্ক সালফেট (হেপটাহাইড্রেট) আধা গ্লাস পানিতে মিশালে সারটি সম্পূর্ণ গলে যাবে এবং পাত্রে কোনরূপ তলানি পড়বে না।  

 
একই পরিমাণ জিঙ্ক সালফেট (হেপটাহাইড্রেট) সার জিঙ্ক সালফেট (মোনোহাইড্রেট সারের তুলনায় ওজনে অনেক হালকা হয়।
 
একই পরিমাণ জিঙ্ক সালফেট (হেপটাহাইড্রেট) সার জিঙ্ক সালফেট (মোনোহাইড্রেট সারের তুলনায় ওজনে অনেক হালকা হয়।
 
বোরন সার
বরিক এসিডের রঙ সাদা। ইহা অনিয়তিকার এবং স্ফটিক আকৃতির হয়।  হাতে কিছু পরিমাণ বরিক এসিড নিয়ে আঙুল দিয়ে ঘষা দিতে থাকলে এক পর্যায়ে পিচ্ছিল তেলতেলে ভাব অনুভূত হবে। কিন্তু ভেজাল বরিক এসিডে পিচ্ছিল তেলতেলে ভাব অনুভূত হবে না। এক চা চামচ বরিক এসিড এক গ্লাস গরম পানিতে মিশালে উহা সম্পূর্ণ গলে যাবে এবং গ্লাসের তলায় কোনো প্রকার তলানি পড়বে না।
 
সল্যুবর বোরন দেখতে ধবধবে সাদা, হালকা, মিহি পাউডারের মতো। এক চা চামচ সল্যুবর  গ্লাসে ঠাণ্ডা পানিতে দ্রবীভূত করলে প্রকৃত সল্যুবর বোরন সার সম্পূর্ণ গলে যাবে এবং পাত্রে কোনো প্রকার তলানি পড়বে না। এ দ্রবণে এক চিমটি বেরিয়াম ক্লোরাইড মেশালে দ্রবণে কোনো অধঃক্ষেপ পড়বে না। যদি নমুনাটিতে সোডিয়াম সালফেট ভেজাল হিসেবে মিশ্রিত থাকে তাহলে বেরিয়াম সালফেটে অধঃক্ষেপ পড়বে এবং দ্রবণটি তাৎক্ষণিকভাবে দুধের মতো সাদা হয়ে যাবে।
 
 
ড. মো. শহিদুল ইসলাম*
* মৃত্তিকা বিজ্ঞানী এবং সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট

যেভাবে পাবনা ক্যাটল

বাংলাদেশে গবাদিপশুর জাত উন্নয়ন শুরু হয়েছিল আঠারো শতকের শেষভাগে। কাজটি শুরু করেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার যৌবনের ঊষালগ্নে যখন পূর্ববঙ্গে পদার্পণ করেছিলেন তিনটি অঞ্চলের জমিদারি দেখভাল করার জন্য, কাজটি তিনি তখনই শুরু করেন। বাস্তবিক অর্থে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদার ছিলেন না; বরং তিনি জমিদারি প্রথার বিরোধী একজন বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর ছিলেন। আমরা তার পরিচয় পাই অচলায়তন অথবা রক্ত করবী নাটকে অথবা রথের রাশি কাব্যে। সাঁওতাল, ডোম, সুইপার, মুচি কম উঠে আসেনি তার সাহিত্যে। বলা যেতে পারে তিনি সমাজে বঞ্চিত-লঞ্ছিত মানুষের সেবা করার জন্য জমিদারির ধন অকাতরে বিলিয়েছেন। এ মানুষটি এসবের স্বাক্ষর রেখেছেন তার লেখায় এবং কাজে। নোবেল বিজয়ে প্রাপ্ত পুরো অর্থ তিনি ব্যয় করেছেন খরাপ্রবণ পূর্ববঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চল নওগাঁ জেলার বা পতিসরের কৃষকের জন্য। নোবেলের অর্থ দিয়ে তিনি বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রথম চালু করেছিলেন কৃষকের সমবায় ব্যাংক। এ ব্যাংকের পুরো লগ্নি ছিল রবী ঠাকুরের নোবেলের অর্থ। কৃষি কাজকে তিনি এমনভাবেই উৎসাহিত করেছেন, পৃষ্টপোষকতা করেছেন।
পূর্ববঙ্গে যখন শাহজাদপুর অঞ্চলে তার পরগনা দেখতে আসতেন; তিনি আসতেন নৌপথে। নদীমাতৃক পূর্ববঙ্গ তার সৃজনশীল মন খুলে দিয়েছিল অন্যভাবে। বর্ষার যত গান, যত কাব্য সব তো তিনি লিখেছিলেন পদ্মা, মেঘনা, যমুনার উত্তাল ঢেউয়ে উদ্বেলিত হয়ে। উম্মত্ত পদ্মা আর ষড়ঋতুর বিচিত্র আকাশ রবীন্দ্রনাথের ভাবনাকে যে কত রূপ দিয়েছিল তা বলে শেষ করা যাবে না। শুধু তিনি ভাবেননি অথবা লেখেননি। নদীর সাথে বসবাস যেসব মানুষের, তাদের ভাঙা গড়ার অনিশ্চিত জীবনকে কীভাবে কল্যাণকর জীবনে রূপান্তর করা যায়, রবীন্দ্রনাথ তা ভেবেছেন অত্যন্ত গভীরভাবে। সে ভাবনা থেকেই এদেশে চলনবিল এবং গোয়ালা নদীর তীরের জলমগ্ন মানুষদের জন্য তিনি হাতে নিয়েছিলেন গবাদিপশুর জাত উন্নয়ন কার্যক্রম। যমুনা থেকে বড়াল, বড়াল থেকে গোয়ালা এবং এর চারপাশ দিয়ে চলনবিল; এলাকাটি শাহজাদপুর। তদানীন্তন পাবনা  জেলার একটি থানা। বড় বিচিত্র এখনাকার ভূ-প্রাকৃতিক রূপ। শুকনো মৌসুমে এখানে জমিনগুলো জেগে থাকে ৬ থেকে ৯ মাস। আর বর্ষার পানির নিচে, বর্ষায় এ অঞ্চলের মানুষের আশ্রয় কেবল পাহাড়ের মতো মাটির ঢিবির ওপরের ঘরবাড়ি। এখানকার মানুষ সরল কিন্তু অলসও বটে। দারিদ্র্য এখানকার মানুষের নিত্যসঙ্গী। রবীন্দ্রনাথ এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের কাজে হাত দিলেন। ব্যবহার করলেন গোয়ালা নদী। একটি নদীকে সম্পদ ভাবলেন রবী ঠাকুর এবং এ সম্পদ ব্যবহারের চিন্তায় মগ্ন হলেন কবি। এখানকার অলস মানুষ বিস্তীর্ণ জমিতে গতর খাটায়, মাঠে বেশ গরু বাছুর দেখা যায়।
রবীন্দ্রনাথ শুরু করলেন গবাদিপশুর জাত উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের কাজ। এজন্য ভারত থেকে নিজ অর্থে নিয়ে এলেন শাহীওয়াল ও সিন্ধি জাতের কিছু ষাড়। ষাড়গুলো রবীন্দ্রনাথ শাহজাদপুর অঞ্চলের কৃষকের মাঝে বিতরণ করলেন। যাদের ষাড় প্রদান করা হলো তাদের জন্য শর্ত একটাই, সেটা হলো তাদের খর্বাকৃতির গাভীগুলো যখন প্রজননে আসবে, তখন এ উন্নত জাতের ষাড় দিয়ে শংকরায়ন করাতে হবে এবং তা বিনামূল্যে। শুরু হলো বঙ্গদেশে গবাদিপশুর জাত উন্নয়ন কার্যক্রম। শ্রী ঠাকুর ষাড়ের মালিকদের প্রতি মাসে ৩০ টাকা করে বরাদ্দ করলেন সেসব ষাড়ের খাদ্য, যতœ এবং ওষুধপত্রের জন্য। ৩০ টাকা তখনকার সময় একজন উচ্চ মানের সরকারি কর্মকর্তার বেতনের চেয়ে বেশি ছিল। শাহজাদপুরের প্রজারা ভালো একটি কাজ পেয়ে গেলেন। রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন শাহজাদপুরে গরুর জাত উন্নয়ন হবে। সুতরাং উন্নত জাতের গবাদিপশুর জন্য চারণভূমি প্রয়োজন। শ্রী ঠাকুর নিজের জমিদারি থেকে ৬০৭ হেক্টর জমি গরুর বাথানের জন্য দান করলেন। বিস্তীর্ণ এ জমিতে শাহজাদপুরের গরু নাক ডুবিয়ে সবুজ ঘাস খায়, এদের স্বাস্থ্য অত্যন্ত সুঠাম, রোগব্যাধী নেই, দিনভর ঘাস খায় আর সময়মতো গোয়ালা নদীতে গোসল করে, সাঁতার কাটে শাহজাদপুরের গরু। সে এক দেখার মতো দৃশ্য। দেখতে দেখতে অতি অল্প সময়ে কয়েক হাজার সংকর জাতের গাভী সৃষ্টি হলো শাহাজাদপুরে। এরা স্বাভাবিক নিয়মে দিনে ১০-১৫ লিটার দুধ দিতে শুরু করল, এ গাভীগুলো শাহাজাদপুর তথা পূর্ববঙ্গের আবহাওয়ার সাথে বেশ খাপ খাইয়েছিল। এরা রোদ, বৃষ্টি, শীতে ভীষণ রকম সহনশীল একটি ভিন্ন ধারার গরুর জাত। এ জাতের তখন নাম হলো পাবনা ক্যাটল এবং এর জনক কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বর্তমানে গবাদিপশুর জাত উন্নয়নের দিগ¦দিক গতিধারায় পাবনা ক্যাটল আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। সত্যি কথা বলতেই হয়, পাবনা ক্যাটল কিছু নিজস্ব সকীয়তা নিয়ে এদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। আমাদের দেশে ফ্রিসিয়ান, শাহীওয়াল দিয়ে জাত উন্নয়ন শুরু হয়েছে ১৯৭৫ সাল থেকে। কিন্তু বড় সত্যি কথা হচ্ছে প্রায় ৫০-৫৫ বছর সময়ের মধ্যে শাহজাদপুর অঞ্চলে একটি অধিক দুগ্ধ উৎপাদনশীল গরুর জাত সৃষ্টি হয়েছিল বলেই ১৯৪৭ সালে সেখানে দুধ পাউডার করার শিল্প স্থাপিত হয়েছিল। সে এক বিস্ময়কর অধ্যায়, ১৯৪৭ সালে সম্ভবত এ দেশে কৃষিভিত্তিক অন্য কোনো শিল্প এত সুন্দরভাবে গড়ে উঠতে পারেনি। অথচ পেয়েছিল দুধ পাউডার করার একটি আধুনিক শিল্প; শাহজাদপুরের কোল ঘেসে, লাহিরী মোহনপুর রেলস্টেশনের পূর্বপাশে। শুধু দুধ পাউডারকরণ কেন? দগ্ধ উৎপাদনকারীদের নিয়ে একটি সমবায়ও গড়ে উঠেছিল পাবনার শাহজাদপুরে। কালের প্রবাহে আজ সব কেমন বিলিন হয়ে যাচ্ছে। এ বঙ্গের গর্ব করার মতো গরুর দুটি জাত আজ বিলিন হতে চললো, কেউ এর খোঁজ রাখে না; কেউ এসব নিয়ে ভাবেন না। বিলিনের পথে দুটি জাতের মধ্যে একটি পাবনা ক্যাটল অন্যটি রেড চিটাগাং ক্যাটল। যারা গবাদিপশুর উন্নয়ন নিয়ে বাস্তবমুখী চিন্তা করেন, তাদের যতœকরে আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করা হয়। আজ বিশৃঙ্খল জাত উন্নয়নের ধারায় আমরা আমাদের নিজস্ব জাতের গরু ধরে রাখতে পারছি না। খুব সত্যি কথা হচ্ছে, যদি খুব নির্বাচিতভাবে আমরা পাবনা ব্রিড এবং চিটাগাং ব্রিড দুটি টিকিয়ে রাখতে পারতাম তবে কত উপকার আমাদের হত তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। কারণ দুটি জাতের গরুই কম খায়, এদের রোগব্যাধী কম হয় এবং এরা বেশি দুধ দেয়। দুটি জাতই বিরূপ আবহাওয়ায় বেশি সহনশীল।
একটি অপ্রিয় সত্যি না বললেই নয়; সেটি হচ্ছে যত্রতত্র কৃত্রিম প্রজনন। এসব করে আজ দুধের উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে বটে। কিন্তু কৃত্রিম প্রজননের জন্য যে শত শত কোটি টাকা ব্যয়  করা হচ্ছে এর ফল আমরা কি পাচ্ছি? দেশে ৭০ লাখ সংকর জাতের গরু আছে। কিন্তু সংকর জাতের গাভীগুলোর প্রজনন স্বাস্থ্যের হাজারো সমস্যা, অধিকাংশ গাভী একবার বাচ্চা দেয়ার পর আর গর্ভধারণে সক্ষম হচ্ছে না। আমাদের ধারণা কেবল কৃত্রিম প্রজনন করিয়ে দিলেই হয়ে গেল, এখন দুধের নহর বইবে। আসলে কী তাই? এখানে কৃত্রিম প্রজনেনর ফলে গাভীর মৃত্যু, বাছুরের মৃত্যু, ওলানফোলা রোগ, রিপিট ব্রিডিং, প্রজনন ক্ষমতা চিরতরে নষ্ট হওয়া, মিল্কফিভার এসব ঘটনা মাঠ পর্যায়ে হাজারে হাজারে ঘটছে। কিন্তু মূল্যবান এ গোসম্পদের সঠিক উন্নয়নের জন্য এ বিষয়ে কোনো গবেষণা নেই, নেই কোনো সঠিক তথ্য, নেই কোনো প্রতিকারের বিধান। ফলে ফ্রিসিয়ান এবং শাহীওয়াল জাতের বীজ দিয়ে সংকরায়নের কারণে দেশে প্রাথমিক পর্যায় ১৯৮০-১৯৯০ সাল পর্যন্ত গাভীপ্রতি দুধের উৎপাদন ২০-৩০ লিটারের বেশি ছিল। কিন্তু এ দুধের উৎপাদন কমে বর্তমানে ৮ লিটারে নেমেছে। তা হলে কী বলা যাবে না শুধু কৃত্রিম প্রজনন করালেই গাভীর দুধ বাড়ে না। বরং দুধ কমে এবং জাতটি ঝুঁকিপূর্ণ একটি জাতে রূপান্তরিত হয়। এক্ষেত্রে জাত টিকাবার জন্য অনেক ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করতে হয়, গবেষণা করতে হয়; যা বাংলাদেশে করা হয় না।
কৃষকের বন্ধু রবীন্দ্রনাথ যে পাবনা ব্রিডের সৃষ্টি করেছিলেন। সে জাতের গাভী প্রায় ৭০-৮০ বছর পর্যন্ত ১২-১৫ লিটার দুধ দিত বিনা যতেœ। আমরা হুজুগে সব নষ্ট করি, তারই ধারাবাহিকতায় নষ্ট করেছি পাবনা ব্রিড এবং চিটাগাং ব্রিড। একজন পেশাজীবী হিসেবে বলতেই হয়, জাত উন্নয়নের জন্য প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে যদি সংকরায়ন করানো যায়, যদি গো খাদ্যের জন্য চারণভূমি তৈরি করা যায়, যদি গোয়ালা নদীর মতো রক্ষা করা যায় পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ দেশের সব শাখা নদী। যদি রক্ষা করা যায় চলনাবিল, জবাইবিল, টাংগুয়ার হাওর, হাকলুকি হাওর, বাইক্কাবিল তবেই হয়ত প্রাকৃতিক পরিবেশে এদেশে সৃষ্টি হতে পারে অধিক উৎপাদনশীল গবাদিপশু, যার মাধ্যমে দেশ দুধে স্বংয়সম্পূর্ণ হবে এবং এদেশের দুধ রফতানি করা যাবে বিদেশে। এর জন্য বছরের পর বছর শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন নেই প্রয়োজন আছে কেবল রবীন্দ্রনাথের পাঠশালা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।

কৃষিবিদ ডা. এম এ সবুর*
*সিনিয়র সাইন্টিফিক অফিসার, এফডিআইএল, মানিকগঞ্জ

কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে বর্তমান সরকার

কৃষি এ দেশের অর্থনীতির এক অতি গুরুত্বপূর্ণ খাত। বর্তমানে দেশে জিডিপির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অর্জিত হয় কৃষি খাত থেকে। তার চেয়েও বড় কথা কৃষি এ দেশের জনমানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা প্রদানের প্রধানতম এবং অন্যতম উৎস। এখনও এ দেশের বিপুল জনসংখ্যার কর্মসংস্থানও হয়ে থাকে কৃষিকে অবলম্বন করেই। ফলে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, জীবনযাত্রায় মানোন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হলে কৃষিক্ষেত্রে যে অধিকতর মনোযোগ দিতে হবে শুরুতেই ২০০৯ সনে নির্বাচিত হয়ে মহাজোট সরকার সেটি অনুধাবন করতে সক্ষম হয়। গত অর্ধযুগ ধরে কৃষিক্ষেত্রে বিভিন্ন খাতে যে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে তা বর্তমান সরকারের কৃষি ভাবনার এক বাস্তব প্রতিফলন।


