কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

রফতানি বৃদ্ধিতে মানসম্পন্ন ফলের উৎপাদন নিশ্চিতকরণ

মানবজাতির সৃষ্টি ও বিকাশের সাথে ফল অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। আদি মানব, আদম ও হাওয়া সৃষ্টির পর বাগানে বিচরণ করতেন এবং বিভিন্ন ফল আহার করতেন। বাগানে নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার অপরাধেই মানবজাতির এ সুন্দর পৃথিবীতে আগমন। পৃথিবীতে এসেও প্রাকৃতিকভাবে জন্মে থাকা ফলমূল আহরণ ও ভক্ষণ করেই তাদের বাঁচতে হয়েছে। ফলে তারা এসব ফলের পরিচর্যা শুরু করে দেয়। কাজেই ইতিহাসের দিক থেকেও বিবেচনা করলে ফল তথা উদ্যান বিজ্ঞানের বিকাশ কৃষি বিজ্ঞানেরও আগে। আর এ প্রাচীনতম বিজ্ঞানকে যারা দৈনন্দিন ও জাতীয় জীবনে যথার্থ স্থান দিয়েছে তারাই দুনিয়াতে স্বাধীন ও শক্তিশালী জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।

প্রকৃতিতে যত প্রকার খাদ্যদ্রব্য উৎপাদিত হয় তার মধ্যে ফলই সবচেয়ে বেশি পুষ্টিকর এবং সুস্বাদু। এর মধ্যে রয়েছে মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় সব গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। ফল বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের সর্বোৎকৃষ্ট উৎস। এটি রান্না ছাড়া সরাসরি খাওয়া হয় বলে বিদ্যমান পুষ্টি উপাদানগুলোর সবটুকুই দেহ গ্রহণ করতে পারে। এসব উপাদান দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধিসহ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে বিধায় এদের প্রটেকটিভ ফুড বা প্রতিরক্ষাকারী খাদ্যও বলা হয়। পুষ্টি উপাদান ছাড়াও ফলে এমন কিছু জৈব এসিড ও এনজাইম আছে, যা আমাদের হজমে সহায়তা করে। যেমন- লেবু জাতীয় ফলে সাইট্রিক এসিড, আঙুর ও তেঁতুলে টারটারিক এসিড আছে। পেঁপেতে রয়েছে পেঁপেইন নামক হজমকারী এনজাইম। এ ছাড়াও চাল বা গম অপেক্ষা ফল চাষ করে অধিক শক্তি পাওয়া যায়। তাই সুস্থ, সবল, কর্মক্ষম এবং মেধাবী জাতি গঠনে সুষম খাদ্য তথা ফলের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই দানাজাতীয় খাদ্যশস্য উৎপাদনের পাশাপাশি ফলের সার্বিক উন্নয়নেও সমগুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন যাতে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
 
বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে ফলের অবদান কম নয়। বাংলাদেশে ফলের আওতায় মোট আবাদি-চাষভুক্ত জমির পরিমাণ শতকরা ১.৬৬ ভাগ। কিন্তু জাতীয় অর্থনীতিতে মোট ফসলভিত্তিক আয়ে প্রায় শতকরা ১০ ভাগ আসে ফল থেকে। অধিকন্তু, বিদেশে তাজা-টাটকা ফল ও প্রক্রিয়াজাতকৃত-মূল্যসংযোজিত ফলজাত দ্রব্যাদির প্রচুর চাহিদা রয়েছে। আমদানিকারক দেশের চাহিদা অনুযায়ী নিরাপদ ও গুণগতমানসম্পন্ন তাজা ফল ও প্রক্রিয়াজাতকৃত-মূল্যসংযোজিত ফলজাত দ্রব্যাদি উৎপাদন করে রফতানির মাধ্যমে অধিকহারে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব, যা দেশের সার্বিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
 
