কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

ভেষজগুণে সমৃদ্ধ শাক-রুকোলা

রুকোলা (জঁপড়ষধ) হচ্ছে সরিষা পরিবারের (ইৎধংংরপধপবধব) একটি বর্ষজীবী, দুর্বল কা- ও সবুজ পাতাবিশিষ্ট উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে ঊৎঁপধ ংধঃরাব। এ প্রজাতির দেহগত ক্রোমোসোম সংখ্যা ২হ = ২২ এবং বীজই হচ্ছে বংশবিস্তারের একমাত্র মাধ্যম। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এটি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। যেমনÑ ইতালিতে রুকোলা, আমেরিকাতে আরুগুলা, জার্মানিতে সালাট্রুকা, স্পেনে ইরুকা এবং ফ্রান্সে রকেট। রুকোলার উৎপত্তিস্থান হচ্ছে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল। ইতালিতে রুকোলা, রোমান কাল থেকে চাষ করা হচ্ছে, তাই ধারণা করা হয় যে, ইতালিই এর উৎপত্তিস্থান। এ অঞ্চল থেকে পরবর্তীতে বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশে এটি বিস্তার লাভ করে। বর্তমানে এটি বাণিজ্যিকভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ (ইতালি, ফ্রান্স, পর্তুগাল এবং চেকপ্রজাতন্ত্র), মিসর, তুরস্ক ও আমেরিকাতে (ইন্ডিয়ানা এবং মিডওয়েস্ট) চাষ হচ্ছে। রুকোলা একটি শীত পছন্দকারী উদ্ভিদ। শীতকালে দ্রুত পাতার বৃদ্ধি ঘটে কিন্তু বসন্তকালে গরম আবহাওয়ায় আকাশাভিমুখে ফুলের স্টক তৈরি করে এবং বীজ ধারণ করে। এ উদ্ভিদটি প্রায় ২০-১০০ সেমি. পর্যন্ত উচ্চতা হয়ে থাকে। বীজ বপনের এক মাস পরেই পাতা সংগ্রহ করা যায়। রুকোলার পাতা রসালো, লম্বাটে ও খাঁজযুক্ত। শিকড় ছাড়া এ উদ্ভিদের সব অংশই যেমনÑ পাতা, ফুল, অপরিপক্ব পড ও বীজ খাবার উপযোগী। তবে পাতাই খাদ্য হিসেবে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। রুকোলার সবুজ সতেজ পাতা সরাসরি কাঁচা সালাদ হিসেবে টমেটো, জলপাই ও পনীরের সাথে, পিজা তৈরির পর পরিবেশনের সময় পিজা টপিং হিসেবে, পাস্তার সাথে এবং মাছ ও মাংস দিয়ে তৈরি বিভিন্ন সুস্বাদু খাবারে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। এছাড়াও এর বীজ থেকে ভোজ্যতেল উৎপাদন করা যায়। কখনও কখনও এটি শাক হিসেবে পালংশাকের মতো রান্না করে খাওয়া যায়।
সবুজ শাকসবজির স্বাস্থ্যপকারিতা এখন সর্বজনবিদিত, কারণ এতে স্বাস্থ্য উদ্দীপক রাসায়নিক উপাদানের প্রাচুর্যতা রয়েছে। নিয়মিত প্রচুর পরিমাণে সবুজ রুকোলা গ্রহণের মাধ্যমে আমরা ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, হৃদরোগ ও রক্তনালি সংক্রান্ত রোগের বিরুদ্ধে আমাদের দেহে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি, যা এরই মধ্যে বৈজ্ঞানিক গবেষণা দ্বারা প্রমাণিত। আমেরিকার ন্যাশনাল নিউট্রিয়েন্ট ডেটাবেস (স্ট্যান্ডার্ড  রেফারেন্স) অনুযায়ী প্রতি ১০০ গ্রাম সবুজ রুকোলা পাতাতে শক্তি রয়েছে মাত্র ২৫ কিলোক্যালরি কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে ফলিক অ্যাসিড (৯৭ মাইক্রোগ্রাম), ভিটামিন-এ (২৩৭৩ আইইউ), ভিটামিন-সি (১৫ মিলিগ্রাম), ভিটামিন কে (১০৮.