শুরুতেই খাদ্যশস্য উৎপাদনে গত অর্ধযুগের ধারাবাহিক সাফল্যের কথা তুলে আনা যুক্তিসঙ্গত হবে। ২০০৮-২০০৯ সনে আমাদের চাল, গম ও ভুট্টার মোট উৎপাদন ছিল ৩৩৩.০৩ লাখ টন। এরপর থেকে প্রতি বছর খাদ্যশস্যের উৎপাদন বর্তমান সরকারের কৃষিবান্ধবনীতি ও কর্মকাণ্ডের ফলশ্রুতিতে ক্রমে বেড়েছে। গত ২০০৯-১০, ২০১০-১১, ২০১১-১২ ও ২০১২-১৩ সনে যথাক্রমে ৩৪৫.৯৬, ৩৬০.৬৫, ৩৬৮.৩৩৯ ও ৩৭২.৬৬ লাখ টনে উন্নীত হয়। আলু উৎপাদনের কথা যদি ধরা হয় তাহলে দেখা যায় যে, ২০০৮-০৯ থেকে ২০১২-১৩ সনে এর উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৭.৪৬ লাখ টন থেকে ৮৬.০৩ লাখ টনে। এ সময়কালে পেঁয়াজ, গম ও সবজির উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেড়েছে।


মূলত চারটি প্রধান কারণে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে গত অর্ধযুগ ধরে। এক, অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় ফসল আবাদের জন্য কৃষক এখন বেশি পরিমাণ গুণগতমান সম্পন্ন ফসলের বীজ পাচ্ছেন। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে বিএডিসি থেকে বিভিন্ন ফসলের বীজ সরবরাহ করা হয় ২ লাখ ৬১ হাজার ৫৯ টন যা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমান সরকারের আমলে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৩৬ হাজার ৬২৩ টনে। এ বৃদ্ধি চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত হলেও তা আড়াই গুণের বেশি। দুই, অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় এ সময়কালে অনেক বেশি সংখ্যক জাত উদ্ভিদ প্রজননবিদরা উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছেন আর অনেক বীজ এরই মধ্যে কৃষক পর্যায়ে বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে বিভিন্ন ফসলের মোট ১৪৫টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। তিন, সারের মূল্য হ্রাস ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় কৃষক স্বল্প মূল্যে সুষম সার প্রয়োগ করার সুযোগ পেয়েছেন। ২০০৯ সনে মহাজোট সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকে সরকার নন-ইউরিয়া সারের মূল্য তিনবার হ্রাস করেছে। ২০০৯ সনে যেখানে টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি এর কেজি প্রতি মূল্য ছিল যথাক্রমে ৮৭, ৭০ ও ৯০ টাকা, ২০১০ সনের অক্টোবরে এসে তা যথাক্রমে হ্রাস করা হয়েছে ২২, ১৫ ও ২৭ টাকায়। অন্যদিকে, ২০১৩ সনের আগস্ট মাসে এসে ইউরিয়া সারের মূল্য কৃষক পর্যায়ে কেজিপ্রতি ১৬ টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, বর্তমান সরকারের আমলে দেশে একটি টেকসই সার বিতরণ নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে যার মাধ্যমে কৃষকের কাছে সব ধরনের সার সময়মতো পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। চার, বেসরকারি বীজ আমদানিকে উৎসাহিত করায় দেশে ভুট্টা, সবজি, গোলআলু এবং পাট বীজ সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে বীজ ব্যবস্থাকে বিশেষ সুযোগ প্রদান করায় প্রাইভেট সেক্টর দেশে প্রচুর সবজি বীজ আমদানির মধ্য দিয়ে কৃষকের কাছে সবজি বীজের জোগান বৃদ্ধি করতে পেরেছে। ফলে দেশে মুক্ত পরাগী বীজের পাশাপাশি হাইব্রিড সবজি বীজের সরবরাহও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সবজি উৎপাদন বেড়েছে।
মহাজোট সরকারের আরেকটি বড় সাফল্য হলো কৃষি গবেষণাকে অগ্রাধিকার প্রদান। বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ঘঅচঞ-এর আওতায় পরিচালিত ঝঢ়ড়হংড়ৎবফ চঁনষরপ এড়ড়ফং জবংবধৎপয (ঝচএজ) এর মাধ্যমে প্রতিটি কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে ল্যাব উন্নয়নসহ নানামুখী গবেষণা পরিচালনা করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে দেশে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটে আণবিক জীববিদ্যা সম্পর্কিত আধুনিক গবেষণাগার গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে পাটের নানা রকম প্রতিকূলতাসহিষ্ণু পাট জাত উদ্ভাবনের গবেষণা চলছে।


দেশে ফসল কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বর্তমান সরকার আরও যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-


বর্তমান সরকারের আমলে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ আরও গতিশীল হয়েছে। ‘খামার যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি’ প্রকল্পের মাধ্যমে ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে ২৫% কম মূল্যে ৩৫টি জেলায় ৩৮ হাজার ৩২৪টি বিভিন্ন প্রকার কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছে। তাছাড়া বিএআরআই এবং বিআরআরআই কর্তৃক উদ্ভাবিত কৃষি যন্ত্রপাতি মোট মূল্যের ৬০% পর্যন্ত ভর্তুকি মূল্যে কৃষকের নিকট সরবরাহ করে যাচ্ছে।


কৃষকের উৎপাদন খরচ হ্রাস করার জন্য সরকার বিদ্যুতের রিবেট প্রদান করেছে এবং বীজ, সারসহ ইক্ষু চাষিদের সহায়তা ভর্তুকি বছর বছর বৃদ্ধি করেছে। ২০০৮-০৯ সনে এ রকম ভর্তুকি যেখানে ছিল ৫১৭৮.২৬৯১ কোটি টাকা ২০১২-১৩ সনে এসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৯৯৯.৯৯৩৮ কোটি টাকায়।
সরকার বন্যা, আইলা, সিডর, মহাসেনসহ নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে ফসল উৎপাদনে প্রণোদনা প্রদান করেছে ও কৃষি পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।


ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করে ভূ-অভ্যন্তরস্থ পানি উত্তোলন হ্রাস করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার ক্ষুদ্র সেচ কার্যক্রম জোরদার করেছে। দেশের জলাবদ্ধ এলাকা, হাওর ও দক্ষিণাঞ্চলে বিভিন্ন ক্ষুদ্র সেচ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারকে সরকার গুরুত্ব দিয়েছে। সেচ সুবিধা বৃদ্ধির জন্য সেচের আওতা বাড়ানো হয়েছে। ড্যাম, পাহাড়ে ঝিরি বাঁধ, রাবার ড্যাম ইত্যাদি নির্মাণ করা হয়েছে।


কৃষি পণ্যের বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন বর্তমান সরকারের আরেকটি সাফল্য। পাইকারি বাজার সৃষ্টি, গ্রোয়ার্স মার্কেট, কুল চেম্বার স্থাপন, রিফার ভ্যান পণ্য বিপণন, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিপণন ব্যবস্থায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়েছে।


সরকার অঞ্চলভিত্তিক ১৭টি সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এসব উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে এলাকা উপযোগী ফসলের জাত উন্নয়ন, সম্ভাবনাময় কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, সেচ অবকাঠামো নির্মাণ করে সেচের আওতা বৃদ্ধি করা, কৃষিজাত পণ্যের বাজার সুবিধা বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে।


কৃষি জমি ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে বলে বৃহত্তর বরিশাল, খুলনা ও সিলেট জেলার পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আনার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
দেশের সমুদ্র উপকূলীয় এলাকার কৃষির সার্বিক উন্নয়ন সাধনের জন্য ২০১৩ সনে একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এ মহাপরিকল্পনার আওতায় দক্ষিণাঞ্চলের ১৪টি জেলায় সামগ্রিকভাবে ফসল, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতসহ ১০টি প্রধান ক্ষেত্রে কর্মকা- শুরু হয়েছে।


দেশে বর্তমান সরকারের আমলে ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের ১০টি কৃষি অঞ্চলে ২৪৫টি কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্র (এআইসিসি) স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কৃষক ফসল উৎপাদন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন।
দেশে মাটির উর্বরতা অনুযায়ী অনলাইন সুষম সার সুপারিশ করার জন্য ২০০টি উপজেলায় ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। তাছাড়া দেশে এওঝ ভিত্তিক মডেলিংয়ের মাধ্যমে ১৭টি শস্য উপযোগিতা বিষয়ক ম্যাপ প্রণয়ন করা হয়েছে। এটি অঞ্চলভিত্তিক শস্য উৎপাদনকে ত্বরান্বিত করবে।


মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশ মৎস্য উৎপাদনে পৃথিবীর পাঁচটি সর্বাধিক মৎস চাষকারী দেশের একটি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ২০১৩-১৪ সনে আমাদের দেশে প্রায় ৩.৪৬ মিলিয়ন টন মাছ উৎপাদন করা হয়েছে যার প্রায় ২ মিলিয়ন টনই মৎস্য আবাদ থেকে পাওয়া গেছে। মৎস্য গবেষণার মাধ্যমে দেশে মাছের নতুন জাত উদ্ভাবন এবং এসব জাতের মাছের পোনা ব্যবহার করার কারণে মৎস্য উৎপাদন বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত অর্ধযুগ ধরে মৎস্য উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং এদের প্রয়োগ নিশ্চিতকরণের কারণেও মৎস্য উৎপাদনে সফলতা অর্জন করেছে। মৎস্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের আমলে যেসব কৌশল উদ্ভাবন ও এদের প্রসার ঘটানো হয়েছে সেগুলো হলো-
সুপার জাতের মনোসেক্স তেলাপিয়ার পোনা উৎপাদন এবং এর আবাদ করা,
থাই পাঙ্গাশের কৃত্রিম প্রজনন এবং পোনা উৎপাদন,
পুকুরে পাঙ্গাশ উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবন,
পুকুরে রুই মাছের প্রজাতির মিশ্র আবাদ করা,
মৌসুমি পুকুরে রাজপুঁটি উৎপাদন,
উন্নত রুই জাতীয় মাছের রেণু উৎপাদন এবং নার্সারি ব্যবস্থাপনা।


প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে বর্তমান মহাজোট সরকারের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে ২০০৭-০৮ সনের তুলনায় ২০১২-১৩ সনে দেশের দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদন যথাক্রমে শতকরা ৪৬, ৫৫ এবং ৪.২ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১২-১৩ সনে কৃত্রিম প্রজননের ক্ষেত্রে শতকরা ৭.৪ ভাগ বৃদ্ধি ঘটেছে। এ সময়ে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার কারণে মুরগির মৃত্যু হার কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। দেশে এ সময়ে ২৪টি লাইভস্টক কোয়ারেনটাইন স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। প্রাণীর ভ্যাকসিন প্রদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে এবং হাইব্রিড গবাদিপশু পালন কর্মকা-কে ত্বরান্বিত করা হয়েছে। গবাদিপশু এবং হাঁস-মুরগি পালনে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বেকার যুবক, দুঃস্থ মহিলা, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষককে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। ২০১১-১২ সনে দেশের দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলের আটটি জেলায় ইনটিগ্রেটেড এগ্রিকালচারাল প্রোডাক্টিভিটি প্রজেক্ট ত্বরান্বিত করা হয়েছে। দেশি মুরগির ব্রিড সংরক্ষণ করা এবং এদের বাড়তি খাদ্য সরবরাহ করে উৎপাদন বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।


বর্তমান সরকারের কৃষিক্ষেত্রে গৃহীত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফলে আজ কৃষির প্রত্যেকটি খাতে ধনাত্মক পরিবর্তন হয়েছে। ফসল, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রত্যেকটি খাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হওয়ায় এখন এ দেশের কৃষক কেবল খাদ্য নিরাপত্তা নয় বরং পুষ্টি নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে দেশ ক্রমে এগোচ্ছে। খাদ্যশস্য, গোলআলু, ভুট্টা এবং সবজি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উৎপাদনে দেশ আজ এক নতুন মাত্রায় উন্নীত হয়েছে। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জমি হ্রাসের প্রেক্ষাপটে জনমানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বিধানের জন্য সরকার নানামুখী ব্যবস্থা গ্রহণ করে চলেছে। কৃষিবান্ধব বর্তমান সরকার সত্যিকার অর্থেই খাদ্য ঘাটতির দেশকে এক খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশে পরিণত করার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।

 

লেখক:

ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া*
* প্রফেসর, কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ এবং প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলানগর, ঢাকা-১২০৭, মোবাইল : ০১৫৫২৪৬৭৯৪৫

 

প্রশ্নোত্তর (পৌষ ১৪২৪)

মো. আবদুল ওয়াহাব, গ্রাম : যাদবপুর, উপজেলা : আলমডাঙ্গা, জেলা : চুয়াডাঙ্গা
প্রশ্ন : বাড়িতে একটি কাঁঠালগাছ আছে। কিন্তু কাঁঠাল পাকার আগে ফেটে যায়, কোষগুলোর গোড়ার দিকে শলার মতো হয় এবং রস কম হয়। এ অবস্থায় করণীয় কী?

উত্তর : কাঁঠাল পাকার আগে ফেটে যায় শারীরবৃত্তীয় কারণে। আর বেশির ভাগ সময়েই এটি ঘটে থাকে সেচের অভাবে। সেজন্য ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত শুকনো মৌসুমে  ১৫ দিন অন্তর পানি সেচ দিলে কচি ফল ঝরা, ফলন ও ফলের গুণগতমান বৃদ্ধি পায়। এছাড়া ফলের ফেটে যাওয়াও রোধ হয়। তবে আরেকটি কথা মনে রাখা দরকার, কাঁঠাল গাছের জাতভেদে কাঁঠাল ফল অনেক সময়ই ফেটে যায়। সেজন্য কাঁঠাল গাছের নিয়মিত পরিচর্যা ও বর্ষার আগে ও পরে সুষম সার প্রয়োগ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়।


মো. আল মামুন, গ্রাম : খঙ্গাপাড়া, উপজেলা : পঞ্চগড় সদর, জেলা : পঞ্চগড়
প্রশ্ন : বাঁধাকপির গোড়া পচে যায়, এর প্রতিকার কী?

উত্তর : বাঁধাকপির গোড়া পচে যায় ছত্রাকের আক্রমণের কারণে। রোগাক্রান্ত বাঁধাকপির গোড়ায় কার্বেনডাজিম গ্রুপের যেমন অটিস্টিন ১ গ্রাম এবং থিরাম ও কার্বক্সিল গ্রুপের যেমন প্রোভ্যাক্স ১ গ্রাম উভয়ই একসাথে ১ লিটার  পানিতে মিশিয়ে বিকাল বেলায় বাঁধাকপির গোড়ায় স্প্রে করতে হবে। এভাবে ৭ দিন পরপর ৩ বার স্প্রে করলেই আপনি সুফল পাবেন।  

 

মো. রুবেল হোসেন, গ্রাম : বেদেরপুকুর, উপজেলা : কাহারোল, জেলা : দিনাজপুর
প্রশ্ন : কৃষি জমিতে ডলোচুন ব্যবহারের নিয়ম কী?

উত্তর : জমির পুষ্টি উপাদানের সহজলভ্যতা বাড়ানোর জন্য বিশেষ কিছু ধরনের মাটিতে ডলোচুন প্রয়োগ করতে হয়। সেক্ষেত্রে মাটির পিএইচ মান জানা খুব জরুরি। পিএইচ মানের ওপর ভিত্তি করে ডলোচুনের মাত্রা নির্ধারণ করতে হয়। মাটির পিএইচ মান ৪.৫ থেকে ৫.৫ হলে প্রতি শতক জমিতে ৬ কেজি ডলোচুন প্রয়োগ করতে হয়। আর যদি মাটির পিএইচ মান ৫.৬ থেকে ৬.৫ হয় তবে প্রতি শতকে ডলোচুন লাগে ৪ কেজি। এছাড়া মাটির পিএইচ মান যদি ৫.৬ থেকে ৬.৫ হয় প্রতি শতক জমিতে ২ কেজি হারে ডলোচুন ব্যবহার করতে হয়। মাটির পিএইচ মান ৭ বা ৭ এর ওপরে গেলে ডলোচুন প্রয়োগ করতে হয় না।


মো. রবিউল ইসলাম, গ্রাম : তাহেরপুর, উপজেলা : বাগমারা, জেলা : রাজশাহী
প্রশ্ন : লাউ গাছের কাণ্ড ফেটে আঠা বের হচ্ছে, কী   করব?

