কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

ফসলের বাণিজ্যিক উৎপাদনে বালাইনাশকের ব্যবহার ও করণীয়

ফসলের বাণিজ্যিক উৎপাদনে বালাইনাশকের ব্যবহার কৃষিতে নতুন কোনো বিষয় নয়। বিভিন্ন ধরনের রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে ফসলকে রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন বালাইনাশকের পরিকল্পিত ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা আছে। আবহাওয়াগত কারণে ও জলবায়ুগত পরিবর্তনের ফলে ফসল উৎপাদনে বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হচ্ছে চাষিদের। এর মধ্যে রোগ ও পোকামাকড়ের সমস্যা অন্যতম। আর এ কাজে সহযোগিতা করছেন দেশের অনেক বালাইনাশক কোম্পানি। তাদের লক্ষ্য হলো কৃষকের পাশে থেকে তাদের ফসল উৎপাদনে  রোগবালাই দমনে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করা এবং দেশের কৃষি উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখা। তবে বর্তমান সময়ে ফল-ফসলে বালাইনাশকের ব্যবহার বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এদেশে উষ্ণ ও অব-উষ্ণ ম-লের আবহাওয়া বিরাজমান এবং জলবায়ুগত পরিবর্তনের কারণে রোগবালাই তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে। উচ্চ তাপমাত্রা ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা অধিকাংশ ক্ষতিকারক পোকামাকড় ও রোগের জীবাণুর প্রজনন ও বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ফলে ফসল উৎপাদনে প্রতিনিয়ত দেখা যাচ্ছে নতুন নতুন সমস্যা। ফল-ফসলের বাণিজ্যিক উৎপাদনে এগুলোর দমন অনেক সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি হয়ে পড়ে। আর এর দমনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন আমাদের চাষিরা। প্রায় সব ফল-ফসলে বালাইনাশকের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছু কিছু সবজি উৎপাদনে প্রায় প্রতি দিনই কীটনাশক ¯েপ্র করা হচ্ছে এবং দেশের জনগণ তা খাচ্ছে প্রতিনিয়ত। যদি আমের কথাই ধরা যায়, আম এদেশে চাষযোগ্য প্রধান অর্থকরী ফসল ও জনপ্রিয় একটি ফল। ছোট-বড় সব মানুষের কাছে এটি একটি পছন্দনীয় ফল। তবে সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো পছন্দনীয় এ ফলটি উৎপাদনের জন্য বহুবার (১৫-৬২ বার) বালাইনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। এক দশক আগেও এসব আমবাগানে ২-৩ বার বালাইনাশক ব্যবহার করে আশানুরূপ ফলন পাওয়া গেছে। তবে গত কয়েক বছরের প্রচার-প্রচারণা এবং ব্যাগিং প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে স্প্রের পরিমাণ এখন কমে দাঁড়িয়েছে ২০-৩০ বারে। এখানে একটি কথা বলে রাখা দরকার ব্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাত্র সাড়ে তিনবার ¯েপ্র করেই রপ্তানিযোগ্য আমের উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। আমের মৌসুম শুরুর আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় আম গাছে ¯েপ্র করা। কেউ শুরু করেন দেখে দেখে, কেউবা শুনে শুনে আর কিছু সংখ্যক চাষি করেন প্রয়োজনে। এছাড়াও আর একটি কারণ হলো আমবাগান হাতবদল হয় ৪-৫ বার বা আরও বেশি এবং প্রত্যেক ক্রেতাই প্রত্যাশা করেন অধিক মুনাফা লাভের জন্য। এসব কারণে বাড়তে থাকে আম বাগানে বালাইনাশকের স্প্রের পরিমাণ। আপনারা জেনে অবাক হবেন ককটেলের ব্যবহার এখন শুরু হয়েছে আমবাগানে। তবে এ ককটেল বলতে একাধিক কীটনাশক, ছত্রাকনাশক ও হরমোনের একত্রে নিম্নমাত্রার মিশ্রণকে বুঝানো হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট গবেষকদের মতে, এ ককটেল কখনও কার্যকরী হতে পারে না। তাদের মতে যে কোনো বালাইনাশকে যদি পরিমিত মাত্রায় কার্যকরী উপাদান থাকে এবং সঠিক মাত্রায় ব্যবহার করা হয় তাহলে নির্দিষ্ট বালাইনাশক নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য যথেষ্ট। তবে চাষিদের মতে, একটি কীটনাশক, ছত্রাকনাশক ও মাকড়নাশক নির্দিষ্ট পোকামাকড় এবং রোগ দমনে কার্যকরী না হওয়ায় তারা ককটেল ব্যবহার করে থাকেন। যদিও বালাইনাশকে কার্যকরী উপাদানের উপস্থিতি নিশ্চিত করার দায়িত্ব কৃষকের নয় বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিশ্চিত করবেন এবং করে থাকেন বলে আমরা মনে করি। তাহলে সমস্যাটি কোথায়? সব কিছু ঠিক থাকলে বালাইনাশক ব্যবহার করে কাক্সিক্ষত ফলাফল পেতে অবশ্যই ¯েপ্রর মূলনীতি ভালোভাবে অনুসরণ করা উচিত।  
স্প্রের মূলনীতি
স্প্রের সুফল পেতে হলে যে কোনো বালাইনাশক স্প্রে করতে ৪টি মূলনীতি অবশ্যই মেনে চলা উচিত। এগুলো হলো সঠিক বালাইনাশক নির্বাচন, সঠিক ডোজ বা মাত্রা নির্ধারণ, সঠিক সময় নির্বাচন এবং সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ।

