কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক সুরক্ষায় কৃষি

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় খাত, জিডিপিতে যার অবদান ১৮.৭ শতাংশ (বিবিএস, ২০১২-১৩)। এ খাত এখনো শতকরা প্রায় ৭৫ ভাগ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবিকা নির্বাহের প্রধান উৎস। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল এবং স্বল্পোন্নত দেশে আশংকাজনক হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি (বাৎসরিক ১.৩৭ শতাংশ) দৈনন্দিন পুষ্ঠি চাহিদা পূরণের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিকূলতা হিসেবে বিবেচিত। এই বিশাল জনসংখ্যার ভরণ পোষণের জন্য খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষির টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিতভাবে কৃষি জমির হ্রাস (বাৎসরিক ১.০ শতাংশ হারে) এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি জলবায়ুর প্রভাব খাদ্য উৎপাদনে বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ভবিষ্যতে গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি নির্দিষ্ট হারে খাদ্য সরবরাহ একাšত প্রয়োজন। এ যখন বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র, ঠিক সে সময়ে বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য হিসেবে ‘‘গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক সুরক্ষায় কৃষি” বিষয়টি গৃহীত হয়েছে। এ প্রতিপাদ্যের মূল তিনটি উপাদান- (১) গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন, (২) সামাজিক সুরক্ষা এবং (৩) কৃষি। অর্থাৎ গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক সুরক্ষা প্রতিষ্ঠায় কৃষি কী ভূমিকা পালন করছে এবং করতে পারে তা অনুধাবন করা। বিশ্ব পরিসরে এ প্রতিপাদ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপাদান তিনটি কেবলই পারস্পারিকভাবে সম্পর্কযুক্তই নয়, পারস্পরিকভাবে নির্ভরশীলও বটে। সামাজিক সুরক্ষা না থাকলে কেবল কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সফলতা অর্জনের মাধ্যমে গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন খুবই দুরূহ কাজ।
 

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পরই গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সংঘবদ্ধ করে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কৃষি উৎপাদন, উন্নয়ন ও সফল বিপণনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে চেয়েছিলেন তিনি। তাঁর দূরদর্শী উপলব্ধি ছিল- ‘কৃষি প্রধান বাংলাদেশে কৃষিই এর আর্থসামাজিক অবস্থার ভিত্তি, কৃষিই কৃষ্টির মূল’। কৃষিতে সবুজ বিপ্লব ঘটানোর উদ্দেশ্যে ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মাফ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের আর্থিক দায়বদ্ধতা লাঘব, নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণের চিন্তা মাথায় রেখে তিনি কৃষকদের জন্য নিয়ে ছিলেন যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তাঁর সরকার প্রণীত প্রথম দ্বিবার্ষিক পরিকল্পনায় তিনি কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। কৃষিবিষয়ক জ্ঞান চর্চা ও প্রয়োগে মেধাবী শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তিকে উৎসাহিত করার জন্য তিনি সরকারি চাকুরিতে কৃষি পেশাজীবীদের প্রথম শ্রেণির মর্যাদা দিয়েছিলেন। তাই বলা চলে, ২০১৫ সনে বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্যের সুর বঙ্গবন্ধুর প্রাণে বেজেছিল আজ থেকে প্রায় ৪৪ বছর আগে।
 

ধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য, যা মোট দানাশস্যের প্রায় ৯৫ শতাংশ চাহিদা মিটায় এবং জনগণের পুষ্টির প্রায় ৭০ শতাংশ এর বেশি ক্যালরী সরবরাহ করে। ইহা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূরীকরণে বিরাট ভূমিকা রেখে চলেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, ১৯৭২-৭৩ অর্থ বছরে দেশে মোট চাল উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ১.০ কোটি মে. টন, যা ২০১৪-২০১৫ অর্থ বছরে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৩.৪৭ কোটি মে. টন। সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, ২০০৮-২০০৯ অর্থ বছরে যেখানে মোট খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছিল ৩.৩৩ কোটি মে. টন, সেখানে ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৮৫ কোটি মে. টনে। ২০০৮-২০০৯ অর্থ বছরে যেখানে আলু ও সবজির উৎপাদন হয়েছিল যথাক্রমে ৬৭.৪৬ ও ১০৬.২২ লাখ মে. টন, সেখানে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৯৩.২৮ ও ১৪২.৩৭ লাখ মে. টনে। সুতরাং দেখা যায় যে, সরকারের সঠিক কৃষি নীতি প্রণয়ন, সঠিক মূল্যে সময় মতো উপকরণ সরবরাহ ও কৃষি প্রযুক্তির ব্যাপক অগ্রসরতার কারণে জমি কমে যাওয়া সত্ত্বেও বিগত ৪৪ বছরে বাংলাদেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন তিন গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, মাত্র ১০ টাকা দিয়ে ৯৬ লাখ কৃষকের ব্যাংক একাউন্ট খোলা, এক কোটি ৪০ লাখ কৃষককে কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড প্রদানের মাধ্যমে কৃষি উপকরণ প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণ এবং ডাল, তেল, মসলা ইত্যাদি ফসল চাষের জন্য মাত্র ৪ শতাংশ হার সুদে কৃষি ঋণ প্রদান, ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি ও মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য কৃষক পর্যায়ে সুষম সারের চাহিদা দূরীভূত করতে সরকার কর্তৃক সার বিতরণ ও মনিটরিং জোরদার করে ব্যাপক ভর্তুকি দেয়ার মাধ্যমে চার দফা রাসায়নিক সারের মূল্য কমানো এবং সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ দ্বারা সেচ প্রদানে স্মার্ট কার্ড প্রচলন করা হয়েছে। এছাড়া, ৩০ শতাংশ ভর্তুকিতে খামার যন্ত্র সরবরাহের মতো যুগান্তকারী পদক্ষেপ এবং বন্যা, পাহাড়িঢলসহ বিভিন্ন দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন ও আউশ ধান চাষে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে প্রণোদনা প্রদানসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের কৃষকদেরকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উপকরণ সহায়তা প্রদানের মতো জনবান্ধব কাজ করেছে সরকার । প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, খরিফ-১/২০১৫-১৬ মৌসুমে উফশী আউশ ধান ও বোনা আউশ ধান (নেরিকা) চাষে প্রণোদনার লক্ষ্যে সর্বমোট ২,১০,০০০ কৃষককে বিনামূল্যে বীজ ও রাসায়নিক সার প্রদান করা হয়েছে।


স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত এ দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরকারের নিরলস প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের গভীরতা ও তীব্রতা উভয়ই উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। স্বাধীনতার পর যেখানে বাংলাদেশে দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী লোকের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৩ শতাংশ, তা কমে বর্তমানে দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী লোকের সংখ্যা ২৪ শতাংশ, এর মধ্যে গ্রামীণ দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী লোকের সংখ্যা ৩১.৫ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের গবেষণামূলক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, বিগত এক দশকে অর্থাৎ ২০০১-১০ মেয়াদে বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমেছে প্রায় দেড় কোটি। অথচ এর ঠিক আগের দশকে অর্থাৎ ১৯৯০-২০০০ সনের মধ্যে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমেছিল মাত্র ২৩ লাখ। এ সফলতা সত্ত্বেও এখনো পর্যন্ত দেশের সব নীতি নির্ধারণ ও উন্নয়ন কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে দারিদ্র্য বিমোচন। দারিদ্র্য বিমোচন হচ্ছে এদেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা। এক্ষেত্রে দেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির পেছনে সরকারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কার্যক্রম, বেসরকারি পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগ এবং একই সঙ্গে সামাজিক উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশে দারিদ্র্য হ্রাস পাওয়ায় মানব উন্নয়ন সূচকেও লক্ষণীয় অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। Human Development Report ২০১৩ অনুযায়ী ২০১২ সনে বিশ্বের ১৮৭টি দেশের মধ্যে মানব উন্নয়নে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৬তম।