ফল চাষের বর্তমান অবস্থা
বাংলাদেশে প্রায় ৭০ রকমের প্রচলিত ও অপ্রচলিত ফল জন্মে থাকে। প্রচলিত ফলের মধ্যে কলা, আম, কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা, পেঁপে, লেবু, বাতাবিলেবু, লিচু, কুল এবং নারিকেল উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে কামরাঙা, লটকন, সাতকরা, তৈকর, আতা, শরিফা, জলপাই, বেল, আমড়া, কদবেল, আমলকী, জাম, ডালিম, সফেদা, জামরুল, গোলাপজাম ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য অপ্রচলিত ফল। স্থানীয় ও বিদেশি ফল এ দেশের উষ্ণ-অব উষ্ণ জলবায়ুতে জন্মে বিধায় স্বাদে, গন্ধে, আকারে ও ফলনে নানা বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশে বহু রকম ফল উৎপাদন হওয়া সত্ত্বেও আমাদের মাথাপিছু দৈনিক ফলের প্রাপ্যতা মাত্র ৭৮ গ্রাম, যা পুষ্টি বিজ্ঞানীদের সুপারিশকৃত ন্যূনতম চাহিদা মাত্রার (১১৫ গ্রাম) অনেক কম। বর্তমানে বাংলাদেশে ২ লাখ ৪৩ হাজার হেক্টর জমি থেকে ৪৫.২ লাখ টন ফল উৎপাদন হয় অথচ আমাদের দরকার ৬৭.২০ লাখ টন। ফলের উৎপাদন ন্যূনতম চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২.০০ লাখ টন কম। তাই জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে ফলের মাথাপিছু প্রাপ্যতার পরিমাণ বাড়াতে আমাদের সচেষ্ট হতে হবে।
 
ফল উৎপাদনের সমস্যা
উচ্চফলনশীল উন্নত জাতের অপ্রতুলতা অঞ্চলভিত্তিক উন্নত জাতের অভাব অনিয়মিত ফল ধারণ মৌসুমভিত্তিক প্রাপ্যতার তারতম্য উন্নত গুণাগুণসম্পন্ন চারা/কলমের অভাব ফল গাছের অপর্যাপ্ত পুষ্টি, সেচ ও ফসল ব্যবস্থাপনা রোগ ও পোকামাকড়ের প্রাদুর্ভাব বাজারজাতকরণের প্রতিবন্ধকতা ফসল সংগ্রহোত্তর অপচয় নিরাপদ ফল চাষে কৃষকদের সচেতনতার অভাব।
 
ফলের মৌসুমভিত্তিক প্রাপ্যতা
আমাদের দেশে প্রচলিত ফলের প্রাপ্তির সময় খুবই সংক্ষিপ্ত অর্থাৎ মধ্য মে থেকে মধ্য আগস্ট মাস পর্যন্ত। এ সময় মোট ফল উৎপাদনের শতকরা ৫৪ ভাগ ফল পাওয়া যায় এবং বাকি আট মাস শতকরা ৪৬ ভাগ ফল পাওয়া যায়। আমাদের দেশে ফলের ভরা মৌসুমে অর্থাৎ মধ্য মে থেকে মধ্য আগস্ট মাসে দেশীয় ফলের প্রাপ্যতা মোটামুটি সন্তোষজনক থাকলেও অন্য সময়ে দেশের চাহিদা পূরণ করতে আমদানির ওপর নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে। সেজন্য দেশীয় ফলের প্রাপ্যতার সময় বৃদ্ধি করা একান্ত প্রয়োজন। ফলের প্রাপ্যতার সময় বৃদ্ধিকরণের মাধ্যমে দেশের আপামর জনগোষ্ঠীর পুষ্টি ঘাটতি পূরণের সাথে সাথে জনসাধারণের আয় ও কাজের সুযোগও সৃষ্টি করা সম্ভব। আগাম, নাবী ও লিন পিরিয়ডে ফলের (সেপ্টেম্বর-এপ্রিল) উপযুক্ত জাত নির্বাচনের মাধ্যমে ফলের প্রাপ্যতার সময় বৃদ্ধি করা সম্ভব।
ফল উৎপাদনের সম্ভাবনা
মাটি ও জলবায়ু : বাংলাদেশ আর্দ্র ও উষ্ণম-লীয় দেশ। এ দেশের অত্যন্ত উর্বর ও গভীর মাটি প্রায় সব ধরনের গ্রীষ্ম ও অবগ্রীষ্ম মণ্ডলীয় ফল চাষের অনুকূল।
 
জনপ্রতি প্রাপ্যতা : বর্তমানে এ দেশে যে পরিমাণ ফল উৎপাদিত হচ্ছে তা পুষ্টি বিজ্ঞানীদের সুপারিশকৃত মাত্রার প্রায় ৬৮% পূরণ করতে পারে। অবশিষ্ট ৩২% ঘাটতি পূরণে প্রচলিত ও অপ্রচলিত ফলের উৎপাদন বৃদ্ধির যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে।
 
