কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

শিখি...করি...খাই

পটভূমি : বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণে লক্ষ্যের বিপরীতে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় ক্রমহ্রাসমান জমির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কাক্সিক্ষত ফসল উৎপাদন আজ সময়ের দাবি। কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণে আগামীর কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীর জন্য চাই মাঠ চাহিদাভিত্তিক বিজ্ঞানসম্মত, আধুনিক ও প্রায়োগিক কৃষি শিক্ষা কার্যক্রম। এজন্য কৃষি শিক্ষার আধুনিকায়ন ও হাতেকলমে প্রয়োগিক শিক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতায় ১৬টি কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে কৃষিবিষয়ক তথা ফসল উৎপাদন, মৎস্য চাষ ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ক প্রযুক্তিসমূহের তাত্ত্বিক, ব্যবহারিক ও প্রায়োগিক শিক্ষার পাশাপাশি দেশের কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনে মাঠ সংযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কৃষিক্ষেত্রে দক্ষ জনবল হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।  


শিখি-করি-খাই উদ্যোগের কোঅর্ডিনেটরের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং এটিআইয়ের প্রশিক্ষকদের নির্দেশনায় শিক্ষার্থীবৃন্দ ব্যবহারিক ও প্রায়োগিক কার্যক্রমে শাকসবজি, ফলমূলসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য ঝুঁকিবিহীন কৃষি পণ্য উৎপাদন করে আবাসিক হোস্টেল এবং নিজ বাড়িতে তাদের পুষ্টি চাহিদা পূরণ করছে।  সেসাথে হোস্টেলের খাদ্য ব্যয় হ্রাস করাসহ শিক্ষার্থীরা শ্রমভিত্তিক কার্যক্রমের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণের মাধ্যমে ‘সেমিস্টার টিউশন ফি’ অর্জন করে শিক্ষা ব্যয় হ্রাসের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। কৃষি ডিপ্লোমা পাঠ্যক্রমের আওতায় ব্যবহারিক ও প্রায়োগিক কার্যক্রমকে আরও গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষার্থীদের শ্রমভিত্তিক অংশগ্রহণে আত্মনির্ভরতা অর্থাৎ কৃষি প্রযুক্তি শেখা, হাতেকলমে করা এবং খাদ্য চাহিদা পূরণসহ আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার লক্ষ্যে কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ঝিনাইদহতে এক বিশেষ কার্যক্রম ‘শি-ক-খা’ (শিখি-করি-খাই) সাফল্যজনকভাবে পরিচালিত হচ্ছে।        

             
কার্যক্রমের উদ্দেশ্য  
সাধারণ উদ্দেশ্য

কৃষি ডিপ্লোমা পাঠ্যক্রমের আধুনিক প্রযুক্তিগুলোর তত্ত্বীয় জ্ঞান অর্জন, উৎপাদন সম্পর্কিত লব্ধ জ্ঞান হাতেকলমে প্রায়োগিক চর্চার মাধ্যমে স্বাস্থ্য ঝুঁকিবিহীন কৃষি পণ্য উৎপাদন এবং তা গ্রহণের মাধ্যমে পুষ্টিমান উন্নয়ন, শ্রমভিত্তিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়ে শিক্ষা ব্যয় হ্রাসসহ দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে উঠে আত্মনির্ভরশীল হওয়া।   


নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য
১. পাঠ্যক্রমের বিষয়াবলির তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন;
২. লব্ধ জ্ঞানের প্রায়োগিক প্রয়োগে স্বাস্থ্য ঝুঁকিবিহীন কৃষিপণ্য উৎপাদন;
৩. পুষ্টি চাহিদা পূরণ ও অতিরিক্ত আয় থেকে শিক্ষা ব্যয় পরিশোধ;
৪. দক্ষ জনশক্তি হিসেবে দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান এবং আত্মনির্ভরশীল হওয়া                                         
 