    বালাইনাশক নির্বাচন
    নির্বাচন মাত্রা নির্ধারণ
    সময় নির্বাচন
    পদ্ধতি অনুসরণ
সঠিক বালাইনাশক নির্বাচন
আমের রোগ বা ক্ষতিকর পোকা লাভজনকভাবে ও কম খরচে দমন করতে সঠিক ওষুধ নির্বাচন করা একটি অতীব গুরুত্বপূর্র্ণ পদক্ষেপ। ওষুধ নির্বাচনে কোনো ভুল হয়ে থাকলে স্প্রে কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে ভেস্তে যায়। এতে শ্রম, সময় ও অর্থের অপচয় ঘটে উপরস্তু আসল উদ্দেশ্য সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হয়। অনেক কৃষক কীটনাশক ডিলারদের জিজ্ঞাসা করেন কি ওষুধ স্প্রে করতে হবে, এটা মোটেই ঠিক নয়। এ ব্যাপারে সঠিক পরামর্শের জন্য স্থানীয় কৃষিকর্মী, কৃষি কর্মকর্তা অথবা আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রে (আম গবেযণা কেন্দ্রে) যোগাযোগ করা উচিত। একই কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক  বার বার স্প্রে না করে মাঝে মাঝে পরিবর্তন করা উচিত। কারণ একই ওষুধ বার বার স্প্রে করলে পোকা বা রোগের জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যেতে পারে এবং পরবর্তীতে ওষুধ কাজ নাও করতে পারে।
সঠিক মাত্রা নির্ধারণ
সঠিক বালাইনাশক সঠিক মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে। বালাইনাশকের মাত্রা কম বা বেশি না হওয়ায় উত্তম। উপযুক্ত মাত্রা না হলে রোগ বা পোকামাকড় ভালোভাবে দমন করা সম্ভব হয় না। উপরন্তু রোগের জীবাণু বা পোকার মধ্যে বালাইনাশক প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়। আবার অধিক মাত্রায় বালাইনাশকের ব্যবহার অর্থের অপচয় হয় এবং ফলগাছের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তাই বালাইনাশকের মাত্রার ব্যাপারে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এজন্য বোতল বা প্যাকেটের গায়ে লিখিত নির্দেশনা, কৃষি বিজ্ঞানীদের, কৃষি কর্মকর্তা এবং কৃষিকর্মীর পরামর্শমতো কাজ করা উচিত।
সঠিক সময় নির্বাচন
কথায় বলে, সময়ের এক ফোড় অসময়ের দশ ফোড়। এ কথা সত্য যেকোনো কাজ সঠিক সময়ে সমাধা করতে পারলে বাড়তি শ্রম ও বাড়তি খরচের অপচয় থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। আমগাছে মুকুল আসার পর থেকে ফলধারণ পর্যন্ত সময়টুকু বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে রোগ বা পোকার আক্রমণ হলে গাফিলতি করা মোটেই ঠিক নয়। এ সময়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হলে আমগাছে ফলধারণ নাও হতে পারে। আমগাছে মুকুল আসার ১৫-২০ দিন আগে প্রথমবার, আমের মুকুল ১০-১২ সেমি. হলেই দ্বিতীয়বার এবং আম মটরের দানার সমান হলে তৃতীয়বার স্প্রে করা উচিত। মুকুলের ফুল ফোটার পর কোনো অবস্থাতেই স্প্রে করা যাবে না। আমের পরাগায়ন প্রধানত বিভিন্ন প্রজাতির মাছি