উত্তর : লাউ গাছের কা- ফেটে গিয়ে আঠা বের হওয়া এ রোগকে গ্যামোসিস বা আঠা ঝরা রোগ বলে। এ রোগ দমনে বোর্দোমিকশ্চার ব্যবহার করলে সুফল মিলে। এটি তৈরির জন্য ১০ গ্রাম তুঁতে, ১০ গ্রাম চুন ও ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে তৈরি করতে হয়। এ মিকশ্চারটি তৈরির পদ্ধতিটি হচ্ছে। প্রথমে মাটি বা প্লাস্টিকের একটি পাত্রে ১০ গ্রাম চুন ভালোভাবে গুঁড়া করে নিতে হবে। এরপর আরেকটি পাত্রে ১০ গ্রাম তুঁতে ভালোভাবে গুঁড়া করে নিতে হবে। তারপর প্রত্যেকটি পাত্রে ৫০০ মিলি পানি মিশিয়ে ভালো করে দ্রবণ তৈরি করতে হবে। তারপর দুইটি পাত্রের দ্রবণটিকে আরেকটি পাত্রে ঢেলে একটা কাঠের কাঠি দিয়ে ভালো করে নাড়াচাড়া করে বিকাল বেলায় নিয়মমাফিক স্প্রে করতে হয়। বোর্দোমিকশ্চার তৈরির ১২ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবহার করতে হয়। নাহলে ভালো ফল পাওয়া যায় না। বোর্দোমিকশ্চার ব্যবহার করা ছাড়াও আপনি সানভিট/ব্লিটক্স প্রতি লিটার পানিতে ৪ গ্রাম ভালোভাবে মিশিয়ে রোগাক্রান্ত লাউ গাছে সঠিক নিয়মে স্প্রে করতে পারেন। তবেই আপনি কাক্সিক্ষত পানের ফলন পাবেন।


মো. রাশেদুল হাসান, গ্রাম : পাঠানতলা, উপজেলা : সিলেট সদর, জেলা : সিলেট
প্রশ্ন : শিম গাছের পাতাগুলো কোঁকড়া হচ্ছে এবং পাতায় হলুদ রঙের ছোপ ছোপ দাগ হচ্ছে, কীভাবে প্রতিকার করব?

উত্তর : শিম গাছে জাব পোকার আক্রমণ হলে পাতা কোঁকড়ে যায়। সেজন্য জাব পোকা দমনের জন্য ইমিডাক্লোরোপিড গ্রুপের  যেমন এডমায়ার  প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি মিশিয়ে বিকাল বেলায় স্প্রে করলে জাব পোকার আক্রমণ রোধ হবে। আর পাতায় হলুদ রঙের ছোপ ছোপ দাগের কারণটি হচ্ছে হলুদ মোজাইক ভাইরাসের আক্রমণ। সেক্ষেত্রে আক্রান্ত গাছ নষ্ট করে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ। এছাড়া ভবিষ্যতে ভালো শিমের ফলনের জন্য রোগমুক্ত গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করলে কিংবা ভালো উৎস হতে প্যাকেটজাত ভালোমানের বীজ ব্যবহার করলে অবশ্যই ভালো ফলন পাবেন।


লাল মিয়া, গ্রাম : দড়িচর, উপজেলা : হোমনা, জেলা : কুমিল্লা
প্রশ্ন : হাঁস দাঁড়াতে পারছে না। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। পালকগুলো এলোমেলো হয়ে আছে এবং ঝিমাচ্ছে। কী করব? পরামর্শ চাই।  

উত্তর : হাঁসের প্লেগ রোগ হয়েছে। এ রোগ প্রতিরোধে ৩ সপ্তাহ বা তার বেশি বয়সের সুস্থ হাঁসকে ডাকপ্লেগের ভ্যাকসিন দিতে হয়। তাহলে আপনি এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাবেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত পরামর্শ পাওয়ার জন্য সম্ভব হলে আপনার কাছের উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে  যোগাযোগ করতে পারেন।


হুমায়ুন কবির, গ্রাম : পূর্বভীষণদই, উপজেলা : হাতিবান্ধা, জেলা : লালমনিরহাট
প্রশ্ন : গরুর জ্বর ১০৬ ডিগ্রি। পায়ের ওপর ফুলে গেছে। খোঁড়াচ্ছে, পেট ফুলে গেছে। এর প্রতিকার কী?

উত্তর : গরুর বাদলা রোগ হয়েছে। পেনিসিলিন বা এমপিসিলিন ইনজেকশন দিতে হবে। সাথে অ্যান্টিহিস্টামিনিক ইনজেকশন প্রয়োগ করতে হবে। স্টোমাপ্লেক্স ভেট পাউডার খাওয়াতে হবে। এ রোগ প্রতিরোধে ৩ মাস থেকে ৩ বছর বয়স্ক পশুকে চামড়ার নিচে বাদলা রোগের টিকা প্রয়োগ করতে হবে।


আল্লামা ইকবাল, গ্রাম : সামাইর, উপজেলা : সাভার, জেলা : ঢাকা
প্রশ্ন : পুকুরে বেশি পরিমাণে গ্যাস ট্যাবলেট ব্যবহার করার কারণে মাছ মারা যাচ্ছে, কী করব?
উত্তর : সাধারণত রাক্ষুসে বা অচাষকৃত মাছ মারার জন্য ফসটক্সিন বা গ্যাস ট্যাবলেট ব্যবহার করা হয়। পুকুরের পানিতে এ গ্যাস ট্যাবলেট দেয়ার কারণে মরা মাছগুলো জাল টেনে উঠিয়ে ফেলতে হবে। না হলে এসব মরা মাছ পুুকুরের তলদেশে পচে গ্যাসের সৃষ্টি করবে। আপনার সমস্যাটি থেকে মুক্তি পেতে পুকুরে নতুন পানি ঢুকাতে হবে। পুকুরে শতকপ্রতি ৫০০ গ্রাম করে চুন প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া, টিএসপি, পটাশ ও কম্পোস্ট সার দিয়ে পুকুরের পানির রঙ সবুজ করতে হবে। তারপর পুকুরে পোনা মজুদ করতে হবে ।


মো.  বোরহান উদ্দিন, গ্রাম : মল্লিকপাড়া  উপজেলা : শিবগঞ্জ, জেলা : বগুড়া
প্রশ্ন : পানির ওপর লাল স্তর পড়েছে, কীভাবে দূর    করব?

উত্তর : এগুলো এক ধরনের প্ল্যাংটন। এগুলোকে কাপড় দিয়ে টেনে অথবা ধানের খড় বা কলার পাতা দিয়ে দড়ি তৈরি করে টানা দিয়ে লাল স্তরটি তুলে ফেলতে হবে। এ সময় খাবার এবং রাসায়নিক সার বন্ধ রাখতে হবে। এছাড়া পুকুরের পানিতে পর্যাপ্ত সূর্যালোক যেন পৌঁছাতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য পুকুর পাড়ে যদি বড় বড় গাছ থাকে সেগুলোর ডালপালা কেটে দিতে হবে।


কৃষির যে কোনো প্রশ্নের উত্তর বা সমাধান পেতে বাংলাদেশের যে কোনো জায়গা থেকে যে কোনো মোবাইল থেকে কল করতে পারেন আমাদের কল সেন্টারের ১৬১২৩ এ নাম্বারে। শুক্রবার ও সরকারি ছুটি ব্যতীত যে কোনো দিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত এ সময়ের মধ্যে। তাছাড়া কৃষিকথার গ্রাহক হতে বার্ষিক ডাক মাশুলসহ ৫০ টাকা মানি অর্ডারের মাধ্যমে পরিচালক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫ এ ঠিকানায় পাঠিয়ে ১ বছরের জন্য গ্রাহক হতে পারেন। প্রতি বাংলা মাসের প্রথম দিকে কৃষিকথা পৌঁছে যাবে আপনার ঠিকানায়।

 

কৃষিবিদ মো. তৌফিক আরেফীন*
*উপজেলা কৃষি অফিসার এলআর, সংযুক্ত কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা

সম্পাদকীয় পৌষ-১৪২১

বাংলাদেশ ঋতুবৈচিত্র্যের দেশ। এ দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি। রবি মৌসুম কৃষির জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এ মৌসুমে একদিকে যেমন বিভিন্ন শাকসবজি উৎপাদিত হয় অন্যদিকে বোরো মৌসুমের ধান উৎপাদনের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বোরো মৌসুমে উৎপাদিত ধানের ওপরই দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বহুলাংশে নির্ভরশীল। এজন্য কৃষির সার্বিক উন্নয়নে সুপরিকল্পিতভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এ দেশের সরকার, কৃষি গবেষক, সম্প্রসারণবিদ, কৃষিকর্মী, কৃষক-কৃষাণী সবাই। বোরো মৌসুমে ধানের ফলন কিভাবে বাড়ানো যায় সে প্রচেষ্টা আমাদের সবাইকে সমন্বিতভাবে অব্যাহত রাখতে হবে। পরিবর্তিত আবহাওয়ার সাথে তালমিলিয়ে ধানের চারা রোপণ, সার ও সেচ প্রয়োগ, রোগবালাই, পোকামাকড় দমন প্রভৃতি কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে হবে। ধানের ফলন বেশি পাওয়ার ক্ষেত্রে জাত নির্বাচন একটি বড় বিষয়। এ ক্ষেত্রে লবণাক্ত এলাকায় ব্রিধান৪৭ ও ব্রিধান৬১ এবং খরাপ্রবণ এলাকায় খরা সহনশীল জাতের ধান নেরিকা-১ চাষাবাদ করা যেতে পারে।
       চাষি ভাইয়েরা, আপনারা জানেন মসলা উচ্চমূল্যের ফসলগুলোর মধ্যে অন্যতম। আমাদের দেশে মসলার ঘাটতি থাকায় প্রতি বছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে মসলা আমদানি করতে হয়। কিন্তু দেশে মসলা চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বগুড়াতে একটি মসলা গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করে বিভিন্ন মসলা ফসল চাষের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ প্রচেষ্টার ফল হিসেবে বারি আলুবোখারা-১ নামে আলুবোখারার একটি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে যার ফলন হেক্টরপ্রতি ৭ থেকে ১০ টন পাওয়া যাচ্ছে। এটি আমাদের জন্য খুবই খুশির খবর। শুধু আলুবোখারাই নয়, অন্যান্য মসলা ফসল চাষ করে ইতোমধ্যেই যথেষ্ট সুফল পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। আমরা আশা করি অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ মসলা ফসল চাষে আরো অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
         সুপ্রিয় পাঠক, পৌষ মাস শীতের মাস। এ মাসে বাজারে প্রচুর শাকসবজি পাওয়া যায়। সবজি আমাদের শরীর গঠন ও পুষ্টিসাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকে। এজন্য সবারই পর্যাপ্ত পরিমাণে শাকসবজি খাওয়া প্রয়োজন। তবে শাকসবজি যেন বিষমুক্ত হয় সে ব্যাপারে কৃষক ভাইদের বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে। পারতপক্ষে কীটনাশকের ব্যবহার পরিহার করে শাকসবজি উৎপাদন করতে পারলে নিজের জন্যও মঙ্গল দেশের জন্যও মঙ্গল। অতএব, আসুন এ ব্যাপারে আমরা সবাই সচেতন হই, স্বাস্থ্যবান জাতি ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ে তুলি।
 

শিখি...করি...খাই

পটভূমি : বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণে লক্ষ্যের বিপরীতে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় ক্রমহ্রাসমান জমির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কাক্সিক্ষত ফসল উৎপাদন আজ সময়ের দাবি। কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণে আগামীর কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীর জন্য চাই মাঠ চাহিদাভিত্তিক বিজ্ঞানসম্মত, আধুনিক ও প্রায়োগিক কৃষি শিক্ষা কার্যক্রম। এজন্য কৃষি শিক্ষার আধুনিকায়ন ও হাতেকলমে প্রয়োগিক শিক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতায় ১৬টি কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে কৃষিবিষয়ক তথা ফসল উৎপাদন, মৎস্য চাষ ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ক প্রযুক্তিসমূহের তাত্ত্বিক, ব্যবহারিক ও প্রায়োগিক শিক্ষার পাশাপাশি দেশের কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনে মাঠ সংযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কৃষিক্ষেত্রে দক্ষ জনবল হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।  


শিখি-করি-খাই উদ্যোগের কোঅর্ডিনেটরের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং এটিআইয়ের প্রশিক্ষকদের নির্দেশনায় শিক্ষার্থীবৃন্দ ব্যবহারিক ও প্রায়োগিক কার্যক্রমে শাকসবজি, ফলমূলসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য ঝুঁকিবিহীন কৃষি পণ্য উৎপাদন করে আবাসিক হোস্টেল এবং নিজ বাড়িতে তাদের পুষ্টি চাহিদা পূরণ করছে।  সেসাথে হোস্টেলের খাদ্য ব্যয় হ্রাস করাসহ শিক্ষার্থীরা শ্রমভিত্তিক কার্যক্রমের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণের মাধ্যমে ‘সেমিস্টার টিউশন ফি’ অর্জন করে শিক্ষা ব্যয় হ্রাসের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। কৃষি ডিপ্লোমা পাঠ্যক্রমের আওতায় ব্যবহারিক ও প্রায়োগিক কার্যক্রমকে আরও গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষার্থীদের শ্রমভিত্তিক অংশগ্রহণে আত্মনির্ভরতা অর্থাৎ কৃষি প্রযুক্তি শেখা, হাতেকলমে করা এবং খাদ্য চাহিদা পূরণসহ আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার লক্ষ্যে কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ঝিনাইদহতে এক বিশেষ কার্যক্রম ‘শি-ক-খা’ (শিখি-করি-খাই) সাফল্যজনকভাবে পরিচালিত হচ্ছে।        

             
কার্যক্রমের উদ্দেশ্য  
সাধারণ উদ্দেশ্য

কৃষি ডিপ্লোমা পাঠ্যক্রমের আধুনিক প্রযুক্তিগুলোর তত্ত্বীয় জ্ঞান অর্জন, উৎপাদন সম্পর্কিত লব্ধ জ্ঞান হাতেকলমে প্রায়োগিক চর্চার মাধ্যমে স্বাস্থ্য ঝুঁকিবিহীন কৃষি পণ্য উৎপাদন এবং তা গ্রহণের মাধ্যমে পুষ্টিমান উন্নয়ন, শ্রমভিত্তিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়ে শিক্ষা ব্যয় হ্রাসসহ দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে উঠে আত্মনির্ভরশীল হওয়া।   


নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য
১. পাঠ্যক্রমের বিষয়াবলির তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন;
২. লব্ধ জ্ঞানের প্রায়োগিক প্রয়োগে স্বাস্থ্য ঝুঁকিবিহীন কৃষিপণ্য উৎপাদন;
৩. পুষ্টি চাহিদা পূরণ ও অতিরিক্ত আয় থেকে শিক্ষা ব্যয় পরিশোধ;
৪. দক্ষ জনশক্তি হিসেবে দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান এবং আত্মনির্ভরশীল হওয়া                                         
 

শি-ক-খা উদ্যোগ
কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, ঝিনাইদহতে অক্টোবর ২০১৩ থেকে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় এবং এ পর্যন্ত তিনটি  সেমিস্টারে মোট ২৭২ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছে। প্রতিটি এটিআইতে তত্ত্বীয় পাঠদানের পাশাপাশি  শিক্ষার্থীকে ব্যবহারিক বিষয়ে হাতেকলমে কাজ করানো হয়। বিগত অক্টোবর ২০১৪ মাসে অধ্যক্ষ ও মুখ্য প্রশিক্ষকদের যোগদানের পর ‘শি—-ক—-খা’ (শিখি-করি-খাই) উদ্যোগের পরিকল্পনা করা হয় এবং এর উদ্দেশ্য ও উপকারিতা বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে মতবিনিময় এবং মনস্তাত্বিকভাবে উদ্বুদ্ধ করার ফলে তাদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ এবং শ্রমভিত্তিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সদিচ্ছা দেখা যায়। ফলশ্রুতিতে এটিআই ঝিনাইদহতে বৃহত্তর আঙ্গিকে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে শিখি-করি-খাই শিরোনামে আত্মনির্ভরতা কার্যক্রম শুরু হয় এবং শিক্ষার্থীরা গ্রুপ ভিত্তিতে বরাদ্দকৃত প্লটে সবজি উৎপাদন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হয়। গ্রুপভিত্তিক প্লট ছাড়াও হোস্টেলে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীরাসহ ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থানকারী উদ্যোগী শিক্ষার্থীরা প্রশিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বাণিজ্যিকভাবে সবজি উৎপাদন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে উৎপাদিত ফসল হ্রাসকৃত মূল্যে হোস্টেলের খাদ্য তালিকায় যোগ করাসহ অতিরিক্ত সবজি বাজারজাতকরণের মাধ্যমে শিক্ষা সফর, খেলাধুলা, জ্ঞানচর্চাসহ শিক্ষা ব্যয় হ্রাসের জন্য আয় করছে।  


এ রকম আত্মনির্ভরশীল কর্মকাণ্ডের সম্পৃক্ততার কারণে তাদের মনোবল দৃঢ় হচ্ছে। এরই মধ্যে ইনস্টিটিউটের একমাত্র পুকুরটিকে শিক্ষার্থীদের মৎস্য চাষ ব্যবস্থাপনা পাঠ্যক্রমের আওতায় মাছ চাষের ব্যবহারিক ক্ষেত্র হিসেবে কাজে লাগিয়ে সেখানে  মনোসেক্স তেলাপিয়াসহ রুই, কাতল ও কার্পজাতীয় মাছের পোনা ছাড়া হয়েছে। প্রশিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণমূলক স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে মাছের চাষাবাদ কলাকৌশল শেখা এবং ব্যবহারিক কাজের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করে ভবিষ্যতে মাছ চাষের জন্য ক্ষুদ্র-মাঝারি খামার গড়ে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে। উৎপাদিত কৃষি পণ্য বিক্রয়ের অর্থ বিধিমোতাবেক স্বেচ্ছাশ্রমে অংশগ্রহণের আনুপাতিক হারে সব শিক্ষার্থীর (সাধারণ উপকারভোগী এবং অংশগ্রহণকারী উপকারভোগী) নামে জমা করা হয়, যা ব্যবহার করে শিক্ষা সফর, খেলাধুলার সামগ্রী ক্রয় এমনকি শিক্ষার্থীদের আংশিক ‘সেমিস্টার টিউশন ফি’ পরিশোধে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়াও এ উদ্যোগে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে নিজ ক্যাম্পাসে পরিছন্নতা, উন্নয়ন, বৃক্ষরোপণসহ অন্যান্য এলাকায় বৃক্ষরোপণ, সবুজায়ন, সামাজিক বনায়ন ইত্যাদি সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।  