আবাদি-চাষভুক্ত জমি বৃদ্ধি : বর্তমানে এ দেশে মোট চাষযোগ্য জমির মাত্র ১.৬৬% জমিতে ফল ও ফলদ বৃক্ষের চাষ হয়ে থাকে। সম্প্রসারণ কাজের মাধ্যমে পাহাড়ি অঞ্চল, পতিত জমি, বসতবাড়ি, পুকুর পাড়, রাস্তার ধার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চত্বর, অফিস এলাকা প্রভৃতি জায়গায় প্রচলিত ও অপ্রচলিত ফলগাছ লাগিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে।
 
ফলন বৃদ্ধি : উন্নত জাতের চাষ, উন্নত চাষাবাদ ও নিবিড় পরিচর্যা, সঠিক রোগ ও পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষ সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফলন বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
 
ফল রপ্তানি
বিশ্বের ফল বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবদান খুবই কম। বিদেশে তাজা-টাটকা ফল ও প্রক্রিয়াজাতকৃত-মূল্যসংযোজিত ফলজাত দ্রব্যাদির প্রচুর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ থেকে বর্তমানে সীমিত আকারে টাটকা ফল রপ্তানি হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশে ফল রপ্তানি হলেও যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং ওমান উল্লেখযোগ্য। অধিক পরিমাণ ফল রপ্তানি করতে হলে আমদানিকারক দেশের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন, প্যাকেজিং ও পরিবহন ব্যবস্থা বিন্যস্ত করতে হবে। রপ্তানিকৃত উল্লেখযোগ্য ফলগুলো হলো- কাঁঠাল, আম, আনারস, জারা লেবু, এলাচি লেবু, আমড়া, জলপাই, পেয়ারা, সাতকরা, তৈকর, লটকন, কামরাঙা, বেল, কদবেল, আমলকী, বাতাবি লেবু, তেঁতুল ও চালতা। প্রবাসী বাংলাদেশী, পাকিস্তানি এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত অভিবাসীদের মাঝে বাংলাদেশী টাটকা ফলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আকর্ষণীয় রঙ, সমআকার, আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং ব্যবহারের কারণে থাইল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, চীন ও আফ্রিকান দেশগুলোর ফলের চাহিদা তুলনামূলকভাবে বেশি।
 
বাংলাদেশ থেকে রপ্তানিকৃত ফলের পরিমাণ ও মূল্য সারণি-১ এ উল্লেখ করা হলো :
সারণি-১: ২০০৫-০৬ থেকে ২০১৩-২০১৪ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ফল রপ্তানির পরিমাণ ও মূল্য

তথ্যসূত্র : রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো এবং হর্টেক্স ফাউন্ডেশন ২০১৫

*রপ্তানিকৃত ফলের গড় মূল্য ৩২০৫ ইউএস ডলার/মে.টন হিসেবে পরিমাণ নির্ণয় (২০১০-১১ অর্থবছরের ভিত্তিতে) করা হয়েছে।
টাটকা ফল রপ্তানি ছাড়াও হিমায়িত ফল (সাতকরা, কাঁঠালের বীজ, কাঁচাকলা, লেবু, জলপাই, আমড়া ইত্যাদি) ইতালি, জার্মানি, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান এবং বাহরাইনে রপ্তানি করা হয়ে থাকে। ফলের বর্তমান গড় ফলন ও বৈদেশিক বাজারের মূল্য বিবেচনায় সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ করলে অদূর ভবিষ্যতে ফল ও ফলজাত দ্রব্যাদির রপ্তানি করে বর্তমানের চেয়ে অধিক বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব, যা দেশের অর্থনৈতিক আয় বৃদ্ধি ও দারিদ্র্যবিমোচনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

ফল রপ্তানিতে প্রতিবন্ধকতা
অঞ্চলভিত্তিক রপ্তানি উপযোগী ফল জাতের অপ্রতুলতা।
আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদানুযায়ী গুণগত মানসম্পন্ন ফলের অভাব।
ফলের অনিয়মিত সরবরাহ।
সঠিক পোকামাকড় ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনার অভাব।
সঠিক সংগ্রহ কলাকৌশল এবং সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনার অভাব।
আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্যাকেজিংয়ের অভাব।
অন্যান্য দেশের তুলনায় বিমান ভাড়া বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন।
স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিবহন সমস্যা
বিমানবন্দরের ভেতরে হিমাগারের অভাব।  
সঠিক প্যাক-হাউস এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যানবাহনের অভাব।
গুণগতমান রক্ষাকল্পে সঠিক উৎপাদন ও সংগ্রহোত্তর কলাকৌশল সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব।
 