বাংলাদেশের পরিকল্পিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়টি সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। ১৯৭৩ সন থেকে ২০১৫ সন পর্যন্ত ৬টি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং একটি দ্বিবার্ষিক পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার অন্যতম লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্য বিমোচন। এ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সমূহের ফলে বাংলাদেশ আয় ও মানব দারিদ্র্য দূরীকরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। ২০১৭ সনের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) এবং ২০৩০ সনের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ব্যাপারে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্য অর্জনের ধারাবাহিকতায় সরকার কর্তৃক দ্বিতীয় দারিদ্র্য নিরসন কৌশল পত্রের সময়োপযোগী সংশোধন (জাতীয় দারিদ্র্য নিরসন কৌশলপত্র-২, ২০০৯-২০১১: দিন বদলের পদক্ষেপ) করা হয়েছে। বাংলদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্প হিসেবে ‘‘বাংলাদেশ প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০১০-২১)” শীর্ষক দলিল প্রণয়ন করা হয়। এ রূপকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০১১-১৫ মেয়াদের জন্য ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। এ পরিকল্পনায় দারিদ্র্য নিরসনকল্পে কৃষি খাতের যে ভূমিকার উল্লেখ রয়েছে তা হলো: দরিদ্র অঞ্চলে উপার্জনক্ষম লোকের কাজের সুযোগ সৃষ্টি; কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং অকৃষি খাতে কর্মসৃজন; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, পানি সরবরাহ ও পুষ্টি খাতে সরকারি ব্যয়ে আঞ্চলিক বৈষম্যের বিষয়টির ওপর অধিকতর গুরুত্বারোপ; খাস জমি বিতরণ, সার, বীজ, সেচ, বিদ্যুৎ এবং গ্রামীণ সড়ক ব্যবস্থা ইত্যাদি বিভিন্ন উপাদান সহায়ক বিষয়সমূহে দরিদ্রদের অগ্রাধিকার নিশ্চিতকরণ; শহরবাসী দরিদ্রদের জন্য নাগরিক সুবিধা প্রদান করা। দারিদ্র্য নিরসনের অঙ্গীকার নিয়ে ২০১৬-২০ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ এগিয়ে চলেছে। এসব কার্যক্রমের উদ্দেশ্য হচ্ছে উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন তথা দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী জনগণের সংখ্যা ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং ২০২১ সনের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা।