অর্থ ব্যবহার
শি-ক-খা কার্যক্রমে প্রাথমিকভাবে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক উপকরণ খাত হতে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। মাছ চাষসহ অন্যান্য কৃষি পণ্য উৎপাদনে অধিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে ইনস্টিটিউটে কর্মরত প্রশিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী যৌথভাবে অর্থ জোগান দিতে সম্মত হয়েছেন। এছাড়াও বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের নিয়মানুযায়ী আবর্তক তহবিল ব্যবহার করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে জমি, স্থাপনা বা পুকুর ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারি নিয়মানুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া  হবে। এ ধরনের মহতী উদ্যোগে যে কোনো ব্যক্তি, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল (ঈঝজ) হতে সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে। এছাড়াও ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরা নিজস্ব তহবিল গঠন করে তা ব্যবহার করতে পারে। এমনকি নার্সারি কার্যক্রম, উচ্চমূল্য ফসল উৎপাদন ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেও ব্যয় নির্বাহ করা যেতে পারে।  


শি-ক-খা উদ্যোগ পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা
অধ্যক্ষ, এটিআই ঝিনাইদহ জনাব হানিফ মোহাম্মদ পদাধিকার বলে শি—-ক—-খা উদ্যোগের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি এ উদ্যোগকে সাফল্যম-িত করার জন্য সার্বিকভাবে পরামর্শ, সহযোগিতা ও বিধি মোতাবেক পৃষ্ঠপোষকতা করেন। ইনস্টিটিউটের মুখ্য প্রশিক্ষক জনাব মাহফুজ হোসেন মিরদাহ এ উদ্যোগের কোঅর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি গৃহীত কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সাধন ও তা সাফল্যজনকভাবে সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ প্রদান করেন।  তিনি এ উদ্যোগের নতুন নতুন কার্যক্রম চিহ্নিতসহ তা একেকটি প্রকল্প হিসেবে শুরুর জন্য পরিকল্পনা প্রণয়নে সার্বিক সহযোগিতা করেন। একেকটি কার্যক্রম প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করা হলে তা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য এটিআইয়ের প্রশিক্ষকদের মধ্য হতে একজনকে দায়িত্ব দেয়া করা হয়। প্রধান পৃষ্ঠপোষকের নেতৃত্বে সব প্রশিক্ষকের সমন্বয়ে একটি  ‘শি-ক-খা  পরিচালনা পরিষদ’  উদ্যোগটির সব কার্যক্রম পরিচালনার নীতিগত ও অর্থনৈতিক অনুমোদন প্রদান করেন। পরিচালনা পরিষদ একাধিক প্রশিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যে কোনো প্রকল্প ব্যবস্থাপনার জন্য দায়িত্ব প্রদান করতে পারবেন। প্রকল্প সমাপ্তের পর প্রকল্পে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশিক্ষক আয়-ব্যয় হিসাবপূর্বক লভ্যাংশ নির্ধারণ করবেন এবং পরিচালনা পরিষদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত হিসেবে লভ্যাংশের অর্থ বণ্টন করবেন এবং সংশ্লিষ্টদের অবগত করবেন। বিভিন্ন সময়ে ‘শি-ক-খা  পরিচালনা পরিষদ’ এর সিদ্ধান্তের আলোকে উদ্যোগটি পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা যেতে পারে।      


ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
কৃষি ডিপ্লোমা পাঠ্যক্রমের বিন্যাস অনুযায়ী আগামীতে শি-ক-খা  কার্যক্রমে পাখি ও মুরগি পালন, গরু মোটাতাজাকরণ, ছাগল পালন, মাশরুম চাষ, নার্সারি স্থাপন, কেঁচো কম্পোস্ট ইত্যাদি কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি কার্যক্রমকে একেকটি প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করে ক্লাসের পূর্বে বা পরে দিনের নির্দিষ্ট সময়ে প্রশিক্ষকদের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছাশ্রমে অংশগ্রহণ করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে এবং উপকারভোগী হিসেবে মুনাফার একটি অংশ তাদের নামে জমা হতে থাকবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা অভিজ্ঞতা লাভ করে নিজেদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারবে। এভাবে সব শিক্ষার্থী পাঠ্যক্রমের সব বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির সাথে সাথে পুষ্টিমান উন্নয়ন ও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়ে ‘সেমিস্টার টিউশন ফি’ পরিশোধের প্রয়োজনীয় অর্থের একটি বিরাট অংশ প্রদানে সমর্থ হবে বলে আশা করা যায়। অত্র ইনস্টিটিউটে এ কার্যক্রমের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ডিএইর আওতাধীন অন্যান্য সরকারি এটিআইগুলোতে এ উদ্যোগ চালু করা যেতে পারে। বর্তমানের সীমাবদ্ধতাগুলো অতিক্রমে বৃহত্তর আকারে বিভাগীয় উদ্যোগের পাশাপাশি বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডসহ অন্যান্য আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় ‘শি—-ক—-খা’ কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ঝিনাইদহর কৃষি ডিপ্লোমা পাঠ্যক্রমের শিক্ষার্থীদের আত্মনির্ভরতা উদ্যোগকে সাফল্যের শিখরে নিয়ে যেতে পারে।

* কোঅর্ডিনেটর (শিখি-করি-খাই) এবং মুখ্য প্রশিক্ষক, এটিআই, ডিএই, ঝিনাইদহ, ফোন-০১৫৫২৩৪০১৮৮

কামরাঙা শিম

কামরাঙা শিম বরবটি ও দেশি শিমের মতো লতা জাতীয় উদ্ভিদ। এ শিম গাছের ফুল, ফল, লতা, পাতা, শিকড় সব অংশই খাওয়া যায়। এ শিমের আদি স্থান পশ্চিম আফ্রিকা। কারও মতে এ সবজি ভারতে প্রথমে চাষ শুরু হয়। দক্ষিণ ও পূর্ব দক্ষিণ এশিয়ায় কামরাঙা শিম আবাদ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। এছাড়া মিয়ানমার, মাদাগাসকার, পাপুয়া নিউগিনি, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় বহু আগে থেকেই এ শিমের অস্তিত্ব দেখা গেছে।  সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বেশি উচ্চতা (১৫০০-২৫০০ ফুট) বিশিষ্ট স্থানে এ সবজি আবাদের জন্য বেশি উপযোগী। এ সুবিধার কারণে দেশের পার্বত্য জেলাগুলোতে কামরাঙা শিমের আবাদ প্রচলন বেশি। দেশের উত্তরাঞ্চলেও কোনো কোনো পরিবার সীমিত আকারে এ শিম আবাদ করে। বেশি আর্দ্রতা বিশিষ্ট উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া এ শিম চাষের জন্য বেশি ভালো।
এ সবজি আবাদে পানির প্রয়োজনীয়তা কম হওয়ায় অপেক্ষাকৃত শুকনা এলাকায় কামরাঙা শিম চাষের প্রচলন বেশি। এ ফসল মূলত বসতবাড়ি ও তদসংলগ্ন এলাকায় পরিবারের চাহিদা মেটাতে সীমিত আকারে আবাদ করা হয়। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে অন্যান্য সবজির মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিসমৃদ্ধ এ কামরাঙা শিম আবাদ প্রবণতা বেশি দেখা যায় না। ডাল জাতীয় ফসলের মতো জমিতে নাইট্রোজেন যোগ করার ক্ষমতা এ সবজির আছে।  


পুষ্টিমান  ও খাবার উপযোগী অংশ :  কামরাঙা শিম অতি পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ সবজি। মানুষসহ সব প্রাণিকুলের জন্য এ শিম অতি উপাদেয় ও পুষ্টিকর। কচি পাতা সুস্বাদু, পুষ্টিকর শাক হিসেবে খাওয়া যায়। এ শিমের হালকা নীল ফুল সালাদ ও সবজি হিসেবে খেতে অতি চমৎকার। কচি পাতা শুকিয়ে পাউডার করে চায়ের বিকল্প পানীয় হিসেবে ব্যবহার প্রচলন অনেক দেশেই আছে। চার কোণা বিশিষ্ট কচি শিম লম্বায় ১.র্৫র্ -র্২র্  (৪-৫ সেন্টিমিটার) হলে তা সংগ্রহ করে সবজি হিসেবে অতি  সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। সবজি হিসেবে ব্যবহার উপযোগী একেকটা শিমের ওজন প্রায় ৫০-৬০ গ্রাম।  পরিপক্ব শিম লম্বায় র্৫র্ -র্৬র্  ইঞ্চি (১৫-২০ সেন্টিমিটার) হতে পারে। প্রতিটা শিমে ৫-৭টা বীজ থাকে। পুষ্ট বীজ সংগ্রহ করে তা মটরশুঁটি বা শিম বীজের মতো সবজি হিসেবে মুখরোচক ও  উপাদেয়। পুষ্ট কামরাঙা শিমের বীজ শুকিয়ে পাউডার করে কফির বিকল্প পানীয় হিসেবে পান করার প্রচলন অনেক দেশেই আছে। এ গাছের শিকড় মিষ্টি আলুর মতো টিউবার বা মূল গঠন করে। এ আলু বা মূল বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সবজি হিসেবে ও চিপস তৈরি করে আহার করার সুবিধা আছে। গাছের ফুল ও কচি ফল সবজি হিসেবে নিয়মিত সংগ্রহ করা হলে শিকড়ের আকার বেশি বড় হয়। তাতে মূল বা আলুর ফলন বেশি হয়। শাকসবজিতে সাধারণত প্রোটিনের পরিমাণ কম। তবে কামরাঙা শিম গাছের সব অংশই প্রোটিনের উপস্থিতি তুলনায় অনেক বেশি। বীজে প্রোটিনের পরিমাণ সয়াবিনের মতো অত্যাধিক (৩০-৩৯%)। এতে আরও রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণ কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট, ভিটামিনস ও মিনারেলস। সোডিয়াম ও কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বেশি থাকে এবং এ সবজি কোলেস্টেরলমুক্ত। অন্যান্য প্রজাতির শিমের চেয়ে ক্যালসিয়ামের উপস্থিতি এতে খুব বেশি, যা হাড় ও দাঁতের সুস্বাস্থ্যের জন্য অতি উপকারী। এ শিমের শিকড়েও প্রচুর প্রোটিন থাকে যা অন্য কোনো প্রকার আলু বা টিউবার জাতীয় ফসলে দেখা যায় না। টিউবার বা শিকড়ে প্রোটিনের উপস্থিতি প্রায় ২০%।  নানা পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ হওয়ার কারণে এ সবজি বিভিন্ন হারবাল মেডিসিন তৈরির কাজে ব্যবহার প্রচলন বেশি। এ ফসল পুষ্টিকর ‘ফডার’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটি লিগুমিনাস দলীয় ফসল হওয়ার কারণে জমির স্বাস্থ্য রক্ষার প্রয়োজনে ফসল চক্রে এ শিম আবাদে প্রাধান্য  অন্যান্য দেশে বেশি দেয়া হয়।


বৈশিষ্ট্য : এটা বরবটি বা দেশি শিমের মতো লতানো গাছ। ফলের আকৃতি চার পাখা বা শিরা বিশিষ্ট যা দেখতে অনেকটা কামরাঙা ফলের মতো। সম্ভবত এজন্যই কামরাঙা শিম নামে পরিচিত। এ শিম চওড়ায় কম (২-৩ সেন্টিমিটার) এবং লম্বায় বেশি প্রায় ৮ ইঞ্চি (২০ সেন্টিমিটার)। একটা পূর্ণাঙ্গ শিম গাছ প্রায় ১০-১৫ ফুট লম্বা হয়। প্রতি গাছে মৌসুমে ৪০-৫০টা ফল ধরে। দিনের পরিধি অপেক্ষাকৃত ছোট হলে (১০-১১ ঘণ্টা) গাছে ফুল-ফল ধরা আরম্ভ করে। অনুকূল মৌসুমে বীজ রোপণের ৬-৭ সপ্তাহ পর থেকেই গাছে ফুল ধরা আরম্ভ করে। ফুল ও গাছের আকৃতি দেখতে সুন্দর হওয়ার কারণে সৌন্দর্য আহরণেও অনেকেই বাড়ির গুরুত্বপূর্ণ অংশে চাষ করে থাকে। ফুল ফোটার ১০-১২ দিন পর কচি শিম আহার উপযোগী হয়। বয়স্ক শিম শক্ত হলে সবজি হিসেবে খাওয়া যায় না। তবে পুষ্ট শিম থেকে বীজ বের করে মটরশুঁটির মতো বিভিন্নভাবে খাওয়া করা যায়। লতানো গাছে ফুল-ফল ধরা আরম্ভ করলে তা থেকে এক টানা পর্যায়ক্রমে প্রায় ৩ মাস পর্যন্ত সবজি সংগ্রহ করা যায়। আফ্রিকাতে বিভিন্ন বাগানে অয়েল পাম, পিচ ফল, কোকো, কাজুবাদাম, রাবার আচ্ছাদন ফসল (ঈড়াবৎ পৎড়ঢ়) হিসেবে এ সবজির আবাদ জনপ্রিয়তা বেশি। তাতে আগাছা দমনসহ, লতা-পাতা ও শিকড় পচে বাগানে জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়ে। এছাড়া এ শিম জমিতে রাইজোবিয়াম (নাইট্রোজেন) সার যোগ করতে সামর্থ্য হয়। এ ব্যবস্থায় জমিতে রস সংরক্ষিত থাকে, পানি সেচ কম লাগে, সর্বোপরি বাগানে গাছের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে। আমাদের দেশেও ফল বাগানে এ ফসল অনুরূপভাবে আবাদ করে একই সুফল আহরণ করা দরকার।   


জাত :  এ দেশে কামরাঙা শিমের জাত উদ্ভাবনের উদ্যোগ তেমন নেই। তবে বারি কামরাঙা শিম -১ নামে একটা জাত অবমুক্ত করেছে। দেশি জাতগুলো মূলত আলোকসংবেদনশীল। তাই এ সবজি হেমন্ত, শীত ও বসন্তকালে দিনের আকার ছোট থাকা অবস্থায় চাষ করা হয়। বিদেশে নানা প্রজাতির এ শিম দেখা যায়। কোনো কোনো বিদেশি জাত বড় দিনেও অর্থাৎ গ্রীষ্ম-বর্ষায় ফুল-ফল ধরে যা এদেশে আবাদ প্রচলন ব্যবস্থা নেয়া দরকার। তাতে বছর ধরে এ গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিকর সবজি অসময়ে প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে।


চাষ পদ্ধতি :  বরবটির বা দেশি শিমের মতো সারি করে বীজ বপন করে আবাদ করা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রতি সারির মাটি ২০-২৫ সেন্টিমিটার গভীর করে কুপিয়ে মাদা তৈরি করে নেয়া প্রয়োজন। বেশি ফলন পেতে তৈরি মাদায় যথেষ্ট পরিমাণ জৈব সার মিশিয়ে নেয়া ভালো। অন্য ফসলের মতো কামরাঙা শিম চাষের জন্য খুব বেশি উর্বর জমির প্রয়োজন হয় না। অনুর্বর বেলে বা এঁটেল মাটিতেও এ ফসল ভালো ফলে। আবাদে খুব একটা বেশি সার প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না। তবে পানি নিষ্কাশন সুবিধাযুক্ত উঁচু জমি এ সবজি আবাদের জন্য বেশি ভালো। ৩০-৪৫ সেন্টিমিটার চওড়া এবং ২.৫৪ সেন্টিমিটার লম্বা মাদায় ৫০০ গ্রাম করে ইউরিয়া, টিএসপি এবং এমওপি মিলে প্রায় ১৫০০ গ্রাম সার জমি তৈরি কালে প্রয়োগ করা হলে ফলন ভালো হয়। চারা গাজানোর প্রায় ৩ সপ্তাহ পর ২০ দিনের ব্যবধানে এতে  আরও ৫০০ গ্রাম ইউরিয়া সার ২-৩ কিস্তিতে উপরিপ্রয়োগ করা ভালো। ঠিকমতো আলো-বাতাস পায় এমন স্থানে এ সবজির ফলন ভালো হয়। উন্মুক্ত আধা ছায়াতেও এ সবজি ফলানো যায়। তবে বেশি ছায়ায় ফসল ভালো হয় না। সাধারণত পরিবারের চাহিদা মেটাতে এ সবজির আবাদ করার প্রচলন বেশি। পার্বত্য জেলার অধিকাংশ পরিবার এ ধরনের শিম চাষে বেশি আগ্রহী। তারা নিজের চাহিদা পূরণ করে অতিরিক্ত শিম বিক্রি করে বাড়তি আয় করে থাকে।