ফল রপ্তানির সম্ভাবনা
এ দেশের মাটি, জলবায়ু ও ভৌগোলিক অবস্থান উপযোল উৎপাদন করে রপ্তানির প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। হর্টেক্স ফাউন্ডেশনের অভিজ্ঞতা এবং কর্মকাণ্ডে প্রতীয়মাণ হয়েছে যে, উত্তম কৃষি পদ্ধতি (GAP) অনুসরণের মাধ্যমে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত গুণগতমানসম্পন্ন ফল উৎপাদন, সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা, মোড়ক উন্নয়ন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মধ্যমে ethnic and mainstream market এ বাংলাদেশের তাজা-টাটকা ফল রপ্তানির অপার সম্ভাবনা বিদ্যমান। তাছাড়া, হিমায়িত এবং প্রক্রিয়াজাতকৃত ফলজাত দ্রব্যাদি রপ্তানির সম্ভাবনাও প্রচুর। অদূর ভবিষ্যতে জৈব কৃষি পদ্ধতিতে উৎপাদিত তাজা ফল রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের ফলের চাহিদা না থাকলেও আম, কাঁঠাল, আনারস, কলা, লেবুজাতীয় ফল, লিচু ও পেয়ারার ব্যাপক চাহিদা বিদ্যমান। উল্লেখ্য, হর্টেক্স ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার অর্থায়নে ২০১৫ সালে উত্তম কৃষি পদ্ধতি ব্যবস্থা অনুসরণপূর্বক নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও আন্তর্জাতিক বাজারের মানসম্পন্ন আম উৎপাদনের মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে বড় খুচগী হওয়ায় আন্তর্জাতিক মানের ফরা পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্টে (ASDA) বাংলাদেশের আম প্রথমবারের মতো যুক্তরাজ্যে রপ্তানি শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা মোতাবেক গুণগতমানসম্পন্ন ফল উৎপাদন সাপেক্ষে আগামী দিনে বাংলাদেশ থেকে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, ফ্রান্স বেলজিয়াম এবং নেদারল্যান্ডসসহ অন্যান্য দেশে বিভিন্ন প্রকার মৌসুমী ফল রপ্তানির উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।
মানসম্পন্ন ফল উৎপাদন কলাকৌশল
অঞ্চলভিত্তিক রফতানি উপযোগী জাতের ব্যবহার
ফল উৎপাদনে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয় হচ্ছে জাতের উৎকৃষ্টতা। কেননা ভালো জাত ভালো ফসলের অন্যতম প্রধান উপাদান। সঠিকভাবে জাত নির্বাচনের ওপর এর ফলন এবং লাভ-লোকসান অনেকাংশে নির্ভর করে। কাজেই ফলচাষিরা অঞ্চলভিত্তিক রফতানি উপযোগী ভালো জাত সরবরাহ করার সাথে সাথে চাষের প্রয়োজনীয় উৎপাদন কলাকৌশল সম্পর্কে অবহিত করতে হবে এবং ভালোজাতের চারা রোপণের জন্য পরামর্শ দিতে হবে।
 