জাতীয় কৃষি সম্প্রসারণ নীতির আলোকে গৃহীত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) কর্তৃক দলগত পদ্ধতিতে (Group approach) সম্প্রসারণ সেবাদানের বর্তমান কৌশল “গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক সুরক্ষায় কৃষি” এর এক সুন্দর সমন্বয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়িত উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ যেমন- সমন্বিত কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ প্রকল্পের আওতায় গঠিত হচ্ছে গ্রাম সংগঠন, উক্ত সংগঠনগুলোকে কেন্দ্র করে উপকরণ বিতরণ, উন্নত প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ ইত্যাদি কার্যক্রমের মাধ্যমে স্বনির্ভরতা অর্জনের যে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে, তার মাধ্যমে গড়ে উঠছে সামাজিক সুরক্ষার দৃঢ়মূল বেষ্টনী যার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে গ্রামীণ দারিদ্র্য দূরীকরণ। এ ধরনের উদ্যোগের নানা দৃষ্টান্ত ইতোমধ্যেই বিপুল অবদান রাখতে শুরু করেছে। ময়মনসিংহ - শেরপুর প্রকল্পের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে ভিলেজ বেজড্ অর্গানাইজেশন বা ভিবিও। ময়মনসিংহ ও শেরপুর জেলার ৪৮টি গ্রামে ভিবিও গঠন করা হয়েছে। কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতা, ন্যায্য মূল্যে কৃষি উপকরণ ও উৎপাদিত পণ্য ক্রয় বিক্রয়ের সুবিধা তৈরির জন্য প্রকল্প এলাকায় স্থাপিত হয়েছে ৫টি পল্লী বাজার। ঘঅঞচ প্রকল্পের মাধ্যমে ২৫টি জেলায় ১৩,৪৫০টি সিআইজি এবং এসসিডিপি প্রকল্পের মাধ্যমে ২৭টি জেলায় ১২,০০০টি ক্ষুদ্র কৃষক দল গঠন করা হয়েছে। এছাড়া আইএফএমসি প্রকল্পের মাধ্যমে ৬টি জেলার ১৫৩টি কৃষক সংগঠন (FO) এবং আইপিএম প্রকল্পের মাধ্যমেও গঠিত হয়েছে ৩,০৭৩ আইপিএম ক্লাব। সংগঠিত এসব সমিতির পুঁজি গঠনের জন্য শেয়ার ক্রয়, সঞ্চয় জমাদান ও বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হচ্ছে উল্লিখিত কৃষক সংগঠনগুলোর প্রণীত পরিকল্পনার আলোকে অথবা দলীয় চাহিদার ভিত্তিতে তাদেরকে আয় বর্ধনমূলক কর্মকা-, কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মাঠ ফসল চাষাবাদ, ফল বাগান স্থাপন, পশুপালন, মৎস্য চাষ, বাড়ির আঙ্গিনায় সবজি চাষ ইত্যাদি কার্যক্রমের ওপর আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এসব কার্যক্রম সফলতার সঙ্গে বাস্তবায়নের ফলে প্রতিটি গ্রাম হয়ে উঠছে স্বনির্ভরতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এসব গ্রামে নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণে দ্রুত দারিদ্র্যের অবসান ঘটছে। আই পিএম ক্লাব, আইসিএম ক্লাব, সিআইজি, ফিয়াক ইত্যাদির মাধ্যমে কৃষি সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করে সামাজিক সুরক্ষা এবং কৃষি  উন্নয়নে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হচ্ছে যা গ্রামীণ দারিদ্র্য দূরীকরণে ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখছে। এ ক্ষেত্রে অর্জিত এক একটি সফলতার উদাহরণগুলোকে মাথায় রেখে আমাদের আরো এগিয়ে যেতে হবে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বর্তমানে অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে উপকরণের সহজপ্রাপ্তি এবং বাজারজাতকরণের সুবিধা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৩২ শতাংশ। পাশাপাশি সঞ্চয়কে উৎসাহিতকরণ ও সহজ প্রাপ্য ঋণ প্রবাহের কারণে গ্রামীণ কৃষকদের পারিবারিক আয় বেড়েছে ৩৩ শতাংশ ( তথ্য সূত্র : Rural poverty wikipidea,case study, Bangladesh) । কৃষক সংগঠন তৈরি তথা টেকসই সমাজকাঠামো, গ্রামীণ কৃষিজীবী জনগোষ্ঠীকে তিনভাবে সাহায্য করতে পারে যেমন- (১) উৎপন্ন দ্রব্যের বাজারজাতকরণসহ ঋণ ও উপকরণ সরবরাহকারীর মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন (২) কৃষকের উৎপন্ন দ্রব্যের সঠিক মূল্য পাওয়া এবং (৩) সদস্যদের অতিরিক্ত আয়, যা লাভের অংশ থেকে প্রাপ্ত, তা আবার কৃষি ব্যবসায় বিনিয়োগ।


বিশ্ব খাদ্য শীর্ষ সম্মেলন (১৯৯৬) অনুসারে, “খাদ্য নিরাপত্তা বিরাজ করে যখন সকল লোকের, সব সময়, শারীরিক ও আর্থিক ভাবে পর্যাপ্ত এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের সামর্থ্য থাকে, যা খাদ্য চাহিদা মিঠানো এবং সুস্থ জীবন যাপনে সহায়তা করে”। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে খাদ্য সংগ্রহ ও ব্যক্তির পছন্দ মতো পুষ্টিসম্মত ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ করা পর্যস্ত বিষয়গুলো খাদ্য নিরাপত্তার আওতায় পড়ে। বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন ও পুষ্টির চাহিদা পূরণের অগ্রগতি উল্লেখ করার মতো। পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, ১৯৯১-৯২ সনে অপুষ্টিতে ভোগা মানুষ ছিল যেখানে ৩৫ শতাংশ, ২০০২-২০০৪ সনে তা কমে হয়েছে ৩০ শতাংশ। ১৯৮৪ সনে গ্রামীণ এলাকায় যেখানে একজন ব্যক্তির দৈনিক গড়ে চাল, গম, সবজি, ডাল, ফল, মাছ, মাংস ও ডিম এবং দুধ গ্রহণের পরিমাণের সঙ্গে ২০১০ সনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, সবজি ও ফল খাওয়ার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ৫০ শতাংশ ও ৬৫ শতাংশ। এছাড়া গ্রামীণ পর্যায়ে মাংস ও ডিম খাওয়ার পরিমাণ বেড়েছে এক-তৃতীয়াংশ এবং শহরে বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। ২০১১-১২ সনের পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, ৬৩.২ শতাংশ পরিবারের মধ্যে প্রতিজন দৈনিক গড়ে ২,১২২ কি.ক্যালরী গ্রহণ করতে পারে। এছাড়া, ৬৪.৭ শতাংশ গ্রামীণ জনগোষ্ঠী পর্যাপ্ত পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণে সক্ষম। ১৯৯০ সনের দিকে যেখানে এক জন শ্রমিক তার মজুরি দিয়ে দৈনিক গড়ে ৩.৫০ কেজি চাল কিনতে সক্ষম হতো, বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ১০.০ কেজি। কম ওজনের শিশুর জন্ম হার ১৯৯০ সনের ৬০ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ৩৬ শতাংশ নেমে এসেছে। অপুষ্টির চরম নিদর্শন, খর্বাকৃতি ২০০৭ সন থেকে ২০১১ সনে ২ শতাংশ পয়েন্ট কমে এসেছে। মহিলাদের ক্ষেত্রে চরম অপুষ্টির হার ১৯৯৭ সনের ৫২ শতাংশ থেকে কমে ২০১১ সনে ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। আমাদের সংবিধানের ১৮(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘জনগণের পুষ্টিরস্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবেন’। সুতরাং, ভবিষ্যতে বর্ধিত জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য টেকসই খাদ্য উৎপাদন ব্যতীত অন্য কোন বিকল্প পন্থা আমাদের হাতে আছে বলে মনে হয় না। আর এ জন্য আমরা যা উৎপাদন করি তার সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন।