বীজ বপন : বীজের আবরণ খুব শক্ত হওয়ায় অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা কম (৪০-৫০%)। এজন্য বীজ বপনের আগে তা ২০-৩০ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে নেয়া উত্তম। সাধারণত ৮-১০  ইঞ্চি (২০-৩৫ সেন্টিমিটার) দূরত্বে র্১র্  ইঞ্চি (২-৩ সেন্টিমিটার) গভীরতায় বীজ বপন করা হয়। এক সারি হতে অন্য সারির দূরত্ব হবে ৩-৪ ফুট (প্রায় এক মিটার)। বীজ বপনের ৫-৭ দিনের মধ্যে তা গজিয়ে দ্রুত বাড়তে থাকে। এ ভাবে ৪-৫ সপ্তাহ বৃদ্ধির পর অনুকূল আবহাওয়ায় দিনের পরিধি কমে (১০-১১ ঘণ্টা) গেলে গাছে ফুল ফোটা আরম্ভ করে। কাঁকরোলের মতো কামরাঙা শিমের শিকড় থেকেও চারা তৈরি করা হয়। মৌসুম শেষে অনেকে বয়স্ক গাছের শিকড় সংগ্রহ করে রেখে দেয় পরে শরৎ-হেমন্ত কালে তা পুনরায় বীজের বিকল্প হিসেবে রোপণ করে থাকে।  


অন্য ফসলের মতো এ সবজি মাঠ ফসল হিসেবে আবাদ প্রচলন নেই। বাড়ির আঙিনায় শিম, বরবটি, শশা, করলার মতো ১.৫-২.০ সেন্টিমিটার লম্বা কাঠির বাউনি বা ছোট আকারের মাচা তৈরি করে তাতে উঠিয়ে আবাদ ব্যবস্থা নেয়া হয়। সীতাকু- মডেলে কাঠি বা কঞ্চি খাঁড়া করে দিয়ে বাউনির ব্যবস্থা করে খুব সহজেই এ সবজি চাষ করা যায়। এ সবজির লতা, ফুল, ফল সবই দেখতে সুন্দর হওয়ায় এবং সৌন্দর্য ও ফলন উভয় প্রাপ্তির লক্ষ্যে বাগানোর গুরুত্বপূর্ণ অংশে অনেকে এ সবজি আবাদ ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।


পরিচর্যা : বীজ বপনের পর মাটি বেশি শুকনা হলে তা গজাতে বিলম্বিত হতে পারে। তাই মাটিতে রসের অভাব হলে ২-৩ দিনের ব্যবধানে হালকাভাবে সেচ দেয়া ভালো। চারা গজিয়ে এক ফুট লম্বা হলে আগা ভেঙে দেয়া প্রয়োজন। তাতে শাখা-প্রশাখার সংখ্যা বাড়বে, ফুল-ফল বেশি দিবে। লতানো গাছে বাউনি হিসেবে ২.৪-৩.০ সেন্টিমিটার লম্বা কাঠি দেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি দুইসারির কাঠির আগা বেঁধে দিলে উভয় দিক থেকে বাড়ন্ত লতা সুন্দরভাবে বাড়তে সহায়ক হয়। বিকল্প ব্যবস্থায় করলা, বরবটি, শশার মতো কম চওড়া বিশিষ্ট মাচা দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। শিম গাছের গোড়ার মাটিতে রসের অভাব হলে মাঝে মাঝে হালকা সেচ দেয়া প্রয়োজন। তবে খেয়াল রাখতে হবে গাছের গোড়ায় কোনো ক্রমেই যেন পানি  না জমে। এজন্য জমিতে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা রাখা জরুরি। জমি সব সময় নিড়ানি দিয়ে আগাছামুক্ত ও মাটিতে চট ধরলে মাটি আগলা করে দেয়া দরকার। এ শিমে পোকা ও রোগের উপদ্রব খুবই কম।


ফলন : প্রতি গাছ থেকে প্রায় ৪০-৬০টা কচি সবজি আহরণ করা যায় এবং সংগৃহীত এ গাছের সবজির পরিমাণ প্রায় ৪-৫ কেজি হয়। এ ব্যবস্থায় প্রতি পরিবারে সীতাকু- মডেলে স্বল্প পরিসরে ২০-৩০টা  এ শিম গাছ রোপণ করা হলে তাতে একেক পরিবারের জন্য প্রায় ১০০-১২৫ কেজি মৌসুমে সবজির প্রয়োজনীয়তা মেটানো যায়।
এ সবজির পাতা, ফুল, ফল, বীজ, শিকড়, সবই অতি পুষ্টিকর ও আহার উপযোগী এবং ভেষজ ঔষধিগুণসমৃদ্ধ  হওয়ার কারণে এ ফসলের সুফল আহরণ করা প্রত্যেকেরই কর্তব্য।  পুষ্টিসমৃদ্ধ এ শিম প্রতিটা বসতবাড়িতে এবং বাড়ির ছাদে আবাদের জন্য অতি উপযোগী। বহুবিদ ব্যবহার উপযোগী মানুষ ও পশুপাখির জন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ এ গুরুত্বপূর্ণ সবজি সম্প্রসারণ করার দ্রুত উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

এম এনামুল হক*
*মহাপরিচালক (অব.), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং সদস্য বিশেষজ্ঞ টিম (অচঅ), কৃষি মন্ত্রণালয়

প্রশ্নোত্তর (পৌষ ১৪২৩)

মো. আফজাল হোসেন
গ্রাম : বরগাছি
উপজেলা : ভোলারহাট
জেলা : চাঁপাইনবাবগঞ্জ

প্রশ্ন : কুল গাছের পাতার ওপর সাদা সাদা ধূসর পাউডার দেখা যায়। গাছের পাতা ও কচি ফল ঝরে যাচ্ছে। কী করলে উপকার পাব?
উত্তর : কুল গাছের পাউডারি মিলডিউ একটি মারাত্মক রোগ। এক ধরনের ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়। এ রোগের দ্বারা গাছের পাতা, ফুল ও কচি ফল আক্রান্ত হয়। উষ্ণ ও ভিজা আবহাওয়ায় বিশেষ করে মেঘাচ্ছন্ন অবস্থায় এ রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে। এজন্য বাগান নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন  রাখতে হবে। সুষম সার ব্যবহার করা প্রয়োজন। গাছের পরিত্যক্ত অংশ সংগ্রহ করে নষ্ট করতে হবে। গাছে ফুল দেখা দেয়ার পর থিওভিট, সালফোলাক বা কুমুলাস ডিএফ নামক ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম অথবা টিল্ট ২৫০ ইসি প্রতি লিটার  পানিতে ০.৫ মিলিলিটার মিশিয়ে ১০ থেকে ১৫ দিন পর পর ২ থেকে ৩ বার স্প্রে করতে হবে।
নাহিদ পারভেজ
গ্রাম : বোয়ালমারি
উপজেলা : ভাঙ্গুরা
জেলা : পাবনা  

প্রশ্ন : ধান গাছের ছড়ায় ধানগুলো হলদে কমলা রঙ হয়ে বলের মতো হয়ে গেছে। সমাধান কী?
উত্তর : এটি ধানের ছত্রাকজনিত রোগ। ধানের ‘লক্ষ্মীর গু’ নামে পরিচিত। ধান পাকার সময় এ রোগ দেখা যায়। চিকন ও সরু জাতীয় আমন ধানে এ রোগ বেশি হয়। এ ছত্রাক ধানের বাড়ন্ত চালকে নষ্ট করে বড় গুটিকা সৃষ্টি করে। এ রোগ ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো রোগাক্রান্ত শীষ তুলে ফেলা। মাত্রাতিরিক্ত ইউরিয়া সার ব্যবহার না করা। শীষ বের হওয়ার সময় ছত্রাকনাশক বেনলেট (০.২ শতাংশ), টপসিন এম (০.২ শতাংশ), ব্যাভিস্টিন (০.১ শতাংশ) অনুমোদিত মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে। এটি বীজবাহিত রোগ তাই বীজ বপন করার আগে প্রোভেক্স বা ব্যাভিস্টিন দিয়ে বীজ শোধন করে নিতে হবে।
মো. আসাদ
গ্রাম : ধলবাড়িয়া
উপজেলা : কালীগঞ্জ
জেলা : সাতক্ষীরা

প্রশ্ন : ধানের শীষের গোড়া কেটে দিচ্ছে। শীষ শুকিয়ে সাদা হয়ে যাচ্ছে। কী করণীয়?
উত্তর : এটি ধানের শীষ কাটা লেদা পোকার জন্য হয়। এটি পাতার পাশেও কেটে ফেলে। এর জন্য  ক্ষেতে ডাল পুঁতে পাখির বসার ব্যবস্থা  করতে হবে। এ পদ্ধতিকে ‘পার্চিং’ বলে। আক্রমণ কমানোর জন্য জমিতে সেচ প্রয়োগ করতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে কীটনাশক কার্বারিল অথবা সেভিন প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম পরিমাণ মিশিয়ে ৭ থেকে ১০ দিন পরপর ৩ বার স্প্রে করতে হবে। ধান কাটার পর নাড়া পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
আবদুল কাইয়ুম
গ্রাম : সকদিরামপুর
উপজেলা : ফরিদগঞ্জ,
জেলা: চাঁদপুর

প্রশ্ন : আম গাছের পাতার চারপাশ থেকে পুড়ে যাচ্ছে। কী করণীয়?
উত্তর : এটি আম গাছের একটি ছত্রাকজনিত রোগ। পাতায় প্রথমে হলুদ দাগ হয় এবং পরে হালকা বাদামি রঙ ধারণ করে। এটি প্রতিরোধের জন্য আক্রান্ত অংশ সংগ্রহ করে পুঁতে ফেলতে হবে। আক্রান্ত গাছে ১ শতাংশ বোর্দমিক্সচার বা ৪ গ্রাম সানভিট অথবা ২ গ্রাম রিডোমিল গোল্ড প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
মো. জাকির হোসেন
গ্রাম : খড়রিয়া
উপজেলা : কালীয়া
জেলা : নড়াইল

প্রশ্ন : আখের কচি ডগার মাজরা পোকা কিভাবে দমন করব?
উত্তর : এ পোকা আখের চারার বয়স যখন ১ থেকে ৩ মাস তখন কা- ছিদ্র করে ভেতরে প্রবেশ করে। ফলে চারার মাঝ ডগা মরে যায়, যাকে ‘মরা ডিগ’ লক্ষণ বলে। মরা ডিগ টান দিলে সহজে উঠে আসে। এদের আক্রমণে একটি  ডগায় ৩ থেকে ৪টি ছিদ্র দেখা যায়। এরা একটি চারা ধ্বংস করার পর অন্য চারায় আক্রমণ করে।
দমন ব্যবস্থা : আগাম আখ চাষ করা, ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে আখ রোপণ শেষ করতে হবে; নালা পদ্ধতিতে আখ চাষ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়; চারার বয়স ১ থেকে ২ মাস  হলে গোড়ায় অল্প করে মাটি তুলে দিতে হবে; আলোক ফাঁদ পেতে মথ ধ্বংস করতে হবে; আক্রান্ত চারাগাছ মাটির ৫.০ থেকে ৭.৫ সেন্টিমিটার নিচ হতে কেটে পানিতে ফেলে বা আগুনে পুড়িয়ে নষ্ট করতে হবে; আখের জমিকে আগাছামুক্ত রাখতে হবে; আক্রমণের তীব্রতা বেশি হলে ডায়াজিনন বা লেবাসিড প্রতি লিটার পানিতে ০.৭ মিলিলিটার পরিমাণ মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
মুকুন্দ চন্দ্র দাশ
গ্রাম : তেলকুড়ি
উপজেলা : পাঁচবিবি
জেলা : জয়পুরহাট  

প্রশ্ন : মাসকলাইয়ের পাতার দাগ রোগ কিভাবে দমন করব?
উত্তর : মাসকলাইয়ের পাতার দাগ রোগ ছত্রাকজনিত একটি রোগ। আক্রান্ত পাতার উপর ছোট ছোট লালচে বাদামি গোলাকৃতি হতে ডিম্বাকৃতির দাগ পড়ে। আক্রান্ত অংশের কোষগুলো শুকিয়ে যায় এবং পাতার ওপর ছিদ্র হয়ে যায়। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে সম্পূর্ণ পাতাই ঝলসে যায়। দমন ব্যবস্থা : আক্রামণ শুরু হলে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম পরিমাণ কার্বেনডাজিম ছত্রাকনাশক মিশিয়ে ১২ থেকে ১৫ দিন পর পর ২ থেকে ৩ বার স্প্রে করতে হবে; রোগ প্রতিরোধী জাতের (যেমন- বারি মাস-১, বারি মাস-২ ও বারি মাস-৩) চাষ করতে হবে; এছাড়াও ফসল উৎপাদনে স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এতে রোগের প্রকোপ অনেক কমে যাবে।
রাসেল হক
গ্রাম : কাঁঠালিয়া
উপজেলা : মির্জাপুর
জেলা : পটুয়াখালী  

প্রশ্ন : হাঁস-মুরগির টিকা দেয়ার বিষয়ে জানতে চাই।
উত্তর : রানীক্ষেত ভ্যাকসিন : ৫ থেকে ৭ দিন বয়স ১টি ভায়াল ৬ মিলিমিটার পানির সঙ্গে মিশিয়ে ২-৩ ফোঁটা করে প্রতি বাচ্চা। ২১ দিন বয়স পুনরায় একই পদ্ধতিতে ২ বার দিতে হবে। ৬০দিন বয়স এক এ্যাম্পুল জউঠ ১০০ সিসি পানির সাথে মিশিয়ে ১ সিসি করে রানের মাংসে ইনজেকশন দিতে হবে। প্রতি ৬ মাস পর পর পুনরায় দিতে হবে। ডাকপ্লেগ ভ্যাকসিন : ৩৫ দিন বয়সের বাচ্চা ১টি ভায়াল ১০০ সিসি পানির সঙ্গে মিশিয়ে ১ সিসি করে বুকে বা রানে পুশ করতে হয়। ৬০ দিন বয়সে পুনরায় ২য় বার। ৬ মাস পর পর নিয়মিত দিতে হবে। কলেরা ভ্যাকসিন : ৩ থেকে ৪ মাস বয়স ১০০ সিসি কলেরা ভ্যাকসিনের বোতল হতে ১ সিসি করে রানের মাংসে ইনজেকশন দিতে হবে। ৬ মাস পর পুনরায়  দিতে হবে। গামবোরো ভ্যাকসিন : ৭ থেকে ১৪ দিন বয়স এক এ্যাম্পুল ৫০০ থেকে ১০০০ সিসি পানির সঙ্গে মিশিয়ে ৩ থেকে ৪ ফোঁটা করে মুখ দিয়ে খাওয়াতে হবে। ২৮ থেকে ৩০ দিন বয়স দ্বিতীয় বার এক এ্যাম্পুল ৫০০ থেকে ১০০০ সিসি পানির সঙ্গে মিশিয়ে ৩ থেকে ৪ ফোটা করে মুখ দিয়ে খাওয়াতে হবে। পক্স ভ্যাকসিন : ৩৫ দিন বয়স এক এ্যাম্পুল ৬ সিসি পানির সঙ্গে মিশিয়ে পাখার নিচে সুঁইয়ের মাধ্যমে ৩ থেকে ৪ বার খোঁচা মেরে দিতে হবে।
তৌহিদ হাসান
গ্রাম : হাজীপাড়া
উপজেলা : গৌড়নদী
জেলা : বরিশাল  

প্রশ্ন : গরুকে পাগলা কুকুর কামড় দিয়েছে। কী করণীয়?
উত্তর : কামড়ের ৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যে জধনরংরহ ইনজেকশন ১০ মিলিলিটার করে প্রথম দিন শরীরের যে যে কোনো জায়গার ৪ স্থানে ৪ সিসি করে ৪টি এবং ৭ম দিনে ৩ সিসি করে ৩ স্থানে ৩টি ইনজেকশন দিতে হবে। পুনরায় ২১তম দিনে ৩ স্থানে ৩ সিসি করে মাংসে ইনজেকশন দিতে হবে।
কামরুল ইসলাম
গ্রাম : নগরঘাট
উপজেলা : তালা
জেলা : সাতক্ষীরা

প্রশ্ন : বাগদা চিংড়ির হোয়াইট স্পট ডিজিস বা সাদা ক্ষত রোগ হলে কী করণীয়?
উত্তর : এটি ভাইরাসজনিত রোগ। প্রতিকারের চেয়ে  প্রতিরোধ করা ভালো। চাষের আগে সঠিক নিয়মে ঘের প্রস্তুত করতে হবে। তলদেশের পচা কাদা মাটি তুলে ফেলতে  হবে। প্রয়োজন অনুসারে চুন ও ব্লিচিং পাউডার দিয়ে (শতকে ৫০০ গ্রাম) মাটি ও পানি শোধন করতে হবে; ঘন ফিল্টার নেটের মাধ্যমে ছেঁকে পানি প্রবেশ করাতে হবে যেন ভাইরাসবহনকারী প্রাণী বা তার ডিম প্রবেশ করতে না পারে; সুস্থ সবল জীবাণুমুক্ত পোনা সঠিক পরিমাণে ছাড়তে হবে; ব্যবহৃত জাল, পাত্র এবং সরঞ্জামাদি ব্যবহারের আগে ও পরে ব্লিচিং পাউডার মিশ্রিত পানিতে-উচ্চ ঘনত্বের পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দ্রবণে ভিজাতে হবে এবং রৌদ্রে ভালোভাবে শুকাতে হবে; পানির গভীরতা ঠিক রাখতে হবে এবং  নিয়মিত চুন, পুষ্টিকর খাবার ও সার দিতে হবে; চিংড়ির রেণু পোনা ছাড়ার সময় পুকুরের পানির গভীরতা ১.৫ ফুট থেকে ২ ফুট এবং চাষকালীন অর্থাৎ মাছ বড় হয়ে গেলে ৩ থেকে ৪ ফুট পানি থাকা বাঞ্ছনীয়।