ও মৌমাছি দ্বারা হয়ে থাকে। তাই ফুল ফোটার সময় কীটনাশক স্প্রে করলে মাছি মারা যেতে পারে এবং আমের পরাগায়ন ও ফলধারণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। গাছ থেকে ফল পাড়ার ১৫-২০ দিন আগ থেকে গাছে কোনো বালাইনাশক স্প্রে করা উচিত নয়। গাছে মুকুল বের হওয়ার আগেই অর্থাৎ জানুয়ারি মাসে প্রয়োজনীয় অর্থ, শ্রমিক, স্প্রে যন্ত্রপাতি, ওষুধ ইত্যাদি মজুদ রাখতে হবে।
সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ
সঠিক ওষুধ, সঠিক মাত্রা, সঠিক সময় ইত্যাদি নির্ধারণের পর সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ একান্ত প্রয়োজন। স্প্রে কার্যক্রম থেকে পরিপূর্ণ ফল লাভ করতে হলে অবশ্যই সঠিক পদ্ধতিতে স্প্রে করতে হবে। ফলের মধ্যে বা ডালের মধ্যে ছিদ্রকারী পোকা অবস্থান করলে বাইরে কীটনাশক স্প্রে করলে কোনো লাভ হয় না। আমের হপার পোকা সুষ্ঠুভাবে দমন করতে হলে পাতায় স্প্রে করার সাথে সাথে গাছের গুঁড়িতেও স্প্রে করা প্রয়োজন। তাই সুষ্ঠুভাবে রোগ বা পোকা দমনের জন্য স্থানীয় কৃষি অফিস বা আম গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীদের সাথে আলাপ করে পরামর্শ নেয়া উচিত।
স্প্রে করার সময়ে সতর্কতা
যিনি স্প্রে করবেন তার যেন স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি না হয় সেইদিকে অবশ্যই লক্ষ্য রাখবেন। এ্যাপ্রোন, মাস্ক, চোখে চশমা, মাথায় হেলমেট বা গামছা দ্বারা আবৃত করে ¯েপ্র করা উচিত। স্প্রে করার সময় কোনো কিছু না খাওয়ায় উত্তম। প্রখর সূর্যালোকে স্প্রে না করাই ভালো। স্প্রে কার শেষ হলে পরিষ্কার পানিতে হাত, মুখসহ অন্যান্য অংশগুলো ভালভাবে সাবান দিয়ে ধৌত করতে হবে। সম্ভব হলে গোসল করা উত্তম।
পোকামাকড় ও রোগ দমনে প্রথমে সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনা পদ্ধতির প্রয়োগ করা উচিত। অতিরিক্ত বালাইনাশকের ব্যবহার যেমন ফসলের উৎপাদনকে ব্যয়বহুল করে তেমনি সময় ও শ্রমের অপচয় ঘটায়। এছাড়াও আমাদের প্রকৃতিতে বিদ্যমান উপকারী ও বন্ধু পোকাকে ধ্বংস করে ফলে শত্রু পোকার সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে বিভিন্ন ফলে পরাগায়নের সহায়কের অভাবে ফলধারণ ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। অধিক বালাইনাশক ব্যবহার করে উৎপাদিত ফল আমাদের স্বাস্থ্যের জন্যে হুমকিস্বরূপ। এ অবস্থায় রোগ ও পোকামাকড় দমনে স্প্রের নিয়মনীতি অনুসরণ করে বালাইনাশক ব্যবহার করবেন চাষিরা এমনটাই প্রত্যাশা। আমরা আশা করি কৃষি উৎপাদনের সাথে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় দেশে উৎপাদিত হবে গুণগত মানসম্পন্ন ফল-ফসল যা নিশ্চিন্তে ভোগ করবেন দেশের সাধারণ জনগণ এটিই আমাদের প্রত্যাশা। য়

 


Share with :

Facebook Facebook