পরিশেষে বলা যায়, আমাদের কৃষি এগিয়ে যেতে শুরু করেছে। এই অর্জন ও সাফল্য ধরে রেখে ২০৩০ সনের মধ্যে পৃথিবীকে পুরোপুরি দারিদ্র্যমুক্ত করাসহ অর্জিত উন্নয়নকে টেকসই করতে এখন আমাদের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে হবে। সে সঙ্গে অর্জন করতে হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ২০৪১ সনের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সুখী, সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্য। এসব উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে তাই সংগত ভাবেই নিম্নবর্ণিত কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে।

১. টেকসই কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার অংশীদারিত্ব জোরদারকরণ;
২. পরিবেশ সংরক্ষণ ও সুরক্ষার লক্ষ্যে সমন্বিত ফসল ব্যবস্থাপনা (আইসিএম), সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম), সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা (আইএনএম), সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা (আইডিএম), ভূউপরিস্থ ও বৃষ্টির পানি এবং সৌরশক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ;
৩. কৃষি সংশ্লিষ্ট সবার (কৃষক, ব্যবসায়ী, উপকরণ সরবরাহকারী, উদ্যোক্তা, প্রশিক্ষক, গবেষক, নারী) দক্ষতা উন্নয়ন;
৪. গবেষণা - সম্প্রসারণ - কৃষক - বাজার সম্পর্ক জোরদারকরণ;
৫. শস্য উৎপাদন বাড়াতে, বহুমুখীকরণ, নিবিড়করণ কার্যক্রম জোরদারকরণ ;
৬. কৃষিতে আইসিটি ও জিআইএস এর ব্যবহার বৃদ্ধিকরণ;
৭. কৃষক দলের মাধ্যমে প্রযুক্তি সম্প্রসারণ;
৮. জবিবৈচিত্র্য সংরক্ষণ (উদ্ভিজ, প্রাণীজ)
৯. খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি এবং খাদ্যাভ্যাসের বহুমুখীকরণ;
১০. খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের সঙ্গে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে সম্পৃক্তকরণ;
১১. বৃষ্টি-নির্ভর চাষাবাদকে উৎসাহিতকরণ;
১২. প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনা (ভূমি, পানি ও জীববৈচিত্র্য);
১৩. চাষাবাদ পদ্ধতির অর্থনৈতিক সক্ষমতা টেকসইকরণ;
১৪. প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নের জন্য সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা।
আমরা গভীর নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আরাধ্য সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নিরন্তর প্রয়াসকে সাফল্য মণ্ডিত করে তুলব। বাংলার দুঃখী মানুষের মুখ অম্লান থাকবে উজ্জ্বল হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলতে হবে।

 

কৃষিবিদ মো. হামিদুর রহমান*
*মহাপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫


Share with :

Facebook Facebook