উন্নত গুণাগুণসম্পন্ন কলমের চারা ব্যবহার
ফলগাছের চারা মূলত যৌন এবং অযৌন প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয়ে থাকে। বীজ থেকে উৎপাদিত চারায় মাতৃগাছের গুণাগুণ অক্ষুন্ন থাকে না কিন্তু অঙ্গজ পদ্ধতিতে উৎপাদিত চারায় মাতৃগাছের বৈশিষ্ট্যগুলো বজায় থাকে। কাজেই ফলগাছ রোপণের পূর্বে সঠিক চারা নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা বাংলাদেশে ফলের নিম্ন ফলন ও নিম্নমানের ফল উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কারণ বীজের চারা ব্যবহার। উন্নত গুণাগুণ সম্পন্ন কলমের চারার অপর্যাপ্ত সরবরাহের জন্য কৃষকরা অধিকাংশ সময়ই বীজের চারা রোপণ করে থাকেন। ফলে সেই চারা বা গাছ থেকে কাক্ষিত মাত্রায় উন্নত মানের ফল এবং ফলন পাওয়া যায় না। কলমের চারা নির্বাচনে নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো বিবেচনা করা দরকার-
কলম উন্নত জাতের হতে হবে (অনুমোদিত বা স্থানীয়)।
নিজের তৈরি বা পরিচিত নার্সারি থেকে কলমের চারা সংগ্রহ করতে হবে।  সুস্থ, সবল অর্থাৎ রোগ ও পোকামাকড় মুক্ত হতে হবে।
গাঢ় ঘন সবুজ পাতাবিশিষ্ট ও কোমল, বর্ধিষ্ণু, সোজা ও তেজদীপ্ত হতে হবে।
সঠিক বয়সের হতে হবে।
ফলচাষিকে উন্নত গুণাগুণসম্পন্ন ভালোজাতের কলম সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং এর উপকারিতা সম্পর্কে সর্বদা অবহিত করতে হবে।
উপযুক্ত স্থান নির্বাচন
ফল বাগানের স্থান নির্বাচন ভুল হলে তা শোধরানো কঠিন তাই ফল বাগানের স্থান সঠিকভাবে নির্বাচন করা প্রয়োজন।
ফল চাষের জন্য উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি নির্বাচন করতে হবে যেখানে সারাদিন সূর্যের আলো পড়ে পাহাড়ি এলাকায় জমির ঢাল ৪৫ ডিগ্রির কম হতে হবে।

জলবায়ু ও মাটি ছাড়াও বাণিজ্যিক ফল বাগানের এলাকা এবং স্থান নির্বাচনে যে বিষয়সমূহ বিবেচনা করা উচিত তা হচ্ছে- ক) বাজারের নৈকট্য, খ) যোগাযোগ ব্যবস্থা, গ) সেচের ব্যবস্থা, ঘ) সার ও ফল সংরক্ষণের ব্যবস্থা, ঙ) জমির মূল্য, চ) শ্রমিক, যন্ত্রপাতি ও উপকরণের সহজলভ্যতা ইত্যাদি।
 
চারা রোপণের সঠিক নিয়মনীতি অনুসরণ
ফলের চারা লাগানোর স্থান নির্ধারণের পর চারার জন্য নির্দিষ্ট দূরত্বে সঠিক আকারের গর্ত করতে হবে এবং গর্তের উপরের স্তরের মাটি এক পাশে, বাকি অর্ধেক আলাদা করে রাখতে হবে। চারা রোপণের অন্তত তিন সপ্তাহ আগে সঠিক মাত্রায় সার উপরের অংশের মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে গর্ত ভর্তি করতে হবে। চারা উপযুক্ত সময়ে সঠিকভাবে রোপণ করতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ চাষিরাই চারা রোপণের জন্য সঠিক নিয়মনীতি অনুসরণ করেন না বিধায় গাছের প্রাথমিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ায় ফলের ফলন কমে যায়। তাই ফল চাষিদের ফলের চারা রোপণের সঠিক নিয়মনীতি সম্পর্কে অবহিত করতে হবে।

ছাঁটাইকরণ
গাছের বৃদ্ধির প্রাথমিক অবস্থায় গাছের একটা সুন্দর, মজবুত কাঠামো বা গঠন তৈরির জন্য যে ছাঁটাই করা হয়ে থাকে তাকে ইংরেজিতে ‘ট্রেনিং’ এবং বাংলায় ‘ছাঁটাই’ বলা হয়ে থাকে। ফল গাছের প্রজাতিভেদে গাছের কা-টা যাতে সোজাভাবে প্রায় ০.৭৫ মিটার থেকে ১.৫ মিটার লম্বা হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে এবং গাছের গোড়ার অপ্রয়োজনীয় ডালপালা গজালে নিয়মিত ছাঁটাই করতে হবে। (চলবে)
 
ড. মো. আবদুল জলিল ভূঁঞা*
মিটুল কুমার সাহা**
* ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ** সহকারী মহাব্যবস্থাপক, হর্টেক্স ফাউন্ডেশন, সেচ ভবন (৪র্থ তলা), ২২ মানিক মিয়া এভিনিউ, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা-১২০৭

Share with :

Facebook Facebook