শি-ক-খা উদ্যোগ
কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, ঝিনাইদহতে অক্টোবর ২০১৩ থেকে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় এবং এ পর্যন্ত তিনটি  সেমিস্টারে মোট ২৭২ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছে। প্রতিটি এটিআইতে তত্ত্বীয় পাঠদানের পাশাপাশি  শিক্ষার্থীকে ব্যবহারিক বিষয়ে হাতেকলমে কাজ করানো হয়। বিগত অক্টোবর ২০১৪ মাসে অধ্যক্ষ ও মুখ্য প্রশিক্ষকদের যোগদানের পর ‘শি—-ক—-খা’ (শিখি-করি-খাই) উদ্যোগের পরিকল্পনা করা হয় এবং এর উদ্দেশ্য ও উপকারিতা বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে মতবিনিময় এবং মনস্তাত্বিকভাবে উদ্বুদ্ধ করার ফলে তাদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ এবং শ্রমভিত্তিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সদিচ্ছা দেখা যায়। ফলশ্রুতিতে এটিআই ঝিনাইদহতে বৃহত্তর আঙ্গিকে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে শিখি-করি-খাই শিরোনামে আত্মনির্ভরতা কার্যক্রম শুরু হয় এবং শিক্ষার্থীরা গ্রুপ ভিত্তিতে বরাদ্দকৃত প্লটে সবজি উৎপাদন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হয়। গ্রুপভিত্তিক প্লট ছাড়াও হোস্টেলে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীরাসহ ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থানকারী উদ্যোগী শিক্ষার্থীরা প্রশিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বাণিজ্যিকভাবে সবজি উৎপাদন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে উৎপাদিত ফসল হ্রাসকৃত মূল্যে হোস্টেলের খাদ্য তালিকায় যোগ করাসহ অতিরিক্ত সবজি বাজারজাতকরণের মাধ্যমে শিক্ষা সফর, খেলাধুলা, জ্ঞানচর্চাসহ শিক্ষা ব্যয় হ্রাসের জন্য আয় করছে।  


এ রকম আত্মনির্ভরশীল কর্মকাণ্ডের সম্পৃক্ততার কারণে তাদের মনোবল দৃঢ় হচ্ছে। এরই মধ্যে ইনস্টিটিউটের একমাত্র পুকুরটিকে শিক্ষার্থীদের মৎস্য চাষ ব্যবস্থাপনা পাঠ্যক্রমের আওতায় মাছ চাষের ব্যবহারিক ক্ষেত্র হিসেবে কাজে লাগিয়ে সেখানে  মনোসেক্স তেলাপিয়াসহ রুই, কাতল ও কার্পজাতীয় মাছের পোনা ছাড়া হয়েছে। প্রশিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণমূলক স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে মাছের চাষাবাদ কলাকৌশল শেখা এবং ব্যবহারিক কাজের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করে ভবিষ্যতে মাছ চাষের জন্য ক্ষুদ্র-মাঝারি খামার গড়ে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে। উৎপাদিত কৃষি পণ্য বিক্রয়ের অর্থ বিধিমোতাবেক স্বেচ্ছাশ্রমে অংশগ্রহণের আনুপাতিক হারে সব শিক্ষার্থীর (সাধারণ উপকারভোগী এবং অংশগ্রহণকারী উপকারভোগী) নামে জমা করা হয়, যা ব্যবহার করে শিক্ষা সফর, খেলাধুলার সামগ্রী ক্রয় এমনকি শিক্ষার্থীদের আংশিক ‘সেমিস্টার টিউশন ফি’ পরিশোধে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়াও এ উদ্যোগে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে নিজ ক্যাম্পাসে পরিছন্নতা, উন্নয়ন, বৃক্ষরোপণসহ অন্যান্য এলাকায় বৃক্ষরোপণ, সবুজায়ন, সামাজিক বনায়ন ইত্যাদি সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।  


অর্থ ব্যবহার
শি-ক-খা কার্যক্রমে প্রাথমিকভাবে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক উপকরণ খাত হতে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। মাছ চাষসহ অন্যান্য কৃষি পণ্য উৎপাদনে অধিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে ইনস্টিটিউটে কর্মরত প্রশিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী যৌথভাবে অর্থ জোগান দিতে সম্মত হয়েছেন। এছাড়াও বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের নিয়মানুযায়ী আবর্তক তহবিল ব্যবহার করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে জমি, স্থাপনা বা পুকুর ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারি নিয়মানুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া  হবে। এ ধরনের মহতী উদ্যোগে যে কোনো ব্যক্তি, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল (ঈঝজ) হতে সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে। এছাড়াও ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরা নিজস্ব তহবিল গঠন করে তা ব্যবহার করতে পারে। এমনকি নার্সারি কার্যক্রম, উচ্চমূল্য ফসল উৎপাদন ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেও ব্যয় নির্বাহ করা যেতে পারে।  