৬ মাইক্রোগ্রাম) এবং ভিটামিন-বি-কমপ্লেক্স। গ্রহণযোগ্য মাত্রায় রয়েছে ফ্লাভোনল নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা ত্বক, ফুসফুস এবং মুখগহ্বর ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কাজ করে। রুকোলা পাতাতে প্রচুর পরিমাণে কপার ও আয়রন জাতীয় খনিজ উপাদান রয়েছে। তবে স্বল্প পরিমাণে ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ এবং ফসফরাস রয়েছে। এছাড়াও এর সবুজ পাতায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসহায়ক রাসায়নিক উপাদান, যেমন সালফিউরাফ্যান, থায়োসায়ানেটস, আইসো-থায়োসায়ানেটস, ইনডলস ও আলফা-লিপোইক অ্যাসিড। এরা সম্মিলিতভাবে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার যেমন- প্রোস্টেট, ব্রেস্ট, সারভিক্যাল, কোলন এবং ওভারিয়ান ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কাজ করে। সালফিউরাফ্যান ‘হিস্টোন ডিঅ্যাসিটাইলেজ’ নামক এনজাইমের কার্যকারিতা ব্যাহত করার মাধ্যমে ক্যান্সার কোষ বৃদ্ধিতে বাধা প্রদান করে। অস্ট্রেলিয়ান রুরাল ইন্ডাস্ট্রিজ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের (আরআইআরডিসি) প্রাক্কলন মতে, সবুজ রুকোলা পাতার ক্যান্সার প্রতিরোধ ক্ষমতা সরিষা পরিবারের অন্যান্য শাকসবজি থেকে অনেক বেশি। রুকোলার সবুজ পাতা যেহেতু সরাসরি পিজা এবং সালাদে ব্যবহৃত হয়, সেহেতু সবুজ পাতায় থাকা ক্লোরোফিল, হেটারোসাইক্লিক অ্যামাইনসের (যা সাধারণত উচ্চ তাপমাত্রায় তেলে ভাজলে বা ঝলসালে নিঃসৃত হয়) কার্সেনোজেনিক প্রভাব থেকে রক্ষা করে। রুকোলাতে বিদ্যমান আলফা-লিপোইক এসিড রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমাতে এবং ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে। এছাড়াও নিয়মিত রুকোলা পাতা গ্রহণ করলে হৃৎপি- এবং রক্তনালির রোগের ঝুঁকি কমে।
আমাদের দেশে এ পর্যন্ত কোথাও রুকোলা চাষের সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে ২০১৪ সনে বাংলাদেশে প্রথম ইতালি থেকে বীজ সংগ্রহ করে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগে এ স্বাস্থ্যপোযোগী উদ্ভিদটি নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে। গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে যে, এটি বাংলাদেশের আবহাওয়ায় সারা বছর জন্মানো সম্ভব, তবে পাতার বৃদ্ধি ও উৎপাদন শীতকালে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু পাতার মতো সারা বছর বীজ উৎপাদন করা যায় না, শীতের শেষে বসন্তের প্রারম্ভে এ উদ্ভিদটি ফুল ও বীজ উৎপাদন করে। বাংলাদেশে রুকোলার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। যেহেতু সারা বছর পাতা উৎপাদন সম্ভব, সেহেতু গ্রামে বাড়ির আঙিনায় সামান্য একটু জায়গায় এবং শহরে ৪-৫টি টবে বাসার ছাদে কিংবা বেলকোনিতে জন্মিয়ে সারা বছর সতেজ পাতা পাওয়া সম্ভব। য়


Share with :

Facebook Facebook