কৃষিবিদ মোহাম্মদ মারুফ*
*সহকারী তথ্য অফিসার (শস্য উৎপাদন), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫

ছাদবাগানে নিরাপদ শাকসবজি

নিরাপদ সবজি করব চাষ, পুষ্টি মিলবে বার মাস- শীর্ষক প্রতিপাদ্য নিয়ে সবজি মেলা ২০১৯ জানুয়ারি ২৪-২৬ তারিখ শুরু হচ্ছে। কৃষিকথার গ্রাহক হয়েছিলাম ১৯৯৫ সালের দিকে আমি যখন ছাত্র। কৃষি তথ্য সার্ভিসের কর্তাব্যক্তিদের অনুরোধ ও আমার আগ্রহ মিলে আধুনিক কৃষির এক আশাব্যঞ্জক কৃষি সেক্টর ছাদবাগানে নিরাপদ সবজি চাষ বিষয়ক খুঁটিনাটি অনেকেই জানেন শুধু সবাইকে এর চাহিদা ও গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য এ লেখা।

ঢাকা শহরে কমপক্ষে প্রায় সাড়ে চার লক্ষ ছাদ রয়েছে (সাড়ে চার হাজার হেক্টরের বেশি) যা দেশের কোন একটি উপজেলার সমান বা বেশি। যেখানে বাসস্থান, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত, ব্যাংক, শপিংমল, কনভেনশন সেন্টার ইত্যাদি অধিকাংশ জায়গা দখল করে আছে। এই পরিমাণ জায়গা কোনো অবস্থাতেই ছোট করে দেখার উপায় নেই। ব্যক্তিপর্যায়ে বা একক প্রধানের বা সমিতির নিয়ন্ত্রণে বিধায় এসব স্থান সবুজের আওতায় বিশেষ করে সবজি-ফল চাষের আওতায় নিয়ে আসা অধিকতর সহজ ও নিরাপদ। বিল্ডিং কোডে ২০% সবুজ থাকার কথা রয়েছে (যা ছাদবাগান নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো ও পলিসি মেকারের ইচ্ছার প্রতিফলন) যেটি পুরোপুরি অনেক জায়গায় উপেক্ষিত থাকে।  ঢাকা শহর তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে অতি দ্রুত হিট আইল্যান্ডে (Heat Island) পরিণত হচ্ছে, যার পরিণাম পরবর্তী প্রজন্মকে ভোগ করতে হবে।


শহরের উত্তপ্ত আইল্যান্ড (Heat Island) নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব কমানোর উপায় :
প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের সবুজ ঢাকা


প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের সবুজ ঢাকা বাস্তবায়নই একমাত্র পারে ঢাকাকে বসবাসের যোগ্য রাখতে এবং তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান মেয়র জামাল মোস্তফা সবুজ কারিগর হিসেবে কৃষি তথ্য সার্ভিস, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ কারিগরি সহায়তা নিয়ে কাজ করছে বেশ কিছু শহুরে কৃষিসহায়ক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন- গ্রীন সেভার্স গাছ ও ফসলের হাসপাতাল নির্মাণের স্বপ্ন নিয়ে সেবা ও সবুজ করার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়াও প্রায় ২০০ প্রতিষ্ঠান ছাদবাগানের বীজ, জৈবসার, কলম ইত্যাদি প্রদানসহ তাদের কার্জক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ছাদবাগানের একটি আবশ্যকীয় ও জনপ্রিয় কম্পোনেন্ট হলো- নিরাপদ সবজি আবাদ, যা একটি চ্যালেঞ্জও। ছাদবাগানিদের নিরাপদ সবজি খাওয়ার আকাঙ্কা থেকে সবজি-ফসল চাষে শহুরে কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।


ছাদবাগান বিষয়ক গবেষণার হালচাল : ছাদবাগানে সবজি ও কৃষি ফসল আবাদ নিয়ে কৃষি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করে যাচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ ঢাকার মিরপুর-১০ এলাকায় ১০০টি পরিবার নিয়ে জরিপে দেখিয়েছে ছাদবাগানিদের ৪১% তরুণ, ৩০% মধ্যবয়সী এবং ২৮% বয়স্ক মানুষ। ফসলের মধ্যে অর্নামেন্টাল, ঔষধি, ছোট হার্বজাতীয় ফসলের চাষাবাদ করতে পছন্দ করেন। ২য় স্থানে ফল এবং ৩য় স্থানে সবজি আবাদের পরিমাণ। একটি পরিবারের উন্মুক্ত ও খালি স্থানে যে কোনো পাত্রে নিরাপদ সবজি চাষ পরিবারের চাহিদা মেটাতে সক্ষম।


সবজি চাষের প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরাপদ বা জৈবভাবে সবজি বা ফল চাষ করা । নিরাপদ সবজি চাষে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো জেনে রাখা ভালো-
 

মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা : ট্রাইকোডার্মা মিশ্রিত সার, বায়োচার ইত্যাদি মাটি শোধন বা হাইজিন করতে ভালো উপাদান।


জৈব সার : ভার্মি কম্পোস্ট, রান্নাঘর ও খাবারের উচ্ছিষ্টাংশ দিয়ে বানানো সার, চা-কম্পোস্ট, ডিম খোসা ভাঙা মিশানো, নতুন মাশরুম কম্পোস্ট (পটাশ ও ফসফরাস আধিক্য), নিম খৈল, সরিষা খৈল ইত্যাদি ছাড়াও যে কোনো বায়োলজিক্যাল কম্পোস্ট (ব্যাকটেরিয়াবিহীন) ব্যবহার করা যেতে পারে।


রোগ-পোকামাকড় দমন : নিরাপদ সবজি চাষে রাসায়নিক পেস্টিসাইড ব্যবহার করতে হবে নিয়ম মেনে; শাকজাতীয় সবজিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার না করলেও চলে কিন্তু ফলজাতীয় সবজি চাষে সবজি আহরণের কমপক্ষে ২০ দিন আগে থেকে রাসায়নিক সার ব্যবহার না করা।


পোকা দমনে ফ্লাইং ইনসেক্টের জন্য ফেরোমন ট্রাপ, সোলার লাইট ট্রাপ (কারিগরি সহায়তার জন্য ডিএই, এআইএস, ফ্যাব-ল্যাব শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় যোগাযোগ করতে পারেন), আঠালো (Sticky trap) ট্রাপ, পেঁয়াজ পাতার ও ছোলা পেস্ট বা নির্যাস, রসুন, গাঁদা ও চন্দ্রমল্লিকার (সর্বাধিক কার্যকরী-ফুলের দোকানে ফেলে দেয়া ফুল সংগ্রহ করে) ফুলের নির্যাস ভালো কাজ করবে।


পার্চিং : ছাদবাগানে পাখি বসার জায়গা করে দেয়া ভালো। বাগানের ফল-সবজি তখনই পাখি খাবে যখন তা নিরাপদ ও বিষমুক্ত থাকবে। এরা অনেক পোকামাকড়ও খাবে। পাখিকেও খেতে দিন তাহলেই তো নিরাপদ সবজি ও ফসল উৎপাদনের সাথে সাথে টেকসই পরিবেশ রক্ষা হবে সবার জন্যই।  


অলটারনেটিভ চাষাবাদ : একই স্থানে একই পরিবারের সবজি (পরিবর্তন করে চাষ) যেমন- টমেটো, বেগুন, আলু পাশাপাশি না করা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি ইত্যাদি একসাথে চাষ না করা।
 

মিশ্র-ফসল : একই সাথে একটি বেডে ফল গাছের ড্রামে বা প্লেন্টার বক্সে শাকসবজি, ঔষধি ও গাঁদা ফুল চাষে ফলন বাড়বে। উদাহরণস্বরুপ- টমেটো-গাদাফুল-গাজর-ব্রকলি-লেটুস-তুলসী/পুদিনা- এই ফরমেটে প্লান্টার বক্স বা পারমানেন্ট/সেমি-পারমানেন্ট বেডে লাগালে রোগ-পোকামাকড় আক্রমণ কম বা হবেই না। এতে নিরাপদ চাষাবাদে কোনো রাসায়নিক বিষ ব্যবহারের প্রয়োজন হবে না। একই স্থান থেকে বেশি উৎপাদন করার চেষ্টা করা কারণ সকল গাছ মাটির একই স্তর থেকে খাদ্য-উপাদান গ্রহণ করে না। এতে সারসহ অন্যান্য উপাদানের সঠিক ও টেকসই ব্যবহার ত্বরান্বিত করবে।


কোন জায়গা খালি না রাখা : আমাদের দেশে সব মৌসুমে সব স্থানে সব সবজি ও ফল চাষ করা সম্ভব শুধু সঠিক মানুষ ও প্রতিষ্ঠান থেকে পরামর্শ নিতে হবে। উদ্যানতত্ত্ব সেন্টার (হর্টিকালচার সেন্টার), কৃষি প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেখান থেকে যে কোনো সমস্যার সমাধান পাবেন। প্লাস্টিক বোতল না ফেলে যে কোনো সবজি-ফল-ফসলের বীজ চারা লাগান, নিজেই নিজের অক্সিজেন ফ্যাক্টরি স্থাপন করা যায়।
 

রাস্তায় সবজি লাগান : বাসা, এপার্টমেন্ট, রাস্তার আইল্যান্ডসহ সব খালিস্থানে শাকসবজির বীজ ফেলা, কেউ না কেউ তো খাবে, খাক না; নিজের শহরকে নিজেরাই সবুজে রঙিন করে তুলতে পারি।
ছোট ছোট বাগানই বাণিজ্যিক বাগান : কোটি মানুষের শহরে সকলে একটু একটু করে ফল-সবজি চাষ করতে থাকলে নিরাপদ ফসল আবাদ আন্দোলনে রূপ নেবে এবং সামগ্রিকভাবে একটি বৃহৎ সবজি কারখানা তৈরি হবে। অনলাইন পোর্টাল, ফেসবুকে গ্রুপ করে নিরাপদ সবজি চাষের তথ্য ও চাষাবাদের সব উপাদানের উৎস আদান-প্রদান করে বাণিজ্যিক বাগানে পরিণত করা যেতে পারে।


ছাদবাগান ব্যবস্থাপনা : সঠিকভাবে ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি এবং শহুরে কৃষি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা ও পরামর্শ নিয়ে ছাদবাগান করলে ছাদের ক্ষতি তো হয়ই না বরং টেকসই সবুজ আচ্ছাদন অক্সিজেন সরবরাহ করে বাসস্থান-অফিস ও প্রতিষ্ঠানকে আরো আরামদায়ক ও শান্তিময় রাখবে।


আধুনিক কৃষি পদ্বতিতে নিরাপদ আবাদ : বারান্দা, বেলকনি, ছাদ সব স্থানে মাটিবিহীন চাষাবাদ (হাইড্রোপনিক), অটো-সেচ ড্রিপ সেচ পদ্ধতিতে ভার্টিক্যাল গার্ডেন (৩ ফুট জায়গায় ২৪টি সবজি চাষ), আলাদা সেচ সুবিধাসহ ব্যারেল গার্ডেন, একত্রে মাছ-সবজি চাষ (একুয়াপনিক্স), বোতল-গার্ডেন, স্মার্ট ডিভাইস মেসেজ অপসনসহ ফার্মিং, ইনডোর ফার্মিং প্রোটেকটিভ চাষাবাদ ইত্যাদি আধুনিক ও নিরাপদ সবজি চাষ এখন এ দেশে অনেকেই করছে। সব ফার্র্মিংয়ের সহায়তার জন্য কৃষি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগাযোগ করতে হবে।


ছাদবাগান বিষয়ক প্রশিক্ষণ : গবেষণায় জানা যায়, ঢাকা শহরের ৭৬% ছাদবাগানি প্রশিক্ষণ নিতে চায়। প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তার জন্য আপনার নিকটস্থ কৃষি অফিস হর্টিকালচার সেন্টার ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগসহ ফেসবুক গ্রুপগুলো পরামর্শ স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রদান করা যায়।


সবজি মেলা : প্রতি বছর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দেশব্যাপী সবজিমেলা করে থাকে যেখানে কৃষি সেক্টরের সব প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। মেলা ছাড়াও রোডশো, পরামর্শ বুলেটিন, ছাদবাগান লিফলেট ইত্যাদি ছাদবাগানি ও আগ্রহী শহুরে কৃষককে টেকসই নিরাপদ সবজি চাষে আরো উৎসাহিত করবে।


নিরাপদ ছাদবাগানের নিরাপত্তা : ছাদ কার্নিশ বা ব্যালকনিতে পটে বা টবে ফুল-ফল-সবজি আবাদে সতর্কতা অবলম্বন করুন যাতে বিল্ডিং বা এপার্টমেন্টের নিচ দিয়ে যাতায়াতকারী পথচারী দুর্ঘটনার শিকার না হন।


কৃষিকথা মোবাইল অ্যাপস এবং ১৬১২৩ : কৃষি তথ্য সার্ভিস কর্তৃক ব্যবস্থাপনায় একটি অনলাইন কৃষি সহায়তা পোর্টাল ও সবার জন্য উন্মুক্ত ফোন নম্বর- ১৬১২৩ এ ফোন করে কৃষি সংক্রান্ত সব সহযোগিতা পেতে পারেন।


কৃষিকথার প্রচার কার্যকরী হবে এ আশাবাদ ব্যক্ত করে নিরাপদ হোক সব ছাদ বাগানের চাষাবাদ।

সহযোগী অধ্যাপক ও ফ্যাব ল্যাব ম্যানেজার, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা-১২০৭, মোবাইল-০১৭১১০৫৪২১৫

বাংলাদেশের কৃষি : চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণ

আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশ। সুজলা সুফলা, শস্য-শ্যামলা মলয়জ শীতলা এক অপরূপ অনিন্দ্য সুন্দর বাংলাদেশ। বিশ্বকবির সোনার বাংলা, নজরুলের বাংলাদেশ, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা, রূপের যে নাইকো শেষ বাংলাদেশ। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রক্ষ্মপুত্র ও বুড়িগঙ্গা বিধৌত বাংলার রূপ ও সৌন্দর্যে সবই মনোমুগ্ধকর। বাংলাদেশ সবুজের দেশ। ষড়ঋতুতে বাংলাদেশ বিভিন্ন সাজে সজ্জিত হয়। কবি তাই যথার্থই বলেছেন, এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের সেরা সে যে আমার জন্মভূমি। কিন্তু আমাদের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের কারণে আজ আমাদের দেশ তথা বাংলাদেশের মেরুদণ্ড কৃষি নানামুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। জীবন জীবিকার জন্য এদেশের জনগণ ও অর্থনীতি মূলত কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এখনও শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ জনসাধারণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল এবং মোট জিডিপির ২২ শতাংশ আসে কৃষি থেকে। তাই কৃষি উৎপাদনে বিপর্যয় ঘটলে দেশের সামাজিক অর্থনীতি তথা অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে।
 
পৃথিবীর মধ্যে জনবহুল দেশ বাংলাদেশ। লোক সংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে ৭ হাজার নতুন মুখ, বছরে বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রায় ২৫ লাখ লোক। অপরদিকে রাস্তাঘাট, মিল-কারখানা, অপরিকল্পিত বাড়িঘর ইত্যাদি অবকাঠামো তৈরিতে চাষযোগ্য জমি থেকে প্রতিদিন ২২০ হেক্টর হিসেবে প্রতি বছর হারিয়ে যাচ্ছে প্রায় ৮০ হাজার ৩০০ হেক্টর জমি। বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য পাল্লা দিয়ে নিবিড়ভাবে চাষ করা হচ্ছে ধান আর ধান। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ধানের সঙ্গে আনুপাতিক হারে অন্যান্য ফসলের (ডাল, তেল, শাকসবজি, ফল-মূল) চাষ আশানুরূপ বাড়ানো যায়নি। দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও অন্যান্য খাদ্য উৎপাদনে আমরা খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন করতে পারেনি। খাদ্য নিরাপত্তার প্রথম এবং প্রধান শর্তই হচ্ছে- খাদ্য জোগানের সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা থাকা অর্থাৎ নিশ্চিত আয়ের সংস্থান থাকা যার দ্বারা সবাই চাহিদা ও পছন্দমতো নিরাপদ এবং প্রয়োজনীয় আমিষসহ পুষ্টিকর খাবার সংগ্রহ করতে পারে।
 
স্বাধীনতা উত্তর ১৯৭২ সালে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিল ১ কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন। সাড়ে ৭ কোটি মানুষের জন্য ওই খাদ্য পর্যাপ্ত ছিল না। এর পরের ৪২ বছরে এখানে মানুষ বেড়েছে দিগুণের বেশি, আর আবাদি জমি কমেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। অথচ দেশে এখন খাদ্যশস্য উৎপাদন হচ্ছে তিন গুণ বেশি, ভুট্টাসহ এর পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি মেট্রিক টন (প্রথম আলো, নভেম্বর ২০১৩)। বাংলাদেশে ৩-৪ বছর ধরে আবহাওয়ার অনুকূল পরিবেশ বিদ্যমান থাকা এবং মাঠ পর্যায়ে কৃষি বিভাগের তৎপরতায় কৃষক ভালো বীজ, জমিতে সুষম সারের ব্যবহার বৃদ্ধি ও পরিমিত সেচের কারণে বর্তমানে পর্যাপ্ত ধান উৎপাদন হচ্ছে। তবে কৃষি গবেষকদের মতে, টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এ মুহূর্তে ধানের আবাদ কমানো যাবে না। প্রধান ফসল ধানের আবাদ ঠিক রেখে অন্যান্য ফসলের (গম, ভুট্টা, ডাল, তৈল, সবজি) আবাদ বৃদ্ধি করতে হবে (বিএইউ-গবেষণা প্রতিবেদন-২০১৩)।
 
বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর অন্যান্য দেশে চালের মূল্য বেশি অথচ এ দানাদার খাদ্যশস্য চাল আমরা সবচেয়ে বেশি পরিমাণে খেয়ে থাকি। বাংলাদেশে প্রতিজন প্রতি বছর চাল খায় ১৬৫-১৮৩ কেজি, ভারত-১১৪ কেজি, ইন্দোনেশিয়া-১০৪ কেজি, শ্রীলঙ্কা-৮৩ কেজি, চীন, কোরিয়া, জাপান ৪০-৪৫ কেজি। এক পরিসংখানে বলা হয়েছে, দৈনিক মাত্র ৫০ গ্রাম করে চাল কম খেলে বাংলাদেশে ২৮ লাখ মেট্রিক টন আর ১০০ গ্রাম করে কম খেলে ৫৬ লাখ মেট্রিক টন চাল উদ্বৃত্ত থাকে। এতে খাদ্য আমদানি করাত দূরে থাক বরং খাদ্য রপ্তানি করা যাবে।
 
অন্যদিকে ভিটামিন, খনিজ লবণের ঘাটতি পূরণ, সুস্থ কর্মক্ষম রোগব্যাধিমুক্ত জীবন গড়তে ফল-মূল, শাকসবজির ভূমিকা অপরিসীম। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সবজি খায় দক্ষিণ কোরিয়া-৬৮৬ গ্রাম, জাপান-৪৫০ গ্রাম, চীন-২৯০ গ্রাম, ভারত-১২৪ গ্রাম, বাংলাদেশ খায় মাত্র ৪৭ গ্রাম/জন/প্রতিদিন। ফল দেহে আনে বল, ভিটামিনের একমাত্র উৎস। প্রতিদিন একজন লোকের ১১৫-১২০ গ্রাম ফল খাওয়া দরকার। আমাদের দেশে মাথাপিছু ফলের উৎপাদন প্রায় ৩৫-৪০ গ্রাম, ভারতে উৎপাদন ১১১ গ্রাম, ফিলিপাইনে উৎপাদন হয় ১২৩ গ্রাম, থাইল্যান্ডে উৎপাদন হয় ২৮৭ গ্রাম। এর পরিপেক্ষিতে আমাদের প্রচলিত ফলের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া অপ্রচলিত ফল যেমন- আতা, কদবেল, শরিফা, সফেদা, লটকন, ডেউয়া, গাব, কাউফল, ক্ষুদিজাম ইত্যাদি ফলের আবাদ বৃদ্ধি করতে হবে।
 
বাংলাদেশে বর্তমানে বছরে ৮০ লাখ  মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হয়। সংরক্ষণের অভাবে এর উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্ট হয়। পৃথিবীর অনেক দেশ যেমন-ডেনমার্ক, হল্যান্ড, ব্রাজিলের জনগণ প্রধান খাদ্য হিসেবে আলু খেয়ে থাকে। আমরা ১০০ গ্রাম চালের পরিবর্তে আলুসহ অন্যান্য সবজি ও ফল খাদ্য তালিকায় প্রতিস্থাপন করতে পারলে চালের ওপর অনেকাংশে চাপ কমবে। আর এর জন্য প্রয়োজন একটু সচেতনা বৃদ্ধি, মানসিকতা এবং খাদ্যাভাসের পরিবর্তন।
 
মাটির স্বাস্থ্য নির্ভর করে মাটির মধ্যে বিদ্যমান পানি, বায়ু আর জৈব উপাদানের ওপর। আর এসব নির্ভর করছে মাটির নিচে বসবাসরত অনুজীব সমষ্টির ওপর। অপরিকল্পিতভাবে রাসায়নিক সার, বালাইনাশক ও আগাছানাশক ব্যবহারের ফলে এ অনুজীব ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। শুধু মাটির অনুজীব বা মাটির স্বাস্থ্য নয়, ধ্বংস হচ্ছে জীবচৈত্র্যসহ পরিবেশের। ফসলের জমিতে ক্রমাগত আগাছানাশক ব্যবহারের ফলে মাটির উর্বরতা হ্রাসসহ ফসলের ফলন কমে যাচ্ছে। নিবিড় ফসল ও ফল চাষে ব্যবহৃত হচ্ছে রাসায়নিক সার। মাটির প্রাণ হচ্ছে জৈবসার। জৈব পদার্থ হারিয়ে মাটি অনুর্বর ও অনুৎপাদনশীল হয়ে পড়ছে। মাটিতে ৫% জৈব পদার্থ থাকা দরকার কিন্তু মাটি পরীক্ষা করে দেখা গেছে জৈব পদার্থ রয়েছে শতকরা ০.৫ - ১.০ ভাগ বা তারও কম। জমির আদর্শ খাদ্য হলো গোবর সার, দেশের অনেক এলাকায় এই আদর্শ গোবর সার জমিতে প্রয়োগের পরিবর্তে রান্নার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ডেনমার্কসহ অনেক উন্নত দেশে মাটির জৈব পদার্থ সংরক্ষণের জন্য জমিতে গোবরসার ব্যবহার বাধ্যতামূলক। বলা হয় ‘সবার আগে জৈব সার তারপর অন্য সার’ আমরা চলছি উল্টো পথে।
 
অপরিকল্পিত বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে পোকামাকড়, রোগবালাইয়ের প্রাকৃতিক শত্রু, বন্ধু পোকা ধবংস হচ্ছে। শত্রু পোকার বালাইনাশক সহনশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে কম ক্ষতিকারক নিম্ন প্রজাতির পোকামাকড় ক্ষতিকারক হিসেবে আত্ম প্রকাশ করছে। ফসলে যথেচ্ছা কীটনাশক ব্যবহার, ফলে ও মাছে বিভিন্ন ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্য মেশানোর ফলস্বরূপ মানবদেহে সৃষ্টি হচ্ছে- ব্লাড ক্যান্সার, ব্রেন ক্যান্সার, ব্রেস্ট ক্যান্সার, লিভার ক্যান্সার, ফুসফুস ক্যান্সার ইত্যাদি। খাদ্যে ভেজালের কারণে গ্যাসট্রিক, আলসার, হৃদরোগ, অন্ধত্ব, কিডনি রোগ, স্নায়ু রোগ প্রভৃতি জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী আজ অসহায় হয়ে পড়ছে। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের  বিষাক্ত খাদ্য জনস্বাস্থের জন্য হুমকি শীর্ষক সেমিনারে বলা হয় শুধুুমাত্র ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩ লাখ লোক ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার, কিডনি রোগের আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ। এছাড়া গর্ভবতী মায়ের শারীরিক জটিলতাসহ গর্ভজাত বিকালঙ্গ শিশুর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। যাহা এক কথায় ভয়াবহ (বাংলাদেশ প্রতিদিন-২৬ অক্টোবর ২০১৪)। বাতাসে সিসা, পানিতে- আর্সেনিক, চালে- ক্যাডনিয়াম, মাছে- ফরমালিন, ফলে- কার্বাইড, ফলের রসে ও বিস্কিটে বিভিন্ন ইন্ডাসট্রিয়াল- রঙ, সবজিতে কীটনাশক, মুরগির মাংসে- ক্রোমিয়াম সর্বদিকে বিষ আর বিষ আমরা যাব কোথায়?
 
শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষার জন্য ৭০এর দশকে এদেশে সার ও কীটনাশক ব্যবহার শুরু হয়। ফসল আবাদ বৃদ্ধির কারনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের অনেক শিল্পাঞ্চল এলাকার উত্তম আবাদি জমি আজ পরিবেশ দূষণের মারাত্মক শিকার। কলকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য গিয়ে মিশছে নদী-নালা, খাল-বিলে। খাল-বিলের পানি ব্যবহৃত হচেছ জলাশয়ের আশপাশের আবাদি জমিতে। আবাদি জমি হারাচ্ছে উর্বরতা ও উৎপাদনশীলতা। শিল্পের বর্জ্যরে মাধ্যমে এসব এলাকার মাটিতে জমা হচ্ছে ভারি ধাতব বস্তু (লেড, ক্যাডনিয়াম, ক্রোমিয়াম)। যার পরিপ্রেক্ষিতে ওইসব এলাকার উৎপাদিত চালে ক্যাডনিয়াম পাওয়া যাচ্ছে।
 
‘বেশি ওষুধ বেশি পোকা, কম ওষুধ কম পোকা’-এ প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে আইপিএম, আইসিএম বর্তমানে আইএফএম  বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ক্লাবের সদস্যদের প্রচার-প্রচারণা ও মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের তদারকির ফলেই বালাইনাশকের ব্যবহার কমতে শুরু করেছে। আশার কথা হলো, সারা দেশে যেখানে ২০০৮ সালে দেশে বালাইনাশক ব্যবহার হয়েছিল ৪৮ হাজার ৬৯০ মেট্রিক টন, ২০১২ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৮৮২ মেট্রিক টন। সারা দেশে আইপিএম, আইসিএম ক্লাবের বর্তমান সংখ্যা ১০০০০টি এবং প্রশিক্ষিত কৃষক-কৃষানির সংখ্যা ৩০০০০০ জন। আগামীতে ২০০০০টি আইপিএম/আইএফএম ক্লাব স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কৃষক সংগঠনের মাধ্যমে কীটনাশকের জুডিশিয়াল/পরিমিত ব্যবহার, পরিবেশ রক্ষায় কীটনাশকের পরিবর্তে সবজিতে ফেরোমেন ট্রাপ, ব্রাকন, ট্রাইকোগামা (উপকারী অনুজীব দ্বারা ক্ষতিকর পোকা দমন) ব্যবহার বৃদ্ধি করা, ধানের জমিতে পার্চিং করা ও  ফল পাকানোতে প্রাকৃতিক পদ্ধতি অবলন্বন  করে ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্য মিশানো পরিহার এবং এর ক্ষতিকারক প্রভাব সম্পর্কে পত্রপ্রত্রিকায় ও রেডিও-টেলিভিশনে ব্যাপক প্রচার করতে হবে। আমাদের বাঁচার তাগিদেই এ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে।
 
একদিকে আবাদি জমি কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে ফসলি জমিতে বেআইনিভাবে ইটভাটা স্থাপন করায় তার কালো ধোঁয়া আশপাশের ফসলি জমি ও গাছ পালার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। প্রতি বছর কোথাও না কোথাও ধানে চিটা, ফসলহানীসহ ফল গাছে ফলশূন্য হওয়ার অনাকাক্সিক্ষত ঘটছে। গত ২০১৩ সালে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ ও তাড়াশ উপজেলার বোরো ধানের জমি এতে অক্রান্ত হয়েছে। আমাদের কৃষি প্রকৃতি এখনও জলবায়ুর ওপর নির্ভরশীল।  বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষি ওপর পড়ছে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব। এর ফলে শুরু হয়েছে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, অসময়ে বৃষ্টি, বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস ভূমিকম্প ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
 
নদ-নদীর উৎস পথে বা তার গতিপথে বাধা সৃষ্টিকারী বাঁধ পানির স্বল্পতাসহ খরার সৃষ্টি করছে। উজানে বিভিন্ন অপরিকল্পিত বাঁধ ভাটিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর কারণে বাংলাদেশে কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশ ধ্বংসের মুখে পতিত হচ্ছে। শুধু তাই নয় সমুদ্রের পানির উজানমুখী ধাক্কা বাড়ছে। কারণ খরার সময় উজানের পানি প্রবাহ বাধার কারণে নদীতে পানির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামার কারণে এবছর বরেন্দ্র অঞ্চলসহ সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া উপজেলার ৩৮০টি অগভীর নলকূপ ৮-১০ ফুট গভীরে স্থাপন করে সেচ প্রদান করা হয়েছে। সিরাজগঞ্জ জেলায় চরাঞ্চলের পরিমাণ প্রায় ৪৪,০০০ হেক্টর (২৪%) যাহা নদীর নাব্যর কারণে প্রতি বছর বেড়েই চলেছে।
 
নদীতে পানির পরিমাণ কমে যাওয়ার ফলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তৃর্ণ এলাকা লবণাক্ততায় ভরে যাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১০ লাখ হেক্টর জমি লবণাক্ত আক্রান্ত। তার মধ্যে মাত্র ২,৫০,০০০ হেক্টর জমিতে লবণসহিষ্ণু ফসল চাষাবাদ সম্ভব হচ্ছে। বাকি জমি এখনও চাষাবাদের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের ১২টি জেলায় লবণাক্ততার প্রভাবে স্বাভাবিক চাষাবাদ হয় না। ২০০৭ সালে সিডর, ২০০৯ সালে আইলা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জমি লবণাক্রান্ত হয়ে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছে। যাহা এখনও কাটিয়ে উঠা সম্ভব হয়নি।

তাপমাত্রা ও উষ্ণতা রোধে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই। একটি দেশের মোট আয়তনের ২৫% গাছপালা/বন থাকা দরকার, আমাদের দেশে রয়েছে বর্তমানে মাত্র ১০-১২%। এ সমস্যা উত্তরণের জন্য সরকার বৃক্ষরোপণের ওপর অত্যধিক জোর দিয়েছেন। কিন্তু কিছু আগ্রাসী প্রজাতির গাছ আমাদের দেশকে মরুময়তার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সারা দেশে রাস্তার দুইপাশে কড়াই গাছ বিশেষ করে সিরাজগঞ্জে ইউক্যালিপটাস গাছ বাগান আকারে চাষ করা হচ্ছে। যে গাছে পাখি বাসা বাঁধে না, মৌমাছি মধু আহরণ করে না এবং আমাদের ভূ-নিম্নস্থ পানি ব্যাপক শোষণ করে উড়িয়ে দিয়ে দ্রুত মরুময়তার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগতভাবে নিম্নমুখী হচ্ছে, ফলশ্রুতিতে পানিতে আর্সেনিকসহ অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারপরও যদি এ প্রজাতির গাছ লাগানোর প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে থাকে, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ কোথায় যাবে তাহা সহজেই অনুমেয়। অথচ আমরা এর পরিবর্তে বেলজিয়াম, একাশিয়া, ইপিল-ইপিল, মেহগনি ইত্যাদি কাঠের গাছের সাথে ফল গাছ (আম, জাম, কলা, লিচু, পেয়ারা, কাঁঠাল, তাল, খেজুর ইত্যাদি) লাগিয়ে একদিকে পরিবেশের উন্নতি সাধন অন্যদিকে ফলের চাহিদা ও পূরণ করতে পারি।

 
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১১ লাখ মেট্রিক টন বীজ ব্যবহার হয় তার মধ্যে বিএডিসি সরবরাহ করে মাত্র ধানের ৩৫-৪০ ভাগ এবং অন্যান্য ফসলের মাত্র ১০-১২ ভাগ। সরকার কৃষক ভালো মানের বীজ সরববাহের লক্ষ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে (ডিএই) কৃষক পর্যায়ে ভিত্তি বীজের প্রদর্শনী স্থাপন করে এ সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করছে। কৃষক পর্যায়ে উৎপাদিত এ বীজ দিয়ে বর্তমানে প্রায় ৭০ ভাগ উন্নত মানের ধান বীজের চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়েছে। সরকারের নন ইউরিয়া সারের মূল্য কমানো এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তদারকির ফলে বর্তমানে জমিতে সুষম সারের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে গত ৫ বছর ধরে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার ফল স্বরূগত ৩ বছর ধরে এক টন চালও বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়নি। এত প্রতিকূল পরিবেশেও কৃষি উৎপাদন গত ৫ বছর শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি বৈশ্বিক মন্দা সত্ত্বেও অনেক উন্নত দেশের তুলনায় ভালো অবস্থানে আছে।
 
নার্স কর্তৃক আয়োজিত ‘খাদ্য নিরাপত্তায় বিজ্ঞান-সেমিনার-২০১০’ সালের একটা গবেষণায় দেখা গেছে, জনসংখ্যা বর্তমান হারে বৃদ্ধি পেতে থাকলে এবং খাদ্য গ্রহণ ৪৫৪ গ্রাম/জন/দিন হিসেবে আগামী ২০২৫ সালে বাংলাদেশের লোক সংখ্যা দাঁড়াবে ১৯ কোটি, খাদ্যের প্রয়োজন হবে ৩ কোটি ১৫ লাখ মেট্রিক টন। আর ২০৫০ সালে লোকসংখ্যা দাঁড়াবে ২৫ কোটি এবং খাদ্য চাহিদা দাঁড়াবে ৪ কোটি ২৫ লাখ মেট্রিক টন। সেই সাথে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ দাড়াবে ২০২৫ সালে বর্তমানে ৮১ লাখ হেক্টর থেকে কমে ৬৯ লাখ হেক্টরে এবং ২০৫০ সালে দাঁড়াবে মাত্র ৪৮ লাখ হেক্টরে। সুতরাং এত অল্প পরিমাণ চাষযোগ্য জমিতে ৪.২৫ কোটি মেট্রিক টন চাল উৎপাদন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অতএব এখন থেকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টি সমুন্নত রেখে খাদ্যাভাস পরিবর্তন এবং সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
 