শি-ক-খা উদ্যোগ পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা
অধ্যক্ষ, এটিআই ঝিনাইদহ জনাব হানিফ মোহাম্মদ পদাধিকার বলে শি—-ক—-খা উদ্যোগের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি এ উদ্যোগকে সাফল্যম-িত করার জন্য সার্বিকভাবে পরামর্শ, সহযোগিতা ও বিধি মোতাবেক পৃষ্ঠপোষকতা করেন। ইনস্টিটিউটের মুখ্য প্রশিক্ষক জনাব মাহফুজ হোসেন মিরদাহ এ উদ্যোগের কোঅর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি গৃহীত কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সাধন ও তা সাফল্যজনকভাবে সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ প্রদান করেন।  তিনি এ উদ্যোগের নতুন নতুন কার্যক্রম চিহ্নিতসহ তা একেকটি প্রকল্প হিসেবে শুরুর জন্য পরিকল্পনা প্রণয়নে সার্বিক সহযোগিতা করেন। একেকটি কার্যক্রম প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করা হলে তা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য এটিআইয়ের প্রশিক্ষকদের মধ্য হতে একজনকে দায়িত্ব দেয়া করা হয়। প্রধান পৃষ্ঠপোষকের নেতৃত্বে সব প্রশিক্ষকের সমন্বয়ে একটি  ‘শি-ক-খা  পরিচালনা পরিষদ’  উদ্যোগটির সব কার্যক্রম পরিচালনার নীতিগত ও অর্থনৈতিক অনুমোদন প্রদান করেন। পরিচালনা পরিষদ একাধিক প্রশিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যে কোনো প্রকল্প ব্যবস্থাপনার জন্য দায়িত্ব প্রদান করতে পারবেন। প্রকল্প সমাপ্তের পর প্রকল্পে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশিক্ষক আয়-ব্যয় হিসাবপূর্বক লভ্যাংশ নির্ধারণ করবেন এবং পরিচালনা পরিষদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত হিসেবে লভ্যাংশের অর্থ বণ্টন করবেন এবং সংশ্লিষ্টদের অবগত করবেন। বিভিন্ন সময়ে ‘শি-ক-খা  পরিচালনা পরিষদ’ এর সিদ্ধান্তের আলোকে উদ্যোগটি পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা যেতে পারে।      


ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
কৃষি ডিপ্লোমা পাঠ্যক্রমের বিন্যাস অনুযায়ী আগামীতে শি-ক-খা  কার্যক্রমে পাখি ও মুরগি পালন, গরু মোটাতাজাকরণ, ছাগল পালন, মাশরুম চাষ, নার্সারি স্থাপন, কেঁচো কম্পোস্ট ইত্যাদি কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি কার্যক্রমকে একেকটি প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করে ক্লাসের পূর্বে বা পরে দিনের নির্দিষ্ট সময়ে প্রশিক্ষকদের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছাশ্রমে অংশগ্রহণ করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে এবং উপকারভোগী হিসেবে মুনাফার একটি অংশ তাদের নামে জমা হতে থাকবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা অভিজ্ঞতা লাভ করে নিজেদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারবে। এভাবে সব শিক্ষার্থী পাঠ্যক্রমের সব বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির সাথে সাথে পুষ্টিমান উন্নয়ন ও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়ে ‘সেমিস্টার টিউশন ফি’ পরিশোধের প্রয়োজনীয় অর্থের একটি বিরাট অংশ প্রদানে সমর্থ হবে বলে আশা করা যায়। অত্র ইনস্টিটিউটে এ কার্যক্রমের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ডিএইর আওতাধীন অন্যান্য সরকারি এটিআইগুলোতে এ উদ্যোগ চালু করা যেতে পারে। বর্তমানের সীমাবদ্ধতাগুলো অতিক্রমে বৃহত্তর আকারে বিভাগীয় উদ্যোগের পাশাপাশি বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডসহ অন্যান্য আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় ‘শি—-ক—-খা’ কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ঝিনাইদহর কৃষি ডিপ্লোমা পাঠ্যক্রমের শিক্ষার্থীদের আত্মনির্ভরতা উদ্যোগকে সাফল্যের শিখরে নিয়ে যেতে পারে।

* কোঅর্ডিনেটর (শিখি-করি-খাই) এবং মুখ্য প্রশিক্ষক, এটিআই, ডিএই, ঝিনাইদহ, ফোন-০১৫৫২৩৪০১৮৮


Share with :

Facebook Facebook