উপসংহার
আমরা জানি কৃষিতে নানাবিধ সমস্যা আছে যার সমাধান ও রয়েছে। আমরা কৃষিতে অনেক দেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছি। আমাদের চাল উৎপাদন যথেষ্ট যা ধরে রাখতে হবে। শ্রীলঙ্কতে এবছর ১ লাখ টন চাল রপ্তানি হচ্ছে। তাপমাত্রা সহিষ্ণুু গমের জাত উদ্ভাবনের ফলে গমের আবাদ বৃদ্ধি হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ লাখ টন গমের চাহিদা রয়েছে, উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১১-১২ লাখ টন। যার জন্য খাদ্যশস্য হিসেবে প্রতি বছর প্রায় ২৫ লাখ টন গম আমদানি করতে হচেছ। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৮০ লাখ টন আলু উৎপাদন হচ্ছে। দেশের চাহিদা পূরণ করে স্বল্প পরিসরে বিদেশে আলু রপ্তানি হচ্ছে। এ মহূর্তে সবজি ও ফলের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে এবং উৎপাদন বাড়াতে হবে। ডাল ও তেল জাতীয় ফসলে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। ভোজ্যতেলের প্রায় ৭০% ভাগ আমদানি করতে হচ্ছে। অবশ্য বর্তমানে ধানের কুড়া থেকে রাইস বার্ন অয়েল উৎপাদনের ফলে সয়াবিন তৈরি আমদানি দিন দিন কমে যাচেছ। সরিষার আবাদ বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে। নতুন নতুন সরিষার জাত উদ্ভাবিত হয়েছে যা উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ডালের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ফলে ডাল জাতীয় ফসলের উৎপাদন এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ডালের মূল্য ও আমদানির পরিমাণ কমেছে। এ সময়ে চাহিদার ৫০% ডাল দেশে উৎপাদন হচ্ছে। চাষিরা মূল্য পাওয়ায় পেঁয়াজ-রসুনের আবাদ ও উৎপাদন বেড়েছে এবং আমদানিও কমেছে। সারা বছরব্যাপী ফল উৎপাদন বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে কলা, পেঁপে, থাই পেয়ারা, আপেল কুল চাষ বেড়েছে। আংশিক বৃষ্টি নির্ভর আউশ ও পুরো বৃষ্টি নির্ভর রোপা আমন চাষে সরকার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ব্যবসায়িক ভিত্তিতে কৃষি খামার স্থাপন, খামার যান্ত্রিকীকরণ ও সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিরলস প্রচেষ্টা বর্তমান কৃষিকে একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ অবস্থানে নিয়ে যাবে। যেখানে কৃষি, কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষিত হবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে আর ও গতিশীল করে সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
 
ড.  মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার*
* শস্য উৎপাদন বিশেষজ্ঞ, ডিএই, সিরাজগঞ্জ, মোবাইল-০১৮১৫৫৯৭৩০৪ dhossain1960@yahoo.com

প্রশ্নোত্তর (ভাদ্র-১৪২২)

মো. আলমগীর হোসেন
নীলফামারী

প্রশ্ন : আদার কন্দ পচা রোগে করণীয় কী?
উত্তর : কন্দ পচা রোগ আদা ফসলের একটি মারাত্মক রোগ। এটি মাটি ও বীজবাহিত ছত্রাকজনিত রোগ।

 

প্রতিকার :
১. আক্রান্ত গাছ রাইজমসহ সম্পূর্ণরূপে তুলে ধ্বংস করতে হবে।

২. রোপণের আগে প্রতি লিটার পানিতে ২.৫ গ্রাম রিডোমিল গোল্ড বা ১ গ্রাম ব্যাভিস্টিন মিশ্রিত দ্রবণে বীজকন্দ ৩০ মিনিট ডুবিয়ে ছায়ায় শুকিয়ে রোপণ করতে হবে এবং একই পদ্ধতিতে  মাতৃকন্দ শোধন করে বীজকন্দ সংরক্ষণ করতে হবে।

৩. রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে অর্থাৎ আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে যখন আক্রমণের লক্ষণ প্রকাশ পায় তখন সঙ্গে সঙ্গে রিডোমিল গোল্ড প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে মাটির সংযোগস্থলে ১৫-২০ দিন পর পর গাছের গোড়ায় প্রয়োগ করতে হবে।
 

নারায়ণ চন্দ্র
পঞ্চগড়
প্রশ্ন : ধান গাছের এক ধরনের পোকা পাতা খেয়ে ঝাঁঝড়া করে ফেলে। কিভাবে দমন করব?

উত্তর : ধানের লম্বাশুঁড় উড়চুঙ্গা পোকা ধানের পাতার কিনারা ও শিরাগুলো বাদে পাতা এমনভাবে খায় যে পাতাগুলো ঝাঁঝড়া হয়ে যায়। এ পোকা দমন করার জন্য যা করা দরকার তাহলো-
০ জমিতে ডালপালা পুঁতে পোকা খেকো পাখি বসার ব্যবস্থা করা।
০ আলোক ফাঁদ ব্যবহার করে পোকা ধরার ব্যবস্থা করা।
০ জমিতে শতকরা ২৫ ভাগ পাতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কুইনালফস জাতীয় কীটনাশক অনুমোদিত মাত্রায় প্রয়োগ করা।

 

মো. শুকুর আলী
সিরাজগঞ্জ
প্রশ্ন : আগাম ফুলকপি, বাঁধাকপি বীজ বপনের সময় কখন জানালে উপকৃত হবো।
উত্তর : আগস্টের শেষ হতে নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত ফুলকপি, বাঁধাকপি বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। আগাম চাষের জন্য বর্ষা শেষ হওয়ার আগেই চারা উৎপাদন করতে হয়। এ সময়ে ঘরের বারান্দায়, টবে বা গামলায় বীজতলা তৈরি করা যেতে পারে।
মো. আবদুল মোতালেব

 

নীলফামারী
প্রশ্ন : পটোল গাছের কাণ্ড ও পটোলের গায়ে পানি ভেজা নরম পচন দেখা যাচ্ছে। করণীয় কী?
উত্তর : পটোল গাছের কাণ্ড ও পটোলের গায়ে সাদা সাদা মাইসেলিয়াম দেখা যায়। এটা পটোলের ছত্রাকজনিত রোগ। এ রোগে গাছের গোড়া, শিকড় ও পটোলে পানি ভেজা নরম পচা রোগ দেখা যায়। পরবর্তীতে পটোল গাছসহ পটোল নষ্ট হয়ে যায়।

 

প্রতিকার :
-আক্রান্ত গাছ পটোলগুলো সংগ্রহ করে নষ্ট বা পুড়ে ফেলতে হবে।
-রোগ সহনশীল জাত বারি পটোল-১, বারি পটোল-২ ব্যবহার করতে হবে।
-প্রতি বছর একই জমিতে পটোল চাষ না করে শস্য পর্যায় অনুসরণ করতে হবে।
-পটোলের শাখা কলম (কাটিং) শোধন করে লাগাতে হবে।
-অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
-সুষম সার ব্যবহার করতে হবে।
-রোগের আক্রমণ দেখা দিলে প্রতিলিটার পানিতে ১ গ্রাম ম্যানকোজেব+মেটালোক্সিল ১০-১২ দিন অন্তর স্প্রে করতে হবে।

 

মনিরুল
পাবনা
প্রশ্ন : গরু খায় না শুকিয়ে যাচ্ছে। কী করণীয়?
উত্তর : প্রথমেই আপনাকে কৃমির ওষুধ দিতে হবে; যদি ৩ মাসের বেশি সময় কৃমির ওষুধ না দিয়ে থাকেন। কৃমির ওষুধ দেয়ার সাতদিন পর আপনি যে দানাদার খাবারগুলো খাওয়াচ্ছেন তার সাথে ভিটামিন মিশিয়ে দিবেন। সুষম দানাদার খাবার খাওয়াবেন।

 

আহমেদ আলী
জামালপুর

 

প্রশ্ন : গরুর চামড়া উঠে যাচ্ছে। কী করণীয়?
উত্তর : অনেক সময় বহিঃপরজীবী জনিত কারণে এমন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আইভারমেকটিন গ্রুপের ইনজেকশন চামড়ার নিচে দিতে হবে।
০ জিংক সমৃদ্ধ সিরাপ খাওয়াতে হবে।
০ এন্টিহিস্টামিনিক ওষুধ দিতে হবে।

 

শাহজাহান
কুমিল্লা

 

প্রশ্ন : হাঁস হাঁটতে পারছে না। প্যারালাইসিসের মতো হয়ে যাচ্ছে। কী করব?
উত্তর : সাধারণত ডাক প্লেগ হলে এমনটি হতে পারে। এক্ষেত্রে সময়মতো ডাক প্লেগের টিকা দিয়ে নিতে হয়। যেগুলো আক্রান্ত হয়েছে সেগুলোকে আপাতত সুস্থ হাঁসগুলো থেকে আলাদা রাখবেন। টেরামাইসিন ক্যাপসুল সকালে অর্ধেক বিকালে অর্ধেক এভাবে তিন দিন খাওয়াবেন।

 

রতন
দিনাজপুর
প্রশ্ন : হাঁস-মুরগিকে প্রতিমাসে/বছরে কি কি টিকা দিতে হয়।

উত্তর : বয়সভেদে হাঁস-মুরগিকে নিচের ছকে বর্ণিত নিয়মে টিকা দিতে হবে।

বয়স

 রোগ

টিকার ব্যবহার

টিকা ব্যবহার পদ্ধতি

১ দিন

ম্যারেকস রোগ

ম্যারেকস টিকা

ঘাড়ের চামড়ার নিচে

৭ দিন ও ২১ দিন

গামবোরো রোগ

গামবোরো লাইভ টিকা

চোখে দুই ফোঁটা

১ দিন/৭ দিন

রানীক্ষেত রোগ

বিসিআর ডিভি

১ চোখে ১ ফোঁটা

১ মাস

বসন্ত রোগ

বসন্তরোগের টিকা

পালকবিহীন স্থানে ছিদ্র করে

২ মাস, ৬ মাস পরপর

রানীক্ষেত রোগ

আরডিভি

মাংসে ১ মিলি. ইনজেকশন

১ মাসে ৬ মাস পরপর

ডাকপ্লেগ রোগ

ডাকপ্লেগ রোগ

রানের মাংসে ইনকেশন

৭৫ দিন পরে ৬ মাস পরপর

কলেরা

কলেরার ঠিকা

রানের মাংস ১ মিলি. ইনজেকশন

 

মো. রুবেল
ঠাকুরগাঁও
প্রশ্ন : পুকুরের পানি নষ্ট (পানির রঙ নষ্ট হওয়া, দুর্গন্ধযুক্ত পানি) হলে বা ঘোলা হলে কী করতে হবে।
উত্তর : পুকুরের পানি নষ্ট বা দূষিত হয়ে গেলে শতকপ্রতি মাছ থাকা অবস্থায় ০.৫ কেজি চুন, মাছ না থাকা অবস্থায় ১ কেজি চুন গুলিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। চুন গুলানোর সময় সতর্ক থাকতে হবে। চুন গুলানোর পর ঠাণ্ডা করে নিতে হবে। পুকুরের পাড়ে অধিক গাছপালা থাকলে তার ডালগুলো ছেঁটে দিতে হবে যাতে পাতা পুকুরে না পড়ে।

 

মো. ইমরান করিম
ব্রাহ্মণবাড়িয়া

 

প্রশ্ন : মাছ বড় হচ্ছে না কী করা যায়?
উত্তর : হ্যাচারি বা যে কোনো উৎস থেকে অপরিপক্ব বা পুষ্টিহীন অথবা খারাপ মানের পোনা পুকুরে বেশি ঘনত্বে ছাড়লে এ সমস্যা হতে পারে। তাই পোনা সংগ্রহের আগে পোনার গুণগতমান সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে বিশ্বস্ত কোনো হ্যাচারি থেকে সংগ্রহ করুন।


তবে দৈনিক সম্পূরক খাদ্য (মানসম্পন্ন খাবার) দিলে, সার প্রয়োগ করলে এবং পানি ব্যবস্থাপনা ঠিকমতো করতে পারলে এ সমস্যার নিরসন হয়।
মাছের ঘনত্ব বেশি থাকলে কমিয়ে দিতে হবে। শতকপ্রতি ৪০ থেকে ৫০টি মাছ (মিশ্র চাষের ক্ষেত্রে সিলভার কার্প, কাতল/ বিগহেড শতকপ্রতি ২০টি রুই ১২টি; মৃগেল/মিরর কার্প/কার্পিও ১০টি; গ্রাসকার্প ২টি, সরপুঁটি ৬টি) পুকুরে ছাড়তে হবে। পুকুরস্থ মাছের মোট ওজনের ৩%-৫% হারে সম্পূরক সুষম খাদ্য প্রতিদিন প্রয়োগ করতে হবে। পুকুরের পানি ঘোলা হলে শতকপ্রতি চুন ০.৫ কেজি এবং ইউরিয়া সার শতকপ্রতি ১০০ গ্রাম হারে দিতে হবে।

 

আনোয়ারুল ইসলাম
টাঙ্গাইল
প্রশ্ন : বন্যার পর পুকুরের পানিতে মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য কতটুকু আছে তা জানার উপায় কী?
উত্তর : হাতের তালু পুকুরের পানিতে ডুবিয়ে বা সেক্কি ডিস্ক (
Secchi dish) নামক যন্ত্রের সাহায্যে এ পরীক্ষা করা যায়। হাত কনুই পর্যন্ত ডুবিয়ে যদি হাতের তালু পরিষ্কার দেখা যায় তাহলে পুকুরে মাছের খাবার খুবই কম আছে বলে ধরে নিতে হবে। আর যদি না দেখা যায় এবং পানির রঙ সবুজ থাকে তাহলে ধরে নিতে হবে পুকুরের পানিতে পর্যাপ্ত খাবার আছে। একইভাবে সেক্কি ডিস্ক যন্ত্রটি ১ থেকে ২ ফুট পুকুরের পানিতে ডুবিয়ে এ পরীক্ষা করা যায়।


কৃষিবিদ মোহাম্মদ মারুফ*

* কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫

চৈত্র মাসের কৃষিকথা ১৪২৪

চৈত্র বাংলা বছরের শেষ মাস। অর্থাৎ আমরা ১৪২৪ বঙ্গাব্দের শেষ অংশে চলে এসেছি। কিন্তু কৃষির শেষ বলে কিছু নেই। এ মাসে রবি ফসল ও গ্রীষ্মকালীন ফসলের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম এক সাথে করতে হয় বলে বেড়ে যায় কৃষকের ব্যস্ততা। সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, কৃষিতে আপনাদের শুভ কামনাসহ সংক্ষিপ্ত শিরোনামে জেনে নেই এ মাসে কৃষির গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো-
 

বোরো ধান
যারা শীতের কারণে দেরিতে চারা রোপণ করেছেন তাদের ধানের চারার বয়স ৫০-৫৫ দিন হলে ইউরিয়া সারের শেষ কিস্তি উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। ক্ষেতে গুটি ইউরিয়া দিয়ে থাকলে ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগ করতে হবে না।
সার দেয়ার আগে জমির আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং জমি থেকে পানি সরিয়ে দিতে হবে।
এলাকার জমিতে যদি সালফার ও দস্তা সারের অভাব থাকে এবং জমি তৈরির সময় এ সারগুলো না দেয়া হয়ে থাকে তবে ফসলে পুষ্টির অভাবজনিত লক্ষণ পরীক্ষা করে শতাংশ প্রতি ২৫০ গ্রাম সালফার ও ৪০ গ্রাম দস্তা সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে।


ধানের কাইচ থোড় আসা থেকে শুরু করে ধানের দুধ আসা পর্যন্ত ক্ষেতে ৩/৪ ইঞ্চি পানি ধরে রাখতে হবে।
পোকা দমনের জন্য নিয়মিত ক্ষেত পরিদর্শন করতে হবে এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আলোর ফাঁদ পেতে, পোকা ধরার জাল ব্যবহার করে, ক্ষতিকর পোকার ডিমের গাদা নষ্ট করে, উপকারী পোকা সংরক্ষণ করে, ক্ষেতে ডাল-পালা পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করার মাধ্যমে ধানক্ষেত বালাইমুক্ত করতে পারেন।
এসব পন্থায় রোগ ও পোকার আক্রমণ প্রতিহত করা না গেলে শেষ উপায় হিসেবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে সঠিক বালাইনাশক, সঠিক সময়ে, সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।

 

গম
দেরিতে বপন করা গম পেকে গেলে কেটে মাড়াই, ঝাড়াই করে ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে।
শুকনো বীজ ছায়ায় ঠা-া করে প্লাস্টিকের ড্রাম, বিস্কুটের টিন, মাটির কলসি ইত্যাদিতে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।

 

ভুট্টা (রবি)
জমিতে শতকরা ৭০-৮০ ভাগ গাছের মোচা খড়ের রঙ ধারণ করলে এবং পাতার রঙ কিছুটা হলদে হলে মোচা সংগ্রহ করতে হবে।
বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে শুকনো আবহাওয়ায় মোচা সংগ্রহ করতে হবে।
সংগ্র